
Table of Contents
ভূমিকা: আমীর মুয়াবিয়া ও দাসপ্রথার প্রেক্ষাপট
ইসলামি ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী এবং বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব হলেন হযরত আমীর মুয়াবিয়া বা মুয়াবিয়া ইবনে আবি সুফিয়ান। তিনি স্রেফ উমাইয়া সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতাই ছিলেন না, বরং ৬৬১ খ্রিষ্টাব্দ থেকে মৃত্যু অবধি সমগ্র ইসলামি সাম্রাজ্যের একচ্ছত্র খলিফা হিসেবে শাসন করেছেন। নবী মুহাম্মদের আপন শ্যালক হওয়ার কারণে (তার বোন উম্মে হাবিবা ছিলেন নবীর স্ত্রী) ইসলামি ধর্মতত্ত্বে তাঁর অবস্থান অত্যন্ত সুউচ্চ এবং সংবেদনশীল।
ইসলামের আদি ও প্রামাণিক গ্রন্থগুলোতে মুয়াবিয়ার মর্যাদা এবং মাহাত্ম্য নিয়ে বেশ কিছু বর্ণনা পাওয়া যায়। স্বয়ং নবী মুহাম্মদ মু’আবিয়ার জন্য বিশেষভাবে দু’আ করেছিলেন যে, হে আল্লাহ! তুমি তাকে পথপ্রদর্শক ও হেদায়াতপ্রাপ্ত বানাও এবং তার মাধ্যমে (মানুষকে) সৎপথ দেখাও। অন্যান্য বর্ণনায় তাকে কিতাব ও হিসাবের জ্ঞান দান এবং আযাব থেকে রক্ষার দু’আও পাওয়া যায়। প্রখ্যাত সাহাবী ইবনু ‘আব্বাস-এর মতো ব্যক্তিত্বের দৃষ্টিতে মু‘আবিয়াহ ছিলেন একজন উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন ফকীহ বা ইসলামি আইনবিদ। অর্থাৎ, মুয়াবিয়া কোনো সাধারণ ঐতিহাসিক চরিত্র নন, বরং ইসলামি আকীদা ও আইনের দৃষ্টিতে অত্যন্ত প্রামাণিক এবং আদর্শস্থানীয় একজন ব্যক্তিত্ব।
ইসলামের ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব এই মু’আবিয়ার আমল এবং চরিত্র বিশ্লেষণের পূর্বে সেই সময়ের সামাজিক প্রেক্ষাপট, বিশেষ করে দাসপ্রথা এবং দাসীদের অবস্থান অনুধাবন করা অপরিহার্য। সপ্তম শতাব্দীর আরব সমাজে অর্থাৎ ইসলামি যুগেও দাসপ্রথা ছিল একটি অবিচ্ছেদ্য অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান। যুদ্ধবন্দী বা কেনা দাসীদের (বাঁদী) আইনগত অবস্থান ছিল স্রেফ ‘মালিকানাধীন পণ্য’ বা সম্পত্তির মতো। স্বাধীন মুসলিম নারীদের জন্য পর্দা বা আব্রুর যে কঠোর বিধান ইসলামে নির্ধারিত ছিল, দাসীদের ক্ষেত্রে তা ছিল সম্পূর্ণ শিথিল। বিভিন্ন ফিকহী গ্রন্থে দাসীদের ‘সতর’ বা ঢেকে রাখার অংশের সীমা স্বাধীন নারীর তুলনায় অত্যন্ত কম নির্ধারণ করা হয়েছে। এই প্রবন্ধের মূল আলোচনার বিষয়বস্তু—অর্থাৎ মুয়াবিয়ার দরবারে দাসীদের নগ্ন অবস্থায় উপস্থাপন—বোঝার জন্য তৎকালীন দাসীদের এই চরম অবমাননাকর আইনি ও সামাজিক অবস্থান সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা প্রয়োজন। এই বিষয়ে আরও বিস্তারিত জানার জন্য এই প্রবন্ধগুলো পড়ে দেখতে পারেন [1] [2] [3]।
সাহাবীগণের সমালোচনা-নিষেধ এবং সত্য অনুসন্ধানে প্রতিবন্ধকতা
মূল আলোচনায় প্রবেশের আগে ইসলামের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক বিশ্বাস বা ‘আকীদা’ সম্পর্কে জেনে নেওয়া প্রয়োজন। ইসলামি ধর্মতত্ত্বের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে সাহাবীগণের মর্যাদা রক্ষার বিধান। প্রচলিত ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, নবীর সাহাবীগণের চরিত্র, কর্ম বা কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচনা করা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। অনেক আলেম একে ‘আদালাতুল সাহাবা’ বা সাহাবীগণের ন্যায়পরায়ণতা হিসেবে অভিহিত করেন, যার অর্থ হলো—তাদের কর্মে কোনো নৈতিক ত্রুটি থাকলেও তা সাধারণ মানুষের মতো বিচার্য নয়। আসুন এই বিষয়ে ইসলামের অবস্থান শুরুতেই কী তা জেনে নেয়া যাক,
সমালোচনার পথ রুদ্ধ করে দেওয়ার বিষয়টি বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস চর্চার ক্ষেত্রে এক বিশাল অন্তরায়। যখন কোনো ঐতিহাসিক চরিত্র বা মতবাদের ওপর থেকে পর্যালোচনার অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়, তখন সেই ব্যক্তি বা ঘটনা সম্পর্কে সত্য জানার পথটিও মূলত বন্ধ হয়ে যায়। ইতিহাসের পাতায় সাহাবীগণের হাজারো দোষ, বিচ্যুতি বা নৈতিক স্খলনের তথ্য-প্রমাণ থাকলেও, একজন একনিষ্ঠ মুসলিম প্রায়ই ঈমান হারাবার ভয়ে সেগুলো গ্রহণ করতে পারেন না। ফলে অনেক সময় অকাট্য যুক্তি ও তথ্য সামনে থাকার পরেও তারা নানা ধরণের অদ্ভুত ও লজিকহীন অজুহাত দিয়ে সেগুলো অস্বীকার করেন অথবা সেগুলোকে ‘অন্ধ বিশ্বাস’ দিয়ে ঢেকে রাখার চেষ্টা করেন। সত্য ও মিথ্যার এই লড়াইয়ে বিশ্বাসের কাছে যুক্তির পরাজয় ঘটে, যা ইতিহাসের এক অন্ধকার দিককেই নির্দেশ করে।
আমীর মুয়াবিয়ার ধর্মীয় মর্যাদা ও উচ্চ মাকাম
হযরত আমীর মুয়াবিয়া কেবল একজন পরাক্রমশালী সম্রাটই ছিলেন না, বরং ইসলামের প্রাথমিক যুগে তার ধর্মীয় অবস্থান ছিল অত্যন্ত মজবুত। তিনি ছিলেন নবী মুহাম্মদের শ্যালক এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ সাহাবীদের একজন। তার বোন উম্মে হাবিবা ছিলেন উম্মুল মুমিনীন। ইসলামের প্রামাণিক হাদিস গ্রন্থগুলোতে মুয়াবিয়ার মাহাত্ম্য এবং তাঁর প্রতি নবীর বিশেষ অনুগ্রহের বর্ণনা পাওয়া যায়। বেশ কিছু সহীহ বর্ণনায় দেখা যায়, নবী মুহাম্মদ মুয়াবিয়ার হেদায়েত এবং তার মাধ্যমে অন্যকে হেদায়েত দান করার জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছিলেন।
সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত)
৪৬/ রাসূলুল্লাহ ﷺ ও তার সাহাবীগণের মর্যাদা
পরিচ্ছেদঃ ৪৮. মু’আবিয়াহ ইবনু আবী সুফইয়ান (রাযিঃ)-এর মর্যাদা
৩৮৪২। আবদুর রহমান ইবনু আবী উমাইরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবী ছিলেন; নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মু’আবিয়া (রাযিঃ)-এর জন্য দু’আ করেনঃ “হে আল্লাহ! তুমি তাকে পথপ্রদর্শক ও হেদায়াতপ্রাপ্ত বানাও এবং তার মাধ্যমে (মানুষকে) সৎপথ দেখাও।
সহীহঃ মিশকাত (৬২৪৪), সহীহাহ (১৯৬৯)।
আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান গারীব।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুর রহমান ইবনু আবূ ‘আমীরাহ্ (রাঃ)
সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত)
৪৬/ রাসূলুল্লাহ ﷺ ও তার সাহাবীগণের মর্যাদা
পরিচ্ছেদঃ ৪৮. মু’আবিয়াহ ইবনু আবী সুফইয়ান (রাযিঃ)-এর মর্যাদা
৩৮৪৩। আবূ ইদরীস আল-খাওলানী (রহঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, “উমর ইবনুল খাত্তাব (রাযিঃ) যখন উমাইর ইবনু সা’দ (রাযিঃ)-কে পদচ্যুত করে সে পদে মু’আবিয়াহ (রাযিঃ)-কে হিমসের গভর্নর নিযুক্ত করলেন তখন লোকেরা বলল, তিনি উমাইরকে পদচ্যুত করে সেই পদে মু’আবিয়াহকে শাসক নিযুক্ত করেছেন। উমাইর (রাযিঃ) বলেন, তোমরা মু’আবিয়াহকে ভালভাবে স্মরণ কর। কেননা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে আমি বলতে শুনেছিঃ হে আল্লাহ! তুমি তার মাধ্যমে (লোকদের) পথ দেখাও।
পূর্বের হাদীসের সহায়তায় সহীহ।
আবূ ঈসা বলেন, হাদীসটি গারীব। আমর ইবনু ওয়াকিদকে দুর্বল মনে করা হয়।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবু ইদরিস খাওলানী (রাঃ)
এসব বর্ণনার বাইরেও তাঁর পাণ্ডিত্য এবং প্রজ্ঞার প্রশংসা করা হয়েছে। সহীহ বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে যে, স্বয়ং ইবনু ‘আব্বাস (রা.)-এর মতো বিজ্ঞ সাহাবী মুয়াবিয়াকে একজন ‘ফকীহ’ বা ইসলামি আইনবিদ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। এর অর্থ হলো, মুয়াবিয়ার প্রতিটি কাজ বা সিদ্ধান্তের পেছনে ইসলামি শরীয়তের গভীর জ্ঞান কাজ করতো বলে তৎকালীন উচ্চপদস্থ সাহাবীরা মনে করতেন।
হাদীস সম্ভার
২৬/ ফাযায়েল
পরিচ্ছেদঃ মুআবিয়া (রাঃ) এর মাহাত্ম্য
(২৮৯২) ইরবায বিন সারিয়াহ সুলামী (রাঃ) বলেন, আমি শুনেছি, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, হে আল্লাহ! তুমি মুআবিয়াকে কিতাব ও হিসাব শিক্ষা দাও এবং আযাব থেকে রক্ষা কর।
(আহমাদ ১৭১৫২, ত্বাবারানীর কাবীর ৬২৮, সিঃ সহীহাহ ৩২২৭)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ ইরবায ইবনু সারিয়াহ্ (রাঃ)
একইসাথে জানা যায়, মু‘আবিয়াহ ছিলেন উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন সাহাবী এবং ফকীহ।
সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৬২/ সাহাবীগণ [রাযিয়াল্লাহ ‘আনহুম]-এর মর্যাদা
পরিচ্ছেদঃ ৬২/২৮. মু‘আবিয়াহ (রাঃ)-এর উল্লেখ।
৩৭৬৫. ইবনু আবূ মুলায়কাহ (রহ.) হতে বর্ণিত। ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ)-কে বলা হল, আপনি আমীরুল মু’মিনীন মু‘আবিয়াহ (রাঃ)-এর সঙ্গে এ বিষয় আলাপ করবেন কি? যেহেতু তিনি বিতর সালাত এক রাক‘আত আদায় করেছেন। ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) বললেন, তিনি ঠিকই করেছেন, কারণ তিনি নিজেই একজন ফকীহ্। (৩৭৬৪) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ৩৪৮২, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৩৪৯০)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ ইবন আবূ মুলায়কা (রহঃ)
মুয়াবিয়ার এই উচ্চ মর্যাদা এবং ধর্মীয় পাণ্ডিত্যই তাঁকে মুসলিম উম্মাহর কাছে একজন আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। কিন্তু যখন আমরা তাঁর ব্যক্তিগত দরবারের কিছু ঘটনার দিকে নজর দেই, তখন সেই ‘মর্যাদা’র সাথে নৈতিকতার এক চরম সংঘাতের চিত্র ফুটে ওঠে। প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ইবনে কাসীরের ‘আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া’ এবং ইবনে আসাকিরের মতো প্রামাণিক সূত্রগুলো এমন এক ঘটনার সাক্ষী দেয়, যা একজন সাধারণ মানুষের চোখেও চরম কুরুচিপূর্ণ এবং অবমাননাকর। খলিফা মুয়াবিয়ার দরবারে দাসীদেরকে যেভাবে উপস্থাপন করা হতো এবং তিনি যেভাবে তাদের শারীরিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নিয়ে মন্তব্য করতেন, তা ইসলামি ইতিহাসে এক বড় ধরণের নৈতিক প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়।
মুয়াবিয়ার দরবারে নগ্ন দাসী এবং দণ্ড দিয়ে গোপনাঙ্গ নির্দেশ
ইসলামি ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব এবং নবীর শ্যালক হিসেবে পরিচিত এই মু’আবিয়ার ব্যক্তিগত জীবনের কিছু দিক আমাদের প্রচলিত নৈতিক ধারণাকে চরমভাবে আঘাত করে। প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ইবনে কাসীরের ‘আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া’ এবং ইবনে আসাকিরের মতো নির্ভরযোগ্য গ্রন্থগুলো থেকে জানা যায় যে, খলিফা মু’আবিয়ার দরবারে দাসীদের অত্যন্ত কদর্যভাবে উপস্থাপন করা হতো। একটি বিশেষ বর্ণনায় দেখা যায়, মু’আবিয়া একবার এক সুন্দরী ও ফর্সা দাসী ক্রয় করেছিলেন। এরপর সেই দাসীকে সম্পূর্ণ বিবস্ত্র বা নগ্ন অবস্থায় তার সামনে আনা হয়।
সে সময় খলিফা মু’আবিয়ার হাতে একটি দণ্ড বা লাঠি ছিল। তিনি সেই দণ্ড দিয়ে দাসীটির বিশেষ অঙ্গ বা গোপনাঙ্গের দিকে নির্দেশ করে বিস্ময়কর এক মন্তব্য করেন। তিনি বলেছিলেন, “এই সম্ভোগ অঙ্গ যদি আমার হতো!” এরপর তিনি সেই নগ্ন দাসীটিকে তাঁর পুত্র ইয়াযীদের কাছে পাঠিয়ে দেওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেন। আসুন পুরো বিবরণটি পড়ি,
ইবনে আসাকির হযরত মু’আবিয়ায় আযাদকৃত গোলাম খোঁঁজা খাদীজের জীবনী আলোচনা প্রসঙ্গে তার উদ্ধৃতিতে উল্লেখ করেছেন,
(একবার) মু আবিরা (বা) একটি সুন্দরী ও ফর্সা বঁদী খরিদ করলেন, এরপর আমি তাকে বিবস্ত্র অবস্থায় তার সামনে পেশ করলাম, এ সময় তার হাতে একটি দণ্ড ছিল৷ তিনি তা দ্বারা তার বিশেষ অঙ্গের প্রতি নির্দেশ করে বলেন, এই সম্ভোগ অঙ্গ যদি আমার হত! তুমি তাকে ইয়াযীদ বিন মু’আবিয়ার কাছে নিয়ে যাও৷
… রাবী যখন তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করলেন, তখন তিনি তাকে বলেন, এই বাদীকে বিবস্ত্র অবস্থায় আমার সামনে আনা হয়েছে এবং আমি তার বিশেষ বিশেষ অঙ্গ দেখেছি, এখন আমি তাকে ইয়াযীদের কাছে পাঠাতে চাই৷ তিনি বললেন, না৷ আমীরুল মু’মিনীন ! আপনি তা করবেন না৷ কেননা, সে তার জন্য আর হালাল হবে না ৷ তিনি বলেন, তুমি অতি উত্তম রায় প্রদান করেছ৷
রাবী বলেন, এরপর তিনি হযরত ফতিমা (রা)-এর আযাদকৃত গোলাম আবদুল্লাহ বিন মাসআদা আল ফাযারীকে বাঁদীটি দান করেন৷ আর সে ছিল কৃষ্ণাঙ্গ, তইি তিনি তাকে বলেন, এর মাধ্যমে তোমার সন্তানাদিকে ফর্সা করে নাও৷ এ ঘটনা হযরত মুআবিয়ার ধর্মীয় বিচক্ষণতা ও অনুসন্ধিৎসার পরিচায়ক৷ যেহেতু তিনি কামভাবের সাথে বীদীটির দিকে তাকিয়ে ছিলেন৷ কিন্তু তাব ব্যাপারে নিজেকে দুর্বল গণ্য করেন (এবং তাকে গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকেন) তাই তিনি নিম্নের আয়াতের কারণে বাঁদীটি তার পুত্র ইয়াযীদকে দান করা থেকে বিরত থেকেছেন।
আসুন সরাসরি বই থেকেই এই অংশটুকু দেখে নিই, [4]


এই ঘটনার বিবরণে আরও জানা যায় যে, জনৈক রাবী বা বর্ণনাকারী যখন মু’আবিয়াকে বাধা দেন এবং জানান যে, যেহেতু মু’আবিয়া নিজেই সেই দাসীর নগ্ন দেহ এবং বিশেষ অঙ্গ কামভাব নিয়ে দেখেছেন, তাই সে তার পুত্র ইয়াযীদের জন্য আর হালাল বা বৈধ থাকবে না। এই কথা শুনে মু’আবিয়া তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন এবং দাসীটিকে তাঁর এক আযাদকৃত গোলামকে দান করে দেন।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, ইবনে কাসীরের মতো বড় মাপের আলেম এই পুরো ঘটনাটিকে মু’আবিয়ার ‘ধর্মীয় বিচক্ষণতা’ ও ‘অনুসন্ধিৎসা’র পরিচায়ক হিসেবে বর্ণনা করেছেন। কারণ তিনি কামভাব নিয়ে তাকালেও শেষ পর্যন্ত শরীয়তের বিধি মেনে দাসীটিকে তার ছেলের কাছে পাঠাননি। কিন্তু একজন সাধারণ মানুষের বিবেক ও নৈতিকতা এখানে প্রশ্ন তুলতে বাধ্য—যেখানে সাধারণ মুসলিম নারীদের এক চুল চুল দেখানোও বড় গুনাহ, সেখানে ইসলামের একজন ‘ফকীহ’ খলিফা কীভাবে পরকীয় এক দাসীকে নগ্ন করে তাঁর গোপনাঙ্গে লাঠি ঠেকিয়ে কামুক মন্তব্য করতে পারেন? এটি কি কেবল তৎকালীন সমাজের চিত্র, নাকি ইসলামের পাতায় লুকিয়ে থাকা এক গভীর নৈতিক সংকটের প্রতিফলন?
উপসংহারঃ ধর্মীয় আবরণের আড়ালে এক নিষ্ঠুর বাস্তবতা
ইসলামি ইতিহাসের এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়টি যখন আমরা ব্যবচ্ছেদ করি, তখন এক চরম বৈপরীত্য ও নৈতিক সংকটের চিত্র স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। একদিকে আমীর মুয়াবিয়াকে নবীর শ্যালক, ‘হিসাব ও কিতাব’ বিশেষজ্ঞ এবং ‘ফকীহ’ বা আইনবিশারদ হিসেবে উচ্চাসনে বসানো হয়েছে। অন্যদিকে, তাঁরই দরবারে একজন অসহায় দাসীকে নগ্ন অবস্থায় উপস্থাপন করা এবং তাঁর হাতে থাকা দণ্ড দিয়ে সেই নারীর গোপনাঙ্গ নির্দেশ করে কামুক মন্তব্য করা—এই দুটি বিষয় কোনোভাবেই একসাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে না।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই ঘটনাগুলো কোনো ইসলামবিদ্বেষী লেখকের কল্পনা নয়, বরং ইবনে কাসীরের মতো প্রখ্যাত এবং রক্ষণশীল আলেমদের কিতাব থেকেই সংগৃহীত। যখন বলা হয় যে, সাহাবীগণের সমালোচনা করা যাবে না, তখন মূলত এই ধরণের ঐতিহাসিক সত্যগুলোকে এক ধরণের অন্ধ বিশ্বাসের চাদর দিয়ে ঢেকে ফেলার চেষ্টা করা হয়। একজন সাধারণ মুমিনের কাছে নিজের ঈমান টিকিয়ে রাখাই যেখানে প্রধান লক্ষ্য, সেখানে তাঁর পক্ষে এই ধরণের অকাট্য দালিলিক প্রমাণ মেনে নেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। ফলে তারা যুক্তির চেয়েও অন্ধ আনুগত্যকে বেশি প্রাধান্য দেন।
যৌক্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ইসলামের তথাকথিত ‘স্বর্ণযুগে’ পর্দার বিধানটি আসলে সব নারীর জন্য ‘সুরক্ষা’ বা ‘মর্যাদা’র প্রতীক ছিল না। বরং এটি ছিল স্রেফ একটি শ্রেণি-বৈষম্যের হাতিয়ার। স্বাধীন মুসলিম নারীদের বেলায় যেখানে সামান্যতম পর্দা লঙ্ঘনে কঠিন শাস্তির বিধান ছিল, সেখানে খলিফার দরবারে একজন দাসীকে পশুর মতো নগ্ন করে তাঁর দেহের ওপর মালিকের নিরঙ্কুশ আধিপত্য প্রদর্শিত হতো। মুয়াবিয়ার এই আচরণ এটিই প্রমাণ করে যে, তৎকালীন ইসলামি সমাজে দাসীদের কোনো মানবিক মর্যাদা বা লজ্জাবোধের অধিকার স্বীকৃত ছিল না; বরং তারা ছিল কেবল সম্ভোগের সামগ্রী।
পরিশেষে বলা যায়, ইসলামের গৌরবময় ইতিহাসের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এই ধরণের সত্যগুলো চাইলেই কোনো ফতোয়া বা ‘সমালোচনা হারাম’ তকমা দিয়ে মুছে ফেলা সম্ভব নয়। ইতিহাসের পাতায় মুয়াবিয়ার সেই দণ্ড আর নগ্ন দাসীর ক্রন্দন এক অম্লান সাক্ষী হিসেবে থেকে যাবে যে, ক্ষমতার শিখরে থাকা ব্যক্তিরা ধর্মের দোহাই দিয়ে কীভাবে মানবিক মূল্যবোধকে পদদলিত করেছিলেন। নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে দেখলে বোঝা যায়, ধর্মের এই তথাকথিত পবিত্রতার আড়ালে লুকিয়ে আছে অসংখ্য অন্ধকার দিক, যা ইতিহাসের নির্মোহ পাঠেই কেবল উন্মোচিত হওয়া সম্ভব।
তথ্যসূত্রঃ
- ইসলাম অনুসারে ক্রীতদাসীর সতর বা পর্দা নাভী থেকে হাঁটু পর্যন্ত ↩︎
- উমর রাস্তায় দাসীদের পেটাতেন এবং ঘরেও নগ্ন দাসী রাখতেন ↩︎
- ইসলামে দাসী-ধর্ষণঃ দাসী সহবাসে কি সম্মতি জরুরি? ↩︎
- আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ইবনে কাসীর, খণ্ড ৮, পৃষ্ঠা ২৬৬ ↩︎

এই লা মঝাবি জাকারিয়া একজন এযিদি, সে যত বড় এযিদি শাইখ হোক সে রাসুল বিদ্দেসি এযিদের বন্ধু।