যীশুর মৃত্যু, ঐশ্বরিক প্রতারণা এবং খ্রিস্টধর্মের উত্থানে আল্লাহর দায়

Table of Contents

ভূমিকাঃ যীশুর মৃত্যু ও পুনরুত্থান

ইসলামি ধর্মতত্ত্বে হযরত ঈসা বা যিশুর ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার বিষয়টি কেবল একটি ঐতিহাসিক বিতর্ক নয়, বরং এটি একটি গভীর দার্শনিক ও যৌক্তিক সংকটেরও জন্ম দেয়। কোরআন স্পষ্টভাবে দাবি করে যে, ইহুদিরা যিশুকে হত্যা বা ক্রুশবিদ্ধ করতে সক্ষম হয়নি, বরং যীশুকে আল্লাহ তুলে নিয়ে গিয়েছিলেন এবং সেই সেই সময়ের মানুষদের কাছে বিষয়টি আল্লাহর পক্ষ থেকেই ‘সাদৃশ্যপূর্ণ’ বা ‘বিভ্রান্তিকর’ (shubbiha lahum) করা হয়েছিল। কোরআনের ভাষ্য অনুযায়ী ‘সাদৃশ্যপূর্ণ’ করা একটি প্রত্যক্ষ ঐশ্বরিক হস্তক্ষেপ হিসেবেই প্রতীয়মান হয়, তাহলে ইতিহাসের গতিপথ পরিবর্তনের দায় সরাসরি আল্লাহর ওপর বর্তায়। ঐতিহাসিক ও সমাজতাত্ত্বিক বিচারে, খ্রিস্টধর্মের মূল ভিত্তিই হলো যিশুর মৃত্যু এবং পুনরুত্থানের সাক্ষ্য। সারা পৃথিবীর কোটি কোটি খ্রিস্টান যা বিশ্বাস করে, তাদের বিশ্বাসের মৌলিক ভিত্তিই হচ্ছে যীশুর মৃত্যু ও পুনরুত্থানের কাহিনী। যদি এই মৃত্যুর দৃশ্যটি আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি পরিকল্পিত বিভ্রম বা দৃশ্যত সত্য (Apparent truth) হয়ে থাকে, তবে পরবর্তী দুই সহস্রাব্দ ধরে কোটি কোটি মানুষের একটি তথাকথিত “ভুল” পথে পরিচালিত হওয়ার ক্ষেত্রে ঐশ্বরিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে। এই প্রবন্ধে আমরা পরীক্ষা করব, কীভাবে একটি ঐশ্বরিক অতিপ্রাকৃত হস্তক্ষেপের মাধ্যমে একটি বৈশ্বিক ধর্মের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হলো এবং এই প্রক্রিয়ায় কর্তার (Agent) নৈতিক ও যৌক্তিক দায়ভার কতটুকু।


ধর্মতাত্ত্বিক কাঠামোর বৈপরীত্য ও সাদৃশ্য

খ্রিস্টধর্ম এবং ইসলাম—উভয় ধর্মই যিশু বা হযরত ঈসা-কে ইতিহাসের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হিসেবে স্বীকার করলেও, তাঁর জীবনের শেষ পরিণতির বিষয়ে উভয় পক্ষের দাবি সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী এবং আপোসহীন। খ্রিস্টধর্মের কেন্দ্রীয় বিশ্বাস আবর্তিত হয় যিশুর ক্রুশবিদ্ধ হওয়া, মৃত্যু এবং তিনদিন পর পুনরুত্থানের ঘটনাকে কেন্দ্র করে; যা মানবজাতির আদি পাপ থেকে মুক্তির একমাত্র পথ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত [1]

আল্লাহ

নিউ টেস্টামেন্টের বর্ণনা অনুযায়ী, শত শত প্রত্যক্ষদর্শী যিশুর ক্রুশবিদ্ধ হওয়া এবং তাঁর মৃতদেহ সমাধিস্ত করার সাক্ষী ছিল, যা খ্রিস্টীয় বিশ্বাস অনুসারে একটি অনস্বীকার্য ঐতিহাসিক সত্য [2]

আল্লাহ 1

অন্যদিকে, ইসলামি ধর্মতত্ত্ব কার্যত এই ঘটনাটিকে একটি ‘ঐশ্বরিকভাবে নির্মিত বিভ্রম’ হিসেবে উপস্থাপন করে। কোরআনের ভাষ্য অনুযায়ী, ইহুদিরা যিশুকে হত্যা করতে পারেনি এবং ক্রুশবিদ্ধও করতে পারেনি, বরং তাদের কাছে বিষয়টি কেবল ‘সদৃশ’ মনে হয়েছিল [3]

আর ‘আমরা আল্লাহর রসূল মাসীহ ঈসা ইবনু মারইয়ামকে হত্যা করেছি’ তাদের এ উক্তির জন্য। কিন্তু তারা না তাকে হত্যা করেছে, না তাকে ক্রুশবিদ্ধ করেছে, কেবলমাত্র তাদের জন্য (এক লোককে) তার সদৃশ করা হয়েছিল, আর যারা এ বিষয়ে মতভেদ করেছিল তারাও এ সম্পর্কে সন্দেহে পতিত হয়েছিল। শুধু অমূলক ধারণার অনুসরণ ছাড়া এ ব্যাপারে তাদের কোন জ্ঞানই ছিল না। এটা নিশ্চিত সত্য যে, তারা তাকে হত্যা করেনি।
— Taisirul Quran
এবং ‘‘আল্লাহর রাসূল ও মারইয়াম নন্দন ঈসাকে আমরা হত্যা করেছি’’ বলার জন্য। অথচ তারা না তাকে হত্যা করেছে আর না শুলে চড়িয়েছে; বরং তারা ধাঁধাঁয় পতিত হয়েছিল। তারা তদ্বিষয়ে সন্দেহাচ্ছন্ন ছিল, কল্পনার অনুসরণ ব্যতীত এ বিষয়ে তাদের কোন জ্ঞান ছিলনা। প্রকৃত পক্ষে তারা তাকে হত্যা করেনি।
— Sheikh Mujibur Rahman
এবং তাদের এ কথার কারণে যে, ‘আমরা আল্লাহর রাসূল মারইয়াম পুত্র ঈসা মাসীহকে হত্যা করেছি’। অথচ তারা তাকে হত্যা করেনি এবং তাকে শূলেও চড়ায়নি। বরং তাদেরকে ধাঁধায় ফেলা হয়েছিল। আর নিশ্চয় যারা তাতে মতবিরোধ করেছিল, অবশ্যই তারা তার ব্যাপারে সন্দেহের মধ্যে ছিল। ধারণার অনুসরণ ছাড়া এ ব্যাপারে তাদের কোন জ্ঞান নেই। আর এটা নিশ্চিত যে, তারা তাকে হত্যা করেনি।
— Rawai Al-bayan
আর ‘আমরা আল্লাহর রাসূল মারঈয়াম তনয় ‘ঈসা মসীহকে হত্যা করেছি’ তাদের এ উক্তির জন্য। অথচ তারা তাকে হত্যা করেনি এবং ক্রুশবিদ্ধও করেনি; বরং তাদের জন্য (এক লোককে) তার সদৃশ করা হয়েছিল [১]। আর নিশ্চয় যারা তার সম্বন্ধে মতভেদ করেছিল, তারা অবশ্যই এ সম্বন্ধে সংশয়যুক্ত ছিল; এ সম্পর্কে অনুমানের অনুসরণ ছাড়া তাদের কোনো জ্ঞানই ছিল না। আর এটা নিশ্চিত যে, তারা তাঁকে হত্যা করেনি,
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

প্রখ্যাত তাফসীর গ্রন্থ তাফসীরে ইবনে কাসীরে এই সম্পর্কে যা বলা আছে তা হচ্ছে, [4]

অভিশপ্ত ইয়াহুদী জাতির চরিত্র
আল্লাহ তা’আলা বিভিন্ন অলৌকিক নিদর্শন সহকারে বনী ইসরাঈলের হিদায়াতের জন্যে হযরত ঈসা (আ)-কে নবী বানাইয়া পাঠাইলেন। তিনি আল্লাহর নির্দেশে জন্মান্ধ ব্যক্তিকে দৃষ্টিদান করিতেন, আল্লাহর নির্দেশে কুষ্ঠ রোগীকে নিরাময় করিতেন এবং আল্লাহর নির্দেশে মৃত ব্যক্তিকে জীবিত করিতেন। তিনি কাদামাটি দ্বারা পাখি বানাইয়া উহাতে ফুঁ দিতেন। উহাতে
আল্লাহর নির্দেশে প্রাণ সঞ্চার হইত এবং উহা আকাশে উড়িত। মানুষ উহার উড্ডয়ন প্রত্যক্ষ করিত। এইরূপ অন্যান্য মু’জিযা আল্লাহ তা’আলা হযরত ঈসা (আ)-এর মাধ্যমে বনী ইসরাঈলকে প্রদর্শন করিতেন। তাহারা এতদ্দর্শনে হযরত ঈসা (আ)-এর প্রতি ঈমান আনিবার পরিবর্তে তাঁহার নবুয়াত ও অলৌকিক শক্তিতে তাঁহার প্রতি বিদ্বিষ্ট হইয়া তাঁহাকে নানাভাবে
উৎপীড়ন করিতে লাগিল। তাহারা আল্লাহর নবীকে কোথাও স্থির হইয়া টিকিতে দিল না।
তাহাদের উৎপীড়নে অতিষ্ঠ হইয়া তিনি স্বীয় মাতা হযরত মরিয়ম (আ)-কে সঙ্গে লইয়া এক জনপদ হইতে আরেক জনপদে ঘুরিয়া বেড়াইতে বাধ্য হইলেন। ইহাতেও পাষণ্ড কাফির বনী ইসরাঈলের মনের তৃপ্তি হইত না। মনের ঝাল মিটাইবার জন্যে তাহারা সিরিয়ার তৎকালীন সম্রাটের দ্বারস্থ হইল। সম্রাট ছিল নক্ষত্রপূজক একজন মুশরিক। তাহার স্বজাতীয়গণ ‘আল-ইউনান’ নামে পরিচিত ছিল। তাহারা সম্রাটকে বলিল, একটা লোক বায়তুল মুকাদ্দাস এলাকায় মানুষকে বিপথগামী করিতেছে এবং সম্রাটের বিরুদ্ধে তাহার প্রজাবৃন্দকে ক্ষেপাইয়া তুলিতেছে। সম্রাট ইহা শুনিয়া রাগান্বিত হইল। সে বায়তুল মুকাদ্দাস এলাকার প্রতিনিধিকে লিখিত নির্দেশ দিল, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিষয়টি যেন সে গুরুত্ব সহকারে গ্রহণ করে। তাহাকে যেন শূলীবিদ্ধ করে ও তাহার মস্তকে যেন কন্টক মুকুট পরাইয়া দেয়। এইভাবে তাহাকে হত্যা করিয়া
জনগণকে যেন সে তাহার অনিষ্ট হইতে রক্ষা করে।
রাজ প্রতিনিধির নিকট সম্রাটের নির্দেশ পৌঁছিবার পর সে উহা পালন করিবার নিমিত্ত একদল লোকসহ হযরত ঈসা (আ)-এর নিকট গমন করিল। তিনি তখন একদল সহচর সহ একটি ঘরে অবস্থান করিতেছিলেন। তথায় তাঁহার সহচরের সংখ্যা তখন বার, তের অথবা সতের ছিল। সেদিন ছিল শুক্রবার। সময় অপরাহ্ন আসরের পর। সম্মুখে শনিবারের রাত্রি।
তাহারা তখন সেখানে হযরত ঈসা (আ)-কে ঘিরিয়া ফেলিল। তিনি দেখিলেন, হয় তাহারা ঘরে প্রবেশ করিয়া তাঁহাকে গ্রেফতার করিবে, না হয় তাঁহাকে তাহাদের নিকট গিয়া আত্মসমর্পণ করিতে হইবে। তাই তিনি স্বীয় সহচরবৃন্দকে বলিলেন, তোমাদের মধ্য হইতে কে আমার আকৃতি গ্রহণ করিতে প্রস্তুত রহিয়াছে? যে ব্যক্তি ইহাতে প্রস্তুত থাকিবে, সে জান্নাতে আমার সঙ্গী ও বন্ধু হইবে। তাহাদের মধ্য হইতে একটি যুবক এজন্যে নিজেকে পেশ করিল। হযরত ঈসা (আ) তাহাকে ইহার অনুপযুক্ত মনে করিয়া স্বীয় আহবানের পুনরুক্তি করিলেন। এইরূপে তিনি তিনবার শিষ্যদের প্রতি একই আহবান জানাইলেন। প্রতিবার একই যুবক তাঁহার আহবানে সাড়া দিল। অন্য কাহাকেও উহাতে সাড়া দিতে দেখা গেল না। তখন তিনি তাহাকে বলিলেন, ‘তুমিই সেই সৌভাগ্যবান ব্যক্তি।’ অতঃপর আল্লাহ তা’আলা সেই যুবককে হযরত ঈসা (আ)-এর আকৃতি বিশিষ্ট করিয়া দিলেন। সে যেন স্বয়ং হযরত ঈসা (আ) হইয়া গেল। ইত্যবসরে ঘরের ছাদে একটা ছিদ্র দেখা দিল। হযরত ঈসা (আ) তন্দ্রাচ্ছন্ন হইয়া পড়িলেন এবং তদবস্থায় আকাশে উত্তোলিত হইলেন। যেমন আল্লাহ তা’আলা বলিয়াছেন:
إِذْ قَالَ اللَّهُ يَعِيسَى إِنِّي مُتَوَفَّيْكَ وَرَافِعُكَ إِلَى وَمُطَهِّرُكَ مِنَ الَّذِينَ كَفَرُوا وَجَاعِلُ الَّذِينَ اتَّبَعُوكَ فَوْقَ الَّذِينَ كَفَرُوا إِلَى يَوْمِ الْقِيِّمَةِ ثُمَّ إِلَى مَرْجِعُكُمْ فَاحْكُمُ بَيْنَكُمْ فِيْمَا كُنْتُمْ فِيهِ تَخْتَلِفُونَ
হযরত ঈসা (আ) আকাশে উত্তোলিত হইবার পর তাঁহার সহচরবৃন্দ ঘর হইতে বাহির হইলেন। অবরোধকারী ইয়াহুদীগণ উপরোক্ত যুবককে দেখিয়া মনে করিল, এইই ঈসা ইন্ন মরিয়ম। তাহারা’ রাত্রিতে তাহাকে ধরিয়া লইয়া গিয়া শূলীবিদ্ধ করিল এবং তাহার মস্তকে কন্টক মুকুট পরাইল। ইয়াহুদীগণ সগর্বে লোকদিগকে বলিল, তাহারা পরিশ্রম করিয়া ঈসা ইন্ন মরিয়মকে শূলীবিদ্ধ করিয়াছে। প্রকৃত ঘটনা সম্বন্ধে অজ্ঞতার কারণে একদল খ্রিস্টান তাহাদের দাবিকে সত্য বলিয়া মানিয়া লইল। অবশ্য যাহারা হযরত ঈসা (আ)-এর ঊর্ধ্বগমন প্রত্যক্ষ করিয়াছিলেন, তাহারা ইয়াহুদীদের উক্ত দাবি সত্য বলিয়া স্বীকার করেন নাই। ইয়াহুদীদের দাবিতে বিশ্বাস স্থাপনকারী অজ্ঞ খ্রিস্টানগণ ইহাও রচনা করিয়া লইল যে, ঈসা ইবন মরিয়মের শূলীবিদ্ধ অবস্থায় তাঁহার মাতা বিবি মরিয়ম শূলীর নীচে বসিয়া কাঁদিয়াছিলেন। এমন কি কেহ কেহ এই কথাও বানাইয়াছে যে, শূলীবিদ্ধ অবস্থায় হযরত ঈসা (আ) তাঁহার মাতার সহিত কথাও বলিয়াছেন। আল্লাহই সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞাতা।
উপরোক্ত ঘটনা ছিল আল্লাহর তরফ হইতে মানুষের প্রতি আগত পরীক্ষা। উহাতে আল্লাহর সূক্ষ্ম হিকমত ও রহস্য নিহিত ছিল। আল্লাহ তা’আলা স্পষ্ট নিদর্শনাবলী দ্বারা সমর্থিত তাঁহার রাসূলের প্রতি অবতীর্ণ পবিত্র কালামে প্রকৃত অবস্থা স্পষ্ট করিয়া বর্ণনা করিয়াছেন। তিনি শ্রেষ্ঠতম সত্যবাদী, বিশ্বজগতের সকল রহস্য সম্বন্ধে অবগত এবং ভূত-বর্তমান-ভবিষ্যত সবই তাঁহার অসীম জ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত। এমনকি যে ঘটনা অতীতে ঘটে নাই, তাহা ঘটিলে কিরূপে ঘটিত, উহাও সীমাহীন জ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত রহিয়াছে। আল্লাহ তা’আলা হযরত ঈসা (আ) সম্বন্ধে ইয়াহুদীদের আরোপিত মিথ্যার জাল ছিন্ন করিয়া বলিতেছেন:
وَمَا قَتَلُوهُ وَمَا صَلَبُوهُ وَلَكِنْ شُبِّهَ لَهُمْ –
অর্থাৎ ‘তাহারা তাহাকে হত্যাও করে নাই আর শূলীবিদ্ধও করে নাই; বরং তাহারা সমআকৃতিবিশিষ্ট একটা লোককে দেখিয়া তাহাকেই ঈসা মনে করিয়াছিল।’

আল্লাহ 3
আল্লাহ 5

এবারে আসুন তাফসীরে মাযহারী থেকে দেখি, [5]

মসীহকে হত্যা করেছি।’ এতে করে বুঝা যায়, তারা তাঁকে রসুল বলতো ঠাট্টা-বিদ্রুপ করে। এ রকমও হতে পারে যে, তারা হজরত ঈসাকে আল্লাহ্ রসুল না বলে অন্য কোনো মন্দ শব্দের মাধ্যমে সম্বোধন করতো। কিন্তু আল্লাহ্পাক এখানে তাদের উক্তিটি উদ্ধৃতি করলেও তাদের মন্দ সম্বোধনের পরিবর্তে হজরত ঈসাকে আল্লাহ্র রসুল বলে সম্মানিত করেছেন। এ রকম অর্থ করলে বুঝতে হবে, আল্লাহর রসূলের প্রতি মন্দ সম্বোধন একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এই অপরাধের কারণেই ইহুদীরা অভিশাপগ্রস্ত হয়েছে। অভিশপ্ত ওই ইহুদীদের ধৃষ্টতামূলক উক্তিটি উল্লেখ করার পরক্ষণেই আল্লাহ্পাক জানাচ্ছেন ‘তারা তাঁকে হত্যা করেনি এবং ক্রশবিদ্ধও করেনি; কিন্তু তাদের এ রকম মনে হয়েছিলো।’ এক বর্ণনায় রয়েছে, প্রকৃত ঘটনা ছিলো এ রকম- একদল ইহুদী হজরত ঈসা এবং তাঁর পুত-পবিত্রা জননীকে গালি দিলো। তিনি তখন তাদের জন্য বদদোয়া করলেন। তাঁর বদদোয়ার কারণে আল্লাহ্পাক গালিদাতাদেরকে বানর ও শুকরে পরিণত করে দিলেন। এই ঘটনা দেখে ক্ষিপ্ত হয়ে গেলো ইহুদী সম্প্রদায়। তারা নিজেদের মধ্যে পরামর্শক্রমে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হলো যে, হজরত ঈসাকে হত্যা করতে হবে। আল্লাহ্পাক তখন হজরত ঈসাকে জানালেন, তোমাকে আকাশে উঠিয়ে নেয়া হবে। সুরা আলে ইমরানের তাফসীরে বিষয়টির বিস্তারিত বিবরণ দেয়া হয়েছে।
কতিপয় বর্ণনায় এসেছে-হজরত ঈসা তাঁর সহচরবৃন্দকে বললেন, তোমাদের মধ্যে কেউ কি আমার আকৃতি বিশিষ্ট হতে চাও, যাকে ইহুদীরা শূলে চড়াবে এবং সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। একজন দাঁড়িয়ে বললেন, আমি চাই। আল্লাহ্পাক তখন তাঁর আকতি হজরত ঈসার মতো করে দিলেন। ওই ব্যক্তিকেই ইহুদীরা শূলে চড়িয়ে হত্যা করলো। হজরত ইবনে আব্বাস থেকে নাসাঈ এ রকম বর্ণনা করছেন। বাগবী বলেছেন, আল্লাহ্পাক ওই ব্যক্তিকে হজরত ঈসার আকৃতি বিশিষ্ট করে দিলেন। আর ইহুদীরা তাকেই হজরত ঈসা মনে করে ক্রশবিদ্ধ করলো।
আমরা সুরা আলে ইমরানের তাফসীরে কালাবী কর্তৃক বর্ণিত হজরত ইবনে আব্বাসের উক্তি হিসেবে বর্ণনা করেছি যে-ইহুদীদের নেতা ইয়াহুদা হজরত ঈসাকে হত্যার জন্য এক ব্যক্তিকে নিযুক্ত করলো। তার নাম ছিলো তাতিয়ানুস। সে হত্যার উদ্দেশ্যে যখন হজরত ঈসার গৃহে প্রবেশ করলো তৎক্ষণাৎ হজরত ঈসাকে উঠিয়ে নেয়া হলো আকাশে। আর তাতিয়ানুসের চেহারা হয়ে গেলো অবিকল হজরত ঈসার মতো। সে ঘর থেকে বের হয়ে এলে অপেক্ষমান ইহুদী জনতা তাকেই হজরত ঈসা মনে করে বন্দী করলো এবং শূলে চড়ালো। কেউ কেউ বলেছেন, ইহুদীরা হজরত ঈসাকে একটি ঘরে বন্দী করে রেখে দিলো এবং তার জন্য নিযুক্ত করলো এক পাহারাদার। ওই পাহারাদারের চেহারাকে আল্লাহ্ হজরত ঈসার মতো করে দিলেন। ইহুদীরা তাকে হজরত ঈসা ভেবে হত্যা করে ফেললো। আল্লাহপাকই সমধিক জ্ঞাত।
হজরত ঈসার ক্রশবিদ্ধ হওয়া নিয়ে ইহুদীদের মধ্যেই দেখা দিলো চরম মতবিরোধ। কালাবী বলেছেন, ইহুদীরা বললো, আমরা ঈসাকে হত্যা করেছি। খৃষ্টানেরা বললো, তাকে কতল করেছি আমরা। খৃষ্টানদের একটি দল এ কথাও বলে বসলো যে, ইহুদী বা খৃষ্টান কেউ তাঁকে হত্যা করতে পারেনি বরং আল্লাহ্ তাঁকে আকাশে উঠিয়ে নিয়েছেন। আর আকাশে উত্তোলনের ঘটনাটি আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। এ রকমও বর্ণিত হয়েছে যে, আল্লাহ্পাক তাতিয়ানুসের মুখমণ্ডল কেবল হজরত ঈসার মতো করে দিয়েছিলেন। তার শরীরের আকার পরিবর্তন করেননি। ক্রশবিদ্ধ করার পর এই বিষয়টি লক্ষ্য করে সংশয়াচ্ছন্ন হয়ে পড়লো তারা। একদল বললো, ক্রশবিদ্ধ করা হয়েছে হজরত ঈসাকে। আরেকদল বললো, না, ক্রশবিদ্ধ ব্যক্তিটি তাতিয়ানুস-ঈসা নয়। একদল বললো, দেখো! এইতো ঈসার মুখাকৃতি। আরেকদল বললো, কিন্তু শরীরতো তাতিয়ানুসের। সুদ্দী বলেছেন, যদি ক্রশবিদ্ধ ব্যক্তিটি হজরত ঈসা হয়ে থাকেন, তবে আমাদের তাতিয়ানুস কোথায়? আর তাতিয়ানুসকে যদি ক্রশবিদ্ধ করা হয় তবে ঈসা কোথায়?
কোনো কোনো আলেম বলেছেন, আয়াতে বলা হয়েছে, ‘যারা তার সম্বন্ধে মতভেদ করেছিলো’- এখানে ‘তাঁর’ সর্বনামটির উদ্দেশ্য হজরত ঈসা। হজরত ঈসা সম্পর্কে ইহুদীদের মতবিরোধ ছিলো এ রকম- কেউ বলতো ঈসা মিথ্যাচারী, আমরা তাকে হত্যা করে উপযুক্ত কাজ করেছি। আবার কেউ বলতো, আমরা জানিনা, ঈসা মিথ্যাবাদী না সত্যবাদী। এ ব্যাপারেও আমরা নিশ্চিত নই যে, তাকে আমরা প্রকৃতই হত্যা করতে পেরেছি কি না। কেউ কেউ আবার এ রকমও বলতো যে, আমাদের সঙ্গে ঈসার দেখা হযেছে। তিনি বলেছেন, আল্লাহ্ আমাকে আকাশে উঠিয়ে নিয়েছেন। তারা বলে বেড়াতো, হজরত ঈসার আকাশে আরোহণের বিষয়টি সঠিক।
সংশয়যুক্ত ইহুদীরা সর্বজনমান্য কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পাবছিলো না। তাদের প্রতিটি মতামতই ছিলো অনুমান নির্ভর। আল্লাহ্পাক তাই বলেছেন, ‘তাদের কোনো জ্ঞানই ছিলো না।’ এ সম্পর্কে আয়াতে সঠিক সিদ্ধান্তটি দেয়া হয়েছে এভাবে ‘এটা নিশ্চিত যে, তারা তাকে হত্যা করেনি।’ এ কথাটি আল্লাহ্পাকের চূড়ান্ত রায় হতে পারে। আতার এটা ইহুদীদের সর্বশেষ সিদ্ধান্ত হওয়াও সম্ভব। সংশয়াচ্ছন্নতার অন্ধকারে হাবুডুবু খেতে খেতে তারা হয়তো অবশেষে এই সিদ্ধান্তের উপকূলে উপনীত হতে পেরেছিলো যে, হজরত ঈসা নিহত হননি- এ কথাটি নিশ্চিত। ফাররা বলেছেন, ক্রশবিদ্ধ করার কাজটি যারা করেছিলো তারাই বিশ্বাস করতে পারছিলো না যে, ক্রশবিদ্ধ ব্যক্তিটি হজরত ঈসা।
হজরত ঈসাকে যে ইহুদীরা ক্রশবিদ্ধ করে হত্যা করতে পারেনি, সে কথা সুস্পষ্টরূপে উল্লেখ করা হয়েছে পরের আয়াতে (১৫৮)। আল্লাহ্পাকের এই অমোঘ ঘোষণাটির মাধ্যমে এ বিষয়ে আর সন্দেহ বা সংশয়ের অবকাশ মাত্র নেই যে, আল্লাহ্পাক তাঁকে আকাশে উঠিয়ে নিয়েছেন। সুতরাং এই বিশ্বাসের বিরুদ্ধে যারা বলবে তারা মিথ্যুক।

আল্লাহ 7
আল্লাহ 9

এখানে উভয় ধর্মের মধ্যে মৌলিক মিলটি হলো—উভয় পক্ষই একমত যে, প্রথম শতাব্দীতে জেরুজালেমের একটি জনসমক্ষে ক্রুশবিদ্ধকরণের মতো একটি ঘটনা ঘটেছিল। কিন্তু অমিলটি হলো সেই ঘটনার ‘বাস্তবতা’ নিয়ে। খ্রিস্টধর্ম যেখানে ইন্দ্রিয়লব্ধ অভিজ্ঞতা এবং চাক্ষুষ সাক্ষ্যকে (Empirical Evidence) সত্য হিসেবে গ্রহণ করে, ইসলাম সেখানে দাবি করে যে সেই চাক্ষুষ অভিজ্ঞতাটি ছিল ত্রুটিপূর্ণ বা ঐশ্বরিক পরিকল্পনায় পরিবর্তিত। এই বৈপরীত্যটিই মূলত মূল সংকটের জন্ম দেয়ঃ যদি কোরআনের দাবিটি আক্ষরিকভাবে গ্রহণ করা হয়, তবে এর অর্থ দাঁড়ায়—আল্লাহ নিজেই একটি কাল্পনিক দৃশ্যপট নির্মাণ করেছেন যা মানবজাতির ইন্দ্রিয়কে প্রতারিত করে, তবে সেই ‘ভ্রান্তি’ থেকে জন্ম নেওয়া ধর্মের দায়ভার শেষ পর্যন্ত কার ওপর বর্তাবে? সেই ধর্মের অনুসারীরা কোন অপরাধে জাহান্নামে যাবে?


বারোজন শিষ্যঃ চাক্ষুষ সাক্ষ্য বনাম ইসলামি দাবি

খ্রিস্টীয় ধর্মতত্ত্ব এবং ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, যিশুর ঘনিষ্ঠতম বারোজন সহচর বা ‘অ্যাপোসল’ (Apostles) ছিলেন তাঁর জীবনের প্রতিটি ঘটনার প্রধানতম সাক্ষী। এই বারোজন হলেন: পিটার (শিমোন), অ্যান্ড্রু, জেমস (জব্দীয়ের পুত্র), জন, ফিলিপ, বার্থোলোমিউ, থমাস, মথি, জেমস (আলফীয়ের পুত্র), থাদ্দেয়াস, শিমোন (কানাডীয়) এবং জুডাস ইস্কারিওত [6]

আল্লাহ 11

খ্রিস্টধর্মের দাবি অনুযায়ী, যিশুর ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার সময় এবং পরবর্তী পুনরুত্থানের পর এই শিষ্যরা তাঁকে সশরীরে দেখেছিলেন এবং তাঁর ক্ষতচিহ্ন স্পর্শ করেছিলেন [7]। বিশেষ করে ‘সন্দিহান থমাস’ যিশুর ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার ক্ষতগুলো পরীক্ষা করে নিশ্চিত হয়েছিলেন যে, এটি সেই একই ব্যক্তি যাকে ক্রুশে দেওয়া হয়েছিল।

আল্লাহ 13

এখানেই ইসলামি দাবির সাথে খ্রিস্টীয় ইতিহাসের এক অলঙ্ঘনীয় প্রাচীর তৈরি হয়। ইসলামি ‘বিকল্প তত্ত্ব’ বা সাবস্টিটিউশন থিওরি অনুযায়ী, ক্রুশে চড়ানো ব্যক্তিটি যিশু ছিলেন না, বরং তাঁর সদৃশ কেউ ছিলেন। কিন্তু ঐতিহাসিক প্রশ্ন হলো, যিশুর নিকটতম পরিজন—মাতা মেরি এবং ঘনিষ্ঠ শিষ্য জন—যদি সরাসরি উপস্থিত থেকেও প্রতারিত হয়ে থাকেন, তবে এই বিভ্রমটি কেবল সাধারণ দৃশ্যগত বিভ্রম ছিল না; এটি ছিল পরিচয়-স্তরের প্রতিস্থাপন। [8]। যদি আল্লাহ যিশুর চেহারা পরিবর্তন করে থাকেন, তবে তিনি কি তাঁর কণ্ঠস্বর এবং স্মৃতিও পরিবর্তন করেছিলেন? কারণ খ্রিস্টীয় বর্ণনা মতে, ক্রুশবিদ্ধ ব্যক্তিটি ক্রুশ থেকে যিশুর মতোই কথা বলছিলেন।

আল্লাহ 15
বিষয়খ্রিস্টীয় দাবি (ঐতিহাসিক ও চাক্ষুষ)ইসলামি দাবি (ধর্মতাত্ত্বিক ও অলৌকিক)
ঘটনার সাক্ষীশিষ্যরা এবং মেরি সরাসরি ক্রুশবিদ্ধ হওয়া ও মৃত্যু দেখেছেন।শিষ্যরা বিভ্রান্ত হয়েছিলেন অথবা তাদের সামনে দৃশ্যপট পরিবর্তন করা হয়েছিল।
ব্যক্তির পরিচয়যিশু নিজেই ক্রুশবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।যিশুর সদৃশ অন্য কোনো ব্যক্তিকে (শিষ্য বা শত্রু) ক্রুশে দেওয়া হয়।
পুনরুত্থানমৃত্যুর পর যিশু শিষ্যদের কাছে দেখা দেন এবং কথা বলেন।যিশুকে জীবিত অবস্থায় আকাশে তুলে নেওয়া হয়, কোনো মৃত্যু ঘটেনি।
প্রমাণযিশুর গায়ের ক্ষতচিহ্ন এবং শিষ্যদের চাক্ষুষ অভিজ্ঞতা।৬০০ বছর পর আসা ওহীর ভাষ্য যা চাক্ষুষ অভিজ্ঞতাকে নাকচ করে।

যৌক্তিক বিচারে, যদি এই ১২ জন শিষ্য—যাঁরা যিশুর সাথে দিনরাত অতিবাহিত করেছেন—তাঁরা যদি যিশুর পরিবর্তে অন্য কাউকে দেখে প্রতারিত হয়ে থাকেন, তবে মানুষের ইন্দ্রিয়লব্ধ জ্ঞানের ওপর আর কোনো আস্থা রাখা সম্ভব হয় না। ইসলামি বর্ণনা অনুযায়ী, আল্লাহ যদি যিশুর অতি ঘনিষ্ঠ জনদেরও বিভ্রান্ত করতে পারেন, তবে তা কেবল একটি অলৌকিক ঘটনা থাকে না, বরং তা হয়ে দাঁড়ায় এক পরিকল্পিত জ্ঞানতাত্ত্বিক ধোঁয়াশা। যদি শিষ্যরা সত্যই যিশুকে মরতে দেখে থাকেন এবং সেই ‘সাক্ষ্য’ দেওয়ার জন্য পরবর্তীতে নিজেরা ভয়াবহ নিপীড়ন ও মৃত্যু বরণ করেন, তবে তাদের এই আত্মত্যাগ কি আল্লাহর তৈরি এক বিভ্রমের ফসল? এই অমিলটি প্রমাণ করে যে, ইসলামি ভাষ্য গ্রহণ করতে হলে ঐতিহাসিক যুক্তি ও চাক্ষুষ সাক্ষ্যের চেয়ে অলৌকিক ‘ডিক্টেট’ বা ঐশ্বরিক হুকুমকে বেশি অগ্রাধিকার দিতে হয়, যা শেষ পর্যন্ত সত্যের সংজ্ঞাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।


প্রত্যক্ষদর্শীর দৃষ্টিভঙ্গি এবং জ্ঞানতাত্ত্বিক (Epistemological) সংকট

প্রথম শতাব্দীর জেরুজালেমের একজন সাধারণ প্রত্যক্ষদর্শীর প্রেক্ষাপট থেকে বিবেচনা করলে এই ঐশ্বরিক হস্তক্ষেপের বিষয়টি একটি চরম জ্ঞানতাত্ত্বিক জটিলতা তৈরি করে। ধরা যাক, সেই সময়কার একজন ব্যক্তি, যিনি যিশুর শিক্ষা দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন এবং যিশুকে ব্যক্তিগতভাবে চিনতেন, তিনি ক্রুশবিদ্ধকরণের স্থলে উপস্থিত ছিলেন। ইসলামি ‘বিকল্প তত্ত্ব’ (Substitution Theory) অনুযায়ী, আল্লাহ যদি যিশুর চেহারা অন্য কারো ওপর অর্পণ করে থাকেন, তবে সেই প্রত্যক্ষদর্শী যা দেখছেন তা হলো—তার চেনা যিশু যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন এবং ক্রুশেই প্রাণত্যাগ করছেন। মানুষের জ্ঞান অর্জনের মৌলিক ভিত্তি তার ইন্দ্রিয়—বিশেষ করে দর্শন ও শ্রবণ। এই ভিত্তিকেই যদি ঐশ্বরিকভাবে বিকৃত করা যায়, তবে সত্য-মিথ্যার পার্থক্য করার কোনো নির্ভরযোগ্য উপায় অবশিষ্ট থাকে না। দর্শনলব্ধ অভিজ্ঞতায় যখন কোনো ত্রুটি থাকে না, তখন সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া মানুষের জন্য কেবল স্বাভাবিক নয়, বরং যুক্তিসঙ্গতও বটে [9]

এই পরিস্থিতিতে উক্ত ব্যক্তির জন্য কোনোভাবেই জানার উপায় ছিল না যে, তিনি যা দেখছেন তা একটি ঐশ্বরিক ‘ইল্যুশন’ বা বিভ্রম। ইসলামি বর্ণনা অনুযায়ী, আল্লাহ সেই মুহূর্তে কোনো ওহী বা দৈববাণী পাঠিয়ে সেখানে উপস্থিত জনতাকে সতর্ক করেননি যে—”তোমরা যা দেখছো তা সত্য নয়।” বরং এই ঘটনার প্রায় ৬০০ বছর পর কুরআনের মাধ্যমে এই সংশোধনী প্রদান করা হয়। ফলে, যিশুর সমসাময়িক একজন মানুষ যদি তার চাক্ষুষ প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে বিশ্বাস করেন যে যিশু মারা গেছেন এবং সেই বিশ্বাসের ভিত্তিতে খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত হন, তবে সেই ‘ভুল’ বিশ্বাসের দায় তার ওপর আরোপ করা যুক্তিগতভাবে অসম্ভব হয়ে পড়ে। কারণ, তথ্যের উৎস হিসেবে স্বয়ং ঈশ্বর এখানে এমন একটি দৃশ্যপট তৈরি করেছেন যা মানুষকে একটি নির্দিষ্ট ভ্রান্তিতে নিপতিত হতে বাধ্য করে। যদি আল্লাহ যিশুর মৃত্যুর একটি নিখুঁত দৃশ্য প্রদর্শন করেন এবং দীর্ঘ ছয় শতাব্দী পর্যন্ত তা সংশোধনের কোনো ব্যবস্থা না করেন, তবে খ্রিস্টধর্মের সেই আদি ভিত্তিপ্রস্তরটি মূলত ঐশ্বরিক হস্তক্ষেপেরই ফসল হয়ে দাঁড়ায়। যুক্তিবিদ্যার নিরিখে, যখন কোনো ‘Agent’ (এখানে ঈশ্বর) সচেতনভাবে এমন কোনো পরিস্থিতি তৈরি করেন যার অনিবার্য ফলাফল একটি নির্দিষ্ট বিশ্বাস (খ্রিস্টধর্ম), তখন সেই ফলাফলের পূর্ণ দায় অবধারিতভাবে ওই ‘Agent’-এর ওপরই বর্তায়।


শিষ্যদের চাক্ষুষ সাক্ষ্য এবং আত্মত্যাগের ঐতিহাসিক গুরুত্ব

খ্রিস্টধর্মের ঐতিহাসিক ভিত্তি কেবল যিশুর শিক্ষার ওপর নয়, বরং তাঁর শিষ্যদের চাক্ষুষ অভিজ্ঞতার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। নিউ টেস্টামেন্টের বর্ণনা অনুযায়ী, যিশুর ঘনিষ্ঠতম বারোজন শিষ্য (Apostles) কেবল ধর্মপ্রচারক ছিলেন না, তাঁরা ছিলেন যিশুর ক্রুশবিদ্ধ হওয়া, মৃত্যু এবং পরবর্তী ঘটনাবলির প্রত্যক্ষদর্শী [10]। ইসলামি ‘বিকল্প তত্ত্ব’ (Substitution Theory) অনুযায়ী, যদি ক্রুশে চড়ানো ব্যক্তিটি যিশু না হয়ে অন্য কেউ হতেন, তবে এই বারোজন শিষ্যের পরবর্তী জীবন এবং তাঁদের নির্মম মৃত্যু এক বিশাল যৌক্তিক ও মনস্তাত্ত্বিক সংকটের মুখোমুখি হয়। একজন মানুষ ভুল বিশ্বাসের জন্য জীবন দিতে পারেন, কিন্তু যখন একদল মানুষ একটি নির্দিষ্ট চাক্ষুষ ঘটনার জন্য অবর্ণনীয় নির্যাতন সহ্য করেন, তখন সেই ঘটনার সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা কঠিন হয়ে পড়ে। নিচে বারোজন শিষ্যের প্রচারস্থল এবং তাঁদের মৃত্যুর বিবরণ বিস্তারিতভাবে দেওয়া হলো:

শিষ্যের নামপ্রচারস্থল ও মিশনমৃত্যুর প্রকৃতি ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
পিটার (শিমোন)রোম এবং এশিয়া মাইনর (তুরস্ক)সম্রাট নিরোর খ্রিস্টান নিধনের সময় রোমে তাঁকে ক্রুশবিদ্ধ করা হয়। ঐতিহ্য অনুযায়ী, তিনি উল্টো হয়ে ক্রুশে বিদ্ধ হতে চেয়েছিলেন কারণ তিনি নিজেকে যিশুর সমান সম্মানের যোগ্য মনে করেননি [11]
অ্যান্ড্রুগ্রিস, সাইথিয়া (রাশিয়া ও ইউক্রেন)গ্রিসের পাট্রাস শহরে তাঁকে একটি ‘X’ আকৃতির ক্রুশে বিদ্ধ করে হত্যা করা হয়। তিনি দুই দিন ক্রুশে ঝুলে থাকা অবস্থায় পথচারীদের কাছে যিশুর বাণী প্রচার করেছিলেন বলে জানা যায় [12]
জেমস (জব্দীয়ের পুত্র)জেরুজালেম৪৪ খ্রিস্টাব্দে রাজা হেরোদ আগ্রিপ্পা তাঁকে তলোয়ার দিয়ে শিরশ্ছেদ করেন। তিনিই শিষ্যদের মধ্যে প্রথম শহীদ হন [13]
জন (যোহন)ইফিষ ও পাটমোস দ্বীপতাঁকে ফুটন্ত তেলে ফেলে হত্যার চেষ্টা করা হলেও অলৌকিকভাবে বেঁচে যান। পরে তাঁকে পাটমোস দ্বীপে নির্বাসিত করা হয়। শিষ্যদের মধ্যে তিনিই একমাত্র স্বাভাবিক মৃত্যু বরণ করেন [14]
ফিলিপউত্তর আফ্রিকা ও এশিয়া মাইনরতুরস্কের হিয়াপোলিস শহরে তাঁকে কারারুদ্ধ করা হয় এবং নির্মমভাবে নির্যাতনের পর ক্রুশবিদ্ধ করে হত্যা করা হয় [15]
বার্থোলোমিউভারত ও আর্মেনিয়াআর্মেনিয়াতে প্রচার করার সময় তাঁকে জীবন্ত অবস্থায় চামড়া ছাড়িয়ে (Flaying) নির্মমভাবে হত্যা করা হয় এবং পরে শিরশ্ছেদ করা হয় [16]
থমাসসিরিয়া ও ভারত (কেরালা ও মাদ্রাজ)যিশুর ক্ষতচিহ্ন পরীক্ষা করে নিশ্চিত হওয়া এই শিষ্যকে ভারতে প্রচার করার সময় স্থানীয়দের দ্বারা বর্শার আঘাতে হত্যা করা হয় [17]
মথি (ম্যাথু)ইথিওপিয়া ও পারস্যইথিওপিয়াতে প্রচার করার সময় তাঁকে কুঠার বা তলোয়ারের আঘাতে শহীদ করা হয় বলে প্রাচীন খ্রিস্টীয় ঐতিহ্যে উল্লেখ আছে [18]
জেমস (আলফীয়ের পুত্র)মিশর ও প্যালেস্টাইনজেরুজালেমের মন্দিরের চূড়া থেকে তাঁকে নিচে ফেলে দেওয়া হয় এবং পরে লাঠি দিয়ে পিটিয়ে তাঁর মস্তক চূর্ণ করে হত্যা করা হয় [19]
থাদ্দেয়াস (জুড)পারস্য (বর্তমান ইরান)পারস্যে প্রচার করার সময় তাঁকে তীরের আঘাতে অথবা কুঠার দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয় [20]
শিমোন (কানাডীয়)পারস্য ও মিশরপারস্যে প্রচারের সময় তাঁকে করাত দিয়ে দ্বিখণ্ডিত করে হত্যা করা হয় বলে ঐতিহ্যগত বিশ্বাস প্রচলিত রয়েছে [12]
ম্যাথিয়াসসিরিয়া ও ইথিওপিয়াজুডাসের শূন্যস্থান পূরণকারী এই শিষ্যকে প্রথমে পাথর ছুড়ে এবং পরে শিরশ্ছেদ করে হত্যা করা হয় [21]

এই শিষ্যদের জীবনের পরিণতি বিশ্লেষণ করলে একটি চরম সত্য সামনে আসে: তাঁরা যে ঘটনাগুলো প্রচার করেছিলেন, সেগুলোকে তাঁরা নিজেরাই প্রত্যক্ষ সত্য হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন। যদি যিশুর ক্রুশবিদ্ধ হওয়া এবং পুনরুত্থান কেবল একটি ঐশ্বরিক ‘বিভ্রম’ হতো, তবে এই বারোজন মানুষ এমন একটি বিভ্রমের জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে গিয়ে কেন চরম নির্যাতন ও মৃত্যু বেছে নিতেন? মনোবিজ্ঞানের নিরিখে, মানুষ একটি জানা মিথ্যার জন্য এভাবে জীবন উৎসর্গ করে না [22]। ফলে, ইসলামি দাবি অনুযায়ী যদি আল্লাহ তাঁদের বিভ্রান্ত করে থাকেন, তবে সেই বিভ্রান্তির ফলে সৃষ্ট এই বিশাল রক্তক্ষয়ী ত্যাগের দায়ভার সরাসরি আল্লাহর ওপরই বর্তায়—যা একটি নৈতিক সংকট তৈরি করে।


সেন্ট পল এবং ক্রুশবিদ্ধকরণের ধর্মতাত্ত্বিক অপরিহার্যতা

খ্রিস্টধর্মের প্রসারে বারোজন শিষ্যের চেয়েও যার ভূমিকা সবচেয়ে বেশি বিতর্কিত এবং প্রভাবশালী, তিনি হলেন সেন্ট পল বা সাধু পৌল। যদিও তিনি যিশুর সমসাময়িক ১২ জন শিষ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না, তবুও তাঁর দর্শনের ওপর ভিত্তি করেই বর্তমান বৈশ্বিক খ্রিস্টধর্ম দাঁড়িয়ে আছে। পলের ধর্মতত্ত্বের কেন্দ্রীয় বিন্দু হলো যিশুর ক্রুশবিদ্ধ হওয়া এবং তাঁর পুনরুত্থান। তিনি স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছিলেন, “যদি খ্রিস্ট পুনরুত্থিত না হতেন, তবে আমাদের প্রচার বৃথা এবং তোমাদের বিশ্বাসও অর্থহীন” [23]। ইসলামি ‘বিকল্প তত্ত্ব’ (Substitution Theory) পলের এই পুরো মিশনটিকে একটি প্রকট যৌক্তিক ও নৈতিক সংকটের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়।

পলের দাবি অনুযায়ী, তিনি দামেস্কে যাওয়ার পথে এক অলৌকিক দর্শনে পুনরুত্থিত যিশুর দেখা পেয়েছিলেন, যা তাঁর জীবনকে আমূল বদলে দেয় [24]। যদি ইসলামি দাবি অনুযায়ী যিশুর ক্রুশবিদ্ধ হওয়া এবং পুনরুত্থান একটি ঐশ্বরিক ‘বিভ্রম’ হয়ে থাকে, তবে যৌক্তিকভাবে প্রশ্ন ওঠে—পলের তথাকথিত ‘পুনরুত্থিত যিশু’র অভিজ্ঞতাও কি একই ঐশ্বরিক বিভ্রমের ধারাবাহিকতা ছিল? যদি আল্লাহই যিশুর ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার দৃশ্যটি নিখুঁতভাবে মঞ্চস্থ করে থাকেন, তবে পল যা প্রচার করেছেন তা মূলত আল্লাহর তৈরি করা সেই দৃশ্যেরই যৌক্তিক পরিণতি। পল বিশ্বাস করতেন যে, যিশুর রক্তপাতের মাধ্যমেই মানবজাতির পাপমুক্তি সম্ভব [25]। ফলে, যিশুর পরিবর্তে অন্য কারো রক্তপাত ঘটিয়ে আল্লাহ যদি পলের মতো একজন প্রভাবশালী প্রচারককে সেই ‘মিথ্যা’ প্রচারের ক্ষেত্র তৈরি করে দেন, তবে খ্রিস্টধর্মের প্রচারক হিসেবে পলের চেয়ে আল্লাহকেই বেশি দায়ী হিসেবে গণ্য করতে হয়।

যুক্তিবিদ্যার নিরিখে, যদি আদি কারণটি (Cause) ঈশ্বর কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত একটি বিভ্রম হয়, তবে তার থেকে উদ্ভূত সকল বিশ্বাস (Effect) ঈশ্বরেরই ইচ্ছার প্রতিফলন। পল তাঁর চিঠিপত্রগুলোতে বারবার যিশুর ক্রুশবিদ্ধ হওয়াকে ঈশ্বরের মহান পরিকল্পনা হিসেবে বর্ণনা করেছেন [26]। যদি এই পরিকল্পনাটি সত্য না হয়ে কেবল একটি ‘ছদ্মবেশ’ হতো, তবে ঈশ্বর সচেতনভাবে পলকে দিয়ে একটি ‘মিথ্যা ধর্ম’ বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছেন। এটি কেবল পলের সততাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে না, বরং আল্লাহর ন্যায়বিচার এবং হিদায়াতের ধারণার সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়ায়—যেখানে স্বয়ং ঈশ্বরই একটি ‘শিরক’ বা কুফরি মতবাদের প্রধান কারিগর হিসেবে আবির্ভূত হন।


সেক্যুলার ঐতিহাসিক সাক্ষ্যঃ রোমান ও ইহুদি নথিতে যিশুর মৃত্যু

ইসলামি ‘বিকল্প তত্ত্ব’ বা যিশুর সদৃশ কাউকে ক্রুশবিদ্ধ করার দাবিটি কেবল ধর্মতাত্ত্বিক বিতর্কের বিষয় নয়, এটি প্রথম শতাব্দীর ইতিহাসের একটি বিশাল অংশের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক। খ্রিস্টানদের ধর্মীয় গ্রন্থের বাইরেও সমসাময়িক রোমান ও ইহুদি ইতিহাসবিদদের লেখায় যিশুর ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার যে উল্লেখ পাওয়া যায়, তা এই ঘটনার ঐতিহাসিকতাকে একটি শক্ত ভিত্তি দান করে। যদি যিশুর মৃত্যু কেবল একটি বিভ্রম হতো, তবে সেই বিভ্রম কেবল তাঁর অনুসারীদেরই নয়, বরং তাঁর শত্রু এবং তৎকালীন নিরপেক্ষ রাষ্ট্রীয় প্রশাসনকেও একইভাবে বিভ্রান্ত করেছিল—যা একটি অসম্ভব প্রায় ঐতিহাসিক দৃশ্যপট তৈরি করে।

প্রথম শতাব্দীর ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অ-খ্রিস্টান সাক্ষ্যগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো রোমান ইতিহাসবিদ টাসিটাস (Tacitus)-এর বর্ণনা। ১১২-১১৭ খ্রিস্টাব্দের দিকে রচিত তাঁর ‘অ্যানালস’ (Annals) গ্রন্থে তিনি সম্রাট নিরোর সময়ে খ্রিস্টানদের ওপর চালানো নির্যাতনের বর্ণনা দিতে গিয়ে লিখেন: “খ্রিস্টান নামের উৎস যে ‘ক্রিস্টাস’ (Christus), তিবেরিয়াসের শাসনামলে পন্টিয়াস পিলেটের নির্দেশে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল” [27]। টাসিটাস খ্রিস্টানদের প্রতি কোনো সহানুভূতিশীল ছিলেন না, বরং তিনি খ্রিস্টধর্মকে একটি ‘বিপজ্জনক অন্ধবিশ্বাস’ হিসেবে গণ্য করতেন। ফলে, একজন রোমান রাজকীয় ইতিহাসবিদ যখন কোনো ধর্মীয় স্বার্থ ছাড়াই যিশুর মৃত্যুদণ্ডকে একটি দাপ্তরিক তথ্য হিসেবে নথিবদ্ধ করেন, তখন তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহুগুণ বেড়ে যায়।

একইভাবে, প্রথম শতাব্দীর বিখ্যাত ইহুদি ইতিহাসবিদ ফ্লাভিয়াস জোসেফাস (Flavius Josephus) তাঁর ‘অ্যান্টিকুইটিজ অফ দ্য জিউস’ (Antiquities of the Jews) গ্রন্থে যিশুর জীবন ও মৃত্যু নিয়ে আলোচনা করেছেন। যিশুর মৃত্যুদণ্ড সংক্রান্ত তাঁর বক্তব্যটি (যা ‘টেস্টিমোনিয়াম ফ্ল্যাভিয়ানাম‘ নামে পরিচিত) আধুনিক ঐতিহাসিকদের মতে পরবর্তীকালে কিছুটা পরিবর্তিত হলেও, যিশুর অস্তিত্ব এবং পন্টিয়াস পিলেটের হাতে তাঁর ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার মৌলিক তথ্যটি অধিকাংশ গবেষকই বিস্তৃত ঐতিহাসিক ঐকমত্যের অংশ হিসেবে বিবেচিত হয় [28]

আল্লাহ 17

এছাড়া ইহুদিদের প্রাচীন ধর্মগ্রন্থ ‘তালমুদ’-এও উল্লেখ আছে যে, যিশু (ইয়েশু) জাদুকরী ও বিপথগামী করার অপরাধে নিস্তারপর্বের (Passover) প্রাক্কালে বিদ্ধ বা ঝুলিয়ে মারা হয়েছিলেন [29]

যৌক্তিক বিচারে, এই সেক্যুলার রেকর্ডগুলো একটি বড় প্রশ্ন উত্থাপন করে: যদি আল্লাহ যিশুর চেহারা পরিবর্তন করে অন্য কাউকে ক্রুশে দিয়ে থাকেন, তবে রোমান প্রশাসন—যারা তাদের কঠোর বিচারব্যবস্থা এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের জন্য সুপরিচিত ছিল—তারা কীভাবে এমন ভুল করল? রোমানরা অত্যন্ত দক্ষতার সাথে অপরাধী শনাক্ত করত এবং ক্রুশবিদ্ধ করার আগে ও পরে দীর্ঘ সময় ধরে পর্যবেক্ষণ করত। যদি আল্লাহ এমন একটি বিভ্রম তৈরি করেন যা রোমান আইনি প্রক্রিয়া এবং ইহুদিদের চাক্ষুষ অভিজ্ঞতাকেও শতভাগ ফাঁকি দিতে সক্ষম হয়, তবে সেই বিভ্রমটি আর অলৌকিকতা থাকে না, তা কার্যত একটি ‘বিশ্বজনীন প্রবঞ্চনা’তে রূপ নেয়—যেখানে সমসাময়িক দর্শক, শত্রু, এবং প্রশাসনিক কাঠামো—সবাই একই বিভ্রমের শিকার। এর অর্থ হলো, আল্লাহ সচেতনভাবে ইতিহাসের তথ্যপ্রমাণকে এমনভাবে সাজিয়েছেন যেন মানুষ আগামী দুই হাজার বছর ধরে যিশুর মৃত্যুকে একটি অকাট্য সত্য হিসেবেই বিশ্বাস করতে বাধ্য হয় [30]। এটি কেবল খ্রিস্টধর্মের উদ্ভবকেই অনিবার্য করেনি, বরং মানুষের পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা এবং ঐতিহাসিক সত্যের ওপর নির্ভরতাকেও চিরতরে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।


ছয় শতাব্দীর নীরবতা এবং ঐশ্বরিক দায়বদ্ধতার নৈতিক সংকট

যিশুর কথিত ক্রুশবিদ্ধকরণ এবং মুহাম্মদের কাছে ওহী আসার মধ্যবর্তী ৬০০ বছরের দীর্ঘ সময়কালটি ইসলামি ধর্মতত্ত্বের কাঠামোর ভেতরে এক বিশাল নৈতিক ও যৌক্তিক শূন্যতা তৈরি করে। যদি তাত্ত্বিকভাবে মেনে নেওয়া হয় যে, আল্লাহ সচেতনভাবে একটি অলৌকিক বিভ্রম তৈরি করেছিলেন, তবে সেই বিভ্রমের ফলে সৃষ্ট ‘কুফরি’ বা শিরকের (যেমন: যিশুকে ঈশ্বরের পুত্র হিসেবে উপাসনা করা) প্রাথমিক দায়ভার সরাসরি আল্লাহর ওপরই বর্তায়। এটি কোনো সাধারণ ভুল ছিল না, বরং এটি ছিল একটি ‘ঐশ্বরিক প্রতারণা’ (Divine Deception), যেখানে সত্য গোপন করে মিথ্যাকে চাক্ষুষ সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। প্রশ্ন ওঠে, আল্লাহ যদি মানুষকে হিদায়াত বা সঠিক পথ দেখানোর অঙ্গীকার করেন, তবে তিনি কেন এমন একটি পরিস্থিতির অবতারণা করলেন যা মানুষকে পরবর্তী ৬০০ বছর ধরে অনিবার্যভাবে কুফরি বা পথভ্রষ্টতার দিকে ঠেলে দেয়? যদি এই ৬০০ বছরে লক্ষ লক্ষ মানুষ যিশুর মৃত্যু ও ঐশ্বরিকতায় বিশ্বাস করে মৃত্যুবরণ করে থাকে, তবে কিয়ামতের ময়দানে তাদের বিচার করার নৈতিক অধিকার আল্লাহর থাকে কি না, তা একটি বড় প্রশ্ন। কারণ, তাদের “অপরাধ” ছিল কেবল তাদের সৃষ্টিকর্তার প্রদর্শিত একটি দৃশ্যমান “মিরাকল” বা অলৌকিকতাকে সত্য বলে মেনে নেওয়া। ইসলামি পরিভাষায় একে ‘জবর’ বা বাধ্যবাধকতা বলা যেতে পারে, যেখানে মানুষকে ভুল বিশ্বাস করতে কার্যত বাধ্য করা হয়েছে।

একইসাথে, জ্ঞানতাত্ত্বিক বিচারে (Epistemology) ৬০০ বছর পরের কোনো ভাষ্যের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে গুরুতর সংশয় দেখা দেয়। ঐতিহাসিক পদ্ধতি অনুযায়ী, কোনো ঘটনার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বিবরণ পাওয়া যায় সমসাময়িক প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য থেকে। যিশুর ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার ঘটনার খ্রিস্টীয় ঐতিহ্য অনুযায়ী বহু প্রত্যক্ষদর্শীর দাবি উপস্থাপিত হয়, রোমান দাপ্তরিক নথি এবং আদি খ্রিস্টীয় শিষ্যদের বর্ণনা যেখানে অভিন্ন সাক্ষ্য দিচ্ছে, সেখানে ৬০০ বছর পর সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে আসা একজন ব্যক্তির একক দাবিকে সত্য বলে গ্রহণ করা ঐতিহাসিক বস্তুনিষ্ঠার পরিপন্থী। যদি যিশুর সমসাময়িক মানুষের চোখ ও কানকে আল্লাহ প্রতারিত করতে পারেন, তবে ৬০০ বছর পরে আসা দাবিটিও যে একইভাবে কোনো বৃহত্তর বিভ্রান্তির অংশ নয়, তার নিশ্চয়তা কোথায়? এই যৌক্তিক সংকটটি কেবল খ্রিস্টধর্মের উদ্ভবকেই বৈধতা দেয় না, বরং ইসলামি ওহীর দাবিকেও একটি দুর্বল অবস্থানের সম্মুখীন করে—যেখানে ওহী কেবল বাস্তবতাকে অস্বীকারই করছে না, বরং একটি দীর্ঘমেয়াদী ধর্মীয় বিপর্যয়ের দায় থেকে আল্লাহকে মুক্ত করতে পারছে না।

আল্লাহ 19

এপোলোজিস্টদের ব্যাখ্যার অসারতা এবং যৌক্তিক সীমাবদ্ধতা

ইসলামি এপোলোজিস্ট বা ধর্মতাত্ত্বিকরা সাধারণত এই নৈতিক সংকট নিরসনে ‘আহলুল ফাতরাহ’ (দুই নবীর মধ্যবর্তী সময়ের মানুষ) তত্ত্ব অথবা ‘পরীক্ষা’ (Test of Faith)-র যুক্তি দিয়ে থাকেন। তবে গভীর বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই ব্যাখ্যাগুলো যৌক্তিক মানদণ্ডে টিকতে পারে না। প্রথমত, ‘আহলুল ফাতরাহ’ তত্ত্বটি কেবল তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যারা কোনো বার্তা পায়নি; কিন্তু যিশুর সমসাময়িক বা পরবর্তী মানুষরা একটি সুনির্দিষ্ট অলৌকিক ঘটনার চাক্ষুষ অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে তাদের ধর্মতত্ত্ব সাজিয়েছিলেন। এখানে সমস্যাটি বার্তার অভাব নয়, বরং বার্তার উৎস হিসেবে আল্লাহর পক্ষ থেকে সরবরাহকৃত ‘ভুল তথ্য’। কোনো বিচারক যদি নিজেই মিথ্যা সাক্ষ্যপ্রমাণ তৈরি করেন এবং পরে আসামিকে সেই প্রমাণের ভিত্তিতে সাজা দেন বা তাকে অজ্ঞ ঘোষণা করেন, তবে তা ন্যায়বিচারের সংজ্ঞাকেই ধূলিসাৎ করে দেয় [31]

দ্বিতীয়ত, অনেক এপোলোজিস্ট দাবি করেন যে পরবর্তীকালে মানুষ ইঞ্জিল বা বাইবেল বিকৃত (তাহরিফ) করেছে। কিন্তু এই বিকৃতির বীজ তো বপন করা হয়েছিল সেই ‘বিভ্রমের’ মাধ্যমে। যদি আদি শিষ্যরা তাদের চোখে দেখা ঘটনাটিই প্রচার করে থাকেন (যিশুর মৃত্যু), তবে তাকে ‘বিকৃতি’ বলা যায় না; বরং তা ছিল প্রত্যক্ষদর্শীর সত্যনিষ্ঠ বিবরণ। যদি আল্লাহ নিজেই সেই বিভ্রম তৈরি করে থাকেন, তবে মানুষের ওপর দোষারোপ করা মূলত দায় এড়ানোর একটি কৌশল মাত্র। তৃতীয়ত, যদি মেনে নেওয়া হয় যে আল্লাহ তাঁর উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য মানুষের জ্ঞানেন্দ্রিয়কে (Senses) প্রতারিত করতে পারেন, তবে তা একটি ‘জ্ঞানতাত্ত্বিক আত্মহনন’ (Epistemological Suicide) ডেকে আনে। কারণ, যদি আল্লাহ যিশুর সময় মানুষকে প্রতারিত করতে পারেন, তবে মুহাম্মদ (সা.)-এর সময় বা অন্য কোনো নবীকেও যে একইভাবে প্রতারিত করা হয়নি, তার কোনো গ্যারান্টি থাকে না। ফলে, ওহীর ওপর নির্ভরতা পুরোপুরি ধসে পড়ে, কারণ ‘সত্যবাদী’ আল্লাহর ধারণাটি তখন ‘প্রতারক’ আল্লাহর ধারণায় রূপান্তরিত হয়—যা ইসলামি একত্ববাদের (তাওহীদ) মৌলিক বৈশিষ্ট্যের পরিপন্থী [32]


আল্লাহর বিভ্রমের জন্য খ্রিস্টানরা কেন জাহান্নামী হবে?

ইসলামি পরকালবিদ্যায় (Eschatology) অবিশ্বাসী বা মুশরিকদের জন্য চিরস্থায়ী জাহান্নামের বিধান অত্যন্ত কঠোরভাবে বর্ণিত। তবে যিশুর ক্রুশবিদ্ধকরণকে কেন্দ্র করে যে ‘ঐশ্বরিক নাটক’ মঞ্চস্থ হয়েছে বলে কোরআন দাবি করে, সেটি এই শাস্তির নৈতিক ভিত্তিকে পুরোপুরি ধসিয়ে দেয়। যদি কোনো বিচারক নিজেই আসামীকে ভুল তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করেন, তবে সেই ভুলের জন্য আসামীকে শাস্তি দেওয়া ন্যায়বিচারের সংজ্ঞায় পড়ে না।


ঐশ্বরিক কারসাজি বনাম মানুষের নৈতিক দায়

যুক্তিবিদ্যার নিরিখে, কোনো ঘটনার প্রাথমিক কারণ (Primary Cause) যদি ঈশ্বর হন, তবে সেই ঘটনা থেকে উদ্ভূত যাবতীয় পরিণামের দায়ভারও তাঁর ওপরই বর্তায়। আল্লাহ যদি যিশুর পরিবর্তে অন্য কাউকে এমনভাবে ‘সদৃশ’ (Shubbiha) করেন যা সমসাময়িক প্রত্যক্ষদর্শীদের সাধারণ বুদ্ধিবৃত্তিকে ফাঁকি দিতে সক্ষম হয়, তবে খ্রিস্টধর্মের উদ্ভব কোনো মানবিক বিচ্যুতি নয়, বরং একটি ‘ঐশ্বরিক প্ররোচনা’ (Divine Entrapment)। মানুষ তার পঞ্চেন্দ্রিয় এবং বুদ্ধিবৃত্তি ব্যবহারের মাধ্যমে যে সিদ্ধান্তে পৌঁছায়, তাকেই সে সত্য বলে গ্রহণ করতে বাধ্য। এখানে ইসলামের দাবী অনুসারেই খ্রিস্টানরা কোনো সত্যকে অস্বীকার করেনি, বরং আল্লাহ তাদের সামনে যে ‘দৃশ্যমান সত্য’ উপস্থাপন করেছিলেন, তারা সেটিকেই বিশ্বাস করেছে। ফলে, আল্লাহর তৈরি করা একটি ‘মিরাকল’ বা বিভ্রমকে বিশ্বাস করার অপরাধে অনন্তকালের অগ্নিদহন এক ধরনের চূড়ান্ত যৌক্তিক স্ববিরোধিতা। আসুন দেখি, কোরআন খুব পরিষ্কারভাবেই ঘোষণা করেছে যে, অমুসলিমরা অনন্তকালের জন্য অর্থাৎ চিরস্থায়ী জাহান্নামী [33]

আল্লাহ মুনাফিক পুরুষ, মুনাফিক নারী ও কাফিরদের জন্য জাহান্নামের আগুনের ওয়া‘দা দিয়েছেন, তাতে তারা চিরদিন থাকবে, তা-ই তাদের জন্য যথেষ্ট। তাদের উপর আছে আল্লাহর অভিশাপ, আর আছে তাদের জন্য স্থায়ী ‘আযাব।
— Taisirul Quran
আল্লাহ মুনাফিক পুরুষ ও নারীদের এবং কাফিরদের সাথে জাহান্নামের আগুনের অঙ্গীকার করেছেন, তাতে তারা চিরকাল থাকবে,ওটাই তাদের জন্য যথেষ্ট। আর আল্লাহ তাদেরকে লা’নত করেছেন এবংতাদের জন্য রয়েছে চিরস্থায়ী শাস্তি।
— Sheikh Mujibur Rahman
আল্লাহ মুনাফিক পুরুষ, মুনাফিক নারী ও কাফিরদেরকে জাহান্নামের আগুনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তাতে তারা চিরদিন থাকবে, এটি তাদের জন্য যথেষ্ট। আর আল্লাহ তাদের লা‘নত করেন এবং তাদের জন্য রয়েছে স্থায়ী আযাব।
— Rawai Al-bayan
মুনাফেক পুরুষ, মুনাফেক নারী ও কাফেরদেরকে আল্লাহ্‌ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন জাহান্নামের আগুনের, যেখানে তারা স্থায়ী হবে, এটাই তাদের জন্যে যথেষ্ট।আর আল্লাহ তাদেরকে লা’নত করেছেন এবংতাদের জন্য রয়েছে স্থায়ী শাস্তি;
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
Allah has promised the hypocrite men and hypocrite women and the disbelievers the fire of Hell, wherein they will abide eternally. It is sufficient for them. And Allah has cursed them, and for them is an enduring punishment.
— Saheeh International


‘বলির পাঁঠা’ তত্ত্বঃ মুসলিমের পাপ ও খ্রিস্টানের জাহান্নাম

খ্রিস্টানদের জাহান্নামী হওয়ার পেছনে কেবল তাদের ‘ভ্রান্ত বিশ্বাস’ নয়, বরং একটি অবাক করা ধর্মতাত্ত্বিক লেনদেনের ইঙ্গিত পাওয়া যায় সহীহ হাদিসে। ইসলামি ন্যায়বিচারের ধারণায় একজনের পাপ অন্যজন বহন করবে না বলা হলেও, সহীহ মুসলিমের একটি বর্ণনা এই দাবিকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয় [34]

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৫১/ তাওবা
পরিচ্ছেদঃ ৮. হত্যাকারীর তাওবা আল্লাহর দরবারে গ্রহণযোগ্য; যদিও সে বহু হত্যা করে থাকে
৬৭৫৮। মুহাম্মদ ইবনু আমর ইবনু আব্বাদ ইবনু জাবালা ইবনু আবূ রাওয়াদ (রহঃ) … আবূ মূসা আশআরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কিছুসংখ্যক মুসলিম পাহাড় সমান গুনাহ নিয়ে কিয়ামতের ময়দানে আসবে এবং আল্লাহ তাআলা তাদের গুনাহ ক্ষমা করে দিবেন। আর তা ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানদের উপর চড়িয়ে দিবেন। আমার মনে হয় এ রূপই বর্ণনাকারী হাদীসের শেষোক্ত কথাটি সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। রাবী আবূ রাওহ (রহঃ) বলেন, কার পক্ষ থেকে সন্দেহের উদ্রেক হয়েছে, তা আমার জানা নেই। আবূ বুরদা (রহঃ) বলেন, এ হাদীসটি আমি উমার ইবনু আবদুল আযীয (রহঃ) এর নিকট বর্ণনা করার পর তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার পিতা এ হাদীসটি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে সরাসরি (শুনে) তোমার নিকট বর্ননা করেছে কি? আমি বললাম, হ্যাঁ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ মূসা আল- আশ’আরী (রাঃ)
[34]

এই বিবরণটি খ্রিস্টানদের জাহান্নামী হওয়ার একটি ভিন্ন এবং আপত্তিকর মাত্রা যোগ করে। এখানে খ্রিস্টানরা কেবল তাদের ‘ভুলের’ জন্য শাস্তি পাচ্ছে না, বরং তারা মুসলিমদের পাপের আধার বা ‘বলির পাঁঠা’ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। যদি আল্লাহ নিজেই যিশুর মৃত্যুভ্রম তৈরি করে খ্রিস্টধর্মের ক্ষেত্র প্রস্তুত করেন এবং পরে সেই ধর্মের অনুসারীদের ওপর মুসলিমদের পাপের বোঝা চাপিয়ে জাহান্নামে পাঠান, তবে তাকে ন্যায়বিচার না বলে একটি সুপরিকল্পিত ট্র্যাজেডি বলাই অধিকতর যুক্তিসঙ্গত।


জ্ঞানতাত্ত্বিক বিশ্বাসঘাতকতা (Epistemological Betrayal)

ইসলামি দাবি অনুযায়ী, আল্লাহ ‘খায়রুল মাকেরিন’ বা শ্রেষ্ঠ কৌশলী। কিন্তু এই কৌশল যখন মানুষের মৌলিক জ্ঞানতাত্ত্বিক সক্ষমতাকে (Epistemology) আক্রমণ করে, তখন তা আর বুদ্ধিমত্তা থাকে না, বরং তা হয়ে দাঁড়ায় একটি পদ্ধতিগত প্রতারণা। যদি স্রষ্টা নিজেই তথ্য বিকৃত করেন, তবে তাঁর প্রেরিত পরবর্তী কোনো বাণীর (ওহী) সত্যতা যাচাই করার আর কোনো মানদণ্ড অবশিষ্ট থাকে না। যিশুর ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার দৃশ্যটি যদি নিখুঁত ‘প্রতারণা’ হয়ে থাকে, তবে মুহাম্মদের কাছে আসা জিব্রাইল যে অন্য কোনো বৃহত্তর বিভ্রমের অংশ নয়, তার নিশ্চয়তা কোথায়?

পরিশেষে, খ্রিস্টানদের জাহান্নামী হওয়ার বিষয়টি এখানে কোনো নৈতিক মানদণ্ডে বিচার করা সম্ভব নয়। কারণ, ঘটনার সূত্রপাত (বিভ্রম), ঘটনার স্থায়িত্ব (নীরবতা) এবং ঘটনার পরিণতি (জাহান্নাম)—এই পুরো চক্রটিই আল্লাহর একক নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত। সুতরাং, যে বিশ্বাসের জন্মদাতা স্বয়ং আল্লাহ, সেই বিশ্বাসের অনুসারীদের ‘কাফের’ হিসেবে দণ্ডিত করা এক ধরনের ধ্রুপদী যৌক্তিক অসঙ্গতি (Logical Inconsistency), যা প্রমাণ করে যে এই ধর্মতাত্ত্বিক কাঠামোটি ন্যায়বিচারের চেয়ে ক্ষমতার একচ্ছত্র প্রয়োগের ওপর বেশি গুরুত্ব দেয়।


উপসংহারঃ ঐশ্বরিক দায়ভার এবং ধর্মতাত্ত্বিক পরিণাম

পরিশেষে বলা যায়, ইসলামি ‘বিকল্প তত্ত্ব’ বা যিশুর সদৃশ কাউকে ক্রুশবিদ্ধ করার যে বর্ণনা প্রথাগত ব্যাখ্যায় পাওয়া যায়, তা কেবল একটি অলৌকিক ঘটনার বিবরণ নয়, বরং তা একটি গভীর নৈতিক ও যৌক্তিক সংকটের উৎস। যদি এই ঐতিহাসিক নাটকটি আল্লাহর নির্দেশনায় মঞ্চস্থ হয়ে থাকে, তবে খ্রিস্টধর্মের উদ্ভব কোনো মানবিক বিচ্যুতি নয়, বরং একটি সুপরিকল্পিত ঐশ্বরিক কার্যের অনিবার্য ফলাফল। যুক্তিবিদ্যার ‘কার্যকারণ সম্পর্ক’ (Cause and Effect) অনুযায়ী, যখন আদি কারণটি (যিশুর মৃত্যুভ্রম) সরাসরি ঈশ্বর কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত, তখন সেই কারণ থেকে উদ্ভূত পরবর্তী সকল বিশ্বাসগত ফলাফলের দায়ভারও ওই আদি কারণের কর্তার ওপরই বর্তায় [35]

এই তাত্ত্বিক কাঠামোটি আল্লাহকে এমন এক সত্তা হিসেবে উপস্থাপন করে, যিনি একদিকে মানুষকে সঠিক পথের সন্ধান দেওয়ার দাবি করেন, আবার অন্যদিকে নিজেই ইতিহাসের বৃহত্তম ‘ভ্রান্ত ধর্ম’ (ইসলামি দৃষ্টিতে) গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় অলৌকিক ভিত্তি সরবরাহ করেন। ৬০০ বছরের দীর্ঘ নীরবতা এবং এর ফলে কোটি কোটি মানুষের “ভুল” বিশ্বাসে নিমজ্জিত হওয়া আল্লাহর ন্যায়বিচার (Adl) এবং প্রজ্ঞার (Hikmah) ধারণাকে গুরুতরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এছাড়া, চাক্ষুষ প্রমাণকে অলৌকিকতার মাধ্যমে অগ্রাহ্য করার এই প্রবণতা সামগ্রিকভাবে ওহী বা দৈববাণীর নির্ভরযোগ্যতাকেই ধূলিসাৎ করে দেয়। কারণ, যদি প্রথম শতাব্দীর প্রত্যক্ষদর্শীরা আল্লাহর তৈরি বিভ্রমের শিকার হতে পারেন, তবে সপ্তম শতাব্দীর ওহী যে কোনো বৃহত্তর বিভ্রান্তির অংশ নয়—তার কোনো বস্তুনিষ্ঠ প্রমাণ অবশিষ্ট থাকে না। সুতরাং, এই আলোচনার প্রেক্ষিতে এটি অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত যে, ইসলামি ভাষ্য যদি আক্ষরিকভাবে সত্য হয়, তবে খ্রিস্টধর্মের উদ্ভবের জন্য আল্লাহ নিজেই সরাসরি দায়ী এবং এই দায়ভার এড়িয়ে মানুষের ওপর ‘কুফরি’র অভিযোগ আনা একটি ধ্রুপদী যৌক্তিক অসঙ্গতি (Logical Inconsistency) ছাড়া আর কিছুই নয়, যা ধর্মতাত্ত্বিক কাঠামোটিকেই ভিতর থেকে ভেঙে দেয়।


তথ্যসূত্রঃ
  1. ১ করিন্থীয় ১৫:৩-৪ ↩︎
  2. মথি ২৭:৫০ ↩︎
  3. আল-কোরআন ৪:১৫৭ ↩︎
  4. তাফসীরে ইবনে কাসীর, ৩য় খণ্ড, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, পৃষ্ঠা ৩২৮, ৩২৯ ↩︎
  5. তাফসীরে মাযহারী, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৪৩, ৩৪৪ ↩︎
  6. মথি ১০:২-৪ ↩︎
  7. যোহন ২০:২৭ ↩︎
  8. যোহন ১৯:২৬-২৭ ↩︎
  9. Hume, David. An Enquiry Concerning Human Understanding ↩︎
  10. লূক ২৪:৪৮ ↩︎
  11. ইউসেবিয়াস, চার্চ হিস্ট্রি, ৩.১ ↩︎
  12. ফক্স বুক অফ মার্টার্স 1 2
  13. প্রেরিত ১২:১-২ ↩︎
  14. টার্টুলিয়ান, দ্য প্রেসক্রিপশন অফ হেরেটিক্স, ৩৬ ↩︎
  15. দ্য অ্যাক্টস অফ ফিলিপ ↩︎
  16. ক্যাথলিক এনসাইক্লোপিডিয়া ↩︎
  17. দ্য অ্যাক্টস অফ থমাস ↩︎
  18. হেরোনিমাস, ডি ভিরিস ইলাস্ট্রিবাস ↩︎
  19. জোসেফাস, অ্যান্টিকুইটিজ অফ দ্য জিউস, ২০.৯ ↩︎
  20. গোল্ডেন লিজেন্ড ↩︎
  21. ক্লিমেন্ট অফ আলেকজান্দ্রিয়া ↩︎
  22. উইলিয়াম লেন ক্রেগ, রিজনেবল ফেইথ ↩︎
  23. ১ করিন্থীয় ১৫:১৪ ↩︎
  24. প্রেরিত ৯:৩-৬ ↩︎
  25. রোমীয় ৫:৯ ↩︎
  26. ফিলিপীয় ২:৮ ↩︎
  27. টাসিটাস, অ্যানালস, ১৫.৪৪ ↩︎
  28. জোসেফাস, অ্যান্টিকুইটিজ, ১৮.৩.৩ ↩︎
  29. ব্যাবিলনীয় তালমুদ, সানহেড্রিন ৪৩ক ↩︎
  30. বার্ট এহরম্যান, দ্য হিস্টোরিক্যাল জেসাস ↩︎
  31. Swinburne, Richard. The Concept of Miracle ↩︎
  32. Internal Logic Critique: Al-Ghazali vs. Averroes on Causality ↩︎
  33. সূরা তওবা, আয়াত ৬৮ ↩︎
  34. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৬৭৫৮ 1 2
  35. Hick, John. The Metaphor of God Incarnate ↩︎