
সারসংক্ষেপ
মানবসভ্যতার ইতিহাসে যেসব ধর্মীয় চরিত্র মানুষের চিন্তা, নৈতিকতা, রাজনীতি, শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছেন, যিশু নিঃসন্দেহে তাঁদের অন্যতম। পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি অঞ্চলে তাঁর নাম প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পৌঁছেছে। খ্রিস্টীয় বিশ্বাসে তিনি কেবল একজন ধর্মপ্রচারক নন, তিনি ঈশ্বরের পুত্র, মানবদেহে আবির্ভূত ঐশী সত্তা, অলৌকিকভাবে জন্ম নেওয়া ত্রাণকর্তা। তাঁর জীবনকাহিনীতে আমরা পাই ভবিষ্যদ্বাণীকৃত জন্ম, এক নিষ্ঠুর শাসকের হাতে শিশুহত্যার হুমকি, স্বর্গীয় সুরক্ষা, অলৌকিক চিকিৎসা, মৃতকে জীবিত করা, প্রকৃতির ওপর কর্তৃত্ব, মানবজাতির জন্য আত্মবলিদান, মৃত্যু, পুনরুত্থান, স্বর্গারোহণ এবং শেষ পর্যন্ত সমগ্র মানবজাতির বিচারকের আসনে অধিষ্ঠিত হওয়ার দাবি। কিন্তু এই কাহিনীগুলোর কোনোটি সাংস্কৃতিক শূন্যতার মধ্যে জন্ম নেয়নি। যিশুর বহু শতাব্দী আগে থেকেই মিশরীয়, মেসোপটেমীয়, গ্রিক, রোমান, ইরানি, ভারতীয় এবং ইহুদি ধর্মীয় কল্পনায় দেবশিশু, দেবপুত্র, অলৌকিকভাবে জন্ম নেওয়া নায়ক, হত্যার হাত থেকে রক্ষা পাওয়া ভবিষ্যৎ রাজা, মৃত্যুকে অতিক্রমকারী দেবতা, মৃতদের জগতের অধিপতি, স্বর্গে উন্নীত বীর এবং মানুষের মুক্তি বা পরিত্রাণের সঙ্গে যুক্ত অতিমানবীয় চরিত্রের দীর্ঘ ঐতিহ্য ছিল।
এই প্রবন্ধে আমরা হোরাস, ওসিরিস, কৃষ্ণ, ডায়োনিসাস, অ্যাসক্লেপিয়াস, হেরাক্লেস, রোমুলাসসহ বিভিন্ন প্রাচীন ধর্মীয় ও পৌরাণিক চরিত্রের জন্ম, দেবত্ব, অলৌকিক ক্ষমতা, মৃত্যু, মৃত্যুকে অতিক্রম করা, স্বর্গীয় মর্যাদা এবং ত্রাণকর্তাসুলভ বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে খ্রিস্টীয় যিশু চরিত্রের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করব। একইসঙ্গে দেখা হবে, কীভাবে পুরোনো ধর্মীয় কাহিনী, ইহুদি ধর্মগ্রন্থের চরিত্র ও ভবিষ্যদ্বাণী, ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের দেবমানব ধারণা, রাজকীয় প্রচারণা এবং মানুষের বহু পুরোনো পৌরাণিক কল্পনা ধীরে ধীরে যিশুর চারপাশে নতুন অর্থে সংগঠিত হয়েছে। যিশুর চরিত্র কোনো একটি পুরোনো দেবতার সরল পুনরাবৃত্তি নয়। বিষয়টি তার চেয়ে অনেক গভীর। এখানে আমরা দেখতে পাই বহু শতাব্দীর ধর্মীয় স্মৃতি, পরিচিত কাহিনীর ছাঁচ, পুরোনো প্রতীক এবং নতুন ধর্মতাত্ত্বিক প্রয়োজন একত্রিত হয়ে কীভাবে একজন ইহুদি ধর্মপ্রচারককে পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী দেবমানবীয় চরিত্রগুলোর একটিতে রূপান্তর করেছে।
| প্রাচীন চরিত্র বা ঐতিহ্য | যিশুর কাহিনীর সঙ্গে আলোচিত মিল বা মোটিফ | গুরুত্বপূর্ণ অমিল বা পার্থক্য | প্রবন্ধে আলোচনার মূল দিক |
|---|---|---|---|
| হোরাস | দেবশিশু, দেবপুত্র, পিতার রাজকীয় ও ঐশী উত্তরাধিকার, বিপদের মুখে শিশুকে রক্ষা, ভবিষ্যৎ বিজয়ী ও বৈধ রাজা | হোরাসের জন্মকাহিনী যিশুর কুমারী গর্ভধারণের অনুরূপ নয়; তাঁর জীবনকাহিনীও যিশুর ক্রুশবিদ্ধতা ও পুনরুত্থানের সরাসরি সমান্তরাল নয় | দেবপুত্র, বিপন্ন দেবশিশু, পিতা-পুত্রের ঐশী রাজত্ব এবং প্রাচীন মিশরীয় ধর্মীয় কল্পনার প্রভাব |
| ওসিরিস | দেবতার মৃত্যু, মৃত্যুকে অতিক্রম করা, নতুন অস্তিত্বে প্রত্যাবর্তন, মৃতদের জগতের ওপর কর্তৃত্ব, মৃত্যু থেকে নতুন জীবনের আশা | ওসিরিস যিশুর মতো ক্রুশবিদ্ধ হয়ে তিন দিন পর পৃথিবীর জীবনে ফিরে আসেন না; তাঁর পুনর্জীবনের প্রকৃতি ও পরকালীন ভূমিকা আলাদা | যিশুর বহু আগে দেবতার মৃত্যু, পুনর্জীবন, পরকাল ও মুক্তির সঙ্গে যুক্ত ধর্মীয় ধারণার অস্তিত্ব |
| আইসিস ও শিশু হোরাস | দেবমাতা ও দেবশিশু, মায়ের কোলে পবিত্র শিশু, শিশুকে স্তন্যপান ও রক্ষা, মাতৃত্ব ও ঐশী সুরক্ষার প্রতীক | আইসিস ও মেরির ধর্মতত্ত্ব এক নয়; দুই ধর্মে মাতৃচরিত্রের অবস্থান ও উৎপত্তি ভিন্ন | খ্রিস্টধর্মের বহু আগে প্রতিষ্ঠিত দেবমাতা ও দেবশিশুর প্রতিমা এবং পরবর্তী মেরি ও শিশু যিশুর চিত্রকল্পের সাংস্কৃতিক পটভূমি |
| মূসা | শিশুহত্যার আদেশ, নির্বাচিত শিশুর অলৌকিক রক্ষা, অত্যাচারী শাসক, পরে মুক্তিদাতার আবির্ভাব | মূসা দেবপুত্র নন এবং তাঁর কাহিনীর ধর্মতাত্ত্বিক উদ্দেশ্য যিশুর কাহিনী থেকে আলাদা | ম্যাথিউর যিশুকে নতুন মূসা হিসেবে নির্মাণ, হেরোদের শিশুহত্যা ও মিসরে পলায়নের সাহিত্যিক কাঠামো |
| কৃষ্ণ | ভবিষ্যদ্বাণীকৃত অসাধারণ শিশু, অত্যাচারী রাজা কংসের আতঙ্ক, শিশুহত্যা, নবজাতককে গোপনে সরিয়ে রক্ষা, পরে অত্যাচারী শাসকের পতন | কৃষ্ণের অবতারতত্ত্ব, জীবনকাহিনী ও ধর্মীয় ভূমিকা যিশুর থেকে ভিন্ন; বিভিন্ন কৃষ্ণকাহিনীর রচনাকালও এক নয় | বিপন্ন দেবশিশু ও হত্যাকারী শাসকের পুনরাবৃত্ত পৌরাণিক ছাঁচ এবং ভারতীয় ও খ্রিস্টীয় কাহিনীর তুলনামূলক বিশ্লেষণ |
| গ্রিক-রোমান দেবমানব ও অর্ধদেব ঐতিহ্য | দেবতা ও মানব নারীর মিলনে অসাধারণ সন্তানের জন্ম, ঐশী পিতৃত্ব, অতিমানবীয় ক্ষমতা, বিশেষ নিয়তি, বীরত্ব, মানুষের রক্ষা, রাজত্ব বা সভ্যতা প্রতিষ্ঠা | গ্রিক-রোমান পুরাণে দেবতার সঙ্গে মানুষের শারীরিক মিলনের কাহিনী সরাসরি বলা হয়; যিশুর ক্ষেত্রে মানব পিতাকে সম্পূর্ণ বাদ দিয়ে পবিত্র আত্মার মাধ্যমে অলৌকিক গর্ভধারণের ধর্মতত্ত্ব তৈরি করা হয়েছে | হেরাক্লেস, পার্সিয়াস, ডায়োনিসাস, অ্যাসক্লেপিয়াস ও রোমুলাসের মতো চরিত্রের মাধ্যমে যিশুর বহু আগে থেকেই প্রচলিত “ঐশী পিতা + মানবী মা + অতিমানবীয় বীর বা রক্ষাকর্তা” ছাঁচের বিশ্লেষণ |
| ডায়োনিসাস | দেবপুত্রত্ব, অস্বাভাবিক জন্ম, মৃত্যু ও নতুন জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত কাহিনী, আচারভিত্তিক মুক্তি ও দেবতার সঙ্গে অংশগ্রহণের ধারণা | ডায়োনিসাসের জন্ম, মৃত্যু ও পুনরাগমনের বিভিন্ন সংস্করণ যিশুর সুসমাচারীয় কাহিনীর অনুরূপ নয় | প্রাচীন গ্রিক ধর্মে দেবপুত্র, মৃত্যু, নবজীবন, আচার ও মুক্তিসংক্রান্ত ধারণার বিস্তৃত পরিবেশ |
| অ্যাসক্লেপিয়াস | দেবপুত্র, অলৌকিক চিকিৎসা, রোগ নিরাময়, মৃতকে জীবিত করার কাহিনী, মানুষের কাছে ত্রাণকারী চিকিৎসক হিসেবে মর্যাদা | তিনি মানবজাতির পাপের জন্য আত্মবলিদানকারী মসিহ নন এবং তাঁর ধর্মীয় ভূমিকা চিকিৎসা ও আরোগ্যকে কেন্দ্র করে | যিশুর বহু আগে অলৌকিক চিকিৎসক ও মৃতকে জীবিত করার ক্ষমতাসম্পন্ন দেবমানবের পরিচিত ঐতিহ্য |
| হেরাক্লেস | দেবতার পুত্র, অতিমানবীয় কার্যকলাপ, দুঃখভোগ, পার্থিব জীবনের সমাপ্তির পর দেবত্ব ও স্বর্গীয় মর্যাদা লাভ | হেরাক্লেসের মৃত্যু ও দেবত্বলাভ যিশুর পুনরুত্থান ও পরিত্রাণতত্ত্বের সমান নয় | মানুষ বা অর্ধদেব চরিত্রের মৃত্যুর পর দেবত্ব ও স্বর্গীয় অবস্থানে উন্নীত হওয়ার গ্রিক ঐতিহ্য |
| রোমুলাস ও রোমান দেবত্বের ঐতিহ্য | অসাধারণ জন্ম, দেবীয় পিতৃত্ব, মৃত্যুর পর অন্তর্ধান বা স্বর্গে উন্নীত হওয়ার কাহিনী, দেবত্বপ্রাপ্ত শাসক | রোমুলাস বা রোমান সম্রাটদের দেবত্ব রাজনৈতিক ও সাম্রাজ্যিক কাঠামোর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিল | যিশুর যুগের পৃথিবীতে দেবপুত্র, প্রভু, ত্রাণকর্তা ও স্বর্গারোহণকারী শাসকের ভাষা আগে থেকেই কীভাবে প্রচলিত ছিল |
| ইহুদি ধর্মীয় ঐতিহ্য | মসিহ, দাউদের উত্তরাধিকারী, মূসাসদৃশ মুক্তিদাতা, দুঃখভোগী ধার্মিক, মানবপুত্র, শেষবিচার, মৃতের পুনরুত্থান | ইহুদি ঐতিহ্যের এসব ধারণা একক কোনো চরিত্রে যিশুর মতো একত্রিত ছিল না এবং পরবর্তী খ্রিস্টীয় ঈশ্বরত্বের ধারণাও শুরু থেকেই একই রূপে উপস্থিত ছিল না | হিব্রু ধর্মগ্রন্থ ও দ্বিতীয় মন্দির যুগের ইহুদি ধারণাগুলো কীভাবে যিশুর চরিত্র নির্মাণের সবচেয়ে প্রত্যক্ষ সাহিত্যিক ভিত্তি তৈরি করেছে |
| খ্রিস্টীয় যিশু | দেবপুত্র, অলৌকিক জন্ম, বিপন্ন শিশু, অলৌকিক চিকিৎসক, মৃতকে জীবিতকারী, আত্মবলিদানকারী ত্রাণকর্তা, পুনরুত্থিত প্রভু, স্বর্গারোহণকারী ও শেষবিচারের বিচারক | এসব বৈশিষ্ট্যের সমন্বয় এবং ইহুদি মসিহবাদকে কেন্দ্র করে নির্মিত পূর্ণ চরিত্রটি খ্রিস্টধর্মের নিজস্ব ঐতিহাসিক ও ধর্মতাত্ত্বিক বিকাশের ফল | বহু প্রাচীন পৌরাণিক মোটিফ, ইহুদি ধর্মীয় প্রত্যাশা এবং গ্রিক-রোমান দেবমানব ধারণা কীভাবে স্তরে স্তরে একত্রিত হয়ে খ্রিস্টীয় যিশুর পূর্ণাঙ্গ চরিত্র নির্মাণ করেছে |
ভূমিকা: ইহুদি ধর্মপ্রচারক থেকে মহাজাগতিক ঈশ্বরপুত্র
খ্রিস্টধর্মের যিশুকে যদি শুধু একজন ঐতিহাসিক মানুষের জীবনী হিসেবে দেখা হয়, তাহলে তাঁর কাহিনীর বিস্তার এক অদ্ভুত সমস্যার সামনে দাঁড় করায়। প্রচলিত খ্রিস্টীয় বিশ্বাসে তিনি এমন এক সত্তা, যিনি কোনো মানব পিতার মাধ্যমে জন্ম নেননি, তাঁর জন্মের আগেই স্বর্গদূত তাঁর পরিচয় ঘোষণা করেছে, তাঁর জন্মের সঙ্গে ভবিষ্যদ্বাণী ও স্বর্গীয় নিদর্শন যুক্ত হয়েছে, তিনি রোগ সারিয়েছেন, অশুভ আত্মা তাড়িয়েছেন, মৃত মানুষকে জীবিত করেছেন, পানির ওপর হেঁটেছেন, ঝড় থামিয়েছেন, সামান্য খাবার দিয়ে হাজার মানুষকে খাইয়েছেন, নিজের মৃত্যুর কথা আগে থেকে জানতেন, মানবজাতির পাপের জন্য প্রাণ দিয়েছেন, মৃত্যুর পর আবার জীবিত হয়েছেন এবং স্বর্গে উঠে গেছেন। এখানেই গল্প শেষ নয়। ভবিষ্যতে তিনি আবার পৃথিবীতে ফিরে আসবেন, মৃতদের পুনরুত্থিত করবেন এবং সমগ্র মানবজাতির চূড়ান্ত বিচার করবেন। অথচ যিশু সম্পর্কে আমাদের হাতে থাকা প্রাচীনতম খ্রিস্টীয় লেখাগুলোতে এই বিশাল দেবমানবীয় জীবনীটি শুরু থেকেই পূর্ণাঙ্গ অবস্থায় পাওয়া যায় না। বরং উৎসগুলোর কালানুক্রমিক স্তর লক্ষ্য করলে দেখা যায়, যিশুকে ঘিরে সংরক্ষিত জীবনীমূলক কাহিনী সময়ের সঙ্গে আরও বিস্তৃত, আরও অলৌকিক এবং আরও মহাজাগতিক হয়ে উঠেছে। ইতিহাসের একজন ধর্মপ্রচারকের চারপাশে ধর্মীয় কল্পনার স্তর জমতে জমতে কীভাবে এক মহাজাগতিক ঈশ্বরপুত্রের জন্ম হতে পারে, যিশুর সাহিত্যিক বিবর্তন তার একটি অসাধারণ উদাহরণ। [1]
যিশুর কথিত মৃত্যুর কয়েক দশকের মধ্যে লেখা পলের প্রামাণ্য চিঠিগুলো খ্রিস্টধর্মের সবচেয়ে প্রাচীন সংরক্ষিত সাহিত্যগুলোর মধ্যে পড়ে। সেখানে পলের প্রধান যিশু হলেন ক্রুশবিদ্ধ ও পুনরুত্থিত খ্রিস্ট, যার মৃত্যু ও পুনরুত্থান মানুষের পরিত্রাণের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু পরবর্তী খ্রিস্টীয় সংস্কৃতিতে যিশুর জন্মকে ঘিরে যে নাটকীয় ঘটনাগুলো প্রায় অবিচ্ছেদ্য সত্যে পরিণত হয়েছে, যেমন বেথলেহেমে অলৌকিক জন্ম, পূর্বদেশীয় জ্ঞানীদের আগমন, বিশেষ নক্ষত্র, হেরোদের শিশুহত্যা এবং মিসরে পলায়ন, পলের চিঠিতে এসবের পূর্ণ কোনো কাহিনী নেই। সবচেয়ে প্রাচীন স্বীকৃত সুসমাচার হিসেবে সাধারণভাবে বিবেচিত মার্কের সুসমাচারেও কোনো জন্মকাহিনী নেই। সেখানে যিশু সরাসরি একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ হিসেবে জন ব্যাপটিস্টের কাছে উপস্থিত হন। জন্ম ও শৈশবের বিস্তৃত অলৌকিক কাহিনী আসে পরে ম্যাথিউ ও লুকের সুসমাচারে। তাও দুই লেখক একই গল্প বলেননি। ম্যাথিউর বর্ণনায় যিশুর পরিবারকে বেথলেহেমকেন্দ্রিক মনে হয়, হেরোদের হত্যার হুমকির কারণে তারা মিসরে পালায় এবং পরে নাজারেথে বসতি স্থাপন করে। লুকের কাহিনীতে পরিবারটি আগে থেকেই নাজারেথের বাসিন্দা, আদমশুমারির কারণে বেথলেহেমে যায়, জন্মের পর জেরুসালেমে ধর্মীয় আচার সম্পন্ন করে এবং তারপর নাজারেথে ফিরে আসে। একটি একক সংরক্ষিত স্মৃতি হলে এমন দুই ভিন্ন নির্মাণের প্রয়োজন হতো না। বরং এখানে লেখকেরা নিজেদের ধর্মতাত্ত্বিক উদ্দেশ্য অনুযায়ী যিশুর জন্মকে নতুন করে সাজাচ্ছেন। ম্যাথিউ যিশুকে নতুন মূসা এবং ইহুদি ভবিষ্যদ্বাণীর পূর্ণতাকারী হিসেবে নির্মাণ করছেন, লুক আবার তাঁকে বৃহত্তর মানবজাতির ত্রাণকর্তা হিসেবে আলাদা সাহিত্যিক কাঠামোয় স্থাপন করছেন। [2]
এখানেই যিশুর পৌরাণিকীকরণের প্রকৃত রূপটি ধরা পড়ে। একজন ঐতিহাসিক মানুষ সত্যিই থাকতে পারেন, কিন্তু তাঁর ঐতিহাসিক অস্তিত্ব তাঁর নামে প্রচলিত সব অলৌকিক কাহিনীকে ইতিহাসে পরিণত করে না। বাস্তব মানুষকে ঘিরে মিথ তৈরি হওয়া মানবসভ্যতায় অত্যন্ত পরিচিত ঘটনা। আলেকজান্ডারকে ঘিরে জন্মেছিল অলৌকিক জন্মের কিংবদন্তি, রোমুলাসকে দেবপুত্র ও রোমের ভাগ্যনির্ধারক হিসেবে কল্পনা করা হয়েছিল, সম্রাটদের দেবত্ব দেওয়া হয়েছে, হেরাক্লেসকে মানুষের সন্তান থেকে দেবত্বে উন্নীত করা হয়েছে, অ্যাপোলোনিয়াসকে ঘিরে অলৌকিক চিকিৎসা ও অতিমানবীয় জ্ঞানের কাহিনী তৈরি হয়েছে। প্রাচীন সমাজে কোনো সম্মানিত ধর্মগুরু, বীর বা রাজাকে মানুষের সীমা অতিক্রম করিয়ে দেবত্বের জগতে তুলে নেওয়া কোনো অস্বাভাবিক ব্যাপার ছিল না। যিশুর ক্ষেত্রেও আমরা সেই পরিচিত মানবিক প্রবণতার এক অভূতপূর্ব সফলতা দেখি। কয়েক প্রজন্মের মধ্যেই একজন গালিলীয় ধর্মপ্রচারকের চারপাশে এমন এক মহাজাগতিক জীবনী নির্মিত হয়, যেখানে তিনি আর শুধু একজন মানুষ নন, তিনি সৃষ্টির আগে থেকেই বিদ্যমান ঈশ্বরীয় সত্তা, মৃত্যুর বিজয়ী এবং শেষ বিচারের অধিপতি। [3]
যিশুর জন্ম কোনো সাংস্কৃতিক শূন্যতায় হয়নি
যিশুর কাহিনী বুঝতে হলে তাঁর সময়কার পৃথিবীটিকে বুঝতে হবে। প্রথম শতকের প্যালেস্টাইন কোনো দেয়ালঘেরা ধর্মীয় দ্বীপ ছিল না, যেখানে ইহুদিরা হাজার বছর ধরে বাইরের পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কেবল নিজেদের ধর্মীয় ধারণার মধ্যেই বসবাস করছিল। এর বহু আগেই এই অঞ্চল আসিরীয়, ব্যাবিলনীয়, পারস্যীয়, গ্রিক এবং পরে রোমান সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অভিঘাতের মধ্য দিয়ে গেছে। আলেকজান্ডারের বিজয়ের পর গ্রিক ভাষা ও চিন্তা পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে এত গভীরভাবে ছড়িয়ে পড়ে যে বহু ইহুদিও গ্রিক ভাষায় কথা বলত, গ্রিক ভাষাতেই ইহুদি ধর্মগ্রন্থের গুরুত্বপূর্ণ অনুবাদ তৈরি হয়েছিল এবং আলেকজান্দ্রিয়ার মতো শহরে ইহুদি ও গ্রিক চিন্তার গভীর সংমিশ্রণ ঘটেছিল। প্রথম শতকে প্যালেস্টাইন ছিল রোমান সাম্রাজ্যের অংশ। মিশর, সিরিয়া, এশিয়া মাইনর, গ্রিস ও রোমের মধ্যে মানুষ, সৈন্য, বণিক, দাস, ধর্মীয় প্রচারক, গল্প এবং দেবদেবীর উপাসনা নিয়মিত চলাচল করত। ফলে যিশুর সময়কার ধর্মীয় পরিবেশে শুধু ইহুদি মসিহের প্রত্যাশাই ছিল না, পাশাপাশি ছিল দেবপুত্রের ধারণা, দেবরাজত্ব, রহস্যধর্ম, পরকাল, মৃতের পুনরুত্থান, স্বর্গীয় মুক্তি, অলৌকিক চিকিৎসক এবং মানুষের মধ্যে আবির্ভূত অতিমানবীয় সত্তার বহুবিধ কাহিনী। এই সাংস্কৃতিক মিশ্রণ কোনো অনুমান নয়। সামারিয়া-সেবাস্তের প্রত্নতাত্ত্বিক ও শিলালিপিগত প্রমাণ থেকেই হেলেনীয় যুগে আইসিস ও সেরাপিসের মিশরীয় উপাসনার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। অর্থাৎ যিশুর জন্মভূমির কাছাকাছি এলাকাতেও বহিরাগত দেবতা ও ধর্মীয় আচার বহু আগেই প্রবেশ করেছিল। [4]
এই পটভূমি ছাড়া খ্রিস্টধর্মের উত্থানকে বোঝা অসম্ভব। যিশুকে ঘিরে যে ধর্ম তৈরি হলো, সেটি একদিকে গভীরভাবে ইহুদি। সেখানে মসিহ, মূসা, দাউদ, ইব্রাহিম, ইহুদি নবীদের ভবিষ্যদ্বাণী, শেষবিচার এবং মৃতের পুনরুত্থানের ধারণা কাজ করেছে। অন্যদিকে সেই যিশুকেই খুব দ্রুত এমন ভাষায় প্রকাশ করা হলো যা বৃহত্তর গ্রিক ও রোমান পৃথিবীর মানুষের কাছেও পরিচিত ছিল। তিনি ঈশ্বরের পুত্র, অলৌকিক চিকিৎসক, মৃত্যুকে জয় করা প্রভু, স্বর্গীয় রাজ্যের অধিপতি এবং সমগ্র মানবজাতির মুক্তিদাতা। পুরোনো ইহুদি মসিহবাদ এখানে ভূমধ্যসাগরীয় দেবমানবের ধর্মীয় ভাষার সঙ্গে মিশে এক নতুন চরিত্র তৈরি করেছে। এই সংমিশ্রণ খ্রিস্টধর্মকে স্থানীয় ইহুদি মসিহবাদের সীমানা অতিক্রম করে বৃহত্তর গ্রিক-রোমান জগতে প্রচারের জন্য একটি শক্তিশালী ও পরিচিত ধর্মীয় ভাষা দেয়। যিশু আর শুধু ইহুদিদের প্রত্যাশিত রাজা নন, তিনি হয়ে ওঠেন পৃথিবীর প্রত্যেক মানুষের জন্য প্রেরিত মহাজাগতিক ত্রাণকর্তা।
দেবতা ও মানবীর সন্তান: দেবপুত্র, বীর ও রক্ষাকর্তার প্রাচীন ঐতিহ্য
যিশুর অলৌকিক জন্ম এবং ঈশ্বরপুত্র পরিচয়কে বুঝতে গেলে প্রাচীন গ্রিক ও রোমান পৃথিবীর একটি অত্যন্ত পরিচিত ধর্মীয় ধারণার দিকে তাকাতে হয়। সেই পৃথিবীতে দেবতা আর মানুষের মাঝখানে আজকের একেশ্বরবাদী ধর্মগুলোর মতো কোনো দুর্ভেদ্য দেয়াল ছিল না। দেবতারা মানুষের পৃথিবীতে আসতেন, মানুষের প্রেমে পড়তেন, মানব নারীদের সঙ্গে যৌনসম্পর্ক স্থাপন করতেন এবং সেই মিলন থেকে জন্ম নিত অসাধারণ সন্তান। এই সন্তানরা সাধারণ মানুষের মতো জন্মালেও সাধারণ মানুষ হিসেবে জীবন কাটাত না। তাদের শরীরে মানবিক দুর্বলতা থাকত, কিন্তু একইসঙ্গে থাকত ঐশী রক্ত, অতিমানবীয় ক্ষমতা এবং একটি বিশেষ নিয়তি। কেউ দানব হত্যা করত, কেউ রাজ্য প্রতিষ্ঠা করত, কেউ মানুষকে বিপদ থেকে রক্ষা করত, কেউ রোগ সারাত, কেউ মৃত্যুকেও অতিক্রম করত। অর্থাৎ দেবতা ও মানবীর মিলন থেকে জন্ম নেওয়া এমন এক মধ্যবর্তী চরিত্র, যে মানুষের জগতের অংশ হয়েও সাধারণ মানুষের ঊর্ধ্বে, যিশুর বহু শতাব্দী আগেই প্রাচীন ধর্মীয় কল্পনার অত্যন্ত পরিচিত একটি ছাঁচ ছিল। এই ছাঁচের সবচেয়ে বিখ্যাত উদাহরণগুলোর মধ্যে হেরাক্লেস, পার্সিয়াস, ডায়োনিসাস, অ্যাসক্লেপিয়াস এবং রোমুলাস বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
গ্রিক পুরাণের সবচেয়ে বিখ্যাত বীর হেরাক্লেসের জন্মই হয়েছিল দেবতা জিউস এবং মানবী আলকমেনের মিলনে। আলকমেনে তখন অ্যামফিট্রিয়নের স্ত্রী। কাহিনী অনুসারে জিউস তাঁর স্বামীর রূপ ধারণ করে আলকমেনের কাছে আসেন এবং তাঁদের মিলন থেকে হেরাক্লেসের জন্ম হয়। একই মায়ের গর্ভে মানব পিতা অ্যামফিট্রিয়নের সন্তান ইফিক্লেসও জন্ম নেয়। ফলে একই মাতৃগর্ভ থেকে একজন সাধারণ মানবপুত্র এবং একজন দেবপুত্রের জন্মের মধ্য দিয়েই পুরাণটি হেরাক্লেসের ব্যতিক্রমী পরিচয় প্রতিষ্ঠা করে। হেরাক্লেস জন্মের পর থেকেই সাধারণ শিশু নন। দেবী হেরার পাঠানো দুটি সাপকে তিনি শিশুকালেই নিজের হাতে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন। বড় হয়ে তিনি অতিমানবীয় শক্তিতে দানব, হিংস্র প্রাণী ও ভয়ংকর শত্রুদের পরাজিত করেন, অসংখ্য মানুষকে বিপদ থেকে উদ্ধার করেন এবং এমন সব কাজ সম্পন্ন করেন যা কোনো সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। প্রাচীন গ্রিক ঐতিহ্যে তাঁকে শুধু শক্তিমান যোদ্ধা হিসেবে নয়, দেবতা ও মানুষের রক্ষাকর্তাসুলভ বীর হিসেবেও কল্পনা করা হয়েছিল। তাঁর পার্থিব জীবনের শেষে গল্প আরও এক ধাপ এগোয়। মৃত্যুর পর হেরাক্লেস সাধারণ মৃত মানুষের মতো পাতালে হারিয়ে যান না, বরং দেবতাদের জগতে উন্নীত হন এবং অমরত্ব লাভ করেন। একজন মানবীর গর্ভে দেবতার সন্তান হিসেবে জন্ম, অতিমানবীয় কর্ম, মানুষের রক্ষা এবং শেষে দেবত্বে উন্নীত হওয়া, এই সম্পূর্ণ ধর্মীয় ছাঁচ খ্রিস্টধর্মের জন্মের বহু শতাব্দী আগেই গ্রিক সংস্কৃতির অত্যন্ত পরিচিত অংশ ছিল। [5]
পার্সিয়াসের জন্মকাহিনী আরও তাৎপর্যপূর্ণ। আর্গসের রাজা অ্যাক্রিসিয়াস একটি ভবিষ্যদ্বাণী শুনেছিলেন যে তাঁর কন্যা দানায়ের গর্ভে যে পুত্র জন্ম নেবে, সেই পুত্রের হাতেই একদিন তাঁর মৃত্যু হবে। এই ভয় থেকে তিনি নিজের কন্যাকে এমনভাবে বন্দি করে রাখেন যাতে কোনো পুরুষ তার কাছে পৌঁছাতে না পারে। কিন্তু মানুষের তৈরি দেয়াল দেবতার পথ আটকাতে পারেনি। পুরাণ অনুসারে জিউস সোনালি বৃষ্টির রূপে দানায়ের কাছে প্রবেশ করেন এবং তাঁর গর্ভে পার্সিয়াসের জন্ম হয়। জন্মের পর রাজা মা ও শিশুকে একটি বাক্সে বন্দি করে সমুদ্রে ভাসিয়ে দেন, কিন্তু শিশুটি মারা যায় না। সে অলৌকিকভাবে রক্ষা পায়, বড় হয়ে অসাধারণ বীরে পরিণত হয়, মেডুসাকে হত্যা করে এবং বহু বিপদ অতিক্রম করে নিজের নিয়তি পূর্ণ করে। এখানে আমরা আবার একই শক্তিশালী কাহিনীর ছাঁচ দেখতে পাই। একটি ভবিষ্যদ্বাণী, সেই ভবিষ্যদ্বাণীতে আতঙ্কিত রাজা, কোনো মানব পুরুষের সাধারণ পথে নয় বরং দেবতার হস্তক্ষেপে অসাধারণ সন্তানের জন্ম, জন্মের পর শিশুকে হত্যার চেষ্টা, অলৌকিকভাবে রক্ষা পাওয়া এবং পরে সেই শিশুর মহান বীরে পরিণত হওয়া। খ্রিস্টীয় যিশুর জন্মকাহিনীতে স্বর্গীয় হস্তক্ষেপ, অসাধারণ সন্তান, রাজশক্তির আতঙ্ক এবং শিশুহত্যার হুমকি যখন দেখি, তখন মনে রাখতে হয় যে প্রাচীন মানুষের কাছে এই ধরনের গল্পের ভাষা নতুন ছিল না। এমন গল্প দিয়েই তারা মহান বীরের জন্মকে সাধারণ মানুষের জন্ম থেকে পৃথক করত এবং তার জীবনের শুরুতেই ঘোষণা করত, এই শিশু অন্য সবার মতো নয়। [6]
ডায়োনিসাসের কাহিনীতেও আমরা দেবতা ও মানবীর মিলনে জন্ম নেওয়া এক অসাধারণ দেবপুত্রকে দেখি। তাঁর মা সেমেলে একজন মানবী রাজকন্যা, আর পিতা সর্বোচ্চ দেবতা জিউস। পুরাণ অনুসারে জিউসের সঙ্গে সম্পর্কের কারণে সেমেলে গর্ভবতী হন, কিন্তু হেরার ষড়যন্ত্রে জিউসকে তাঁর পূর্ণ ঐশী রূপে দেখতে গিয়ে তিনি আগুনে পুড়ে মারা যান। তখনও অনাগত ডায়োনিসাস মাতৃগর্ভে। জিউস সেই অসম্পূর্ণ ভ্রূণকে উদ্ধার করে নিজের উরুর মধ্যে সেলাই করে রাখেন এবং পরে সেখান থেকে তার দ্বিতীয় জন্ম ঘটে। এই কারণেই ডায়োনিসাসকে কখনো “দ্বিজাত” বা দুইবার জন্ম নেওয়া দেবতা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। তাঁর জন্ম নিজেই প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম ভেঙে দেওয়া এক ঐশী ঘটনা। জন্মের পরে তাঁকে শত্রুর হাত থেকে গোপনে রক্ষা করা হয়, পরে তিনি মদ, উন্মাদনা, উর্বরতা, ধর্মীয় উচ্ছ্বাস ও মুক্তির সঙ্গে যুক্ত এক শক্তিশালী দেবতায় পরিণত হন। এখানে আবার আমরা দেখি, মানবী মাতার গর্ভে সর্বোচ্চ দেবতার সন্তান, অস্বাভাবিক জন্ম, বিপদের মধ্য দিয়ে রক্ষা এবং পরে ঐশী ক্ষমতার অধিকারী চরিত্রে প্রতিষ্ঠা। [7]
অ্যাসক্লেপিয়াসের কাহিনী যিশুর সঙ্গে তুলনায় আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে, কারণ এখানে দেবপুত্র পরিচয়ের সঙ্গে সরাসরি রোগ নিরাময় এবং মৃতকে জীবিত করার ক্ষমতাও যুক্ত হয়েছে। গ্রিক ঐতিহ্যে অ্যাসক্লেপিয়াস ছিলেন দেবতা অ্যাপোলোর সন্তান এবং তাঁর মা করোনিস ছিলেন মানবী। মায়ের মৃত্যুর সময় অনাগত শিশুটিকে উদ্ধার করে কাইরনের কাছে বড় করা হয়। সেখানে তিনি চিকিৎসাবিদ্যায় এমন অসাধারণ দক্ষতা অর্জন করেন যে শুধু রোগ সারানো নয়, মৃত মানুষকেও জীবিত করতে শুরু করেন। প্রাচীন গ্রিক কাহিনীতে তাঁর হাতে একাধিক মৃত ব্যক্তির জীবন ফিরে পাওয়ার কথা বলা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত মৃতদের জীবিত করার এই ক্ষমতাই দেবরাজ জিউসের জন্য সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়, কারণ মৃত্যু ও জীবনের স্বাভাবিক সীমা ভেঙে যাচ্ছিল। জিউস বজ্রাঘাতে অ্যাসক্লেপিয়াসকে হত্যা করেন। পরে তিনি দেবত্ব লাভ করেন এবং গ্রিক-রোমান পৃথিবীর অন্যতম প্রধান চিকিৎসাদেবতায় পরিণত হন। তাঁর মন্দিরে মানুষ রোগমুক্তির আশায় যেত, সেখানে রাত্রিযাপন করত, স্বপ্নে দেবতার দর্শন ও আরোগ্যের প্রত্যাশা করত। অর্থাৎ যিশুর বহু আগে থেকেই ভূমধ্যসাগরীয় ধর্মীয় জগতে এমন এক দেবপুত্রের উপাসনা ছিল, যার প্রধান পরিচয় ছিল রোগ সারানো, মানুষের দুর্দশা দূর করা এবং এমনকি মৃতকে জীবন ফিরিয়ে দেওয়া। [8]
রোমানদের নিজেদের জাতির প্রতিষ্ঠাতার কাহিনীও একই ধর্মীয় যুক্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। রোমুলাস ও রেমুসের মা রিয়া সিলভিয়া ছিলেন একজন মানবী এবং ভেস্টার কুমারী পুরোহিত্রী, যাঁর সন্তান ধারণ করার কথাই ছিল না। কিন্তু রোমান ঐতিহ্যে তাঁদের পিতা হিসেবে যুদ্ধদেবতা মার্সকে ঘোষণা করা হয়। অর্থাৎ রোম নগরীর প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ কোনো মানুষের সন্তান নন, তাঁর শরীরেই দেবতার রক্ত প্রবাহিত। জন্মের পর রাজা আমুলিয়াস এই শিশুদের হত্যা করতে চান। তাদের নদীতে ফেলে দেওয়া হয়, কিন্তু তারা মারা যায় না; অলৌকিকভাবে রক্ষা পায়, বড় হয় এবং শেষ পর্যন্ত রাজবংশীয় অন্যায়ের প্রতিশোধ নেয়। রোমুলাস পরে রোম নগরীর প্রতিষ্ঠাতা হন। এখানেও তাঁর পৌরাণিক যাত্রা মানবজীবনে শেষ হয় না। পরবর্তী রোমান ঐতিহ্যে তিনি মৃত্যুর পর দেবত্ব লাভ করেন এবং কুইরিনাস নামে পূজিত হন। ফলে রোমান রাজনৈতিক সংস্কৃতির একেবারে কেন্দ্রে ছিল এমন এক প্রতিষ্ঠাতা বীরের কাহিনী, যার মা মানুষ, পিতা দেবতা, শিশুকালে তাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে, সে অলৌকিকভাবে রক্ষা পেয়েছে, পরে জাতির রক্ষক ও প্রতিষ্ঠাতা হয়েছে এবং শেষে দেবত্ব লাভ করেছে। [9]
এই কাহিনীগুলো পাশাপাশি রাখলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রাচীন মানুষের কাছে কোনো মহান ব্যক্তিকে অসাধারণ প্রমাণ করার অন্যতম শক্তিশালী উপায় ছিল তার জন্মকে সাধারণ মানুষের জন্মের ঊর্ধ্বে তুলে দেওয়া। তার পিতা শুধু একজন মানুষ নন, দেবতা; তার জন্ম কোনো সাধারণ যৌনসম্পর্কের ফল নয়, তার পেছনে রয়েছে স্বর্গীয় ইচ্ছা; তার জীবন কোনো আকস্মিক মানবজীবন নয়, জন্মের আগেই তার জন্য নির্ধারিত রয়েছে বিশেষ নিয়তি। এই ঐশী পিতৃত্ব চরিত্রটির ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের ব্যাখ্যা দেয়। হেরাক্লেস কেন সাধারণ মানুষের চেয়ে শক্তিশালী? কারণ তার পিতা জিউস। পার্সিয়াস কীভাবে অসম্ভব কাজ সম্পন্ন করে? কারণ তার জন্মেই দেবতার হস্তক্ষেপ আছে। অ্যাসক্লেপিয়াস কীভাবে এমন চিকিৎসাশক্তির অধিকারী যে মৃতকেও ফিরিয়ে আনতে পারে? তিনি অ্যাপোলোর পুত্র। রোমুলাস কেন একটি সাম্রাজ্যিক জাতির প্রতিষ্ঠাতা হওয়ার যোগ্য? কারণ তাঁর পিতা যুদ্ধদেবতা মার্স। পুরাণের ভাষায় ঐশী পিতৃত্ব ছিল অসাধারণ মানুষের অসাধারণত্বের এক ধরনের স্বর্গীয় বৈধতাপত্র।
এই দীর্ঘ ধর্মীয় ঐতিহ্যের মধ্যে যিশুর জন্মকাহিনী রাখলে তার সাংস্কৃতিক অর্থ আরও পরিষ্কার হয়। মেরি একজন মানবী নারী, কিন্তু যিশুর জন্মের পেছনে কোনো সাধারণ মানব পিতাকে রাখা হয়নি। লুকের সুসমাচারে স্বর্গদূত মেরিকে জানায়, পবিত্র আত্মা তাঁর ওপর আসবে এবং সর্বোচ্চের শক্তি তাঁকে আচ্ছন্ন করবে, আর সেই কারণে জন্ম নেওয়া সন্তানকে পবিত্র ও ঈশ্বরের পুত্র বলা হবে। অর্থাৎ গল্পের ভাষা বদলেছে, বহুদেববাদী পুরাণের প্রকাশ্য যৌনসম্পর্ককে একেশ্বরবাদী পবিত্রতার ভাষায় রূপান্তর করা হয়েছে, কিন্তু ঐশী পিতৃত্বের মৌলিক ধর্মীয় কাজটি একই রয়ে গেছে। এই সন্তান সাধারণ মানুষের সন্তান নয়। তার জন্মের উৎস স্বর্গে, তাই তার কর্তৃত্বও সাধারণ মানুষের ঊর্ধ্বে। সে এমন কাজ করতে পারবে যা মানুষ পারে না, রোগ সারাবে, মৃতকে জীবিত করবে, প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করবে, মৃত্যুকে অতিক্রম করবে এবং মানুষের মুক্তির পথ হয়ে উঠবে। প্রাচীন গ্রিক ও রোমান শ্রোতাদের কাছে “ঈশ্বরের পুত্র” বা ঐশী উৎস থেকে জন্ম নেওয়া অতিমানবীয় রক্ষাকর্তার ধারণা তাই কোনো সম্পূর্ণ অপরিচিত ভাষা ছিল না। বরং তারা এমন দেবপুত্র, অর্ধদেব, বীর, চিকিৎসক, রাজা ও জাতির প্রতিষ্ঠাতার গল্প শুনেই বড় হয়েছে। খ্রিস্টধর্ম সেই পরিচিত ধর্মীয় ভাষাকে ইহুদি মসিহবাদের সঙ্গে মিলিয়ে আরও শক্তিশালী এক চরিত্র নির্মাণ করেছে। এখানে আর জিউস কোনো মানবীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করছেন না, কিন্তু স্বর্গীয় শক্তি মানবী নারীর গর্ভে প্রবেশ করে এমন এক সন্তান সৃষ্টি করছে যার কোনো মানব পিতা নেই এবং যাকে ঈশ্বরের পুত্র বলা হবে। পৌরাণিক ভাষা বদলেছে, ধর্মতত্ত্ব বদলেছে, কিন্তু মানুষের গর্ভে ঐশী উৎস থেকে জন্ম নেওয়া অসাধারণ রক্ষাকর্তার বহু পুরোনো কল্পনাটি আবার ফিরে এসেছে নতুন রূপে। [10]

এই তুলনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি শুধু জন্মের অলৌকিকতায় নয়, বরং সেই জন্মের সামাজিক ও ধর্মীয় উদ্দেশ্যে। সাধারণ মানুষের সন্তান হলে একজন মানুষকে তার কাজ দিয়ে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে হয়; কিন্তু দেবতার সন্তান হিসেবে জন্ম দিলে তার শ্রেষ্ঠত্ব জন্মের আগেই নিশ্চিত হয়ে যায়। তার ক্ষমতার জন্য আর মানবিক ব্যাখ্যা প্রয়োজন হয় না, তার কর্তৃত্ব আসে আকাশ থেকে। প্রাচীন রাজা ও বীরদের ক্ষেত্রে এই কৌশল রাজনৈতিক বৈধতা তৈরি করেছে, ধর্মীয় বীরদের ক্ষেত্রে তৈরি করেছে অতিমানবীয় কর্তৃত্ব। যিশুর কাহিনীতেও ঠিক এই রূপান্তরটি ঘটে। তিনি আর নাজারেথের কোনো সাধারণ ইহুদি প্রচারক নন, তাঁর জন্মের আগেই স্বর্গ তাঁর পরিচয় ঘোষণা করে, তাঁর কোনো মানব পিতা নেই, তাঁর শরীরে সাধারণ মানববংশের সীমা অতিক্রম করা ঐশী পরিচয় স্থাপন করা হয়। এই নির্মাণের ফলে তাঁর পরবর্তী প্রতিটি অলৌকিক কাজ আরও বিশ্বাসযোগ্য ধর্মীয় অর্থ পায়। ঈশ্বরের পুত্র যদি রোগ সারায়, মৃতকে জীবিত করে বা মৃত্যুকে জয় করে, তখন আর ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন অলৌকিক গল্প থাকে না; সেগুলো তাঁর জন্মগত ঐশী পরিচয়ের স্বাভাবিক প্রকাশে পরিণত হয়। আর ঠিক এই কারণেই প্রাচীন দেবপুত্র ও বীরদের দীর্ঘ ঐতিহ্য যিশুর চরিত্র নির্মাণ বোঝার ক্ষেত্রে এত গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ বহু আগে থেকেই জানত কীভাবে একজন মানুষের জন্মকে স্বর্গের সঙ্গে যুক্ত করে তাকে সাধারণ মানুষ থেকে দেবমানব, বীর, রক্ষাকর্তা এবং শেষ পর্যন্ত উপাসনার যোগ্য সত্তায় পরিণত করতে হয়।
হোরাস: দেবশিশু, রাজপুত্র ও পিতার উত্তরাধিকারী
যিশুর পৌরাণিক চরিত্রের পেছনের দীর্ঘ ধর্মীয় ইতিহাস অনুসন্ধান করতে গেলে মিশরীয় হোরাসকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। হোরাসের কাহিনী যিশুর জন্মের হাজার হাজার বছর আগে থেকে গড়ে ওঠা মিশরীয় ধর্মীয় ঐতিহ্যের অংশ। তিনি ছিলেন দেবশিশু, নিহত দেবরাজ ওসিরিসের পুত্র এবং পিতার সিংহাসনের বৈধ উত্তরাধিকারী। তাঁর জন্ম কোনো সাধারণ পারিবারিক ঘটনার মতো নয়, বরং দেবতাদের মধ্যে ক্ষমতা, হত্যা, মৃত্যু, পুনর্জীবন এবং রাজকীয় উত্তরাধিকারের এক বিশাল পৌরাণিক নাটকের অংশ। কাহিনী অনুসারে দেবরাজ ওসিরিসকে তাঁর ভাই সেথ হত্যা করে ক্ষমতা দখল করে। ওসিরিসের স্ত্রী ও বোন আইসিস মৃত স্বামীর দেহ উদ্ধার করেন এবং নিজের জাদুশক্তির মাধ্যমে তাঁকে সাময়িকভাবে প্রাণশক্তি ফিরিয়ে দেন। সেই অলৌকিক মিলনের ফলেই হোরাসের জন্ম। ওসিরিস এরপর আর সাধারণ জীবনের রাজা হয়ে ফিরে আসেন না, তিনি মৃতদের জগতের শাসক হয়ে ওঠেন। অন্যদিকে তাঁর পুত্র হোরাস পৃথিবীতে পিতার ন্যায্য রাজকীয় অধিকারের প্রতিনিধি হিসেবে বেড়ে ওঠেন এবং শেষ পর্যন্ত সেথের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে নিজের উত্তরাধিকার প্রতিষ্ঠা করেন। [11]

এই কাহিনীর গভীরে তাকালে কয়েকটি শক্তিশালী ধর্মীয় ধারণা দেখা যায়, যা খ্রিস্টধর্মের বহু শতাব্দী আগেই মানুষের কল্পনায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। দেবপিতা ও দেবপুত্রের সম্পর্ক, পিতার ঐশী ও রাজকীয় কর্তৃত্ব পুত্রের মধ্যে প্রবাহিত হওয়া, শিশুপুত্রের ভবিষ্যৎ রাজত্ব, অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে দেবপুত্রের সংগ্রাম, নিহত দেবপিতার মৃত্যুতে অস্তিত্ব শেষ না হয়ে বরং অন্য এক জগতের সর্বময় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়া, এসব ধারণা মিশরীয় ধর্মে অত্যন্ত প্রাচীন। খ্রিস্টীয় পিতা ও পুত্রের ধর্মতত্ত্ব অবশ্য মিশরীয় দেবরাজত্বের পুনরাবৃত্তি নয়, কিন্তু এটিও সত্য যে দেবপুত্র, পিতার ঐশী কর্তৃত্বের উত্তরাধিকারী পুত্র এবং পিতা-পুত্রের মাধ্যমে মহাজাগতিক শাসনের ধারণা যিশুর সঙ্গে প্রথম জন্ম নেয়নি। মানুষ বহু শতাব্দী ধরে দেবতাদের পারিবারিক সম্পর্কের মধ্য দিয়ে রাজত্ব, উত্তরাধিকার, মৃত্যু ও বিজয়কে ব্যাখ্যা করেছে। খ্রিস্টধর্ম সেই পুরোনো ধর্মীয় ভাষাকেই নতুন একেশ্বরবাদী কাঠামোয় অসাধারণ দক্ষতায় পুনর্বিন্যাস করেছে।
ওসিরিস: মৃত্যু, পুনর্জীবন এবং মৃতদের জগতের দেবতা
যিশুর মৃত্যু ও পুনরুত্থানকে ঘিরে গড়ে ওঠা ধর্মতত্ত্ব বুঝতে গেলে হোরাসের পাশাপাশি ওসিরিস আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন। ওসিরিসের কাহিনীর কেন্দ্রেই আছে একজন দেবরাজের হত্যা, দেহের ধ্বংস, ঐশী শক্তিতে প্রাণের প্রত্যাবর্তন এবং মৃত্যুর পরে এক নতুন মহাজাগতিক মর্যাদা। তাঁর ভাই সেথ তাঁকে হত্যা করলেও মৃত্যু ওসিরিসকে নিশ্চিহ্ন করতে পারেনি। আইসিসের জাদুশক্তিতে তাঁর প্রাণশক্তি ফিরে আসে, হোরাসের জন্ম সম্ভব হয় এবং তারপর ওসিরিস মৃতদের জগতের শাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। মিশরীয় পরকালচিন্তায় তিনি ক্রমে এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন যে মৃত্যুর পরে মানুষের ভাগ্য, বিচার, পুনর্জন্মের আশা এবং পরলোকের নিরাপত্তার সঙ্গে তাঁর নাম গভীরভাবে জড়িয়ে যায়। অর্থাৎ এখানে আমরা যিশুর বহু আগে এমন এক শক্তিশালী ধর্মীয় কল্পনা দেখতে পাই, যেখানে দেবতার মৃত্যু পরাজয় নয়। বরং মৃত্যুর মধ্য দিয়েই সেই দেবতা অন্য এক স্তরের মহাজাগতিক ক্ষমতার অধিকারী হয়ে ওঠেন। [12]

খ্রিস্টীয় যিশুর গল্পেও একই মৌলিক মানবিক আকাঙ্ক্ষা নতুন ধর্মতাত্ত্বিক ভাষায় ফিরে আসে। যিশুর মৃত্যু শেষ নয়, তাঁর সবচেয়ে বড় বিজয়ের সূচনা। মৃত্যুর পর তিনি পুনরুত্থিত হন, মৃত্যুর ক্ষমতা ভেঙে দেন, স্বর্গীয় মর্যাদায় উন্নীত হন এবং তাঁর অনুসারীদেরও ভবিষ্যৎ পুনরুত্থান ও অনন্ত জীবনের আশা দেন। ওসিরিস ও যিশুর কাহিনীর ঘটনা এক নয়, কিন্তু উভয়ের পেছনে মানুষের একই গভীর ভয় ও আকাঙ্ক্ষা কাজ করছে: মৃত্যু কি সত্যিই শেষ? প্রিয় মানুষকে কি চিরতরে হারিয়ে যেতে হবে? রাজা, বীর বা দেবতা কি মৃত্যুকে অতিক্রম করতে পারে না? প্রাচীন ধর্মগুলো বারবার এই ভয়কে গল্পে রূপ দিয়েছে এবং মানুষের জন্য আশার দরজা খুলেছে। ওসিরিসের উপাসনায় মৃত্যু ও নতুন জীবনের প্রতীক ধর্মীয় আচারেও প্রবেশ করেছিল। খোয়াক উৎসবে ওসিরিসের প্রতীকী দেহ, শস্যের অঙ্কুরোদ্গম এবং নতুন জীবনের ধারণা পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হতো। মৃত মাটির বুক ভেদ করে নতুন সবুজ অঙ্কুরের জন্ম যেমন মানুষের চোখে জীবন ফিরে পাওয়ার বিস্ময় সৃষ্টি করে, তেমনি মৃত দেবতার মধ্য থেকে নতুন জীবনের ধারণা ধর্মীয় মুক্তির ভাষায় পরিণত হয়েছিল। যিশুর জন্মের বহু শতাব্দী আগে থেকেই মানুষ দেবতার মৃত্যু ও জীবন ফিরে পাওয়ার কাহিনীর মাধ্যমে নিজের মৃত্যুভয়কে জয় করার চেষ্টা করছিল।
আইসিস ও শিশু হোরাস: দেবমাতা ও দেবশিশুর প্রাচীন প্রতিমা
প্রাচীন মিশরের ধর্মীয় শিল্পে সবচেয়ে আবেগময় ও পরিচিত দৃশ্যগুলোর একটি হলো মা আইসিসের কোলে শিশু হোরাস। কখনো তিনি শিশুকে বুকে ধরে আছেন, কখনো স্তন্যপান করাচ্ছেন, কখনো বিপদের মধ্যে তাকে রক্ষা করছেন। এই চিত্র খ্রিস্টধর্মের জন্মের কয়েক শতাব্দী নয়, বহু শতাব্দী আগে থেকেই মিশরীয় ধর্মীয় শিল্পে সুপ্রতিষ্ঠিত ছিল। খ্রিস্টপূর্ব প্রথম সহস্রাব্দে আইসিসের কোলে স্তন্যপানরত হোরাসের অসংখ্য মূর্তি তৈরি হয়েছিল এবং হেলেনীয় ও রোমান যুগে আইসিসের উপাসনা মিশরের সীমানা ছাড়িয়ে ভূমধ্যসাগরীয় পৃথিবীর বহু অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। আইসিস শুধু একজন মা ছিলেন না। তিনি জীবনদাত্রী, রক্ষাকারী, জাদুশক্তির অধিকারী এবং বিপন্ন দেবশিশুর আশ্রয়। অন্যদিকে তাঁর কোলে থাকা হোরাস ছিল ভবিষ্যৎ রাজা, পিতার উত্তরাধিকারী এবং অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে ভবিষ্যৎ বিজয়ের প্রতীক। মা ও দেবশিশুর এই চিত্র মানুষের কাছে একইসঙ্গে কোমলতা, সুরক্ষা, পবিত্রতা এবং রাজকীয় ঐশ্বর্যের অনুভূতি তৈরি করত। [13]

পরবর্তী খ্রিস্টীয় শিল্পে মেরির কোলে শিশু যিশুর যে চিত্র পৃথিবীর অন্যতম শক্তিশালী ধর্মীয় প্রতীকে পরিণত হয়েছে, সেটিও এমন এক সমাজে গড়ে উঠেছিল যেখানে দেবমাতা ও দেবশিশুর চিত্র বহু শতাব্দী ধরে মানুষের পরিচিত ছিল। মেরি শিশুযিশুকে কোলে নিচ্ছেন, বুকে জড়িয়ে রাখছেন, স্তন্যপান করাচ্ছেন, বিপদ থেকে রক্ষা করছেন, এই চিত্রের আবেগীয় ভাষা প্রাচীন ভূমধ্যসাগরীয় মানুষের কাছে অপরিচিত ছিল না। আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো, স্বীকৃত সুসমাচারগুলোতে মেরির ভূমিকা তুলনামূলকভাবে সীমিত হলেও শতাব্দী পেরোতে পেরোতে তাঁর চরিত্র নিজেই বিস্ময়করভাবে পৌরাণিক হয়ে ওঠে। তাঁর জন্ম, আজীবন কুমারীত্ব, অসাধারণ পবিত্রতা, স্বর্গীয় মধ্যস্থতা এবং শেষে স্বর্গে উন্নীত হওয়ার কাহিনী গড়ে ওঠে। চার্চ তাঁকে Theotokos, অর্থাৎ “ঈশ্বরের জননী” উপাধিতে প্রতিষ্ঠিত করে। কোটি কোটি বিশ্বাসীর কাছে তিনি হয়ে ওঠেন এমন এক স্বর্গীয় মাতৃমূর্তি, যার কাছে দয়া, সুরক্ষা ও মধ্যস্থতা চাওয়া যায়। অর্থাৎ যিশুকে ঘিরে শুধু একজন দেবপুত্রের কাহিনী তৈরি হয়নি, তাঁর চারপাশে একটি পূর্ণাঙ্গ পবিত্র পরিবার এবং দেবমাতার ধর্মীয় কল্পনাও ধীরে ধীরে বিকশিত হয়েছে। প্রাচীন ধর্মের মাতৃদেবীর দীর্ঘ ঐতিহ্যের মধ্যে এই রূপান্তরকে রাখলে খ্রিস্টধর্মের এই বিবর্তন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা বলে মনে হয় না। [14]
হুমকির মুখে দেবশিশু: হোরাস থেকে মূসা, কৃষ্ণ ও যিশু
মানুষের প্রাচীন গল্পগুলোতে একটি দৃশ্য আশ্চর্যজনকভাবে বারবার ফিরে আসে। একটি অসাধারণ শিশুর জন্ম হবে, ভবিষ্যতে সে বড় কোনো পরিবর্তন ঘটাবে বা বর্তমান শাসককে পরাজিত করবে, এই ভবিষ্যদ্বাণী শাসকের কানে পৌঁছায়। ক্ষমতাধর রাজা আতঙ্কিত হয়ে ওঠে। সে শিশুটিকে হত্যা করতে চায়, কখনো একটি শিশুকে খুঁজে না পেয়ে বহু শিশুকে হত্যা করে, কখনো একের পর এক সম্ভাব্য সন্তানকে মেরে ফেলে। কিন্তু যে শিশুকে সবচেয়ে বেশি ভয় করা হচ্ছে, সে অলৌকিকভাবে বেঁচে যায়। তাকে লুকিয়ে রাখা হয়, দূরে সরিয়ে নেওয়া হয় বা অন্য পরিবারে বড় করা হয়। পরে সেই শিশুই ফিরে এসে অত্যাচারী শক্তিকে পরাজিত করে নিজের নিয়তি পূর্ণ করে। হোরাসের ক্ষেত্রে আমরা দেখি পিতার হত্যাকারী সেথের ভয় থেকে আইসিস শিশুপুত্রকে গোপনে রক্ষা করছেন। মূসার কাহিনীতে ফারাও হিব্রু নবজাতক পুত্রদের হত্যার নির্দেশ দেয়, কিন্তু মূসা রক্ষা পায় এবং পরে সেই রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে মুক্তিদাতা হয়ে ওঠে। ভারতীয় কৃষ্ণকথায় অত্যাচারী কংস ভবিষ্যদ্বাণী শুনে জানতে পারে দেবকীর সন্তান তার মৃত্যুর কারণ হবে। সে আতঙ্কে সন্তানদের হত্যা করতে থাকে, কিন্তু কৃষ্ণকে গোপনে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয় এবং পরে সেই শিশুই বড় হয়ে কংসকে হত্যা করে। বিভিন্ন যুগ ও সংস্কৃতিতে কাহিনীগুলোর রূপ আলাদা হলেও মূল নাটকীয় ছাঁচটি বিস্ময়করভাবে পরিচিত: ভবিষ্যৎ ত্রাণকর্তা বা বিজয়ী শিশু, আতঙ্কিত শাসক, শিশুহত্যা, অলৌকিক রক্ষা এবং শেষ পর্যন্ত নিয়তির পূর্ণতা।
ম্যাথিউর সুসমাচারে যিশুর জন্মকাহিনী ঠিক এই পরিচিত পৌরাণিক ছাঁচে প্রবেশ করে। পূর্বদেশীয় জ্ঞানীরা এসে যখন “ইহুদিদের নবজাত রাজা” সম্পর্কে জানতে চান, হেরোদ আতঙ্কিত হয়ে ওঠে। একটি শিশু জন্ম নিয়েছে, কিন্তু তার জন্মই বর্তমান শাসনের জন্য রাজনৈতিক হুমকি। এরপর স্বপ্নে স্বর্গীয় সতর্কতা আসে, যোসেফ শিশুকে নিয়ে মিসরে পালিয়ে যান, আর হেরোদ বেথলেহেমের শিশুদের হত্যার নির্দেশ দেন। পরে শাসকের মৃত্যুর পর শিশুটি ফিরে আসে। ম্যাথিউর এই কাহিনী মূসার জন্মকাহিনীর ছায়া এত স্পষ্টভাবে বহন করে যে যিশুকে এখানে নতুন মূসা হিসেবে নির্মাণের সাহিত্যিক উদ্দেশ্য প্রায় চোখের সামনে ধরা পড়ে। আরও লক্ষণীয় হলো, বেথলেহেমের সেই ভয়াবহ শিশুহত্যার কোনো স্বাধীন সমকালীন ঐতিহাসিক বিবরণ পাওয়া যায় না। হেরোদের নিষ্ঠুরতা নিয়ে বিস্তারিত লিখেছেন ইহুদি ইতিহাসবিদ যোসেফুস, কিন্তু এমন একটি অসাধারণ গণশিশুহত্যার ঘটনা তাঁর বিবরণে অনুপস্থিত। ফলে কাহিনীটি ঐতিহাসিক সংবাদ হিসেবে নয়, বরং পরিচিত ধর্মীয় কাহিনীর ছাঁচে যিশুর মহানত্ব প্রতিষ্ঠার সাহিত্যিক নির্মাণ হিসেবে অনেক বেশি অর্থবহ হয়ে ওঠে। শিশুটিকে জন্মের মুহূর্ত থেকেই এমন গুরুত্বপূর্ণ দেখাতে হবে যে রাজা তাকে ভয় পাবে, স্বর্গ তাকে রক্ষা করবে এবং ইতিহাস যেন তার আগমনের জন্য প্রস্তুত হয়ে থাকবে। ধর্মীয় বীর নির্মাণের জন্য এর চেয়ে শক্তিশালী কাহিনী আর কী হতে পারে? [15]
একজন ঐতিহাসিক মানুষ কীভাবে মিথে পরিণত হয়
যিশুর পৌরাণিকীকরণ বুঝতে সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো তাঁকে ঘিরে সংরক্ষিত জীবনীমূলক কাহিনীগুলোকে সময়ের ধারায় দেখা। প্রাচীনতর উৎসে জীবনীমূলক উপাদান তুলনামূলকভাবে সংক্ষিপ্ত; পরবর্তী সুসমাচার ও খ্রিস্টীয় সাহিত্যে তাঁর জন্ম, শৈশব ও পরিচয়কে ঘিরে অলৌকিক এবং মহাজাগতিক উপাদান ক্রমে আরও বিস্তৃত হয়েছে। পলের লেখায় আমরা মূলত ক্রুশবিদ্ধ ও পুনরুত্থিত খ্রিস্টের ধর্মতাত্ত্বিক গুরুত্ব দেখি। মার্কের সুসমাচারে প্রাপ্তবয়স্ক যিশু হঠাৎ কাহিনীতে প্রবেশ করেন। পরে ম্যাথিউ ও লুক তাঁর জন্মের আগে স্বর্গদূত পাঠান, কুমারীর গর্ভে অলৌকিক গর্ভধারণ ঘটান, ভবিষ্যদ্বাণী জুড়ে দেন, রাজা ও সাম্রাজ্যের ইতিহাসকে তাঁর জন্মের সঙ্গে যুক্ত করেন। ম্যাথিউ আকাশে নক্ষত্র জ্বালান, পূর্বদেশ থেকে জ্ঞানীদের নিয়ে আসেন, হেরোদকে শিশুহত্যাকারী বানান এবং যিশুকে মিসরে পাঠিয়ে আবার ফিরিয়ে এনে মূসা ও ইস্রায়েলের পুরোনো ইতিহাসকে তাঁর জীবনে পুনরাভিনয় করান। পরে খ্রিস্টীয় অপ্রামাণ্য গ্রন্থগুলো তাঁর শৈশবকেও অলৌকিকতায় ভরিয়ে দেয়। শিশু যিশু তখন মাটির পাখিকে জীবিত করেন, অলৌকিক শক্তি প্রদর্শন করেন এবং ছোটবেলা থেকেই আর সাধারণ শিশু থাকেন না। একইভাবে মেরির নিজের জীবনও ক্রমশ অতিপ্রাকৃত হয়ে ওঠে। একটি ধর্মীয় সম্প্রদায় যখন কোনো মানুষকে পবিত্রতার সর্বোচ্চ আসনে বসায়, তখন তার অনুসারীরা তার জীবনের শূন্যস্থানগুলো সাধারণ ঘটনায় ভরে রাখে না। তারা সেই শূন্যস্থান ভরে এমন গল্পে, যা তাদের বিশ্বাসকে আরও অর্থপূর্ণ, আরও বিস্ময়কর এবং আরও মহিমান্বিত করে। এভাবেই স্মৃতি ধীরে ধীরে ধর্মতত্ত্বে এবং ধর্মতত্ত্ব ধীরে ধীরে মিথে রূপ নেয়। [16]
এখানে “মিথ” শব্দটি ব্যবহার করলেই অনেকে মনে করেন কোনো চরিত্রকে সম্পূর্ণ কাল্পনিক বলা হচ্ছে। কিন্তু ইতিহাস ও মিথ এভাবে কাজ করে না। বাস্তব মানুষকে ঘিরেও মিথ জন্মায়, বরং বাস্তব মানুষকে ঘিরে তৈরি মিথই অনেক সময় সবচেয়ে শক্তিশালী হয়। একটি পরিচিত শহর, একটি সত্যিকারের শাসক, একটি বাস্তব যুদ্ধ বা রাজনৈতিক সময়কাল গল্পকে বিশ্বাসযোগ্যতার আবরণ দেয়। পন্তীয় পীলাত সত্যিকারের রোমান শাসক ছিলেন, কিন্তু তাঁর ঐতিহাসিক অস্তিত্ব মৃত মানুষ পুনরুত্থিত হওয়ার ঘটনাকে প্রমাণ করে না। জেরুসালেম বাস্তব শহর, তাই বলে সেখানে সংঘটিত প্রতিটি অলৌকিক কাহিনী ইতিহাস হয়ে যায় না। আধুনিক গবেষক এম. ডেভিড লিটওয়া দেখিয়েছেন, প্রাচীন গ্রিক ও রোমান সাহিত্যেও পৌরাণিক ঘটনাকে বাস্তব শাসক, স্থান, প্রত্যক্ষদর্শীর দাবি এবং পরিচিত ভূগোলের মধ্যে বসিয়ে ইতিহাসসদৃশ করে তোলার সাহিত্যিক কৌশল ব্যবহৃত হতো। যিশুর সুসমাচারগুলোতেও আমরা সেই প্রক্রিয়া দেখি। বাস্তব জুডিয়া, বাস্তব রোমান সাম্রাজ্য, বাস্তব পীলাত ও হেরোদের পাশে দাঁড়িয়ে আছে স্বর্গদূত, শয়তান, অশুভ আত্মা, অলৌকিক জন্ম, মৃতের পুনরুত্থান এবং স্বর্গারোহণ। বাস্তবতার সঙ্গে অলৌকিকতার এই মিশ্রণই মিথকে সবচেয়ে শক্তিশালী করে তোলে। [3]
যিশুর ক্ষেত্রে এই রূপান্তর আরও গভীর। তাঁর মধ্যে একে একে বহু পুরোনো ধর্মীয় পরিচয় এসে জমা হয়েছে। তিনি ইহুদিদের মসিহ, আবার নতুন মূসা; তিনি দুঃখভোগী ধার্মিক, আবার আকাশ থেকে আসা মানবপুত্র; তিনি ঈশ্বরের পুত্র, আবার অলৌকিক চিকিৎসক; তিনি বলিদানের শিকার, আবার মৃত্যুর বিজয়ী প্রভু। যোহনের সুসমাচারে গিয়ে তিনি আরও এক ধাপ বদলে যান। সেখানে তিনি কেবল মানুষের মধ্যে জন্ম নেওয়া একজন ঈশ্বরনির্বাচিত ব্যক্তি নন, তিনি সৃষ্টির শুরু থেকেই ঈশ্বরের সঙ্গে থাকা মহাজাগতিক “বাক্য” বা Logos, যার মাধ্যমে সবকিছু সৃষ্টি হয়েছে। পরবর্তী চার্চীয় ধর্মতত্ত্ব তাঁকে ত্রিত্ববাদের দ্বিতীয় ব্যক্তিতে পরিণত করে, সম্পূর্ণ মানুষ এবং সম্পূর্ণ ঈশ্বর হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে। একজন গালিলীয় ধর্মপ্রচারক থেকে মহাবিশ্ব সৃষ্টিকারী চিরন্তন ঈশ্বর পর্যন্ত এই বিশাল যাত্রা কোনো একদিনে ঘটেনি। কয়েক শতাব্দীর বিশ্বাস, বিতর্ক, ধর্মীয় রাজনীতি, সাহিত্যিক নির্মাণ এবং পৌরাণিক কল্পনা স্তরে স্তরে এই যিশুকে তৈরি করেছে। এই বিবর্তনের ইতিহাস নিজেই প্রমাণ করে, ধর্মীয় চরিত্র আকাশ থেকে সম্পূর্ণ রূপে নেমে আসে না; মানুষই তাদের স্মৃতি, আশা, ভয় এবং পুরোনো গল্পের ভাষায় ধীরে ধীরে নির্মাণ করে।
হোরাস ও ওসিরিস ছিল শুরু, উৎসের শেষ নয়
মিশরীয় হোরাস, আইসিস ও ওসিরিসের কাহিনী যিশুর পৌরাণিক চরিত্র বোঝার বিশাল ইতিহাসের কেবল একটি দরজা খুলে দেয়। এর পেছনে আরও বিস্তৃত এক প্রাচীন পৃথিবী অপেক্ষা করছে। সেখানে আমরা দেখতে পাব দেবতার সন্তান হিসেবে জন্ম নেওয়া বীর, জন্মের আগেই যার ভবিষ্যৎ ঘোষণা করা হয়েছে; এমন শিশু, যাকে ভয় পেয়ে রাজা হত্যা করতে চেয়েছে; এমন অলৌকিক চিকিৎসক, যার স্পর্শে রোগ সেরেছে; এমন দেবমানব, যে মৃত্যুর পরে দেবত্ব লাভ করেছে বা স্বর্গে উঠেছে; এমন দেবতা, যার মৃত্যু ও ফিরে আসার সঙ্গে মানুষের মুক্তি, নতুন জীবন বা পরকালের আশা যুক্ত হয়েছে। গ্রিক ও রোমান পৃথিবীতে হেরাক্লেস, ডায়োনিসাস, অ্যাসক্লেপিয়াস, রোমুলাস ও সাম্রাজ্যিক দেবত্বের কাহিনী এই বিশাল ধর্মীয় কল্পনার অংশ। ভারতীয় কৃষ্ণের কাহিনীতে আবার আমরা দেখি ভবিষ্যদ্বাণীকৃত অসাধারণ শিশু, আতঙ্কিত অত্যাচারী রাজা কংস, একের পর এক শিশুহত্যা, নবজাতককে গোপনে সরিয়ে নেওয়া এবং পরে সেই শিশুর হাতেই অত্যাচারী শাসকের পতন। প্রতিটি কাহিনীর নিজস্ব ইতিহাস আছে, কিন্তু তাদের মধ্য দিয়ে বারবার যে মানবিক ও ধর্মীয় ছাঁচগুলো ফিরে আসে, সেগুলো উপেক্ষা করে যিশুকে বোঝা সম্ভব নয়।
পরবর্তী অংশে আমরা এই বৃহত্তর পৌরাণিক জগতে প্রবেশ করব। প্রথমে কৃষ্ণ ও কংসের কাহিনী, তারপর ডায়োনিসাসের দেবপুত্রত্ব ও পুনর্জন্মের ধারণা, অ্যাসক্লেপিয়াসের অলৌকিক চিকিৎসা ও মৃতকে জীবিত করার কাহিনী, হেরাক্লেস ও রোমুলাসের মৃত্যুর পর স্বর্গীয় মর্যাদা এবং গ্রিক-রোমান পৃথিবীতে মানুষের দেবত্ব লাভের দীর্ঘ ঐতিহ্য বিশ্লেষণ করা হবে। তখন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে, যিশুর চারপাশে যে অলৌকিক জীবনী আমরা আজ এত পরিচিত বলে স্বাভাবিক মনে করি, তার উপাদানগুলো আসলে বহু পুরোনো ধর্মীয় কল্পনার পৃথিবীতে দীর্ঘদিন ধরেই ঘুরে বেড়াচ্ছিল। খ্রিস্টধর্ম সেই পুরোনো পৃথিবীকে মুছে দিয়ে সম্পূর্ণ নতুন গল্প সৃষ্টি করেনি। বরং পুরোনো গল্প, ইহুদি ধর্মীয় প্রত্যাশা এবং ভূমধ্যসাগরীয় দেবমানবের কল্পনাকে এক নতুন কেন্দ্রে এনে এমন একটি চরিত্র নির্মাণ করেছে, যিনি শেষ পর্যন্ত তাঁর পূর্বসূরি প্রায় সব দেবমানবকেই জনপ্রিয়তা ও ঐতিহাসিক প্রভাবে ছাপিয়ে গেছেন।
কৃষ্ণ ও কংস: ভবিষ্যদ্বাণীকৃত দেবশিশু, হত্যাকারী রাজা এবং অলৌকিক রক্ষা
প্রাচীন ধর্মীয় কাহিনীতে ভবিষ্যৎ ত্রাণকর্তা বা দেবশিশুর জন্মকে ঘিরে যে পরিচিত ছাঁচটি আমরা হোরাস, মূসা এবং পরে যিশুর কাহিনীতে দেখতে পাই, ভারতীয় কৃষ্ণকথায় তার একটি অত্যন্ত শক্তিশালী রূপ পাওয়া যায়। কৃষ্ণ সাধারণ কোনো শিশুর মতো পৃথিবীতে আসেন না। তিনি বিষ্ণুর অবতার, পৃথিবীর ভার লাঘব এবং অত্যাচারী শক্তির বিনাশের জন্য তাঁর জন্ম। তাঁর আবির্ভাবের আগেই রাজা কংস জানতে পারে, তার বোন দেবকীর সন্তানদের একজনই হবে তার মৃত্যুর কারণ। ভবিষ্যতের সেই শিশুকে দেখা তো দূরের কথা, সে তখনও জন্মায়নি, অথচ শুধু একটি ভবিষ্যদ্বাণীই ক্ষমতাধর রাজাকে এমন আতঙ্কে ফেলে দেয় যে সে নিজের বোন ও ভগ্নিপতিকে বন্দি করে এবং দেবকীর সন্তানদের জন্মের পরপরই হত্যা করতে শুরু করে। এখানে শিশুটি জন্ম নেওয়ার আগেই গল্প তাকে অসাধারণ করে তুলেছে। তার অস্তিত্ব এতই তাৎপর্যপূর্ণ যে একটি রাজশক্তি তাকে ভয় পাচ্ছে, ভাগ্য তার আগমন ঘোষণা করছে এবং ইতিহাস যেন তার জন্মের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে। কৃষ্ণের জন্মকাহিনীর বিস্তারিত রূপ হরিবংশ, বিষ্ণু পুরাণ, ভাগবত পুরাণসহ বিভিন্ন বৈষ্ণব ঐতিহ্যে স্তরে স্তরে বিকশিত হয়েছে, কিন্তু এর কেন্দ্রীয় নাটকটি একই: অত্যাচারী শাসক কংস, ভবিষ্যদ্বাণীকৃত শিশু, ধারাবাহিক শিশুহত্যা, অলৌকিকভাবে রক্ষা পাওয়া দেবশিশু এবং শেষ পর্যন্ত সেই শিশুর হাতেই অত্যাচারীর পতন। [17]
কাহিনী অনুসারে দেবকী ও বসুদেবের সন্তানদের একের পর এক হত্যা করার পর কংসের সমস্ত মনোযোগ গিয়ে পড়ে সেই ভয়ংকর অষ্টম সন্তানের দিকে, যার হাতে তার মৃত্যু হবে বলে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে। দেবকী বন্দিশালায় গর্ভধারণ করেন, চারদিকে প্রহরা বসানো হয়, পালানোর পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়। কিন্তু দেবশিশুকে মানুষের পাহারা আটকাতে পারে না। কৃষ্ণ জন্ম নেওয়ার রাতে প্রহরীরা নিদ্রায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে, কারাগারের বন্ধন ও দরজা অকার্যকর হয়ে যায়, বসুদেব নবজাতক শিশুকে নিয়ে কারাগার থেকে বেরিয়ে গোকুলে পৌঁছাতে সক্ষম হন। সেখানে যশোদার সদ্যোজাত কন্যাশিশুর সঙ্গে কৃষ্ণকে বদলে দেওয়া হয়। বসুদেব সেই কন্যাশিশুকে নিয়ে কারাগারে ফিরে আসেন। কংস শিশুটিকে হত্যা করতে গেলে সে তার হাত থেকে মুক্ত হয়ে দেবীর রূপ ধারণ করে আকাশে উঠে ঘোষণা করে যে তার প্রকৃত হত্যাকারী ইতিমধ্যেই অন্যত্র জন্ম নিয়েছে। এরপর কংসের দানবীয় মন্ত্রীরা দশ দিন বা তার কম বয়সী শিশুদের হত্যা করার প্রস্তাব দেয় এবং বৃহত্তর নিপীড়ন অভিযান চালানোর পরিকল্পনা করে। কৃষ্ণ গোপনে অন্য পরিবারে বড় হতে থাকে, তার প্রকৃত পরিচয় শত্রুর কাছ থেকে আড়াল থাকে, আর বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সে একের পর এক অতিমানবীয় কীর্তি সম্পন্ন করে। অবশেষে সেই গোপনে রক্ষা পাওয়া শিশুই মথুরায় ফিরে কংসকে হত্যা করে। যে ভবিষ্যদ্বাণী এড়াতে কংস এত শিশুর রক্ত ঝরিয়েছিল, তার প্রতিটি হত্যাকাণ্ড শেষ পর্যন্ত সেই ভবিষ্যদ্বাণী বাস্তবায়নের পথই তৈরি করে। ধর্মীয় মিথে এই নিয়তির ব্যঙ্গ অত্যন্ত পরিচিত। অত্যাচারী রাজা ভবিষ্যৎকে ঠেকাতে যতই চেষ্টা করে, দেবশিশুর জন্ম ও বিজয় ততই অনিবার্য হয়ে ওঠে। [18]
এই কাহিনীর পাশে ম্যাথিউর যিশুর জন্মকাহিনী রাখলে দুই ভিন্ন ধর্মীয় জগতের মধ্যেও একই ধরনের নাটকীয় ছাঁচ চোখে পড়ে। সেখানে হেরোদ জানতে পারে “ইহুদিদের রাজা” জন্মেছে। এখানেও বর্তমান শাসক এমন এক শিশুকে ভয় পায়, যে এখনও কোনো সেনাবাহিনী গড়েনি, কোনো বিদ্রোহ করেনি, এমনকি কথা বলতেও শেখেনি। কিন্তু তার ভবিষ্যৎ পরিচয়ই রাজাকে আতঙ্কিত করার জন্য যথেষ্ট। হেরোদ শিশুটির অবস্থান জানতে চায়, তাকে হত্যা করার পরিকল্পনা করে, স্বর্গীয় সতর্কবার্তায় যোসেফ শিশুকে নিয়ে পালিয়ে যায় এবং এরপর বেথলেহেমের শিশুদের হত্যার কাহিনী আসে। কৃষ্ণকথায় কংস, যিশুর কাহিনীতে হেরোদ। কৃষ্ণের জন্মের আগে ভবিষ্যদ্বাণী, যিশুর জন্মে মসিহ ও রাজা হওয়ার ঘোষণা। কৃষ্ণকে হত্যার জন্য দেবকীর সন্তানদের হত্যা, যিশুকে হত্যার জন্য বেথলেহেমের শিশুদের হত্যা। কৃষ্ণকে গোপনে অন্যত্র সরিয়ে রক্ষা করা, যিশুকে মিসরে নিয়ে গিয়ে রক্ষা করা। পরে উভয় চরিত্রই নিরাপদে বড় হয়ে নিজেদের ধর্মীয় কাহিনীতে অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে বিজয়ী চরিত্রে প্রতিষ্ঠিত হয়। কাহিনীগুলোর ধর্মতত্ত্ব, সাহিত্যিক উৎস এবং ঐতিহাসিক বিকাশ আলাদা, কিন্তু মানুষের ধর্মীয় কল্পনার ছাঁচটি অত্যন্ত পরিচিত। অসাধারণ মানুষের অসাধারণত্ব প্রমাণ করতে তার প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের জন্য অপেক্ষা করা হয় না। তাকে জন্মের আগেই ভবিষ্যদ্বাণীর সন্তান বানানো হয়, জন্মের পরপরই রাজাদের আতঙ্কে পরিণত করা হয়, তার চারপাশে শিশুহত্যার রক্তাক্ত নাটক তৈরি করা হয় এবং তার বেঁচে থাকাকে স্বর্গীয় পরিকল্পনার প্রমাণ হিসেবে দেখানো হয়। এভাবে একটি শিশু জন্মের মুহূর্ত থেকেই আর সাধারণ মানুষ থাকে না, সে হয়ে ওঠে নিয়তির সন্তান। [19]

এখানে আরও একটি গভীর পার্থক্য ও মিল একসঙ্গে লক্ষণীয়। কৃষ্ণের ক্ষেত্রে ঐশী সত্তা নিজেই মানবজন্ম গ্রহণ করছেন। তিনি কেবল ঈশ্বরের আশীর্বাদপুষ্ট মানুষ নন, বৈষ্ণব ধর্মতত্ত্বে বিষ্ণুর অবতার। অর্থাৎ অসীম ঐশী সত্তা সীমিত মানবদেহে পৃথিবীতে অবতরণ করছে, মানুষের মধ্যে জন্ম নিচ্ছে, মানুষের মতো বেড়ে উঠছে, অথচ তার অন্তর্গত পরিচয় ঐশী। খ্রিস্টধর্মের পরবর্তী ধর্মতত্ত্বেও যিশুকে নিয়ে একটি আশ্চর্যজনকভাবে অনুরূপ মৌলিক প্রশ্ন তৈরি হয়: কীভাবে ঈশ্বর মানবদেহ ধারণ করেন? কীভাবে একই সত্তা ঈশ্বরীয় এবং মানবীয় দুই প্রকৃতির অধিকারী হতে পারে? খ্রিস্টীয় অবতারতত্ত্ব এবং বৈষ্ণব অবতারধারণা এক ধর্মতাত্ত্বিক ধারণা নয়, কিন্তু “ঈশ্বর মানুষের জগতে মানুষের রূপ ধারণ করে অবতীর্ণ হন” এই বৃহত্তর ধর্মীয় কল্পনা যিশুর সঙ্গে প্রথম জন্মায়নি। মানুষের ইতিহাসে বারবার দেবতাকে দূর আকাশে রেখে সন্তুষ্ট থাকা হয়নি। মানুষ তাকে নিজের পৃথিবীতে নামিয়েছে, মানবীর গর্ভে জন্ম দিয়েছে, শিশুর মতো বড় করেছে, তার হাতে অত্যাচারী হত্যা করিয়েছে এবং মানুষের মুক্তির জন্য তাকে ইতিহাসের ভেতরে প্রবেশ করিয়েছে। কৃষ্ণের কাহিনী এই ধর্মীয় আকাঙ্ক্ষার এক অসাধারণ উদাহরণ, আর যিশুর অবতারতত্ত্ব একই মানবিক আকাঙ্ক্ষাকে অন্য এক সাংস্কৃতিক ও ধর্মতাত্ত্বিক ভাষায় মহাজাগতিক মাত্রায় নিয়ে গেছে।
ডায়োনিসাস: দেবপুত্র, দুইবার জন্ম নেওয়া দেবতা এবং মানুষের মধ্যে ঐশী আবির্ভাব
গ্রিক ধর্মের ডায়োনিসাস এমন এক চরিত্র, যার কাহিনীতে দেবপুত্রত্ব, অস্বাভাবিক জন্ম, মাতৃগর্ভের মৃত্যু অতিক্রম করে দ্বিতীয় জন্ম, মানুষের মধ্যে দেবতার আবির্ভাব, অবিশ্বাসীদের সামনে নিজের ঐশী পরিচয় প্রতিষ্ঠা এবং অনুসারীদের জন্য এক গভীর ধর্মীয় অভিজ্ঞতা একসঙ্গে মিশে আছে। তাঁর পিতা সর্বোচ্চ দেবতা জিউস, মা থিবসের মানবী রাজকন্যা সেমেলে। অর্থাৎ আবারও সেই পরিচিত ছাঁচ: ঐশী পিতা এবং মানবী মাতা থেকে জন্ম নেওয়া অসাধারণ সন্তান। কিন্তু ডায়োনিসাসের জন্মের কাহিনী আরও নাটকীয়। ঈর্ষান্বিত হেরা সেমেলেকে এমনভাবে প্ররোচিত করেন যে তিনি জিউসকে তাঁর পূর্ণ ঐশী রূপে উপস্থিত হতে বলেন। জিউস বজ্র ও আগুনের মহিমায় আবির্ভূত হলে মানবী সেমেলে সেই ঐশী শক্তি সহ্য করতে পারেন না এবং মারা যান। কিন্তু তাঁর গর্ভের অনাগত সন্তান মারা যায় না। জিউস তাকে মৃত মায়ের গর্ভ থেকে উদ্ধার করে নিজের উরুর মধ্যে সেলাই করে রাখেন এবং পূর্ণ সময় হলে নিজ দেহ থেকেই তাকে আবার জন্ম দেন। ফলে ডায়োনিসাস এক অর্থে দুইবার জন্ম নেওয়া দেবতা। প্রথমবার মানবী মাতার গর্ভে, দ্বিতীয়বার দেবপিতা জিউসের শরীর থেকে। প্রাচীন গ্রিক সাহিত্যে তাঁর এই অস্বাভাবিক জন্ম এত গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে তাঁকে “দুইবার জন্ম নেওয়া” এবং জিউসের শরীরে ধারণ করা দেবতা হিসেবে বিশেষভাবে স্মরণ করা হয়েছে। [20]
ডায়োনিসাসের কাহিনীর সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক শুধু তাঁর জন্ম নয়, মানুষের মধ্যে তাঁর আবির্ভাবের ধরন। ইউরিপিদিসের বাক্কাই নাটকের শুরুতেই ডায়োনিসাস নিজের পরিচয় ঘোষণা করেন: তিনি জিউসের পুত্র, সেমেলের সন্তান, একজন দেবতা, কিন্তু মানুষের সামনে মানুষের রূপ ধারণ করে উপস্থিত হয়েছেন। তিনি থিবসে এসেছেন নিজের দেবত্ব প্রতিষ্ঠা করতে, কারণ সেখানে অনেকে বিশ্বাস করতে অস্বীকার করছে যে সেমেলে সত্যিই জিউসের সন্তান ধারণ করেছিলেন। এমনকি সেমেলের নিজের বোনেরাও দাবি করেছিল, সে কোনো মানব পুরুষের সঙ্গে সম্পর্কের ফলে গর্ভবতী হয়েছিল এবং নিজের লজ্জা ঢাকতে জিউসের নাম ব্যবহার করেছিল। ফলে ডায়োনিসাসের কাহিনীতে একটি অদ্ভুত ধর্মীয় নাটক তৈরি হয়। দেবতার পুত্র পৃথিবীতে এসেছে, মানুষ তাকে চিনতে পারছে না, কেউ তার ঐশী পরিচয় অস্বীকার করছে, আর দেবতা নিজেই মানুষের রূপে তাদের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের সত্য পরিচয় প্রকাশ করছেন। রাজা পেন্থেউস তাকে প্রত্যাখ্যান করে, তার উপাসনাকে দমন করতে চায় এবং শেষ পর্যন্ত ভয়াবহ পরিণতির মুখে পড়ে। এখানে বিশ্বাস ও অবিশ্বাস কেবল মতামতের প্রশ্ন নয়। দেবতাকে চিনতে না পারা নিজেই ধ্বংসের কারণ। [21]
খ্রিস্টীয় যিশুর কাহিনীতেও এই ধর্মীয় নাটকটি পরিচিত মনে হয়। যোহনের সুসমাচারে যিশু এমন এক ঐশী সত্তা, যিনি মানুষের মধ্যে এসেছেন, কিন্তু পৃথিবী তাঁকে চিনতে পারেনি। তিনি মানবদেহে উপস্থিত, অথচ তাঁর প্রকৃত পরিচয় স্বর্গীয়। সাধারণ মানুষ তাঁর বাহ্যিক মানবদেহ দেখে, কিন্তু বিশ্বাসীরা তার ভেতরে ঈশ্বরীয় পরিচয় খুঁজে পায়। তাঁর কথায় বিশ্বাস বা অবিশ্বাস মানুষের পরিণতি নির্ধারণ করে। ডায়োনিসাস ও যিশুর ধর্মতত্ত্ব এক নয়, কিন্তু দেবতা মানুষের রূপে মানুষের মধ্যে উপস্থিত হন, অধিকাংশ মানুষ তাঁর প্রকৃত পরিচয় বুঝতে ব্যর্থ হয়, কেউ তাঁকে প্রতারক বা বিপজ্জনক ব্যক্তি মনে করে, তাঁর অনুসারীরা তাঁকে ঐশী বলে স্বীকার করে এবং তাঁকে প্রত্যাখ্যানের পরিণতি ভয়াবহ হয়, এই ধর্মীয় নাটক খ্রিস্টীয় সাহিত্যের আগে থেকেই গ্রিক মঞ্চে অভিনীত হচ্ছিল। ইউরিপিদিসের বাক্কাই খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকের রচনা। অর্থাৎ মানুষের মধ্যে গোপন বা আংশিক মানবীয় রূপে দেবতার উপস্থিতি এবং মানুষ সেই দেবতাকে চিনতে পারবে কি না, এই প্রশ্ন যিশুর বহু শতাব্দী আগেই গ্রিক ধর্মীয় কল্পনার একটি শক্তিশালী বিষয় ছিল। [22]
ডায়োনিসাসের উপাসনা আরও একটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি শুধু কোনো গল্পের চরিত্র ছিলেন না, তাঁর চারপাশে গড়ে উঠেছিল জীবন্ত ধর্মীয় আচার, উৎসব, মদ, উল্লাস, নৃত্য, উন্মাদনা এবং ব্যক্তিগত ধর্মীয় অভিজ্ঞতার এক বিশাল জগৎ। মদ তাঁর সঙ্গে এমন গভীরভাবে যুক্ত ছিল যে আঙুরের রস শুধু পানীয় নয়, দেবতার উপস্থিতি ও শক্তির প্রতীক হয়ে উঠেছিল। তাঁর উপাসনায় মানুষ দৈনন্দিন সামাজিক পরিচয় ও নিয়ন্ত্রণের সীমানা অতিক্রম করে এক ধরনের ধর্মীয় উচ্ছ্বাসে প্রবেশ করত। অনুসারীরা অনুভব করত যে দেবতা দূরে নেই, তিনি তাদের মধ্যে উপস্থিত, তাদের শরীর ও চেতনার ভেতরে প্রবেশ করছেন, সাময়িকভাবে মানুষকে তার সাধারণ সীমার বাইরে নিয়ে যাচ্ছেন। খ্রিস্টধর্মে মদ সম্পূর্ণ ভিন্ন ধর্মতাত্ত্বিক অর্থ গ্রহণ করে। শেষ নৈশভোজের কাহিনীতে যিশু মদের পেয়ালাকে নিজের রক্তের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন, আর পরবর্তী খ্রিস্টীয় উপাসনায় রুটি ও মদ বিশ্বাসীর সঙ্গে খ্রিস্টের সম্পর্কের অন্যতম কেন্দ্রীয় পবিত্র আচারে পরিণত হয়। এই দুই ধর্মের আচারকে এক করে দেখা যাবে না, কিন্তু এটুকু স্পষ্ট যে খ্রিস্টধর্ম এমন একটি ভূমধ্যসাগরীয় পৃথিবীতে জন্ম নিয়েছিল যেখানে মদ বহু আগেই শুধু দৈনন্দিন পানীয় ছিল না, দেবতা, ধর্মীয় উল্লাস, পবিত্র আচার এবং ঐশী উপস্থিতির শক্তিশালী প্রতীক ছিল। ফলে যিশুর রক্তের প্রতীক হিসেবে মদের ব্যবহারও কোনো প্রতীকশূন্য সমাজে জন্ম নেয়নি। [23]
ডায়োনিসাসের কাহিনী আমাদের আরও একবার দেখায়, খ্রিস্টধর্মের আগে প্রাচীন পৃথিবীতে “দেবতার পুত্র” কথাটি শুনলে মানুষ বিস্ময়ে নির্বাক হয়ে যেত না। তারা এমন সন্তানদের গল্প বহুবার শুনেছে। দেবতা মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করেন, মানবী গর্ভবতী হন, অসাধারণ সন্তান জন্ম নেয়, জন্মের চারপাশে বিপদ ও অলৌকিক ঘটনা ঘটে, সেই সন্তান বড় হয়ে নিজের ঐশী পরিচয় প্রকাশ করে, মানুষের কাছে নতুন ধর্মীয় অভিজ্ঞতা নিয়ে আসে এবং তার পরিচয় স্বীকার বা অস্বীকার করা মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ করে। ডায়োনিসাসের মধ্যে এই ছাঁচের বহু উপাদান একত্রে উপস্থিত। যিশুর চরিত্র যখন গ্রিক ভাষাভাষী রোমান পৃথিবীতে প্রচারিত হতে শুরু করে, তখন “ঈশ্বরের পুত্র”, “মানুষের মধ্যে অবতীর্ণ ঐশী সত্তা”, “অলৌকিক শক্তির অধিকারী দেবমানব” কিংবা “মানুষকে নতুন জীবনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া প্রভু” এসব ধারণার জন্য সাংস্কৃতিক ভাষা আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল। খ্রিস্টধর্মের অসাধারণ সাফল্যের একটি কারণ ছিল এই যে, সে ইহুদি মসিহের কাহিনীকে এমন এক ভাষায় রূপ দিতে পেরেছিল যা বৃহত্তর ভূমধ্যসাগরীয় পৃথিবীর বহু পুরোনো ধর্মীয় কল্পনার সঙ্গেও কথা বলতে পারত। যিশু তাই কেবল ইহুদি ভবিষ্যদ্বাণীর চরিত্র হয়ে থাকেননি। তিনি ধীরে ধীরে এমন এক সর্বজনীন দেবমানবে পরিণত হয়েছেন, যার মধ্যে ইহুদি মসিহ, গ্রিক দেবপুত্র, অলৌকিক চিকিৎসক, মৃত্যুবিজয়ী প্রভু এবং মানবজাতির ত্রাণকর্তার বহু পরিচিত ধর্মীয় ছাঁচ এক নতুন ধর্মতত্ত্বে এসে মিলেছে।
অ্যাসক্লেপিয়াস: দেবপুত্র, অলৌকিক চিকিৎসক এবং মৃতকে জীবিত করার ক্ষমতা
যিশুর অলৌকিক চিকিৎসা, রোগ সারানো এবং মৃত মানুষকে জীবিত করার কাহিনী খ্রিস্টীয় বিশ্বাসে তাঁর ঐশী পরিচয়ের অন্যতম প্রধান প্রমাণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সুসমাচারে তিনি অন্ধের দৃষ্টি ফিরিয়ে দেন, পক্ষাঘাতগ্রস্তকে হাঁটান, কুষ্ঠরোগীকে সুস্থ করেন এবং এমনকি মৃত লাজারুসকে কবর থেকে জীবিত করে তোলেন। কিন্তু অলৌকিক চিকিৎসক এবং মৃত্যুর সীমা অতিক্রমকারী দেবমানবের ধারণাও যিশুর সঙ্গে প্রথম আবির্ভূত হয়নি। তাঁর বহু শতাব্দী আগে গ্রিক পৃথিবীতে অ্যাসক্লেপিয়াস এমন এক দেবপুত্র হিসেবে পূজিত ছিলেন, যার প্রধান পরিচয়ই ছিল মানুষের রোগমুক্তি এবং মৃত্যুর হাত থেকে জীবন ফিরিয়ে আনার অসাধারণ ক্ষমতা। তাঁর পিতা ছিলেন দেবতা অ্যাপোলো, মা মানবী করোনিস। প্রাচীন কবি পিন্ডারের বর্ণনায়, করোনিসের মৃত্যুর সময় অ্যাপোলো তাঁর গর্ভের শিশুকে উদ্ধার করেন এবং পরে সেই শিশুই মহান চিকিৎসক অ্যাসক্লেপিয়াসে পরিণত হয়। অর্থাৎ তাঁর জন্মের শুরুতেই রয়েছে ঐশী পিতা, মানবী মাতা, মৃত্যুর মুখ থেকে অলৌকিক উদ্ধার এবং ভবিষ্যৎ অসাধারণ নিয়তির সেই পরিচিত ধর্মীয় ছাঁচ। [24]
অ্যাসক্লেপিয়াস শুধু পুরাণের কোনো চিকিৎসক চরিত্র ছিলেন না। প্রাচীন গ্রিক ও পরবর্তী রোমান পৃথিবীতে তাঁকে কেন্দ্র করে বিস্তৃত চিকিৎসা ও ধর্মীয় উপাসনার ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল। তাঁর মন্দিরগুলোতে অসুস্থ মানুষ আরোগ্যের আশায় আসত, পবিত্র স্থানে রাত কাটাত, স্বপ্নে দেবতার দর্শন প্রত্যাশা করত এবং সুস্থ হয়ে ওঠার কাহিনী পাথরের ফলকে লিখে রাখত। মানুষের কাছে তিনি এমন এক ঐশী চিকিৎসক, যিনি সাধারণ চিকিৎসাবিদ্যার সীমার বাইরে গিয়ে রোগীর জীবন বদলে দিতে পারেন। এই ধর্মীয় বিশ্বাসের পেছনে সবচেয়ে নাটকীয় কাহিনী হলো তাঁর মৃত মানুষকে জীবিত করার ক্ষমতা। পিন্ডারের খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকের কবিতাতেই অ্যাসক্লেপিয়াসের এমন একজন মৃত মানুষকে আবার জীবনে ফিরিয়ে আনার কথা পাওয়া যায়, যার ফলে দেবরাজ জিউস ক্রুদ্ধ হয়ে বজ্রাঘাতে তাঁকে হত্যা করেন। পরবর্তী কাহিনীগুলোতে এই মৃতকে জীবিত করার ঘটনা আরও বিস্তৃত হয়। বিভিন্ন ঐতিহ্যে হিপ্পোলিটাস, ক্যাপানেউস, লাইকারগাসসহ একাধিক মৃত ব্যক্তিকে তাঁর হাতে জীবিত হয়ে ফিরে আসতে দেখা যায়। মৃত্যুর ওপর মানুষের এই হস্তক্ষেপ দেবতাদের মহাজাগতিক ব্যবস্থাকেই বিপন্ন করে তুলেছিল, কারণ মানুষ যদি মৃতকেও ফিরিয়ে আনতে পারে, তাহলে মৃত্যু আর দেবতাদের নির্ধারিত অপরিবর্তনীয় সীমা থাকে না। তাই জিউস শেষ পর্যন্ত সেই চিকিৎসক দেবপুত্রকেই বজ্রাঘাতে হত্যা করেন। [25]
এই জায়গায় যিশুর কাহিনীর সঙ্গে তুলনাটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সুসমাচারগুলোতে যিশুর ঐশী কর্তৃত্ব প্রমাণের অন্যতম প্রধান উপায় তাঁর চিকিৎসাশক্তি। তিনি শুধু চিকিৎসক নন, তাঁর শরীর, বাক্য কিংবা স্পর্শেই অলৌকিক আরোগ্য ঘটে। কেউ তাঁর পোশাক স্পর্শ করে সুস্থ হয়, তিনি দূর থেকে নির্দেশ দিয়ে রোগ সারিয়ে দেন, অন্ধকে চোখ দেন, পক্ষাঘাতগ্রস্তকে হাঁটান এবং মৃতকে ফিরিয়ে আনেন। যিশুর অনুসারীদের কাছে এসব ঘটনা তাঁর পরিচয়ের প্রমাণ। কিন্তু গ্রিক ভাষাভাষী একজন মানুষের কাছে অলৌকিক চিকিৎসাশক্তিসম্পন্ন দেবপুত্র কোনো সম্পূর্ণ নতুন ধারণা ছিল না। অ্যাসক্লেপিয়াসের উপাসনা তখন বহু শতাব্দীর পুরোনো এবং ভূমধ্যসাগরীয় পৃথিবীর বিস্তীর্ণ অঞ্চলে পরিচিত। এমনকি “ত্রাণকর্তা” অর্থে ব্যবহৃত Soter উপাধিও গ্রিক ধর্মীয় পরিবেশে বিভিন্ন দেবতা ও দেবমানবের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হতো। অর্থাৎ একজন ঐশী চিকিৎসক মানুষের দুঃখ দূর করছেন, রোগ সারাচ্ছেন এবং জীবন রক্ষা করছেন, এই ধর্মীয় ভাষা খ্রিস্টধর্মের আগে থেকেই মানুষের পরিচিত ছিল। যিশুকে যখন একই পৃথিবীতে অসুস্থ মানুষের আরোগ্যদাতা, মৃত্যুর ওপর ক্ষমতাবান ঈশ্বরপুত্র এবং ত্রাণকর্তা হিসেবে প্রচার করা হলো, তখন তাঁর চরিত্র এমন এক সাংস্কৃতিক ভাষায় কথা বলছিল যা শ্রোতাদের কাছে আগে থেকেই অর্থপূর্ণ ছিল।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাপার হলো, ধর্মীয় কাহিনীতে মৃতকে জীবিত করার ঘটনাটি প্রায় কখনোই কেবল করুণার গল্প নয়। এটি চরিত্রটির ক্ষমতার সর্বোচ্চ ঘোষণা। অসুস্থ মানুষকে সুস্থ করা বিস্ময়কর, কিন্তু মৃত্যুকে উল্টে দেওয়া মানে প্রকৃতির সবচেয়ে কঠিন সীমাটিকেই অস্বীকার করা। অ্যাসক্লেপিয়াসের কাহিনীতে এই ক্ষমতা এত ভয়ংকর যে দেবরাজ নিজেই হস্তক্ষেপ করেন। যিশুর কাহিনীতে একই ক্ষমতা তাঁকে ঈশ্বরপুত্রের মর্যাদায় আরও শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করে। লাজারুসের সমাধির সামনে দাঁড়িয়ে যিশু শুধু একজন মৃত বন্ধুকে ফিরিয়ে আনেন না, যোহনের সুসমাচারে তিনি ঘোষণা করেন, “আমিই পুনরুত্থান ও জীবন।” এখানে চিকিৎসক আর চিকিৎসার মধ্যে দূরত্ব থাকে না। মানুষকে জীবন ফিরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতাধারী ব্যক্তি নিজেই জীবনের উৎসে পরিণত হন। ধর্মীয় কল্পনার এই বিবর্তন গভীরভাবে মানবিক। মানুষ মৃত্যুকে ভয় করে, প্রিয়জনকে হারায়, রোগের সামনে অসহায় হয়ে পড়ে এবং তাই এমন এক চরিত্রের স্বপ্ন দেখে যার কাছে রোগ ও মৃত্যু দুটোই পরাজিত। অ্যাসক্লেপিয়াস সেই আকাঙ্ক্ষার প্রাচীন গ্রিক রূপ, আর যিশু সেই একই গভীর মানবিক আকাঙ্ক্ষাকে আরও বৃহৎ ধর্মতাত্ত্বিক কাঠামোয় নিয়ে গিয়ে ঘোষণা করেন, শুধু কয়েকজন মৃত নয়, শেষ পর্যন্ত তাঁর মাধ্যমে সমগ্র বিশ্বাসী মানবজাতিই মৃত্যুকে অতিক্রম করবে। [26]
হেরাক্লেস ও রোমুলাস: মানুষের মৃত্যু থেকে দেবত্ব ও স্বর্গারোহণ
যিশুর পুনরুত্থান ও স্বর্গারোহণকে খ্রিস্টীয় ধর্মতত্ত্বে তাঁর ঐশী পরিচয়ের চূড়ান্ত বিজয় হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। তিনি পৃথিবীতে জীবন কাটালেন, কষ্ট ভোগ করলেন, মারা গেলেন, তারপর মৃত্যুকে অতিক্রম করে স্বর্গীয় জগতে উন্নীত হলেন। কিন্তু একজন অসাধারণ মানুষ বা দেবপুত্র পার্থিব জীবন শেষে দেবতাদের জগতে উঠে গিয়ে অমরত্ব লাভ করছে, এই কাহিনীও প্রথম শতকের মানুষের কাছে নতুন ছিল না। গ্রিক ধর্মের সবচেয়ে বিখ্যাত বীর হেরাক্লেসের জীবনের শেষ পর্বেই আমরা এর অত্যন্ত স্পষ্ট উদাহরণ দেখি। জিউস ও মানবী আলকমেনের সন্তান হেরাক্লেস সারাজীবন অসাধারণ শক্তি, দুঃখভোগ এবং বীরত্বপূর্ণ কর্মের মধ্য দিয়ে নিজের দেবপুত্র পরিচয় বহন করেন। জীবনের শেষে বিষমাখা পোশাকের যন্ত্রণায় তাঁর শরীর অসহ্যভাবে পুড়তে শুরু করলে তিনি ওয়েটা পর্বতে নিজের চিতায় আরোহণ করেন। আগুন জ্বলে ওঠে, কিন্তু কাহিনী অনুসারে সেই আগুন তাঁর অস্তিত্ব শেষ করতে পারে না। একটি মেঘ তাঁকে ঘিরে নেয়, বজ্রধ্বনির মধ্যে তিনি স্বর্গে উন্নীত হন, অমরত্ব লাভ করেন এবং অলিম্পাসে দেবতাদের মধ্যে স্থান পান। পরে তিনি দেবী হেবেকে বিবাহ করেন। অর্থাৎ তাঁর পার্থিব দেহের যন্ত্রণাদায়ক সমাপ্তির পর গল্পটি মৃত্যুর পরিবর্তে দেবত্বে রূপান্তরের কাহিনীতে পরিণত হয়। [27]
হেরাক্লেসের এই দেবত্বপ্রাপ্তি বা ঈশ্বরীকরণ (apotheosis) প্রাচীন ধর্মীয় চিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক প্রকাশ করে। মানুষ জন্মেই দেবতা হতে হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা ছিল না। কোনো অসাধারণ বীর তার কর্ম, বংশ, কষ্টভোগ অথবা মৃত্যুর পর দেবতাদের মধ্যে স্থান লাভ করতে পারে। মানুষের জীবন থেকে দেবত্বের দিকে এই যাত্রা গ্রিক ও রোমান ধর্মীয় সংস্কৃতিতে এতটাই পরিচিত ছিল যে পরবর্তী সময়ে রাজা ও সম্রাটদের ক্ষেত্রেও ঈশ্বরীকরণের রাজনৈতিক প্রথা গড়ে ওঠে। মৃত সম্রাটকে দেবতা ঘোষণা করা, তাঁর জন্য মন্দির ও পুরোহিত স্থাপন করা এবং তাঁকে স্বর্গীয় মর্যাদা দেওয়া রোমান সাম্রাজ্যের ধর্মীয় রাজনীতির অংশ হয়ে যায়। ফলে প্রথম শতকে যখন যিশুর অনুসারীরা ঘোষণা করতে শুরু করে যে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত একজন মানুষ পুনরুত্থিত হয়ে স্বর্গে উন্নীত হয়েছেন এবং এখন স্বর্গীয় প্রভু হিসেবে রাজত্ব করছেন, সেই দাবির ধর্মতাত্ত্বিক অর্থ নতুন হলেও মানুষের মৃত্যুর পর দেবত্ব ও স্বর্গীয় মর্যাদা লাভের মৌলিক ধারণাটি সাংস্কৃতিকভাবে অপরিচিত ছিল না। হেরাক্লেস বহু শতাব্দী আগেই পার্থিব যন্ত্রণা শেষে স্বর্গে উঠে অমর দেবতায় পরিণত হয়েছেন বলে মানুষ বিশ্বাস করত। [28]
রোমের পৌরাণিক প্রতিষ্ঠাতা রোমুলাসের কাহিনী আরও বিস্ময়কর তুলনার সুযোগ দেয়। রোমান ইতিহাসবিদ লিভির বর্ণনায়, একদিন রোমুলাস সৈন্যদের পরিদর্শন করছিলেন। হঠাৎ ভয়ংকর ঝড় শুরু হয়, ঘন মেঘ তাঁকে ঢেকে ফেলে এবং ঝড় থামার পর দেখা যায় তিনি আর সেখানে নেই। তাঁর দেহও পাওয়া যায় না। উপস্থিত মানুষের মধ্যে দ্রুত বিশ্বাস ছড়িয়ে পড়ে যে রোমুলাসকে স্বর্গে তুলে নেওয়া হয়েছে। এরপর তাঁকে দেবতা, দেবতার পুত্র, রোম নগরীর রাজা ও পিতা হিসেবে সম্মান করা শুরু হয়। কিন্তু কাহিনী এখানেই শেষ নয়। প্রোকুলুস জুলিয়াস নামে একজন সম্মানিত ব্যক্তি পরে দাবি করেন, রোমুলাস স্বর্গ থেকে তাঁর সামনে আবির্ভূত হয়েছেন। সেই আবির্ভাবে রোমুলাস তাঁকে বলেন, রোমানদের জানাতে যে তিনি এখন স্বর্গীয় অবস্থানে আছেন এবং রোমের জন্য দেবীয় দায়িত্ব পালন করবেন। পরে তাঁকে কুইরিনাস নামে দেবতা হিসেবে পূজা করা হয়। এখানে একটি অত্যন্ত পরিচিত ধারাবাহিকতা দেখা যায়: অসাধারণ ব্যক্তির হঠাৎ অন্তর্ধান, পার্থিব দেহের অনুপস্থিতি, স্বর্গে উন্নীত হওয়ার বিশ্বাস, পরে একজন অনুসারীর সামনে তাঁর পুনরাবির্ভাবের দাবি এবং শেষ পর্যন্ত দেবতা হিসেবে উপাসনা। এই কাহিনী যিশুর বহু আগে রোমের নিজস্ব প্রতিষ্ঠাতাকে ঘিরে প্রচলিত ছিল। [29]
আরও আকর্ষণীয় হলো, লিভি নিজেই রোমুলাসের অন্তর্ধান নিয়ে অন্য একটি সম্ভাব্য গল্পের কথা উল্লেখ করেছেন। গোপনে এমন কথাও প্রচলিত ছিল যে রোমুলাসকে হয়তো সেনেটররাই হত্যা করে দেহ টুকরো টুকরো করে গোপন করে ফেলেছিল। কিন্তু যে কাহিনী শেষ পর্যন্ত মানুষের ধর্মীয় স্মৃতিতে বিজয়ী হলো, সেটি হত্যার গল্প নয়, স্বর্গারোহণের গল্প। মানুষ তাদের মহান প্রতিষ্ঠাতাকে রাজনৈতিক হত্যার শিকার মৃত মানুষ হিসেবে মনে রাখতে চায়নি; তারা তাকে স্বর্গে তুলে দেবতায় পরিণত করেছে। লিভির বিবরণে এমনকি স্পষ্ট হয় যে রোমুলাসের অমরত্বের বিশ্বাস মানুষের শোক ও অনিশ্চয়তা প্রশমিত করেছিল। এই মনস্তাত্ত্বিক দিকটি যিশুর কাহিনী বিশ্লেষণেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো প্রিয় নেতা আকস্মিকভাবে নিহত হলে অনুসারীদের সামনে ভয়াবহ সংকট তৈরি হয়। যে মানুষকে তারা ঈশ্বরের নির্বাচিত মনে করেছিল, সে অপমানজনক মৃত্যুদণ্ডে মারা গেল কেন? তাঁর মিশন কি তাহলে ব্যর্থ হলো? ধর্মীয় বিশ্বাস এই ব্যর্থতাকে উল্টে দিতে পারে। মৃত্যু তখন পরাজয় থাকে না, হয়ে ওঠে পূর্বনির্ধারিত পরিকল্পনা। মৃত নেতা হারিয়ে যান না, তিনি জীবিত। তিনি পরাজিত নন, স্বর্গে রাজত্ব করছেন। তাঁর অনুপস্থিতি প্রমাণ করে না যে তিনি শেষ হয়ে গেছেন, বরং বলা হয় তিনি অন্য এক উচ্চতর জগতে উন্নীত হয়েছেন এবং আবার ফিরে আসবেন। এই ধর্মীয় রূপান্তর মানুষের গভীর শোককে বিজয়ে পরিণত করে। [30]
রোমুলাসের কাহিনীর সঙ্গে যিশুর কাহিনী পাশাপাশি রাখলে তাই শুধু “স্বর্গে ওঠা” একটি সাধারণ মিল দেখা যায় না, আরও গভীর একটি ধর্মীয় প্রক্রিয়া চোখে পড়ে। যিশুর মৃত্যুর পর তাঁর সমাধি শূন্য পাওয়া গেল বলে কাহিনী তৈরি হয়, অনুসারীরা তাঁকে জীবিত দেখার দাবি করে, তিনি তাদের সামনে আবির্ভূত হন, তারপর স্বর্গে উঠে যান এবং স্বর্গীয় রাজত্বে অধিষ্ঠিত হন। রোমুলাস অন্তর্ধান করেন, তাঁর দেহ আর দেখা যায় না, মানুষ বিশ্বাস করে তিনি স্বর্গে গেছেন, পরে একজন ব্যক্তি তাঁর আবির্ভাব দেখার দাবি করে এবং তাঁকে দেবতা হিসেবে পূজা করা হয়। দুই কাহিনীর ঐতিহাসিক উৎস, ধর্মতত্ত্ব এবং উদ্দেশ্য এক নয়, কিন্তু একজন মৃত বা অন্তর্ধানকারী নেতাকে স্বর্গে উন্নীত অমর সত্তায় রূপান্তর করার কাহিনীর ভাষা প্রাচীন পৃথিবীতে আগে থেকেই ছিল। হেরাক্লেস আগুন ও মৃত্যুর মধ্য দিয়ে স্বর্গে উঠে দেবতা হন, রোমুলাস ঝড় ও মেঘের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে দেবতা হন, রোমান সম্রাটরা মৃত্যুর পরে স্বর্গীয় মর্যাদা লাভ করেন, আর খ্রিস্টীয় যিশু ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার পর পুনরুত্থিত হয়ে স্বর্গে উঠে সমগ্র সৃষ্টির প্রভুতে পরিণত হন। যিশুর কাহিনী এই পুরোনো কাহিনীগুলোর পুনরাবৃত্তি নয়, কিন্তু যে পৃথিবীতে তাঁর কাহিনী প্রচারিত হয়েছিল, সেখানে মানুষের মৃত্যু থেকে দেবত্বে উত্তরণ, স্বর্গে উন্নীত হওয়া এবং পরে জীবিত বা স্বর্গীয় রূপে আবির্ভূত হওয়ার ধারণা বহুদিন ধরেই মানুষের ধর্মীয় কল্পনার অংশ ছিল। যিশুর স্বর্গারোহণকে বুঝতে হলে সেই বৃহত্তর সাংস্কৃতিক জগতকে বাদ দিয়ে শুধু খ্রিস্টীয় ধর্মতত্ত্বের ভেতরে তাকালে ছবির বড় একটি অংশই অদৃশ্য থেকে যায়। [31]
রোমান সম্রাট, ঈশ্বরপুত্র, ত্রাণকর্তা ও সুসমাচার: যিশুর যুগের রাজনৈতিক ধর্মভাষা
যিশুকে “ঈশ্বরের পুত্র”, “প্রভু” এবং “ত্রাণকর্তা” হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল এমন এক পৃথিবীতে, যেখানে এই শব্দগুলো শুধু ধর্মীয় কল্পনার বিমূর্ত ভাষা ছিল না, রাজনৈতিক ক্ষমতার ভাষাও ছিল। রোমান সাম্রাজ্যে সম্রাটকে কেবল প্রশাসক বা সেনাপতি হিসেবে দেখা হতো না। তাঁর ক্ষমতাকে ধর্মীয় মর্যাদা দেওয়া হতো, তাঁর মূর্তির সামনে উৎসর্গ করা হতো, তাঁর নামে মন্দির ও পুরোহিতের ব্যবস্থা গড়ে উঠত, তাঁর জন্মদিন ও সামরিক বিজয় পবিত্র উৎসবে পরিণত হতো। জুলিয়াস সিজার হত্যার পরে তাঁকে দেবত্ব দেওয়া হলে তাঁর দত্তকপুত্র অক্টাভিয়ান, পরবর্তী সম্রাট অগাস্টাস, নিজের পরিচয়ে Divi Filius, অর্থাৎ “দেবত্বপ্রাপ্তের পুত্র” উপাধি ব্যবহার করতে শুরু করেন। এখানে তিনি কোনো রহস্যময় ধর্মতাত্ত্বিক অর্থে ঈশ্বরের জৈবিক সন্তান দাবি করছিলেন না; তাঁর রাজনৈতিক বার্তাটি ছিল আরও বাস্তব এবং আরও শক্তিশালী। তাঁর পিতা সিজার এখন দেবত্বপ্রাপ্ত, অতএব তিনি দেবত্বপ্রাপ্ত পিতার পুত্র। মুদ্রা, শিলালিপি ও রাষ্ট্রীয় প্রচারণার মাধ্যমে এই পরিচয় সাম্রাজ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। যিশুর জন্মের কয়েক দশক আগেই ভূমধ্যসাগরীয় পৃথিবীর সাধারণ মানুষ তাই “দেবপুত্র” ধরনের ভাষাকে কোনো অচেনা ধারণা হিসেবে শুনছিল না। এই ভাষা ছিল তাদের মুদ্রায়, শহরের শিলালিপিতে, মন্দিরে এবং সাম্রাজ্যিক রাজনীতির প্রকাশ্য মঞ্চে। [32]
খ্রিস্টপূর্ব ৯ সালের প্রিয়েনে পাওয়া বিখ্যাত পঞ্জিকা-শিলালিপি এই রাজনৈতিক ধর্মভাষার অসাধারণ উদাহরণ। সেখানে অগাস্টাসকে মানবজাতির কল্যাণের জন্য প্রেরিত “ত্রাণকর্তা” হিসেবে প্রশংসা করা হয়েছে, তাঁর আগমন যুদ্ধের অবসান ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে এবং তাঁর জন্মদিনকে বিশ্বের জন্য “সুসমাচারগুলোর সূচনা” হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এখানে ব্যবহৃত গ্রিক শব্দ euangelion বা তার বহুবচনই সেই শব্দপরিবার, যা পরে খ্রিস্টধর্মে “গসপেল” বা “সুসমাচার” হিসেবে কেন্দ্রীয় ধর্মীয় অর্থ গ্রহণ করে। অর্থাৎ “সুসমাচার” কথাটিও খ্রিস্টানরা প্রথম আবিষ্কার করেনি। কোনো মহান শাসকের আগমন, জন্ম বা বিজয়ের সংবাদকে পৃথিবীর জন্য শুভবার্তা হিসেবে ঘোষণা করার রাজনৈতিক ভাষা আগেই প্রচলিত ছিল। অগাস্টাসের জন্ম পৃথিবীর জন্য নতুন যুগের সূচনা, তিনি শান্তি এনেছেন, তিনি কল্যাণকারী, তিনি ত্রাণকর্তা। কয়েক দশক পরে একই রোমান সাম্রাজ্যের মধ্যে আরেকটি আন্দোলন ঘোষণা করতে শুরু করল, প্রকৃত সুসমাচার সিজারের নয়, যিশুর; প্রকৃত ত্রাণকর্তা সম্রাট নয়, যিশু; প্রকৃত ঈশ্বরপুত্র অগাস্টাস নয়, যিশু; প্রকৃত শান্তির রাজ্য রোমের সামরিক সাম্রাজ্য নয়, ঈশ্বরের রাজ্য। এই ভাষার রাজনৈতিক ধারটি বোঝা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। খ্রিস্টধর্ম শুধু নতুন ধর্মীয় বিশ্বাস প্রচার করছিল না, সাম্রাজ্যের নিজের পবিত্র ক্ষমতার ভাষাকেও দখল করে নতুন কেন্দ্রে বসিয়ে দিচ্ছিল। [33]
এই প্রেক্ষাপটে মার্কের সুসমাচারের সূচনা আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে: “যিশু খ্রিস্ট, ঈশ্বরের পুত্রের সুসমাচারের আরম্ভ।” একজন আধুনিক পাঠকের কাছে এটি নিছক ধর্মীয় বাক্য মনে হতে পারে, কিন্তু প্রথম শতকের রোমান সাম্রাজ্যে “সুসমাচার”, “ঈশ্বরের পুত্র”, “ত্রাণকর্তা”, “প্রভু” এবং “শান্তি” ছিল ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বী ভাষা। সম্রাট নিজের রাজনৈতিক কর্তৃত্বকে ঐশী অনুমোদনের মাধ্যমে বৈধ করতেন, আর খ্রিস্টীয় প্রচার সেই একই বিশ্বের সামনে ঘোষণা করল, সর্বোচ্চ আনুগত্য সিজারের নয়, যিশুর প্রাপ্য। লুকের জন্মকাহিনীতে স্বর্গদূত ঘোষণা করে, “আমি তোমাদের মহা আনন্দের সুসমাচার জানাচ্ছি”, তারপর নবজাতক যিশুকে “ত্রাণকর্তা”, “খ্রিস্ট” ও “প্রভু” বলা হয় এবং স্বর্গীয় বাহিনী পৃথিবীতে শান্তির ঘোষণা করে। এই শব্দগুলোকে রোমান সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক ধর্মভাষা থেকে বিচ্ছিন্ন করে পড়লে তাদের অর্ধেক অর্থ হারিয়ে যায়। অগাস্টাসের রাষ্ট্রীয় প্রচারণাও শান্তি, নতুন যুগ এবং মানুষের কল্যাণের কথা বলত। তাঁর শাসনকে Pax Augusta বা অগাস্টীয় শান্তির যুগ হিসেবে মহিমান্বিত করা হয়েছিল, যদিও সেই শান্তির ভিত্তি ছিল রোমের সামরিক বিজয় ও সাম্রাজ্যিক আধিপত্য। খ্রিস্টীয় গল্প তার বিপরীতে এক দরিদ্র শিশুকে প্রকৃত ত্রাণকর্তা এবং শান্তির প্রভু হিসেবে দাঁড় করায়। সাম্রাজ্যের চোখে পৃথিবীর কেন্দ্র রোম, খ্রিস্টীয় কাহিনীতে পৃথিবীর ইতিহাস বদলে যায় জুডিয়ার এক শিশুর জন্মে। এই প্রতিস্থাপন ছিল ধর্মীয়ও, রাজনৈতিকও। [34]
রোমান সম্রাটদের দেবত্বের ধারণা শুধু কাগজে লেখা উপাধিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। সাম্রাজ্যের বিভিন্ন শহরে সম্রাট বা তাঁর দেবত্বপ্রাপ্ত পরিবারের সদস্যদের জন্য মন্দির, বেদি, পুরোহিত, উৎসব, শোভাযাত্রা, উৎসর্গ ও ধর্মীয় প্রতিযোগিতা আয়োজন করা হতো। কোনো কোনো সম্রাট মৃত্যুর পরে আনুষ্ঠানিকভাবে দেবত্বপ্রাপ্ত হতেন, আবার সাম্রাজ্যের পূর্বাঞ্চলে জীবিত সম্রাটকেও দেবসম্মান দেওয়া অস্বাভাবিক ছিল না। মানুষ একইসঙ্গে রাজনৈতিক আনুগত্য ও ধর্মীয় আচার দিয়ে সাম্রাজ্যের ক্ষমতাকে স্বীকার করত। ফলে একজন মানুষ কীভাবে দেবত্বের মর্যাদা পেতে পারে, কীভাবে কোনো শাসককে পৃথিবীর ত্রাণকর্তা বলা যায়, কীভাবে তার জন্মকে নতুন যুগের সূচনা হিসেবে উদযাপন করা যায়, এগুলো প্রথম শতকের মানুষের কাছে অসম্ভব বা অকল্পনীয় ধারণা ছিল না। এই পৃথিবীতেই যিশুর অনুসারীরা একজন ক্রুশবিদ্ধ ইহুদি ধর্মপ্রচারককে শুধু পুনরুত্থিত মানুষ নয়, ঈশ্বরের পুত্র, প্রভু, ত্রাণকর্তা এবং শেষ পর্যন্ত সমগ্র মহাবিশ্বের শাসক হিসেবে ঘোষণা করল। রোমান সম্রাটের রাজনৈতিক দেবত্ব এবং যিশুর খ্রিস্টীয় ঈশ্বরত্ব এক বিষয় নয়, কিন্তু তারা একই সাংস্কৃতিক পৃথিবীতে মানুষের আনুগত্যের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে এবং একই ধরনের শক্তিশালী উপাধি ব্যবহার করেছে। একজনের সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সেনাবাহিনী ও রাজনৈতিক শক্তির ওপর, অন্যজনের রাজ্য দাবি করা হলো স্বর্গীয়। কিন্তু ভাষার সংঘর্ষটি স্পষ্ট: কে প্রকৃত প্রভু, কে প্রকৃত ঈশ্বরপুত্র, কে প্রকৃত ত্রাণকর্তা, কার আগমনই প্রকৃত সুসমাচার? খ্রিস্টধর্ম এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে গিয়ে রোমের ধর্মীয়-রাজনৈতিক ভাষাকে ধ্বংস করেনি, বরং তার সবচেয়ে শক্তিশালী শব্দগুলো নিজেদের যিশুর হাতে তুলে দিয়েছে। [35]
পুরোনো ধর্মগ্রন্থ থেকে নতুন জীবনী: ভবিষ্যদ্বাণী পূরণ নয়, কাহিনী নির্মাণের ছাঁচ
যিশুর পৌরাণিক চরিত্রের উৎস খুঁজতে শুধু মিশর, গ্রিস, রোম বা ভারতের দিকে তাকালেই চলবে না। সবচেয়ে প্রত্যক্ষ এবং গভীর উৎস ছিল ইহুদিদের নিজেদের ধর্মগ্রন্থ। সুসমাচারকারীরা এমন একটি সংস্কৃতির মানুষ ছিলেন, যেখানে পুরোনো ধর্মগ্রন্থ শুধু অতীতের ইতিহাস নয়, বর্তমান ও ভবিষ্যতের রহস্য উন্মোচনের পবিত্র মানচিত্র হিসেবে পড়া হতো। ফলে যিশুকে মসিহ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার সময় তাঁর জীবনের গল্পকে বারবার পুরোনো কাহিনী, গীত, নবীদের বাণী এবং ইস্রায়েলের ইতিহাসের সঙ্গে মিলিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। বিষয়টি শুধু এই নয় যে যিশুর জীবনে কিছু ঘটনা ঘটেছিল এবং পরে লেখকেরা আবিষ্কার করলেন, আহা, বহু শতাব্দী আগে এগুলো ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিল। অনেক ক্ষেত্রে উল্টো প্রক্রিয়াটিই বেশি স্পষ্ট। পুরোনো ধর্মগ্রন্থে একটি বাক্য আছে, একটি প্রতীক আছে, একজন পুরোনো বীরের কাহিনী আছে; তারপর নতুন মসিহের জীবনী এমনভাবে লেখা হচ্ছে যাতে তাঁর জীবন সেই পুরোনো পবিত্র ছাঁচকে পুনরায় অভিনয় করে। ফলে ধর্মগ্রন্থ যিশুর জীবনের সাক্ষী হওয়ার পাশাপাশি তাঁর জীবনী নির্মাণের কাঁচামালেও পরিণত হয়েছে। ম্যাথিউর প্রথম দুই অধ্যায় এই প্রক্রিয়ার সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণগুলোর একটি। সেখানে যিশুর জন্ম থেকে নাজারেথে বসবাস পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা পুরোনো ধর্মগ্রন্থের কোনো না কোনো বাক্যের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছে। [36]
কুমারী মায়ের গর্ভে যিশুর জন্মের ক্ষেত্রে ম্যাথিউ যিশাইয় ৭:১৪ উদ্ধৃত করেন: “এক কুমারী গর্ভবতী হবে এবং পুত্র প্রসব করবে।” কিন্তু হিব্রু মূল পাঠের শব্দ almah সাধারণভাবে তরুণী নারী বোঝায়; বাধ্যতামূলকভাবে যৌনসম্পর্কহীন কুমারী নয়। গ্রিক সেপ্তুয়াজিন্ট অনুবাদে শব্দটি parthenos করা হয়েছিল, যা কুমারী অর্থে ব্যবহৃত হতে পারে। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যিশাইয়ের মূল ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে এই বাক্যটি শত শত বছর পর জন্ম নেওয়া যিশু সম্পর্কে সরাসরি ভবিষ্যদ্বাণী ছিল না। যিশাইয় ৭ অধ্যায়ে রাজা আহাজ একটি তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে ছিলেন এবং শিশুটির জন্ম ও বেড়ে ওঠার সময়সীমাই সেই সংকটের অবসানের লক্ষণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। অথচ ম্যাথিউ পুরোনো সেই পাঠকে নতুনভাবে পড়ে যিশুর অলৌকিক জন্মের ধর্মগ্রন্থীয় ভিত্তিতে পরিণত করেন। এই পুনর্ব্যাখ্যা এত শক্তিশালী হয়েছে যে পরবর্তী দুই হাজার বছরের খ্রিস্টীয় সংস্কৃতিতে যিশাইয়ের সেই বাক্য প্রায় সম্পূর্ণভাবে যিশুর কুমারী জন্মের “ভবিষ্যদ্বাণী” হিসেবে পরিচিত হয়ে গেছে। পুরোনো পাঠের নিজস্ব ঐতিহাসিক অর্থ প্রায় অদৃশ্য হয়ে গেছে, নতুন ধর্ম তার ওপর নিজের অর্থ বসিয়ে দিয়েছে। [37]
একই ঘটনা আরও স্পষ্টভাবে দেখা যায় “মিসর থেকে আমি আমার পুত্রকে ডেকেছি” বাক্যটির ব্যবহারে। ম্যাথিউর কাহিনী অনুসারে হেরোদের হাত থেকে বাঁচাতে যোসেফ যিশুকে মিসরে নিয়ে যান এবং পরে ফিরে আসেন। লেখক সঙ্গে সঙ্গে ঘোষণা করেন, এর মাধ্যমে নবীর বাণী পূর্ণ হলো: “মিসর থেকে আমি আমার পুত্রকে ডেকেছি।” উদ্ধৃতিটি হোসেয়া ১১:১ থেকে নেওয়া। কিন্তু হোসেয়ার মূল বাক্যটি পড়লেই দেখা যায়, সেখানে ভবিষ্যতের কোনো মসিহ সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করা হচ্ছে না। বাক্যটি অতীতের ইস্রায়েল জাতিকে নিয়ে: “ইস্রায়েল যখন শিশু ছিল, আমি তাকে ভালোবেসেছিলাম, এবং মিসর থেকে আমার পুত্রকে ডেকেছিলাম।” এটি স্পষ্টভাবে Exodus বা মিসর থেকে ইস্রায়েল জাতির বেরিয়ে আসার স্মৃতি। ম্যাথিউ সেই অতীত ইতিহাসকে যিশুর ব্যক্তিগত জীবনে পুনর্লিখন করেন। ইস্রায়েল যেমন মিসরে ছিল এবং সেখান থেকে ঈশ্বরের পুত্র হিসেবে ডেকে আনা হয়েছিল, যিশুও মিসরে যান এবং ফিরে আসেন। এখানে যিশু এক অর্থে পুরো ইস্রায়েলের ইতিহাস নিজের জীবনে পুনরাভিনয় করছেন। ঘটনাটি আগে ঘটেছে, তারপর দৈবভাবে একটি ভবিষ্যদ্বাণীর সঙ্গে মিলে গেছে, এমনভাবে পড়ার চেয়ে সাহিত্যিক নির্মাণটি অনেক বেশি পরিষ্কার: পুরোনো পবিত্র ইতিহাসকে নতুন মসিহের জীবনের ছাঁচ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। [38]
হেরোদের শিশুহত্যার কাহিনীতেও একই কৌশল দেখা যায়। ম্যাথিউ বেথলেহেমের শিশুদের হত্যার পর যিরমিয় ৩১:১৫ উদ্ধৃত করেন: “রামায় একটি শব্দ শোনা গেল, ক্রন্দন ও মহাবিলাপ; রাহেল তাঁর সন্তানদের জন্য কাঁদছেন।” মূল যিরমিয় পাঠে এটি হেরোদের হাতে বেথলেহেমের শিশু হত্যার ভবিষ্যদ্বাণী নয়। এটি ইস্রায়েলীয়দের নির্বাসন ও জাতীয় বিপর্যয়ের কাব্যিক চিত্র, যেখানে পূর্বমাতা রাহেল নিজের বংশধরদের হারিয়ে কান্না করছেন। ম্যাথিউ সেই পুরোনো শোকের কবিতাকে নতুন শিশুহত্যার কাহিনীর সঙ্গে যুক্ত করেন। একইভাবে যিশুর বেথলেহেমে জন্মকে মীখা ৫:২-এর সঙ্গে, মিসরে যাওয়া ও ফিরে আসাকে হোসেয়ার সঙ্গে, শিশুহত্যাকে যিরমিয়ের সঙ্গে এবং পরে নাজারেথে বসবাসকেও এক রহস্যময় “তিনি নাসরীয় বলে পরিচিত হবেন” ধর্মগ্রন্থীয় দাবির সঙ্গে যুক্ত করা হয়। একটি জন্মকাহিনীর এতগুলো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা যখন একের পর এক ধর্মগ্রন্থের বাক্য পূরণ করার জন্য সাজানো হয়, তখন লেখকের উদ্দেশ্য খুব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি আধুনিক জীবনীকারের মতো একজন মানুষের শৈশবের নিরপেক্ষ তথ্য সংগ্রহ করছেন না; তিনি পবিত্র ধর্মগ্রন্থের ভাষায় এমন এক মসিহ নির্মাণ করছেন যার জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপ আগেই ঈশ্বরের পরিকল্পনায় লেখা ছিল। [39]
মূসার কাহিনী এখানে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ফারাও একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর পুরুষ শিশুদের হত্যা করতে চায়, মূসা অলৌকিকভাবে বেঁচে যায়, পরে মিসর থেকে বেরিয়ে এসে ইস্রায়েলকে মুক্তি দেয়, পাহাড়ে উঠে ঈশ্বরের কাছ থেকে বিধান গ্রহণ করে। ম্যাথিউর যিশুও শিশুহত্যাকারী রাজার হাত থেকে বেঁচে যান, মিসর থেকে ফিরে আসেন, তারপর পাহাড়ে উঠে নতুন নৈতিক বিধান ঘোষণা করেন। মূসার পাঁচটি গ্রন্থের স্মৃতি জাগিয়ে ম্যাথিউ তাঁর সুসমাচারকে পাঁচটি বড় শিক্ষামূলক পর্বে সাজিয়েছেন বলে বহু গবেষক লক্ষ্য করেছেন। যিশু এখানে শুধু মসিহ নন, নতুন মূসার চরিত্রও ধারণ করছেন। তিনি পুরোনো বিধান বাতিল করছেন এমন সরল বক্তব্য নয়, বরং তার পূর্ণতা দাবি করছেন এবং নিজের কর্তৃত্বে তা পুনর্ব্যাখ্যা করছেন: “তোমরা শুনেছ বলা হয়েছিল… কিন্তু আমি তোমাদের বলছি…” একজন সাধারণ ধর্মগুরু এভাবে কথা বলেন না; গল্পের যিশু নিজেকে এমন এক কর্তৃত্বে স্থাপন করছেন যা মূসার ঐতিহ্যকে অতিক্রম করে। এই সাহিত্যিক নির্মাণ বুঝলে যিশুর জীবনের অনেক ঘটনাই নতুন অর্থ পায়। ধর্মীয় লেখকেরা পুরোনো মহান চরিত্রের বৈশিষ্ট্য নতুন চরিত্রের জীবনে পুনরায় সৃষ্টি করে তাকে আরও বড় করে তুলছেন। নতুন নায়ক পুরোনো নায়কের পথ দিয়ে হাঁটছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। [40]
এই প্রক্রিয়া যিশুর জন্মেই থেমে যায়নি। তাঁর জীবনের শেষ দিন, ক্রুশবিদ্ধতা এবং মৃত্যু নিয়েও সুসমাচারের ভাষা পুরোনো ধর্মগ্রন্থে ডুবে আছে। গীতসংহিতা ২২-এ এক নিপীড়িত ব্যক্তির আর্তনাদ, শত্রুদের বিদ্রূপ, পোশাক ভাগ করা এবং ঈশ্বরের কাছে পরিত্যক্ত হওয়ার অনুভূতি পাওয়া যায়। ক্রুশবিদ্ধ যিশুর কাহিনীতে এই ভাষার প্রতিধ্বনি একের পর এক ফিরে আসে। “আমার ঈশ্বর, আমার ঈশ্বর, তুমি কেন আমাকে পরিত্যাগ করেছ?” সরাসরি গীতসংহিতা ২২-এর সূচনা। সৈন্যদের পোশাক ভাগ করা ও ভাগ্য নির্ধারণের দৃশ্যও একই গীতের ভাষাকে স্মরণ করায়। যিশাইয় ৫৩-এর দুঃখভোগী সেবকের চিত্র, যিনি অন্যদের অপরাধের জন্য কষ্ট ভোগ করেন, পরবর্তী খ্রিস্টীয় ব্যাখ্যায় যিশুর মৃত্যুর ধর্মতাত্ত্বিক অর্থের কেন্দ্র হয়ে ওঠে। জাখারিয়ার গাধায় চড়া রাজা যিশুর জেরুসালেমে প্রবেশের দৃশ্যে পুনরায় অভিনীত হয়। অর্থাৎ যিশুর কাহিনী শুধু পূর্ববর্তী পৌত্তলিক ধর্মীয় মোটিফের পরিবেশে গড়ে ওঠেনি; ইহুদিদের নিজস্ব পবিত্র সাহিত্য তাঁর জীবনকে নির্মাণের জন্য আরও প্রত্যক্ষ কাহিনীভাণ্ডার হিসেবে কাজ করেছে। [41]
এই সাহিত্যিক পদ্ধতির সবচেয়ে গভীর ফল হলো, ইতিহাস ও ধর্মতত্ত্বের সীমানা ধীরে ধীরে মুছে যায়। কোনো ঘটনা সত্যিই ঘটেছিল বলে ধর্মগ্রন্থের সঙ্গে মিলেছে, নাকি ধর্মগ্রন্থে লেখা ছিল বলে ঘটনাটি যিশুর জীবনীতে নির্মিত হয়েছে, দুই হাজার বছর পরে সব ক্ষেত্রে তা আলাদা করা সম্ভব নয়। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট: সুসমাচারকারীরা আধুনিক ইতিহাসবিদ ছিলেন না। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল যিশুর জীবন সম্পর্কে নিরপেক্ষ তথ্যের তালিকা তৈরি করা নয়, বরং প্রমাণ করা যে তিনিই ঈশ্বরের পরিকল্পিত মসিহ। সেই বিশ্বাস থেকেই তাঁরা পুরোনো ধর্মগ্রন্থকে নতুন চোখে পড়েছেন এবং পুরোনো বাক্যের মধ্যে যিশুকে খুঁজে পেয়েছেন। তারপর যিশুর জন্ম, শৈশব, প্রচার, মৃত্যু ও পুনরুত্থানের কাহিনীকে সেই পবিত্র ভাষার মধ্যে সাজিয়েছেন। ফলে যিশুর পৌরাণিক নির্মাণ বুঝতে গেলে শুধু “কোন পৌত্তলিক দেবতার সঙ্গে কতটা মিল” এই প্রশ্ন যথেষ্ট নয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, কীভাবে ইহুদি ধর্মগ্রন্থের পুরোনো ইতিহাস, কবিতা ও ভবিষ্যদ্বাণীকে নতুন করে ব্যাখ্যা করে এমন একটি জীবনী তৈরি করা হলো যেখানে যিশুর প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা যেন শত শত বছর আগে থেকেই লেখা ছিল। ধর্মীয় বিশ্বাসের জন্য এটি ভবিষ্যদ্বাণীর অলৌকিক পূর্ণতা; ঐতিহাসিক বিশ্লেষণের দৃষ্টিতে এটি ধর্মগ্রন্থ থেকে জীবনী নির্মাণের এক শক্তিশালী সাহিত্যিক প্রক্রিয়া।
অলৌকিকতার দীর্ঘ ঐতিহ্য: যিশুর আগে ও পরে দেবমানব, চিকিৎসক ও প্রকৃতিনিয়ন্ত্রক
যিশুর জীবনী থেকে অলৌকিক ঘটনাগুলো সরিয়ে দিলে খ্রিস্টীয় যিশুর পরিচিত চরিত্রটির বড় একটি অংশই হারিয়ে যায়। তিনি কুষ্ঠরোগীকে স্পর্শ করে সুস্থ করেন, অন্ধের চোখ খুলে দেন, পক্ষাঘাতগ্রস্তকে হাঁটান, অশুভ আত্মা তাড়ান, মৃতকে জীবিত করেন, অল্প কয়েকটি রুটি ও মাছ দিয়ে হাজার মানুষকে খাওয়ান, পানির ওপর হাঁটেন এবং ঝড়ো সমুদ্রকে এক নির্দেশে শান্ত করে দেন। সুসমাচারকারীরা এসব ঘটনাকে নিছক বিস্ময়কর কাহিনী হিসেবে লেখেননি। প্রতিটি অলৌকিকতার ভেতর দিয়ে তাঁরা পাঠককে একটি নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তের দিকে নিয়ে যেতে চেয়েছেন: এই মানুষটি সাধারণ মানুষ নন। প্রকৃতি, রোগ, অশুভ আত্মা এবং শেষ পর্যন্ত মৃত্যুও তাঁর কর্তৃত্বের অধীন। কিন্তু প্রাচীন পৃথিবীতে কোনো মহান ধর্মীয় চরিত্রের ঐশী পরিচয় প্রতিষ্ঠার জন্য অলৌকিক কর্মকাণ্ডের কাহিনী তৈরি করা মোটেও নতুন কোনো সাহিত্যিক পদ্ধতি ছিল না। দেবতা, দেবপুত্র, নবী, পবিত্র মানুষ ও অতিমানবীয় বীরদের চারপাশে রোগ নিরাময়, প্রকৃতির ওপর কর্তৃত্ব, ভবিষ্যৎ জানা, অলৌকিক খাদ্য, মৃতকে জীবন ফিরিয়ে দেওয়া এবং অশুভ শক্তিকে পরাস্ত করার কাহিনী বহু শতাব্দী ধরে প্রচলিত ছিল। যিশুর অলৌকিক জীবনী এই দীর্ঘ ধর্মীয় কল্পনার এক নতুন এবং অত্যন্ত সফল রূপ।
এর সবচেয়ে প্রত্যক্ষ শিকড়গুলোর একটি ছিল ইহুদি ধর্মগ্রন্থেই। যিশুর বহু আগে নবী এলিয় ও এলিশাকে ঘিরে এমন অলৌকিক কাহিনী তৈরি হয়েছিল, যেগুলোর সঙ্গে সুসমাচারের কিছু যিশু-কাহিনীর সাহিত্যিক সাদৃশ্য অত্যন্ত স্পষ্ট। প্রথম রাজাবলি গ্রন্থে এলিয় এক বিধবার ঘরে সামান্য ময়দা ও তেল এমনভাবে টিকিয়ে রাখেন যে দুর্ভিক্ষের মধ্যেও তা শেষ হয় না; পরে সেই বিধবার মৃত ছেলেকে তিনি জীবিত করেন। দ্বিতীয় রাজাবলি গ্রন্থে এলিশা অল্প কয়েকটি যবের রুটি দিয়ে একশ মানুষকে খাওয়ান, অথচ খাওয়ার পরও খাবার অবশিষ্ট থাকে। তিনি কুষ্ঠরোগী নামানকে সুস্থ করেন এবং এক মৃত শিশুকে জীবন ফিরিয়ে দেন। মার্কের সুসমাচারে যিশু যখন কয়েকটি রুটি ও মাছ দিয়ে হাজার মানুষকে খাওয়ান এবং শেষে খাবার অবশিষ্ট থাকে, তখন কাহিনীটি শুধু একটি বিচ্ছিন্ন অলৌকিক ঘটনার মতো পড়ে না। এটি পুরোনো নবীদের অলৌকিকতার ভাষাকে আরও বড় পরিসরে পুনরায় ব্যবহার করে। এলিশা একশ মানুষকে খাওয়ালে যিশু হাজার মানুষকে খাওয়ান। পুরোনো নবী মৃত শিশুকে জীবিত করলে যিশুও মৃতকে জীবিত করেন। এই সাহিত্যিক বৃদ্ধির ভেতরে একটি পরিষ্কার ধর্মতাত্ত্বিক বার্তা রয়েছে: যিশু শুধু পুরোনো নবীদের মতো নন, তিনি তাদেরও ছাড়িয়ে গেছেন। [42]
প্রকৃতির ওপর যিশুর কর্তৃত্বের কাহিনীগুলোতেও একই ধরনের ধর্মীয় ভাষা কাজ করে। হিব্রু ধর্মগ্রন্থে সমুদ্র ও ঝড়কে নিয়ন্ত্রণ করা মূলত ঈশ্বরের ক্ষমতা। গীতসংহিতায় ঈশ্বর ঝড় থামিয়ে সমুদ্রের ঢেউ শান্ত করেন, ইয়োবের গ্রন্থে ঈশ্বর সমুদ্রের ওপর কর্তৃত্ব ঘোষণা করেন, আর মূসার কাহিনীতে সমুদ্র বিভক্ত হয়ে নির্বাচিত জাতির জন্য পথ তৈরি করে। সুসমাচারে যিশু যখন উত্তাল সমুদ্রকে ধমক দিয়ে শান্ত করেন, শিষ্যরা বিস্ময়ে জিজ্ঞেস করে, “এ কে, যে বাতাস ও সমুদ্রও তার কথা মানে?” প্রশ্নটির উদ্দেশ্য কেবল ভয় প্রকাশ করা নয়। পাঠককে বোঝানো হচ্ছে, যে ক্ষমতা পুরোনো ধর্মগ্রন্থে ঈশ্বরের নিজস্ব ক্ষমতা হিসেবে বর্ণিত হয়েছিল, সেই ক্ষমতাই এখন যিশুর মধ্যে কাজ করছে। একইভাবে পানির ওপর হাঁটার কাহিনীতে যিশু এমন একটি কাজ করছেন যা প্রাচীন ধর্মীয় ভাষায় মানুষের সাধারণ সামর্থ্যের বাইরে। এসব কাহিনী তাই কোনো সাংবাদিকের চোখে দেখা বিচ্ছিন্ন ঘটনার তালিকা নয়। এগুলো একের পর এক ধর্মতাত্ত্বিক দৃশ্য, যার মাধ্যমে একজন মানুষকে ধীরে ধীরে প্রকৃতির ওপর ঈশ্বরীয় কর্তৃত্বসম্পন্ন চরিত্রে রূপান্তর করা হচ্ছে। [43]
ইহুদি ঐতিহ্যের বাইরে বৃহত্তর গ্রিক ও রোমান পৃথিবীতেও অলৌকিক চিকিৎসক ও দেবমানবের ধারণা সুপ্রতিষ্ঠিত ছিল। অ্যাসক্লেপিয়াসের কথা আগেই আলোচনা করা হয়েছে। তাঁর মন্দিরগুলোতে অসুস্থ মানুষ সুস্থতার আশায় আসত, অলৌকিক আরোগ্যের কাহিনী লিখে রাখা হতো, আর ধর্মীয় স্মৃতিতে তিনি এমন চিকিৎসক হয়ে ওঠেন যিনি মৃত্যুর সীমাও অতিক্রম করতে পারেন। পরে প্রথম শতকের টাইয়ানার অ্যাপোলোনিয়াসকে ঘিরেও পবিত্র মানুষ, অলৌকিক জ্ঞান, রোগ নিরাময়, অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে ক্ষমতা এবং এক মৃত বা মৃতপ্রায় তরুণীকে জীবনে ফিরিয়ে আনার কাহিনী গড়ে ওঠে। তাঁর বিস্তৃত জীবনী ফিলোস্ত্রাতুস তৃতীয় শতকে লিখেছিলেন, তাই সেই গ্রন্থকে যিশুর সুসমাচারের পূর্বসূরি হিসেবে ব্যবহার করা যায় না; কিন্তু এই ধরনের সাহিত্য দেখায় যে গ্রিক-রোমান সংস্কৃতিতে একজন অসাধারণ ধর্মীয় ব্যক্তির মাহাত্ম্য প্রকাশ করতে অলৌকিকতা, অতিমানবীয় জ্ঞান, চিকিৎসা ও মৃত্যুর সীমা অতিক্রমের কাহিনী কত স্বাভাবিকভাবে ব্যবহৃত হতো। অলৌকিক মানুষের জীবনী ছিল সেই যুগের পরিচিত ধর্মীয় সাহিত্যিক ভাষা। [44]
এমনকি রোমান সম্রাটদেরও অলৌকিক চিকিৎসার কাহিনী থেকে বাদ রাখা হয়নি। ইতিহাসবিদ ট্যাসিটাস ও সুয়েতোনিয়াস সম্রাট ভেসপাসিয়ানের আলেকজান্দ্রিয়ায় অবস্থানকালে অন্ধ ও পঙ্গু মানুষকে সুস্থ করার গল্প সংরক্ষণ করেছেন। কাহিনী অনুসারে এক অন্ধ ব্যক্তি সম্রাটের কাছে এসে তাঁর চোখে থুতু লাগানোর অনুরোধ করে, আরেকজন হাতের অসুস্থতা সারানোর জন্য তাঁর পায়ের স্পর্শ চায়। প্রথমে ভেসপাসিয়ান দ্বিধা করেন, পরে চিকিৎসকদের মত নেওয়া হয় এবং শেষ পর্যন্ত তিনি চেষ্টা করলে অলৌকিক আরোগ্য ঘটে বলে গল্পটি দাবি করে। এখানে কোনো ইহুদি মসিহ নেই, কোনো খ্রিস্টীয় সুসমাচারও নেই। একজন রাজনৈতিক শাসকের ঐশী অনুগ্রহ ও বিশেষ মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্যও চিকিৎসার অলৌকিক গল্প ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে প্রাচীন সমাজে অলৌকিক আরোগ্যের গল্প শুধু ধর্মীয় করুণা নয়, কর্তৃত্ব নির্মাণের ভাষাও ছিল। যিনি সাধারণ মানুষের অসাধ্য কাজ করতে পারেন, তাঁর ক্ষমতা সাধারণ মানুষের উৎস থেকে আসেনি, এই ধারণাই গল্পকে শক্তিশালী করত। [45]
যিশুর অলৌকিক কাহিনীগুলোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এগুলো সময়ের সঙ্গে শুধু সংরক্ষিত হয়নি, ধর্মতাত্ত্বিক অর্থে আরও বড় হয়েছে। সবচেয়ে প্রাচীন সুসমাচার মার্কে বহু আরোগ্য ও অশুভ আত্মা তাড়ানোর ঘটনা থাকলেও যোহনের সুসমাচারে এসে অলৌকিক ঘটনাগুলো আরও সচেতনভাবে “চিহ্ন” হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সেখানে পানি মদে পরিণত হয়, জন্মান্ধ মানুষ দৃষ্টি ফিরে পায় এবং চার দিন কবরের মধ্যে থাকা লাজারুস যিশুর ডাকে বেরিয়ে আসে। প্রতিটি ঘটনা যিশুর পরিচয় সম্পর্কে একটি ধর্মতাত্ত্বিক ঘোষণা তৈরি করে। তিনি শুধু রুটি দেন না, তিনি নিজেই “জীবনের রুটি”; তিনি শুধু অন্ধকে চোখ দেন না, তিনি “জগতের আলো”; তিনি শুধু লাজারুসকে জীবিত করেন না, তিনি নিজেই ঘোষণা করেন, “আমিই পুনরুত্থান ও জীবন।” কাহিনী যত এগোয়, অলৌকিক কাজ ও চরিত্রের পরিচয় একাকার হয়ে যায়। যিশু আর শুধু ঈশ্বরের কাছ থেকে ক্ষমতা পাওয়া কোনো নবী নন, তিনি নিজেই জীবন, আলো ও মুক্তির উৎসে পরিণত হন। এভাবেই ধর্মীয় জীবনী ইতিহাসের সম্ভাব্য কোনো প্রচারকের স্মৃতি থেকে বেরিয়ে ক্রমে এমন এক দেবমানব নির্মাণ করে, যার হাতে প্রকৃতির প্রতিটি সীমা ভেঙে পড়ে। [46]
অলৌকিকতার এই দীর্ঘ ইতিহাস একটি মৌলিক সত্য সামনে আনে। প্রাচীন ধর্মীয় কাহিনীতে অলৌকিকতা কোনো নিরপেক্ষ প্রমাণ নয়, বরং চরিত্র নির্মাণের অন্যতম প্রধান উপকরণ। মহান নবীকে মহান দেখাতে তাঁর হাতে প্রকৃতির নিয়ম ভাঙতে হয়, দেবপুত্রকে দেবপুত্র প্রমাণ করতে রোগ ও মৃত্যু তাঁর সামনে নত হতে হয়, রাজাকে স্বর্গের অনুগ্রহপ্রাপ্ত দেখাতে তাঁর স্পর্শে অন্ধের চোখ খুলে যেতে হয়। তাই কোনো প্রাচীন গ্রন্থে অলৌকিক ঘটনার সংখ্যা যত বেশি, সেটি সেই ঘটনার ঐতিহাসিক সত্যতার শক্তি বাড়ায় না; বরং সেই চরিত্রকে ঘিরে ধর্মীয় বিশ্বাস কত গভীর হয়েছে, তার সাক্ষ্য দেয়। যিশুর ক্ষেত্রেও তাঁর চারপাশে জমে ওঠা অলৌকিকতার স্তরগুলোকে এই বৃহত্তর মানবিক ও সাহিত্যিক প্রক্রিয়ার মধ্যে দেখতে হয়। তিনি এমন এক পৃথিবীর দেবমানব, যেখানে মানুষ বহু আগে থেকেই বিশ্বাস করত মহান সত্তা সাধারণ মানুষের নিয়মে বাঁধা থাকে না। তাঁর স্পর্শে রোগ সারে, তাঁর কথায় প্রকৃতি থামে, তাঁর উপস্থিতিতে অশুভ শক্তি পালায় এবং শেষ পর্যন্ত তাঁর সামনে মৃত্যুকেও হার মানতে হয়।
মৃত্যু, পাতাল ও পুনরাগমন: যিশুর পুনরুত্থানের বহু পুরোনো পৌরাণিক পটভূমি
খ্রিস্টধর্মের পুরো কাঠামোর কেন্দ্রবিন্দুতে আছে একটি দাবি: যিশু মারা গিয়েছিলেন, তাঁকে সমাহিত করা হয়েছিল, তারপর তিনি মৃত্যু থেকে ফিরে এসেছেন। পল নিজেই স্পষ্ট ভাষায় বলেন, খ্রিস্ট যদি পুনরুত্থিত না হয়ে থাকেন, তাহলে খ্রিস্টীয় প্রচার ও বিশ্বাস অর্থহীন। ফলে যিশুর পুনরুত্থান তাঁর জীবনের আর দশটি অলৌকিক ঘটনার একটি নয়, এটি পুরো ধর্মটির অস্তিত্বের ভিত্তি। কিন্তু মৃত্যু অতিক্রম করা, পাতালে যাওয়া, মৃত দেবতার ফিরে আসা, ঋতুচক্রের সঙ্গে দেবতার মৃত্যু ও নতুন জীবন, অথবা মৃত বীরের স্বর্গীয় অস্তিত্ব লাভ, এসব ধারণা যিশুর কাহিনীর আগে থেকেই প্রাচীন ধর্মীয় কল্পনার গভীরে উপস্থিত ছিল। মিশরের ওসিরিসের মৃত্যু ও পরকালীন পুনর্জীবন আমরা ইতিমধ্যে দেখেছি। মেসোপটেমিয়ার ইনান্না, দুমুজি, লেভান্তের বাল, গ্রিক আদোনিস এবং বিভিন্ন অঞ্চলের মৃত্যু ও প্রত্যাবর্তনের কাহিনী দেখায়, মৃত্যুকে শেষ কথা হিসেবে মেনে নিতে মানুষের অনীহা ছিল ধর্মীয় পুরাণের সবচেয়ে প্রাচীন শক্তিগুলোর একটি। যিশুর পুনরুত্থান এই বিশাল ঐতিহ্যের মধ্যে এক নতুন ও বিশেষ রূপ পেয়েছে, কিন্তু মৃত্যু থেকে জীবন ফিরে পাওয়ার ধর্মীয় স্বপ্নটি খ্রিস্টধর্মের আবিষ্কার নয়। [47]
এই ধারার সবচেয়ে প্রাচীন এবং নাটকীয় উদাহরণগুলোর একটি সুমেরীয় দেবী ইনান্নার পাতালযাত্রা। কাহিনীতে ইনান্না মৃতদের জগতে প্রবেশ করেন এবং একের পর এক সাতটি দ্বার অতিক্রম করতে গিয়ে নিজের ক্ষমতা ও রাজকীয় অলংকার হারান। শেষে পাতালের রানী এরেশকিগালের সামনে তিনি মৃত্যুদণ্ডে পতিত হন এবং তাঁর মৃতদেহ একটি পেরেক বা কাঁটায় ঝুলিয়ে রাখা হয়। ইনান্না ফিরে না আসায় তাঁর সহচর নিনশুবুর দেবতাদের সাহায্য চান। শেষ পর্যন্ত এনকি এমন দুটি সত্তা সৃষ্টি করেন যারা পাতালে গিয়ে “জীবনের খাদ্য” ও “জীবনের জল” ব্যবহার করে ইনান্নাকে পুনরুজ্জীবিত করে। তিনি আবার জীবিত হয়ে উপরের জগতে ফিরে আসেন, যদিও পাতাল থেকে মুক্তির জন্য তাঁর বদলে অন্য কাউকে যেতে হয় এবং সেই প্রক্রিয়ায় তাঁর সঙ্গী দুমুজির ভাগ্য জড়িয়ে পড়ে। এখানে যিশুর পুনরুত্থানের ধর্মতত্ত্ব নেই, পাপের প্রায়শ্চিত্তও নেই; কিন্তু খ্রিস্টধর্মের প্রায় দুই হাজার বছর আগে রচিত ধর্মীয় কল্পনায় আমরা ইতিমধ্যেই দেখি দেবসত্তা পাতালে প্রবেশ করছে, মৃত্যু বরণ করছে, মৃতদেহ ঝুলছে, ঐশী ব্যবস্থায় জীবন ফিরে পাচ্ছে এবং মৃতের জগত থেকে আবার জীবিতদের জগতে উঠে আসছে। মৃত্যু, পাতাল, মৃতদেহ, জীবনের জল এবং পুনরাগমনের এই নাটক মানব ধর্মীয় কল্পনায় কত প্রাচীন, ইনান্নার কাহিনী তার অসাধারণ সাক্ষ্য। [48]
ইনান্নার কাহিনী নিয়ে জনপ্রিয় আলোচনায় প্রায়ই “তিন দিন পরে পুনরুত্থান” কথাটি খুব সহজে বলা হয়, কিন্তু প্রাচীন পাঠের বক্তব্য আরও সূক্ষ্ম। সেখানে তিন দিন তিন রাত পার হওয়ার পর তাঁর সহচর সাহায্যের উদ্যোগ নেয়; ঠিক তিন দিনের মাথায় ইনান্না পুনরুজ্জীবিত হয়েছেন, এমন সময়রেখা পাঠে নেই। এই পার্থক্য যিশুর সঙ্গে তুলনার গুরুত্ব কমায় না, বরং প্রকৃত মিলটি আরও পরিষ্কার করে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কোনো জাদুকরী সংখ্যা মেলানো নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো, যিশুর বহু শতাব্দী আগে থেকেই দেবতার মৃত্যু, মৃতদের জগতে অবস্থান, ঐশী হস্তক্ষেপে জীবন ফিরে পাওয়া এবং উপরের জগতে প্রত্যাবর্তনের পূর্ণাঙ্গ ধর্মীয় কাহিনী মানুষের হাতে ছিল। গল্পের সময়, চরিত্র ও ধর্মতত্ত্ব বদলেছে, কিন্তু মৃত্যু অতিক্রম করার স্বপ্ন বহু পুরোনো। [49]
সিরিয়া ও প্রাচীন লেভান্ত অঞ্চলের উগারিতীয় বাল-কাহিনীতেও আমরা দেবতার মৃত্যু ও প্রত্যাবর্তনের শক্তিশালী ভাষা পাই। ঝড় ও উর্বরতার দেবতা বাল মৃত্যুর দেবতা মোতের ক্ষমতার কাছে পতিত হন। তাঁর মৃত্যুতে পৃথিবীতে শোক নেমে আসে, তাঁর অনুপস্থিতির সঙ্গে প্রকৃতির উর্বরতা ও শৃঙ্খলার সংকট যুক্ত হয়। পরে তাঁর ফিরে আসার সংবাদ আসে এবং দেবলোকের ক্ষমতার ভারসাম্য আবার বদলে যায়। এই কাহিনীগুলোর বিভিন্ন পাঠ ও ব্যাখ্যা নিয়ে গবেষণায় বিতর্ক আছে, কিন্তু প্রাচীন পশ্চিম এশিয়ায় দেবতার মৃত্যু, অনুপস্থিতি এবং জীবন বা ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন যে একটি সুপ্রাচীন পৌরাণিক ধারণা ছিল, তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ কম। সাম্প্রতিক গবেষণায় দ্বিতীয় সহস্রাব্দ খ্রিস্টপূর্ব পশ্চিম এশিয়াতেই মৃত্যু ও প্রত্যাবর্তনশীল দেবতার একটি দীর্ঘ পৌরাণিক ধারার বিকাশ অনুসন্ধান করা হয়েছে। অর্থাৎ “দেবতা মারা গেলেন কিন্তু মৃত্যু তাঁর শেষ নয়” এই ধর্মীয় কল্পনার শিকড় যিশুর সময়ের বহু শতাব্দী আগের। [50]
আদোনিসের কাহিনী আবার মৃত্যু, প্রেম, পাতাল এবং ঋতুচক্রের ধারণাকে একত্র করেছে। গ্রিক ঐতিহ্যে সুন্দর যুবক আদোনিস আফ্রোদিতির প্রিয়। তাঁর মৃত্যু গভীর শোকের জন্ম দেয়, আর বিভিন্ন ধারায় তাঁর সময়ের একটি অংশ পাতালের দেবী পার্সেফোনির সঙ্গে এবং অন্য অংশ জীবিতদের জগতে আফ্রোদিতির সঙ্গে কাটানোর কাহিনী গড়ে ওঠে। তাঁকে ঘিরে আদোনিয়া উৎসবে দ্রুত অঙ্কুরিত হয়ে দ্রুত শুকিয়ে যাওয়া গাছের পাত্র ব্যবহার করা হতো, যা ক্ষণস্থায়ী জীবন, মৃত্যু ও পুনর্নবীকরণের শক্তিশালী প্রতীক হয়ে ওঠে। বিভিন্ন অঞ্চল ও যুগে আদোনিসের ধর্মীয় আচারের রূপ ভিন্ন ছিল, কিন্তু তাঁর সঙ্গে মৃত্যু, শোক এবং ফিরে আসার আনন্দের সম্পর্ক প্রাচীন উৎসেই দেখা যায়। এখানে আবার খ্রিস্টীয় পুনরুত্থানের মতো একবারের জন্য চূড়ান্ত দেহগত বিজয়ের ধারণা নেই; আছে মৃত্যু ও জীবনের পুনরাবৃত্তি, অনুপস্থিতি ও প্রত্যাবর্তনের চক্র। মানুষের কাছে প্রকৃতির ঋতুচক্রই যেন প্রতিদিন একটি ধর্মীয় শিক্ষা দিত: যা মরে যায়, তার সবকিছু শেষ হয়ে যায় না; শুকনো মাটি থেকে আবার সবুজ জন্মায়, বীজ মাটির অন্ধকারে হারিয়ে গিয়ে নতুন জীবন হয়ে ফিরে আসে। ধর্মীয় পুরাণ সেই দৃশ্যকে দেবতার শরীরে রূপ দিয়েছে। [51]
তবে যিশুর পুনরুত্থানের সবচেয়ে প্রত্যক্ষ ধারণাগত ভিত্তি ছিল ইহুদি ধর্মের ভেতরেই ক্রমবিকশিত মৃতদের পুনরুত্থানের বিশ্বাস। হিব্রু বাইবেলের প্রাচীন স্তরে মৃত্যুর পর মানুষের ভাগ্য সম্পর্কে ধারণা ছিল অস্পষ্ট এবং শেওল ছিল ছায়াময় মৃতজগত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে, বিশেষ করে দ্বিতীয় মন্দির যুগে, নির্যাতিত ধার্মিক মানুষের ন্যায়বিচারের প্রশ্ন নতুন ধর্মতাত্ত্বিক সংকট সৃষ্টি করে। ঈশ্বর যদি ন্যায়বান হন, তাহলে যারা ঈশ্বরের জন্য নির্যাতিত ও নিহত হলো তারা কীভাবে চিরতরে পরাজিত থাকবে? এই প্রশ্নের একটি শক্তিশালী উত্তর হয়ে ওঠে পুনরুত্থান। দানিয়েল গ্রন্থে আমরা স্পষ্ট ভাষায় দেখি, মৃতদের কেউ অনন্ত জীবনের জন্য এবং কেউ লজ্জা ও নিন্দার জন্য জেগে উঠবে। পরবর্তী ইহুদি সাহিত্যে পুনরুত্থান আরও বিস্তৃত ধারণায় পরিণত হয়। যিশুর যুগে ফারিসীদের মতো ইহুদি গোষ্ঠী পুনরুত্থানে বিশ্বাস করত, আবার সদূকীরা তা অস্বীকার করত। অর্থাৎ মৃত মানুষের দেহগত পুনরুত্থান নিয়ে ধর্মতাত্ত্বিক বিতর্ক যিশুর মৃত্যুর আগেই ইহুদি সমাজে চলছিল। খ্রিস্টধর্ম সেই বিদ্যমান ইহুদি প্রত্যাশাকে একটি নাটকীয় নতুন মোড় দেয়: শেষ সময়ে সবাই একসঙ্গে পুনরুত্থিত হওয়ার আগে যিশুই প্রথমে পুনরুত্থিত হয়েছেন, তিনি ভবিষ্যৎ সাধারণ পুনরুত্থানের প্রথম ফল। [52]
এখানেই যিশুর পুনরুত্থান-কাহিনীর প্রকৃত ঐতিহাসিক শক্তি বোঝা যায়। এটি কোনো এক পুরোনো দেবতার গল্পকে পুনরাবৃত্তি করেনি; বরং বহু পুরোনো ধর্মীয় আকাঙ্ক্ষাকে এক জায়গায় এনে অসাধারণ এক নতুন সমন্বয় তৈরি করেছে। মিশরীয় ধর্মে মৃত দেবতা ওসিরিস পরকালের অধিপতি, মেসোপটেমিয়ায় ইনান্না পাতাল থেকে জীবনে ফিরে আসে, পশ্চিম এশিয়ায় দেবতার মৃত্যু ও প্রত্যাবর্তনের কাহিনী রয়েছে, গ্রিক ধর্মে মৃত্যু ও পুনর্নবীকরণের প্রতীকী আচার রয়েছে, হেরাক্লেস ও রোমুলাসের মতো বীর মৃত্যুর পরে স্বর্গীয় মর্যাদা লাভ করে, আর ইহুদি ধর্মে ভবিষ্যৎ দেহগত পুনরুত্থানের বিশ্বাস ইতিমধ্যে গড়ে উঠেছে। খ্রিস্টধর্ম এই দীর্ঘ ধর্মীয় পৃথিবীর মধ্যে একজন ক্রুশবিদ্ধ মসিহকে এমনভাবে পুনর্ব্যাখ্যা করল যে তাঁর অপমানজনক মৃত্যু পরাজয় নয়, ঈশ্বরের পরিকল্পনা; তাঁর কবর শেষ নয়, বিজয়ের দরজা; তাঁর ফিরে আসা শুধু তাঁর নিজের জীবন ফিরে পাওয়া নয়, ভবিষ্যতে সমস্ত বিশ্বাসীর মৃত্যুবিজয়ের নিশ্চয়তা। ব্যক্তিগত বীরের পুনরুত্থানকে সার্বজনীন মুক্তির প্রতিশ্রুতিতে রূপান্তর করার মধ্যেই খ্রিস্টীয় কাহিনীর সবচেয়ে বড় ধর্মতাত্ত্বিক শক্তি নিহিত।
পলের লেখায় এই রূপান্তরটি সবচেয়ে স্পষ্ট। তাঁর কাছে যিশুর মৃত্যু একটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের করুণ সমাপ্তি নয়; এটি মানুষের পাপের জন্য মহাজাগতিক আত্মবলিদান। পুনরুত্থানও শুধু মৃত শিক্ষকের ফিরে আসা নয়; এটি নতুন যুগের সূচনা। বিশ্বাসী যিশুর মৃত্যু ও পুনরুত্থানের সঙ্গে প্রতীকীভাবে যুক্ত হয়ে নিজেও নতুন জীবন লাভ করে। একজন মানুষ মারা গেলেন এবং তাঁর অনুসারীরা তাঁকে আবার দেখেছেন বলে দাবি করলেন, এই ছোট ঐতিহাসিক কেন্দ্র থেকে কয়েক দশকের মধ্যেই এমন এক ধর্মতত্ত্ব গড়ে ওঠে যেখানে সমগ্র মানবজাতির মৃত্যু, পাপ, মুক্তি ও অনন্ত জীবনের ভাগ্য সেই এক ব্যক্তির মৃত্যুর সঙ্গে বাঁধা হয়ে যায়। এখানেই যিশুর পৌরাণিক চরিত্র তাঁর পূর্ববর্তী বহু দেবতা ও বীরকে ছাড়িয়ে যায়। পুরোনো দেবতারা ঋতু ফিরিয়েছে, মৃতদের জগত শাসন করেছে, কোনো কোনো বীর স্বর্গে উঠেছে; খ্রিস্টীয় যিশু শেষ পর্যন্ত দাবি করেন সমগ্র মানবজাতির মৃত্যুর সমস্যার চূড়ান্ত সমাধান তাঁর মধ্যেই। মানুষের সবচেয়ে পুরোনো ভয়, মৃত্যুভয়, এবং সবচেয়ে পুরোনো স্বপ্ন, মৃত্যু অতিক্রম করে আবার বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা, খ্রিস্টধর্ম যিশুর শরীরে এক সর্বজনীন মুক্তির কাহিনীতে পরিণত করেছে। [53]
ঐতিহাসিক যিশু থেকে ঈশ্বর যিশু: একটি চরিত্রের ধর্মতাত্ত্বিক বিবর্তন
যিশুকে ঘিরে সবচেয়ে বিস্ময়কর ঐতিহাসিক ঘটনাটি সম্ভবত তাঁর অলৌকিক জন্ম, চিকিৎসা কিংবা পুনরুত্থানের কোনো একটি গল্প নয়। আরও বিস্ময়কর হলো, প্রথম শতকের জুডিয়ার একটি প্রান্তিক ধর্মীয় আন্দোলনের কেন্দ্রীয় চরিত্র কীভাবে কয়েক শতাব্দীর মধ্যে মহাবিশ্ব সৃষ্টির পূর্ব থেকেই বিদ্যমান চিরন্তন ঈশ্বর, সমগ্র সৃষ্টির কর্তা এবং ত্রিত্বের দ্বিতীয় ব্যক্তিতে পরিণত হলেন। একটি সম্ভাব্য ঐতিহাসিক গালিলীয় প্রচারক থেকে খ্রিস্টীয় ধর্মতত্ত্বের সর্বশক্তিমান ঈশ্বরপুত্র পর্যন্ত এই যাত্রা একদিনে ঘটেনি। আবার একে খুব সরল একটি সিঁড়ি হিসেবেও দেখা যাবে না, যেখানে প্রথমে যিশুকে নিছক মানুষ ভাবা হতো এবং পরে ধাপে ধাপে তাঁকে ঈশ্বর বানানো হয়েছে। যিশুর মৃত্যুর কয়েক দশকের মধ্যেই তাঁর অনুসারীদের একাংশ তাঁকে অত্যন্ত উচ্চ স্বর্গীয় মর্যাদায় বসিয়েছিল। পলের প্রাচীন চিঠিতেই যিশু সাধারণ মৃত শিক্ষক নন, তিনি পুনরুত্থিত প্রভু, যাঁর নামে বিশ্বাসীরা মুক্তি পায়, যাঁর সামনে শেষ পর্যন্ত সবাই নত হবে এবং যাঁর মাধ্যমে ঈশ্বরের মহাজাগতিক পরিকল্পনা পূর্ণ হবে। কোনো কোনো প্রাচীন খ্রিস্টীয় স্তোত্রে তাঁকে পৃথিবীতে আসার আগেও এক উচ্চতর অস্তিত্বে কল্পনা করা হয়েছে বলে বহু গবেষক মনে করেন। অর্থাৎ যিশুর দেবত্বের বীজ অনেক প্রাচীন। কিন্তু সেই বীজ থেকে পরবর্তী শতাব্দীর পূর্ণাঙ্গ “সম্পূর্ণ ঈশ্বর এবং সম্পূর্ণ মানুষ” ধারণা তৈরি হতে দীর্ঘ ধর্মতাত্ত্বিক সংগ্রাম, সাহিত্যিক নির্মাণ এবং মতবাদগত বিবর্তনের প্রয়োজন হয়েছে। [54]
এই বিবর্তন বোঝার জন্য নতুন নিয়মের বিভিন্ন লেখায় যিশুকে কীভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, সেটি পাশাপাশি দেখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সবচেয়ে প্রাচীন সুসমাচার মার্ক যিশুর কোনো অলৌকিক জন্মকাহিনী দিয়ে শুরু করে না। সেখানে কোনো স্বর্গদূত মেরির কাছে আসে না, কোনো কুমারী গর্ভধারণের ঘোষণা নেই, কোনো বেথলেহেমের নক্ষত্র নেই, কোনো পূর্বদেশীয় জ্ঞানী নেই। প্রাপ্তবয়স্ক যিশু জন ব্যাপটিস্টের কাছে বাপ্তিস্ম নিতে আসেন এবং সেখান থেকেই তাঁর প্রকাশ্য জীবন শুরু হয়। মার্কের যিশু অবশ্য সাধারণ মানুষ নন। তিনি পাপ ক্ষমা করেন, অশুভ আত্মার ওপর কর্তৃত্ব দেখান, প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করেন, মৃতকে জীবিত করেন এবং পুনরুত্থিত মসিহ হিসেবে উপস্থাপিত হন। কিন্তু তাঁর পরিচয়ের সাহিত্যিক নির্মাণ ম্যাথিউ, লুক এবং বিশেষ করে যোহনের যিশুর তুলনায় আলাদা। ম্যাথিউ ও লুক পরবর্তী সময়ে তাঁর জীবনকে জন্মের আগেই স্বর্গীয় পরিকল্পনার অংশ করে তোলেন। এখন তাঁর মা অলৌকিকভাবে গর্ভধারণ করেন, স্বর্গদূত তাঁর পরিচয় ঘোষণা করে, পুরোনো ভবিষ্যদ্বাণী তাঁর জন্মে পূর্ণ হয় এবং পৃথিবীতে আসার আগেই তাঁর ভবিষ্যৎ মহত্ত্ব নির্ধারিত থাকে। অর্থাৎ যিশুর দেবত্ব ও বিশেষত্বকে তাঁর প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের অলৌকিক কাজ থেকে আরও পেছনে নিয়ে গিয়ে মাতৃগর্ভ পর্যন্ত স্থাপন করা হয়। [55]
যোহনের সুসমাচারে এসে এই রূপান্তর আরও নাটকীয় হয়ে ওঠে। সেখানে যিশুর পরিচয় তাঁর জন্মের মুহূর্ত থেকেও শুরু হয় না। তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় সৃষ্টিরও আগে। “আদিতে বাক্য ছিল, বাক্য ঈশ্বরের সঙ্গে ছিল, এবং বাক্য ঈশ্বর ছিল।” এই “বাক্য” বা লোগোসের মাধ্যমেই সবকিছু সৃষ্টি হয়েছে এবং সেই মহাজাগতিক বাক্যই পরে মানবদেহ ধারণ করেছে। এখানে নাজারেথের একজন মানুষকে আর কেবল ঈশ্বরের নির্বাচিত মসিহ হিসেবে দেখা হচ্ছে না। তিনি পৃথিবীতে জন্ম নেওয়ার আগেই স্বর্গীয় সত্তা, সৃষ্টি তাঁর মাধ্যমে সংঘটিত, তিনি ওপর থেকে পৃথিবীতে এসেছেন এবং কাজ শেষ করে আবার পিতার কাছে ফিরে যাবেন। যোহনের যিশু বারবার নিজের স্বর্গীয় উৎপত্তি ঘোষণা করেন, বলেন তিনি ও পিতা এক, আব্রাহামের জন্মের আগেও তাঁর অস্তিত্ব ছিল এবং তাঁকে দেখলে পিতাকে দেখা হয়। সুসমাচারগুলোর মধ্যে এই যিশু সবচেয়ে স্পষ্টভাবে মহাজাগতিক ও পূর্বস্থিত ঐশী সত্তা। প্রথম শতকের শেষভাগের খ্রিস্টীয় ধর্মতত্ত্বে এসে একজন গালিলীয় প্রচারকের জীবনী আর শুধু পৃথিবীর ইতিহাসের অংশ থাকে না, তাকে মহাবিশ্বের উৎপত্তির গল্পের মধ্যেই বসিয়ে দেওয়া হয়। [56]
তবে এখানেও গল্প শেষ হয়নি। যিশুকে ঈশ্বর বললেই নতুন সমস্যার জন্ম হলো। যদি একমাত্র ঈশ্বর একজন হন, তাহলে পিতা এবং পুত্র দুজনই কীভাবে ঈশ্বর? যিশু যদি সত্যিই ঈশ্বর হন, তাহলে তিনি কি পিতার সমান, নাকি পিতার সৃষ্টি করা সর্বোচ্চ সত্তা? তিনি যদি মানুষও হন, তাহলে তাঁর মধ্যে ঈশ্বর ও মানুষ কীভাবে একসঙ্গে বিদ্যমান? তাঁর কি মানুষের মতো একটি স্বাধীন মন ছিল? তাঁর শরীর কি সত্যিকারের মানবদেহ, নাকি শুধু দেখতে মানুষের মতো? ক্রুশে যখন তিনি মারা গেলেন, ঈশ্বর কি মারা গেলেন? মেরি কি শুধু মানুষ যিশুর মা, নাকি তাঁকে “ঈশ্বরের জননী” বলা যাবে? এসব প্রশ্নের কোনো একক, পরিষ্কার এবং সর্বসম্মত উত্তর প্রথম খ্রিস্টানদের হাতে ছিল না। বরং প্রথম কয়েক শতাব্দীজুড়ে খ্রিস্টানদের বিভিন্ন গোষ্ঠী যিশুর প্রকৃতি নিয়ে তীব্র মতবিরোধে জড়িয়ে পড়ে। কেউ তাঁকে ঈশ্বর কর্তৃক নির্বাচিত অসাধারণ মানুষ হিসেবে বুঝেছে, কেউ তাঁকে স্বর্গীয় সত্তা মনে করেছে, কেউ তাঁর মানবদেহকে আপাত বা মায়াময় বলেছে, কেউ পিতার তুলনায় নিম্নতর ঐশী সত্তা হিসেবে দেখেছে, আবার কেউ পিতা ও পুত্রের পূর্ণ সমতা প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে। খ্রিস্টধর্মের আজকের বহুল পরিচিত যিশু তাই শুরু থেকেই কোনো সম্পূর্ণ প্রস্তুত মতবাদ হিসেবে উপস্থিত ছিলেন না। তাঁকে কীভাবে ঈশ্বর বলতে হবে, সেই প্রশ্নের উত্তর নিয়েই শতাব্দীর পর শতাব্দী লড়াই হয়েছে। [57]
চতুর্থ ও পঞ্চম শতাব্দীর বড় ধর্মসভাগুলো এই দীর্ঘ বিতর্ককে রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক শক্তির মাধ্যমে নির্দিষ্ট মতবাদে বাঁধতে শুরু করে। ৩২৫ খ্রিস্টাব্দের নাইসিয়ার ধর্মসভায় ঘোষণা করা হয়, পুত্র কোনো সাধারণ সৃষ্টি নন, তিনি পিতার সঙ্গে একই সত্তার অংশীদার, homoousios। ৩৮১ সালের কনস্টান্টিনোপলের ধর্মসভায় ত্রিত্ববাদী কাঠামো আরও সুসংহত হয়। পরে ৪৫১ সালের খালকিদনের ধর্মসভা যিশুকে একই ব্যক্তির মধ্যে পূর্ণ ঈশ্বর এবং পূর্ণ মানুষ, দুই প্রকৃতির এক ব্যক্তি হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে। আজ বহু খ্রিস্টানের কাছে এই ভাষা যেন বাইবেলের শুরু থেকেই পরিষ্কারভাবে লেখা ছিল, কিন্তু বাস্তবে এসব সূক্ষ্ম সংজ্ঞা তৈরি হতে যিশুর মৃত্যুর পরে তিন থেকে চার শতাব্দী সময় লেগেছে। এর পেছনে ছিল তীব্র ধর্মতাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব, প্রতিদ্বন্দ্বী বিশপ, বহিষ্কার, রাজনৈতিক সমর্থন, সাম্রাজ্যিক ক্ষমতা এবং কোন মতকে “সত্য বিশ্বাস” আর কোন মতকে “বিধর্ম” ঘোষণা করা হবে, সেই সংগ্রাম। শেষ পর্যন্ত যে মতবাদ বিজয়ী হয়েছে, ইতিহাসে সেটিই “মূল খ্রিস্টধর্ম” হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে; পরাজিত খ্রিস্টীয় ধারাগুলোর বহু গ্রন্থ ও বিশ্বাস প্রান্তে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। ফলে বর্তমান খ্রিস্টীয় যিশু শুধু প্রথম শতকের স্মৃতির ফল নন, তিনি কয়েক শতাব্দীর ধর্মতাত্ত্বিক নির্বাচনেরও ফল। [58]
এই দীর্ঘ বিবর্তনের দিকে তাকালে একটি বিষয় অত্যন্ত স্পষ্ট হয়। ধর্মীয় বিশ্বাস পরে যে চরিত্রটিকে চিরন্তন, অপরিবর্তনীয় সত্য হিসেবে উপস্থাপন করেছে, ইতিহাসে সেই চরিত্রের ধারণাই পরিবর্তিত হয়েছে। পলের পুনরুত্থিত প্রভু, মার্কের অলৌকিক মসিহ, ম্যাথিউ ও লুকের অলৌকিকভাবে জন্ম নেওয়া ঈশ্বরপুত্র, যোহনের সৃষ্টির পূর্ব থেকে বিদ্যমান লোগোস এবং পরবর্তী ধর্মসভার ত্রিত্ববাদী “সম্পূর্ণ ঈশ্বর ও সম্পূর্ণ মানুষ” একই যিশুকে নিয়ে গড়ে ওঠা সম্পর্কিত কিন্তু একেবারে অভিন্ন ধর্মতাত্ত্বিক ছবি নয়। অবশ্যই প্রাচীন ও উচ্চ যিশুভক্তি খুব দ্রুতই তৈরি হয়েছিল, তাই বিষয়টিকে “প্রথমে মানুষ, অনেক পরে হঠাৎ ঈশ্বর” এমন সরল রেখায় নামিয়ে আনা যাবে না। বরং যা দেখা যায় তা আরও আকর্ষণীয়: যিশুকে ঘিরে শুরু থেকেই বিভিন্ন উচ্চ মর্যাদার বিশ্বাস জন্ম নেয়, তারপর বিভিন্ন সম্প্রদায় সেই বিশ্বাসকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করে, পুরোনো ধর্মগ্রন্থ, ইহুদি স্বর্গীয় সত্তার ধারণা, গ্রিক দর্শনের লোগোস, দেবপুত্রের ভূমধ্যসাগরীয় ভাষা এবং নতুন খ্রিস্টীয় অভিজ্ঞতাকে একত্র করে ক্রমে আরও সুসংহত এক ঈশ্বরতত্ত্ব নির্মাণ করে। এই দীর্ঘ নির্মাণপ্রক্রিয়াই শেষ পর্যন্ত ইতিহাসের যিশুকে ধর্মতত্ত্বের চিরন্তন খ্রিস্টে পরিণত করেছে। [59]
আর এখানেই যিশুর পৌরাণিক নির্মাণের সবচেয়ে গভীর স্তরটি প্রকাশিত হয়। একজন ধর্মীয় ব্যক্তির চারপাশে গল্প যোগ হওয়া এক বিষয়, কিন্তু তাঁর পরিচয়কে মহাবিশ্বের গঠন পর্যন্ত বিস্তৃত করা সম্পূর্ণ অন্য স্তরের ঘটনা। যিশুর ক্ষেত্রে সেটিই ঘটেছে। তাঁর জন্ম আর শুধু একটি শিশুর জন্ম নয়, ঈশ্বরের মানবদেহ ধারণ; তাঁর মৃত্যু আর রোমান রাষ্ট্রের হাতে একজন ইহুদি প্রচারকের মৃত্যুদণ্ড নয়, মহাজাগতিক পাপমোচনের বলিদান; তাঁর সমাধি আর একজন মৃত মানুষের কবর নয়, মৃত্যুর ওপর বিজয়ের মঞ্চ; তাঁর অনুসারীদের স্মৃতি আর একজন শিক্ষকের স্মৃতি নয়, সৃষ্টির প্রভুর উপাসনা। ইতিহাসের ঘটনাগুলোকে ধর্মতত্ত্ব এমনভাবে পুনর্ব্যাখ্যা করেছে যে শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবনের প্রতিটি পর্যায় মহাজাগতিক অর্থ পেয়েছে। এটাই পৌরাণিকীকরণের অসাধারণ ক্ষমতা। এটি একটি মানুষকে শুধু বড় করে না, তাকে এমন এক প্রতীকে পরিণত করে যার শরীরে একটি সভ্যতা নিজের ভয়, আশা, পাপ, মৃত্যু, মুক্তি এবং অনন্ত জীবনের স্বপ্নকে জমা করে। যিশু সেই অর্থে শুধু একটি ধর্মের কেন্দ্রীয় চরিত্র নন, মানবজাতির সবচেয়ে সফল পৌরাণিক নির্মাণগুলোর একটি।
উপসংহার: বহু পুরোনো মিথ, নতুন ধর্মতত্ত্ব এবং খ্রিস্টীয় যিশুর নির্মাণ
যিশুর কাহিনীকে যখন শুধু খ্রিস্টীয় ধর্মগ্রন্থের ভেতরে রেখে পড়া হয়, তখন তাঁর জীবনকে অনন্য এবং ইতিহাসে সম্পূর্ণ নজিরবিহীন বলে মনে হওয়া খুব সহজ। একজন কুমারীর গর্ভে ঈশ্বরপুত্রের জন্ম, শিশুকালে অত্যাচারী রাজার হত্যার হুমকি, স্বর্গীয় সুরক্ষা, অলৌকিক চিকিৎসা, মৃতকে জীবিত করা, প্রকৃতির ওপর কর্তৃত্ব, মানুষের পাপের জন্য আত্মবলিদান, মৃত্যু অতিক্রম করে ফিরে আসা, স্বর্গে উন্নীত হওয়া এবং শেষ পর্যন্ত সমগ্র মানবজাতির ত্রাণকর্তা ও বিচারকে পরিণত হওয়া, সবকিছু একসঙ্গে দেখলে চরিত্রটি সত্যিই অসাধারণ। কিন্তু ইতিহাসের দরজা খুলে যিশুর চারপাশের কয়েক হাজার বছরের ধর্মীয় জগতের দিকে তাকালেই এই ছবিটি বদলে যায়। তখন দেখা যায়, যিশুর গল্পের মৌলিক ধর্মীয় ভাষাগুলোর প্রায় কোনোটিই সাংস্কৃতিক শূন্যতায় জন্ম নেয়নি। দেবতা ও মানবীর সন্তান, বিপন্ন দেবশিশু, শিশুহত্যাকারী রাজা, ভবিষ্যদ্বাণীকৃত মুক্তিদাতা, অলৌকিক চিকিৎসক, মৃতকে জীবিতকারী দেবপুত্র, মৃত্যুবরণকারী দেবতা, পাতাল থেকে ফিরে আসা ঐশী চরিত্র, স্বর্গে উন্নীত বীর, দেবত্বপ্রাপ্ত রাজা, ত্রাণকর্তা এবং মানবজাতির জন্য নতুন যুগের সুসমাচার, এসব ধারণা যিশুর বহু আগে থেকেই মানুষের ধর্মীয় কল্পনায় নানা রূপে ঘুরে বেড়াচ্ছিল।
মিশরে আমরা দেখেছি নিহত দেবরাজ ওসিরিসকে, যার মৃত্যু অস্তিত্বের সমাপ্তি নয়, বরং মৃতদের জগতের রাজত্বে রূপান্তর। তাঁর পুত্র হোরাস দেবশিশু, পিতার উত্তরাধিকারী এবং ভবিষ্যৎ বিজয়ী। আইসিসের কোলে শিশু হোরাস দেবমাতা ও দেবশিশুর এমন এক প্রতিমা তৈরি করেছিল যা খ্রিস্টধর্মের বহু শতাব্দী আগেই মানুষের ধর্মীয় অনুভূতির অংশ। ভারতীয় কৃষ্ণের কাহিনীতে ভবিষ্যদ্বাণীকৃত দেবশিশুকে হত্যার জন্য আতঙ্কিত রাজা কংস শিশুদের হত্যা করে, কিন্তু শিশুটি গোপনে রক্ষা পায় এবং পরে সেই শাসকের পতন ঘটায়। গ্রিক পুরাণে জিউস ও মানবী নারীর সন্তান হেরাক্লেস, পার্সিয়াস ও ডায়োনিসাস অসাধারণ জন্ম ও অতিমানবীয় নিয়তির অধিকারী। অ্যাসক্লেপিয়াস দেবপুত্র, চিকিৎসক এবং মৃতকে জীবিত করার ক্ষমতার অধিকারী। হেরাক্লেস পার্থিব যন্ত্রণা শেষে দেবতাদের জগতে অমরত্ব লাভ করেন। রোমুলাস অন্তর্ধানের পর স্বর্গীয় দেবতায় পরিণত হন এবং তাঁর পুনরাবির্ভাবের কাহিনী প্রচলিত হয়। রোমান সম্রাটকে দেবপুত্র, ত্রাণকর্তা ও নতুন যুগের ঘোষক বলা হয়। এই বিশাল ধর্মীয় পৃথিবীর মাঝখানেই খ্রিস্টীয় যিশুর কাহিনী জন্ম নিয়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইহুদি ধর্মীয় ঐতিহ্যের আরও প্রত্যক্ষ উপাদান। মূসার শিশুহত্যার কাহিনী যিশুর শৈশবে নতুনভাবে ফিরে আসে, ইস্রায়েলের মিসরযাত্রা যিশুর ব্যক্তিগত জীবনে পুনরাভিনীত হয়, পুরোনো নবীদের অলৌকিক খাদ্য ও মৃতজীবিত করার কাহিনী তাঁর হাতে আরও বড় আকার নেয়, গীতসংহিতার দুঃখভোগী মানুষের ভাষা তাঁর ক্রুশবিদ্ধতার দৃশ্য নির্মাণে ব্যবহৃত হয়, যিশাইয়ের দুঃখভোগী সেবক তাঁর আত্মবলিদানের ব্যাখ্যা হয়ে ওঠে এবং ইহুদি পুনরুত্থানের প্রত্যাশা তাঁর ব্যক্তিগত পুনরুত্থানের মাধ্যমে নতুন ধর্মতাত্ত্বিক অর্থ পায়। ফলে যিশুর চরিত্রকে বোঝার সবচেয়ে প্রত্যক্ষ সাহিত্যিক চাবি ছিল ইহুদি ধর্মগ্রন্থ, আর বৃহত্তর পৌরাণিক পরিবেশ সরবরাহ করেছে দেবপুত্র, দেবমানব, অলৌকিক চিকিৎসক, মৃত্যুবিজয়ী এবং স্বর্গীয় ত্রাণকর্তার পরিচিত ধর্মীয় ভাষা। এই দুই জগত একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। বরং তাদের সংযোগেই খ্রিস্টীয় যিশুর অসাধারণ শক্তি তৈরি হয়েছে। তিনি একইসঙ্গে ইহুদি মসিহ এবং ভূমধ্যসাগরীয় পৃথিবীর বোধগম্য দেবমানব।
ধর্মীয় মিথের বিবর্তন সাধারণত কোনো কারখানার নকশা অনুসরণ করে না। একজন লেখক বসে হোরাস থেকে তিনটি বৈশিষ্ট্য, কৃষ্ণ থেকে দুটি, ডায়োনিসাস থেকে দুটি এবং মূসা থেকে পাঁচটি ঘটনা নিয়ে যিশু বানিয়েছেন, ইতিহাসকে এমন শিশুসুলভ সমীকরণে নামিয়ে আনলে প্রকৃত প্রক্রিয়াটিই অদৃশ্য হয়ে যায়। ধর্মীয় কাহিনী আরও জটিলভাবে জন্ম নেয়। মানুষ পুরোনো গল্প শুনে বড় হয়, পরিচিত প্রতীকের মধ্যে পৃথিবীকে বোঝে, পূর্বপুরুষের ধর্মগ্রন্থ নতুন সংকটে নতুনভাবে পড়ে, রাজনৈতিক ভাষাকে ধর্মীয় ভাষায় রূপান্তর করে, মৃত নেতার স্মৃতিকে আশা ও বিশ্বাস দিয়ে পুনর্গঠন করে এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম নতুন কাহিনী যোগ করতে থাকে। একটি গল্প আরেকটির হুবহু অনুলিপি না হয়েও একই সাংস্কৃতিক স্মৃতি, একই পৌরাণিক ছাঁচ এবং একই মানবিক আকাঙ্ক্ষা বহন করতে পারে। যিশুর কাহিনীর ক্ষেত্রেও আমরা এই গভীর সংমিশ্রণ দেখি। তাঁর চরিত্রের ভেতরে বহু শতাব্দীর পুরোনো কাহিনী নতুন অর্থে বেঁচে উঠেছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মানুষের আবেগ ও অস্তিত্বের ভয়কে বোঝা। মানুষ মৃত্যুকে ভয় পায়, সন্তানের মৃত্যু সহ্য করতে পারে না, অত্যাচারের সামনে ন্যায়বিচার চায়, রোগের সামনে অসহায় হয়, প্রিয় নেতাকে হারিয়ে বিশ্বাস করতে চায় তিনি সত্যিই হারিয়ে যাননি। মানুষ এমন একজন রক্ষাকর্তার স্বপ্ন দেখে যে রাজাদের ভয় পায় না, রোগের কাছে হার মানে না, মৃত্যুর সীমা মানে না এবং শেষ পর্যন্ত অন্যায়ের বিচার করবে। তাই সভ্যতার পর সভ্যতা দেবশিশু তৈরি করেছে, দেবপুত্র সৃষ্টি করেছে, মৃত দেবতাকে ফিরিয়ে এনেছে, বীরকে স্বর্গে তুলেছে এবং মানুষের ব্যর্থতাকে মহাজাগতিক বিজয়ের গল্পে বদলে দিয়েছে। যিশুর কাহিনী এই মানবিক আকাঙ্ক্ষাগুলোকে এমন অসাধারণ দক্ষতায় একত্র করেছে যে একটি পরাজিত ও ক্রুশবিদ্ধ চরিত্র ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী ত্রাণকর্তায় পরিণত হয়েছে। যে ক্রুশ ছিল রোমান সাম্রাজ্যের অপমানজনক মৃত্যুদণ্ডের প্রতীক, সেটিই পরে মুক্তির প্রতীক হয়েছে। যে মৃত্যু অনুসারীদের আন্দোলন শেষ করে দিতে পারত, সেই মৃত্যুকেই পুনরুত্থানের বিশ্বাস আন্দোলনের সবচেয়ে বড় শক্তিতে পরিণত করেছে। ধর্মীয় মিথের ক্ষমতা এখানেই। বাস্তবতার আঘাতকে সে নতুন অর্থ দেয় এবং পরাজয়কে বিজয়ে রূপান্তর করে।
যিশুকে ঘিরে প্রাচীনতম খ্রিস্টীয় লেখাগুলোর দিকে তাকালেও এই নির্মাণপ্রক্রিয়া থেমে থাকতে দেখা যায় না। পলের পুনরুত্থিত প্রভু, মার্কের অলৌকিক মসিহ, ম্যাথিউ ও লুকের অলৌকিক জন্মের ঈশ্বরপুত্র, যোহনের সৃষ্টির পূর্ব থেকে বিদ্যমান লোগোস এবং পরবর্তী ধর্মসভাগুলোর ত্রিত্ববাদী ঈশ্বর একই চরিত্রের শতাব্দীব্যাপী ধর্মতাত্ত্বিক বিকাশের বিভিন্ন স্তর। সময়ের সঙ্গে তাঁর অতীত আরও অলৌকিক হয়েছে, তাঁর জন্ম আরও মহাজাগতিক হয়েছে, তাঁর মৃত্যু আরও সর্বজনীন অর্থ পেয়েছে এবং তাঁর পরিচয় মানুষের সীমা অতিক্রম করে শেষ পর্যন্ত চিরন্তন ঈশ্বরে পরিণত হয়েছে। যিশুর চরিত্র যেন একটি ধর্মীয় বৃক্ষ, যার শিকড় ইহুদি ধর্মগ্রন্থ ও প্রথম শতকের ইতিহাসে, কিন্তু যার মাটিতে মিশে আছে মিশর, মেসোপটেমিয়া, পারস্য, গ্রিস, রোম এবং বৃহত্তর প্রাচীন পৃথিবীর অসংখ্য পৌরাণিক স্মৃতি। পরে শতাব্দীর পর শতাব্দী খ্রিস্টীয় ধর্মতত্ত্ব সেই বৃক্ষের নতুন ডালপালা তৈরি করেছে।
এই কারণেই খ্রিস্টীয় যিশুকে বুঝতে হলে কেবল প্রশ্ন করা যথেষ্ট নয়, “যিশু নামে একজন মানুষ সত্যিই ছিলেন কি না?” একজন ঐতিহাসিক যিশু থাকলেও খ্রিস্টধর্ম যে যিশুকে উপাসনা করে, তিনি শুধু সেই ঐতিহাসিক মানুষের সমান নন। তাঁর ওপর জমেছে ধর্মগ্রন্থের পুনর্ব্যাখ্যা, অলৌকিক কাহিনী, পুনরুত্থানের বিশ্বাস, দেবপুত্রের প্রাচীন ভাষা, রোমান সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক উপাধি, গ্রিক দর্শনের লোগোস, বহু শতাব্দীর ধর্মতাত্ত্বিক বিতর্ক এবং কোটি মানুষের বিশ্বাস ও কল্পনা। ইতিহাসের কোনো মানুষ থাকলে তিনি এই বিশাল নির্মাণের কেন্দ্রবিন্দু হতে পারেন, কিন্তু নির্মাণটি নিজেই শতাব্দীব্যাপী মানবসৃষ্ট ধর্মীয় প্রক্রিয়ার ফল। এই পার্থক্যটি না বুঝলে ঐতিহাসিক যিশু এবং বিশ্বাসের খ্রিস্টকে এক করে ফেলা হয়।
সব মিলিয়ে যিশুর কাহিনীকে মানবসভ্যতার ধর্মীয় ইতিহাসের বাইরে দাঁড়ানো কোনো বিচ্ছিন্ন অলৌকিক ঘটনা হিসেবে দেখার শক্ত ভিত্তি নেই। বরং তাঁর চরিত্রের প্রায় প্রতিটি বড় স্তরকে আমরা একটি দীর্ঘ সাংস্কৃতিক ইতিহাসের মধ্যে স্থাপন করতে পারি। ঐশী পিতৃত্বের আগে দেবপুত্র ছিল, কুমারী বা অস্বাভাবিক জন্মের আগে অলৌকিক জন্মের দীর্ঘ ঐতিহ্য ছিল, হেরোদের আগে শিশুকে ভয় পাওয়া হত্যাকারী রাজাদের মিথ ছিল, যিশুর আগে অলৌকিক চিকিৎসক ছিল, মৃতকে জীবিত করা দেবমানব ছিল, মৃত্যুকে অতিক্রম করা দেবতা ছিল, স্বর্গে উন্নীত বীর ছিল, ঈশ্বরপুত্র ও ত্রাণকর্তা উপাধিধারী শাসক ছিল, আর মৃতদের পুনরুত্থানের আশাও ছিল। খ্রিস্টধর্মের ঐতিহাসিক সাফল্য এই পুরোনো ধারণাগুলোকে মুছে ফেলা নয়, বরং সেগুলোকে এক শক্তিশালী নতুন কেন্দ্রে সংগঠিত করা। সেই কেন্দ্রের নাম যিশু। একজন ইহুদি মসিহের চারপাশে বহু শতাব্দীর পৌরাণিক স্মৃতি, মানুষের মৃত্যুভয়, ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষা, অলৌকিকতার প্রতি আকর্ষণ এবং মুক্তির স্বপ্ন একত্রিত হয়ে এমন এক দেবমানব তৈরি করেছে, যিনি শেষ পর্যন্ত তাঁর আগের অধিকাংশ দেবতা, বীর ও ত্রাণকর্তাকে জনপ্রিয়তা ও ঐতিহাসিক প্রভাবে ছাপিয়ে গেছেন। সেই অর্থে খ্রিস্টীয় যিশু শুধু একটি ধর্মীয় চরিত্র নন, তিনি মানবজাতির দীর্ঘ পৌরাণিক কল্পনা ও ধর্মতাত্ত্বিক নির্মাণের সবচেয়ে সফল এবং প্রভাবশালী সমন্বয়গুলোর একটি।
About This Article
Genre: Comparative Mythology, Historical Jesus Studies, Religious Syncretism, and Myth-Critical Analysis of Divine-Man Motifs
Epistemic Position: Historical Criticism, Comparative Religion, Mythography, Textual Criticism, Cultural Memory Studies, and Anti-Apologetic Reasoning
This article examines how the Christian image of Jesus developed within a wider ancient world of divine children, god-men, miracle workers, dying-and-rising figures, heavenly rulers, savior motifs, and mythic birth narratives.
The central argument is not that Jesus is a simple copy of Horus, Osiris, Krishna, Dionysus, Asclepius, Heracles, Romulus, or Moses, but that the Jesus tradition absorbed, reorganized, and reinterpreted many older religious motifs through Jewish messianism and Mediterranean divine-man language.
The article compares themes such as miraculous birth, threatened divine child, tyrant king, healing miracles, resurrection-like hope, heavenly exaltation, divine sonship, sacred motherhood, and final judgment across multiple ancient traditions.
This article should be evaluated through comparative mythology, ancient literary patterns, historical context, source criticism, cultural transmission, and religious imagination—not through devotional exceptionalism, apologetic denial, superficial one-to-one copying claims, or the demand that Christian mythology be treated as historically unique revelation.
তথ্যসূত্রঃ
- Bart D. Ehrman, The New Testament: A Historical Introduction to the Early Christian Writings, Oxford University Press; M. David Litwa, How the Gospels Became History: Jesus and Mediterranean Myths, Yale University Press, 2019 ↩︎
- Raymond E. Brown, The Birth of the Messiah, Doubleday, Revised Edition, 1993; Matthew 1-2; Luke 1-2 ↩︎
- M. David Litwa, How the Gospels Became History: Jesus and Mediterranean Myths, Yale University Press, 2019 1 2
- Jodi Magness, “The Cults of Isis and Kore at Samaria-Sebaste in the Hellenistic and Roman Periods,” Harvard Theological Review, Vol. 94, No. 2, 2001, pp. 159-179 ↩︎
- Homer, Iliad, 14.323-324; 19.95-133; Pseudo-Apollodorus, Bibliotheca, 2.4.8; 2.7.7; The Metropolitan Museum of Art, “The Labors of Herakles” ↩︎
- Pseudo-Apollodorus, Bibliotheca, 2.4.1; Ovid, Metamorphoses, Book IV ↩︎
- Euripides, Bacchae, 1-42; Pseudo-Apollodorus, Bibliotheca, 3.4.3 ↩︎
- Pindar, Pythian Ode 3; Pseudo-Apollodorus, Bibliotheca, 3.10.3 ↩︎
- Livy, History of Rome, Book I; Plutarch, Life of Romulus; Cicero, De Republica, II ↩︎
- Luke 1:26-35; M. David Litwa, Iesus Deus: The Early Christian Depiction of Jesus as a Mediterranean God, Fortress Press, 2014; Charles H. Talbert, What Is a Gospel? The Genre of the Canonical Gospels, Fortress Press, 1977 ↩︎
- Geraldine Pinch, Egyptian Mythology: A Guide to the Gods, Goddesses, and Traditions of Ancient Egypt, Oxford University Press, 2002; The Metropolitan Museum of Art, “Statuette of Isis with the Infant Horus,” ca. 733-525 BCE ↩︎
- Jan Assmann, Death and Salvation in Ancient Egypt, Cornell University Press, 2005; Geraldine Pinch, Egyptian Mythology, Oxford University Press, 2002 ↩︎
- The Metropolitan Museum of Art, “Isis and Horus,” Late Period to Ptolemaic Period, 664-30 BCE; The Metropolitan Museum of Art, “Statuette of Isis with the Infant Horus,” ca. 733-525 BCE ↩︎
- Stephen J. Shoemaker, Mary in Early Christian Faith and Devotion, Yale University Press, 2016; The Metropolitan Museum of Art, “Isis and Horus,” 664-30 BCE ↩︎
- Matthew 2:1-23; Exodus 1-2; Raymond E. Brown, The Birth of the Messiah, Doubleday, Revised Edition, 1993 ↩︎
- J. K. Elliott, The Apocryphal New Testament, Oxford University Press; Raymond E. Brown, The Birth of the Messiah; Bart D. Ehrman, Lost Christianities, Oxford University Press, 2003 ↩︎
- Harivaṃśa, Viṣṇu Parva, Krishna birth cycle; Bhāgavata Purāṇa, Book 10, Chapters 1-4; Edwin F. Bryant, ed., Krishna: A Sourcebook, Oxford University Press, 2007 ↩︎
- Bhāgavata Purāṇa, 10.3-4; Harivaṃśa, Viṣṇu Parva; Cornelia Dimmitt and J. A. B. van Buitenen, eds., Classical Hindu Mythology: A Reader in the Sanskrit Purāṇas, Temple University Press, 1978 ↩︎
- Matthew 2:1-23; Raymond E. Brown, The Birth of the Messiah, Doubleday, Revised Edition, 1993; John Stratton Hawley, Krishna, The Butter Thief, Princeton University Press, 1983 ↩︎
- Euripides, Bacchae, lines 1-42; Euripides, Hippolytus, lines 555-564; Pseudo-Apollodorus, Bibliotheca, 3.4.3; Homeric Hymn to Dionysus 1 and 26 ↩︎
- Euripides, Bacchae, especially lines 1-42, 434-518; Walter Burkert, Greek Religion, Harvard University Press, 1985 ↩︎
- Euripides, Bacchae; John 1:1-14; 8:19; 10:30-38; 14:7-11; M. David Litwa, Iesus Deus: The Early Christian Depiction of Jesus as a Mediterranean God, Fortress Press, 2014 ↩︎
- Euripides, Bacchae; Walter Burkert, Greek Religion, Harvard University Press, 1985; Mark 14:22-25; 1 Corinthians 11:23-26 ↩︎
- Pindar, Pythian Ode 3; Pseudo-Apollodorus, Bibliotheca, 3.10.3; Emma J. Edelstein and Ludwig Edelstein, Asclepius: Collection and Interpretation of the Testimonies, Johns Hopkins University Press, 1945 ↩︎
- Pindar, Pythian Ode 3.54-58; Pseudo-Apollodorus, Bibliotheca, 3.10.3; Pausanias, Description of Greece, Book 2 ↩︎
- John 11:1-44; Mark 5:21-43; Pindar, Pythian Ode 3; Emma J. Edelstein and Ludwig Edelstein, Asclepius, Johns Hopkins University Press, 1945 ↩︎
- Pseudo-Apollodorus, Bibliotheca, 2.7.7; Diodorus Siculus, Bibliotheca Historica, Book 4; Ovid, Metamorphoses, Book 9 ↩︎
- Pseudo-Apollodorus, Bibliotheca, 2.7.7; Walter Burkert, Greek Religion, Harvard University Press, 1985 ↩︎
- Livy, History of Rome, 1.16; Plutarch, Life of Romulus, 27-28; Ovid, Metamorphoses, Book 14 ↩︎
- Livy, History of Rome, 1.16; Plutarch, Life of Romulus, 28 ↩︎
- Luke 24:50-53; Acts 1:6-11; Livy, History of Rome, 1.16; Plutarch, Life of Romulus, 28; M. David Litwa, Iesus Deus: The Early Christian Depiction of Jesus as a Mediterranean God, Fortress Press, 2014 ↩︎
- Michael Peppard, The Son of God in the Roman World: Divine Sonship in Its Social and Political Context, Oxford University Press, 2011; Ittai Gradel, Emperor Worship and Roman Religion, Oxford University Press, 2002 ↩︎
- Calendar Inscription of Priene, 9 BCE; Simon R. F. Price, Rituals and Power: The Roman Imperial Cult in Asia Minor, Cambridge University Press, 1984; Michael Peppard, The Son of God in the Roman World, Oxford University Press, 2011 ↩︎
- Mark 1:1; Luke 2:8-14; John Dominic Crossan and Jonathan L. Reed, In Search of Paul: How Jesus’s Apostle Opposed Rome’s Empire with God’s Kingdom, HarperSanFrancisco, 2004; Warren Carter, The Roman Empire and the New Testament, Abingdon Press, 2006 ↩︎
- Michael Peppard, The Son of God in the Roman World, Oxford University Press, 2011; Ittai Gradel, Emperor Worship and Roman Religion, Oxford University Press, 2002 ↩︎
- Raymond E. Brown, The Birth of the Messiah, Doubleday, Revised Edition, 1993; Dale C. Allison Jr., The New Moses: A Matthean Typology, Fortress Press, 1993 ↩︎
- Isaiah 7:10-17; Matthew 1:22-23; Raymond E. Brown, The Birth of the Messiah, Doubleday, 1993 ↩︎
- Hosea 11:1; Matthew 2:13-15; Dale C. Allison Jr., The New Moses, Fortress Press, 1993 ↩︎
- Matthew 2:1-23; Jeremiah 31:15; Micah 5:2; Raymond E. Brown, The Birth of the Messiah, Doubleday, 1993 ↩︎
- Exodus 1-24; Matthew 2-7; Dale C. Allison Jr., The New Moses: A Matthean Typology, Fortress Press, 1993 ↩︎
- Psalm 22; Isaiah 52:13-53:12; Zechariah 9:9; Mark 11:1-10; 15:21-41; Matthew 27:27-50 ↩︎
- 1 Kings 17:8-24; 2 Kings 4:1-7, 4:32-37, 4:42-44, 5:1-14; Mark 5:21-43; 6:30-44; John P. Meier, A Marginal Jew: Rethinking the Historical Jesus, Volume II: Mentor, Message, and Miracles, Doubleday, 1994 ↩︎
- Psalm 77:16-20; 89:8-9; 107:23-30; Job 9:8; Mark 4:35-41; 6:45-52 ↩︎
- Philostratus, Life of Apollonius of Tyana, Book IV; Graham Anderson, Philostratus: Biography and Belles Lettres in the Third Century A.D., Croom Helm, 1986; Emma J. Edelstein and Ludwig Edelstein, Asclepius, Johns Hopkins University Press, 1945 ↩︎
- Tacitus, Histories, 4.81; Suetonius, Life of Vespasian, 7 ↩︎
- John 2:1-11; 6:1-59; 9:1-41; 11:1-44; Bart D. Ehrman, How Jesus Became God, HarperOne, 2014 ↩︎
- 1 Corinthians 15:3-19; Jan Assmann, Death and Salvation in Ancient Egypt, Cornell University Press, 2005; C. D. Elledge, Resurrection of the Dead in Early Judaism, 200 BCE-CE 200, Oxford University Press, 2017 ↩︎
- Inanna’s Descent to the Netherworld, Sumerian literary tradition; Samuel Noah Kramer, History Begins at Sumer, University of Pennsylvania Press; Diane Wolkstein and Samuel Noah Kramer, Inanna: Queen of Heaven and Earth, Harper & Row, 1983 ↩︎
- Inanna’s Descent to the Netherworld; Samuel Noah Kramer, “Death and Nether World According to the Sumerian Literary Texts,” Iraq ↩︎
- Mark S. Smith, The Ugaritic Baal Cycle, Brill; Noga Ayali-Darshan, Dying and Rising Gods: The History of a Mythologem in West Asia of the Second Millennium BCE, Zaphon, 2024 ↩︎
- Pseudo-Apollodorus, Bibliotheca, 3.14.4; Lucian, De Dea Syria, 6-8; V. Pirenne-Delforge, “Adonis,” Oxford Classical Dictionary ↩︎
- Daniel 12:1-3; 2 Maccabees 7; Josephus, Jewish War, 2.162-166; 1 Corinthians 15:20-23; C. D. Elledge, Resurrection of the Dead in Early Judaism, 200 BCE-CE 200, Oxford University Press, 2017 ↩︎
- Romans 6:3-11; 1 Corinthians 15:12-28; Eduard Schweizer, “Dying and Rising with Christ,” New Testament Studies, Vol. 14, Issue 1; Helmut Koester, “The Memory of Jesus’ Death and the Worship of the Risen Lord,” Harvard Theological Review, Vol. 91, Issue 4 ↩︎
- Philippians 2:5-11; 1 Corinthians 8:6; Romans 1:3-4; Larry W. Hurtado, Lord Jesus Christ: Devotion to Jesus in Earliest Christianity, Eerdmans, 2003; James D. G. Dunn, Christology in the Making, SCM Press, 1980 ↩︎
- Mark 1:1-11; Matthew 1-2; Luke 1-2; Raymond E. Brown, The Birth of the Messiah, Doubleday, Revised Edition, 1993 ↩︎
- John 1:1-18; 8:58; 10:30; 14:9; William Loader, Jesus in John’s Gospel: Structure and Issues in Johannine Christology, Eerdmans, 2017 ↩︎
- Bart D. Ehrman, How Jesus Became God, HarperOne, 2014; J. N. D. Kelly, Early Christian Doctrines, Continuum, 5th Edition, 1977 ↩︎
- Council of Nicaea, 325 CE; Council of Constantinople, 381 CE; Definition of Chalcedon, 451 CE; Lewis Ayres, Nicaea and Its Legacy, Oxford University Press, 2004; J. N. D. Kelly, Early Christian Doctrines ↩︎
- Larry W. Hurtado, Lord Jesus Christ, Eerdmans, 2003; John J. Collins and Adela Yarbro Collins, King and Messiah as Son of God, Eerdmans, 2008; Bart D. Ehrman, How Jesus Became God, HarperOne, 2014 ↩︎
