ইতিহাসের ছাইঃ আদি কোরআন ধ্বংস এবং বিবর্তনের চিহ্ন মোছার ইসলামি কৌশল

ভূমিকা

যেকোনো আদর্শিক বা ধর্মীয় কাঠামোর স্থায়িত্ব নির্ভর করে তার একটি ‘প্রামাণিক’ বা ‘স্ট্যান্ডার্ড’ ভাষ্যের ওপর। ইতিহাসের পাতায় আমরা বারবার দেখি, যখনই কোনো কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ তাদের মতাদর্শকে নিরঙ্কুশ করতে চেয়েছে, তখনই তারা তথ্যের বৈচিত্র্যকে সংকুচিত করে একটিমাত্র বয়ানকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছে। এই প্রক্রিয়ার সবচেয়ে কার্যকর ও চরম পন্থা হলো ‘ইনফরমেশন ইরেজার’ বা তথ্যের পরিকল্পিত বিনাশ। মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, কোনো গ্রন্থ বা মতবাদকে ‘অপরিবর্তনীয়’ এবং ‘ঐশ্বরিক’ হিসেবে প্রমাণ করার প্রধান শর্তই হলো তার বিবর্তন বা সংস্কারের সমস্ত প্রমাণ মুছে ফেলা। কারণ, সংস্কারের ইতিহাস রক্ষিত থাকলে সেই গ্রন্থের মানবসৃষ্ট বিবর্তনের রেখাচিত্রটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যা অলৌকিকত্বের দাবিকে দুর্বল করে দেয়।

ইসলামের প্রাথমিক যুগে কোরআন সংকলনের ইতিহাস এবং পরবর্তীকালে বিভিন্ন সংস্করণ পুড়িয়ে ফেলার ঘটনাটি কেবল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ছিল না; বরং এটি ছিল একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক ও ধর্মতাত্ত্বিক সেন্সরশিপ। কোনো গ্রন্থের আদি পাণ্ডুলিপি ধ্বংস করা মানে হলো সেই গ্রন্থের শব্দচয়ন, ব্যাকরণিক বিবর্তন এবং আঞ্চলিক পাঠভেদের (Dialectal variations) ঐতিহাসিক পথটি চিরতরে রুদ্ধ করে দেওয়া। যখন একটি কর্তৃপক্ষ দাবি করে যে তাদের কাছে থাকা সংস্করণটিই ‘একমাত্র সত্য’, এবং একই সাথে অন্য সব প্রাচীন উৎস ধ্বংস করে ফেলে, তখন সেখানে যৌক্তিক অনুসন্ধানের পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। এটি মূলত পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তথ্যের বহুত্ববাদকে আড়াল করে একটি ‘মনোলিথিক’ বা একশিলা ধর্মতত্ত্ব চাপিয়ে দেওয়ার একটি ধ্রুপদী কৌশল।


আদি পাণ্ডুলিপি ও সংকলনের বৈচিত্র্যঃ হারানো ইতিহাসের সন্ধানে

ইসলামী ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথম খলিফা আবু বকর এবং উমরের শাসনামলে কোরআনের যে প্রাথমিক সংকলনটি তৈরি হয়েছিল, তাকে ‘আদি কোরআন’ বা আদি পাণ্ডুলিপি হিসেবে গণ্য করা যায়। ইসলামি ঐতিহাসিক বর্ণনা মতে, এই সংকলনটি মুহাম্মদের বর্ণিত ধারা অনুসরণ করে প্রস্তুত করা হয়েছিল, যেখানে সূরাগুলোর অভ্যন্তরীণ বিন্যাস থাকলেও সামগ্রিক ক্রমধারা তখনো নির্ধারিত হয়নি। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই সংস্করণটি ‘সাত হরফ’ বা বিভিন্ন আঞ্চলিক উপভাষার (Dialects) বৈচিত্র্য ধারণ করত এবং এতে কেবল সেই আয়াতগুলোই অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল যা রহিত বা বাতিল হয়ে যায়নি [1]

ইসলামি ঐতিহাসিক সূত্রগুলোতে দেখা যায়, এই আদি পাণ্ডুলিপিটি পরবর্তীকালে তৃতীয় খলিফা উসমানের সংকলিত সংস্করণের জন্য একটি বড় ধরণের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। উসমান যখন সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি ক্রমধারা অনুসরণ করে নতুনভাবে কোরআন সংকলন শুরু করেন, তখন আদি সংস্করণের সাথে এর কাঠামোগত ও ভাষাগত পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ইতিহাসের এই সন্ধিক্ষণে একটি অত্যন্ত বিতর্কিত প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়—উসমানের সংকলিত সংস্করণটিকে প্রশ্নাতীত করার লক্ষ্যে পূর্ববর্তী সমস্ত আদি পাণ্ডুলিপি পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয় [2] [3]

[2] [4]

এভাবে নববী যুগে নবী কারীম (স)-এর তত্ত্বাবধানে পবিত্র কুরআনুল কারীমের একটি কপি লিপিবদ্ধ করা হয়েছিল। যদিও তখন গ্রন্থাকারে ছিল না; বরং পৃথক পৃথক কাগজে লিপিবদ্ধ ছিল। এর সাথে সাথে কোনো কোনো সাহাবী নিজের মুখস্ত রাখার জন্য পবিত্র কুরআনুল কারীমের কোনো কোনো আয়াত নিজের কাছে লিখে রাখতেন। আর এই ধারাবাহিকতা ইসলামের একেবারে প্রাথমিক অবস্থা থেকে চালু ছিল। যার প্রমাণ নিম্নের ঘটনা থেকে পাওয়া যায়। ঘটনাটি হলো, হযরত ওমর (র)-এর বোন ফাতেমা বিনতে খাত্তাব (আ) এবং ভগ্নিপতি হযরত সাঈদ ইবনে যায়েদ (র) হযরত ওমর (র)-এর পূর্বেই ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। হযরত ওমর () তাঁদের ইসলাম গ্রহণের সংবাদ পেয়ে রাগান্বিত হয়ে যখন তাঁদের ঘরে প্রবেশ আনহু
করলেন, তখন তিনি সেখানে কুরআনের একটি সহীফা বা পান্ডুলিপি পেলেন। যার মধ্যে সূরা ‘ত্বহা’র আয়াতগুলো লিপিবদ্ধ ছিল এবং হযরত খাব্বাব ইবনে আরাত )ﷺ( তা পাঠ করছিলেন। ২৬০ আনহু
এছাড়াও একাধিক রেওয়ায়েত থেকে জানা যায় যে, অনেক সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-গণ ব্যক্তিগতভাবে পবিত্র কুরআনুল কারীমের সম্পূর্ণ বা অসম্পূর্ণ কপি লিপিবদ্ধ করে নিজের সংরক্ষণে রেখে দিয়েছিলেন। যেমন সহীহ বুখারীতে হযরত ইবনে ওমর (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে-আনহ
أن رسول الله صلى الله عليه وسلم نهى أن يسافر بالقرآن إلى ارض العدو
‘রাসূলুল্লাহ (হা হা) কুরআনকে নিয়ে শত্রুর ভূমিতে সফর করতে নিষেধ করেছেন।’ ২৬১
অনুরূপভাবে মু’জামুল আওসাতেও একটি রেওয়ায়েত এসেছে।
রাসূলে করীম (আয়া) ইরশাদ করেছেন-
قرأة الرجل في غير المصحف الف درجة وقراءته في المصحف تضاعف في ذلك الفي درجة.
‘কোনো ব্যক্তি যদি কুরআনের কপি না দেখে তেলাওয়াত করে তাহলে তার সওয়াব এক হাজার। আর যে দেখে তেলাওয়াত করে তার সওয়াব দুই হাজার।’ ২৬২
উপরোক্ত দুটি রেওয়ায়েত থেকে জানা যায় যে, নববী যুগ থেকেই সাহাবায়ে কেরামের নিকট কুরআনের পান্ডুলিপি বিদ্যমান ছিল। আর যদি এমনটি না হতো তাহলে পবিত্র কুরআনুল কারীম দেখে পাঠ করার বা তা নিয়ে শত্রুর এলাকায় সফর করার প্রশ্নই উঠতনা।
حضرت ابو بکر رضی کے عہد میں جمع قرآن
হযরত আবু বকর (রা.)-এর যুগে পবিত্র কুরআন জমা করণেরঃ
দ্বিতীয় ধাপ:
যেহেতু নবী কারীম (মায়া)-এর যুগে পবিত্র কুরআনুল কারীমের যতগুলো কপি লিপিবদ্ধ করা হয়েছিল, সেগুলোর অবস্থা ছিল এমন যে, হয়তো বিভিন্ন বস্তুর উপর লিপিবদ্ধ ছিল। কোনো আয়াত চামড়ার উপর, কোনো আয়াত গাছের পাতায় আবার কোনো আয়াত হাড়ের উপর। অধিকাংশই ছিল অসম্পূর্ণ কপি। কোনো সাহাবীর কাছে একটি সূরা লিপিবদ্ধ ছিল। কারো কাছে পাঁচ-দশটি সূরা। কারো কাছে শুধু কয়েকটি আয়াত। আবার কোনো কোনো সাহাবীর কাছে আয়াতের সাথে তার তাফসীর বাক্য ও লিপিবদ্ধ ছিল।
এপ্রেক্ষিতে হযরত আবু বকর (র) নিজের খেলাফত কালে পবিত্র কুরআনুল কারীমের এই বিক্ষিপ্ত অংশগুলোকে একত্রিত করে তা সংরক্ষণ করাটাকে অত্যন্ত জরুরী মনে করলেন। হযরত আবু বকর ( () যেসব অবস্থার প্রেক্ষিতে এ পদক্ষেপ নিয়েছিলেন এবং যেভাবে তা সম্পন্ন করে ছিলেন, সে সম্পর্কে হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত (র) বর্ণনা করেন যে, ইমামামাহ্’র যুদ্ধের পর পরই একদিন হযরত আবু বকর (আ) আমাকে জরুরীভাবে তলব করলেন। (আমি সেখানে উপস্থিত হয়ে হযরত ওমর বিন খাত্তাব ()-উপস্থিত ছিলেন।)
হযরত আবু বকর (রা) আমাকে বললেন, “হযরত ওমর এইমাত্র এসে আমাকে সংবাদ দিলেন যে, ইয়ামামাহ্’র যুদ্ধে হাফেযে কুরআনদের বিরাট একটি দল শহীদ হয়ে গেছেন। আর এভাবে যদি হাফেযগণ শহীদ হতে থাকেন, তাহলে আমার আশঙ্কা হচ্ছে যে, পবিত্র আল-কুরআনের বিরাট একটা অংশ বিলুপ্ত হয়ে যাবে। তাই আমার মত হলো, আপনি আপনার নির্দেশ প্রদান করে কুরআনুল কারীমকে সংকলন করার কাজ আরম্ভ করে দিন।” আমি হযরত ওমরকে বললাম, যে কাজ রাসূলে খোদা (আলাযাহ) নিজে করেননি, তা আমরা কিভাবে করতে পারি? হযরত ওমর (রা.) উত্তর দিলেন, মহান আল্লাহর কসম! এ কাজ অনেক উত্তমই হবে।
এভাবে হযরত ওমর আমাকে বারবার তাগিদ দিতে থাকলেন। এমনকি আমার অন্তরও এ দিকে ঝুঁকে পড়ল। এবং আমিও হযরত ওমরের সাথে একমত হয়ে গেলাম, অতপর হযরত আবু বকর (আ) আমাকে বললেন, “তুমি একজন নওজোয়ান এবং সমঝদার মানুষ। তোমার ব্যাপারে আমার কোনো বিরূপ ধারণা নেই। তুমি নবী কারীম (সা)-এর নিকট ওহী লিপিবদ্ধ করতে। অতএব, তুমি কুরআনুল কারীমের আয়াতসমূহকে তালাশ করে সেগুলোকে একত্রে জমা কর।”
আনহু সায়াল্লার হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত (র) বলেন, মহান আল্লাহর কসম! যদি তাঁরা আমাকে একটি পাহাড় স্থানান্তর করার নির্দেশ দিতেন, তবু বোধ হয় তা আমার কাছে এত কঠিন মনে হতো না, যত কঠিন মনে হতে লাগল কুরআন সংকলনের কাজটি। আমি তাঁকে বললাম, আপনি ওই কাজ কি করে করতে চাচ্ছেন, যে কাজ স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা) করেন নি? হযরত আবু বকর () উত্তরে আমাকে বললেন, মহান আল্লাহর শপথ! এ কাজ উত্তম-ই উত্তম হবে। বার বার তিনি আমাকে একই কথা বলতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তাআলা আমার হৃদয়কেও এ রায়ের প্রতি উন্মুক্ত করে দিলেন, যার প্রতি উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন হযরত আবু বকর (রা.) ও হযরত ওমর (রা.)-এর হৃদয়কে। এভাবে আমি কুরআনের আয়াত তালাশ করতে শুরু করলাম। খেজুরের ডাল, পাথরের গা এবং মানুষের বক্ষ থেকে কুরআন সংকলন করলাম। ২৬৩
এখানে কুরআন জমা করার ক্ষেত্রে হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত (আ)-এর কার্যক্রম সম্পর্কে ভালোভাবে জেনে নেওয়ার দরকার। যেমনটি পূর্বে আলোচিত হয়েছে যে, তিনি নিজেও একজন কুরআনের হাফেয ছিলেন। কাজেই তিনি তাঁর স্মৃতি থেকে সম্পূর্ণ কুরআন লিখতে পারতেন। এ ছাড়া শত শত হাফেযও তখন বিদ্যমান ছিলেন। হাফেযদের একটি দলকে সমবেত করেও কুরআন লিপিবদ্ধ করা সম্ভব ছিল। অনুরূপভাবে পবিত্র কুরআনুল কারীমের যে কপিটি নবী কারীম (সা)-এর যুগেই লিপিবদ্ধ করা হয়েছিল, হযরত যায়েদ ইবনে আরকাম (র) ওই কপি থেকেও কুরআনুল কারীম…


কোরআন
কোরআন 1
কোরআন 3

কুরআন মজীদের সংকলন
কুরআন মজীদ বর্তমানে যেভাবে বিন্যস্ত আছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সময় হাফেজদের স্মৃতিতেও সেভাবেই সংরক্ষিত ছিল। তবে লিখিতভাবে একটি গ্রন্থে ছিল না বরং বিভিন্ন ছোট ছোট পুস্তিকাকারে সংরক্ষিত ছিল। ইয়ামামার যুদ্ধে বিপুল সংখ্যক কুরআনের হাফেজ শাহাদাত লাভ করলে হযরত উমর (রা) নবী (স) যেভাবে কুরআন মজীদ বিন্যস্ত করেছিলেন সেইভাবে একটি মাত্র গ্রন্থাকারে বিন্যস্ত করে সংরক্ষণের জন্য প্রস্তাব দেন। হযরত আবু বকর (রা) প্রথমে কিছু আপত্তি করলেও পরে তাঁর সাথে ঐকমত্য পোষণ করেন এবং কাতেবে অহী হযরত যায়েদ ইবনে সাবেত (রা) এ কাজের জন্য আদিষ্ট হন। তিনি অতীব যত্ন সহকারে ছোট ছোট সহীফাসমূহ একত্র করে তার সাথে কুরআন মজীদকে একটি বিন্যস্ত গ্রন্থের আকারে সংকলিত ও লিপিবদ্ধ করেন। হযরত আবু বকর (রা)-এর ইনতিকালের পর উক্ত মাসহাফ হযরত উমরের কাছে সংরক্ষিত ছিল। হযরত উসমান (রা) খলিফা হওয়ার পর তার একাধিক কপি প্রস্তুত করিয়ে অন্যান্য শহরে প্রেরণ করেন। আমীর মুয়াবিয়ার শাসনযুগে মদীনার গভর্ণর মারওয়ান হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা)-এর নিকট থেকে হযরত আবু বকর (রা)-এর প্রস্তুতকৃত মাসহাফ নিয়ে ধ্বংস করে ফেলে। ১
মোদ্দা কথা, হযরত আবু বকর (রা)-এর ঈমানী শক্তি এবং সৎ ও দৃঢ় সংকল্পের ফলে এক বছরের মধ্যে সমস্ত অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা অবদমিত হয় এবং সমগ্র আরব ইসলামী পতাকার নীচে ঐক্যবদ্ধ হয়। মহা জ্ঞানভান্ডার কুরআন মজীদ-মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে যার হিফাজতের প্রতিশ্রুতি ছিল-চিরদিনের জন্য সংরক্ষিত হয়ে যায়।
(১) ফাতহুল বারী, ৯ম খন্ড, পৃষ্ঠা-১৭

কোরআন 5

মনস্তাত্ত্বিকভাবে, কোনো একটি বিষয়কে ‘পরম সত্য’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে তার বিবর্তনের চিহ্নগুলো মুছে ফেলা জরুরি হয়ে পড়ে। যদি উসমানের সংকলিত কোরআন এবং আবু বকরের আদি কোরআন হুবহু একই হতো, তবে আদি পাণ্ডুলিপিটি সংরক্ষণ করাই ছিল অধিকতর যৌক্তিক। কিন্তু সেটিকে ধ্বংস করা এবং পরবর্তীতে মদীনার গভর্নর মারওয়ান কর্তৃক হযরত হাফসার কাছে গচ্ছিত সেই মূল কপিটি সুপরিকল্পিতভাবে নষ্ট করে ফেলা এটাই ইঙ্গিত দেয় যে, পাণ্ডুলিপিগুলোর মধ্যে এমন কিছু মৌলিক পার্থক্য ছিল যা কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের গৃহীত ভাষ্যের সাথে সাংঘর্ষিক ছিল [5]। তথ্যের এই পদ্ধতিগত বিনাশ মূলত একটি ঐতিহাসিক ‘ফিল্টারিং’ প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে পাঠভেদের (Textual variants) সমস্ত প্রমাণ ধামাচাপা দিয়ে একটি রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক সংস্করণকে চূড়ান্ত রূপ দেওয়া হয়েছে।


পদ্ধতিগত তথ্য বিনাশ: প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের বিপরীতে আদর্শিক শুদ্ধিকরণ

ইতিহাসের যেকোনো জরুরি নথিপত্র সংরক্ষণের বৈশ্বিক ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি হলো সেগুলোকে আর্কাইভ বা জাদুঘরে সংরক্ষণ করা। পুরোনো পাণ্ডুলিপি বা দলিল গবেষক এবং পণ্ডিতদের জন্য অমূল্য প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হয়, যা একটি বিষয়ের বিবর্তন ও সত্যতা যাচাইয়ে অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে। কিন্তু ইসলামের ইতিহাসে খলিফা উসমান কর্তৃক গৃহীত পদক্ষেপটি ছিল এই বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির সম্পূর্ণ বিপরীত। তিনি কেবল একটি নতুন সংস্করণই তৈরি করেননি, বরং তৎকালীন সময়ে প্রচলিত অন্য সকল পাণ্ডুলিপি পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ দিয়েছিলেন—যা ইতিহাসের একটি বিশাল অংশকে চিরতরে মুছে ফেলার নামান্তর [6] [7]

সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫৩/ ফাজায়ীলুল কুরআন
পরিচ্ছেদঃ কুরআন সংকলন
ইসলামিক ফাউন্ডেশন নাম্বারঃ ৪৬২৬, আন্তর্জাতিক নাম্বারঃ ৪৯৮৭ – ৪৯৮৮
৪৬২৬। মূসা (রহঃ) … আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, হুযায়ফা ইবনুল ইয়ামান (রাঃ) একবার উসমান (রাঃ) এর কাছে এলেন। এ সময় তিনি আরমিনিয়া ও আযারবাইজান বিজয়ের ব্যাপারে সিরীয় ও ইরাকী যোদ্ধাদের জন্য রণ-প্রস্তুতির কাজে ব্যস্ত ছিলেন। কুরআন পাঠে তাঁদের মতবিরোধ হুযায়ফাকে ভীষণ চিন্তিত করল। সুতরাং তিনি উসমান (রাঃ) কে বললেন, হে আমীরুল মু’মিনীন! কিতাব সম্পর্কে ইহুদী ও নাসারাদের মত মত পার্থক্যে লিপ্ত হবার পূর্বে এই উম্মতকে রক্ষা করুন। তারপর উসামান (রাঃ) হাফসা (রাঃ) এর কাছে জনৈক ব্যাক্তিকে এ বলে পাঠালেন যে, আপনার কাছে সংরক্ষিত কুরআনের সহীফাসমূহ আমাদের কাছে পাঠিয়ে দিন, যাতে আমরা সেগুলোকে পরিপূর্ণ মাসহাফসমূহে লিপিবদ্ধ করতে পারি। এরপর আমরা তা আপনার কাছে ফিরিয়ে দেব।
হাফসা (রাঃ) তখন সেগুলো উসমান (রাঃ) এর কাছে পাঠিয়ে দিলেন। এরপর উসমান (রাঃ) যায়দ ইবনু সাবিত (রাঃ), আবদুল্লাহ ইবনু যুবায়র (রাঃ), সাঈদ ইবনু আস (রাঃ) এবং আবদুর রহমান ইবনু হারিস ইবনু হিশাম (রাঃ) কে নির্দেশ দিলেন। তাঁরা মাসহাফে তা লিপিবদ্ধ করলেন। এ সময় উসমান (রাঃ) তিনজন কুরাইশী ব্যাক্তিকে বললেন, কুরআনের কোন বিষয়ে যদি যায়দ ইবনু সাবিতের সঙ্গে তোমাদের মতপার্থক্য দেখা দেয়, তাহলে তোমরা তা কুরাইশদের ভাষায় লিপিবদ্ধ করবে। কারণ, কুরআন তাদের ভাষায় অবতীর্ণ হয়েছে। সুতরাং তাঁরা তাই করলেন। যখন মূল লিপিগুলো থেকে কয়েকটি পরিপূর্ণ গ্রন্থ লিপিবদ্ধ হয়ে গেল, তখন উসমান (রাঃ) মূল লিপিগুলো হাফসা (রাঃ) এর কাছে ফিরিয়ে দিলেন। তারপর তিনি কুরআনের লিখিত মাসহাফ সমূহের এক একখানা মাসহাফ এক এক প্রদেশে পাঠিয়ে দিলেন এবং এতদভিন্ন আলাদা আলাদা বা একত্রে সন্নিবেশিত কুরআনের যে কপিসমূহ রয়েছে তা জ্বালিয়ে দেয়ার নির্দেশ দিলেন।
ইবনু শিহাব (রহঃ) খারিজা ইবনু যায়দ ইবনু সাবিতের মাধ্যমে যায়দ ইবনু সাবিত থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন, আমরা যখন গ্রন্থকারে কুরআন লিপিবদ্ধ করছিলাম তখন সূরা আহযাবের একটি আয়াত আমার থেকে হারিয়ে যায়; অথচ আমি তা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে পাঠ করতে শুনেছি। তাই আমরা অনুসন্ধান করতে লাগলাম। অবশেষে আমরা তা খুযায়মা ইবনু সাবিত আনসারী (রাঃ) এর কাছে পেলাম। আয়াতটি হচ্ছে এইঃ “মু’মিনদের মধ্যে কতক আল্লাহর সঙ্গে তাদের কৃত অঙ্গীকার পূর্ণ করেছে, তাদের কেউ কেউ শাহাদত বরণ করেছে এবং কেউ কেউ প্রতীক্ষায় রয়েছে। তাঁরা তাদের অঙ্গীকারে কোন পরিবর্তন করেনি”। (৩৩: ২৩)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)

কোরআন 7

যৌক্তিক প্রেক্ষাপট থেকে বিচার করলে দেখা যায়, এই গণ-দহন প্রক্রিয়াটি ছিল এক ধরণের ‘টেক্সচুয়াল ক্লিনজিং’ বা পাঠগত শুদ্ধিকরণ। যদি বিভিন্ন অঞ্চলে প্রচলিত পাণ্ডুলিপিগুলোর সাথে উসমানের তৈরি সংস্করণের কোনো মৌলিক পার্থক্য না-ই থাকত, তবে সেগুলো ধ্বংস করার কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ থাকতে পারে না। সহিহ বুখারীর বর্ণনা অনুযায়ী, আরমিনিয়া ও আযারবাইজান যুদ্ধে অংশ নেওয়া যোদ্ধাদের মধ্যে কোরআনের পাঠ নিয়ে যে তীব্র মতবিরোধ দেখা দিয়েছিল, তা কর্তৃপক্ষকে আতঙ্কিত করে তুলেছিল। এই মতভেদ নিরসনের জন্য উসমান আলোচনার চেয়ে ‘ইনফরমেশন সাপ্রেশন’ বা তথ্য দমনের পথটিই বেছে নেন।

আধুনিক ইতিহাসবেত্তাদের মতে, যখন ভিন্ন ভিন্ন পাঠ বা সংস্করণকে পুড়িয়ে ফেলা হয়, তখন সেই গ্রন্থের আদি রূপ এবং তার বিবর্তনের গতিপ্রকৃতি বোঝার সব পথ বন্ধ হয়ে যায়। উসমানের এই নির্দেশ কেবল ‘সাত হরফ’ বা আঞ্চলিক পাঠভেদের বৈচিত্র্যকেই ধ্বংস করেনি, বরং কোরআনের টেক্সট যে একসময় বহুবিধ ও পরিবর্তনশীল ছিল, সেই সত্যটিকেও আড়াল করে দিয়েছে। এটি মূলত একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছিল, যার উদ্দেশ্য ছিল ধর্মীয় একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রাখা এবং ভবিষ্যতের যেকোনো টেক্সচুয়াল ক্রিটিসিজম বা পাঠ-সমালোচনার সম্ভাবনাকে সমূলে বিনাশ করা। তথ্যের এই পদ্ধতিগত ধ্বংস প্রমাণ করে যে, তৎকালীন নেতৃত্ব একটি অখণ্ড ও প্রশ্নাতীত বয়ান তৈরির জন্য ঐতিহাসিক সততাকে বিসর্জন দিতে দ্বিধা করেনি।


অসংগতি ও হারিয়ে যাওয়া বয়ানঃ প্রামাণিকতার সংকট

কোরআন সংকলন প্রক্রিয়ার অন্যতম বড় যৌক্তিক সংকট হলো এর ‘সংরক্ষণ’ পদ্ধতির অসংগতি। প্রথাগত দাবি অনুযায়ী, কোরআন যদি হাজার হাজার হাফেজের স্মৃতিতে অবিকৃতভাবে রক্ষিত থাকতো, তবে লিখিত সংকলনের সময় কোনো আয়াতের জন্য একক কোনো ব্যক্তির ওপর নির্ভর করার প্রয়োজন হতো না। কিন্তু ঐতিহাসিক দলিলসমূহ এই দাবির বিপরীত চিত্র তুলে ধরে। খোদ সংকলন কমিটির প্রধান যায়দ ইবনে সাবিত স্বীকার করেছেন যে, গ্রন্থাকারে কোরআন লিপিবদ্ধ করার সময় সূরা আহযাবের একটি আয়াত (৩৩:২৩) খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না, যা তিনি নবীকে পাঠ করতে শুনেছিলেন। দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর কেবল খুযায়মা ইব্‌ন সাবিত আনসারীর কাছে সেই আয়াতের লিখিত লিপি পাওয়া যায় [6]

যৌক্তিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই ঘটনাটি একটি গভীর উদ্বেগের জন্ম দেয়। যদি একটি আয়াত কেবল একজনের কাছে পাওয়া যায়, তবে এমন হওয়া কি অসম্ভব যে আরও অনেক আয়াত বা সূরা একইভাবে হারিয়ে গেছে যা কারোর কাছেই সংরক্ষিত ছিল না? এই ‘হারিয়ে যাওয়া এবং খুঁজে পাওয়া’র প্রক্রিয়াটি প্রমাণ করে যে, সংকলনটি কোনো ঐশ্বরিক বা স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়ায় হয়নি; বরং এটি ছিল অত্যন্ত মানবিক ও ত্রুটিপূর্ণ একটি সংগ্রহ কাজ। এর মাধ্যমে ‘পারফেক্ট প্রিজারভেশন’ বা ত্রুটিহীন সংরক্ষণের মিথটি ভেঙে পড়ে। যখন একটি কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ অন্য সব পাঠ পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ দেয়, তখন তারা মূলত এই ধরণের অসংগতিগুলোকেই ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে। তথ্যের এই একক উৎস-নির্ভরতা এবং ভিন্নমতের পাণ্ডুলিপি ধ্বংস করা প্রমাণ করে যে, বর্তমান কোরআনিক পাঠটি একটি ঐতিহাসিক বিবর্তনের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে, যেখানে তথ্যের শুদ্ধিকরণ (Sanitization) এবং রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ছিল প্রধান প্রভাবক।


উপসংহারঃ তথ্যের দহন ও ইতিহাসের বিনির্মাণ

পরিশেষে বলা যায়, আদি কোরআনের পাণ্ডুলিপি ও অন্যান্য আঞ্চলিক সংস্করণ পুড়িয়ে ফেলার ঘটনাটি ইতিহাসের পাতায় এক বিশাল শূন্যতার সৃষ্টি করেছে। মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, কোনো একটি গ্রন্থকে ‘নিখুঁত’ বা ‘ঐশ্বরিক’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার প্রধান শর্তই হলো তার বিবর্তনের সমস্ত প্রমাণ মুছে ফেলা। যখন কোনো সংকলনের আদি রূপ বা ভিন্নতর পাঠগুলোকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করা হয়, তখন সেই গ্রন্থের বিবর্তনের রেখাচিত্রটিও বিলুপ্ত হয়ে যায়। এটি মূলত পরবর্তী প্রজন্মের অনুসারীদের মধ্যে একটি ‘মনোলিথিক’ বা একশিলা বিশ্বাসের ভিত তৈরি করার একটি কৌশল, যেখানে কোনো ভিন্নমতের বা ভিন্ন পাঠের অস্তিত্ব রাখার সুযোগ দেওয়া হয় না।

ঐতিহাসিক ও বৈজ্ঞানিক মানদণ্ডে, তথ্যের এই পদ্ধতিগত বিনাশ মূলত একটি আদর্শিক শুদ্ধিকরণ বা ‘টেক্সচুয়াল সেন্সরশিপ’। কোনো নথিপত্র যদি সত্যিই অপরিবর্তনীয় এবং অনন্য হতো, তবে সেগুলো সংরক্ষণের মাধ্যমেই সেই সত্যতা অধিকতর জোরালোভাবে প্রমাণ করা সম্ভব ছিল। কিন্তু সংরক্ষণের পরিবর্তে দহনের পথ বেছে নেওয়া এটাই ইঙ্গিত দেয় যে, তৎকালীন রাজনৈতিক ও ধর্মতাত্ত্বিক নেতৃত্ব তথ্যের বহুত্ববাদকে তাদের একচ্ছত্র আধিপত্যের জন্য হুমকি মনে করেছিল। সত্যের অনুসন্ধানে বৈচিত্র্য এবং প্রামাণিক দলিল অপরিহার্য; কিন্তু যখন আগুনের মাধ্যমে সেই দলিলগুলোকে নিচিহ্ন করা হয়, তখন সেখানে কেবল অন্ধ আনুগত্যই অবশিষ্ট থাকে, ঐতিহাসিক স্বচ্ছতা নয়। আধুনিক মুক্তবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের কাছে তাই এই দহন প্রক্রিয়াটি পবিত্রতা রক্ষার চেয়ে বরং ইতিহাসের তথ্য গোপনের এক চরম দৃষ্টান্ত হিসেবেই প্রতিভাত হয়।

About This Article

Genre: Semi-Academic Skeptical Analysis

Epistemic Position: Scientific Skepticism

This article belongs to the skeptical-rationalist analytical tradition of Shongshoy.com.

It applies historical criticism, empirical reasoning, logical analysis, and scientific skepticism in evaluating religious, philosophical, and historical claims.

The objective is not theological neutrality, but evidence-based critical examination and adversarial analysis of ideas and narratives.

This article should primarily be evaluated through: source quality, evidentiary strength, logical rigor, and factual consistency.


তথ্যসূত্রঃ
  1. তারিখুল কোরআনিল কারিম, তাহের আল কুরদি, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৮ ↩︎
  2. উলুমুল কোরআন, তাকী উসমানি, পৃষ্ঠা ১৮৬-১৮৭ 1 2
  3. তারীখে ইসলাম, সাইয়েদ মুহাম্মদ আমীমুল ইসলাম, আধুনিক প্রকাশনী, পৃষ্ঠা ২৮ ↩︎
  4. তারীখে ইসলাম, সাইয়েদ মুহাম্মদ আমীমুল ইসলাম, আধুনিক প্রকাশনী, পৃষ্ঠা ২৮ ↩︎
  5. ফাতহুল বারী, ৯ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৭ ↩︎
  6. সহিহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৪৬২৬ 1 2
  7. সহিহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, খণ্ড ৮, পৃষ্ঠা ৩৩৮ ↩︎