ইসলামি শরীয়তে অসহায় প্রানি হত্যার অমানবিক বিধান

ভূমিকা

ইসলামী বক্তা ও অপোলজিস্টরা প্রায়শই দাবি করেন যে, মুহাম্মদ ছিলেন ‘তামাম জগতের জন্য রহমত’ বা দয়া স্বরূপ [1]। কিন্তু ইতিহাস এবং সহীহ হাদিসের পাতাগুলো ভিন্ন এক ভয়াবহ সত্যের সাক্ষী দেয়। মুহাম্মদের রাজনৈতিক ও সামরিক উত্থানের ইতিহাস কেবল শত শত মানুষের রক্তে রঞ্জিত নয়, কিংবা বেসামরিক নারী ও শিশুদের ‘গনিমত’ হিসেবে দাসীবৃত্তিতে বাধ্য করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়—বরং নিরীহ ও অবলা প্রাণীদের প্রতি তাঁর অহেতুক ও পদ্ধতিগত নিষ্ঠুরতা তাকে ইতিহাসের এক নির্দয় চরিত্রে পরিণত করেছে। আজকের দিনে যেখানে প্রাণীদের ‘সংবেদনশীল সত্তা’ (Sentient Beings) হিসেবে গণ্য করে তাদের অধিকার সুরক্ষায় বিশ্বব্যাপী কঠোর আইন তৈরি হচ্ছে, সেখানে মুহাম্মদের আমলের এই মধ্যযুগীয় বর্বরতা কেবল অনৈতিকই নয়, আধুনিক সভ্যতার জন্য এক চরম হুমকি।

ইসলামী শরীয়তে মুহাম্মদের জীবন থেকে নেওয়া এই বিধানগুলো আধুনিক সমাজে কেন বিপজ্জনক, তা নিম্নোক্ত কারণে অত্যন্ত স্পষ্ট:

বৈজ্ঞানিক যুক্তিবাদ
বিবর্তনবিরোধী ও অবৈজ্ঞানিক বিদ্বেষ

যখন কোনো ধর্মতাত্ত্বিক নির্দেশ কেবল গায়ের রঙের ওপর ভিত্তি করে (যেমন কালো কুকুর) কোনো প্রাণীকে ‘শয়তান’ আখ্যা দিয়ে হত্যার প্ররোচনা দেয়, তখন তা সরাসরি বৈজ্ঞানিক যুক্তিবাদকে অস্বীকার করে অন্ধ কুসংস্কারের বীজ বপন করে।

মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব
সহিংসতার স্বাভাবিকীকরণ

একটি নিরীহ প্রাণীকে প্রথম আঘাতেই হত্যার জন্য ‘সওয়াব’ বা পুরস্কারের যে টোপ হাদিসে দেওয়া হয়েছে, তা মানুষের মনোজগতে—বিশেষ করে শিশুদের মনে—সহিংসতার প্রতি এক ধরণের নিষ্ঠুরতা তৈরি করে। এটি সহমর্মিতা ও দয়ার মতো মানবিক গুণাবলিকে বিনাশ করে।

পরিবেশ ও বিজ্ঞান
বাস্তুসংস্থানিক বিপর্যয়

প্রকৃতির প্রতিটি প্রাণীর একটি সুনির্দিষ্ট ভারসাম্য রক্ষা করার ভূমিকা রয়েছে। মুহাম্মদের নির্দেশিত ‘গণহারে প্রাণী নিধন’ কোনো স্বাস্থ্যঝুঁকির সমাধান নয়, বরং এটি একটি অদূরদর্শী ও পরিবেশবিরোধী পদক্ষেপ, যা বাস্তুসংস্থানকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেয়।

অপ্রয়োজনীয় যন্ত্রণা প্রদান বা হত্যা করা যে কোনো মানদণ্ডেই অপরাধ। অথচ মুহাম্মদ নির্দিষ্ট কোনো কারণ ছাড়াই কেবল কুসংস্কার ও ব্যক্তিগত ভীতির বশবর্তী হয়ে কিছু প্রজাতির প্রাণীকে নির্মূল করার যে নির্দেশ দিয়েছিলেন, তা আধুনিক মানবাধিকার ও প্রাণী অধিকারের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। মুহাম্মদ যে শুধু নিজেই এসব অপকর্ম করে গেছেন তাই নয়, তিনি উম্মতদেরও এই কাজ করার নির্দেশ ও উৎসাহ দিয়ে গেছেন, যার ফলাফল হিসেবে ইসলামি শরিয়তে এই বিধানগুলো আইন হিসেবে গণ্য হয়েছে। এই প্রবন্ধের পরবর্তী অংশগুলোতে আমরা ইসলামী মূলধারার দলিলগুলোর মাধ্যমে বিশ্লেষণ করব কীভাবে মুহাম্মদের এই ‘রহমত’ দাবিটি আসলে একটি রক্তক্ষয়ী ও নিষ্ঠুর ধাপ্পাবাজি ছাড়া আর কিছুই ছিল না।


শৈশব ও সহমর্মিতার বিনাশ: ধর্মের নামে সহিংসতার মনস্তত্ত্ব

শৈশব হলো নৈতিক চরিত্র গঠনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। আধুনিক শিশুমনস্তত্ত্ব অনুযায়ী, একটি শিশুর এমপ্যাথি বা সহমর্মিতা বিকাশের প্রথম ধাপ হলো পশুপাখির প্রতি ভালোবাসা এবং তাদের কষ্টের প্রতি সংবেদনশীল হওয়া। জীববিজ্ঞানের দৃষ্টিতে মানুষসহ প্রতিটি প্রাণীই এই পৃথিবীর যৌথ অংশীদার—আমাদের বিবর্তনীয় আত্মীয়। যখন একটি শিশুকে শেখানো হয় যে প্রতিটি প্রাণের মূল্য রয়েছে এবং অকারণে কোনো ক্ষুদ্র প্রাণীকেও কষ্ট দেওয়া অন্যায়, তখন সে বড় হয়ে মানুষের প্রতিও সহনশীল ও সহানুভূতিশীল হতে শেখে।

কিন্তু ইসলামী শরীয়তের কিছু বিশেষ বিধান এই স্বাভাবিক মানবিক বিকাশকে চরমভাবে বাধাগ্রস্ত করে এবং শিশুর মনে নিষ্ঠুরতার বীজ বপন করে:

মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব
সহিংসতার স্বাভাবিকীকরণ ও সওয়াবের টোপ

যখন শিশুকে শেখানো হয় যে টিকটিকিকে এক আঘাতেই মারলে ১০০ সওয়াব পাওয়া যাবে, তখন প্রাণ হরণ তার কাছে একটি ‘লাভজনক ইবাদত’ হয়ে দাঁড়ায়। মনস্তাত্ত্বিক ভাষায় একে বলা হয় ‘সাইকোলজিক্যাল ডিসেনসিটিজেশন’—অর্থাৎ ক্রমাগত সহিংসতার নির্দেশ পেয়ে শিশুর মন অন্যের ব্যথার প্রতি অনুভূতিহীন হয়ে পড়ে।

সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি
প্রাতিষ্ঠানিক ঘৃণা ও কুসংস্কার

গায়ের রঙের ভিত্তিতে কালো কুকুরকে ‘শয়তান’ আখ্যা দিয়ে হত্যার নির্দেশ একটি শিশুর মনে অহেতুক ভীতি ও বিদ্বেষ তৈরি করে। এটি তাকে শেখায় যে, কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই কেবল শারীরিক বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে কাউকে ঘৃণা করা যায়। এই শিক্ষা বড় হয়ে তাকে ভিন্ন মতের মানুষের প্রতি ‘অপরত্ব’ (Othering) লালন করতে উৎসাহিত করে।

নৈতিক অবক্ষয়
প্রাণের মূল্যহ্রাস

যখন শিশু দেখে যে ধর্মের সর্বোচ্চ ব্যক্তি নির্দিষ্ট প্রাণীকে ‘ফাসেক’ বলে নির্বিচারে হত্যার অনুমতি দিচ্ছেন, তখন প্রাণের প্রতি তার সহজাত শ্রদ্ধা বা ‘Sacredness of Life’ লুপ্ত হয়। সে প্রাণকে আর স্বজন হিসেবে নয়, বরং নিজের খেয়ালখুশি বা ধর্মীয় নির্দেশের অধীন এক তুচ্ছ বস্তু হিসেবে দেখতে শুরু করে।

এই ধরণের শিক্ষা মূলত শিশুদের মানবিক বোধকে ভোঁতা করে দিয়ে তাদের মধ্যে এক ধরণের হিংস্র ও অসহিষ্ণু মানসিকতা তৈরি করে। যারা শৈশব থেকে ধর্মের নামে নিরীহ প্রাণী হত্যা করে নেকি কামানোর নেশায় মত্ত হয়, তারা বড় হয়ে সমাজের বৃহত্তর মানবিক সংকটগুলোতে সংবেদনশীল হওয়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। ফলে এই বিধানগুলো কেবল প্রাণীদের জন্যই নয়, বরং একটি সুস্থ ও সহানুভূতিশীল সমাজ বিনির্মাণের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং ক্ষতিকর।


কুকুর ও অন্যান্য প্রাণী নিধনের বিধানের উৎস

আসুন সেই হাদিসগুলো দেখি, যা থেকে বোঝা যায়, নবী মুহাম্মদ কিছু প্রাণীকে কীভাবে মেরে ফেলার নির্দেশ দিয়েছেন [2] [3] [4] [5] [6] [7] [8] [9] [10] [11] [12]

সহীহ বুখারী (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৪৯/ সৃষ্টির সূচনা
‏পরিচ্ছদঃ ১৯৯৯. তোমাদের কারো পানীয় দ্রব্যে মাছি পড়লে ডুবিয়ে দেবে । কেননা তার এক ডানায় রোগ জীবানু থাকে, আর অপরটিতে থাকে আরোগ্যে
৩০৮৯। আবদুল্লাহ ইবনু ইউসুফ (রহঃ) … আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুকুর মেরে ফেলার নির্দেশ দিয়েছেন।’
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

সূনান আবু দাউদ (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ১১/ শিকার প্রসঙ্গে
পরিচ্ছদঃ ৯৯. শিকারে উদ্দেশ্যে বা অন্য কোন প্রয়োজনে কুকুর পোষা।
২৮৩৬. মুসাদ্দআদ (রহঃ) ……….. ‘আবদুল্লাহ্ ইবন মুগাফফাল (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ রাসূলূল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যদি কুকুর আল্লাহ্ তা‘আলার বহুজাতিক সৃষ্টজীবের মাঝে এক জাতীয় সৃষ্টি না হত, তবে আমি তাদের হত্যা করার নির্দেশ দিতাম। এখন তোমরা তাদের থেকে কেবল কালবর্ণের কুকুরকেই হত্যা করবে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

সহীহ বুখারী (তাওহীদ)
অধ্যায়ঃ ৫৯/ সৃষ্টির সূচনা
পরিচ্ছদঃ ৫৯/১৭. পানীয় দ্রব্যে মাছি পড়লে ডুবিয়ে দেবে। কারণ তার এক ডানায় থাকে রোগ, অন্যটিতে থাকে আরোগ্যের উপায়।
৩৩২৩. ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। ‘রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুকুর মেরে ফেলতে আদেশ করেছেন।’ (মুসলিম ২২/১০ হাঃ ১৫৭০, আহমাদ ৫৯৩২) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ৩০৭৭, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৩০৮৬)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

সূনান তিরমিজী (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ২১/ বিবিধ বিধান ও তার উপকারিতা
পরিচ্ছদঃ কুকুর রাখলে কি পরিমান ছাওয়াব হ্রাস পাবে।
১৪৯৫। উবায়দ ইবনু আসবাত ইবনু মুহাম্মদ কুরাশী (রহঃ) … আবদুল্লাহ ইবনু মুগাফফাল রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেদিন খুতবা প্রদানের সময় তাঁর চেহারা থেকে খেজুর গাছের ডাল যারা সরাচ্ছিলেন আমি তাদের একজন ছিলাম। তিনি বলেছিলেন, কুকুর যদিও আল্লাহর সৃষ্ট জাত-গুলোর একটি জাতি না হত তবে আমি তা হত্যা করার হুকুম দিয়ে দিতাম। সুতরাং তোমরা যেগুলা ঘোর কালো বর্ণের সেগুলোকে হত্যা করবে। শিকারের বা শস্যক্ষেত্রের বা চারণের কুকুর ছাড়া অন্য কোন কুকুর যদি কেউ বেঁধে রাখে তবে অবশ্যই তার নেক আমল থেকে প্রতিদিন এক কিরাত করে হ্রাস পাবে। সহীহ, ইবনু মাজাহ ৩২০৫, তিরমিজী হাদিস নম্বরঃ ১৪৮৯ (আল মাদানী প্রকাশনী)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

সহীহ মুসলিম (হাঃ একাডেমী)
অধ্যায়ঃ ২৩। মুসাকাহ (পানি সেচের বিনিময়ে ফসলের একটি অংশ প্রদান)‏
পরিচ্ছদঃ ১০. কুকুর হত্যার আদেশ ও তা রহিত হওয়ার বর্ণনা এবং শিকার করা অথবা ক্ষেত পাহারা বা জীবজন্তু পাহারা বা এ জাতীয় কোন কাজের উদ্দেশে ব্যতীত কুকুর পালন করা হারাম হওয়ার বর্ণনা
৩৯০৯-(৪৪/…) আবূ বকর ইবনু আবূ শাইবাহ্ (রহঃ) ….. ইবনু উমর (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুকুর হত্যা করার নির্দেশ দিয়ে মাদীনার চারপাশে লোক পাঠালেন যাতে কুকুর হত্যা করা হয়। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ৩৮৭২, ইসলামিক সেন্টার ৩৮৭১)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

সহীহ মুসলিম (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ২৩/ মুসাকাত ও মুযারাত (বর্গাচাষ)
পরিচ্ছদঃ ৯. কুকুর হত্যার আদেশ ও তা রহিত হওয়ার বর্ণনা এবং শিকার করা অথবা ক্ষেত পাহারা বা জীবজন্তু পাহারা ও এ জাতীয় কোন কাজের উদ্দেশ্য ব্যতীত কুকুর পালন করা হারাম হওয়ার বর্ণনা
৩৮৭২। আবূ বকর ইবনু আবূ শায়বা (রহঃ) … ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুকুর হত্যা করার নির্দেশ দিলেন। অতঃপর তিনি মদিনার চারপাশে লোক প্রেরণ করলেন যে, কুকুর হত্যা করা হোক।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

সহীহ মুসলিম (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ২৩/ মুসাকাত ও মুযারাত (বর্গাচাষ)
পরিচ্ছদঃ ৯. কুকুর হত্যার আদেশ ও তা রহিত হওয়ার বর্ণনা এবং শিকার করা অথবা ক্ষেত পাহারা বা জীবজন্তু পাহারা ও এ জাতীয় কোন কাজের উদ্দেশ্য ব্যতীত কুকুর পালন করা হারাম হওয়ার বর্ণনা
৩৮৭৩। হুমায়দ ইবনু মাসআদা (রহঃ) … আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুকুর হত্যা করার জন্য হুকুম দিতেন। অতঃপর আমি মদিনার অভ্যন্তরে ও তার চারপাশের কুকুর ধাওয়া করাতাম। আর কোন কুকুরই আমরা না মেরে ছেড়ে দিতাম না। এমন কি বেদুইনদের দুগ্ধবতী উষ্ট্রীর সাথে যে কুকুর থাকত তাও আমরা হত্যা করতাম।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

সহীহ মুসলিম (হাঃ একাডেমী)
অধ্যায়ঃ ২৩। মুসাকাহ (পানি সেচের বিনিময়ে ফসলের একটি অংশ প্রদান)
পরিচ্ছদঃ ১০. কুকুর হত্যার আদেশ ও তা রহিত হওয়ার বর্ণনা এবং শিকার করা অথবা ক্ষেত পাহারা বা জীবজন্তু পাহারা বা এ জাতীয় কোন কাজের উদ্দেশে ব্যতীত কুকুর পালন করা হারাম হওয়ার বর্ণনা
৩৯১১-(৪৬/১৫৭১) ইয়াহইয়া ইবনু ইয়াহইয়া (রহঃ) ….. ইবনু উমার (রাযিঃ) হতে বর্ণিত যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুকুর হত্যা করতে হুকুম দিয়েছেন। তবে শিকারী কুকুর, বকরী পাহারা দানের কুকুর অথবা অন্য জীবজন্তু পাহারা দেয়া কুকুর ব্যতীত। অতঃপর ইবনু উমারের নিকট বলা হলো যে, আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) তো ক্ষেত পাহারার কুকুরের কথাও বলে থাকেন। ইবনু উমর (রাযিঃ) বললেনঃ আবূ হুরাইরার ক্ষেত আছে। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৩৮৭৪, ইসলামিক সেন্টার ৩৮৭৩)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

সহীহ মুসলিম (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ২৩/ মুসাকাত ও মুযারাত (বর্গাচাষ)
পরিচ্ছদঃ ৯. কুকুর হত্যার আদেশ ও তা রহিত হওয়ার বর্ণনা এবং শিকার করা অথবা ক্ষেত পাহারা বা জীবজন্তু পাহারা ও এ জাতীয় কোন কাজের উদ্দেশ্য ব্যতীত কুকুর পালন করা হারাম হওয়ার বর্ণনা
৩৮৭৪। ইয়াহইয়া ইবনু ইয়াহইয়া (রহঃ) … ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুকুর হত্যা করতে নির্দেশ দিয়েছেন। তবে শিকারী কুকুর, বকরী (পাহারা দানের কুকুর) অথবা অন্য জীবজন্তু পাহারা দেওয়া কুকুর ব্যতীত। এখন ইবনু উমর (রাঃ) কে বলা হল যে, আবূ হুরায়রা (রাঃ) তো ক্ষেত পাহারার কুকুরের কথাও বলে থাকেন। ইবনু উমর (রাঃ) বললেন, আবূ হুরায়রার ক্ষেত আছে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

সহীহ মুসলিম (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ২/ তাহারাত (পবিত্রতা)
পাবলিশারঃ ইসলামিক ফাউন্ডেশন
পরিচ্ছদঃ ২৭. কুকুরের উচ্ছিষ্ট সম্পর্কে বিধান
৫৪৬। উবায়দুল্লাহ ইবনু মু’আয (রহঃ) … ইবনুল মুগাফফাল (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুকুর হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন। পরে বললেন, তাদের কী হয়েছে যে, তারা কুকুরের পিছনে পড়লো? তারপর শিকারী কুকুর এবং বকরীর (পাহারা দেয়ার) কুকুর রাখার অনুমতি দেন এবং বলেন, কুকুর যখন পাত্রে মুখ লাগিয়ে পান করবে তখন তা সাতবার ধুইয়ে ফেলবে এবং অষ্টমবার মাটি দিয়ে ঘষে ফেলবে।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)


কুকুর গণহত্যার উদ্ভট কারণ

ইদানীংকালের অনেক লজ্জিত মুসলিম লাজলজ্জার মাথা খেয়ে দাবী করেন, নবী মুহাম্মদ নাকি পাগলা কুকুরের উপদ্রব থেকে মানুষকে রক্ষার জন্য বাধ্য হয়ে এরকম নির্দেশ দিয়েছিলেন! জলাতঙ্ক রোগের কুকুর কিংবা অন্যান্য কারণে নানা রোগব্যাধিতে আক্রান্ত কুকুরগুলোকেই নাকি নবী হত্যা করতে বলেছে। অথচ হাদিস থেকে জানা যায় একদমই ভিন্ন কথা। নবীর এই কুকুর গণহত্যার পেছনে কোন পাগলা কুকুরের পাগলামি কিংবা অসুখ ছড়ানো কিংবা মানুষের জন্য মহা বিপদজনক কোন বিষয়ই ছিল না। বরঞ্চ কারণ ছিল খুবই উদ্ভট এবং ফালতু। কারণটি হচ্ছে, ফেরেশতা জিবরাইল নাকি একদিন আসার কথা বলেও কুকুরের কারণে নবীর সাথে দেখা করতে আসতে পারেনি। সকালে উঠে রেগেমেগে মুহাম্মদ বাগানের প্রশিক্ষিত বড় কুকুর বাদে সব কুকুর নিধনের হুকুম দেয়। প্রশ্ন হচ্ছে, এতবড় ক্ষমতাবান ফেরেশতা, এক কুকুরেই তার প্যান্ট ভিজে গেল? এই বলদা ফেরেশতা দিয়ে শয়তানের সাথে যুদ্ধ কীভাবে হবে? শয়তান তো কুকুর লেলিয়ে দিলেই আল্লাহর ফেরেশতারা প্যান্ট খুলে রেখে পালিয়ে যাবে। আর আল্লাহর ওহী তো মহাবিশ্বের সবচাইতে গুরুত্বপুর্ণ বিষয়, যা আল্লাহ ফেরেশতা জিবরাইলের মাধ্যমে নবীকে পাঠাতেন। তাহলে, এত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে যখন জিবরাইল আসবেন, তিনি ঘরের বাইরে থেকে নবীকে ডাকাডাকি করতে পারতেন, বা দরজার সামনেই অপেক্ষা তো করতে পারতেন। সেগুলো না করেই এই বেকুব জিবরাইল ফেরত চলে গেছে! চিন্তা করুন তো, রমজানের সময় ইবলিশ শেকল দিয়ে বাধা থাকার পরেও, সারা পৃথিবী ব্যাপী তার কার্যক্রম চলতে থাকে। অথচ এই বেকুব আর অলস জিবরাইলকে একটা কাজ দিলেও সে ঠিক মত করতে পারে না। কুকুরের ভয়ে পালিয়ে চলে আসে। জিবরাইল ফেরেশতা হিসেবে চাকরি পেলো কীভাবে সেটি একটি জরুরি প্রশ্ন! [13]

সহীহ মুসলিম (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৩৮/ পোশাক ও সাজসজ্জা
ইসলামিক ফাউন্ডেশন
পরিচ্ছদঃ ২১. জীব-জন্তুর ছবি অংকন করা নিষিদ্ধ হওয়া এবং চাদর ইত্যাদিতে সুস্পষ্ট ও অবজ্ঞাপূর্ণ নয় এমন ছবি থাকলে তা ব্যবহার করা হারাম হওয়া এবং যে ঘরে কুকুর ও ছবি থাকে সে ঘরে ফেরেশতাগণ প্রবেশ করেন না
৫৩৩৫। হারামালা ইবনু ইয়াহইয়া (রহঃ) … আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, মায়মুনা (রাঃ) আমাকে (হাদীস) অবহিত করেছেন যে, একদিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভোরে বিষণ্ণ অবস্থায় উঠলেন। তখন মায়মুনা (রাঃ) বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আজ আপনার চেহারা বিমর্ষ দেখছি! রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, জিবরীল (আলাইহিস সালাম) আজ রাতে আমার সঙ্গে মুলাকাত করার ওয়াদা করেছিলেন, কিন্তু তিনি আমার সঙ্গে মুলাকাত করেননি। জেনে রাখ, আল্লাহর কসম! তিনি (কখনো) আমার সঙ্গে ওয়াদা খেলাফ করেননি। পরে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সে দিনটি এভাবেই কাটালেন।
এরপর
আমাদের পর্দা (ঘেরা খাট) এর নিচে একটি কুকুর ছানার কথা তাঁর মনে পড়ল। তিনি হুকুম দিলে সেটিকে বের করে দেয়া হল। তারপর তিনি তাঁর হাতে সামান্য পানি নিয়ে তা ঐ (কুকুর ছানার বসার) স্থানে ছিঁটিয়ে দিলেন। পরে সন্ধ্যা হলে জিবরীল (আলাইহিস সালাম) তাঁর সঙ্গে মুলাকাত করলেন। তখন তিনি তাঁকে বললেন, আপনি তো গতরাতে আমার সাথে মুলাকাতের ওয়াদা করেছিলেন। তিনি বললেন, হ্যাঁ। তবে আমরা (ফিরিশতারা) এমন কোন ঘরে প্রবেশ করিনা, যে ঘরে কোন কুকুর থাকে কিংবা কোন (প্রানীর) ছবি থাকে।
পরে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেদিন ভোরবেলায় কুকুর নিধনের আদেশ দিলেন, এমনকি তিনি ছোট বাগানের পাহারাদার কুকুরও মেরে ফেলার হুকুম দিয়েছিলেন
এবং বড় বড় বাগানের কুকুরগুলোকে রেহাই দিয়েছিলেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

প্রানি

নৈতিক ও মানবিক মূল্যায়ন

উপরের হাদিসগুলো একত্রে বিবেচনা করলে স্পষ্ট হয় যে, এখানে কুকুর বা সাপ মারার নির্দেশ কোনো বৈজ্ঞানিক রোগতত্ত্ব, জনস্বাস্থ্য গবেষণা কিংবা প্রাণীর প্রতি সহমর্মিতার ওপর ভিত্তি করে দেওয়া হয়নি। বরং কুসংস্কারপূর্ণ ধারণা (ফেরেশতা ঘরে প্রবেশ করবে না, সব সাপ মারো, কালো কুকুর বিশেষভাবে মেরে ফেল ইত্যাদি), অলৌকিক ব্যাখ্যা ও ধর্মীয় ভয় প্রদর্শনের মাধ্যমে এই নির্দেশগুলোর নৈতিকতা প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করা হয়েছে। আধুনিক মানবাধিকার ও প্রাণী অধিকার–সংক্রান্ত আলোচনার সঙ্গে এগুলোকে মিলিয়ে দেখলে গভীর দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয় যে, পরমকরুনাময় আল্লাহর নবী কীভাবে এই প্রাণীগুলোকে মেরে ফেলতে বলতে পারেন? আর যদি মেরে ফেলতেই হয়, আল্লাহ এইসব প্রাণীকে সৃষ্টিই বা কেন করলেন? সৃষ্টি করে কষ্ট দিয়ে মারার জন্য?

একদিকে ইসলামী বক্তারা প্রচার করেন, ইসলাম নাকি অত্যন্ত ‘সহানুভূতি’ ও ‘মানবিক’ ধর্ম; অন্যদিকে সহীহ বলে গণ্য মূলধারার হাদিসগুলোতেই দেখা যায়, কুকুর যেমন-তেমন কারণেই গণহারে নিধনের শিকার হয়েছে, সাপকে ‘দেখলে মেরে ফেল’ ধরনের নির্দেশ এসেছে, এমনকি নির্দিষ্ট রঙের কুকুরকে টার্গেট করতে বলা হয়েছে। কোনো প্রাণীর প্রতি অযৌক্তিক ভয় বা ঘৃণা থেকে যদি এই ধরনের নির্দেশ আসে, তবে তা মানবিক নীতির সঙ্গে এবং ন্যূনতম যুক্তির সঙ্গেও সাংঘর্ষিক।

এছাড়া যে যুক্তি দেখানো হয়—“শুধু ক্ষতিকর কুকুরই মারা হয়েছে”—তা উপরের উদ্ধৃত হাদিসগুলোর সঙ্গেও যায় না। সেখানে স্পষ্টভাবে কালো কুকুরকে, সাধারণ কুকুরকে, এমনকি দুগ্ধবতী উষ্ট্রীর সঙ্গে থাকা পাহারাদার কুকুর পর্যন্ত হত্যা করার বর্ণনা আছে। অর্থাৎ বাস্তবে এখানে ‘প্রাণীর স্বাস্থ্যঝুঁকি’ নয়, বরং ধর্মীয় কুসংস্কার ও ফেরেশতা-সংক্রান্ত ভীতিই মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে।


অতিপ্রাকৃত কুসংস্কার বনাম আধুনিক জীববিজ্ঞান

নবী ইব্রাহিম-এর আগুনে টিকটিকির ফুঁ দেওয়ার যে বর্ণনা হাদিসগুলোতে পাওয়া যায়, এবং সেই কারণে টিকটিকি হত্যার যে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তা একদিকে যেমন অলৌকিক দাবি, অন্যদিকে তেমনি জ্ঞানতাত্ত্বিকভাবেও দুর্বল। এই সমস্ত কুসংস্কারের ওপর ভিত্তি করে যখন রাষ্ট্রীয় আইন তৈরি হয়, তখন সেগুলো ভয়াবহ আকার ধারণ করে। আসুন হাদিসটি দেখে নিই,

সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)
৬০/ আম্বিয়া কিরাম (‘আঃ)
পরিচ্ছেদঃ ৬০/৮. মহান আল্লাহর বাণীঃ আর আল্লাহ ইবরাহীম (আঃ)-কে বন্ধুরূপে গ্রহণ করেছেন- (আন্-নিসা ১২৫)।
৩৩৫৯. উম্মু শারীক (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গিরগিটি মেরে ফেলার নির্দেশ দিয়েছেন এবং তিনি বলেছেন, ওটা ইবরাহীম (আঃ) যে অগ্নিকুন্ডে নিক্ষিপ্ত হয়েছিলেন তাতে এ গিরগিটি ফুঁ দিয়েছিল। (৩৩০৭) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ৩১১০, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৩১১৮)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ উম্মু শারীক (রাঃ)

একটি ছোট গেকো বা হাউস লিজার্ডকে এমন এক মিথিক্যাল এজেন্সি দেওয়া হয়েছে যেন তার শ্বাসপ্রশ্বাসই আগুনকে উসকে দিতে পারে। অথচ গেকোরা স্বাভাবিকভাবেই ছোট সরীসৃপ, বেশিরভাগ প্রজাতির দৈর্ঘ্য প্রায় ৩ থেকে ১৫ সেন্টিমিটার; তাদের শরীরতত্ত্ব ও আচরণ কীটপতঙ্গ শিকার এবং বেঁচে থাকার জন্য বিবর্তিত, কোনো অগ্নিকুণ্ডে “অশুভ শক্তি” ঢেলে দেওয়ার জন্য নয়। সুতরাং এই বর্ণনা জীববিজ্ঞানের তথ্য নয়, বরং ধর্মীয় লোককথার ভাষায় উপস্থাপিত একটি মিথিক্যাল কাহিনি। আসুন প্রাসঙ্গিক হাদিসটি দেখি,

সুনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত)
১৬/ শিকার
পরিচ্ছেদঃ ১৪. গিরগিটি (টিকটিকি) জাতীয় প্রাণী মেরে ফেলা বিষয়ে
১৪৮২। আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ প্রথম আঘাতেইযে লোক একটি গিরগিটি (টিকটিকি) মারতে পারে তার জন্য এই এই পরিমাণ সাওয়াব। সে এটাকে দ্বিতীয় আঘাতে মারতে পারলে তার জন্য এই এই পরিমাণ সাওয়াব। সে তা তৃতীয় আঘাতে মারতে পারলে তার জন্য এত এত সাওয়াব।
সহীহ, মুসলিম (৭/৪২)
ইবনু মাসউদ, সা’দ, আইশা ও উম্মু শারীক (রাঃ) হতেও এ অনুচ্ছেদে হাদীস বর্ণিত আছে। আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত হাদীসটিকে আবূ ঈসা হাসান সহীহ বলেছেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)

এর সঙ্গে আরেকটি গভীর নৈতিক সমস্যা যুক্ত হয়। যদি ধরে নেওয়াও হয় যে প্রাচীন কোনো একটি প্রাণী কোনো “অপরাধ” করেছিল, তবু আজকের প্রতিটি টিকটিকিকে সেই কাহিনির উত্তরাধিকারী বানিয়ে হত্যার প্রলোভন দেওয়া যৌথ অপরাধের নীতিকে প্রতিষ্ঠা করে। অথচ কোরআন নিজেই বলে, “কোনো বোঝাবাহক অন্যের বোঝা বহন করবে না”, এবং “কেউ অন্যের বোঝা বহন করবে না।” অর্থাৎ ব্যক্তিগত দায়ের নীতি ধর্মগ্রন্থের ভেতরেই আছে, কিন্তু প্রাণীদের ক্ষেত্রে তা হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যায়। সুবিধামতো নীতি বদলানোকে ঐশী ন্যায় বললে ন্যায়ের ধারণাটাই কৌতুকের পর্যায়ে নেমে আসে। আসুন দেখি কোরআনের আয়াত, যেখানে বলা হয়েছে, কেউই একের পাপের বোঝা অন্যে বহন করবে না [14]

কোন বোঝা বহনকারী অন্যের বোঝা বহন করবে না। আমি ‘আযাব দেই না যতক্ষণ একজন রসূল না পাঠাই।
— Taisirul Quran
এবং কেহ অন্য কারও ভার বহন করবেনা; আমি রাসূল না পাঠানো পর্যন্ত কেহকেও শাস্তি দিইনা।
— Sheikh Mujibur Rahman
আর কোন বহনকারী অপরের (পাপের) বোঝা বহন করবে না। আর রাসূল প্রেরণ না করা পর্যন্ত আমি আযাবদাতা নই।
— Rawai Al-bayan
আর কোনো বহনকারী অন্য কারো ভার বহন করবে না [২]। আর আমরা রাসুল না পাঠানো পর্যন্ত শাস্তি প্রদানকারী নই [৩]।
— Dr. Abu Bakr Muhammad Zakaria

একই ধরনের অদ্ভুত ধারণা সাপ সম্পর্কিত হাদিসগুলোর মধ্যেও দেখা যায়। কিছু বর্ণনায় নবী মুহাম্মদ সাপ হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছেন, আবার অন্য বর্ণনায় বলা হয়েছে যে ঘরের সাপগুলোকে সঙ্গে সঙ্গে হত্যা না করে আগে সতর্ক করতে হবে, কারণ সেগুলো নাকি জিনের রূপ ধারণ করে থাকতে পারে। অর্থাৎ একই উৎসে একদিকে সাপকে সরাসরি ধ্বংসযোগ্য বিপজ্জনক প্রাণী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, অন্যদিকে আবার তাকে সম্ভাব্য অতিপ্রাকৃত সত্তা হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। আসুন হাদিসটি পড়ি,

সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৪১/ সাপ ইত্যাদি নিধন
পরিচ্ছেদঃ পরিচ্ছেদ নাই
৫৬৩২। হাজিব ইবনু ওয়ালীদ (রহঃ) … ইবনু উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে আমি কুকুর নিধনের হুকুম জারী করতে শুনেছি, তিনি বলতেন, সাপগুলি আর কুকুরগুলি মেরে ফেল। আর (বিশেষত) পিঠে দু’সাদা রেখাবিশিষ্ট ও লেজবিহীন সাপ মেরে ফেল। কেননা এ দুটি মানুষের দূষ্টিশক্তি ছিনিয়ে নেয় এবং গর্ভবতীদের গর্ভপাত ঘটায়। (সনদের মধ্যবর্তী) রাবী যুহরী (রহঃ) বলেন, আমাদের ধারণায় তা এদের বিষের কারণে; তবে আল্লাহ তাআলাই সমধিক অবগত। রাবী সালিম (রহঃ) বলেন, আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) বলেছেন, এরপরে আমার অবস্থা দাঁড়াল এই যে, কোন সাপ দেখতে পেলে তাকে আমি না মেরে ছেড়ে দিতাম না।
একদিনের ঘটনা, আমি বাড়ি-ঘরে অবস্থানকারী ধরনের একটি সাপ তাড়া করছিলাম। সে সময় যায়দ ইবনু খাত্তাব (রাঃ) বা আবূ লূবাবা (রাঃ) আমার কাছ দিয়ে যাচ্ছিলেন, আর আমি তাড়া করে যাচ্ছিলাম। তিনি বললেন, থামো! হে আবদুল্লাহ! তখন আমি বললাম, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তো এদের মেরে ফেলার হুকুম দিয়েছেন। তিনি বললেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘর-দুয়ারে বসবাসকারী সাপ নিধন করতে নিষেধও করেছেন।
হারামালা ইবনু ইয়াহইয়া, আবদ ইবনু হুমায়দ ও হাসান হুলওয়ানী (রহঃ) … যুহরী (রহঃ) থেকে উল্লেখিত সনদে হাদীস রিওয়ায়াত করেছেন। তবে (শেষ সনদের) রাবী সালিহ (রহঃ) বলেছেন, অবশেষে আবূ লূবাবা ইবনু আবদুল মুনযির (রাঃ) এবং যায়দ ইবনু খাত্তাব (রাঃ) আমাকে দেখলেন …… এবং তাঁরা দুাজন বললেন যে, ঘর-দুয়ারে বসবাসকারী সাপ নিধন করতে নিষেধ করেছেন। আর (প্রথম সনদের) রাবী ইউনূস (রহঃ) বর্ণিত হাদীসে রয়েছে- ’সব সাপ মেরে ফেল’। তিনি (বিশেষ করে) ’পিঠে দু’সাদারেখা বিশিষ্ট ও লেজবিহীন সাপ’ কথাটি বলেন নি।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবন উমর (রাঃ)

এই ধারণা আধুনিক জীববিজ্ঞান বা প্রাণিবিদ্যার সঙ্গে তো সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়ই, বরং এটি প্রাচীন আরব সমাজের লোকবিশ্বাস ও অতিপ্রাকৃত কল্পনার প্রতিফলন বলেই বোঝা যায়। বাস্তবিক অর্থে সাপ হলো পৃথিবীর পরিবেশব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ; তারা ইঁদুর ও অন্যান্য ক্ষতিকর প্রাণীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। কিন্তু যখন ধর্মীয় কাহিনি ও লোকবিশ্বাসের ভিত্তিতে প্রাণীদের “অশুভ”, “ক্ষতিকর” বা অতিপ্রাকৃত শক্তির বাহক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, তখন সেই ধারণা মানুষের মধ্যে অযৌক্তিক ভয় এবং নির্বিচার প্রাণীহত্যাকে বৈধতা দিতে শুরু করে। ফলে এখানে আবারও একই প্রশ্ন উঠে আসে: যদি নৈতিক নীতিটি সত্যিই হয় যে কেউ অন্যের পাপের বোঝা বহন করবে না, তবে কেন একটি সম্পূর্ণ প্রাণী প্রজাতিকে এমন লোককথার দায় বহন করতে হবে?


পাঁচ প্রকারের প্রাণী হত্যার ইসলামিক বিধান

মুহাম্মদের প্রাণিহত্যার তালিকা কেবল কুকুর বা সাপের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা বিস্তৃত ছিল একগুচ্ছ নিরীহ ও বাস্তুসংস্থানগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রাণীর ওপর। ইসলামী পরিভাষায় এদের ‘ফাসেক’ বা পাপিষ্ঠ-অনিষ্টকারী প্রাণী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সহীহ হাদিস অনুযায়ী, পাঁচটি প্রাণীকে হিল ও হারাম (মক্কার পবিত্র সীমানার ভেতর ও বাইরে) সব জায়গায় হত্যা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে—কাক, চিল, বিচ্ছু, ইঁদুর এবং পাগলা কুকুর [15] [16]। এমনকি হজের সময় যখন একজন মুহরিম ব্যক্তির জন্য যেকোনো শিকার বা সাধারণ প্রাণী হত্যা নিষিদ্ধ, তখনও এই পাঁচটি প্রাণীকে হত্যা করলে কোনো গুনাহ হয় না বলে ঘোষণা করা হয়েছে [17] [18]

মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
অধ্যায়ঃ পর্ব-১১ঃ হজ্জ
পাবলিশারঃ হাদিস একাডেমি
পরিচ্ছদঃ ১২. প্রথম অনুচ্ছেদ – মুহরিম ব্যক্তির শিকার করা হতে বিরত থাকবে
২৬৯৯-(৪) ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ পাঁচটি ক্ষতিকর প্রাণী হিল্ ও হারাম (সর্বস্থানে) যে কোন স্থানেই হত্যা করা যেতে পারে। সেগুলো হলো সাপ, (সাদা কালো) কাক, ইঁদুর, হিংস্র কুকুর ও চিল। (বুখারী, মুসলিম)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

সূনান আবু দাউদ (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৫/ হাজ্জ
পাবলিশারঃ ইসলামিক ফাউন্ডেশন
পরিচ্ছদঃ ৩৮. ইহরাম অবস্থায় যেসব জীবজন্তু হত্যা করা যাবে।
১৮৪৬. আহমাদ ইবন হাম্বল (রহঃ) ……… ইবন উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জিজ্ঞাসা করা হয় যে, মুহরিম ব্যক্তি কোন কোন জীবজন্তু হত্যা করতে পারবে? তিনি বলেন, পাঁচ শ্রেনীর জীবজন্তু হত্যায় কোন গুনাহ্ নেই, যদি এগুলোকে হেরেম এলাকায় বা হেরেমের বাহিরেও হত্যা করা হয়। তা হলঃ – বিচ্ছু, ইঁদুর, কাক, চিল ও পাগলা কুকুর।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

আধুনিক বিজ্ঞান ও বাস্তুসংস্থানের (Ecology) মানদণ্ডে এই ঢালাও হত্যাদেশ অত্যন্ত আদিম ও ক্ষতিকর:

বাস্তুসংস্থান (Ecology)
কাক ও চিলের গুরুত্ব অস্বীকার

জীববিজ্ঞানের দৃষ্টিতে কাক ও চিল হলো প্রকৃতির ‘পরিষ্কারক’ বা Scavengers। তারা পচনশীল দ্রব্য খেয়ে পরিবেশকে রোগমুক্ত রাখে। অথচ মুহাম্মদ এই উপকারী পাখিগুলোকে ‘ক্ষতিকর’ তকমা দিয়ে হত্যার যে নির্দেশ দিয়েছেন, তা আধুনিক বিজ্ঞানের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক।

খাদ্যশৃঙ্খল (Food Chain)
ইঁদুর ও বিচ্ছুর প্রতি প্রজাতিগত ঘৃণা

ইঁদুর বা বিচ্ছু অস্বস্তিকর হতে পারে, কিন্তু ইকোসিস্টেমে এদের প্রত্যেকের সুনির্দিষ্ট ভূমিকা রয়েছে। মুহাম্মদ এদের কোনো বৈজ্ঞানিক কারণ ছাড়াই ‘অনিষ্টকারী’ বলে চিহ্নিত করে যে নির্বিচার হত্যার বৈধতা দিয়েছেন, তা মূলত তাঁর মধ্যযুগীয় মরু-অভিজ্ঞতারই সীমাবদ্ধতা।

মনস্তত্ত্ব (Psychology)
টিকটিকি হত্যার বীভৎস পুরস্কার

প্রাণী নিধনের সাথে ‘সওয়াব’ বা পরকালীন নেকির বাণিজ্য জুড়ে দেওয়া হয়েছে। যে ব্যক্তি প্রথম আঘাতেই টিকটিকি মারবে, সে ১০০ সওয়াব পাবে। প্রাণীকে অহেতুক যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যু দেওয়াকে ‘পুণ্য’ হিসেবে প্রচার করা মানুষের মনে এক বিকৃত ও পাশবিক আনন্দ তৈরি করে।

ইতিহাস (History)
মদীনার পৈশাচিক কুকুর নিধন

মদীনায় যে কুকুর নিধন অভিযান চালানো হয়েছিল, তা ছিল আধুনিক সংজ্ঞায় একটি ‘প্রজাতিগত গণহত্যা’। জাবির (রা.)-এর বর্ণনা অনুযায়ী, মরুভূমি থেকে আসা নারীর পোষা কুকুরকেও জোর করে কেড়ে নিয়ে হত্যা করা হতো। এই নির্মমতা কোনো যুক্তিতেই ‘রহমত’ হতে পারে না।

পরিশেষে, এই প্রাণীগুলোকে ‘ফাসেক’ ঘোষণা করা কেবল মুহাম্মদের প্রজাতিগত বৈষম্য ও অজ্ঞতারই প্রমাণ। যদি এই বিধানগুলো কোনো সর্বজ্ঞ স্রষ্টার হতো, তবে তিনি বাস্তুসংস্থানের ভারসাম্য নষ্টকারী এমন নির্দেশ দিতেন না। মুহাম্মদের এই আইনগুলো মূলত ৭ম শতাব্দীর আরবদের কুসংস্কার আর ভীতির ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যা আধুনিক পৃথিবীর বৈজ্ঞানিক ও নৈতিক অগ্রগতির পথে এক বিশাল বাধা।


প্রজাতিগত বৈষম্য এবং কালো কুকুরকে “শয়তান” বলা

সহিহ মুসলিম ও সংশ্লিষ্ট বর্ণনায় কালো কুকুরকে সরাসরি “শয়তান” বলা হয়েছে; অন্য হাদিসে কুকুর হত্যা করার আদেশও পাওয়া যায়, পরে তা কিছু ব্যতিক্রমে সীমিত করা হয়েছে। এই ভাষ্য কোনো নিরপেক্ষ প্রাণিবিদ্যাগত পর্যবেক্ষণ নয়, বরং রঙ-ভিত্তিক নৈতিক আতঙ্কের ধর্মীয় রূপ। আধুনিক জেনেটিক্সে কুকুরের গায়ের রঙ মেলানিনের ধরন, জিনগত ভ্যারিয়েশন এবং বংশগত বৈশিষ্ট্যের ফল। এটি নৈতিকতা, অশুভতা বা অতিপ্রাকৃত সত্তার কোনো নির্দেশক নয়। একইভাবে WHO-র রেবিজ নির্দেশিকাও কামড়, সংস্পর্শ, ক্ষত পরিষ্কার, টিকা এবং post-exposure prophylaxis-এর ওপর জোর দেয়, কুকুরের রঙের ওপর নয়।

এখানে “জলাতঙ্ক ঠেকানোর ব্যবস্থা” বলে যে অজুহাত তোলা হয়, তা মূলত পরবর্তী যুগের একটি সুবিধাজনক ব্যাখ্যা। মূল বর্ণনাগুলোর ভাষা নিজেই দেখায়, সিদ্ধান্তটি রোগতত্ত্বের ভিত্তিতে নয়, বরং নির্দিষ্ট প্রাণীকে অশুভ প্রতীকে পরিণত করার মানসিকতায় দাঁড়ানো। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, একই ধারার বর্ণনায় একদিকে সব কুকুর হত্যার কথা বলা হয়েছে, আবার পরে শিকার, পাহারা বা কাজের কুকুরের ব্যতিক্রম রাখা হয়েছে। অর্থাৎ এটি কোনো শাশ্বত নীতি নয়; এটি পরিস্থিতিনির্ভর, ভীতি-নির্ভর এবং পরে সংশোধিত এক মানবীয় কুসংস্কার, যা ধর্মীয় নির্দেশের পোশাক পরে এসেছে।


“সমস্ত জগতের জন্য রহমত” বনাম প্রাণীহত্যার অনুমোদন

কোরআন মুহাম্মদকে “সমস্ত জগতের জন্য রহমত” হিসেবে উপস্থাপন করে। কিন্তু হাদিস-সাহিত্যে ইঁদুর, বিচ্ছু, কাক, চিল এবং আক্রমণাত্মক কুকুরের মতো প্রাণীকে ইহরাম অবস্থাতেও হত্যাযোগ্য বলা হয়েছে। এখানে সমস্যাটা শুধু নৈতিক নয়, বাস্তুসংস্থানগতও। কাক ক্যারিয়ন ও আবর্জনা খেয়ে পরিষ্কারক ভূমিকা রাখে; গেকো অনেক ক্ষেত্রে পোকামাকড় খেয়ে থাকে; আর এ ধরনের প্রাণী খাদ্যজাল ও পচনচক্রের অংশ হিসেবে প্রকৃতিতে ভূমিকা পালন করে। কাজেই এগুলোকে কেবল “অপছন্দনীয়” বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বাস্তবে এটি আধুনিক ecology নয়, বরং লোকাচারভিত্তিক প্রাণীবিদ্বেষের আরেকটি উদাহরণ।

দর্শনের ভাষায় একে speciesism বলা যায়, অর্থাৎ প্রজাতি-পরিচয়ের ভিত্তিতে কিছু প্রাণীকে নৈতিকভাবে নিচু, তুচ্ছ বা হত্যাযোগ্য ধরে নেওয়া। ব্রিটানিকা ও সমসাময়িক নৈতিকতাবিদ্যার ভাষ্য অনুযায়ী, speciesism হলো এক প্রজাতিকে অন্যদের তুলনায় নৈতিকভাবে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করা বা সেই বৈষম্যকে বৈধ বলে ধরে নেওয়া। ধর্মীয় ভাষ্যে যখন নির্দিষ্ট প্রাণীকে “ফাসেক”, “শয়তান” বা “ক্ষতিকর” তকমা দিয়ে ঢালাওভাবে শাস্তিযোগ্য বানানো হয়, তখন নৈতিক বিচার আর প্রকৃত ক্ষতির প্রশ্ন থাকে না, থাকে কেবল পূর্বনির্ধারিত ঘৃণা। এ ধরনের ঘৃণাকে যদি ঐশী জ্ঞান বলে চালানো হয়, তবে জ্ঞানের সংজ্ঞাটাই ইচ্ছামতো প্রসারিত করতে হয়। আসুন এই টেবিলটি দেখি,

প্রাণীর নাম ধর্মীয় দাবি ও নিধন আদেশ বৈজ্ঞানিক ও যৌক্তিক বাস্তবতা
টিকটিকি / গিরগিটি ইব্রাহিমের আগুনে ফুঁ দিয়ে তাপ বাড়িয়েছিল। মারলে ১০০ সওয়াব। [19] ক্ষুদ্র ফুসফুসে আগুন বাড়ানো অসম্ভব। টিকটিকি ক্ষতিকর পোকা খেয়ে বাস্তুসংস্থান রক্ষা করে।
কালো কুকুর কালো কুকুর সরাসরি শয়তান। এদের নির্বিচারে হত্যার নির্দেশ। [20] পশমের রঙ কেবল মেলানিন ও জেনেটিক্সের ফল। কোনো প্রাণীর রঙের সাথে অশুভ শক্তির সম্পর্ক নেই।
কাক ও চিল এরা ‘ফাসেক’ বা পাপিষ্ঠ। হজের পবিত্র সীমানাতেও হত্যাযোগ্য। [21] এরা প্রকৃতির প্রধান ‘পরিষ্কারক’ (Scavengers)। আবর্জনা পরিষ্কার করে মহামারীর হাত থেকে সমাজকে বাঁচায়।
সাপ সব সাপ মেরে ফেল। কিছু সাপ জিনের রূপ ধরে ঘরে থাকতে পারে। [22] সাপ ইঁদুর ও অন্যান্য ক্ষতিকর প্রাণীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখে।
ইঁদুর ও বিচ্ছু এরা অনিষ্টকারী। ইহরাম অবস্থায় মারলেও কোনো গুনাহ নেই। [23] ইকোসিস্টেমের অবিচ্ছেদ্য অংশ। নির্বিচার নিধন খাদ্যশৃঙ্খলে বিপর্যয় ডেকে আনে।

রক্তের বিনিময়ে পুণ্য: প্রাণিহত্যা যখন নেকির হাতিয়ার

ইসলামী শরীয়তের সবচেয়ে বিকৃত দিকটি উন্মোচিত হয় তখন, যখন কোনো প্রাণীর রক্ত ঝরানোকে সরাসরি ‘ইবাদত’ বা ‘সওয়াব’ অর্জনের উপায় হিসেবে ঘোষণা করা হয়। আধুনিক নৈতিকতায় যেখানে অহেতুক প্রাণহানিকে অপরাধ হিসেবে দেখা হয়, সেখানে মুহাম্মদের শিক্ষা অনুযায়ী একটি টিকটিকি বা গিরগিটি হত্যা করা মানে হলো পরকালের ব্যাংকে ‘নেকি’ জমা করা। সহীহ হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী, যে ব্যক্তি প্রথম আঘাতেই একটি টিকটিকি মারতে পারবে, তার জন্য ১০০ সওয়াব বা নেকি নির্ধারিত; আর যদি দ্বিতীয় বা তৃতীয় আঘাতে মারে, তবে সেই সওয়াবের পরিমাণ কমে যায় [24] [25]। প্রাণের বিনিময়ে এই যে ‘পুণ্যের অফার’, এটি কেবল নিষ্ঠুরতা নয়, বরং এক ধরনের ধর্মীয় বিকৃতি। এই সওয়াবের ধারণার মধ্য দিয়ে কয়েকটি ভয়াবহ নৈতিক সংকট তৈরি হয়:

🧠
সহিংসতাকে ‘পবিত্র’ করা

যখন হত্যার সাথে সওয়াব বা পুরস্কার যুক্ত করা হয়, তখন হত্যাকারীর মনে কোনো অনুশোচনা কাজ করে না। এটি মানুষের স্বাভাবিক সহমর্মিতা (Empathy) ধ্বংস করে তাকে একজন ‘পার্থিব ও পারলৌকিক সুবিধাবাদী’ শিকারীতে পরিণত করে।

⚔️
নিষ্ঠুরতার প্রতিযোগিতা

প্রথম আঘাতেই মারলে বেশি সওয়াব—এই নীতিটি হত্যার দক্ষতাকে পুরস্কৃত করে। ধর্মের নামে এই ধরণের ‘টার্গেট কিলিং’ শিক্ষা শিশুদের মনে এই ধারণা গেঁথে দেয় যে, শক্তি প্রয়োগ করে দুর্বলের প্রাণ কেড়ে নেওয়া ঈশ্বরকে খুশি করার একটি বৈধ পথ।

⚖️
প্রাণের বাণিজ্যিকীকরণ

এখানে প্রাণীর জীবন কোনো মূল্যবান সত্তা নয়, বরং তা কেবল একজন মুসলিমের জান্নাতে যাওয়ার ‘টোকেন’ মাত্র। রূপকথার গল্পের ওপর ভিত্তি করে কোটি কোটি প্রাণী হত্যার এই প্ররোচনা মূলত প্রাতিষ্ঠানিক প্রজাতিবাদ (Institutional Speciesism)

পরিশেষে, যে ধর্মব্যবস্থা একটি ক্ষুদ্র প্রাণীর আর্তনাদকে ‘সওয়াব’ হিসেবে গণ্য করে, সেই ব্যবস্থার ‘মানবিক’ হওয়ার দাবিটি চরম হাস্যকর। এটি আসলে দয়া বা করুণার ধর্ম নয়, বরং এটি এমন এক রক্ত পিপাসু দর্শন যা মানুষকে শেখায় যে অন্যের মৃত্যুতে নিজের আধ্যাত্মিক উন্নতি সম্ভব। এই সওয়াব ভিত্তিক প্রাণিহত্যার ধারণা আধুনিক সভ্য সমাজ ও উন্নত মানবিক মূল্যবোধের সম্পূর্ণ পরিপন্থী, যা কেবল ঘৃণা ও নিষ্ঠুরতাকেই দীর্ঘস্থায়ী করে।


উপসংহার: অন্ধবিশ্বাসের উত্তরাধিকার ও নৈতিক দায়বদ্ধতা

সামগ্রিক আলোচনা শেষে এটি দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে, সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম এবং সুনান গ্রন্থগুলোতে বর্ণিত প্রাণী হত্যার নির্দেশগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এগুলো ইসলামী শরীয়তের একটি সুপরিকল্পিত ও নিষ্ঠুর অংশ। মুহাম্মদের পক্ষ থেকে জারি করা কুকুর ও সাপ নিধনের নির্দেশ কিংবা টিকটিকি মারলে সওয়াব পাওয়ার প্রতিশ্রুতি—এর কোনোটির পেছনেই কোনো জনস্বাস্থ্যগত নিরাপত্তা বা প্রমাণভিত্তিক বৈজ্ঞানিক যুক্তি ছিল না। বরং এসব নির্দেশের মূলে কাজ করেছে চরম প্রজাতিবাদী (Speciesism) ঘৃণা, অতিপ্রাকৃত ভীতি (যেমন: জিব্রাইলের কুকুর-ভীতি বা কালো কুকুরকে শয়তান মনে করা) এবং মধ্যযুগীয় মরু-কুসংস্কার।

ইসলামী শরীয়তে এই বিধানগুলোর প্রভাব কেবল প্রাণিহত্যার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি একটি নির্দিষ্ট ধরণের ‘মানসিক কাঠামো’ তৈরি করে। যখন একটি ধর্মবিশ্বাস শেখায় যে কেবল শারীরিক বৈশিষ্ট্যের (যেমন গায়ের রঙ) কারণে একটি প্রাণীকে নির্বিচারে হত্যা করা ‘পুণ্য’ বা ‘সওয়াব’ এর কাজ, তখন তা প্রকারান্তরে ন্যায়বিচার ও মানবিক করুণার মূলে কুঠারাঘাত করে। আধুনিক মানবাধিকার ও প্রাণী অধিকারের এই যুগে মুহাম্মদের এই নির্দেশগুলো কেবল অগ্রহণযোগ্যই নয়, বরং বিপজ্জনক। অপোলজিস্টরা একে ‘তৎকালীন সময়ের প্রয়োজন’ বা ‘রোগতত্ত্ব’ দিয়ে ঢাকার আপ্রাণ চেষ্টা করলেও, হাদিসের মূল বক্তব্য তাদের এই জোড়াতালির ব্যাখ্যাকে বারবার পরাজিত করে। কারণ, স্রষ্টার প্রেরিত ‘রহমত’ যদি বিজ্ঞানের বদলে কুসংস্কারের ওপর ভিত্তি করে প্রাণ হত্যার উল্লাস তৈরি করে, তবে সেই করুণার দাবিটি আসলে একটি প্রতারণা ছাড়া আর কিছুই নয়।

পরিশেষে, আমাদের বেছে নিতে হবে আমরা কোন সভ্যতার অংশ হতে চাই। একদিকে আছে ১৪০০ বছর আগের সেই অন্ধকার লোকবিশ্বাস, যা ভীতি আর ঘৃণা ছড়িয়ে প্রাণের মূল্য নির্ধারণ করে। অন্যদিকে আছে আধুনিক বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী নৈতিকতা, যা প্রতিটি সংবেদনশীল সত্তার জীবনকে মর্যাদার সাথে বিচার করতে শেখায়। ধর্মকে যদি সত্যিই মানবিকতার কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়, তবে এই নিষ্ঠুর বিধানগুলো থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখা আর সম্ভব নয়। মুক্তবুদ্ধির মানুষেরা আজ এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে বাধ্য যে, যে আদর্শ নির্বিচার প্রাণিহত্যাকে ধর্মের নামে বৈধতা দেয়, তা আধুনিক প্রগতিশীল সমাজের জন্য একটি কলঙ্ক। সত্যিকারের মানবিক সমাজ গড়তে হলে এই প্রাগৈতিহাসিক বর্বরতা এবং কুসংস্কারের শেকল ছিঁড়ে বেরিয়ে আসাই হবে আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় নৈতিক বিজয়।

About This Article

Genre: Semi-Academic Skeptical Analysis

Epistemic Position: Scientific Skepticism

This article belongs to the skeptical-rationalist analytical tradition of Shongshoy.com.

It applies historical criticism, empirical reasoning, logical analysis, and scientific skepticism in evaluating religious, philosophical, and historical claims.

The objective is not theological neutrality, but evidence-based critical examination and adversarial analysis of ideas and narratives.

This article should primarily be evaluated through: source quality, evidentiary strength, logical rigor, and factual consistency.


তথ্যসূত্রঃ
  1. কোরআন ২১:১০৭ ↩︎
  2. সহীহ বুখারী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৩০৮৯ ↩︎
  3. সূনান আবু দাউদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ২৮৩৬ ↩︎
  4. সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকেশন্স, হাদিসঃ ৩৩২৩ ↩︎
  5. সূনান তিরমিজী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ১৪৯৫ ↩︎
  6. সহীহ মুসলিম, হাদীস একাডেমী, হাদিসঃ ৩৯০৯ ↩︎
  7. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৩৮৭২ ↩︎
  8. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৩৮৭৩ ↩︎
  9. সহীহ মুসলিম, হাদীস একাডেমী, হাদিসঃ ৩৯১১ ↩︎
  10. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৩৮৭৪ ↩︎
  11. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৫৬৩২ ↩︎
  12. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৫৪৬ ↩︎
  13. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিসঃ ৫৩৩৫ ↩︎
  14. সূরা আল-ইসরা (বনী-ইসরাঈল), আয়াত ১৫ ↩︎
  15. সহীহ বুখারী, হাদিস নং ৩০৮০ ↩︎
  16. মিশকাতুল মাসাবীহ, হাদিস নং ২৬৯৯ ↩︎
  17. সূনান আবু দাউদ, হাদিস নং ১৮৪৬ ↩︎
  18. সূনান নাসাঈ, হাদিস নং ২৮৩১ ↩︎
  19. সহীহ বুখারী ৩৩৫৯ ↩︎
  20. সহীহ মুসলিম ৫১০ ↩︎
  21. সহীহ বুখারী ৩০৮০ ↩︎
  22. সহীহ মুসলিম ৫৬৩২ ↩︎
  23. সূনান আবু দাউদ ১৮৪৬ ↩︎
  24. সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ৫২৪৪ ↩︎
  25. সূনান আত তিরমিজী, হাদিস নং ১৪৮২ ↩︎