ইসলামে যাদু হারাম ও যাদুকরের শিরচ্ছেদের বিধান

ভূমিকা

ইসলামী শরীয়তে যাদুকরদের শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে, যা অত্যন্ত নৃশংস, বর্বর এবং অমানবিক এক ব্যবস্থা। ইসলামের বিভিন্ন হাদিস এবং ফিকাহ গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে যে, যারা জাদু বা তুকতাক করে, ইসলামী বিধান অনুসারে তাদেরকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে। ইসলামিক আইনের এই ধরনের শাস্তি শুধু অযৌক্তিকই নয়, বরং এটি ধর্মীয় গোঁড়ামি এবং কুসংস্কারের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। যাদু বা তুকতাক হলো একটি অবৈজ্ঞানিক ও ভিত্তিহীন ধারণা, যার অস্তিত্বের কোনো প্রমাণ নেই। মানুষের মনোরঞ্জনের জন্য করা যেই সকল জাদু আমরা দেখি, সেগুলো আমাদের অনেক আনন্দ দেয়। শুধুমাত্র কাউকে আনন্দ দেয়ার জন্য বা মানুষকে অবাক করে দেয়ার জন্য কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া একটি বর্বর এবং অসভ্য আইনের উদাহরণ। এইসব পুরনো অসভ্য আইন যে মূলত মানুষের ভয় ও অজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে, এই ধরণের আইনগুলো সেগুলোই বারবার প্রমাণ করে। একইসাথে, এই ধরণের আইন মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন এবং ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।

উল্লেখ্য, এই প্রবন্ধে আধুনিক ‘সুগারকোটেড’ বা অ্যাপোলোজেটিক এড হক ব্যাখ্যাসমূহকে সম্পূর্ণ সরিয়ে রেখে শুধুমাত্র নবি মুহাম্মদ, সাহাবী ও তাবেয়ীগণের আমল এবং চার মাজহাবের প্রতিষ্ঠিত ধ্রুপদী ফিকহী নীতিমালাকে ইসলামের মূল ভিত্তি ধরে আলোচনা করা হয়েছে। ইসলামের প্রতিষ্ঠিত শাস্ত্রীয় আদর্শ অনুযায়ী, আধুনিক কোনো ব্যাখ্যা যদি মুহাম্মদ, সাহাবী, তাবে তাবেইন ও পূর্বসূরি আলেমদের জীবন এবং ধ্রুপদী ফিকহের বর্ণনার সাথে সংগতিপূর্ণ না হয়, তবে সেখানে ধ্রুপদী ব্যাখ্যাকেই অগ্রাধিকার দিয়ে গ্রহণ করা হয়েছে, যা এই আলোচনার মূল ভিত্তি। এর মূল ভিত্তি হলো নবি মুহাম্মদের সেই বিখ্যাত বাণী— “সবচাইতে উত্তম মানুষ হচ্ছে আমার যুগের লোক, এরপর যারা তাদের নিকটবর্তী হবে, এরপর যারা তাদের নিকটবর্তী হবে” [1] [2]। ইসলামের সেই বিশুদ্ধতম যুগগুলোর আমল ও ব্যাখ্যাকেই এখানে আলোচনার মানদণ্ড ধরা হয়েছে।

ইসলামে যাদুকর এবং শরীয়তের বিধান

যাদুর শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার এই আইনের মাধ্যমে ইসলামী শরীয়ত কেবল অমানবিকতা ও বর্বরতার প্রতীক হিসেবে দাঁড়ায় না, বরং এটি জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিকাশের পথে একটি বড় বাধা হয়ে ওঠে। এ ধরনের আইন সমাজে কুসংস্কার ও ভ্রান্ত ধারনাকে আরও বদ্ধমূল করে এবং যুক্তিবাদী চিন্তাকে স্তব্ধ করে দেয়। আধুনিক যুগে, যেখানে বিজ্ঞানের মাধ্যমে পৃথিবীর অজানা রহস্য উদঘাটিত হচ্ছে এবং মানুষ যুক্তিনির্ভরভাবে সবকিছু বিশ্লেষণ করছে, সেখানে সামান্য জাদু দেখিয়ে মানুষকে আনন্দ দেয়ার হজন্য এ ধরনের শাস্তি মূলত সমাজকে অন্ধকার যুগে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার শামিল। এটি মানুষের স্বাধীন চিন্তাধারা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণকে পদদলিত করে। ছোটবেলা আমার প্রিয় যাদুশিল্পী ছিলেন জুয়েল আইচ। সদা হাস্যমুখের এই মানুষটিকে নিঃসন্দেহে সকলেই পছন্দ করেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পিসি সরকারের নাম অনেক শুনেছি, সেইসাথে ডেভিড কপারফিল্ডের যাদু তো মনোমুগ্ধকর। ইসলামে যাদু দেখানো এমনকি মানুষকে মনোরঞ্জনের জন্য হলে, সেটি সম্পুর্ণ হারাম এবং মৃত্যুদণ্ড যোগ্য অপরাধ। আসুন তথ্যসূত্রগুলো যাচাই করে দেখি।

জুয়েল আইচ

ইসলামী বিশ্বাসে যাদুকররা কাফের

হাদিসে বলা হয়েছে জাদুকরেরা কাফির,

মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত)
পর্ব-২৩: চিকিৎসা ও ঝাড়-ফুঁক
পরিচ্ছেদঃ ২. তৃতীয় অনুচ্ছেদ – জ্যোতিষীর গণনা
৪৬০৪-[১৩] ’আবদুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি নক্ষত্র বিদ্যা বিষয়ে আল্লাহর বাতলানো উদ্দেশ্য ব্যতীত কিছু শিক্ষাও গ্রহণ করেছে, সে বস্তুতঃ জাদুবিদ্যার এক অংশ হাসিল করেছে। আর জ্যোতিষী প্রকৃতপক্ষ গণক, আর গণক জাদুকর। আর জাদুকর কাফির। (রযীন)[1]
[1] সহীহ : আল ইসতিযকার (৩৭৯৪২)-(৯৫৬), আত্ব ত্বিববু লি আবী দাঊদ (৪/১৫), ‘বায়হাক্বী’র কুবরা ১৬৯৫৫, ‘ত্ববারানী’র আল মু‘জামুল কাবীর ১১১১, শু‘আবুল ঈমান ৫১৯৭, আহমাদ ২০০০, ইবনু আবূ শায়বাহ্ ২৫৬৪, আবূ দাঊদ ৩৮০৫, ইবনু মাজাহ ৩৭২৬, সহীহুল জামি‘ ৬০৭৪, আল জামি‘উস্ সগীর ১০১৯, সহীহ আত্ তারগীব ওয়াত্ তারহীব ৩০৫১, সিলসিলাতুস্ সহীহাহ্ ৭৯৩।
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنِ اقْتَبَسَ بَابًا مِنْ عِلْمِ النُّجُومِ لِغَيْرِ مَا ذَكَرَ اللَّهُ فَقَدِ اقْتَبَسَ شُعْبَةً مِنَ السِّحْرِ الْمُنَجِّمُ كَاهِنٌ والكاهنُ ساحرٌ والساحرُ كافرٌ» . رَوَاهُ رزين
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ)


যাদু ও যাদুকর সম্পর্কে উসাইমীনের ফতোয়া

এবারে আসুন শায়খ মুহাম্মদ বিন সালেহ আল উসাইমীনের বিখ্যাত ফতোয়া গ্রন্থ ফতোওয়া আরকানুল ইসলাম গ্রন্থ থেকে এই বিষয়ের বিধানটি জেনে নিই, [3]

যাদু
যাদু 2

যাদু ও যাদুকর সম্পর্কে ইসলামী শরীয়ত

আসুন জুয়েল আইচ, পিসি সরকার এবং ডেভিড কপারফিল্ড সম্পর্কে ইসলামী শরীয়তের বিধান জেনে নিই। উনারা তো অমুসলিম, তাহলে উনাদের ওপর ইসলামী শরীয়তের বিধান প্রযোজ্য হবে কিনা, দেখা যাক। যাদুকর ও জ্যোতিষীর গলায় ধারালো তরবারি – ইসলামে যাদুর হুকুম গ্রন্থের ৫০, ৫১ পৃষ্ঠায় বলা আছে, [4]

আহলে কিতাব অমুসলিম যাদুকরের বিষয়ে শরীয়তের নির্দেশ
ইমাম আবু হানীফা (রাহেমাহুল্লাহ) বলেনঃ যেহেতু হাদীসে কোন নির্দিষ্ট শ্রেণী উল্লেখ নেই সেজন্যে অমুসলিম যাদুকরকেও হত্যা করা হবে। এই জন্য যে, যাদু এক এমন অপরাধ যা মুসলিমকে হত্যা করে। অনুরূপ এক অপরাধও অমুসলিমকে হত্যা করা জরুরী করে দেয়। (আল-মুগনীঃ ১০/১১৫)
ইমাম মালেক (রাহেমাহুল্লাহ) বলেন যে, আহলে কিতাবের যাদুকরকে হত্যা করা যাবে না। তবে যদি তার যাদু দ্বারা কেউ হত্যা হয় তবে তাকে হত্যা করা হবে। আরও বলেনঃ তার যদি দ্বারা যদি কোন মুসলিম ক্ষতিগ্রস্ত হয় যার ব্যাপারে ওয়াদা ভঙ্গের অভিযোগ নেই তাকেও হত্যা করা বৈধ।
নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) লাবীদ বিন আসেমকে হত্যা এজন্য করেননি যে, তিনি নিজের জন্যে কারো প্রতিশোধ নিতেন না। লাবীদ রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে যাদু করেছিল। দ্বিতীয়তঃ এজন্যে হত্যা করেননি যে, কোথাও আবার ইয়াহুদী ও মুসলিমদের মাঝে রক্তাক্তরূপ ধারণ না করে। (ফতহুল বারীঃ ১০/২৩৬)
ইমাম ইবনে কুদামা (রাহেমাহুল্লাহ) বলেনঃ যাদুকর সে ইয়াহুদী অথবা খ্রিস্টান যেই হোক না কেন কেবলমাত্র যাদুর জন্যে তাকে হত্যা করা হবে না। যতক্ষণ না সে তার যাদুর মাধ্যমে অন্যকে হত্যা করে। এর প্রমাণ হল যে, নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) লাবীদকে হত্যা করেন নি অথচ শিরক যাদু থেকেও বড় পাপ।
তিনি আরো বলেনঃ যত দলীল এসব ব্যাপারে এসেছে সব মুসলিম যাদুকরের ব্যাপারে। কেননা সে তার যাদুর কারণে কাফের হয়ে যায়। (ফতহুল বারীঃ ১০/২৩৬)

যাদু 4

এবারে আসুন মোস্তাফিজুর রহমান বিন আব্দুল আজিজ আল-মাদানী রচিত হারাম ও কবিরা গুনাহ গ্রন্থ থেকে একটি অংশ পড়ে নিই, [5]

যাদু শিক্ষা দেয়া বা শিক্ষা নেয়া শুধু কবীরা গুনাহ্ই নয়। বরং তা শির্ক এবং কুফর ও বটে। আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন:
«وَمَا كَفَرَ سُلَيْمَاْنُ وَلَكِنَّ الشَّيَاْطِيْنَ كَفَرُوْا يُعَلِّمُوْنَ النَّاْسَ السِّحْرَ وَمَا أُنْزَلَ عَلَى الْمَلَكَيْنِ بِبَاْبِلَ هَاْرُوْتَ وَمَاْرُوْتَ وَمَا يُعَلِّمَاْنِ مِنْ أَحَدٍ حَتَّى يَقُوْلَا إِنَّمَا نَحْنُ فِتْنَةٌ فَلَا تَكْفُرْ»
‘‘সুলাইমান (আঃ) কুফরি করেননি, তবে শয়তানরাই কুফরি করেছে, তারা লোকদেরকে যাদু শেখাতো বাবেল শহরে বিশেষ করে হারূত-মারূত ব্যক্তিদ্বয়কে। (জিব্রীল ও মীকাঈল) ফিরিশ্তাদ্বয়ের উপর কোন যাদু অবতীর্ণ করা হয়নি (যা ইহুদিরা ধারণা করতো)। তবে উক্ত ব্যক্তিদ্বয় কাউকে যাদু শিক্ষা দিতো না যতক্ষণ না তারা বলতো, আমরা পরীক্ষাস্বরূপ মাত্র, অতএব তোমরা (যাদু শিখে) কুফরী করো না।
(সূরাহ বাকারাহ : ১০২)
যাদুকরের শাস্তি হচ্ছে, কারো ব্যাপারে তা সত্যিকারভাবে প্রমাণিত হয়ে গেলে তাকে শাস্তিস্বরূপ হত্যা করা। এ ব্যাপারে সাহাবাদের ঐকমত্য রয়েছে।
জুনদুব (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন:
حَدُّ السَّاْحِرِ ضَرْبَةٌ بِالسَّيْفِ.
‘‘যাদুকরের শাস্তি হচ্ছে তলোয়ারের কোপ তথা শিরশ্ছেদ’’।
(তিরমিযী ১৪৬০)
জুনদুব (রাঃ) শুধু এ কথা বলেই ক্ষান্ত হননি। বরং তিনি তা বাস্তবে কার্যকরী করেও দেখিয়েছেন।
আবূ ’উসমান নাহ্দী (রাহিমাহুল্লাহ্) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন:
كَانَ عِنْدَ الْوَلِيْدِ رَجُلٌ يَلْعَبُ، فَذَبَحَ إِنْسَانًا وَأَبَانَ رَأْسَهُ، فَعَجِبْنَا فَأَعَادَ رَأْسَهُ، فَجَاءَ جُنْدُبٌ الْأَزْدِيْ فَقَتَلَهُ.
‘‘ইরাকে ওয়ালীদ্ বিন্ ’উক্ববার সম্মুখে জনৈক ব্যক্তি খেলা দেখাচ্ছিলো। সে জনৈক ব্যক্তির মাথা কেটে শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেললো। এতে আমরা খুব বিস্মিত হলে লোকটি কর্তিত মাথা খানি যথাস্থানে ফিরিয়ে দেয়। ইতিমধ্যে জুনদুব (রাঃ) এসে তাকে হত্যা করেন’’। (বুখারী/আত্তা’রীখুল্ কাবীর : ২/২২২ বায়হাক্বী : ৮/১৩৬)
তেমনিভাবে উম্মুল্ মু’মিনীন ’হাফ্সা (রাঃ) ও নিজ ক্রীতদাসীকে জাদুকরী প্রমাণিত হওয়ার পর হত্যা করেন।
‘আব্দুল্লাহ্ বিন্ ’উমর (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন:
سَحَرَتْ حَفْصَةَ بِنْتَ عُمَرَ ـ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا ـ جَارِيَةٌ لَهَا، فَأَقَرَّتْ بِالسِّحْرِ وَأَخْرَجَتْهُ، فَقَتَلَتْهَا، فَبَلَغَ ذَلِكَ عُثْمَانُ فَغَضِبَ، فَأَتَاهُ اِبْنُ عُمَرَ ـ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا ـ فَقَالَ: جَارِيَتُهَا سَحَرَتْهَا، أَقَرَّتْ بِالسِّحْرِ وَأَخْرَجَتْهُ، قَالَ: فَكَفَّ عُثْمَانُ قَالَ الرَّاوِيْ: وَكَأَنَّهُ إِنَّمَا كَانَ غَضَبُهُ لِقَتْلِهَا إِيَّاهَا بِغَيْرِ أَمْرِهِ.
‘‘হাফ্সা বিন্ত ’উমর (রাযিয়াল্লাহু আন্হা) কে তাঁর এক ক্রীতদাসী যাদু করে। এমনকি সে ব্যাপারটির স্বীকারোক্তিও করে এবং যাদুর বস্ত্তটি উঠিয়ে ফেলে দেয়। এতদ্ কারণে ’হাফ্সা (রাঃ) ক্রীতদাসীটিকে হত্যা করেন। সংবাদটি ’উস্মান (রাঃ) এর নিকট পৌঁছুলে তিনি খুব রাগান্বিত হন। অতঃপর ‘আব্দুল্লাহ্ বিন্ ’উমর (রাঃ) তাঁকে ব্যাপারটি বুঝিয়ে বললে তিনি এ ব্যাপারে চুপ হয়ে যান তথা তাঁর সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। বর্ণনাকারী বলেন: ’উসমান (রাঃ) এর অনুমতি না নিয়ে ক্রীতদাসীটিকে হত্যা করার কারণেই তিনি এতো রাগান্বিত হন’’।
(‘আব্দুর রায্যাক, হাদীস ১৮৭৪৭ বায়হাক্বী : ৮/১৩৬)
অনুরূপভাবে ’উমর (রাঃ) ও তাঁর খিলাফতকালে সকল যাদুকর পুরুষ ও মহিলাকে হত্যা করার আদেশ জারি করেন।
বাজালা থেকে বর্ণিত তিনি বলেন:
كَتَبَ عُمَرُ بْنُ الْـخَطَّابِ أَنِ اقْتُلُوْا كُلَّ سَاحِرٍ وَسَاحِرَةٍ، قَالَ الرَّاوِيْ: فَقَتَلْنَا ثَلَاثَ سَوَاحِرَ.
’উমর (রাঃ) নিজ খিলাফতকালে এ আদেশ জারি করে চিঠি পাঠান যে, তোমরা সকল যাদুকর পুরুষ ও মহিলাকে হত্যা করো। বর্ণনাকারী বলেন: অতঃপর আমরা তিনজন মহিলা যাদুকরকে হত্যা করি’’।
(আবূ দাউদ ৩০৪৩ বায়হাকী : ৮/১৩৬ ইব্নু আবী শাইবাহ্, হাদীস ২৮৯৮২, ৩২৬৫২ আব্দুর রায্যাক, হাদীস ৯৯৭২; আহমাদ ১৬৫৭; আবূ ইয়া’লা ৮৬০, ৮৬১)
’উমর (রাঃ) এর খিলাফতকালে উক্ত আদেশের ব্যাপারে কেউ কোন বিরোধিতা দেখাননি বিধায় উক্ত ব্যাপারে সবার ঐকমত্য রয়েছে বলে প্রমাণিত হলো।

যাদু 6
যাদু 8
যাদু 10

এবারে আবার আসুন যাদুকর ও জ্যোতিষীর গলায় ধারালো তরবারি – ইসলামে যাদুর হুকুম গ্রন্থ থেকে পড়ি, ৪৮, ৪৯ পৃষ্ঠায় বলা আছে, [6]

১। ইমাম মালেক (রাহেমাহুল্লাহ) বলেন, যে ব্যক্তি যাদু করে তার জন্য আল্লাহ তায়ালার এই বাণী প্রযোজ্যঃ
وَلَقَدْ عَلِمُوا لَمَنِ اشْتَرَاهُ مَا لَهُ فِي الْآخِرَةِ مِنْ خَلَاقٍ
অর্থঃ “নিশ্চয় তারা জানে যে, যা তারা ক্রয় করেছে আখেরাতে এর জন্য কোন অংশ নেই।” (সূরা বাকারাঃ ১০২) অতঃপর বলেনঃ আমার অভিমত হল, যাদুকরকে হত্যা করা, যদি সে যাদু কর্ম করে থাকে।
২। ইবনে কুদামা (রাহেমাহুল্লাহ) বলেনঃ যাদুকরের শাস্তি হত্যা। আর এই অভিমত পোষণ করেছেন, উমর, উসমান বিন আফফান, ইবনে আমর বিন আব্দুল আযীয, আবু হানীফা এবং ইমাম মালেক।
৩। ইমাম কুরতুবী (রাহেমাহুল্লাহ) বলেন, মুসলিম মনিষীদের মাঝে মুসলিম যাদুকর ও (অমুসলিম) যিম্মী যাদুকরের শাস্তির ব্যাপারে মতবিরোধ রয়েছে।
ইমাম মালেক (রাহেমাহুল্লাহ) বলেন যে, যখন মুসলমান যাদুকর কুফুরি কালামের মাধ্যমে যাদু করে তবে তাকে হত্যা করা হবে। আর তার তাওবা ও গ্রহণীয় হবে না। আর না তাকে তাওবা করতে বলা হবে। কেননা এটা এমন বিষয় যার দ্বারা আল্লাহর নির্দেশকে লঙ্ঘন করা হয়। এজন্য আল্লাহ তায়ালা যাদুকে কুফুরি বলে আখ্যায়িত করেছেন।
وَمَا يُعَلِّمَانِ مِنْ أَحَدٍ حَتَّىٰ يَقُولَا إِنَّمَا نَحْنُ فِتْنَةٌ فَلَا تَكْفُرْ
অর্থঃ “তারা যাকেই যাদু বিদ্যা শিখাতো তাকে বলে দিত যে তোমরা (যাদু শিখে) কুফুরি করো না, নিশ্চয়, আমরা তোমাদের জন্য পরীক্ষা।” (সূরা বাকারাঃ ১০২)
আর এই অভিমত পোষণ করেছেন ইমাম আহমদ বিন হাম্বল, আবু সাওর, ইসহাক এবং আবু হানীফা (রাহেমাহুমুল্লাহ)।
৪ । ইমাম ইবনে মুনযির বলেন যখন কোন ব্যক্তি স্বীকার করে যে, সে কুফুরি কালামা দিয়ে যাদু করেছে, তখন তাকে হত্যা করা ওয়াজিব। যদি সে তাওবা না করে থাকে। এমনিভাবে কারো কুফুরীর যদি প্রমাণ ও বর্ণনা সাব্যস্ত হয়ে যায়, তবুও তাকে হত্যা করা ওয়াজিব। আর যদি তার কথা কুফুরি না হয় তবে তাকে হত্যা করা বৈধ হবে না। আর যদি যাদুকর তার যাদু দ্বারা কাউকে হত্যা করে তবে তাকেও হত্যা করা হবে আর যদি ভুলক্রমে হত্যা করে তবে তাতে দিয়াত দিতে হবে।
৫। হাফেজ ইবনে কাসীর (রাহেমাহুল্লাহ) বলেনঃ মনীষীগণ আল্লাহ তায়ালার নিম্নোল্লিখিত আয়াত দ্বারা প্রমাণ করেছেন যাতে যাদুকর সম্পর্কে বলা হয়েছেঃ
وَلَوْ أَنَّهُمْ آمَنُوا وَاتَّقَوْا
অর্থাৎ “যদি তারা ঈমান আনয়ন করত এবং আল্লাহকে ভয় করত।” সুতরাং এই আয়াত দ্বারা অনেকেই যাদুকরকে কাফের বলে মত পোষণ করেছেন। আবার অনেকেই অভিমত পোষণ করেছেন যে, সে কাফের তো নয় তবে তার শাস্তি শিরচ্ছেদ কেননা ইমাম শাফেয়ী (রাহেমাহুল্লাহ), আহমদ বিন হাম্বল (রাহেমাহুল্লাহ) বর্ণনা করেছেন, তারা উভয়ে বলেনঃ বলেছেন যে, তিনি বাজলা বিন আব্দকে বলতে শুনেছেন যে, উমর বিন খাত্তাব (রাযিয়াল্লাহু আনহু) এ মর্মে নির্দেশ জারি করেছেন যে, প্রত্যেক যাদুকর পুরুষ ও মহিলার শিরচ্ছেদ করে দাও। তিনি বলেন যে, তিনি তিনটি যাদুকর মহিলাকে হত্যা করেছেন। ইবনে কাসীর (রাহেমাহুল্লাহ) বলেন যে, ইমাম বুখারী (রাহেমাহুল্লাহ) এভাবেই বর্ণনা দিয়েছেন। (বুখারীঃ ২/২৫৭)
ইবনে কাসীর (রাহেমাহুল্লাহ) বলেনঃ সহীহ বিশুদ্ধ বর্ণনায় আছে যা হাফসা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত, তাকে তার এক বান্ধবী যাদু করেছেন। অতঃপর তার নির্দেশে যাদুকরকে হত্যা করা হয়েছে।
ইমাম আহমদ থেকে বর্ণিত যে, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)এর তিন সাহাবা থেকে যাদুকরকে হত্যার ফতোয়া রয়েছে। (তাফসীর ইবনে কাসীরঃ ১/১৪৪)
মূলকথাঃ পূর্বের আলোচনা হতে বুঝা যায় যে, ইমাম শাফেয়ী (রাহেমাহুল্লাহ) ছাড়া জমহুর উলামা যাদুকরকে হত্যার মত পোষণ করেন, তিনি বলেনঃ যাদুকরের যাদু দ্বারা যদি কেউ মারা যায়, তবে তার (কিসাসের) পরিবর্তে তাকে হত্যা করা হবে।

যাদু 12

উপসংহার

ইসলামী শরীয়তে যাদুকরদের হত্যার বিধান শুধু একটি ধর্মীয় আইন নয়, এটি মানব সভ্যতার বিবেক ও নৈতিকতার প্রতি সরাসরি চ্যালেঞ্জ। এমন একটি বিধান, যা কোনো ব্যক্তির চিন্তা, বিশ্বাস বা তথাকথিত অতিপ্রাকৃত ক্ষমতার অভিযোগের ভিত্তিতে তাকে মৃত্যুদণ্ড দিতে নির্দেশ দেয় — তা সভ্যতার পরিভাষায় ন্যায়বিচার নয়, বরং বর্বরতা। এটি সেই যুগের অন্ধকারাচ্ছন্ন মানসিকতার প্রতিফলন, যেখানে অজ্ঞতা, ভয় এবং ধর্মীয় কর্তৃত্ব মানুষের জীবন-মৃত্যুর বিচার করত, প্রমাণ নয়; যুক্তি নয়; মানবিকতা নয়।

ইসলামী ফিকহের বহু ব্যাখ্যা, বিশেষ করে হানাফি, মালিকি ও হাম্বলি মতবাদে “সাহির” বা “যাদুকর”কে কাফির ঘোষণা করে হত্যা বৈধ বলা হয়েছে — অথচ “যাদু” নামের এই ধারণাটিই আজ বিজ্ঞান ও যুক্তির আলোকে এক প্রমাণহীন কুসংস্কার ছাড়া কিছু নয়। প্রমাণহীন এক অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের অনুমোদন, যুক্তির আদালতে একে ন্যায়বিচার বলা যায় না — এটি নৃশংসতা। আর যারা মানুষকে আনন্দ দেয়ার জন্য যাদু দেখায়, তারা তো আসলে কোন অন্যায় করছে না, কারো ক্ষতিও করছে না। তাহলে শুধুমাত্র সাধারণ মানুষকে আনন্দ দেয়ার জন্য তাদের হত্যা করা কীভাবে কোন সভ্য বিধান হতে পারে?

আরও ভয়ঙ্কর হলো, এই বিধান কেবল ধর্মীয় ব্যাখ্যা নয়; অনেক ইসলামি সমাজে এটি এখনো মানুষ হত্যার ধর্মীয় বৈধতা হিসেবে ব্যবহার হয়। ইতিহাসে যেমন মিথ্যা অভিযোগে বহু নারীকে “যাদুকরী” আখ্যা দিয়ে হত্যা করা হয়েছে, তেমনি আজও ধর্মীয় উন্মাদনা ও শরীয়ত-নামক আইনি সন্ত্রাসের আড়ালে এই বর্বরতা চলমান। মানবাধিকারের আধুনিক ধারণা — জীবন, মতপ্রকাশ, চিন্তা ও বিশ্বাসের স্বাধীনতা — ইসলামী শরীয়তের এই বিধানের সঙ্গে সম্পূর্ণ অসামঞ্জস্যপূর্ণ। একটি সভ্য সমাজে রাষ্ট্র ও আইন কখনোই কুসংস্কার, গুজব বা ধর্মীয় ভয়কে ভিত্তি করে মৃত্যুদণ্ড দিতে পারে না।

যে ধর্মীয় ব্যবস্থা যুক্তি নয়, বরং অন্ধবিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে হত্যার আদেশ দেয়, তা নৈতিকভাবে টেকসই নয়; বরং এটি মানবতার বিবর্তন প্রক্রিয়ার পরিপন্থী। ইসলামী শরীয়তের যাদুকর হত্যার এই বিধান তাই শুধু একটি আইনি সমস্যা নয়, এটি সভ্যতা বনাম অন্ধবিশ্বাসের সংঘর্ষের প্রতীক।

About This Article

Genre: Semi-Academic Skeptical Analysis

Epistemic Position: Scientific Skepticism

This article belongs to the skeptical-rationalist analytical tradition of Shongshoy.com.

It applies historical criticism, empirical reasoning, logical analysis, and scientific skepticism in evaluating religious, philosophical, and historical claims.

The objective is not theological neutrality, but evidence-based critical examination and adversarial analysis of ideas and narratives.

This article should primarily be evaluated through: source quality, evidentiary strength, logical rigor, and factual consistency.


তথ্যসূত্রঃ
  1. সহীহ বুখারী, হাদিসঃ ২৬৫২ ↩︎
  2. সহীহ মুসলিম, হাদিসঃ ২৫৩৩ ↩︎
  3. ফতোওয়া আরকানুল ইসলাম, শায়খ মুহাম্মদ বিন সালেহ আল উসাইমীন, পৃষ্ঠা ১৩৫-১৩৬ ↩︎
  4. যাদুকর ও জ্যোতিষীর গলায় ধারালো তরবারি – ইসলামে যাদুর হুকুম, বায়তুস সালাম প্রকাশনী, সৌদি আরব, ওয়াহীদ বিন আব্দুস সালাম বালী, পৃষ্ঠা ৫০, ৫১ ↩︎
  5. হারাম ও কবিরা গুনাহ, মোস্তাফিজুর রহমান বিন আব্দুল আজিজ আল-মাদানী, পৃষ্ঠা ১১৬, ১১৭, ১১৮ ↩︎
  6. যাদুকর ও জ্যোতিষীর গলায় ধারালো তরবারি – ইসলামে যাদুর হুকুম, বায়তুস সালাম প্রকাশনী, সৌদি আরব, ওয়াহীদ বিন আব্দুস সালাম বালী, পৃষ্ঠা ৪৮, ৪৯ ↩︎