
Table of Contents
ভূমিকা
কোরআনের “জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি” প্রসঙ্গকে ইসলামী সাহিত্য ও সমকালীন এপোলজেটিক্সে প্রায়ই বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। একদিকে ক্লাসিক্যাল তাফসীরকারেরা এই আয়াতগুলোকে সাধারণত নারী–পুরুষ, উদ্ভিদ–প্রাণী ও অন্যান্য সৃষ্টির দ্বৈত কাঠামোর ভাষ্য হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন; অন্যদিকে আধুনিক অনেক দাঈ ও লেখক এই দ্বৈততাকে ম্যাটার–এন্টিম্যাটার বা সমসাময়িক বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের সঙ্গে মিলিয়ে “অলৌকিক” পূর্বজ্ঞান হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেন। ফলত, একটি ধর্মীয় ভাষ্য কীভাবে পরবর্তীকালে বিজ্ঞান-সংক্রান্ত দাবিতে রূপান্তরিত হয়—এই প্রশ্নটি সমালোচনামূলক আলোচনার দাবি রাখে।
এই প্রবন্ধে মূলত দুইটি বিষয় পরীক্ষা করা হয়েছে। প্রথমত, ক্লাসিক্যাল তাফসীরগ্রন্থ—যেমন তাফসীরে জালালাইন ও ইবনে কাসীর—এই আয়াতগুলোর অর্থ নির্ধারণের সময় ঠিক কী ধরনের “জোড়া” ধারণা সামনে এনেছে, তা পাঠ-ভিত্তিকভাবে দেখা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, আধুনিক জীববিজ্ঞান ও উদ্ভিদবিজ্ঞানের আলোকে “প্রত্যেক বস্তু” বা “প্রত্যেক প্রাণী”কে কেবল পুরুষ–নারী বা দ্বৈত-যুগলের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখা আদৌ বাস্তবসম্মত কি না, তা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। পাশাপাশি, চীনা ইন–ইয়াং ন্যায় প্রাচীন দ্বৈত দর্শনের ইতিহাস টেনে দেখানো হয়েছে যে “সকল কিছু জোড়ায় গঠিত”—এই ধারণা ইসলামের বহু আগে থেকেই নানা সংস্কৃতিতে বিদ্যমান ছিল। ফলে কোরআনিক এই ভাষ্যকে কতটা “অদ্বিতীয়” বা “বৈজ্ঞানিক মুজিজা” হিসেবে দেখা যায়, তা পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন রয়েছে।
কোরআনের আয়াত
কোরআনের একাধিক আয়াতে দাবি করা হয়েছে যে পৃথিবীর প্রতিটি বস্তু ও প্রাণীকে স্রষ্টা জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি করেছেন; অর্থাৎ সৃষ্টিজগত নাকি মূলত দ্বৈত বিন্যাসের উপর প্রতিষ্ঠিত। ক্লাসিক্যাল তাফসীরগুলোতে এসব আয়াতের ব্যাখ্যায় সাধারণভাবে বলা হয়, প্রতিটি প্রাণীকে আল্লাহ নারী ও পুরুষ—এই দুই লিঙ্গের যুগল আকারে সৃষ্টি করেছেন। ফলে ‘জোড়া’ ধারণাটি সেখানে শুধু সংখ্যাগত দুই নয়, বরং পুরুষ–নারী বা পরস্পর পরিপূরক বিপরীত সঙ্গী বোঝাতেই ব্যবহৃত হয়েছে। [1] [2] [3]
পূত পবিত্র সেই সত্তা যিনি জোড়া সৃষ্টি করেছেন প্রত্যেকটির যা উৎপন্ন করে যমীন, আর তাদের নিজেদের ভিতরেও আর সে সবেও যা তারা জানে না।
— Taisirul Quran
পবিত্র মহান তিনি,যিনি উদ্ভিদ, মানুষ এবং তারা যাদেরকে জানেনা তাদের প্রত্যেককে সৃষ্টি করেছেন জোড়ায় জোড়ায়।
— Sheikh Mujibur Rahman
পবিত্র ও মহান সে সত্তাযিনি সকল জোড়া জোড়া সৃষ্টি করেছেন, যমীন যা উৎপন্ন করেছে তা থেকে, মানুষের নিজদের মধ্য থেকে এবং সে সব কিছু থেকেও যা তারা জানে না ।
— Rawai Al-bayan
পবিত্র ও মহান তিনি,যিনি সৃষ্টি করেছেন সকল প্রকার সৃষ্টি, যমীন থেকে উৎপন্ন উদ্ভিদ এবং তাদের (মানুষদের) মধ্য থেকেও (পুরুষ ও নারী)। আর তারা যা জানে না তা থেকেও [১]।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
আমিপ্রত্যেকটি বস্তু সৃষ্টি করেছি জোড়ায় জোড়ায়, যাতে তোমরা শিক্ষা গ্রহণ কর।
— Taisirul Quran
আমিপ্রত্যেক বস্তু সৃষ্টি করেছি জোড়ায় জোড়ায়, যাতে তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর।
— Sheikh Mujibur Rahman
আরপ্রত্যেক বস্তু থেকে আমি জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি করেছি। আশা করা যায়, তোমরা উপদেশ গ্রহণ করবে।
— Rawai Al-bayan
আরপ্রত্যেক বস্তু আমরা সৃষ্টি করেছি জোড়ায় জোড়ায় [১], যাতে তোমরা উপদেশ গ্ৰহণ কর।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
তিনি সব কিছুকে জোড়া জোড়া সৃষ্টি করেছেন, আর তোমাদের জন্য নৌযান ও গবাদি পশু সৃষ্টি করেছেন যাতে তোমরা আরোহণ কর,
— Taisirul Quran
এবং যিনি যুগলসমূহের প্রত্যেককে সৃষ্টি করেন এবং যিনি তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেন এমন নৌযান ও চতুস্পদ জন্তু যাতে তোমরা আরোহণ কর –
— Sheikh Mujibur Rahman
আর যিনি সব কিছুই জোড়া জোড়া সৃষ্টি করেছেন এবং তিনি তোমাদের জন্য নৌযান ও গৃহপালিত জন্তু সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা আরোহণ কর,
— Rawai Al-bayan
আর যিনি সকল প্রকারের জোড়া যুগল সৃষ্টি করেছেন এবং যিনি তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন এমন নৌযান ও গৃহপালিত জন্তু যাতে তোমরা আরোহণ কর;
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
অনেক ইসলামিক এপোলজিস্ট বা সমকালীন দাঈ এই আয়াতগুলোর সমালোচনা এড়াতে যুক্তি দেন যে এখানে ‘জোড়ায় জোড়ায়’ বলাতে আসলে নারী-পুরুষ বোঝানো হয়নি, বরং শুধু ‘দুটি’ বা ‘যুগল’—এমন একটি বিমূর্ত গাণিতিক ধারণা বোঝানো হয়েছে। কিন্তু কোরআনের অন্যান্য আয়াত ও সেগুলোর তাফসীরের আলোকে দেখা যায়, এই ব্যাখ্যা টিকিয়ে রাখা কঠিন। ‘জোড়া’ ধারণাটি সেখানে স্পষ্টভাবেই নারী-পুরুষ যুগল কিংবা দুটো পরস্পর বিপরীত অথচ পরিপূরক সত্তাকে ইঙ্গিত করে। এর সরাসরি প্রমাণ পাওয়া যায় অন্য আয়াতগুলোতে, যেখানে জোড়া সৃষ্টি প্রসঙ্গে স্পষ্ট ভাষায় ‘পুরুষ ও নারী’র উল্লেখ রয়েছে। [4] [5]
আর এই যে, তিনিই সৃষ্টি করেন জোড়া- পুরুষ আর নারী,
— Taisirul Quran
আর এই যে, তিনিই সৃষ্টি করেন যুগল পুরুষ ও নারী –
— Sheikh Mujibur Rahman
আর তিনিই যুগল সৃষ্টি করেন- পুরুষ ও নারী।
— Rawai Al-bayan
আর এই যে, তিনিই সৃষ্টি করেন যুগল—পুরুষ ও নারী
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
অতঃপর তা থেকে তিনি সৃষ্টি করলেন জুড়ি- পুরুষ ও নারী।
— Taisirul Quran
অতঃপর তিনি তা হতে সৃষ্টি করেন যুগল নর ও নারী।
— Sheikh Mujibur Rahman
অতঃপর তিনি তা থেকে সৃষ্টি করেন জোড়ায় জোড়ায় পুরুষ ও নারী।
— Rawai Al-bayan
অতঃপর তিনি তা থেকে সৃষ্টি করেন যুগল— নর ও নারী।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria
অতএব ক্লাসিক্যাল ইসলামি ব্যাখ্যার আলোকে ‘প্রত্যেক বস্তু’কে জোড়ায় সৃষ্টি করার দাবি মূলত নারী-পুরুষ কিংবা অনুরূপ দ্বৈত–সঙ্গী ধারণার উপর দাঁড়িয়ে আছে।
তাফসীরে জালালাইন
এখন দেখা দরকার, ক্লাসিক্যাল তাফসীরগ্রন্থগুলোতে এ বক্তব্য কীভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। প্রথমে দেখা যাক তাফসীরে জালালাইন কী বলছে [6] –
৩৬. পবিত্র সেই মহান সত্তা, যিনি সমস্ত জোড়া বা যুগল সৃষ্টি করেছেন—সেসব থেকে যা ভূমি উৎপন্ন করে (শস্য, উদ্ভিদ ইত্যাদি), তাদের নিজেদের (মানুষের) মধ্য থেকে এবং এমন সব সৃষ্টি থেকে যা তারা জানে না (অজ্ঞাত আশ্চর্যজনক সৃষ্টিকুল)।
তাফসীরকারকগণ সাধারণভাবে ‘আযওয়াজ’ (أزواج)-এর ব্যাখ্যা করেছেন ‘প্রকারসমূহ’ বা ‘শ্রেণি’ হিসেবে। কারণ যেভাবে স্ত্রীলিঙ্গ ও পুংলিঙ্গকে পরস্পর যুগল (জোড়া) বলা হয়, তেমনি দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী বস্তুকেও ‘যুগল’ বলা হয়। যেমন—ঠান্ডা-গরম, শুষ্ক-আর্দ্র, আনন্দ-বেদনা, সুস্থতা-অসুস্থতা ইত্যাদি। এগুলোর প্রত্যেকটির আবার উচ্চ, মধ্য ও নিম্নমান অনুযায়ী অনেক স্তর, শ্রেণিবিভাগ ও প্রকারভেদ রয়েছে। অনুরূপভাবে মানুষ ও অন্যান্য জীবজন্তুর মাঝেও বর্ণ, আকার, ভাষা ও জীবনধারণ পদ্ধতির দিক বিবেচনায় অনেক বৈচিত্র্য বিদ্যমান। আয়াতে বর্ণিত যুগল শব্দের মধ্যেও উপরোক্ত সকল শ্রেণিবিভাগ বিদ্যমান রয়েছে। আলোচ্য আয়াতে সর্বপ্রথম ‘মিম্মা তুনবিতুল আরদ’ (যা জমিন উৎপন্ন করে) উল্লেখ করে উদ্ভিদরাজির প্রকারভেদ ও শ্রেণিবিভাগ বর্ণনা করা হয়েছে। এরপর ‘মিন আনফুসিহিম’ (তাদের নিজেদের মধ্য হতে) বলে মানুষের নফসের বা স্বভাবের প্রকরণ বর্ণনা করা হয়েছে। পরিশেষে ‘মিম্মা লা ইয়া’লামুন’-এর মধ্যে অসংখ্য সৃষ্টজীব অন্তর্ভুক্ত রয়েছে যা আজ পর্যন্ত মানুষের জানাজানি হয়নি। ভূ-গর্ভ, সমুদ্রের তলদেশ বা পাহাড়-পর্বতে কত অসংখ্য জীবজন্তু, গাছপালা ও জড় পদার্থ রয়েছে, আল্লাহ তাআলা তার সবকিছুই জানেন।
পরস্পরের জন্য জোড়া হওয়া এবং তাদের মিলনের ফলে নতুন প্রাণের অস্তিত্ব লাভ মহান সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব ও একত্ববাদের অকাট্য প্রমাণ। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন যে, প্রতিটি বস্তুকে তিনি জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি করেছেন। প্রতিটি সৃষ্টিকে তিনি পুরুষ ও স্ত্রী—এই দুই লিঙ্গে এবং বহু শ্রেণিতে বিভক্ত করেছেন; যেমন মানবজাতিকে নারী ও পুরুষ—এই দুই শ্রেণিতে বিভক্ত করেছেন। তাদের মধ্যে দান করেছেন যৌনশক্তি, ভালোবাসা ও একে অপরের প্রতি দুর্বার আকর্ষণ। নারী ও পুরুষ যখন এই প্রীতির বন্ধনে যৌবনের প্রচণ্ড আকর্ষণে মিলিত হয়, তার ফসল হিসেবে পৃথিবীতে নতুন প্রজন্মের আবির্ভাব ঘটে। আর তারা সানন্দে অবর্ণনীয় কষ্ট সহ্য করে এই নতুন প্রজন্মের লালন-পালনের দায়িত্ব গ্রহণ করে। মানবজাতির বংশধারা এভাবেই অব্যাহত রয়েছে এবং থাকবে।
সৃষ্টিজগতের এই সুশৃঙ্খল ধারা অব্যাহত থাকা কি কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনার ফল? নাকি এটি কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই এমনিতেই চলছে? কক্ষনো না। কারণ কোনো দুর্ঘটনা এমন সুশৃঙ্খলভাবে ঘটতে পারে না। একটি সামান্য কাজও পরিকল্পনা ছাড়া সুসম্পন্ন করা যায় না। তবে প্রশ্ন হলো—এই পরিকল্পনাকারী কে? এটি নিশ্চিতভাবেই কোনো সাধারণ মানুষ হতে পারে না; বরং এর পেছনে এক মহাশক্তির হাত রয়েছে। আর সেই সত্তাই হলেন বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহ তাআলা। আমরা আরও দেখতে পাই যে, মহাবিশ্বের সবকিছু একটি সুনির্দিষ্ট নিয়ম-নীতি অনুসরণ করে চলছে; এর কোনো ব্যতিক্রম হচ্ছে না। আর এটিই প্রমাণ করে যে, নিশ্চয়ই এগুলো একমাত্র সত্তারই নিয়ন্ত্রণাধীন। কাজেই জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি করা এবং তাদের মিলনের ফলে নতুন প্রজন্মের আবির্ভাব আল্লাহর অস্তিত্ব ও একত্ববাদকে অকাট্যভাবে প্রমাণ করে।
‘আফালা ইয়াশকরুন’ (أَفَلَا يَشْكُرُونَ)-এর মধ্যস্থ হামযা ও ফা-এর অর্থ: এখানে হামযাটি ‘ইসতিফহাম’ (اِسْتِفْهَامْ) তথা প্রশ্নবোধক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। আর ‘ফা’ (ف) হরফে আত্বফ (সংযোজক অব্যয়) হিসেবে এসেছে, যার ‘মাতুফ আলাইহ’ এখানে উহ্য রয়েছে। বাক্যটির মূল রূপ দাঁড়ায়: ‘আইয়ুনকিরুনা নি’মাতাহু ফালা ইয়াশকরুন’ (أَيُنْكিরُونَ نِعْمَتَهُ فَلَا يَشْكُرُونَ)। অর্থাৎ—তারা কি আল্লাহর নিয়ামতসমূহকে অস্বীকার করে যে, তারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছে না?
আল্লাহর বাণী ‘লা ইয়াশকরুন’ বাক্যটিকে হামযায়ে ইসতিফহামের সাথে বর্ণনা করলেন কেন? এখানে কাফের-মুশরিকদের কার্যকলাপের প্রতি ঘৃণা ও বিস্ময় প্রকাশ করার জন্য ‘ইসতিফহাম’-এর হামযার সাথে বাক্যটিকে ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থাৎ কাফেররা এতই অকৃতজ্ঞ যে, আল্লাহ তাআলা তাদের সুখ-শান্তির জন্য এত সব উপকরণ ও সাজ-সরঞ্জামের ব্যবস্থা করে রেখেছেন, অথচ তারা তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না। যার প্রথম দাবি হচ্ছে তাওহীদে বিশ্বাস করা এবং কুফর ও শিরক পরিত্যাগ করা। বড়ই পরিতাপের বিষয়, সর্বশক্তিমান আল্লাহকে ছেড়ে তারা এমন সব অসার বস্তুর উপাসনায় লিপ্ত, যারা একটি লতাপাতাও তৈরি করতে সক্ষম নয়। এর চেয়ে চরম পথভ্রষ্টতা আর কী হতে পারে?


তাফসীরে ইবনে কাসীর
এরপর একই বিষয়ে ইবনে কাসীর কী ব্যাখ্যা দিয়েছেন তা দেখা যেতে পারে। তিনিও মূলত উদ্ভিদ, প্রাণী ও মানুষের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ দ্বৈততার প্রসঙ্গ টেনে আয়াতটির অর্থ নির্ধারণ করেছেন [7] –
তারা আহার করে; অর্থাৎ তাহাদের ও তাহাদের পশুর রিজিকের ব্যবস্থা করিয়াছি।
وَجَعَلْنَا فِيهَا جَنَّاتٍ مِّن نَّخِيلٍ وَأَعْنَابٍ وَفَجَّرْنَا فِيهَا مِنَ الْعُيُونِ (অনুবাদ: আমি উহাতে খেজুর ও আঙ্গুরের উদ্যান সৃষ্টি করি এবং উহাতে প্রস্রবণ উৎসারিত করি।) অর্থাৎ, যেসব স্থানে প্রয়োজন, আমি সেখানে নহর বা ঝরনা সৃষ্টি করিয়া দেই এবং উহার মাধ্যমে উদ্যান সৃষ্টি করি। আল্লাহ তাআলা প্রথমে ভূমি হইতে ফসল উৎপন্ন করিবার কথা উল্লেখ করিয়াছেন এবং পরে নানা প্রকার ফলমূল সৃষ্টি করিবার কথা উল্লেখ করিয়া বান্দাগণের প্রতি তাঁহার অনুগ্রহের কথা প্রকাশ করিয়াছেন।
لِيَأْكُلُوا مِن ثَمَرِهِ وَمَا عَمِلَتْهُ أَيْدِيهِمْ أَفَلَا يَشْكُرُونَ
(অনুবাদ: যাহাতে তাহারা উহার ফল আহার করিতে পারে। তাহাদের হাত তো ইহা সৃষ্টি করে নাই। তবুও কি তাহারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করিবে না?)
অর্থাৎ, এই ফলমূল সৃষ্টি হওয়া কেবল আল্লাহর অনুগ্রহ; মানুষের শ্রমের কোন অংশ ইহাতে নাই, না আছে তাহাদের প্রচেষ্টার কোন ভূমিকা এবং না আছে এই বিষয়ে তাহাদের কোন ক্ষমতা। হযরত ইবনে আব্বাস ও কাতাদাহ (র) এই তাফসীর করিয়াছেন। আর যেহেতু উল্লেখিত বিষয়ে কেবলমাত্র আল্লাহর অনুগ্রহ কাজ করিয়াছে, এই কারণে ইরশাদ হইয়াছে— أَفَلَا يَشْكُرُونَ (তবুও কি তাহারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করিবে না?)। অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা যে তাহাদিগকে অগণিত নিয়ামত দান করিয়াছেন, তাহারা কি উহার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করিবে না?
ইবনে জারীর (র) বলেন, وَمَا عَمِلَتْهُ أَيْدِيهِمْ-এর ‘মা’ (مَا) শব্দটি এখানে ‘মাউসুলা’ (যা) অর্থেও ব্যবহৃত হইতে পারে। তখন ইবারত বা অর্থ এইরূপ হইবে— لِيَأْكُلُوا مِنْ ثَمَرِهِ وَمَا عَمِلَتْهُ أَيْدِيهِمْ অর্থাৎ, তাহারা যেন উহার ফল হইতে এবং যাহা তাহাদের হাত অর্জন করে (অর্থাৎ চাষাবাদের মাধ্যমে) তাহা হইতে আহার করে। অর্থাৎ যেসব গাছপালা তাহারা নিজ হাতে লাগাইয়াছে এবং উহার জন্য শ্রম ব্যয় করিয়াছে, তাহারা যেন উহার ফলমূল আহার করে। ইবনে জারীর (র) বলেন, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (র)-এর কিরাআতে আয়াতটি এইরূপ— لِيَأْكُلُوا مِنْ ثَمَرِهِ وَمَا عَمِلَتْهُ أَيْدِيهِمْ أَفَلَا يَشْكُرُونَ।
অতঃপর আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
سُبْحَانَ الَّذِي خَلَقَ الْأَزْوَاجَ كُلَّهَا مِمَّا تُنبِتُ الْأَرْضُ
(অনুবাদ: পবিত্র তিনি, যিনি জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি করিয়াছেন উদ্ভিদ—অর্থাৎ ফসল, ফলমূল ও গাছপালা।) وَمِنْ أَنفُسِهِمْ (অনুবাদ: এবং মানুষ হইতেও।) অতঃপর তাহাদিগকে পুরুষ ও নারী—এই দুই প্রকারে সৃষ্টি করিয়াছেন।
وَمِمَّا لَا يَعْلَمُونَ (অনুবাদ: এবং তাহারা যাহাদিগকে জানে না।) অর্থাৎ এমন বহু সৃষ্টি রহিয়াছে যাহাদিগকে তাহারা জানে না। যেমন অন্যত্র ইরশাদ হইয়াছে:
وَمِن كُلِّ شَيْءٍ خَلَقْنَا زَوْجَيْنِ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ
(অনুবাদ: আমি প্রত্যেক জিনিস জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি করিয়াছি, সম্ভবত তোমরা উপদেশ গ্রহণ করিবে।)

আধুনিক জীববিজ্ঞান
এবার জীববিজ্ঞানের প্রাথমিক তথ্যের সাথে এই ধর্মীয় দাবির তুলনা করলে গভীর অসামঞ্জস্য চোখে পড়ে। জীববিজ্ঞানে সুপরিচিত একটি ধারণা হলো পারথেনোজেনেসিস (parthenogenesis)। অপুংজনি বা পারথেনোজেনেসিস হলো অযৌন প্রজননের একটি প্রাকৃতিক রূপ, যেখানে গর্ভাধান ছাড়াই কোনো অনিষিক্ত ডিম্বাণু থেকে সরাসরি ভ্রূণের বিকাশ ঘটে। অর্থাৎ এখানে কোনো পুরুষ গ্যামেটের অংশগ্রহণ নেই। নিচের ছবিতে যে প্রাণীটিকে দেখা যাচ্ছে, সেটি অযৌন প্রজননের মাধ্যমে বংশবিস্তার করে এবং এ প্রজাতির সদস্য সবাই স্ত্রীলিঙ্গ; অর্থাৎ এই প্রজাতিতে কোনো পুরুষ জন্মায় না [8]।

এ ধরনের একক-লিঙ্গ বা অযৌন প্রজননের উদাহরণ আরও বহু প্রাণী ও উদ্ভিদের ক্ষেত্রে পাওয়া যায়। অপুংজনি বা অযৌন জন্মদায়ক জীবের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যায় হাইড্রা, বিভিন্ন নিম্নতর উদ্ভিদ (যেমন ফার্ন), এবং নানা ধরনের অণুজীবকে। হাইড্রা, জেলিফিশসহ অনেক জীব আবার অনুকূল অবস্থায় যৌন প্রজননেও সক্ষম; তবে অনেক সাধারণ জীব যেমন—ব্যাকটেরিয়া, ইস্ট ও অধিকাংশ ছত্রাকের ক্ষেত্রে জীবনের পুরো চক্রই কার্যত অযৌন প্রজননের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। কিছু প্রাণী ও উদ্ভিদ খণ্ডন, কুঁড়ি গঠন ইত্যাদির মাধ্যমে নিজের পুরো দেহ থেকেই নতুন জীব গঠন করতে পারে—যা পুনরুৎপাদনের বিশেষ ধরণ; উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যায় তারা মাছ, পলিপ, জেব্রাফিশ, কিছু গোধা ও স্যালামান্ডারকে। প্রাণীজগতে সাধারণ নিয়ম হলো: গঠন যত সরল, অযৌন পুনরুৎপাদনের ক্ষমতা তত বেশি; জটিল, বিশেষ করে মেরুদণ্ডী প্রাণীর ক্ষেত্রে এ সামর্থ্য খুব সীমিত বা অনুপস্থিত।
উদ্ভিদবিজ্ঞানে একই ধরনের বাস্তবতা দেখা যায়। যারা উদ্ভিদবিদ্যার প্রাথমিক পাঠ নিয়েছেন, তারা স্ব-পরাগায়ন ধারণার সাথে পরিচিত। কোনো ফুলের পরাগরেণু যখন একই ফুলের কিংবা একই উদ্ভিদের অন্য ফুলের গর্ভমুণ্ডে স্থানান্তরিত হয়, তখন তাকে স্ব-পরাগায়ন বলা হয়। উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যায়—সরিষা, ধুতুরা, সন্ধ্যামালতী, শিম, টমেটো ইত্যাদি উদ্ভিদকে। স্ব-পরাগায়নের ফলে উৎপন্ন বীজ থেকে যে নতুন উদ্ভিদ গড়ে ওঠে, তার বৈশিষ্ট্য সাধারণত মাতৃউদ্ভিদের প্রায় হুবহু অনুরূপ হয়। এ ধরনের বহু উদ্ভিদে একই শরীরে পুরুষ ও স্ত্রী অঙ্গ উপস্থিত থাকে; ফলে এখানে পৃথক পুরুষ-নারী গাছের কোনো প্রশ্নই ওঠে না।
ছত্রাক জগতে বিষয়টি আরও বহুমাত্রিক। সিজোফিলাম কমিউন পৃথিবীর সবচেয়ে ব্যাপকভাবে বিস্তৃত ছত্রাকগুলোর একটি, যা এন্টার্কটিকা বাদে সব মহাদেশেই দেখা যায়। এ প্রজাতির ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত ২৮ হাজারেরও বেশি পৃথক ‘লিঙ্গ-টাইপ’ শনাক্ত করা হয়েছে; অর্থাৎ এখানে মাত্র দু’টি লিঙ্গের বদলে অসংখ্য ভিন্ন ভিন্ন সঙ্গীতা-ধরন কাজ করে [9]
উপ-পারমাণবিক কণা ও ‘জোড়া’ তত্ত্বের অসারতা
কোরআনের “সবকিছু জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি” (৫১:৪৯) দাবিটিকে আধুনিক অনেক ইসলাম প্রচারক প্রাণীজগতে এই বক্তব্যের অসারতা বুঝতে পেরে এই আয়াতের অর্থ(যা নবীর আমলে সাহাবীরা বুঝেছিলেন) খানিকটা পরিবর্তন করে বর্তমানে কণা-পদার্থবিজ্ঞানের (Particle Physics) ‘কণা ও প্রতি-কণা’ (Matter and Antimatter) অথবা বিদ্যুৎ চুম্বকীয় বলের ‘পজিটিভ ও নেগেটিভ’ চার্জের সাথে তুলনা করে একটি বৈজ্ঞানিক মোজেজা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চান। উল্লেখ্য যে, ১৯৩০ সালে পল ডিরাক প্রথম কণা ও প্রতি-কণার এই গাণিতিক ধারণা প্রদান করেন [10]। কিন্তু এই ব্যাখ্যার সমস্যাটি হচ্ছে, প্রাচীন তাফসীরকারকগণ কিছু এই আয়াতকে প্রাণী জগতের নারী পুরুষ হিসেবেই বুঝেছিলেন। আরও যেই সমস্যাটি দেখা যায় তা হচ্ছে, আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের মৌলিক সূত্রগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এভাবে ব্যাখ্যা করলেও ইসলামের এই মোজেজার দাবিটি সর্বজনীনভাবে সত্য নয় এবং এর সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক ব্যতিক্রম রয়েছে। নিচে সেগুলো আলোচনা করা হচ্ছে।
বৈদ্যুতিক আধানহীন নিরপেক্ষ কণা (Neutral Particles)
যদি ‘জোড়া’ বলতে বিপরীতমুখী বৈদ্যুতিক আধান বা মেরু (Positive and Negative) বোঝানো হয়, তবে মহাবিশ্বের মৌলিক গঠন উপাদানগুলোর একটি বড় অংশ এই সংজ্ঞার বাইরে পড়ে। পরমাণুর অন্যতম প্রধান উপাদান নিউট্রন (Neutron) সম্পূর্ণ চার্জহীন বা নিরপেক্ষ। এছাড়া মহাবিশ্বে প্রচুর পরিমাণে বিদ্যমান নিউট্রিনো (Neutrino) কণার কোনো বৈদ্যুতিক আধান নেই। যেহেতু এদের কোনো বিপরীত চার্জযুক্ত ‘সাথী’ বা ‘জোড়া’ নেই, তাই “সবকিছু জোড়ায় সৃষ্ট”—এই সাধারণীকরণটি এখানে সরাসরি ব্যর্থ হয়।মৌলিক কণাগুলোর এই শ্রেণিবিন্যাস এবং তাদের চার্জহীন প্রকৃতি পদার্থবিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠিত পাঠ্যপুস্তকে বিশদভাবে বর্ণিত হয়েছে [11]।
স্ব-প্রতিসম কণা (Self-Conjugate Particles)
কণা-পদার্থবিজ্ঞানের স্ট্যান্ডার্ড মডেল অনুযায়ী, অনেক কণা রয়েছে যারা নিজেরাই নিজেদের প্রতি-কণা (Antiparticle)। এদের আলাদা কোনো ‘বিপরীত জোড়া’ নেই। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো ফোটন (Photon) বা আলোক কণা। ফোটনের কোনো আলাদা অ্যান্টি-ফোটন নেই; একটি ফোটন নিজেই নিজের প্রতি-কণা। কোয়ান্টাম মেকানিক্সের ভাষায় এদের ‘strictly neutral’ কণা বলা হয়। ফোটন ছাড়াও Z বোসন (Z boson) এবং হিগস বোসন (Higgs boson) কণাগুলোও নিজেদের প্রতি-কণা হিসেবে কাজ করে [12]।
যদি জগতের প্রতিটি বস্তু বা কণা আলাদা আলাদা জোড়ায় বা বিপরীত সত্তায় সৃষ্টি হতো, তবে এই কণাগুলোর স্বতন্ত্র প্রতি-কণা থাকা আবশ্যক ছিল। কিন্তু বিজ্ঞানে এদের কোনো ‘জোড়া’ বা ‘বিপরীত সত্তা’ নেই, এরা একক ও স্বয়ংসম্পূর্ণ।
গাণিতিক ও যৌক্তিক অসঙ্গতি
যুক্তিবিদ্যার নিয়ম অনুযায়ী, যখন কোনো দাবিতে “সবকিছু” (Universal quantifier) শব্দটি ব্যবহার করা হয়, তখন একটিমাত্র ব্যতিক্রমও সেই দাবিটিকে ভুল প্রমাণ করার জন্য যথেষ্ট। পদার্থবিজ্ঞানে যেখানে নিউট্রন, নিউট্রিনো এবং ফোটনের মতো মৌলিক ও অপরিহার্য কণাগুলো ‘জোড়া’ বা ‘বিপরীত লিঙ্গ/চার্জ’ ধারণার বাইরে, সেখানে “আমি সবকিছু জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি করেছি” (৫১:৪৯)—এই দাবিটি বৈজ্ঞানিকভাবে একটি ভুল এবং অসম্পূর্ণ পর্যবেক্ষণ হিসেবে প্রমাণিত হয়। এটি স্পষ্ট করে যে, আয়াতটি রচনার সময় তৎকালীন মানুষের জ্ঞান কেবল দৃশ্যমান দ্বৈততার (যেমন: দিন-রাত, নর-নারী) মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল এবং তারা উপ-পারমাণবিক স্তরের এই জটিল ও একক অস্তিত্ব সম্পর্কে অবগত ছিল না।
আসুন পুরো বিষয়টি একনজরে দেখে নিই,
কোরআনের “সবকিছু জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি” দাবিটিকে আধুনিক অনেক প্রচারক কণা-পদার্থবিজ্ঞানের ‘কণা ও প্রতি-কণা’ বা চার্জের দ্বৈততার সাথে মিলিয়ে ব্যাখ্যা করেন। কিন্তু আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের মৌলিক সূত্রগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই দাবিটি সর্বজনীনভাবে সত্য নয়।
যদি ‘জোড়া’ বলতে বিপরীতমুখী চার্জ বোঝানো হয়, তবে পরমাণুর অন্যতম প্রধান উপাদান নিউট্রন (Neutron) সম্পূর্ণ চার্জহীন। এছাড়া মহাবিশ্বে কোটি কোটি নিউট্রিনো (Neutrino) রয়েছে যাদের কোনো বিপরীত চার্জযুক্ত ‘সাথী’ বা ‘জোড়া’ নেই। ফলে “সবকিছু জোড়ায় সৃষ্ট”—এই দাবিটি এখানে সরাসরি অচল।
কণা-পদার্থবিজ্ঞানে এমন অনেক কণা আছে যারা নিজেরাই নিজেদের প্রতি-কণা। যেমন: ফটোন (Photon) বা আলোক কণা। ফোটনের কোনো আলাদা ‘বিপরীত জোড়া’ নেই। এছাড়াও Z বোসন এবং হিগস বোসন কণাগুলোও একক ও স্বয়ংসম্পূর্ণ। এদের কোনো স্বতন্ত্র প্রতি-কণা বা ‘জোড়া’র অস্তিত্ব বিজ্ঞান স্বীকার করে না।
যুক্তিবিদ্যার নিয়ম অনুযায়ী, যখন কোনো দাবিতে “সবকিছু” শব্দটি ব্যবহার করা হয়, তখন একটিমাত্র ব্যতিক্রমও সেই দাবিটিকে ভুল প্রমাণ করার জন্য যথেষ্ট। যেখানে নিউট্রন ও ফোটনের মতো অপরিহার্য কণাগুলো জোড়াহীন, সেখানে এই ধর্মীয় দাবিটি একটি অসম্পূর্ণ ও ভুল পর্যবেক্ষণ মাত্র।
1. Griffiths, D. J. (2008). Introduction to Elementary Particles.
2. CERN: Standard Model of Particle Physics.
3. Dirac, P. A. M. (1930). A Theory of Electrons and Protons.
চীনা ইন ইয়াং দ্বৈত ধারনা

সমসাময়িক ইসলামিক এপোলজিস্টদের একটি বহুল প্রচলিত দাবী হলো, কোরআনের ‘জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি’ সংক্রান্ত আয়াতগুলো আসলে আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের ম্যাটার–এন্টিম্যাটার ধারণাকে ইঙ্গিত করে। তাদের যুক্তি, সপ্তম শতাব্দীর আরব সমাজে এ ধরনের বৈজ্ঞানিক ধারণা কারও জানার কথা নয়; অতএব এ আয়াতগুলো নাকি অলৌকিক পূর্বজ্ঞানের প্রমাণ। কিন্তু দ্বৈততা বা জোড়ার ধারণা মানবচিন্তায় অত্যন্ত প্রাচীন, এবং শুধুই পুরুষ–নারী নয়, বরং বিশ্ববিন্যাসের মৌলিক নীতি হিসেবে ‘বিপরীত কিন্তু পরস্পর নির্ভরশীল জোড়া’—এই ধারণা বহু সংস্কৃতিতে বহু আগে থেকেই বিদ্যমান।
প্রাচীন চীনা দর্শনে ‘ইন’ ও ‘ইয়াং’ (Yin–Yang) নামেই সৃষ্টির এই দ্বৈত নীতি সুপরিচিত; এটি তাওবাদী বিশ্বদর্শনের কেন্দ্রীয় উপাদান। আলো–অন্ধকার, উষ্ণ–শীতল, পুরুষ–নারী, সক্রিয়–নিষ্ক্রিয়—এভাবে প্রায় সব কিছুকেই সেখানে যুগল বিপরীতের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা হয়। বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ ও ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ থেকে ধারণা করা হয়, ইন-ইয়াং চিহ্ন ও ধারণা খ্রিষ্টপূর্ব কমপক্ষে পঞ্চম শতাব্দী থেকে প্রচলিত ছিল এবং সাং রাজবংশের যুগে ব্রোঞ্জ নির্মিত বস্তুতেও এর উপস্থিতি দেখা যায়; তবে ধারণাটির শিকড় এরও আগে প্রসারিত [13]।
খ্রিষ্টপূর্ব ২৬৯৮ সাল থেকে ২৫৯৮ সাল পর্যন্ত শাসন করা এবং হান চীনাদের পূর্বপুরুষ লিজেন্ডারি চীনা সম্রাট বলেছেন, ‘ইং এবং ইয়াং এর নীতি পুরো মহাবিশ্বের মূল। এটি প্রত্যেক সৃষ্টির অধীন। এটি অভিভাবকত্বের অগ্রগতি নিয়ে আসে। এটি জীবন এবং মৃত্যুর মূল ও উৎস।
ঐতিহাসিক ও তুলনামূলক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, ‘দ্বৈত নীতি’ বা ‘সকল কিছু জোড়ায় গঠিত’—এই ধরনের চিন্তা ইসলামি গ্রন্থের বহু আগে থেকেই বিভিন্ন সংস্কৃতি ও দর্শনে সুপ্রতিষ্ঠিত ছিল। সুতরাং এই ধারণার ক্ষেত্রে নতুন বা একমাত্রিক কৃতিত্ব দাবী করলে তা ইতিহাসসম্মত হয় না। যদি ‘জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি’ ধারণাটির জন্য কারও কাছে ক্রেডিট দিতে হয়, তাহলে যুক্তিসঙ্গতভাবে তা প্রাচীন চীনা ও অন্যান্য পূর্ববর্তী ধারনার দিকেই যাবে; আল্লাহ বা মুহাম্মদকে এ ধারণার মৌলিক উৎস বলা ঐতিহাসিক তথ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
উপসংহার
উপরের আলোচনায় প্রথমে দেখা গেল, ক্লাসিক্যাল তাফসীরকারেরা “জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি” ধারণাকে মূলত উদ্ভিদ, প্রাণী ও মানুষের নারী–পুরুষ দ্বৈততার মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেছেন। অর্থাৎ এখানে ‘জোড়া’ বলতে শুধুই বিমূর্ত “দুটি” বোঝানো হয়নি; বরং স্পষ্টভাবে লিঙ্গ-ভিত্তিক যুগল বা একে অপরের পরিপূরক বিপরীত সত্তা বোঝানো হয়েছে। পরবর্তীকালে আধুনিক এপোলজেটিক্স এই ভাষ্যকে কখনো জীববিজ্ঞানের সাধারণ দ্বৈততা, কখনো আবার ম্যাটার–এন্টিম্যাটারের মত জটিল পদার্থবিজ্ঞানীয় ধারণার সঙ্গে জুড়ে “বৈজ্ঞানিক পূর্বজ্ঞান” দাবিতে পরিণত করেছে—যা ঐতিহাসিক পাঠের সঙ্গে খুব সহজে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
অন্যদিকে, জীববিজ্ঞান ও উদ্ভিদবিজ্ঞানের তথ্য দেখায় যে “প্রত্যেক সৃষ্টি”কে সরলভাবে পুরুষ–নারী বা দ্বৈত-যুগলের কাঠামোর মধ্যে বন্দি করা বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খায় না। পারথেনোজেনেসিস, স্ব-পরাগায়ন, বহুলিঙ্গীয় ছত্রাক-প্রজাতি বা অযৌন প্রজননের বিভিন্ন ধরন—সবই প্রমাণ করে যে প্রকৃতিতে লিঙ্গ ও প্রজননব্যবস্থা অত্যন্ত বহুবিধ এবং বহু ক্ষেত্রে “পুরুষ–নারী জোড়া” ধারণা একেবারেই প্রযোজ্য নয়। অতএব “সবকিছুকে জোড়ায় সৃষ্টি করা হয়েছে”—এই ধরনের সর্বজনীন দাবিকে প্রকৃতিবিদ্যার মানদণ্ডে তথ্যগতভাবে সঠিক বলা কঠিন।
শেষত, দ্বৈত নীতির ধারণা কেবল কোরআনিক আয়াতে সীমাবদ্ধ নয়; চীনা ইন–ইয়াং মতবাদসহ প্রাচীন বিশ্বের নানা দর্শনেই “বিপরীত কিন্তু পরস্পর নির্ভরশীল জোড়া” ধারণাটি গভীরভাবে বিকশিত হয়েছিল। এই দৃষ্টিকোণ থেকে “জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি” ধারণাটিকে অনন্য, অদ্বিতীয় বা অলৌকিক বলে দাবি করলে তা ইতিহাস, দর্শন ও বিজ্ঞান—এই তিন ক্ষেত্রেরই প্রমাণের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে। বরং এসব তথ্য-উপাত্ত মিলিয়ে যে সিদ্ধান্তে আসা যায়, তা হলো—এটি একটি প্রাচীন ধর্মীয়-দার্শনিক ভাষ্য, যার সীমাবদ্ধতা ও প্রাসঙ্গিকতা বুঝতে হলে সেটিকে সমকালীন বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের তুলনায় সমালোচনামূলকভাবে মূল্যায়ন করাই বেশি বোধগম্য পদ্ধতি।
তথ্যসূত্রঃ
- সূরা ইয়াসিন, আয়াত ৩৬ ↩︎
- সূরা যারিয়াত, আয়াত ৪৯ ↩︎
- সূরা যুখরুফ, আয়াত ১২ ↩︎
- সূরা নজম, আয়াত ৪৫ ↩︎
- সূরা আল কিয়ামাহ, আয়াত ৩৯ ↩︎
- তাফসীরে জালালাইন, পঞ্চম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৩৬-৩৩৯ ↩︎
- তাফসীরে ইবনে কাসীর, নবম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৫৫ ↩︎
- New Mexico whiptail ↩︎
- Prof. Tom Volk, “Schizophyllum commune, the split gill fungus“, University of Wisconsin, February 2000. ↩︎
- Dirac, P. A. M. (1930). “A Theory of Electrons and Protons” ↩︎
- Griffiths, David J. (2008). Introduction to Elementary Particles ↩︎
- Standard Model of Particle Physics, CERN ↩︎
- Ray Wood, “Yin and Yang“, Taichido, accessed February 14, 2011 ↩︎
