Al-Mu'minun
আল-মুমিনুন: 101
23 আল-মুমিনুন Al-Mu'minun · 118 আয়াত المؤمنون
মূল আরবি
فَإِذَا نُفِخَ فِى ٱلصُّورِ فَلَآ أَنسَابَ بَيْنَهُمْ يَوْمَئِذٍ وَلَا يَتَسَآءَلُونَ
English Translations
So when the Horn is blown, no relationship will there be among them that Day, nor will they ask about one another.
Then, when the Trumpet is blown, there will be no kinship among them that Day, nor will they ask of one another.
Thereafter, when the Sūr (the trumpet) is blown, no ties of kinship will remain between them any more, nor will they inquire about one another.
And then no sooner the Trumpet is blown than there will remain no kinship among them that Day, nor will they ask one another.
And when the trumpet is blown there will be no kinship among them that day, nor will they ask of one another.
Then when the Trumpet is blown, there will be no more relationships between them that Day, nor will one ask after another!
বাংলা অনুবাদ
অতঃপর যখন শিঙ্গায় ফুঁ দেয়া হবে সেদিন তাদের পরস্পরের মাঝে আত্মীয় বন্ধন থাকবে না। একে অপরের কাছে জিজ্ঞেসও করবে না।
অতঃপর যেদিন শিঙ্গায় ফুঁক দেয়া হবে সেদিন তাদের মাঝে কোন আত্মীয়তার বন্ধন থাকবে না, কেউ কারো বিষয়ে জানতে চাইবে না।
অতঃপর যে দিন শিঙ্গায় ফুৎকার দেয়া হবে সেদিন পরস্পরের মধ্যে আত্মীয়তার বন্ধন থাকবেনা, এবং একে অপরের খোঁজ খবর নিবেনা।
অতঃপর যেদিন শিঙ্গায় ফুঁক দেয়া হবে সেদিন পরস্পরের মধ্যে আত্মীয়তার বন্ধন থাকবে না এবং একে অন্যের খোঁজ-খবর নেবে না,
এবং যেদিন শিঙ্গায় ফুঁৎকার দেয়া হবে সেদিন পরস্পরের মধ্যে আত্মীয়তার বন্ধন থাকবে না, এবং একে অপরের খোঁজ-খবর নিবে না,
১০১. শিঙ্গায় ফুৎকারে দায়িত্বরত ফিরিশতা যখন কিয়ামতের ঘোষণা সংক্রান্ত দ্বিতীয় ফুৎকার দিবে তখন তারা পরকালের ভয়াবহ অবস্থায় ব্যস্ত থাকার দরুন নিজেদের মধ্যকার বংশ পরিচিতি নিয়ে একে অপরের সাথে গর্ব করবে না এবং নিজেদের বিষয়সমূহ নিয়ে ব্যস্ত থাকার দরুন একে অপরকে কিছু জিজ্ঞাসাও করবে না।
তাফসীর
১০১-১০৪ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা খবর দিচ্ছেন যে, যখন পুনরুত্থানের জন্যে শিংগায় ফুৎকার দেয়া হবে এবং মানুষ জীবিত হয়ে কবর হতে বেরিয়ে পড়বে তখন আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যাবে এবং একে অপরের কোন খোঁজ খবর নিবে না। না পিতার সন্তানের উপর কোন ভালবাসা থাকবে, না সন্তান পিতার দুঃখে দুঃখিত হবে। অন্য জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “সুহৃদ সুহৃদের তত্ত্ব নিবে না, তাদের এককে অপরের দৃষ্টি গোচর করা হবে।” (৭০-১০-১১) আর এক জায়গায় আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “সেই দিন মানুষ পলায়ন করবে তার ভ্রাতা হতে, তার মাতা, তার পিতা, তার পত্নী ও তার সন্তান হতে।” (৮০:৩৪-৩৬)হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা কিয়ামতের দিন পূর্ববর্তী ও পরবর্তী লোকদেরকে একত্রিত করবেন।
অতঃপর একজন ঘোষণাকারী ঘোষণা করবেনঃ “যার কোন হক অন্যের উপর রয়েছে সে যেন এসে তার হক তার নিকট থেকে নিয়ে যায়।” এ কথা শুনে কারো হক তার পিতার উপর থাকলে বা পুত্রের উপর থাকলে অথবা স্ত্রীর উপর থাকলে সেও আনন্দিত হয়ে দৌড়িয়ে আসবে এবং নিজের হক বা প্রাপ্যের জন্যে তার কাছে তাগাদা শুরু করে দেবে। যেমন এই আয়াতে রয়েছে। (এটা ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)মিসওয়ার ইবনে মাখরামা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ফাতেমা (রাঃ) আমার দেহের একটা অংশ। যে তাকে কষ্ট দেয় সে আমাকেও কষ্ট দেয়। আর যে তাকে খুশী করে সে আমাকেও খুশী করে।
কিয়ামতের দিন সমস্ত আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যাবে, কিন্তু আমার আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন হবে না।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এই হাদীসের মূল সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমেও রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ফাতেমা (রাঃ) আমার দেহের একটা অংশ। তাকে অসন্তুষ্টকারী ও কষ্টদানকারী আমাকেও অসন্তুষ্টকারী ও কষ্টদানকারী।”হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে মিম্বরের উপর বলতে শুনেছেনঃ “লোকদের কি হয়েছে যে, তারা বলে-রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আত্মীয়তার সম্পর্কও তাঁর কওমের কোন উপকারে আসবে না?
আল্লাহর শপথ! আমার আত্মীয়তার সম্পর্ক দুনিয়া ও আখিরাতে মিলিতভাবে রয়েছে। হে লোক সকল! আমি তোমাদের আসবাব পত্রের রক্ষক হবো যখন তোমরা আসবে।” একটি লোক বলবেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি অমুকের পুত্র অমুক।” আমি উত্তরে বলবোঃ “হ্যা, আমি বংশ চিনে নিয়েছি। কিন্তু আমার পরে তুমি বিদআতের আবিষ্কার করেছিলে এবং উল্টো পদে ফিরে গিয়েছিলে।” (এ হাদীসটিও মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে)আমীরুল মুমিনীন হযরত উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ)-এর মুসনাদে কয়েকটি সনদের মাধ্যমে আমরা বর্ণনা করেছি যে, যখন তিনি হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রাঃ)-এর কন্যা উম্মে কুলসুম (রাঃ)-কে বিয়ে করেন তখন তিনি বলতেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছিঃ “কিয়ামতের দিন সমস্ত মূল ও বংশের সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যাবে, কিন্তু আমার বংশ ও মূলের সম্পর্ক ছিন্ন হবে না।” এটাও বর্ণিত আছে যে, হযরত উমার (রাঃ) হযরত উম্মে কুলসুম (রাঃ)-এর মর্যাদার প্রতি লক্ষ্য রেখে তাঁর মোহরর ধার্য করেছিলেন চল্লিশ হাজার (দিরহাম)।হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন আমার বংশগত ও বৈবাহিক সম্পর্ক ছাড়া সমস্ত বংশগত ও বৈবাহিক সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যাবে।” (এ হাদীসটি হাফিয ইবনে আসাকির (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমি আমার প্রতিপালক মহামহিমান্বিত আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করেছি যে, যেখানে আমার বিয়ে হয়েছে এবং যার সাথে আমি বৈবাহিক সূত্রে আবদ্ধ হয়েছি তারা সবাই যেন জান্নাতে আমার সঙ্গ লাভ করে।
আল্লাহ তা'আলা আমার এ দু'আ কবুল করেছেন।”মহান আল্লাহ বলেনঃ যাদের পাল্লা ভারী হবে তারাই হবে সফলকাম। যার একটি মাত্র পুণ্য পাপের উপর বেশী হবে সেই পরিত্রাণ পেয়ে যাবে। সে জাহান্নাম থেকে রক্ষা পাবে এবং জান্নাতে প্রবেশ লাভ করবে। তার উদ্দেশ্য সফল হবে এবং যা থেকে সে ভয় করতো তা থেকে সে বেঁচে যাবে। পক্ষান্তরে, যাদের পাল্লা হালকা হবে, অর্থাৎ পুণ্যের চেয়ে পাপ বেশী হয়ে যাবে তারা হবে চরমভাবে ক্ষগ্রিস্ত।হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, কিয়ামতের দিন একজন ফেরেশতা দাঁড়িপাল্লার উপর নিযুক্ত থাকবেন যিনি প্রত্যেক মানুষকে দাড়ি-পাল্লার দুই পাল্লার মাঝে দাঁড় করিয়ে দিবেন।
অতঃপর পাপ ও পুণ্য ওজন করা হবে। যদি পুণ্য বেশী হয়ে যায় তবে তিনি উচ্চ স্বরে ঘোষণা করবেনঃ “অমুকের পুত্র অমুক মুক্তি পেয়ে গেছে। এরপর ক্ষতি ও ধ্বংস তার কাছেও যাবে না। আর যদি পাপ বেশী হয়ে যায় তবে সবারই সামনে তিনি উচ্চ স্বরে ঘোষণা করবেনঃ “অমুকের পুত্র অমুক ধ্বংস হয়ে গেছে। এখন সে কল্যাণ লাভে বঞ্চিত হয়েছে।” (এটা হাফিয আবু বকর আল বাযযার (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এর সনদ দুর্বল। বর্ণনাকারী দাউদ ইবনে হাজর দুর্বল ও বর্জনীয়)মহান আল্লাহর উক্তিঃ তারা জাহান্নামে স্থায়ী হবে। অর্থাৎ তারা চিরদিনই জাহান্নামে থাকবে। কখনো তাদেরকে তা থেকে বের করা হবে না।
অগ্নি তাদের মুখমণ্ডল দগ্ধ করবে। আগুনকে সরিয়ে ফেলার ক্ষমতা তাদের হবে না।হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “প্রথম অগ্নিশিখা তাদেরকে জড়িয়ে ধরামাত্রই তাদের গোশ্ত অস্থি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে এবং তাদের পায়ের উপর পড়ে যাবে। (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিমে বর্ণিত হয়েছে) ফলে তাদের চেহারা বীভৎস ও বিকৃত হয়ে যাবে। দাঁত বের হয়ে থাকবে, ওষ্ঠ উপরের দিকে উঠে যাবে এবং অধর নীচের দিকে নেমে থাকবে। উপরের ঠোট তালু পর্যন্ত উঠে যাবে এবং নীচের ঠোট নাভী পর্যন্ত নেমে আসবে।” (এটা মুসনাদে আহমাদে হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে মারফু’রূপে বর্ণিত আছে)
অতঃপর যেদিন শিঙ্গায় ফুঁক দেয়া হবে [১] সেদিন পরস্পরের মধ্যে আত্মীয়তার বন্ধন থাকবে না [২] এবং একে অন্যের খোঁজ-খবর নেবে না [৩],
[১] দু’বার শিংগায় ফুঁৎকার দেয়া হবে। প্রথম ফুঁৎকারের ফলে যমীন-আসমান এতদুভয়ের মধ্যবর্তী সব ধ্বংস হয়ে যাবে এবং দ্বিতীয় ফুঁৎকারের ফলে পুনরায় সব মৃত জীবিত হয়ে উত্থিত হবে। কুরআনের
ثُمَّ نُفِخَ فِيْهِ اُخْرٰى فِاِذِاهُمْ قِيَامٌ يَّنْظُرُوْنَ
আয়াতে একথার স্পষ্ট বর্ণনা রয়েছে। তবে আলোচ্য আয়াতে শিংগায় প্রথম ফুঁৎকার বোঝানো হয়েছে, না দ্বিতীয় ফুঁৎকার-এ বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। যদিও দ্বিতীয় ফুঁৎকার বুঝানোই অধিক সঠিক মত বলে মনে হয়। [দেখুন, ইবন কাসীর]
[২] এর অর্থ হচ্ছে, সে সময় বাপ ছেলের কোন কাজে লাগবে না এবং ছেলে বাপের কোন কাজে লাগবে না। প্ৰত্যেকে এমনভাবে নিজের অবস্থার শিকার হবে যে, একজন অন্যজনের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করা তো দূরের কথা কারোর কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করার মতো চেতনাও থাকবে না। অন্যান্য স্থানে এ বিষয়টিকে এভাবে বর্ণনা করা হয়েছেঃ “কোন অন্তরংগ বন্ধু নিজের বন্ধুকে জিজ্ঞেস করবে না।” [সূরা আল-মা‘আরিজঃ ১০] আরও বলা হয়েছে, “সেদিন অপরাধীর মন তার নিজের সন্তান, স্ত্রী, ভাই ও নিজের সহায়তাকারী নিকটতম আত্মীয় এবং সারা দুনিয়ার সমস্ত মানুষকে ক্ষতিপূরণ বাবদ দিতে এবং নিজেকে আযাব থেকে মুক্ত করতে চাইবে।” [সূরা আল-মা'আরিজঃ ১১-১৪]।
অন্যত্র বলা হয়েছে, “সেদিন মানুষ নিজের ভাই, মা, বাপ ও স্ত্রী ও ছেলেমেয়েদের থেকে পালাতে থাকবে। সেদিন প্ৰত্যেক ব্যক্তি নিজের অবস্থার মধ্যে এমনভাবে লিপ্ত থাকবে যে, তার কারোর কথা মনে থাকবে না।” [সূরা আবাসাঃ ৩৪-৩৭]
[৩] অর্থাৎ পরস্পর কেউ কারও সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করবে না। অন্য এক আয়াতে বলা হয়েছে
وَأَقْبَلَ بَعْضُهُمْ عَلَىٰ بَعْضٍ يَتَسَاءَلُونَ
“আর তারা একে অপরকে প্রশ্ন করতে এগিয়ে যাবে”। [সূরা আস-সাফফাতঃ ২৭] অর্থাৎ হাশরের ময়দানে একে অপরকে জিজ্ঞাসাবাদ করবে। এই আয়াত সম্পর্কে ইবনে আব্বাস রাদিয়ালাহু আনহু বলেনঃ হাশরে বিভিন্ন অবস্থানস্থল হবে এবং প্রত্যেক অবস্থানস্থলের অবস্থা বিভিন্নরূপ হবে। এমনও সময় আসবে, যখন কেউ কাউকে জিজ্ঞেস করবে না। এরপর কোন অবস্থানকালে ভয়ভীতি ও আতঙ্ক হ্রাস পেলে একে অপরের অবস্থা জিজ্ঞেস করবে। [দেখুন, বাগভী; ফাতহুল কাদীর]
[সূরা আল-মুমিনুন (২৩): আয়াত ১০১] পূর্ণ পৃষ্ঠা
[সূরা আল-মুমিনুন (২৩): আয়াত ১০১]অতঃপর যখন শিঙায় ফুঁৎকার দেওয়া হবে, সেদিন তাদের মধ্যে পারস্পরিক কোনো আত্মীয়তার সম্পর্ক থাকবে না এবং তারা একে অপরের খোঁজখবর নেবে না (১০১)।মহান আল্লাহর বাণী: (অতঃপর যখন শিঙায় ফুঁৎকার দেওয়া হবে) এই ফুঁৎকার দ্বারা দ্বিতীয় ফুঁৎকার উদ্দেশ্য। (সেদিন তাদের মধ্যে পারস্পরিক কোনো আত্মীয়তার সম্পর্ক থাকবে না এবং তারা একে অপরের খোঁজখবর নেবে না) ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন: তারা আখিরাতে বংশমর্যাদা নিয়ে অহংকার করবে না যেমনটি তারা দুনিয়াতে করত। সেখানে তারা একে অপরকে দুনিয়ার মতো জিজ্ঞেস করবে না যে, তুমি কোন গোত্রের বা কোন বংশের?
এবং ভয়াবহ আতঙ্কের কারণে তারা একে অপরকে চিনতেও চাইবে না। ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে আরও বর্ণিত আছে যে, এটি প্রথম ফুঁৎকারের সময় ঘটবে, যখন আসমান ও জমিনে যারা আছে তারা সবাই বেহুঁশ হয়ে পড়বে—আল্লাহ যাদের ইচ্ছা করেন তারা ছাড়া; তখন তাদের মধ্যে কোনো আত্মীয়তা থাকবে না এবং তারা একে অপরকে জিজ্ঞাসাবাদও করবে না। এরপর যখন দ্বিতীয়বার ফুঁৎকার দেওয়া হবে, তখন তারা দাঁড়িয়ে তাকাতে থাকবে এবং একে অপরের দিকে এগিয়ে এসে জিজ্ঞাসাবাদ করবে। এক ব্যক্তি ইবনে আব্বাস (রা.)-কে এই আয়াত এবং মহান আল্লাহর বাণী: "তারা একে অপরের দিকে এগিয়ে এসে জিজ্ঞাসাবাদ করবে" [আস-সাফফাত: ৫০] সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন।
তিনি বললেন: প্রথম ফুঁৎকারের সময় তারা একে অপরকে জিজ্ঞাসাবাদ করবে না, কারণ তখন পৃথিবীতে কেউ জীবিত থাকবে না, ফলে কোনো বংশমর্যাদাও থাকবে না এবং জিজ্ঞাসাবাদের অবকাশও থাকবে না। আর তাঁর বাণী "তারা একে অপরের দিকে এগিয়ে এসে জিজ্ঞাসাবাদ করবে" এর অর্থ হলো—তারা যখন জান্নাতে প্রবেশ করবে তখন একে অপরকে জিজ্ঞাসা করবে। ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন: এই আয়াতে মূলত দ্বিতীয় ফুঁৎকার বোঝানো হয়েছে। আবু উমর জাযান বলেন: আমি ইবনে মাসউদ (রা.)-এর নিকট প্রবেশ করলাম এবং দেখলাম পুণ্যবান ও সৌভাগ্যবান ব্যক্তিরা আমার আগেই তাঁর কাছে পৌঁছে গেছেন। তখন আমি উচ্চস্বরে ডাক দিয়ে বললাম: হে আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ!
আমি কি একজন অনারব ব্যক্তি বলে আপনি এদের কাছে টেনে নিলেন আর আমাকে দূরে সরিয়ে দিলেন? তিনি বললেন: কাছে এসো। আমি কাছে গেলাম, এমনকি আমার ও তাঁর মাঝে আর কেউ বসা ছিল না। তখন আমি তাঁকে বলতে শুনলাম: কিয়ামতের দিন কোনো দাস বা দাসীর হাত ধরা হবে এবং তাকে পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকল মানুষের সামনে দাঁড় করানো হবে। এরপর একজন ঘোষণাকারী ঘোষণা করবে: "এ হলো অমুকের পুত্র অমুক, যার কোনো প্রাপ্য অধিকার পাওনা আছে সে যেন তার হকের জন্য চলে আসে।" তখন কোনো নারী আনন্দিত হবে যে সে তার পিতা, স্বামী, ভাই বা পুত্রের ওপর কোনো পাওনা বা অধিকার ফিরে পেয়েছে।
এরপর ইবনে মাসউদ পাঠ করলেন: "সেদিন তাদের মধ্যে পারস্পরিক কোনো আত্মীয়তার সম্পর্ক থাকবে না এবং তারা একে অপরের খোঁজখবর নেবে না।" তখন মহান প্রভু বলবেন, (এদের প্রাপ্য অধিকারগুলো দিয়ে দাও)। তখন সে বলবে: হে আমার রব! দুনিয়া তো শেষ হয়ে গেছে, আমি এখন কোত্থেকে তাদের পাওনা দেব? তখন প্রভু ফেরেশতাদের বলবেন: (তার নেক আমল থেকে নিয়ে নাও এবং প্রত্যেক মানুষকে তার পাওনা অনুযায়ী দিয়ে দাও)। যদি সে আল্লাহর ওলি হয় এবং তার নেক আমল থেকে একটি সরিষার দানা পরিমাণও অবশিষ্ট থাকে, তবে আল্লাহ তাআলা তা বহুগুণ বাড়িয়ে দেবেন এবং তার মাধ্যমে তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।
এরপর ইবনে মাসউদ পাঠ করলেন:(১). দেখুন: খণ্ড ১৫, পৃষ্ঠা ৮১।
একজন ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করলেন: মুহাজিরদের জন্য কী রয়েছে? তিনি বললেন: নিশ্চয়ই আল্লাহ অণু পরিমাণও জুলুম করেন না এবং যদি তা কোনো নেক আমল হয়, তবে তিনি তাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেন এবং নিজের পক্ষ থেকে মহান প্রতিদান দান করেন
। আর আল্লাহ যখন কোনো কিছুকে 'মহান' বলেন, তবে তা অবশ্যই মহান।আবদ ইবনে হুমাইদ এবং ইবনে জারির কাতাদাহ (রহ.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি এই আয়াতটি তিলাওয়াত করলেন এবং বললেন: আমার নেক আমলগুলো যদি আমার গুনাহের ওপর অণু পরিমাণও প্রাধান্য পায়, তবে তা আমার কাছে দুনিয়া ও এর মধ্যবর্তী সবকিছুর চেয়ে অধিক প্রিয়।তায়ালিসি, আহমাদ, মুসলিম এবং ইবনে জারির আনাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো মুমিনের একটি নেক আমলের প্রতিও অবিচার করেন না; দুনিয়াতে এর কারণে তাকে রিযিক দান করা হয় এবং আখিরাতেও এর প্রতিদান দেওয়া হবে।
আর কাফিরের ক্ষেত্রে সে যা ভালো কাজ করে, তার বিনিময়ে তাকে দুনিয়াতেই আহার্য দান করা হয়; ফলে যখন কিয়ামত দিবস উপস্থিত হবে, তখন তার জন্য কোনো নেক আমল অবশিষ্ট থাকবে না।আবদুর রাজ্জাক, আবদ ইবনে হুমাইদ, ইবনে মাজাহ, ইবনে জারির এবং ইবনে আবি হাতিম আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, নবী কারীম (সা.) বলেছেন: যার অন্তরে অণু পরিমাণ ঈমান থাকবে, তাকে জাহান্নাম থেকে বের করা হবে।আবু সাঈদ (রা.) বলেন: যার সন্দেহ হয় সে যেন এই আয়াতটি পাঠ করে: নিশ্চয়ই আল্লাহ অণু পরিমাণও জুলুম করেন না
।আবদ ইবনে হুমাইদ, ইবনে জারির এবং ইবনে আবি হাতিম ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: কিয়ামতের দিন বান্দাকে উপস্থিত করা হবে এবং পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকলের সামনে একজন ঘোষণাকারী উচ্চস্বরে ঘোষণা করবে: 'এটি অমুকের পুত্র অমুক, যার কোনো পাওনা আছে সে যেন তার হক নিতে আসে'।আল্লাহর কসম, তখন মানুষ আনন্দিত হবে যদি তার কোনো অধিকার তার পিতা, সন্তান অথবা স্ত্রীর কাছে পাওনা থাকে, তবে সে তা তাদের কাছ থেকে গ্রহণ করবে—যদিও তা সামান্য হয়।
আর আল্লাহর কিতাবে এর সত্যতা প্রমাণিত: (অতঃপর যখন শিংঙ্গায় ফুৎকার দেওয়া হবে, তখন তাদের মধ্যে আর কোনো আত্মীয়তার বন্ধন থাকবে না এবং তারা একে অপরের খবরও নেবে না) (সূরা মুমিনুন, আয়াত: ১০১)। এরপর তাকে বলা হবে: 'এদের পাওনা পরিশোধ করো'। সে বলবে: 'হে প্রতিপালক, আমি কোত্থেকে দেব? দুনিয়া তো শেষ হয়ে গেছে'। তখন আল্লাহ ফেরেশতাদের বলবেন: 'তার নেক আমলগুলো দেখো এবং সেখান থেকে তাদের পাওনা দিয়ে দাও'।যদি অণু পরিমাণ নেক আমলও অবশিষ্ট থাকে, তবে ফেরেশতারা বলবেন: 'হে আমাদের প্রতিপালক, আমরা প্রত্যেক পাওনাদারকে তাদের পাওনা দিয়ে দিয়েছি, আর এখন তার জন্য কেবল অণু পরিমাণ নেক আমল বাকি আছে'।তখন আল্লাহ ফেরেশতাদের বলবেন: 'আমার বান্দার জন্য এটি বহুগুণ বাড়িয়ে দাও এবং আমার দয়ার বদৌলতে তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাও'।
আর আল্লাহর কিতাবে এর সত্যতা প্রমাণিত: নিশ্চয়ই আল্লাহ অণু পরিমাণও জুলুম করেন না এবং যদি তা কোনো নেক আমল হয়, তবে তিনি তাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেন এবং নিজের পক্ষ থেকে মহান প্রতিদান দান করেন
অর্থাৎ তিনি তাকে জান্নাত দান করেন।আর যদি তার নেক আমল শেষ হয়ে যায় কিন্তু গুনাহ বাকি থাকে, তবে ফেরেশতারা বলবেন: 'হে আমাদের ইলাহ, তার নেক আমল শেষ হয়ে গেছে কিন্তু এখনও অনেক পাওনাদার বাকি আছে'।তখন আল্লাহ বলবেন: 'তাদের গুনাহের বোঝা তার ওপর চাপিয়ে দাও এবং তার জন্য জাহান্নামের ফয়সালা লিখে দাও'।ইবনে আবি হাতিম সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রহ.) থেকে বর্ণনা করেছেন যদি তা কোনো নেক আমল হয়
অর্থাৎ যদি গুনাহের চেয়ে অণু পরিমাণও বেশি হয়, তবে তিনি তাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেন
।
আর মুশরিকের ক্ষেত্রে এর দ্বারা তার আযাবকে লাঘব করা হয়, কিন্তু সে কখনও জাহান্নাম থেকে বের হতে পারবে না।
মতভেদতিনি বললেন: সে বিষয়ে তোমার কাছে যা যা পরস্পরবিরোধী মনে হয়েছে, তা পেশ করো।তিনি বললেন: আমি আল্লাহকে বলতে শুনেছি, (অতঃপর তাদের পরীক্ষার পরিণাম এছাড়া আর কিছু হবে না যে, তারা বলবে: ‘আমাদের রব আল্লাহর শপথ! আমরা মুশরিক ছিলাম না’) (সূরা আল-আন’আম, আয়াত ২৩)। আবার তিনি বলেছেন, এবং তারা আল্লাহর কাছে কোনো কথা গোপন করতে পারবে না
অথচ তারা তো গোপন করল। আবার আমি তাকে বলতে শুনেছি, (সেদিন তাদের মধ্যে কোনো বংশীয় সম্পর্ক থাকবে না এবং তারা একে অপরের খোঁজ নেবে না) (সূরা আল-মুমিনুন, আয়াত ১০১)। পুনরায় তিনি বলেছেন, (এবং তারা একে অপরের মুখোমুখি হয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করবে) (সূরা আস-সাফফাত, আয়াত ২৭)।
তিনি আরও বলেছেন, (তোমরা কি সেই সত্তাকেই অস্বীকার করছ, যিনি পৃথিবীকে দুই দিনে সৃষ্টি করেছেন) (সূরা ফুসসিলাত, আয়াত ৯) ‘অনুগত হয়ে এলাম’ বাক্যটি পর্যন্ত। এই আয়াতে তিনি আসমান সৃষ্টির আগে জমিন সৃষ্টির কথা উল্লেখ করেছেন। আবার অন্য আয়াতে বলেছেন, (আকাশ, যা তিনি নির্মাণ করেছেন) (সূরা আন-নাজিআত, আয়াত ২৭)। তারপর বলেছেন, (আর এর পরে পৃথিবীকে তিনি বিস্তৃত করেছেন) (সূরা আন-নাজিআত, আয়াত ৩০)। ফলে এই আয়াতে তিনি জমিন সৃষ্টির আগে আসমান সৃষ্টির কথা উল্লেখ করেছেন। আর আমি তাকে বলতে শুনি, (আল্লাহ ছিলেন মহাপরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়), (আল্লাহ ছিলেন পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু), (আল্লাহ ছিলেন সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা); যেন এগুলো আগে ছিল কিন্তু এখন সেই অবস্থা অতিক্রান্ত হয়েছে।অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, (আল্লাহ ছিলেন)—এই বাক্যের তাৎপর্য কী?ইবনে আব্বাস (রাযি.) বললেন: তাঁর বাণী—(অতঃপর তাদের পরীক্ষার পরিণাম এছাড়া আর কিছু হবে না যে, তারা বলবে: ‘আমাদের রব আল্লাহর শপথ!
আমরা মুশরিক ছিলাম না’) (সূরা আল-আন’আম, আয়াত ২৩)—এর ব্যাখ্যা হলো, কিয়ামতের দিন যখন তারা দেখবে যে আল্লাহ ইসলাম অনুসারীদের ক্ষমা করছেন এবং পাপসমূহ মোচন করছেন কিন্তু শিরক ক্ষমা করছেন না, আর কোনো পাপ ক্ষমা করা তাঁর জন্য অসম্ভব নয়, তখন মুশরিকরা ক্ষমার আশায় তাদের শিরকের কথা অস্বীকার করবে এবং বলবে: ‘আমাদের রব আল্লাহর শপথ! আমরা মুশরিক ছিলাম না।’ তখন আল্লাহ তাদের মুখে মোহর মেরে দেবেন এবং তাদের হাত ও পা তারা যা করত সে বিষয়ে সাক্ষ্য দেবে। সেই মুহূর্তেই কাফেররা কামনা করবে যে যদি মাটি তাদের সাথে মিশে সমতল হয়ে যেত, আর তারা আল্লাহর কাছে কোনো কথা গোপন করতে পারবে না।আর তাঁর বাণী—(সেদিন তাদের মধ্যে কোনো বংশীয় সম্পর্ক থাকবে না এবং তারা একে অপরের খোঁজ নেবে না) (সূরা আল-মুমিনুন, আয়াত ১০১)—এটি প্রথম শিঙায় ফুৎকারের সময়কার অবস্থা, (আর যখন শিঙায় ফুৎকার দেওয়া হবে, তখন আসমান ও জমিনে যারা আছে সবাই সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়বে, তবে আল্লাহ যাকে ইচ্ছা করেন সে ব্যতীত) (সূরা আয-যুমার, আয়াত ৬৮)।
সেই সময় তাদের মধ্যে কোনো বংশীয় সম্পর্ক থাকবে না এবং তারা একে অপরের খোঁজ নেবে না। (অতঃপর যখন পুনরায় ফুৎকার দেওয়া হবে, তখনই তারা দাঁড়িয়ে তাকাতে থাকবে) (সূরা আয-যুমার, আয়াত ৬৮) এবং তখন (তারা একে অপরের মুখোমুখি হয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করবে) (সূরা আস-সাফফাত, আয়াত ২৭)।আর তাঁর বাণী—(পৃথিবীকে দুই দিনে সৃষ্টি করেছেন) (সূরা ফুসসিলাত, আয়াত ৯)—এর বিষয় হলো, পৃথিবী আসমানের পূর্বেই সৃষ্টি করা হয়েছে।
