ইসলামি সহিহ আকিদা অনুসারে দর্শন বা যুক্তিবিদ্যা পড়া হারাম

ভূমিকা

মানবসভ্যতার বৌদ্ধিক বিবর্তনের ইতিহাসে ‘দর্শন’ (Philosophy) কেবল একটি পাঠ্য বিষয় নয়, বরং এটি মানুষের স্বাধীন চিন্তার সর্বোচ্চ বহিঃপ্রকাশ। শব্দগতভাবে যার অর্থ “জ্ঞানের প্রতি অনুরাগ”, সেই দর্শনই যুগে যুগে মানুষের অস্তিত্ব, নৈতিকতা এবং মহাজাগতিক রহস্যগুলোকে যুক্তির কষ্টিপাথরে যাচাই করতে শিখিয়েছে। পদার্থবিজ্ঞান থেকে শুরু করে মনোবিজ্ঞান—জ্ঞানের প্রতিটি আধুনিক শাখা আজ যেখানে দাঁড়িয়ে আছে, তার ভিত্তি রচিত হয়েছিল দর্শনের হাতেই। একারণেই উচ্চতর উচ্চশিক্ষার সর্বোচ্চ স্বীকৃতিকে আজও ‘ডক্টর অফ ফিলোসফি’ (PhD) বলা হয়, যা মূলত সকল জ্ঞানের আদি উৎস হিসেবে দর্শনের শ্রেষ্ঠত্বকে স্বীকার করে নেয়। তবে ইতিহাসের এক অদ্ভুত বৈপরীত্য হলো, দর্শন যখন মানুষকে প্রশ্নাতীত আনুগত্যের শৃঙ্খল ভেঙে যুক্তিনির্ভর হতে উদ্বুদ্ধ করেছে, তখন সংগঠিত ধর্মগুলো একে অনেক সময় নিজেদের আধিপত্যের প্রতি হুমকি হিসেবে বিবেচনা করেছে।

ইসলামী ধর্মতত্ত্বের প্রেক্ষাপটে দর্শন ও যুক্তিশাস্ত্রের এই লড়াইটি অত্যন্ত প্রাচীন এবং জটিল। একদিকে যখন যুক্তি (Aql) মানুষকে অজানাকে জানতে প্ররোচিত করে, অন্যদিকে ওহী বা প্রত্যাদেশ (Naql) দাবি করে সত্যের চূড়ান্ত সীমা ইতিমধ্যে নির্ধারিত হয়ে গেছে। এই দুই বিপরীতমুখী অবস্থানের দ্বন্দ্বে মূলধারার ইসলামী স্কলার এবং পূর্ববর্তী ইমামগণ দর্শনের চর্চাকে কেবল নিরুৎসাহিতই করেননি, বরং একে ঈমানের জন্য এক ‘মারাত্মক ব্যাধি’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। প্রশ্ন জাগে, কেন একটি ধর্ম নিজেকে পূর্ণাঙ্গ দাবি করা সত্ত্বেও মানুষের বিচারবুদ্ধি বা যুক্তিশাস্ত্রের চর্চাকে ‘হারাম’ বা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে? কেন প্রাচীন গ্রিক বা পারসিক দর্শন মুসলিম সমাজে প্রবেশের পর থেকে রক্ষণশীল আলেম সমাজ একে ‘যিনদিক’ বা ধর্মত্যাগের পথ হিসেবে সাব্যস্ত করেছিলেন? এই প্রবন্ধে আমরা আধুনিক এবং শাস্ত্রীয় ইসলামী উৎসগুলোর আলোকে দর্শন বনাম বিশ্বাসের এই চিরন্তন সংঘাতের ময়নাতদন্ত করব।


দর্শনের দর্পণঃ অন্ধবিশ্বাসের ব্যবচ্ছেদ ও সংশয়বাদের শক্তি

দর্শন কোনো নির্দিষ্ট উত্তরের নিরেট সমষ্টি নয়, বরং এটি নিরন্তর প্রশ্ন করার একটি পদ্ধতি যা মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক জড়তাকে ভাঙতে সাহায্য করে। যখন কোনো বিশ্বাসকে ‘পবিত্র’ বা ‘প্রশ্নাতীত’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়, দর্শন সেখানেই সংশয়বাদের (Skepticism) আলো ফেলে তার যৌক্তিক ভিত্তি পরীক্ষা করে [1]। অন্ধবিশ্বাসের প্রধান হাতিয়ার হলো আবেগ এবং উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত একপাক্ষিক দাবী, যেখানে প্রমাণের চেয়ে আনুগত্যই মুখ্য।

অন্যদিকে, দর্শনের মূল ধর্ম হলো ‘এপিস্টেমিক হিউমিলিটি’ বা জ্ঞানতাত্ত্বিক বিনয়, যা দাবি করে যে জগতের কোনো তথ্যই লজিক্যাল স্ক্রুটিনি বা বিচার-বিশ্লেষণের ঊর্ধ্বে নয় [2]। সংশয়বাদ মানুষকে শেখায় যে, কোনো দাবির বিশালত্ব যত বেশি হবে, তার স্বপক্ষে প্রমাণের ভারও ততটাই জোরালো হতে হবে—যা মূলত অন্ধবিশ্বাসের মূলে কুঠারাঘাত করে [3]। এই বিচারমূলক দৃষ্টিভঙ্গি যখন অলৌকিক বা অতিপ্রাকৃত দাবির ওপর প্রয়োগ করা হয়, তখন বিশ্বাসের সেই কাঠামোগুলো ভেঙে পড়ে যা কেবল প্রমাণের অভাব এবং যৌক্তিক ত্রুটির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। দর্শনের এই আলোকায়ন বা ‘এনলাইটেনমেন্ট’ মানুষকে তার নিজের বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্ব থেকে মুক্ত করে এবং অন্ধ আনুগত্যের বদলে ‘সেপারে আউদে’ (Sapere Aude) বা ‘নিজের বুদ্ধি ব্যবহারের সাহস’ জোগায় [4]। মূলত দর্শনের এই ব্যবচ্ছেদ করার ক্ষমতাই রক্ষণশীল শক্তিগুলোর ভয়ের কারণ, যা মানুষকে শৃঙ্খলবদ্ধ চিন্তা থেকে বের করে এক মুক্ত পৃথিবীর পথ দেখায়।


বিশুদ্ধতাবাদী আলেমদের বক্তব্য

ইসলামী ধর্মতত্ত্বে দর্শনের চর্চাকে একটি ‘বিদেশি আগ্রাসন’ বা বিশ্বাসের জন্য হুমকিস্বরূপ হিসেবে দেখার প্রবণতা ঐতিহাসিক এবং পদ্ধতিগত। বিশুদ্ধতাবাদী রক্ষণশীল আলেমগণ মনে করেন, যুক্তিবিদ্যা বা দর্শনের চর্চা মূলত ঈমানি চেতনার পরিপন্থী, কারণ এটি মানুষকে প্রশ্নহীন আনুগত্যের পরিবর্তে কৌতূহলী, সংশয়বাদী ও বিশ্লেষণপ্রবণ করে তোলে। বাংলাদেশের সমসাময়িক আলেম ড. আবু বকর মুহাম্মদ যাকারিয়ার মতে, সাধারণ মুসলমানদের জন্য যুক্তিবিদ্যা বা দর্শনের গভীরে প্রবেশ করা বিপজ্জনক, কারণ এটি মানুষকে বিভ্রান্তির পথে নিয়ে যেতে পারে এবং মূল ওহীর সরল পথ থেকে বিচ্যুত করে।

আসুন ড. আবু বকর মুহাম্মদ যাকারিয়ার আরও একটি বক্তব্যটি শুনি,


এই দৃষ্টিভঙ্গি কেবল স্থানীয় নয়, বরং আন্তর্জাতিকভাবেও স্বীকৃত। বিখ্যাত ইসলামিক স্কলার আসিম আল হাকিম (Assim al Hakeem) অত্যন্ত কঠোর ভাষায় দর্শন এবং সঙ্গীত বা থিয়েটারের মতো শিল্পমাধ্যমকেও ‘হারাম’ বা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন, কারণ তাঁর মতে এগুলো সরাসরি ইসলামী আকিদার সাথে সাংঘর্ষিক এবং মানুষের মনে সন্দেহের বীজ বপন করে। আসুন Assim al hakeem এর দুইটি বক্তব্য শুনে নিই,



একইভাবে শায়েখ মুজাফফর বিন মহসিনও যুক্তি ও দর্শনের চর্চাকে বর্জন করার ওপর জোর দেন, কারণ তাঁদের মতে যা ওহীর মাধ্যমে পাওয়া যায়নি, তা কেবল মানুষের মস্তিষ্কজাত কল্পনা ছাড়া আর কিছুই নয়। এই আলেমদের অবস্থান বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, ধর্মীয় ডগমা বা প্রতিষ্ঠিত বিশ্বাসের কাঠামোকে সুরক্ষিত রাখতেই তারা মানুষের বিচারবুদ্ধি বা ‘লজিক’ প্রয়োগকে একটি ভীতিকর বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করেন।


বিশ্বাসের প্রাচীর: শারহুল আক্বীদা আত-ত্বহাবীয়া

ইসলামী আকিদার ইতিহাসে দর্শনের প্রতি রক্ষণশীল সমাজের ভীতি ও বিদ্বেষের এক প্রামাণিক দলিল হলো ‘শারহুল আক্বীদা আত-ত্বহাবীয়া’। ইমাম ইবনে আবীল ইয আল-হানাফী এই গ্রন্থে সালাফ বা পূর্ববর্তী আলেমদের উদ্ধৃতি দিয়ে দেখিয়েছেন যে, যুক্তিবিদ্যা বা ইলমুল কালামের চর্চাকে তারা কেবল অপছন্দই করতেন না, বরং একে সরাসরি ‘হারাম’ বা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। এই গ্রন্থে ইমাম গাজ্জালীর বরাতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইমাম শাফেঈ, আহমাদ বিন হাম্বাল এবং সুফিয়ান সাওরীর মতো প্রথিতযশা আলেমদের ঐকমত্য অনুযায়ী, শির্ক বাদে অন্য যেকোনো পাপ নিয়ে আল্লাহর সামনে হাজির হওয়া দর্শন বা কালাম শাস্ত্র নিয়ে হাজির হওয়ার চেয়ে উত্তম [5]। এই কঠোর অবস্থানের মূল কারণ হলো, দর্শন মানুষকে যেকোনো বিষয়ের গভীরে গিয়ে প্রশ্ন করতে শেখায়, যা ধর্মের প্রথাগত বা সরল কাঠামোর জন্য হুমকিস্বরূপ হতে পারে। এই রক্ষণশীল ধারার মতে, দ্বীনের ব্যাপারে ‘অধিক ঘাটাঘাটি’ বা সূক্ষ্ম যৌক্তিক বিচার মূলত ধ্বংসের পথ, যাকে তারা ‘মুতানাত্তিঊন’ বা সীমা লঙ্ঘনকারী হিসেবে অভিহিত করেন [6]। তাত্ত্বিকভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ধর্মতাত্ত্বিকরা ভয় পান যে, মানুষের মস্তিষ্ক যদি একবার মুক্ত যুক্তির স্বাদ পেয়ে যায়, তবে ওহীর প্রথাগত ব্যাখ্যাগুলো আর অটুট থাকবে না। ফলে তারা ‘যুক্তি’ বা ‘আকল’কে কেবল ওহীর আজ্ঞাবহ হিসেবেই দেখতে চান—যেখানে যুক্তি স্বাধীনভাবে সত্য অনুসন্ধান করতে পারবে না, বরং ওহীকে সমর্থন করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হবে। দর্শনের প্রতি এই শাস্ত্রীয় নিষেধাজ্ঞা মূলত মানুষের স্বাধীন চিন্তার ওপর এক ধরণের ‘বৌদ্ধিক সেন্সরশিপ’, যা বিশ্বাসকে সুরক্ষিত রাখতে যুক্তিকে নির্বাসনে পাঠাতে চায়। [7]

ইমাম গাজ্জালী রহিমাহুল্লাহ তার অন্যতম মূল্যবান কিতাব … -এ বলেন, প্রশ্ন হলো মানতেক ও তর্কশাস্ত্র কি জ্যোতিষ শাস্ত্রের মত নিন্দনীয়? না কি এটি মুবাহ?
এর জবাবে আমি বলবো, মানুষেরা এ বিষয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে চরম বাড়াবাড়ি ও সীমা লংঘন করেছে। কেউ কেউ বলেছেন, ইলমুল কালাম ও তর্কশাস্ত্র সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা বিদআত ও হারাম। শির্ক ছাড়া অন্যান্য সকল প্রকার পাপাচার নিয়ে আল্লাহর কাছে হাযির হওয়া ইলমে কালাম নিয়ে তার নিকট হাযির হওয়ার চেয়ে উত্তম। আবার কেউ কেউ বলেছেন, মানতেক, ইলমে কালাম ও তর্ক শাস্ত্র সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা ফরয। কেউ বলেছেন, ফরযে কেফায়া আবার কেউ বলেছেন, ফরযে আইন। শুধু তাই নয়; তারা আরো বলেছেন, এটি সর্বোত্তম আমল এবং সর্বোচ্চ আনুগত্য। এর মাধ্যত্রে তাওহীদের জ্ঞান পুর্ণরূপে অর্জিত হয় এবং এটিই আল্লাহর দীনের পথে সংগ্রামের অন্তর্ভূক্ত। ইমাম গাজ্জালী রহিমাহুল্লাহ আরো বলেন, কেউ কেউ বলেছেন, ইলমে মানতেক ও তর্কশাস্ত্র সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা সম্পূর্ণ নিষেধ। এটিই ইমাম শাফেঈ, আহমাদ বিন হাম্বাল, সুফিয়ান সাওরী এবং সালাফদের মুহাদ্দিছদের মত। তাদের মতামতকে ইমাম গাজ্জালী স্বীয় কিতাবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, সালাফদের সকল মুহাদ্দিছের ঐকমত্যে এটি হারাম। তাদের থেকে এ বিষয়ে যত উক্তি এসেছে তা উপরোক্ত কথার মধ্যেই সীমিত নয়।
আলেমগণ বলেছেন, ছাহাবীগণ ইলমে কালাম, মানতেক ও তর্কশাস্ত্র সম্পর্কে চুপ থাকার কারণ হলো, তারা তাওহীদের হাকীকত সম্পর্কে ভালো করেই জানতেন এবং অন্যদের তুলনায় ইলমে কালামের পরিভাষা ও শব্দ চয়ন সম্পর্কে অধিকতর জ্ঞানী ছিলেন। এ জন্যই তাদের থেকে দীনের ক্ষেত্রে কোনো বিদআত ও ক্ষতিকর জিনিস বের হয়নি। নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, هَلَكَ الْمُتَنَطِعُونَ قَالَهَا ثَلَاثًا
যারা দীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করে, তারা ধ্বংস হোক। কথাটি তিনি তিনবার বলেছেন।১৯২ অর্থাৎ দীনের বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে জানার সময় বেশী বেশী ঘাটাঘাটি করা ও গভীরে প্রবেশ করা ঠিক নয়। ইলমে কালাম ও তর্কশাস্ত্র যদি দীনের অন্তর্ভুক্ত হতো, তাহলে রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ ব্যাপারে সর্বাগ্রে আদেশ দিতেন এবং কালাম শাস্ত্রবিদদের প্রশংসা করতেন। অতঃপর ইমাম গাজ্জালী রহিমাহুল্লাহ আরো অনেক দলীল-
—————-
হাজারের নেছাবসমূহ হতে একটি নেছাব তাহার মার জন্য বখশাইয়া দিলাম। আমি আমার অন্তরে তা গোপন রাখছিলাম। কিন্তু ঐ যুবক তৎক্ষনাৎ বলতে লাগল চাচা! আমার মা দোযখের আগুন হতে রক্ষা পেয়েছে। কুরতুবী (রহি) বলেন: এ ঘটনা হতে আমার দু’টি ফায়দা হল। এক. সত্তর হাজার বার কালেমা তাইয়্যেবা পড়ার বরকত সম্পর্কে যাহা আমি শুনেছি তার অভিজ্ঞতা। দুই যুবকটির সত্যতার (তার কাশফ হওয়ার) একীন হইয়া গেল । দেখুন: ফাযায়েলে আমাল, ১ম খণ্ড, ১৩৫ পৃষ্ঠা, প্রথম প্রকাশ, অক্টোবর-২০০১ ইং। দারুল কিতাব, ৫০ বাংলা বাজার ঢাকা-১১০০ থেকে প্রকাশিত)
১৯২. ছহীহ মুসলিম ২৬৭০, মুসনাদে ইবনে আবী শাইবা।

যুক্তিবিদ্যা

আকলের শেকলঃ আল-ফিকহুল আকবর

ইসলামী আকিদার অন্যতম প্রাচীন ও নির্ভরযোগ্য স্তম্ভ ‘আল-ফিকহুল আকবর’ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মুক্তচিন্তা এবং যুক্তিশাস্ত্রের প্রতি তৎকালীন ধর্মতাত্ত্বিকদের চরম অনীহা ও আতঙ্ক। এই গ্রন্থে বলা হয়েছে, ইমাম আবু হানীফা এবং তাঁর অনুসারীগণ দর্শনের এই বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চাকে কেবল বর্জনই করেননি, বরং একে হৃদয়ের কঠোরতা এবং পথভ্রষ্টতার মূল কারণ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। আবু হানীফার মতে, যারা দর্শনের মাধ্যমে সত্য খুঁজতে যায়, তাদের প্রকৃতি নেককার মানুষের মতো হয় না এবং তারা কুরআন-সুন্নাহর বিরোধিতা করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করে না। এমনকি তাঁর উত্তরসূরি ইমাম আবু ইউসুফ চরম হুশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন যে, যে ব্যক্তি দর্শনের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন করতে চাইবে, সে ‘যিনদীক’ বা ধর্মদ্রোহীতে পরিণত হবে।

এই পদ্ধতিগত বিরোধের মূলে রয়েছে ওহী (Revelation) এবং আকল (Reason)-এর চিরন্তন দ্বন্দ্ব। দর্শনের মূল ভিত্তি হলো যুক্তি বা আকল, যা যেকোনো তথ্যকে প্রমাণের নিরিখে বিচার করে; পক্ষান্তরে ধর্মতাত্ত্বিকদের দাবি হলো, বিশ্বাসীয় বিষয়ে বুদ্ধির কোনো স্থান নেই, বরং সেখানে কেবল ওহীর অন্ধ অনুসরণই কাম্য। ইমাম শাফিঈর মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বরা দর্শনের চর্চাকারীদের জন্য এমন বর্বরোচিত বিধান দিয়েছিলেন যে, তাদেরকে খেজুরের ডাল ও জুতা দিয়ে পিটিয়ে মহল্লায় মহল্লায় ঘুরিয়ে অপমান করা উচিত। এই ধরণের কঠোর মনোভাব স্পষ্ট করে দেয় যে, ধর্মতাত্ত্বিক কাঠামোটি আসলে কতটা নড়বড়ে ছিল—যেখানে স্বাধীন যুক্তির সামান্য স্পর্শও পুরো বিশ্বাসব্যবস্থাকে ধসিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। তারা জানতেন যে, মানুষ যদি একবার ওহীকে যুক্তির ছাঁচে বিচার করতে শুরু করে, তবে অলৌকিকতার সেই অস্পষ্ট জগতটি তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে। তাই তারা যুক্তিকে ‘বিদআত’ হিসেবে আখ্যায়িত করে মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের পথকে রুদ্ধ করে দিয়েছিলেন। [8]

আকীদা-শাস্ত্রের আরেকটি প্রসিদ্ধ নাম ‘ইলমুল কালাম’। ইলমুল কালাম বলতে মূলত ধর্মবিশ্বাসের বিষয়ে দর্শন ও যুক্তিবিদ্যা ভিত্তিক আলোচনা বুঝানো হয়। ‘আল-কালাম’ (الكلام) শব্দের অর্থ কথা, বাক্য, বক্তব্য, বিতর্ক (word, speech, conversation, debate) ইত্যাদি। কেউ কেউ মনে করেন যে কালামুল্লাহ বা আল্লাহর কালাম (كلام الله) থেকে ইলমুল কালাম পরিভাষাটির উদ্ভব। কারণ ইলমুল কালামে আল্লাহর কালাম বিষয়ে আলোচনা হয়। তবে জোরালো মত হল, গ্রীক ‘লগস’ (logos) শব্দ থেকে ‘কালাম’ শব্দটি গৃহীত হয়েছে। লগস (logos) শব্দটির অর্থ বাক্য, যুক্তিবৃত্তি, বিচারবুদ্ধি, পরিকল্পনা (word, reason, plan) ইত্যাদি। লগস শব্দ থেকে লজিক (logic) শব্দটির উৎপত্তি, যার অর্থ তর্কশাস্ত্র বা যুক্তিবিদ্যা।
সম্ভবত মূল অর্থের দিকে লক্ষ্য রেখে হিজরী দ্বিতীয় শতকের আরব পন্ডিতগণ ‘লজিক’ শব্দের আরবী প্রতিশব্দ হিসেবে ‘ইলমুল কালাম’ (কথা-শাস্ত্র) পরিভাষা ব্যবহার করেন। পরবর্তীকালে এ অর্থে ‘ইলমুল মানতিক’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে, যার আভিধানিক অর্থও ‘কথা-শাস্ত্র’। সর্বাবস্থায় ইলমুল কালাম বলতে দর্শন বা যুক্তিবিদ্যা ভিত্তিক ধর্মতাত্ত্বিক আলোচনা বা গবেষণা (speculative theology, scholastic theology) বুঝানো হয়।
প্রাচীন যুগ থেকে দার্শনিকগণ মানবীয় যুক্তি, বুদ্ধি, জ্ঞান বা দর্শনের মাধ্যমে মানবীয় ইন্দ্রিয়ের অজ্ঞাত বিষয় সমূহ নিয়ে গবেষণা করেছেন। স্রষ্টা, সৃষ্টি, সৃষ্টির প্রকৃতি, স্রষ্টার প্রকৃতি, কর্ম, বিশেষণ ইত্যাদি বিষয়ে যুক্তি তর্ক দিয়ে তাঁরা অনেক কথা বলেছেন। এ সকল বুদ্ধিবৃত্তিক যুক্তিতর্ক মানুষকে অত্যন্ত আকর্ষিত করলেও তা কোনো সত্যে পৌঁছাতে পারে না। কারণ মানুষ যুক্তি বা জ্ঞান দিয়ে স্রষ্টার অস্তিত্ব অনুভব করতে বা নিশ্চিত হতে পারে, কিন্তু স্রষ্টার প্রকৃতি, কর্ম, বিশেষণ, স্রষ্টার সাথে সৃষ্টির সম্পর্ক ইত্যাদি বিষয়ে চূড়ান্ত সত্যে পৌঁছাতে পারে না। এজন্য কখনোই দার্শনিকগণ এ সকল বিষয়ে একমত হতে পারেন নি। তাদের গবেষণা ও বিতর্ক অন্ধের হাতি দেখার মতই হয়েছে।
দ্বিতীয় হিজরী শতক থেকে মুসলিম উম্মাহর মধ্যে গ্রীক, ভারতীয় ও পারসিক দর্শন প্রচার লাভ করে। মূলধারার তাবিয়ীগণ ও তাঁদের অনুসারীগণ বিশ্বাস বা গাইবী বিষয়ে দার্শনিক বিতর্ক কঠিনভাবে অপছন্দ করতেন। কারণ তাঁরা বিশ্বাস করতেন যে, গাইবী বিষয়ে ওহীর উপর নির্ভর করা এবং ওহীর নির্দেশনাকে মেনে নেওয়াই মুমিনের মুক্তির পথ।
ইমাম আবূ হানীফা (রাহ) ও তাঁর সহচরগণ ‘ইলমুল কালামৎ শিক্ষা করতে ঘোর আপত্তি করেছেন। ইলমুল কালামের প্রসার ঘটে মূলত দ্বিতীয় হিজরী শতকের প্রথমাংশে, বিশেষত ১৩২ হিজরী (৭৫০ খৃ) সালে আববাসী খিলাফতের প্রতিষ্ঠার পর। ইমাম আবূ হানীফা শিক্ষা জীবনে বা তাঁর জীবনের প্রথম ৩০ বৎসরে (৮০-১১০ হি) দর্শনভিত্তিক ইলমুল কালাম সমাজে তেমন পরিচয় লাভ করে নি। তবে দর্শনভিত্তিক বিভ্রান্ত মতবাদগুলো তখন কুফা, বসরা ইত্যাদি এলাকায় প্রচার হতে শুরু করেছে। গ্রীক-পারসিক দর্শন নির্ভর কাদারিয়া, জাবারিয়া, জাহমিয়া ইত্যাদি মতবাদ দ্বিতীয় হিজরী শতকের শুরু থেকেই জন্ম লাভ করে। এ সকল মতবাদ খন্ডন করতে মূলধারার কোনো কোনো আলিম দর্শন ও যুক্তিবিদ্যা নির্ভর যুক্তি-তর্কের আশ্রয় নিতে থাকেন।
কোনো কোনো জীবনীকার উল্লেখ করেছেন যে, ইমাম আবূ হানীফা (রাহ) প্রথম জীবনে এরূপ দর্শন ও যুক্তিবিদ্যা নির্ভর বিতর্ক বা ইলমুল কালামের চর্চা করেন। পরবর্তীতে তিনি তা বর্জন করেন এবং তা বর্জন করতে নির্দেশ প্রদান করেন। ইলমুল কালামের প্রাথমিক অবস্থাতেই তিনি এর ক্ষতি ও ভয়াবহতা অনুধাবন করতে সক্ষম হন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন:
كنت أعطيت جدلا فى الكلام … فلما مضى مدة عمري تفكرت وقلت السلف كانوا أعلم بالحقائق ولم ينتصبوا مجادلين بل أمسكوا عنه وخاضوا فى علم الشرائع ورغبوا فيه وتعلموا وعلموا وتناظروا عليه فتركت الكلام واشتغلت بالفقه ورأيت المشتغلين بالكلام ليس سيماهم سيماء الصالحين قاسية قلوبهم غليظة أفئدتهم لا يبالون بمخالفة الكتاب والسنة ولو كان خيرا لاشتغل به السلف الصالحون
‘‘কালাম বা দর্শনভিত্তিক বিতর্কে আমার পারদর্শিতা ছিল … আমার জীবনের কিছু সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর আমি চিন্তা করলাম যে, পূর্ববর্তীগণ (সাহাবীগণ ও প্রথম যুগের তাবিয়ীগণ) দীন-ঈমানের প্রকৃত সত্য বিষয়ে অধিক অবগত ছিলেন। তাঁরা এ সকল বিষয়ে বিতর্কে লিপ্ত হন নি। বরং ঈমান-আকীদা বিষয়ক বিতর্ক তাঁরা পরিহার করতেন। তাঁরা শরীয়ত বা আহকাম বিষয়ে আলোচনা ও অধ্যয়নে লিপ্ত হতেন, এগুলোতে উৎসাহ দিতেন, শিক্ষা করতেন, শিক্ষা দিতেন এবং এ বিষয়ে বিতর্ক- আলোচনা করতেন। এজন্য আমি কালাম পরিত্যাগ করে ফিকহ চর্চায় মনোনিবেশ করি। আমি দেখলাম যে, কালাম বা দর্শনভিত্তিক আকীদা চর্চায় লিপ্ত মানুষগুলোর প্রকৃতি ও প্রকাশ নেককার মানুষদের মত নয়। তাদের হৃদয়গুলো কঠিন, মন ও প্রকৃতি কর্কশ এবং তারা কুরআন ও সুন্নাতের বিরোধিতা করার বিষয়ে বেপরোয়া। কালাম চর্চা যদি কল্যাণকর হতো তাহলে অবশ্যই পূর্ববর্তীগণ (সাহাবী-তাবিয়ীগণ) এর চর্চার করতেন।’’[1]
ইমাম যাহাবী উল্লেখ করেছেন যে, ইমাম আবূ হানীফার শিক্ষা জীবনে ‘ইলমুল কালাম’-এর অস্তিত্বই ছিল না।[2] অর্থাৎ এ সময়ে দর্শন ভিত্তিক আকীদা চর্চা কোনো পৃথক ‘ইলম’ বা জ্ঞানে পরিণত হয় নি। কারণ ইমাম আবূ হানীফা ১০০ হিজরীর আগেই ফিকহ শিক্ষায় মনোনিবেশ করেন। ইমাম যাহাবী বলেন:
فأفقه أهل الكوفة علي وابن مسعود، وأفقه أصحابهما علقمة، وأفقه أصحابه إبراهيم، وأفقه أصحاب إبراهيم حماد، وأفقه أصحاب حماد أبو حنيفة،
‘‘কূফার সর্বশ্রেষ্ঠ ফকীহ আলী (রা) এবং ইবন মাসঊদ (রা)। তাঁদের ছাত্রদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ফকীহ আলকামা। তাঁর ছাত্রদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ফকীহ ইবরাহীম নাখয়ী (৯৬ হি)। তাঁর ছাত্রদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ফকীহ হাম্মাদ ইবন আবী সুলাইমান (১২০ হি)। তাঁর ছাত্রদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ফকীহ আবূ হানীফা।’’[3]
উল্লেখ্য যে, ১২০ হিজরীতে ইমাম হাম্মাদের ওফাতের পর ইমাম আবূ হানীফা তাঁর স্থলাভিষিক্ত বলে গণ্য হন। এতে প্রমাণ হয় যে, এ সময়ের অনেক পূর্বেই ইমাম আবূ হানীফা কুফার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফকীহ বলে গণ্য হয়েছেন। এতে সুস্পষ্ট যে, ১০০ হিজরীর পূর্ব থেকেই তিনি ফিকহ শিক্ষা ও চর্চায় আত্মনিয়োগ করেছিলেন। আর ১০০ হিজরীর পূর্বে মুসলিম বিশ্বে দর্শনভিত্তিক আকীদা চর্চা কোনো ‘ইলম’ বা শাস্ত্র হিসেবে প্রকাশ ও প্রসার লাভ করে নি। তাঁর পরিণত বয়সে (১১০-১৫০ হি) সমাজে ইলমুল কালাম চর্চা প্রসার লাভ করে এবং তিনি ইলমুল কালামের চর্চা থেকে তাঁর অনুসারীদেরকে নিষেধ করেন। এ প্রসঙ্গে তাঁর পুত্র হাম্মাদ বলেন:
أخذ أبو حنيفة رضي الله عنه بيدي يوم الجمعة، فأدخلني المسجد، …. مَرَّ بقوم يتنازعون في الدين، فقال: يا بنيَّ! إذا مهر في هذا الأمر، قيل: زنديق ، وأُخرِج من حَدِّ الإسلام، فيصير بحال لا ينتفع به. …. قال حماد بن أبي حنيفة: وكنتُ معجَبا بالمنازعة، فتركتُ المنازعةَ بعد قول الشيخ
এক শুক্রবারে আবূ হানীফা (রাহিমাহুল্লাহ) আমার হাত ধরে মসজিদে প্রবেশ করেন। …. তিনি দীন (আকীদা) বিষয়ে বিতর্কে (কালাম চর্চায়) লিপ্ত একদল মানুষদের নিকট দিয়ে গমন করেন এবং আমাকে বলেন: বেটা, যে ব্যক্তি এ শাস্ত্রে পারদর্শিতা অর্জন করবে সে যিনদ্দীক (ধর্মত্যাগী ও ধর্ম অবমাননাকারী) বলে আখ্যায়িত হবে এবং ইসলামের পরিমন্ডল থেকে বহির্ভূত বলে গণ্য হবে। এভাবে সে এমন অবস্থায় পৌঁছাবে যে, তার দ্বারা কোনো কল্যাণ সাধিত হবে না। …. হাম্মাদ ইবন আবী হানীফা বলেন: আমি এরূপ বিতর্কের বিষয়ে খুবই আগ্রহী ছিলাম। শাইখ (রা)-এর এ কথার পরে আমি এ জাতীয় বিতর্ক পরিত্যাগ করি।’’[4]
ইমাম আবূ হানীফার ছাত্র নূহ ইবন আবী মরিয়ম বলেন:
قلت لأبي حنيفة رحمه الله ما تقول فيما أحدث الناس من كلام في الأعراض والأجسام فقال مقالات الفلاسفة عليك بالأثر وطريقة السلف وإياك وكل محدثة فإنها بدعة.
‘‘আমি আবূ হানীফা রাহিমাহুল্লাহকে বললাম: মানুষেরা ইলমুল কালামে (স্রষ্টার অস্তিত্ব, অনাদিত্ব ও বিশেষণ প্রমাণে) ‘আরায’ (অমৌল-পরনির্ভর: nonessential), ‘জিসম’ (দেহ: body) ইত্যাদি বিষয়ক আলোচনা উদ্ভাবন করেছে। এগুলোর বিষয়ে আপনার মত কী? তিনি বলেন: এগুলো দার্শনিকদের কথাবার্তা। তোমার দায়িত্ব হাদীসের উপর নির্ভর করা এবং পূর্ববতীদের (সাহাবী-তাবিয়ীদের) তরীকা অনুসরণ করা। সাবধান! সকল নব-উদ্ভাবিত বিষয় বর্জন করবে; কারণ তা বিদআত।’’[5]
ইমাম আযমের ছাত্রগণও এভাবে ইলমুল কালাম চর্চা নিষেধ করতে থাকেন। ইমাম আবূ ইউসূফ রাহ. (১৮৯ হি) তাঁর ছাত্র ইলমুল কালামের বিশেষজ্ঞ ও মু’তাযিলী পণ্ডিত বিশ্র আল-মারীসী (২১৮ হি)- কে বলেন:
اَلْعِلْمُ بِالْكَلاَمِ هُوَ الْجَهْلُ وَالْجَهْلُ بِالْكَلاَمِ هُوَ الْعِلْمُ، وَإِذَا صَارَ الرَّجُلُ رَأْساً فِيْ الْكَلاَمِ قِيْلَ: زِنْدِيْقٌ.
‘‘কালামের জ্ঞানই হলো প্রকৃত অজ্ঞতা আর কালাম সম্পর্কে অজ্ঞতাই হলো প্রকৃত জ্ঞান। ইলমুল কালামে সুখ্যাতির অর্থ তাকে যীনদীক বা অবিশ্বাসী-ধর্মত্যাগী বলা হবে।’’[6]
ইমাম আবূ ইউসুফ (রাহ) আরো বলেন:
مَنْ طَلَبَ الْعِلْمَ بِالْكَلاَمِ تَزَنْدَقَ
‘‘যে ব্যক্তি ইলমু কালাম শিক্ষা করবে সে যিনদীকে পরিণত হবে।’’[7]
ইমাম শাফিয়ী রাহ. (২০৪ হি) বলেন,
حُكْمِيْ فِيْ أَهْلِ الْكَلاَمِ أَنْ يُضْرَبُوا بِالْجَرِيْدِ وَالنِّعَالِ وَيُطَافُ بِهِمْ فِيْ الْعَشَائِرِ وَالْقَبَائِلِ وَيُقَالُ: هَذَا جَزَاءُ مَنْ تَرَكَ الْكِتَابَ وَالسُّنَّةَ وَأَقْبَلَ عَلَى الْكَلاَمِ.
‘‘যারা ইলমুল কালাম চর্চা করে তার বিষয়ে আমার বিধান এই যে, তাদেরকে খেজুরের ডাল ও জুতা দিয়ে পেটাতে হবে, এভাবে মহল্লায় মহল্লায় ও কবীলাসমূহের মধ্যে ঘুরিয়ে নিয়ে বেড়াতে হবে এবং বলতে হবে: যারা কিতাব ও সুন্নাত ছেড়ে ইলমুল কালামে মনোনিবেশ করে তাদের এ শাস্তি।’’[8]
এভাবে প্রসিদ্ধ চার মুজতাহিদ ইমাম এবং দ্বিতীয়-তৃতীয় হিজরী শতকের সকল প্রসিদ্ধ আলিম, ইমাম, ফকীহ ও মুহাদ্দিস অত্যন্ত কঠোর ভাষায় ইলমুল কালামের নিন্দা করেছেন।[9]
পরবর্তী যুগে ইমাম আবূ হানীফা ও অন্যান্য ইমামের অনুসারী অনেক আলিম আহলুস সুন্নাতের আকীদা ব্যাখ্যার জন্য ইলমুল কালাম চর্চা করেছেন। বিভ্রান্ত ফিরকাসমূহের বিভ্রান্তির উত্তর প্রদানের প্রয়োজনেই তাঁরা ইলমুল কালামের পরিভাষা ও পদ্ধতি গ্রহণ করেছেন বলে তাঁরা উল্লেখ করেছেন। তবে তাঁরা ইলমুল কালামের দার্শনিক ছায়া থেকে বের হতে পারেন নি। তাদের আলোচনায় সর্বদা কুরআন, হাদীস বা ওহীর বক্তব্যর চেয়ে যুক্তি, তর্ক ও দর্শন প্রাধান্য পেয়েছে।[10]
ইলমুল কালামের বিরুদ্ধে ইমাম আযম ও অন্যান্য ইমামের বক্তব্যকে তাঁরা বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তাঁরা দাবি করেছেন যে, ইমামগণ মূলত ইলমুল কালাম ভিত্তিক মুতাযিলী ও অন্যান্য মতবাদের নিন্দা করেছেন, ইলমুল কালম ভিত্তিক আকীদা চর্চার নিন্দা তাঁরা করেন নি। কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখি যে, চার ইমাম ও দ্বিতীয়-তৃতীয় শতকের অন্যান্য ইমাম মূলত ইলমুল কালাম ভিত্তিক আকীদা চর্চার নিন্দা করেছেন। তাঁরা সকলেই আকীদা বিষয় আলোচনা করেছেন এবং অনেকে গ্রন্থ রচনা করেছেন। তবে তাঁরা কুরআন, হাদীস ও সাহাবীগণের বক্তব্যের উপর নির্ভর করে আকীদা ব্যাখ্যা করেছেন। এর বিপরীতে দর্শন ও যুক্তিবিদ্যা নির্ভর আকীদা চর্চা কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। সঠিক আকীদা প্রমাণের জন্যও দর্শন নির্ভর বিতর্ক তাঁরা নিষেধ করেছেন। কারণ সালফ সালিহীনের আকীদা চর্চা ও ইলমুল কালামের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য ওহী ও আকল-এর অবস্থান।
ইমামগণ বা সালফ সালিহীনের আকীদা চর্চা ওহী নির্ভর, বিশেষত হাদীস ও ‘আসার’ বা সাহাবীগণের বক্তব্য নির্ভর। পক্ষান্তরে ইলমুল কালাম ‘আকল’ অর্থাৎ জ্ঞানেন্দ্রিয়, বোধশক্তি বা বুদ্ধিবৃত্তিক যুক্তি ও দর্শন নির্ভর। ইমামগণের বক্তব্য সর্বদা নিম্নরূপ: তোমার বিশ্বাস এরূপ হতে হবে; কারণ কুরআনে, হাদীসে বা সাহাবীগণের বক্তব্যে এরূপ বলা হয়েছে। পক্ষান্তরে ইলমুল কালামের বক্তব্য নিম্নরূপ: তোমাকে এরূপ বিশ্বাস করতে হবে; কারণ জ্ঞান, বিবেক ও যুক্তি এটিই প্রমাণ করে। আমরা ওহী ও আকলের অবস্থান সম্পর্কে ইমামগণের মত আকীদার উৎস বিষয়ক অনুচ্ছেদে বিস্তারিত আলোচনা করব ইনশা আল্লাহ। এখানে সংক্ষেপে নিম্নের বিষয়গুলো লক্ষণীয়:
(ক) আমরা দেখেছি যে, ইমাম আবূ হানীফার ছাত্র নূহ ইবন আবী মরিয়ম যখন তাকে ইলমুল কালামের আরায (অমৌল), জিসম (দেহ) ইত্যাদি সম্পর্কে প্রশ্ন করেন তখন তিনি বলেন: ‘‘এগুলো দার্শনিকদের কথাবার্তা। তোমার দায়িত্ব হাদীসের উপর নির্ভর করা এবং পূর্ববতীদের (সাহাবী-তাবিয়ীদের) তরীকা অনুসরণ করা। সাবধান! সকল নব-উদ্ভাবিত বিষয় বর্জন করবে; কারণ তা বিদআত।’’
ইলমুল কালাম চর্চা করতে গেলে এ সকল পরিভাষার উপর নির্ভর করা ছাড়া কোনো উপাই নেই। মহান আল্লাহর অস্তিত্ব, একত্ব, বিশেষণ ইত্যাদি প্রমাণের জন্য আরায, জিসম, জাওহার ইত্যাদি পরিভাষাগুলোই কালামবিদগণের একমাত্র ভিত্তি। এ থেকে আমরা নিশ্চিত হই যে, ইমামগণ মূলত সাহাবী তাবিয়ীদের পদ্ধতিতে ওহী-নির্ভর আকীদা চর্চায় উৎসাহ দিয়েছেন এবং দার্শনিকদের পরিভাষা এবং দার্শনিক যুক্তিতর্ক নির্ভর ইলমুল কালাম ভিত্তিক আকীদা চর্চা নিষেধ করেছেন।
(খ) ইমামগণ ফিকহ ও কালাম উভয় ক্ষেত্রেই কুরআন, হাদীস ও আসার বা সাহাবী-তাবিয়ীগণের বক্তব্যের উপর সমানভাবে নির্ভর করেছেন। ফিকহের ন্যায় আকীদার ক্ষেত্রেও তাঁরা ‘খাবারুল ওয়াহিদ’ বা একক বর্ণনার সহীহ হাদীসগুলোর উপর নির্ভর করেছেন। আর এজন্যই ইমাম আযম আকীদাকেও ‘ফিকহ’ বলেছেন এবং আল-ফিকহুল আকবার বা আল-ফিকহু ফিদ্দীন বলে আখ্যায়িত করেছেন। পক্ষান্তরে কালামবিদগণ ফিকহ ও আকীদার মধ্যে পার্থক্য করেছেন। তারা দাবি করেছেন যে, ফিকহ বা কর্মের ক্ষেত্রে হাদীস, খাবারুল ওয়াহিদ বা সাহাবী-তাবিয়ীগণের বক্তব্যের উপর নির্ভর করা যায়, কিন্তু বিশ্বাস বা আকীদার ক্ষেত্রে আকলের বিরুদ্ধে কারো বক্তব্য গ্রহণ করা যায় না বা কারো ‘তাকলীদ’ করা যায় না।
(গ) ইমামগণের দৃষ্টিতে ওহী বা কুরআন-হাদীসের বক্তব্য মানুষকে সত্যের নির্দেশনা প্রদানের জন্য। শিক্ষিত-অশিক্ষিত, সাধারণ-অসাধারণ সকল মানুষ যেন বিশ্বাস ও কর্মের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা-বহির্ভূত ও ইন্দ্রিয়-বহির্ভূত বিষয়গুলোতে সহজ দিক নির্দেশনা লাভ ও সত্য অনুসরণ করতে পারে সেজন্যই মহান আল্লাহ নবী-রাসূলগণের মাধ্যমে ওহী ও কিতাব প্রদান করেন। এজন্য দীন ও শরীয়তে বা বিশ্বাস ও কর্মে সকল ক্ষেত্রে ওহীর বক্তব্যকে সর্বদা সরল ও প্রকাশ্য অর্থে গ্রহণ করতে হবে এবং এর রূপকার্থ ও দূরবর্তী ব্যাখ্যা বর্জন করতে হবে। ওহীকে রূপকার্থে ব্যবহার করা বা ওহীর দূরবর্তী ব্যাখ্যা করার অর্থ ওহীকে অকার্যকর করা। এজন্য তাঁরা যেভাবে সালাত, সিয়াম, যাকাত, হজ্জ ইত্যাদি কর্ম বিষয়ক নির্দেশনার রূপক অর্থ গ্রহণ ও ব্যাখ্যা কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন, তেমনি মহান আল্লাহর বিশেষণ, আখিরাত, কিয়ামতের আলামত, কবর, হাশর ও অন্যান্য বিশ্বাসীয় বিষয়েও ওহীর বক্তব্যের রূপক অর্থ গ্রহণ ও ব্যাখ্যা কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। এর বিপরীতে ইলমুল কালামের দৃষ্টিতে ওহীর নির্দেশনা অস্পষ্ট ও এতে রূপকের সম্ভাবনা ব্যাপক। এজন্য বিশ্বাসের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে আকলের উপর নির্ভর করতে হবে। ওহীর কোনো বক্তব্য আকলের ব্যতিক্রম হলে তা রূপক অর্থে ব্যাখ্যা করতে হবে।
(ঘ) ইমামগণের দৃষ্টিতে বিশ্বাস ও কর্মে সকল ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও তাঁর সাহাবীগণই পূর্ণতম আদর্শ। তাঁদের মত হওয়া বা হুবহু তাঁদের অনুসরণ করাই মুমিনের লক্ষ্য। অন্যান্য বিষয়ের ন্যায় আকীদা চর্চারও উদ্দেশ্য আকীদা বিষয়ে সুন্নাতের প্রতিষ্ঠা ও পুনরুজ্জীবন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও সাহাবীগণের আকীদার সাথে মুমিনের আকীদার হুবহু মিল প্রতিষ্ঠাই এখানে উদ্দেশ্য। পক্ষান্তরে ইলমুল কালামের উদ্দেশ্য আকল, বুদ্ধি ও বিবেক খাটিয়ে বিশ্বাস বিষয়ক সত্যে উপনীত হওয়া। কুরআন, সুন্নাহ বা সাহাবীগণের সাথে মিল ও অমিল এখানে গৌণ। মিল হলে ভাল কথা, নইলে কোনোরূপ ব্যাখ্যা করলেই হলো।
(ঙ) ইমামগণের আকীদা চর্চার ক্ষেত্রে মতভেদের সুযোগ খুবই সীমিত। কারণ সকলেই ওহীর উপর নির্ভর করেছেন এবং ওহীর ব্যাখ্যা বর্জন করেছেন। আর ওহীর মধ্যে ভিন্নতার অবকাশ খুবই কম। পক্ষান্তরে ইলমুল কালাম চর্চায় সকলেই জ্ঞান, যুক্তি ও বুদ্ধি-বিবেকের উপর নির্ভর করেছেন এবং ওহীকে নিজ নিজ বুদ্ধি-বিবেক অনুসারে ব্যাখ্যা করেছেন। জ্ঞানবুদ্ধি ও যুক্তির কোনো নির্ধারিত মানদন্ড নেই। কেউ দেবতার জন্য নরবলিকেও আকল-নির্দেশিত বা জ্ঞান ও যুক্তিসঙ্গত বলে প্রমাণের চেষ্টা করছেন। আবার কেউ জীবন ধারণের জন্য মাংস ভক্ষণকে অযৌক্তিক বা বিবেক বিরুদ্ধ বলে দাবি করছেন। এজন্য কালাম ভিত্তিক আকীদা চর্চায় মতভেদ খুবই বেশি।
[1] কুরাশী, তাবাকাতুল হানাফিয়্যাহ, পৃষ্ঠা, ৪৬৮।
[2] যাহাবী, সিয়ারু আ’লামিন নুবালা ৬/৩৯৮।
[3] যাহাবী, সিয়ারু আ’লামিন নুবালা, খন্ড ৫, পৃষ্ঠা ২৩১-২৩৬।
[4] সায়িদ নাইসাপূরী হানাফী, আল-ই’তিকাদ, পৃষ্ঠা ১৭৭।
[5] হারাবী, আব্দুল্লাহ ইবন মুহাম্মাদ আনসারী, যাম্মুল কালাম ওয়া আহলিহী ৫/২০৬-২০৭।
[6] ইবন আবিল ইয্য হানাফী, শারহুল আকীদাহ আত-তাহাবিয়্যাহ, পৃ. ৭৫
[7] ইবন আবিল ইয্য, শারহুল আকীদাহ আত-তাহাবিয়্যাহ, পৃ. ৭৫
[8] ইবন আবিল ইয্য, শারহুল আকীদাহ আত-তাহাবিয়্যাহ, পৃ. ৭৫
[9] গাযালী, ইহইয়াউ উলূমিদ্দীন ১/৩৩, ৫২-৫৩; ইবন আবিল ইয্য, শারহুল আকীদা আত-তাহাবিয়্যাহ, পৃ. ৭২-৭৭, ২০৪-২১০।
[10] গাযালী, ইহইয়াউ উলূমিদ্দীন ১/৩৩, ৫২-৫৩; ইবন আবিল ইয্য, শারহুল আকীদা আত-তাহাবিয়্যাহ, পৃ. ৭২-৭৭, ২০৪-২১০।

যুক্তিবিদ্যা 1
যুক্তিবিদ্যা 3
যুক্তিবিদ্যা 5
যুক্তিবিদ্যা 7
যুক্তিবিদ্যা 9
যুক্তিবিদ্যা 11
যুক্তিবিদ্যা 13

ইসলাম ও চিন্তার স্বাধীনতা

এবারে আসুন ইসলামে চিন্তার স্বাধীনতা বিষয়ে শায়খ মুহাম্মদ বিন সালেদ আল উসাইমীনের একটি প্রখ্যাত ফতোয়া দেখে নিই [9]

“চিন্তার স্বাধীনতা” কথাটি কতটুকু সঠিক?
প্রশ্নঃ (১১০) “চিন্তার স্বাধীনতা” সম্পর্কে আমরা শুনে থাকি এবং পত্রিকায় পড়ে থাকি। মূলতঃ এটি আকীদা গ্রহণের স্বাধীনতার দিকে আহবান মাত্র। এ সম্পর্কে আপনার মতামত কি?
উত্তরঃ এ ব্যাপারে আমাদের কথা হল, যে ব্যক্তি আকীদার স্বাধীনতার দাবী করে এবং যে কোন দ্বীনে বিশ্বাসের অধিকার রাখে বলে মনে করে, সে কাফের। কারণ যে ব্যক্তি মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর দ্বীন ব্যতীত অন্য দ্বীন গ্রহণ করা বৈধ মনে করে, সে কাফেরে পরিণত হবে। তাকে তাওবা করতে বলা হবে। তাওবা না করলে তাকে হত্যা করা ওয়াজিব।
দ্বীনের বিষয় চিন্তা প্রসূত বিষয় বা কোন মতবাদ নয়। এটা আল্লাহর অহী, যা আল্লাহ তাঁর নবীদের উপর নাযিল করেছেন যেন মানুষ তার অনুসরণ করতে পারে। ইসলাম একটি চিন্তাধারা, খৃষ্ট ধর্ম একটি চিন্তা ধারা এবং ইহুদীবাদ একটি চিন্তা ধারা এভাবে ব্যাখ্যা করার অর্থ এই যে, আসমানী শরীয়তসমূহ নিছক মানবীয় চিন্তা প্রসূত বিষয়। আসমানী দ্বীনসমূহ আল্লাহর পক্ষ হতে অহী স্বরূপ আগমণ করেছে। এর মাধ্যমে মানুষ আল্লাহর এবাদত করবে। সুতরাং এর ব্যাপারে চিন্তাধারা কথাটি ব্যবহার করা জায়েয নেই।
মোট কথা, যে ব্যক্তি এই বিশ্বাস করবে যে, সে নিজের খেয়াল-খুশী মত যে কোন দ্বীনে বিশ্বাস করতে পারে, তাহলে সে কাফের হয়ে যাবে। আল্লাহ বলেন,
وَمَنْ يَبْتَغِ غَيْرَ الْإِسْلَامِ دِينًا فَلَنْ يُقْبَلَ مِنْهُ)
“যে ব্যক্তি ইসলাম ছাড়া অন্য দ্বীন গ্রহণ করবে, তার কাছ থেকে তা গ্রহণ করা হবে না।” (সূরা আল-ইমরানঃ ৮৫) আল্লাহ বলেন,
إِنَّ الدِّينَ عِنْدَ اللَّهِ الْإِسْلَامُ)
“ইসলাম আল্লাহর কাছে একমাত্র মনোনীত ধর্ম।” (সূরা আল-ইমরানঃ ১৯) সুতরাং ইসলাম ছাড়া অন্য কোন দ্বীন গ্রহণ করা জায়েয নেই। যে ব্যক্তি তা করবে আলেমগণ তাকে সুস্পষ্ট কাফের হিসাবে ফতোয়া দিয়েছেন।

যুক্তিবিদ্যা 15

প্রাতিষ্ঠানিক সিলমোহরঃ দর্শন ও যুক্তিবিরোধী প্রখ্যাত ফতোয়া

দর্শনের প্রতি এই অনীহা কেবল হাতেগোনা কয়েকজন আলেমের ব্যক্তিগত অভিমত নয়, বরং এটি সমসাময়িক প্রভাবশালী ইসলামী ফতোয়া বোর্ডগুলোর একটি সুসংগঠিত প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থান। বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় এবং নির্ভরযোগ্য ইসলামী ফতোয়া পোর্টাল IslamQA.info-তে দর্শনের চর্চাকে একটি ‘মারাত্মক বিষ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাদের ফতোয়া অনুযায়ী, দর্শন বা ফিলোসফি হলো মানুষের বিভ্রান্তিকর কল্পনার সমষ্টি যা ওহীর নূরকে নিভিয়ে দিতে চায়। সেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে: [10]

Question 88184
What is the ruling on studying philosophy? Please note that studying it is compulsory for us in Algeria.
Answer
Praise be to Allah, and blessings and peace be upon the Messenger of Allah:
Firstly:
It should be understood what philosophy is and what its principles are, before stating what the ruling on studying it is, because passing a ruling on something is usually based on the way it is viewed.
Al-Ghazaali said in al-Ihya’ (1/22): Philosophy is not one branch of knowledge, it is actually four:
1 – Geometry and mathematics: these are permissible as stated above, and there is no reason why they should not be studied unless there is the fear that one may overstep the mark and indulge in forbidden branches of knowledge, because most of those who study them overstep the mark and go on to innovations, thus the weak should be protected from them.
2 – Logic, which deals with the way in which evidence is to be used, the conditions of evidence being valid, the definition of what constitutes evidence and guidelines on the use of evidence. These come under the heading of ‘ilm al-kalaam.
3 – Theology, which is discussion of the essence and attributes of Allaah, which also comes under the heading of ‘ilm al-kalaam. The philosophers did not have any other kind of knowledge that was unique to them, rather they had some views and ideas which were unique to them, some of which constitute kufr and some bid’ah (innovation).
4 – Natural sciences, some of which go against sharee’ah, Islam and truth, so it is ignorance, not knowledge that may be mentioned alongside the other branches of knowledge. Some of it involves the discussion of the attributes of different elements and how one can be changed to another. This is similar to the way in which doctors examine the human body in particular, from the point of view of what makes it sick and what makes it healthy. They look at all the elements to see how they change and move. But medicine has an edge over the physical body in that it is needed, but there is no need for the study of nature. End quote.
In al-Mawsoo’ah al-Muyassarah fi’l-Adyaan wa’l-Madhaahib al-Mu’aasirah (2/1118-1121) it says:
Philosophy is a Greek word composed of two words. Philo originally meant selflessness, but Pythagoras turned it to mean love; and sophia which means wisdom. The word philosopher is derived from philosophy and means the lover of wisdom. But the meaning changed and came to mean wisdom.
Then the philosopher came to be called a wise man (hakeem). In the past the word philosophy referred to study of the basic principles, viewing knowledge as something based on rationality, the goal of which was the search for truth. For its supporters, philosophy is, as Dr. Tawfeeq al-Taweel described it: Rational examination, free from any restrictions and authority imposed on it from outside, and with the ability to go all the way on the basis of logic, propagating his view regardless of the difference between these (philosophical) views and what is customarily known, religious beliefs and the dictates of tradition, without being confronted or resisted or punished by any authority. In Aristotle’s view, the philosopher is of a higher status than a prophet, because the prophet understands things by means of imagination whereas the philosopher understands things by means of reason and contemplation. In their view, imagination is of a lower status than contemplation. Al-Faraabi agreed with Aristotle in viewing the philosopher as being of higher status than a prophet.
In this sense philosophy is opposed to wisdom, which in Islamic terminology refers to the Sunnah as defined by the majority of muhadditheen and fuqaha’, and in the sense of judgement, knowledge and proficiency, alongside moral guidelines which control the whims and desires of the self and keep it from doing haraam things. The wise man is the one who has these characteristics, hence philosophy, as defined by the philosophers, is one of the most dangerous falsehoods and most vicious in fighting faith and religion on the basis of logic, which it is very easy to use to confuse people in the name of reason, interpretation and metaphor that distort the religious texts.
Imam al-Shaafa’i said: The people did not become ignorant and begin to differ until they abandoned Arabic terminology and adopted the terminology of Aristotle. Even though philosophy existed in the ancient civilizations of Egypt, India and Persia, it became most famous in Greece and became synonymous with that land, the reason being that the Greek philosophers were interested in transmitting it from the legacy of idolatrous peoples and the remnants of the divinely-revealed religions, benefiting from the scriptures of Ibraaheem and Moosa (peace be upon them) after the Greek victory over the Hebrews after the captivity in Babylon, and benefiting from the religion of Luqmaan the Wise. So there was a mixture of views that confirmed the divinity and Lordship of the Creator that was contaminated with idolatry. Therefore the Greek philosophy was in some ways a revival more than an innovation.
Ibn Abi’l-‘Izz, the commentator on al-Tahhaawiyyah, summed up the schools of philosophical thought about the five basic principles of religion in their view, as follows:
That God does exist but He has no reality or essence, and He does not know the details of His creation, but He does know about its general terms, thus they denied that He creates the deeds of His slaves. They also did not believe in His Books, as in their view God does not speak or talk, and the Qur’aan is just something that shines from active reasons into purified human hearts. Exalted be Allaah far above what they ascribe to Him. There is no separate entity that ascends or descends, rather in their view it is all ideas in the mind that do not exist in reality. The philosophers are the one who most deny the Last Day and its events. In their view Paradise and Hell are no more than parables for the masses to understand, but they have no reality beyond people’s minds.
The Greek philosophers still have an impact on all western philosophies and ideologies, ancient and modern. Indeed, most of the Islamic kalaami groups were influenced by them. The terminology of Islamic philosophy did not emerge as a branch of knowledge that is taught in the curriculum of Islamic studies until it was introduced by Shaykh Mustafa ‘Abd al-Razzaaq – the Shaykh of al-Azhar – as a reaction to western attacks on Islam based on the idea that Islam has no philosophy. But the fact of the matter is that philosophy is an alien entity in the body of Islam. There is no philosophy in Islam and there are no philosophers among Muslims in this deviant sense. Rather in Islam there is certain knowledge and prominent scholars who examine matters. Among the most famous philosophers who were nominally Muslims were al-Kindi, al-Faraabi, Ibn Sina (Avicenna) and Ibn Rushd (Averroes). End quote.
Secondly:
The majority of fuqaha’ have stated that it is haraam to study philosophy. Among their comments on that are the following:
1 – Ibn Nujaym (Hanafi) said in al-Ashbaah wa’l-Nazaa’im: Acquiring knowledge may be an individual obligation, which is as much as one needs for religious commitment to be sound; or it may be a communal obligation, which is in addition to the previous and is done for the benefit of others; or it may be recommended, which is studying fiqh and ‘ilm al-qalb (purification of the heart) in depth; or it may be haraam, which is learning philosophy, magic (sleight of hand), astrology, geomancy, natural science and witchcraft. End quote from al-Ashbaah wa’l-Nazaa’ir ma’a Sharhiha: Ghamaz ‘Ayoon al-Basaa’ir by al-Hamawi (4/125).
2 – al-Dardeer (Maaliki) said in al-Sharh al-Kabeer, discussing the kind of knowledge which is a communal obligation: Such as studying sharee’ah, which is not an individual obligation, and which includes fiqh, tafseer, hadeeth and ‘aqeedah, and things that help with that such as (Arabic) grammar and literature, tafseer, mathematics and usool al-fiqh – not philosophy, astrology or ‘ilm al-kalaam, according to the most sound opinion.
Al-Dasooqi said in his Haashiyah (2/174): His phrase “according to the most sound opinion” means that it is forbidden to read the books of al-Baaji, Ibn al-‘Arabi and ‘Iyaad, unlike the one who says that it is essential to learn it in order to understand ‘aqeedah and basic religious issues. But al-Ghazaali said that the one who has knowledge of ‘ilm al-kalaam knows nothing of religious beliefs except the beliefs that the common people share, but they are distinguished by their ability to argue and debate.
3 – Zakariya al-Ansaari (Shaafa’i) said in Asna al-Mataalib (4/182): As for learning philosophy, magic (sleight of hand), astrology, geomancy, natural science and witchcraft, it is haraam. End quote.
4 – al-Bahooti (Hanbali) said in Kashshaaf al-Qinaa’ (3/34): The opposite of shar’i knowledge is knowledge that is haraam or makrooh. Haraam knowledge is like ‘ilm al-kalaam in which they argue on the basis of pure reason or speak in a manner that contradicts sound, unambiguous reports. If they speak on the basis of reports only or on the basis of texts and rational thought that is in accordance with them, then this is the basis of religion and the way of ahl al-sunnah. This is what is meant by the words of Shaykh Taqiy al-Deen. In his commentary he explains that even better. [Haraam knowledge also includes] philosophy, magic (sleight of hand), astrology and geomancy, as well as alchemy and natural sciences. End quote.
It should be noted that an exception from this prohibition is made for those who study it as a speciality in order to explain its deviations and refute the falsehoods that they stir up.
Thirdly:
If studying philosophy is compulsory, then you must beware of believing in any of its falsehoods or admiring its people. You should strive hard to acquire shar’i knowledge, especially that which has to do with ‘aqeedah (belief), so that you will develop immunity and resistance to specious arguments.
We ask Allaah to help and guide you.
And Allaah knows best.

বাংলা অনুবাদঃ সকল প্রশংসা আল্লাহর প্রাপ্য, এবং আল্লাহর রাসূলের ওপর শান্তি ও রহমত বর্ষিত হোক।
প্রথমত:
দর্শন অধ্যয়নের বিধান বর্ণনা করার আগে দর্শন কী এবং এর মূলনীতিগুলো কী কী তা বোঝা প্রয়োজন। কারণ কোনো বিষয়ের ওপর হুকুম বা বিধান দেওয়া সেই বিষয়টি কীভাবে দেখা হচ্ছে তার ওপর নির্ভর করে।
ইমাম আল-গাজ্জালী তাঁর ‘আল-ইহয়া’ (১/২২) গ্রন্থে বলেন: দর্শন কেবল কোনো একটি নির্দিষ্ট জ্ঞানশাখা নয়, এটি মূলত চারটি ভাগে বিভক্ত:
১. জ্যামিতি ও গণিত: এগুলো উপরে বর্ণিত বিধান অনুযায়ী বৈধ। এগুলো অধ্যয়নে কোনো বাধা নেই, তবে সতর্ক থাকতে হবে যেন এর মাধ্যমে কেউ সীমা লঙ্ঘন করে নিষিদ্ধ কোনো জ্ঞানশাখায় নিমজ্জিত না হয়। কারণ গণিত চর্চাকারীদের অনেকেই পরে বিদআত বা ভ্রান্ত উদ্ভাবনের দিকে চলে যায়, তাই দুর্বল ঈমানদারদের এগুলো থেকে রক্ষা করা উচিত।
২. যুক্তিবিদ্যা (Logic): এটি সাক্ষ্য-প্রমাণ ব্যবহারের পদ্ধতি, প্রমাণের বৈধতার শর্তাবলি এবং প্রমাণের সংজ্ঞা নিয়ে আলোচনা করে। এগুলো ‘ইলমুল কালাম’-এর আওতাভুক্ত।
৩. ধর্মতত্ত্ব (Theology): এটি আল্লাহর সত্তা ও গুণাবলি নিয়ে আলোচনা করে। এটিও ‘ইলমুল কালাম’-এর অন্তর্ভুক্ত। দার্শনিকদের কাছে এমন কোনো স্বতন্ত্র জ্ঞান ছিল না যা কেবল তাদেরই নিজস্ব, বরং তাদের কিছু দৃষ্টিভঙ্গি ও ধারণা ছিল যা সম্পূর্ণ তাদের নিজস্ব; যার কিছু কুফর (অবিশ্বাস) এবং কিছু বিদআত (ভ্রান্তি)।
৪. প্রাকৃতিক বিজ্ঞান (Natural Sciences): এর কিছু অংশ শরীয়ত, ইসলাম এবং সত্যের পরিপন্থী। তাই এগুলো জ্ঞানের তালিকায় পড়ার চেয়ে অজ্ঞতা হিসেবে গণ্য হওয়াই সমীচীন। এর কিছু অংশ বিভিন্ন উপাদানের বৈশিষ্ট্য এবং এক উপাদান থেকে অন্য উপাদানে রূপান্তর নিয়ে আলোচনা করে। এটি অনেকটা চিকিৎসকদের মানবদেহ পরীক্ষার মতো; যেখানে তারা সুস্থতা ও অসুস্থতার কারণ খুঁজেন। কিন্তু চিকিৎসাশাস্ত্রের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও প্রকৃতির এই দার্শনিক বিশ্লেষণের কোনো প্রয়োজন নেই। (উদ্ধৃতি সমাপ্ত)
‘আল-মাওসূআহ আল-মুয়াসসারাহ ফিল-আদিয়ান ওয়াল-মাদাহিব আল-মুয়াসিরাহ’ (২/১১১৮-১১২১) গ্রন্থে বলা হয়েছে:
দর্শন (Philosophy) একটি গ্রিক শব্দ যা দুটি শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। ‘ফিলু’ (Philo) মূলত স্বার্থহীনতা বুঝালেও পিথাগোরাস এর অর্থ করেছেন ‘প্রেম’; আর ‘সোফিয়া’ (Sophia) মানে ‘প্রজ্ঞা’। ‘ফিলোসফার’ বা দার্শনিক শব্দটি দর্শন থেকে এসেছে যার অর্থ ‘প্রজ্ঞার প্রেমিক’। তবে কালক্রমে এর অর্থ বদলে এটি কেবল ‘প্রজ্ঞা’ বোঝাতে ব্যবহৃত হতে থাকে।
পরবর্তীতে দার্শনিককে ‘হাকিম’ বা প্রজ্ঞাবান বলা শুরু হয়। অতীতে দর্শন বলতে মৌলিক নীতিমালার অধ্যয়নকে বোঝানো হতো, যেখানে জ্ঞানকে যুক্তিনির্ভর হিসেবে দেখা হতো এবং যার লক্ষ্য ছিল সত্যের সন্ধান করা। এর সমর্থকদের কাছে দর্শন হলো—যেমনটি ড. তৌফিক আল-তওয়ীল বর্ণনা করেছেন—যৌক্তিক নিরীক্ষণ, যা বাইরের কোনো বিধিনিষেধ বা কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত এবং যুক্তির ভিত্তিতে শেষ পর্যন্ত যাওয়ার ক্ষমতা রাখে। দার্শনিক তাঁর মত প্রচার করেন সেটির সাথে প্রচলিত রীতি, ধর্মীয় বিশ্বাস বা ঐতিহ্যের যতই পার্থক্য থাকুক না কেন; এবং তিনি কোনো কর্তৃপক্ষের দ্বারা বাধাগ্রস্ত বা শাস্তিপ্রাপ্ত হন না। অ্যারিস্টটলের মতে, একজন দার্শনিকের মর্যাদা একজন নবীর চেয়েও উপরে; কারণ নবী কল্পনা বা ইলহামের মাধ্যমে বিষয়গুলো বোঝেন, আর দার্শনিক বোঝেন যুক্তি ও চিন্তার মাধ্যমে। তাদের দৃষ্টিতে কল্পনার চেয়ে চিন্তার স্থান উঁচুতে। আল-ফারাবিও দার্শনিকের মর্যাদা নবীর চেয়ে উপরে রাখার বিষয়ে অ্যারিস্টটলের সাথে একমত ছিলেন।
এই অর্থে দর্শন ‘প্রজ্ঞা’ বা হিকমতের বিপরীত, যা ইসলামী পরিভাষায় ‘সুন্নাহ’কে বোঝায় (অধিকাংশ মুহাদ্দিস ও ফকীহদের মতে)। এটি নৈতিক নির্দেশনার পাশাপাশি বিচারবুদ্ধি এবং জ্ঞানকেও বোঝায় যা কুপ্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং হারাম থেকে দূরে রাখে। ‘হাকিম’ বা প্রজ্ঞাবান হলেন তিনি যাঁর এই বৈশিষ্ট্যগুলো আছে। তাই দার্শনিকদের সংজ্ঞায়িত ‘দর্শন’ হলো ঈমান ও ধর্মের বিরুদ্ধে লড়াই করার সবচেয়ে বিপজ্জনক ও জঘন্য ভ্রান্ত মাধ্যম। কারণ যুক্তির নামে, অপব্যাখ্যা ও রূপকের নামে ধর্মীয় পাঠ্য বা টেক্সট বিকৃত করে মানুষকে বিভ্রান্ত করা এর মাধ্যমে খুবই সহজ।
ইমাম আল-শাফেঈ বলেছেন: “মানুষ ততক্ষণ পর্যন্ত অজ্ঞ হয়নি এবং তাদের মধ্যে মতভেদ তৈরি হয়নি, যতক্ষণ না তারা আরবি পরিভাষা ছেড়ে অ্যারিস্টটলের পরিভাষা গ্রহণ করেছে।” যদিও মিশর, ভারত ও পারস্যের প্রাচীন সভ্যতায় দর্শনের অস্তিত্ব ছিল, কিন্তু এটি গ্রিসে সবচেয়ে বেশি প্রসিদ্ধি লাভ করে। গ্রিক দার্শনিকরা পৌত্তলিক জাতিগুলোর ঐতিহ্য এবং আসমানি ধর্মগুলোর ধ্বংসাবশেষ থেকে এটি সংগ্রহ ও প্রচার করতে আগ্রহী ছিল। বিশেষ করে ব্যাবিলনীয় বন্দিদশা থেকে মুক্ত হওয়ার পর ইব্রাহিম ও মুসা (আ.)-এর সহিফা এবং লুকমান হাকিমের প্রজ্ঞা থেকে তারা উপকৃত হয়েছিল। ফলে সেখানে এমন এক জগাখিচুড়ি মতবাদের সৃষ্টি হয় যেখানে স্রষ্টার উলুহিয়াত বা প্রভুত্বের সাথে পৌত্তলিকতার মিশ্রণ ছিল। তাই গ্রিক দর্শন মূলত নতুন উদ্ভাবনের চেয়ে প্রাচীন পৌত্তলিকতার এক ধরণের পুনর্জাগরণ ছিল।
তাহাওয়ীয়ার ভাষ্যকার ইবনে আবিল ইয ধর্মের পাঁচটি মৌলিক নীতির ওপর দার্শনিক চিন্তাধারার সারসংক্ষেপ এভাবে করেছেন:
১. তাদের মতে ঈশ্বর বিদ্যমান, কিন্তু তাঁর কোনো বাস্তবতা বা সত্তা নেই। তিনি তাঁর সৃষ্টির খুঁটিনাটি (details) জানেন না, কেবল সাধারণ (general) বিষয়গুলো জানেন। ফলে তারা বিশ্বাস করে না যে আল্লাহ তাঁর বান্দাদের কাজ সৃষ্টি করেন।
২. তারা তাঁর কিতাবসমূহে বিশ্বাস করে না। তাদের মতে ঈশ্বর কথা বলেন না এবং কুরআন কেবল একটি জ্যোতি যা মানব হৃদয়ে প্রতিফলিত হয়। আল্লাহ তাদের এই বর্ণনা থেকে অনেক ঊর্ধ্বে।
৩. আসমান থেকে কোনো কিছুর অবতরণ বা ঊর্ধ্বারোহণ ঘটে না, বরং তাদের মতে এগুলো সব মনের ধারণা, বাস্তবে অস্তিত্ব নেই।
৪. দার্শনিকরাই পরকাল এবং এর ঘটনাবলিকে সবচেয়ে বেশি অস্বীকার করে। তাদের মতে জান্নাত ও জাহান্নাম সাধারণ মানুষকে বোঝানোর জন্য কেবল কিছু রূপক গল্প, মানুষের মনের বাইরে এর কোনো বাস্তবতা নেই।
গ্রিক দার্শনিকদের প্রভাব প্রাচীন ও আধুনিক সকল পাশ্চাত্য দর্শন ও আদর্শের ওপর রয়ে গেছে। এমনকি ইসলামের অনেক কালামী গ্রুপ বা দল তাদের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল। ‘ইসলামী দর্শন’ নামে কোনো জ্ঞানশাখা ইসলামী শিক্ষার পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত ছিল না, যতক্ষণ না শায়খ মুস্তফা আবদ আল-রাজ্জাক (আল-আজহারের শায়খ) এটি প্রবর্তন করেন। এটি ছিল ইসলামের ওপর পাশ্চাত্য আক্রমণের একটি প্রতিক্রিয়া, যেখানে দাবি করা হয়েছিল ইসলামের কোনো নিজস্ব দর্শন নেই। কিন্তু বাস্তবতা হলো, দর্শন ইসলামের দেহের ভেতর একটি ভিনদেশি সত্তা। ইসলামের ভেতর ‘দর্শন’ বলতে কিছু নেই এবং বিচ্যুত অর্থে মুসলমানদের মধ্যে কোনো ‘দার্শনিক’ নেই। বরং ইসলামে আছে সুনিশ্চিত জ্ঞান এবং বিশিষ্ট আলেম। নামধারী মুসলিম দার্শনিকদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত ছিলেন আল-কিন্দি, আল-ফারাবি, ইবনে সিনা এবং ইবনে রুশদ। (উদ্ধৃতি সমাপ্ত)
দ্বিতীয়ত:
অধিকাংশ ফকীহ বা আইনবিদ দর্শন অধ্যয়ন করা হারাম বলে উল্লেখ করেছেন। এ বিষয়ে তাদের কিছু মন্তব্য নিম্নরূপ:
১. ইবনে নুজাইম (হানাফী) তাঁর ‘আল-আশবাহ ওয়ান-নাজাইম’ গ্রন্থে বলেন: “জ্ঞান অর্জন করা কখনো ফরজে আইন বা ব্যক্তিগত বাধ্যবাধকতা (সালাত-সিয়ামের জন্য যতটুকু প্রয়োজন); কখনো ফরজে কেফায়া (অন্যদের উপকারের জন্য অতিরিক্ত জ্ঞান); কখনো মুস্তাহাব বা প্রশংসনীয় (ফিকহ ও আধ্যাত্মিকতার গভীর জ্ঞান); এবং কখনো হারাম—যেমন দর্শন, জাদুকরী বিদ্যা, জ্যোতিষশাস্ত্র, ভাগ্যগণনা এবং প্রাকৃতিক বিজ্ঞান শেখা।” (আল-হামাউই রচিত ‘গামাজ আইউন আল-বাসাইর’ থেকে উদ্ধৃত, ৪/১২৫)
২. আল-দারদীর (মালিকী) ‘আল-শারহ আল-কাবীর’ গ্রন্থে ফরজে কেফায়া জ্ঞান সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে বলেন: “শরীয়তের জ্ঞান অর্জন করা যেমন ফিকহ, তাফসীর, হাদীস ও আকিদাহ এবং এর সহায়ক বিষয় যেমন আরবি ব্যাকরণ ও সাহিত্য, গণিত এবং উসুল আল-ফিকহ—এগুলো ফরজে কেফায়া। কিন্তু নির্ভরযোগ্য মতানুসারে দর্শন, জ্যোতিষশাস্ত্র বা ইলমুল কালাম এর অন্তর্ভুক্ত নয় (বরং এগুলো বর্জনীয়)।”
আল-দাসুকী তাঁর হাশিয়াহ (২/১৭৪) গ্রন্থে বলেন: “নির্ভরযোগ্য মতানুসারে” কথাটির অর্থ হলো আল-বাজি, ইবনুল আরাবি এবং ইয়াদের মতো আলেমদের বই পড়াও নিষেধ, যদিও অনেকে মনে করেন আকিদা বোঝার জন্য এগুলো শেখা জরুরি। কিন্তু ইমাম গাজ্জালী বলেছেন, যাদের ‘ইলমুল কালাম’ বা যুক্তিশাস্ত্রের জ্ঞান আছে তারা সাধারণ মানুষের বিশ্বাসের চেয়ে অতিরিক্ত কিছুই জানে না, তাদের বিশেষত্ব কেবল বিতর্ক করার ক্ষমতার মধ্যে সীমাবদ্ধ।
৩. জাকারিয়া আল-আনসারী (শাফেঈ) তাঁর ‘আসনা আল-মাতালিব’ (৪/১৮২) গ্রন্থে বলেন: “দর্শন, জাদুকরী বিদ্যা, জ্যোতিষশাস্ত্র এবং প্রাকৃতিক বিজ্ঞান শেখা হারাম।”
৪. আল-বাহুতি (হাম্বলী) ‘কাশশাফ আল-কিনা’ (৩/৩৪) গ্রন্থে বলেন: “শরীয়তসম্মত জ্ঞানের বিপরীত হলো সেই জ্ঞান যা হারাম বা মাকরূহ। হারাম জ্ঞান হলো ‘ইলমুল কালাম’, যেখানে তারা কেবল যুক্তির ভিত্তিতে বিতর্ক করে অথবা এমন কথা বলে যা সুস্পষ্ট ও বিশুদ্ধ দলিলের পরিপন্থী। তবে তারা যদি কেবল দলিল বা টেক্সটের ভিত্তিতে কথা বলে এবং যুক্তিকে দলিলে অনুসারী করে, তবে তা দ্বীনের ভিত্তি এবং আহলে সুন্নাহর পথ। দর্শন, জাদুকরী বিদ্যা এবং জ্যোতিষশাস্ত্রও এর অন্তর্ভুক্ত।” (উদ্ধৃতি সমাপ্ত)
উল্লেখ্য যে, এই নিষেধাজ্ঞার ব্যতিক্রম কেবল তাদের জন্য যারা এই বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হিসেবে পড়াশোনা করেন যাতে তারা এই দর্শনের ভ্রান্তিগুলো ব্যাখ্যা করতে পারেন এবং তাদের তোলা মিথ্যা যুক্তিগুলো খণ্ডন করতে পারেন।
তৃতীয়ত:
যদি কোনো প্রতিষ্ঠানে দর্শন অধ্যয়ন করা বাধ্যতামূলক হয়, তবে আপনাকে অবশ্যই এর কোনো ভ্রান্তিতে বিশ্বাস করা বা দার্শনিকদের ভক্ত হওয়া থেকে সতর্ক থাকতে হবে। আপনাকে শরীয়তের জ্ঞান অর্জনে কঠোর পরিশ্রম করতে হবে, বিশেষ করে আকিদা বিষয়ে, যাতে আপনার মধ্যে বিভ্রান্তিকর যুক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়।
আমরা আল্লাহর কাছে আপনার সাহায্য ও সঠিক পথের দিশা কামনা করছি।
আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন।

একইভাবে IslamWeb.net তাদের ফতোয়ায় দর্শনের চর্চাকে ‘হারাম’ বা নিষিদ্ধ করার অসংখ্য প্রাচীন আলেমদের উদাহরণ টেনেছে, যারা যুক্তিবিদ্যাকে ‘শয়তানি ধোঁকা’ হিসেবে গণ্য করতেন [11]। এই প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থানগুলো বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয় পরিষ্কার হয়—ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো মানুষের স্বাধীন বুদ্ধিবৃত্তিক অনুসন্ধানকে সবসময়ই একটি ‘বিপজ্জনক প্রতিপক্ষ’ হিসেবে দেখেছে। তাদের দৃষ্টিতে, যুক্তি হলো এমন এক অবাধ্য ঘোড়া যা নিয়ন্ত্রিত না হলে বিশ্বাসের সীমানা অতিক্রম করে সত্যের এক ভিন্ন দিগন্ত উন্মোচন করে দিতে পারে, যা প্রকারান্তরে ধর্মীয় কর্তৃত্বের জন্য হুমকি। এই সেন্সরশিপের মধ্য দিয়ে মূলত একটি বার্তা দেওয়া হয়: “ভাবার দরকার নেই, কেবল মেনে নাও।”

Why some scholars studied Kalaam theology though prohibited by the Salaf
Question
Shaykh, i have read some sayings of the scholars of Salaf that they had forbidden teaching and taking with ilm al-kalam. But in other hand we see that many of great scholars have teached ilm al-kalam. My question is: Why scholars like Shaykhul Islam Ibn Taymiyyah, Hafiz Al-Iraqi, Shaah Waliyyullaah Ad-Dahlawi and Mohammad Shah Anwar Kashmiri teached and were taking with ilm al-kalam?May Allah reward you Shaykh.
Answer
All perfect praise be to Allaah, The Lord of the Worlds. I testify that there is none worthy of worship except Allaah, and that Muhammad sallallaahu `alayhi wa sallam ( may Allaah exalt his mention ) is His slave and Messenger.
Indeed, it has been reported that many scholars among the Salaf (righteous predecessors) dispraised ‘Ilm al-Kalaam (discursive theology) and Kalaam theologians and strongly warned against it. The most famous statements about this is a statement from Ash-Shaafi‘i who said: “My judgment concerning Kalaam theologians is that they should be taken around the community and beaten with palm branches and slippers and it will be said to them: this is the punishment for leaving the Words of Allaah and the words of the Messenger of Allaah, sallallaahu ‘alayhi wa sallam.”
Ismaa‘eel Al-Harawi authored a book entitled Thamm Al-Kalaam (The Dispraise of Kalaam Theology), and Ibn Qudaamah authored a book entitled Tahreem An-Nathar fi Kutub Al-Kalaam (The Prohibition of Reading Books on Kalaam Theology), based on it being a discipline that is based on philosophical principles that contradict the revelation presented in the Book of Allaah and the Sunnah of the Prophet, sallallaahu ‘alayhi wa sallam.
Nonetheless, some scholars said it is permissible to study and teach it if one is secure from deviating from the right path.
In our view, there is no good in studying this science as it confuses the person no matter how intelligent he is. Al-Ghazaali may Allaah have mercy upon him who was an expert in Kalaam theology, said: “As regards its benefits (i.e. the benefits of Kalaam theology), it may be said that it leads to the truth (i.e. knowedge about Allaah in a correct manner); but how preposterous! There is no fulfillment of this noble objective in Kalaam; the most it comprises is a dramatization … So listen to this from someone who is and expert in Kalaam theology, and who came to the same conclusion as that of the Kalaam theologians, and then exceeded that and delved deeper into other sciences that suit Kalaam theology (i.e. philosophy), and then realized that the path to knowledge from these means has been obstructed.” [End of quote]
Moreover, Ash-Shahristaani, author of Al-Milal wan-Nihal, Al-Aamidi, and the Imaam Al-Haramayn have all made profound statements at the end of their lives about it.
Some scholars may be interested in studying and teaching logic since the science of logic is in principle an instrumental science, and some scholars clarified the importance of studying it as an instrument to understand some branches of knowledge, because much of the literature was formulated in a logical mould, so the only way to become versed in it is by studying logic. This is in addition to the need for logic in debating with Kalaam theologians and philosophers, which is what Shaykhul-Islam Ibn Taymiyyah and other scholars did. Hence, some well-versed scholars may study scholastic theology and philosophy for this purpose.
Finally, it is worth mentioning that the science of logic itself has not been spared from being mixed with some philosophy, and this is what some scholars referred to when they mentioned the difference of opinion regarding the judgment on learning it. They said: the difference of opinion has only to do with the kind of logic that has been mixed with the statements of the philosophers. As regards pure logic that is not mixed with the statements of philosophers, then no one is prohibited from studying it and teaching it.
Allaah Knows best.

প্রশ্ন:
শায়েখ, আমি সালাফদের (পূর্বসূরি আলেমদের) অনেক উক্তি পড়েছি যেখানে তাঁরা ‘ইলমে কালাম’ বা ধর্মতাত্ত্বিক দর্শন শিক্ষা দেওয়া এবং এ বিষয়ে আলোচনা করা নিষিদ্ধ করেছেন। কিন্তু অন্যদিকে আমরা দেখি যে, অনেক বড় বড় আলেম ইলমে কালাম পড়িয়েছেন। আমার প্রশ্ন হলো: শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া, হাফিজ আল-ইরাকি, শাহ ওয়ালিউল্লাহ আদ-দেহলভী এবং মোহাম্মদ শাহ আনোয়ার কাশ্মীরের মতো আলেমরা কেন ইলমে কালাম পড়াতেন বা এটি নিয়ে আলোচনা করতেন? আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন।
উত্তর:
সকল প্রশংসা জগতের প্রতিপালক আল্লাহর। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই এবং মুহাম্মদ ﷺ তাঁর বান্দা ও রাসূল।
প্রকৃতপক্ষে এটি বর্ণিত হয়েছে যে, সালাফদের মধ্যে অনেক আলেম ইলমে কালাম এবং কালাম শাস্ত্রবিদদের নিন্দা করেছেন এবং এ বিষয়ে কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন। এ বিষয়ে সবচেয়ে বিখ্যাত উক্তিটি হলো ইমাম শাফেঈর, যিনি বলেছিলেন:
“কালাম শাস্ত্রবিদদের (যুক্তিবিদদের) ব্যাপারে আমার রায় হলো—তাদেরকে খেজুরের ডাল ও জুতো দিয়ে পিটিয়ে পুরো গোত্র ও মহল্লায় ঘোরানো উচিত এবং বলা উচিত: এটিই সেই ব্যক্তির শাস্তি যে আল্লাহর কালাম (কুরআন) এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর বাণী ত্যাগ করে কালাম শাস্ত্র বা দর্শনে লিপ্ত হয়েছে।”
ইসমাঈল আল-হারাবী এ বিষয়ে একটি বই লিখেছেন যার নাম ‘শাম আল-কালাম’ (কালাম শাস্ত্রের নিন্দা), এবং ইবনে কুদামাহ একটি বই লিখেছেন যার নাম ‘তাহরীম আন-নাজার ফি কুতুব আল-কালাম’ (কালাম শাস্ত্রের বই পড়ার নিষেধাজ্ঞা)। তাঁরা এই নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিলেন কারণ এই শাস্ত্রটি এমন কিছু দার্শনিক মূলনীতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে যা কুরআন এবং সুন্নাহর নির্দেশনার সাথে সাংঘর্ষিক।
তা সত্ত্বেও, কিছু আলেম বলেছেন যে, যদি কেউ সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা থেকে মুক্ত থাকে, তবে তার জন্য এটি শেখা বা পড়ানো জায়েজ হতে পারে।
আমাদের দৃষ্টিতে, এই বিজ্ঞানটি (ইলমে কালাম) পড়ার মধ্যে কোনো কল্যাণ নেই, কারণ এটি একজন মানুষকে বিভ্রান্ত করে দেয়—সে যত বুদ্ধিমানই হোক না কেন। ইমাম গাজ্জালী, যিনি নিজে ইলমে কালামে বিশেষজ্ঞ ছিলেন, তিনি এর উপকারিতা সম্পর্কে বলেছেন:
“এর (ইলমে কালামের) উপকারিতা সম্পর্কে বলা হতে পারে যে এটি সত্যের দিকে (অর্থাৎ সঠিকভাবে আল্লাহ সম্পর্কে জানার দিকে) নিয়ে যায়; কিন্তু কী অদ্ভুত ও অসম্ভব কথা! কালাম শাস্ত্রের মাধ্যমে এই মহৎ উদ্দেশ্য অর্জন করা সম্ভব নয়; এটি বড়জোর কিছু নাটুকেপনার সংমিশ্রণ… সুতরাং এটি তাঁর কাছ থেকে শুনুন যিনি নিজে কালাম শাস্ত্রে বিশেষজ্ঞ ছিলেন এবং কালাম শাস্ত্রবিদরা যেখানে পৌঁছেছিলেন তিনিও সেখানে পৌঁছেছিলেন, তারপর তা অতিক্রম করে এর সাথে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিজ্ঞানে (দর্শনে) গভীরভাবে প্রবেশ করেছিলেন, এবং পরিশেষে অনুধাবন করেছিলেন যে এই উপায়ে জ্ঞান অর্জনের পথটি রুদ্ধ বা অবরুদ্ধ।” (উদ্ধৃতি সমাপ্ত)
এছাড়া ‘আল-মিলাল ওয়ান-নিহাল’-এর লেখক আশ-শাহরিস্তানি, আল-আমীদি এবং ইমামুল হারামাইন—তাঁরা সকলেই তাঁদের জীবনের শেষ প্রান্তে এই শাস্ত্র সম্পর্কে গভীর হতাশা ও অনুশোচনামূলক মন্তব্য করেছেন।
তবে কিছু আলেম যুক্তিবিদ্যা (Logic) শিক্ষা দেওয়া এবং অধ্যয়নের প্রতি আগ্রহী হতে পারেন, কারণ যুক্তিবিদ্যা মূলত একটি ‘যান্ত্রিক বিজ্ঞান’ (Instrumental science/আলাত)। কিছু আলেম জ্ঞানের অন্যান্য শাখা বোঝার হাতিয়ার হিসেবে এর গুরুত্ব স্পষ্ট করেছেন। কারণ ইসলামের অনেক প্রাচীন সাহিত্য যৌক্তিক ছাঁচে বা কাঠামোর মধ্যে রচিত হয়েছিল, তাই সেই বইগুলো বুঝতে হলে যুক্তিবিদ্যা জানা ছাড়া উপায় নেই। এছাড়া কালাম শাস্ত্রবিদ এবং দার্শনিকদের সাথে বিতর্কের প্রয়োজনেও যুক্তিবিদ্যা জানার প্রয়োজন পড়ে; যা শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া এবং অন্যান্য আলেমরা করেছিলেন। ফলে কিছু গভীর জ্ঞানী আলেম এই বিশেষ উদ্দেশ্যে কালাম শাস্ত্র এবং দর্শন অধ্যয়ন করতে পারেন।
পরিশেষে এটি উল্লেখ করা জরুরি যে, যুক্তিবিদ্যা শাস্ত্রটি নিজেও দর্শনের মিশ্রণ থেকে মুক্ত থাকতে পারেনি। কিছু আলেম যখন যুক্তিবিদ্যা শেখার বিধান নিয়ে মতভেদের কথা বলেছেন, তখন তাঁরা মূলত এই বিষয়ের দিকেই ইঙ্গিত করেছেন। তাঁরা বলেছেন: মতভেদ কেবল সেই যুক্তিবিদ্যা নিয়ে যা দার্শনিকদের বক্তব্যের সাথে মিশ্রিত। পক্ষান্তরে যে যুক্তিবিদ্যা বিশুদ্ধ এবং দার্শনিকদের ভ্রান্ত মতবাদের সাথে মিশ্রিত নয়, তা শেখা বা পড়ানোতে কারো কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই।
আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন।


বুদ্ধিবৃত্তিক বন্ধ্যাত্ব: দার্শনিক ও যুক্তিনির্ভর বীক্ষাহীনতার পরিণতি

একটি জাতি যখন ক্রিটিকাল থিঙ্কিং বা সমালোচনামূলক চিন্তা এবং যুক্তির প্রয়োগকে বিসর্জন দেয়, তখন সেই সমাজে এক ধরনের ভয়াবহ বুদ্ধিবৃত্তিক দৈন্য বা ‘ইন্টেলেকচুয়াল স্ট্যাগনেশন’ তৈরি হয়। দার্শনিক বীক্ষাহীনতা একটি সমাজকে কেবল অন্ধ অনুকরণকারী এবং হুজুগে গোষ্ঠীতে পরিণত করে, যেখানে তথ্যের চেয়ে গুজব এবং প্রমাণের চেয়ে ভাবাবেগ বেশি গুরুত্ব পায়। যখন কোনো জাতির শিক্ষাব্যবস্থা বা সামাজিক সংস্কৃতিতে সংশয়বাদকে ‘পাপ’ বা ‘বিচ্যুতি’ হিসেবে দেখা হয়, তখন সেই জাতি বৈজ্ঞানিক ও মনস্তাত্ত্বিক উদ্ভাবনে পিছিয়ে পড়ে এবং প্রাগৈতিহাসিক প্রথাগুলোকে আঁকড়ে ধরে থাকাকেই শ্রেষ্ঠত্ব মনে করে [12]। এই ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলিয়াত্ব সমাজকে ‘কনফার্মিটি’ বা দলবদ্ধ চিন্তার দাসে পরিণত করে, যেখানে ভিন্নমত বা মুক্ত চিন্তাকে দমন করা হয় একপাক্ষিক সত্য প্রতিষ্ঠার নেশায় [13]। দর্শনের অনুপস্থিতিতে একটি জাতির মধ্যে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য করার সক্ষমতা লোপ পায়, ফলে তারা সহজেই ডগমা (Dogma) বা চরমপন্থি রাজনৈতিক ও ধর্মীয় আদর্শের শিকারে পরিণত হয়। বস্তুতপক্ষে, যুক্তি ও সংশয়বাদের অবর্তমানে একটি সমাজ কেবল যান্ত্রিকভাবে টিকে থাকে, কিন্তু তার সৃজনশীল প্রাণশক্তি এবং মানবিক মূল্যবোধগুলো ক্রমশ মৃতপ্রায় হয়ে পড়ে [14]। যুক্তির এই নির্বাসন শেষ পর্যন্ত সমাজকে এক অন্ধকার গহ্বরে ঠেলে দেয়, যেখানে সত্যের মাপকাঠি হিসেবে ‘প্রমাণ’ নয়, বরং ‘কর্তৃত্বের আদেশ’ বা ‘ধর্মীয় ফতোয়া’ই চূড়ান্ত হয়ে দাঁড়ায়।


উপসংহার

দর্শন এবং ধর্মের এই চিরন্তন দ্বন্দ্বে একটি বিষয় অত্যন্ত পরিষ্কার—যুক্তি যেখানে মানুষকে অসীমের দিকে নিয়ে যায়, প্রথাগত ধর্ম সেখানে তাকে একটি নির্দিষ্ট বৃত্তে আটকে রাখতে চায়। প্রবন্ধের আলোচনা থেকে এটি স্পষ্ট যে, মূলধারার ইসলামী স্কলারগণ দর্শনকে কেবল একটি শাস্ত্র হিসেবে নয়, বরং ঈমানের জন্য একটি ‘প্রতিপক্ষ’ হিসেবে দেখেন। তাদের এই ভীতি অযৌক্তিক নয়; কারণ দর্শন যখন মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখায়, তখন হাজার বছরের পুরনো অজস্র ‘পবিত্র’ ধারণা আর ধোপে টিকে না। যুক্তি ও সংশয়বাদ হলো সেই ধারালো অস্ত্র যা অন্ধবিশ্বাসের মেদ ঝরিয়ে সত্যকে উন্মোচিত করে।

একটি জাতি যখন নিজের বুদ্ধিবৃত্তিক দরজায় তালা লাগিয়ে দেয় এবং ‘যুক্তি পড়া হারাম’ বলে ফতোয়া জারি করে, তখন সেই জাতির চিন্তার জগৎ স্থবির হয়ে পড়তে বাধ্য। ইসলামের আদি যুগে যে গ্রিক দর্শনের অনুপ্রবেশ ঘটেছিল, তা দমনে প্রাচীন ইমামদের কঠোর অবস্থান আজও সমসাময়িক আলেমদের কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হয়। এর মাধ্যমে মূলত একটি সুরক্ষামূলক প্রাচীর তৈরি করা হয়েছে, যাতে কোনো অপ্রিয় প্রশ্ন বিশ্বাসের ভিত নড়িয়ে দিতে না পারে। কিন্তু সত্য যদি সত্যিই অবিনশ্বর হয়, তবে তাকে যুক্তির আয়নায় দেখতে ভয় পাওয়ার কোনো কারণ থাকার কথা নয়।

পরিশেষে বলা যায়, দর্শনের অনুপস্থিতি একটি সমাজকে কেবল যান্ত্রিক আনুগত্যের দাস বানায়, কিন্তু মানবিক বিবর্তন ও সত্যের প্রকৃত স্বাদ থেকে বঞ্চিত করে। স্বাধীনভাবে চিন্তা করার ক্ষমতা এবং যুক্তি প্রয়োগের সাহসই মানুষকে প্রকৃত অর্থে ‘মানুষ’ হিসেবে শ্রেষ্ঠত্ব দান করে। সেই যুক্তিকে বিসর্জন দিয়ে কেবল ওহীর ওপর অন্ধ নির্ভরতা হয়তো সাময়িক আত্মিক প্রশান্তি দিতে পারে, কিন্তু তা শেষ পর্যন্ত একটি জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক মৃত্যুকেই ত্বরান্বিত করে। সত্যের অনুসন্ধান কোনো নিষিদ্ধ পথ নয়, বরং এটিই মানুষের আদি ও অকৃত্রিম মুক্তি।

About This Article

Genre: Semi-Academic Skeptical Analysis

Epistemic Position: Scientific Skepticism

This article belongs to the skeptical-rationalist analytical tradition of Shongshoy.com.

It applies historical criticism, empirical reasoning, logical analysis, and scientific skepticism in evaluating religious, philosophical, and historical claims.

The objective is not theological neutrality, but evidence-based critical examination and adversarial analysis of ideas and narratives.

This article should primarily be evaluated through: source quality, evidentiary strength, logical rigor, and factual consistency.


তথ্যসূত্রঃ
  1. Bertrand Russell, A History of Western Philosophy, Simon & Schuster, 1945 ↩︎
  2. David Hume, An Enquiry Concerning Human Understanding, 1748 ↩︎
  3. Carl Sagan, The Demon-Haunted World: Science as a Candle in the Dark, Random House, 1995 ↩︎
  4. Immanuel Kant, “An Answer to the Question: What is Enlightenment?”, 1784 ↩︎
  5. শারহুল আক্বীদা আত-ত্বহাবীয়া, লেখক: ইমাম ইবনে আবীল ইয আল-হানাফী, পৃষ্ঠা ৩২৮ ↩︎
  6. সহিহ মুসলিম ২৬৭০ ↩︎
  7. শারহুল আক্বীদা আত-ত্বহাবীয়া, লেখক : ইমাম ইবনে আবীল ইয আল-হানাফী, প্রকাশনী : মাকতাবাতুস সুন্নাহ, পৃষ্ঠা ৩২৮ ↩︎
  8. আল-ফিকহুল আকবর (বঙ্গানুবাদ ও ব্যাখ্যা), ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস, জাহাঙ্গীর, ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ, আস-সুন্নাহ পাবলিকেশন্স, পৃষ্ঠা ১৪৮-১৫৪ ↩︎
  9. ফতোয়ায়ে আরকানুল ইসলাম, শায়খ মুহাম্মদ বিন সালেদ আল উসাইমীন, পৃষ্ঠা ১৬৯ ↩︎
  10. Ruling on studying philosophy ↩︎
  11. Why some scholars studied Kalaam theology though prohibited by the Salaf ↩︎
  12. Martha Nussbaum, Not for Profit: Why Democracy Needs the Humanities, Princeton University Press, 2010 ↩︎
  13. Irving Janis, Groupthink: Psychological Studies of Policy Decisions and Fiascoes, Houghton Mifflin, 1982 ↩︎
  14. John Dewey, Democracy and Education, Macmillan, 1916 ↩︎