Al-Mu'minun
আল-মুমিনুন: 17
23 আল-মুমিনুন Al-Mu'minun · 118 আয়াত المؤمنون
মূল আরবি
وَلَقَدْ خَلَقْنَا فَوْقَكُمْ سَبْعَ طَرَآئِقَ وَمَا كُنَّا عَنِ ٱلْخَلْقِ غَـٰفِلِينَ
English Translations
And We have created above you seven layered heavens, and never have We been of [Our] creation unaware.
And indeed We have created above you seven heavens (one over the other), and We are never unaware of the creation.
And We created above you seven paths (heavens), and We were never neglectful of the creation.
We have indeed fashioned above you seven paths. Never were We unaware of the task of creation.
And We have created above you seven paths, and We are never unmindful of creation.
And We have made, above you, seven tracts; and We are never unmindful of (our) Creation.
বাংলা অনুবাদ
আমি তোমাদের উপরে সপ্ত স্তর সৃষ্টি করেছি, আমি (আমার) সৃষ্টির ব্যাপারে অমনোযোগী নই।
আর অবশ্যই আমি তোমাদের উপর সাতটি স্তর সৃষ্টি করেছি। আর আমি সৃষ্টি সম্পর্কে উদাসীন ছিলাম না।
আমিতো তোমাদের উর্ধ্বে সৃষ্টি করেছি সপ্ত স্তর এবং আমি সৃষ্টি বিষয়ে অসতর্ক নই।
আর অবশ্যই আমরা তোমাদের ঊর্ধ্বে সৃষ্টি করেছি সাতটি আসমান এবং আমরা সৃষ্টি বিষয়ে মোটেই উদাসীন নই,
আমি তো তোমাদের ঊর্ধ্বে সৃষ্টি করেছি সপ্তস্তর এবং আমি সৃষ্টি বিষয়ে অসতর্ক নই,
১৭. হে মানুষ! নিশ্চয়ই আমি তোমাদের উপর একের উপর আরেকটি করে সাতটি আকাশ তৈরি করেছি। বস্তুতঃ আমি কখনো আমার সৃষ্টি থেকে গাফিল ছিলাম না। না তাকে কখনো ভুলে গিয়েছিলাম।
তাফসীর
মানব সৃষ্টি সম্পর্কে আলোচনা করার পর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা আকাশসমূহের সৃষ্টির বর্ণনা দিচ্ছেন। মানব সৃষ্টির তুলনায় আকাশসমূহের সৃষ্টি বহুগুণে বেশী শিল্প চাতুর্যের পরিচায়ক। সূরায়ে আলিফ-লাম-মীম সাজদাহতেও এরই বর্ণনা রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) জুমআর দিন ফজরের নামাযের প্রথম রাকআতে এই সূরাটি পাঠ করতেন। সেখানে প্রথমে আসমান ও যমীনের সষ্টি সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। তারপর মানব সৃষ্টির বর্ণনা দেয়া হয়েছে। এরপর পুরস্কার ও শাস্তি প্রদান সম্পর্কে বর্ণনা রয়েছে।এখানে মহান আল্লাহ বলেনঃ আমি তো তোমাদের উর্ধ্বে সৃষ্টি করেছি সপ্তস্তর।
যেমন তিনি অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সপ্ত আকাশ ও যমীন এবং এতোদুভয়ের মধ্যে যত কিছু রয়েছে সবই তার মহিমা কীর্তন করে।” (১৭:৪৪) অন্য এক স্থানে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা কি দেখেনি যে, কিভাবে আল্লাহ সপ্ত আকাশ স্তরে স্তরে সৃষ্টি করেছেন?” (৭১:১৫) আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আল্লাহই সৃষ্টি করেছেন সপ্ত আকাশ এবং পৃথিবীও ওগুলোর মতই, ওগুলোর মধ্যে নেমে আসে তাঁর নির্দেশ; ফলে তোমরা বুঝতে পার যে, আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান এবং জ্ঞানে আল্লাহ সবকিছুকে পরিবেষ্টন করে আছেন।” (৬৫: ১২)আল্লাহ পাক বলেনঃ আমি সৃষ্টি বিষয়ে অসতর্ক নই।
অর্থাৎ তিনি জানেন যা কিছু ভূমিতে প্রবেশ করে ও যা কিছু তা হতে বের হয় এবং আকাশ হতে যা কিছু নামে ও আকাশে যা কিছু উথিত হয়। তোমরা যেখানেই থাক না কেন তিনি তোমাদের সাথে আছেন; তোমরা যা কিছু কর আল্লাহ তা দেখেন। আকাশের উচ্চ হতে উচ্চতম স্থানে অবস্থিত জিনিস, যমীনের গোপনীয় জিনিস, পর্বতের শৃঙ্গ, সমুদ্রের তলদেশ ইত্যাদি সবকিছুই তাঁর সামনে প্রকাশমান। পাহাড়-পর্বত-টিলা, মরুভূমি, সমুদ্র, ময়দান ইত্যাদি সবকিছুরই খবর তিনি রাখেন। গাছের এমন কোন পাতা ঝরে পড়ে না যা তাঁর জানা থাকে না, যমীনের অন্ধকারে এমন বীজ নেই যা তাঁর অজানা রয়েছে এবং এমন কোন আর্দ্র ও শুষ্ক জিনিস নেই যা প্রকাশ্য কিতাবে বিদ্যমান নেই।
আর অবশ্যই আমরা তোমাদের ঊর্ধ্বে সৃষ্টি করেছি সাতটি আসমান [১] এবং আমরা সৃষ্টি বিষয়ে মোটেই উদাসীন নই [২],
[১] মানুষ সৃষ্টির কথা আলোচনা করার পর সাত আসমান সৃষ্টি করার আলোচনা করা হচ্ছে। সাধারণতঃ যখনই আল্লাহ্ আসমান যমীনের সৃষ্টির কথা আলোচনা করেন, তখনই মানুষ সৃষ্টির কথা আলোচনা করেন। যেমন, আল্লাহ্ বলেন, “মানুষ সৃষ্টি অপেক্ষা আসমানসমূহ ও যমীন সৃষ্টি অবশ্যই বড় বিষয়, কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না।’’ [সূরা গাফিরঃ ৫৭] অনুরূপভাবে সূরা আস-সাজদাহ এর ৪-৯ আয়াতসমূহ। [ইবন কাসীর] আকাশ সৃষ্টির আলোচনায় বলা হয়েছে যে, “আমরা তো তোমাদের ঊর্ধ্বে সৃষ্টি করেছি সাতটি طراءق । এ طراءق শব্দটি طريقة শব্দের বহুবচন। এর মানে পথও হয় আবার স্তরও হয়।
[কুরতুবী] যদি প্রথম অর্থটি গ্রহণ করা হয় এখানে রাস্তা বলতে ফেরেশতাদের চলাচলের পথ বুঝানো হয়েছে। কারণ, সবগুলো আসমান বিধানাবলী নিয়ে যমীনে যাতায়াতকারী ফেরেশতাদের পথ। [বাগভী; কুরতুবী] আর যদি দ্বিতীয় অর্থটি গ্রহণ করা হয় তাহলে طراءق এর অর্থ তাই হবে যা سَبعَ سَمٰوٰتٍ طِبَاتًا বা সাতটি আকাশ স্তরে স্তরে [সূরা আল-মুলকঃ ৩; নূহঃ ১৫] এর অর্থ হয়। অর্থাৎ স্তরে স্তরে সাত আসমান তোমাদের ঊর্ধ্বে সৃষ্টি করা হয়েছে, এর দ্বারা যেন এ কথা বলাই উদ্দেশ্য যে, তোমাদের চাইতে বড় জিনিস আমি নির্মাণ করেছি সেটা হলো, এ আকাশ। মুজাহিদ বলেন, এখানে সাত আসমানই বলা উদ্দেশ্য।
যেমন অন্য আয়াতে এসেছে, “সাত আসমান ও যমীন এবং এগুলোর অন্তর্বর্তী সব কিছু তাঁরই পবিত্ৰতা ও মহিমা ঘোষণা করে’’। [সূরা আল-ইস রাঃ ৪৪] [ইবন কাসীর]
[২] এর অর্থ আমি যা কিছুই সৃষ্টি করেছি তাদের কারোর কোন প্রয়োজন থেকে আমি কখনো গাফিল এবং কোন অবস্থা থেকে কখনো বেখবর থাকিনি। প্রত্যেকটি বিন্দু, বালুকণা ও পত্র-পল্লবের অবস্থা আমি অবগত থেকেছি। আমি মানুষকে শুধু সৃষ্টি করেই ছেড়ে দেইনি। আমি তাদের ব্যাপারে বেখবরও হতে পারি না; বরং তাদের পালন, বসবাস ও সুখের সরঞ্জামও সরবরাহ করেছি। আকাশ সৃষ্টি দ্বারা এ কাজের সূচনা হয়েছে। এরপর আকাশ থেকে বারিবর্ষণ করে মানুষের জন্যে খাদ্য ও ফল-ফুল দ্বারা সুখের সরঞ্জাম সৃষ্টি করেছি। [দেখুন, কুরতুবী]
অথবা আয়াতের অর্থ, আমি আমার সৃষ্টি সম্পর্কে কখনো গাফেল নই। আমি আমার সৃষ্টির সবকিছু জানি। যমীনে যা প্রবেশ করে, যমীন থেকে যা বের হয়, আকাশ থেকে যা নাযিল হয়, যা আকাশে উঠে, তিনি সবই জানেন। তোমরা যেখানেই থাক সেখানেই তোমরা তাঁর জ্ঞানের আওতাভুক্ত। আর তোমরা যা আমল কর আল্লাহ্ তা সম্যক দেখছেন। তিনি এমন এক সত্তা, কোন আসমান অপর আসমানের, কোন যমীন অপর যমীনের মধ্যে তার দৃষ্টিতে বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। কোন পাহাড়ের কঠিন স্থানে, কোন সমুদ্রের গভীর কোণে কি আছে সবই পরিমাণ কত সবই তাঁর জানা। পাহাড়ে, টিলায়, বালু, সমুদ্রে, মরুভূমিতে, গাছে কি আছে আর পরিমাণ কত সবই তিনি জানেন।
[ইবন কাসীর] আল্লাহ্ বলেন, “স্থল ও সমুদ্রের অন্ধকারসমূহে যা কিছু আছে তা তিনিই অবগত, তাঁর অজানায় একটি পাতাও পড়ে না। মাটির অন্ধকারে এমন কোন শস্যকণাও অংকুরিত হয় না বা রসযুক্ত কিংবা শুস্ক এমন কোন বস্তু নেই যা সুস্পষ্ট কিতাবে নেই।” [সূরা আল-আন‘আমঃ ৫৯]
[সূরা আল-মুমিনুন (২৩): আয়াত ১৭] পূর্ণ পৃষ্ঠা
সাতাশতম রাতে। উমর (রা.) বললেন: তোমরা কি এই কিশোরের মতো কিছু করতে অক্ষম হয়ে পড়লে যার মাথার খুলির জোড়াগুলোও এখনো শক্ত হয়নি? এই দীর্ঘ হাদিসটি ইবন আবি শায়বার মুসনাদে বর্ণিত হয়েছে। সুতরাং ইবন আব্বাস তাঁর বক্তব্য "আদম সন্তানকে সাতটি বস্তু হতে সৃষ্টি করা হয়েছে" দ্বারা এই আয়াতটিকে [২] বুঝিয়েছেন এবং তাঁর বক্তব্য: "তার রিযিক সাতটি জিনিসে রাখা হয়েছে" বলতে বুঝিয়েছেন: "অতঃপর আমি তাতে উৎপন্ন করেছি শস্য, আঙুর, শাক-সবজি, জয়তুন, খেজুর, ঘন উদ্যানসমূহ এবং ফলমূল ও ঘাস।" [আবাসা: ২৭-৩১] আয়াতটি। এর মধ্যে সাতটি হলো আদম সন্তানের জন্য এবং 'আব' (ঘাস) হলো চতুষ্পদ জন্তুর জন্য।
'কদব' (শাক-সবজি) আদম সন্তান ভক্ষণ করে এবং মহিলারা তা থেকে হৃষ্টপুষ্ট হয়—এটি একটি অভিমত। আবার বলা হয়েছে: 'কদব' হলো এমন সবজি যা বারবার কাটা যায়, তাই এটি আদম সন্তানের জীবিকা। আরও বলা হয়েছে: 'কদব' এবং 'আব' উভয়ই চতুষ্পদ জন্তুর জন্য এবং অবশিষ্ট ছয়টি আদম সন্তানের জন্য, আর সপ্তমটি জন্তুদের জন্য যেহেতু এটি আদম সন্তানের প্রধান জীবিকার অন্তর্ভুক্ত। [সূরা আল-মুমিনুন (২৩): আয়াত ১৫ থেকে ১৬]অতঃপর এরপর অবশ্যই তোমরা মৃত্যুবরণ করবে (১৫)। এরপর কিয়ামতের দিন অবশ্যই তোমাদেরকে পুনরুত্থিত করা হবে (১৬)।মহান আল্লাহর বাণী: (অতঃপর এরপর অবশ্যই তোমরা মৃত্যুবরণ করবে) অর্থাৎ সৃষ্টি এবং জীবনের পর।
আল-নাহহাস বলেন: এই অর্থে 'লামায়িতুন' (অবশ্যই তোমরা মরণশীল) শব্দটিও ব্যবহৃত হয়। এরপর মৃত্যুর পর পুনরুত্থান সম্পর্কে সংবাদ দিয়ে তিনি বলেন: (এরপর কিয়ামতের দিন অবশ্যই তোমাদেরকে পুনরুত্থিত করা হবে)। [সূরা আল-মুমিনুন (২৩): আয়াত ১৭]এবং আমি তোমাদের উপরে সাতটি পথ সৃষ্টি করেছি এবং আমি সৃষ্টি সম্পর্কে অসতর্ক নই (১৭)।মহান আল্লাহর বাণী: (এবং আমি তোমাদের উপরে সাতটি পথ সৃষ্টি করেছি) আবু উবায়দাহ বলেন: অর্থাৎ সাতটি আকাশ। তাঁর থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি বলেন: 'তারাকতুশ শায়' এর অর্থ হলো আমি একটার ওপর অন্যটা রাখলাম। আকাশমন্ডলীকে 'তারাইক' (পথসমূহ বা স্তরসমূহ) বলা হয়েছে কারণ তারা একে অপরের ওপরে অবস্থিত।
আর আরবরা একটার ওপর অবস্থিত অন্য প্রতিটি বস্তুকে 'তারিকাহ' নামে অভিহিত করে। আবার বলা হয়েছে: কারণ সেগুলো ফেরেশতাদের চলাচলের পথ। (এবং আমি সৃষ্টি সম্পর্কে অসতর্ক নই) কোনো কোনো আলিম বলেন: অর্থাৎ আসমান সৃষ্টি সম্পর্কে। অধিকাংশ মুফাসসির বলেন: অর্থাৎ সমগ্র সৃষ্টিজগত সম্পর্কে, যাতে আসমান তাদের ওপর পড়ে তাদের ধ্বংস না করে দেয়। আমি (গ্রন্থকার) বলি: এর অর্থ এটাও হতে পারে যে—'এবং আমি সৃষ্টি সম্পর্কে অসতর্ক নই'—অর্থাৎ তাদের কল্যাণ সাধন এবং তাদের সংরক্ষণের বিষয়ে; আর এটিই 'আল-হাইয়ুল কাইয়ুম' (চিরঞ্জীব ও বিশ্বচরাচরের ধারক) এর অর্থ, যা পূর্বে আলোচিত হয়েছে।(১).
আদ-দুররুল মানসুর-এ রয়েছে: "তোমরা কি এই কিশোরের মতো কথা বলতে অক্ষম হয়ে পড়লে?" [ ..... ](২). মূল পাণ্ডুলিপিতে এরূপই আছে, তবে প্রসঙ্গের দাবি অনুযায়ী বাক্যটি এরূপ হওয়া উচিত: ইবন আব্বাস তাঁর বাণী "আদম সন্তানকে সাতটি থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে" দ্বারা এই আয়াতটি উদ্দেশ্য করেছেন... ইত্যাদি।(৩). দেখুন ১৯তম খণ্ড, ২১৮ পৃষ্ঠা এবং পরবর্তী অংশ।(৪). এটি 'কাফ' পাণ্ডুলিপিতে রয়েছে, আর 'বা' এবং 'জীম' পাণ্ডুলিপিতে একবচনে রয়েছে।(৫). দেখুন ৩য় খণ্ড, ২৭১ পৃষ্ঠা।
