Ali 'Imran
আলে ইমরান: 102
3 আলে ইমরান Ali 'Imran · 200 আয়াত آل عمران
মূল আরবি
يَـٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ ٱتَّقُوا۟ ٱللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِۦ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ
English Translations
O you who have believed, fear Allāh as He should be feared and do not die except as Muslims [in submission to Him].
O you who believe! Fear Allah (by doing all that He has ordered and by abstaining from all that He has forbidden) as He should be feared. [Obey Him, be thankful to Him, and remember Him always], and die not except in a state of Islam (as Muslims) with complete submission to Allah.
O you who believe, fear Allah, as He should be feared, and let not yourself die save as Muslims.
Believers! Fear Allah as He should be feared, and see that you do not die save in the state of submission to Allah.
O ye who believe! Observe your duty to Allah with right observance, and die not save as those who have surrendered (unto Him)
O ye who believe! Fear Allah as He should be feared, and die not except in a state of Islam.
বাংলা অনুবাদ
হে মু’মিনগণ! আল্লাহকে ভয় কর যেমনভাবে তাঁকে ভয় করা উচিত। তোমরা মুসলিম না হয়ে কক্ষনো মরো না।
হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা মুসলমান হওয়া ছাড়া মারা যেও না।
হে বিশ্বাস স্থাপনকারীগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর যেমনভাবে করা উচিৎ এবং তোমরা মুসলিম না হয়ে মৃত্যু বরণ করনা।
হে মুমিনগণ! তোমরা যথার্থভাবে আল্লাহ্র তাকওয়া অবলম্বন কর এবং তোমরা মুসলিম (পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণকারী) না হয়ে কোনো অবস্থায় মৃত্যুবরণ করো না
হে ঈমানদারগণ! তোমরা যথাযথভাবে আল্লাহকে ভয় কর এবং তোমরা মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ কর না।
১০২. হে আল্লাহতে বিশ্বাসী এবং তাঁর রাসূলের অনুসারী মু’মিনরা! তোমরা নিজেদের প্রভুকে সত্যিকারার্থে ভয় করো। আর তা হবে তাঁর আদেশ-নিষেধ মানা ও তাঁর নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা আদায়ের মাধ্যমে। তেমনিভাবে তোমরা মৃত্যু পর্যন্ত নিজেদের ধর্মকে অবিচলভাবে আঁকড়ে ধরো।
তাফসীর
১০২-১০৩ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলাকে পূর্ণরূপে ভয় করার অর্থ এই যে, তাঁর আনুগত্য স্বীকার করতে হবে, অবাধ্য হওয়া যাবে না, তাকে সদা স্মরণ করতে হবে, কোন সময়েই তাকে ভুলে যাওয়া চলবে না। তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে হবে, কৃতঘ্ন হতে পারবে না। কোন কোন বর্ণনায় এ তাফসীর মারুফু' রূপেও বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু এর মাওকুফ হওয়াই সঠিক কথা। অর্থাৎ এটা হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর উক্তি। হযরত আনাস (রাঃ)-এর ঘোষণা এই যে, মানুষ আল্লাহ তাআলাকে ভয় করার দাবী পূরণ করতে পারে না যে পর্যন্ত না সে স্বীয় জিহ্বাকে সংযত করে। অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে এ আয়াতটি (আরবী) (৬৪:১৬)-এ আয়াত দ্বারা রহিত হয়েছে।
এ দ্বিতীয় আয়াতে বলে দেয়া হয়েছে যে, মানুষ সাধ্যানুসারে আল্লাহ তা'আলাকে ভয় করতে থাকবে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি রহিত হয়ে যায়নি। বরং ভাবার্থ এই যে, মানুষ যেন আল্লাহর পথে জিহাদ করে, তার কার্যে যেন কোন ভৎসনাকারীর ভৎর্সনার প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করে, ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে, এমনকি নিজের উপরেও যেন ন্যায়ের নির্দেশ জারী করে। নিজের পিতা-মাতা ও ছেলে-মেয়ের ব্যাপারেও যেন ইনসাফ কায়েম করে।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তোমরা ইসলামের উপর মৃত্যুবরণ কর। অর্থাৎ সারা জীবন ইসলামের উপর সুপ্রতিষ্ঠিত থাক, যাতে মৃত্যুও তার উপরেই হয়।
ঐ মহান প্রভুর অভ্যাস এই যে, মানুষ স্বীয় জীবন যেভাবে চালিত করে ঐভাবেই তার মৃত্যু দিয়ে থাকেন। যার উপরে তার মৃত্যু সংঘটিত হবে ওর উপরেই কিয়ামতের দিন তাকে উথিত করবেন। আল্লাহ তা'আলা এরবিপরীত হতে আমাদেরকে আশ্রয় দান করুন, আমীন। মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, মানুষ বায়তুল্লাহ শরীফের তাওয়াফ করছিলেন এবং হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) তথায় উপস্থিত ছিলেন। তাঁর হাতে একখানা কাষ্ঠখণ্ড ছিল। তিনি বর্ণনা করছিলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ আয়াতটি পাঠ করতঃ বলেনঃ ‘যদি যাকুমের এক বিন্দুমাত্র দুনিয়ায় নিক্ষেপ করা হয় তবে দুনিয়াবাসীদের আহার্য নষ্ট হয়ে যাবে।
তারা কোন জিনিস খেতে ও পান করতে পারবে না। তাহলে কল্পনা কর যে, ঐ জাহান্নামীদের অবস্থা কি হতে পারে যাদের আহার্য হবে এ যাকুম। অন্য হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি জাহান্নাম হতে পৃথক থাকতে ও জান্নাতে যেতে চায় তার উচিত যে, যেন সে আমরণ আল্লাহ তাআলার উপর এবং পরকালের উপর বিশ্বাস রাখে ও লোকদের সাথে ঐ ব্যবহার করে যে ব্যবহার সে নিজের জন্য তাদের নিকট কামনা করে। (মুসনাদ-ই-আহমাদ) হযরত জাবের (রাঃ) বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মৃত্যুর তিন দিন পূর্বে তার মুখে শুনেছিঃ “দেখ, মৃত্যুর সময় আল্লাহর প্রতি ভাল ধারণা পোষণ করবে।
(সহীহ মুসলিম) রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আমার বান্দা আমার সম্পর্কে যেমন ধারণা করে, আমি তার ধারণার পার্শ্বেই রয়েছি। যদি আমার প্রতি তার ভাল ধারণা হয় তবে আমি তার মঙ্গল সাধন করবো। আর যদি আমার প্রতি তার মন্দ ধারণা হয় তবে তার নিকট ঐভাবেই হাযির হবো'। (মুসনাদ-ই-আহমাদ) এ হাদীসটির পূর্ব অংশ সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমেও রয়েছে। মুসনাদ-ই-বাযারে রয়েছে যে, এক রুগ্ন আনসারীকে দেখার জন্যে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর নিকট গমন করেন। সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করেনঃ ‘অবস্থা কিরূপ? তিনি বলেনঃ “আলহামদুলিল্লাহ, ভালই আছি। প্রভুর করুণার আশা করছি এবং তার শাস্তির ভয় করছি।
রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ “জেনে রেখো, এরূপ অবস্থায় যার অন্তরে ভয় ও আশা উভয়ই থাকে তাকে আল্লাহ তার আশার জিনিস প্রদান করেন এবং ভয়ের জিনিস হতে রক্ষা করেন। মুসনাদ-ইআহমাদের অন্য একটি হাদীসে রয়েছে যে, হযরত হাকীম ইবনে খারাম (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হাতে বায়আত গ্রহণ করতঃ বলেনঃ “আমি দাড়িয়ে দাঁড়িয়ে পতিত হয়ে যাবো। ইমাম নাসাঈ (রঃ) সুনানে নাসাঈর মধ্যে একথার ভাবার্থ বর্ণনা করতে গিয়ে একটি অধ্যায় করেছেনঃ ‘সিজদায় কিভাবে যাওয়া উচিত তারই অধ্যায়। তথায় বলা হয়েছে যে, সিজদায় ঐভাবে যাওয়া উচিত। আবার নিম্নের ভাবার্থও বর্ণনা করা হয়ছে- ‘আমি মুসলমান না হয়ে মরবো না।
এ ছাড়া নিম্নের আর একটি ভাবার্থও বর্ণনা করা হয়েছে- আমি জিহাদে শত্রুর দিকে পিঠ করে মৃত্যুবরণ করবো না।তারপর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তোমরা একতাবদ্ধ হয়ে থাক, বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে পড়ো না। (আরবী) শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে আল্লাহ তা'আলার অঙ্গীকার। কেউ কেউ বলেন যে, এর দ্বারা পবিত্র কুরআনকে বুঝানো হয়েছে। একটি মারফু হাদীসে রয়েছে যে, কুরআন কারীম আল্লাহ তা'আলার একটি দৃঢ় রঞ্জু এবং তাঁর সরল পথ। আর একটি বর্ণনায় রয়েছে- ‘আল্লাহর কিতাব তাঁর আকাশ হতে পৃথিবীর দিকে লটকানো রজু বিশেষ।' আরও একটি মারফু’ হাদীসে রয়েছে- ‘এ কুরআন মাজীদ আল্লাহ তা'আলার শক্ত রঞ্জু, এটা প্রকাশ্য দীপ্তি।
এটা সরাসরি আরোগ্য দানকারী এবং উপকারী। এর উপর আমলকারীর জন্যে এটা রক্ষাকবচ, এর অনুসারীদের জন্যে এটা মুক্তির উপায়। হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেনঃ “ঐ সব পথে তো শয়তানেরা চলে, তোমরা আল্লাহ তা'আলার পথে এসে যাও। তোমরা আল্লাহ পাকের রঞ্জুকে সুদৃঢ়ভাবে ধারণ কর। ঐ রঞ্জু হচ্ছে পবিত্র কুরআন। তোমরা মতভেদ সৃষ্টি করো না এবং পৃথক পৃথক হয়ে যেয়ো না। সহীহ মুসলিমে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ আল্লাহ তা'আলা তিনটি কাজে সন্তুষ্ট হন এবং তিনটি কাজে অসন্তুষ্ট হন। যে তিনটি কাজে তিনি সন্তুষ্ট হন তার একটি এই যে, তোমরা একমাত্র তাঁরই ইবাদত করবে এবং তার সাথে অন্য কাউকে অংশীদার করবে না।
দ্বিতীয় হচ্ছে এই যে, তোমরা একতাবদ্ধ হয়ে আল্লাহর রজ্জুকে শক্তভাবে ধারণ করবে এবং বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে না। তৃতীয় হচ্ছে এই যে, তোমরা মুসলমান বাদশাহদের সহায়তা করবে। আর যে তিনটি কাজ তাঁর অসন্তুষ্টির কারণ তার একটি হচ্ছে বাজে ও অনর্থক কথা বলা, দ্বিতীয়টি হচ্ছে অত্যধিক প্রশ্ন করা এবং তৃতীয়টি হচ্ছে সম্পদ ধ্বংস করা।' বহু হাদীস এমন রয়েছে যেগুলোর মধ্যে বর্ণিত হয়েছে যে, একতার সময় মানুষ ভুল ও অন্যায় হতে রক্ষা পায়। আবার বহু হাদীসে মতানৈক্য হতে ভয় প্রদর্শন করা হয়েছে কিন্তু এতদসত্ত্বেও উম্মতের মধ্যে মতভেদ ও অনৈক্যের সৃষ্টি হয়ে গেছে এবং তাদের মধ্যে ৭৩টি দল হয়ে গেছে, যাদের মধ্যে একটি দল মুক্তি পেয়ে জান্নাতে প্রবেশ লাভ করবে এবং জাহান্নামের আগুনের শাস্তি হতে রক্ষা পেয়ে যাবে।
এরা ঐসব যারা এমন জিনিসের উপর প্রতিষ্ঠিত রয়েছে যার উপর স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সঃ) ও তাঁর সাহাবীগণ ছিলেন। অতঃপর আল্লাহ তাআলা স্বীয় বান্দাদেরকে তাঁর নিয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। অজ্ঞতার যুগে। আউস ও খাযরাজ গোত্রদ্বয়ের মধ্যে বড়ই যুদ্ধ-বিগ্রহ ও কঠিন শত্রুতা ছিল। পরস্পরের মধ্যে যুদ্ধ প্রায় লেগেই থাকতো। অতঃপর যখন গোত্রদ্বয় ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয় তখন মহান আল্লাহর অনুগ্রহে তারা পূর্বের সব কিছু ভুলে গিয়ে সব এক হয়ে যায়। হিংসা বিদ্বেষ বিদায় নেয় এবং তারা পরস্পর ভাই ভাই হয়ে যায়। তারা পুণ্যের কাজে একে অপরের সহায়ক হয় এবং আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে তারা পরস্পর একতাবদ্ধ হয়ে যায়।
যেমন অন্য স্থানে রয়েছে। (আরবী) অর্থাৎ ‘তিনিই সেই আল্লাহ যিনি স্বীয় সাহায্য দ্বারা এবং মুমিনদের সাহায্য দ্বারা তোমাকে শক্তিশালী করেছেন এবং তিনি তাদের অন্তরে প্রেম-প্রীতি স্থাপন করেছেন।' (৮:৬২-৬৩) আল্লাহ তা'আলা স্বীয় দ্বিতীয় অনুগ্রহের বর্ণনা দিচ্ছেন- “হে মুমিনগণ! তোমরা একেবারে জাহান্নামের অগ্নির ধারে পৌঁছে গিয়েছিলে এবং তোমাদের কুফরী তোমাদেরকে ওর ভিতরে প্রবেশ করিয়ে দিত। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা তোমাদের ইসলাম গ্রহণের তাওফীক প্রদান করতঃ তোমাদেরকে ঐ আগুন থেকেও বাঁচিয়ে নিয়েছেন। হুনায়েন যুদ্ধে বিজয় লাভের পর ধর্মীয় মঙ্গলের কথা চিন্তা করে রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন যুদ্ধলব্ধ মাল বন্টন করতে গিয়ে কোন কোন লোককে কিছু বেশী প্রদান করেন তখন কোন একজন লোক কিছু কটুক্তি করে।
ফলে রাসূলুল্লাহ (সঃ) আনসার দলকে একত্রিত করতঃ একটি ভাষণ দান করেন। ঐ ভাষণে তিনি একথাও বলেনঃ হে আনসারের দল! তোমরা কি পথভ্রষ্ট ছিলে না? অতঃপর আমার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে সুপথ-প্রদর্শন করেন? তোমরা কি দলে দলে বিভক্ত ছিলে না? অতঃপর আল্লাহ আমারই কারণে তোমাদের অন্তরে প্রেম-প্রীতি স্থাপন করেন। তোমরা দরিদ্র ছিলে না? অতঃপর আল্লাহ আমারই মাধ্যমে তোমাদেরকে সম্পদশালী করেন? প্রত্যেক প্রশ্নের উত্তরে এ পবিত্র দলটি আল্লাহর শপথ করে সমস্বরে বলে উঠেনঃ আমাদের উপর আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ) -এর অনুগ্রহ এর চেয়েও বেশী রয়েছে। হযরত মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (রঃ) বলেন যে, আউস ও খাযরাজের মধ্যে কয়েক শতাব্দী ধরে শত্রুতা ছিল, অথচ তারাও পরস্পর ভাই ভাই হয়ে গেছে দেখে ইয়াহুদীরা চোখে আঁধার দেখতে থাকে।
তারা তোক নিযুক্ত করে যে, তারা যেন আউস ও খাযরাজের সভাস্থলে গমন করে এবং তাদেরকে তাদের পুরাতন যুদ্ধ-বিগ্রহ ও শক্রতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। তাদের নিহত ব্যক্তিদের কথা যেন নতুনভাবে তাদেরকে মনে করিয়ে দেয় এবং এভাবে যেন তাদেরকে উত্তেজিত করে তুলে। এ ঔষধ একদা তাদের উপর পড়েও যায় এবং উভয় গোত্রের মধ্যে পুরাতন অগ্নি প্রজ্জ্বলিত হয়ে উঠে। এমনকি তাদের মধ্যে তরবারী চালনারও উপক্রম হয়ে যায়। সেই অজ্ঞতার যুগের গণ্ডগোল ও চীৎকার শুরু হয়ে যায় এবং একে অপরের রক্ত পিপাসু হয়ে পড়ে। স্থির হয় যে, তারা হুররার প্রান্তরে গিয়ে প্রাণ খুলে যুদ্ধ করবে এবং পিপাসার্ত ভূমিকে রক্ত পানে পরিতৃপ্ত করবে।
কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ সংবাদ জানতে পেরে তৎক্ষণাৎ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন এবং উভয় দলকে শান্ত করে দেন। অতঃপর তিনি তাদের উভয় দলকে বলেনঃ পুনরায় তোমরা অজ্ঞতা যুগের ঝগড়া শুরু করে দিলে? আমার বিদ্যমানবস্থায় তোমরা পরস্পরের মধ্যে তরবারী চালনা আরম্ভ করলে?” তারপরে তিনি তাদেরকে এ আয়াতটি পাঠ করে শুনিয়ে দেন। এতে সবাই লজ্জিত হয়ে যায় এবং কিছুক্ষণ পূর্বের কার্যের জন্যে দুঃখ প্রকাশ করতে থাকে। আবার তারা পরস্পরে কোলাকুলি করে এবং হাতে হাত মিলিয়ে নেয়। পুনরায় তারা ভাই ভাই হয়ে যায়। হযরত ইকরামা (রাঃ) বলেন যে, হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাঃ)-কে যখন মুনাফিকরা অপবাদ দিয়েছিল এবং তাকে দোষমুক্ত করে আল্লাহ তা'আলা আয়াত অবতীর্ণ করেছিলেন, তখন মুসলমানেরা একে অপরের বিরুদ্ধে লেগে পড়েছিল, সে সময় এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়েছিল।
হে মুমিনগণ! তোমরা যথার্থভাবে আল্লাহ্র তাকওয়া অবলম্বন কর [১] এবং তোমরা মুসলিম (পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণকারী) না হয়ে কোন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করো না [২]
এগারতম রুকূ‘
[১] আলোচ্য আয়াতে আল্লাহ্র তাকওয়া অর্জনের হক্ক আদায় করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ তাকওয়ার ঐ স্তর অর্জন কর, যা তাকওয়ার হক। কিন্তু তাকওয়ার হক বা যথার্থ তাকওয়া কি? আব্দুল্লাহ ইবনে মাস’উদ, রবী, কাতাদাহ ও হাসান রাহিমাহুমুল্লাহ বলেন, তাকওয়ার হক হল, প্রত্যেক কাজে আল্লাহ্র আনুগত্য করা, আনুগত্যের বিপরীতে কোন কাজ না করা, আল্লাহকে সর্বদা স্মরণে রাখা- কখনো বিস্মৃত না হওয়া এবং সর্বদা তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা- অকৃতজ্ঞ না হওয়া। [ইবন কাসীর]
[২] এতে বুঝা যায় যে, পূর্ণ ইসলামই প্রকৃতপক্ষে তাকওয়া। অর্থাৎ আল্লাহ্ তা’আলা ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের পূর্ণ আনুগত্য করা এবং তাঁর অবাধ্যতা থেকে বেঁচে থাকার নামই হচ্ছে তাকওয়া অবলম্বন। আয়াতের শেষে মুসলিম না হয়ে যেন কারও মৃত্যু না হয় সেটার উপর জোর দেয়া হয়েছে। দুনিয়াতে ঈমানদারের অবস্থান হবে আশা-নিরাশার মধ্যে। সে একদিকে আল্লাহ্র রহমতের কথা স্মরণ করে নাজাতের আশা করবে, অপরদিকে আল্লাহ্র শাস্তির কথা স্মরণ করে জাহান্নামে যাওয়ার ভয় করবে। কিন্তু মৃত্যুর সময় তাকে আল্লাহ সম্পর্কে সুধারণা নিয়েই মরতে হবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “তোমাদের কেউ যেন আল্লাহ সম্পর্কে সু ধারণা না নিয়ে মারা না যায়” [মুসলিম: ২৮৭৭] অর্থাৎ মৃত্যুর সময় তার আশা থাকবে যে, নিশ্চয় আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করবেন।
[সূরা আল ইমরান (৩): আয়াত ১০২] পূর্ণ পৃষ্ঠা
অন্য একজন কবি বলেছেন «১»:অতঃপর তিনি নিজেকে এতে সঁপে দিলেন যখন তিনি বিপদমুক্ত হতে আশ্রয়প্রার্থী ছিলেন … এবং তিনি তাঁর উপায়-উপকরণসমূহ ত্যাগ করলেন ও ভরসা করলেন।আর খাবার তাকে রক্ষা করল: অর্থাৎ তার থেকে ক্ষুধাকে নিবৃত্ত করল। আরবরা বলে থাকে: খাবার অমুককে রক্ষা করল, অর্থাৎ তাকে ক্ষুধা থেকে নিবৃত্ত করল। এই কারণেই তারা ছাতুকে ‘আবু আসিম’ (রক্ষণকারী) উপনামে ভূষিত করেছে। আহমাদ ইবনে ইয়াহইয়া বলেছেন: আরবরা রুটিকে ‘আসিম’ এবং ‘জাবির’ (পরিপূরক) নামে অভিহিত করে। তিনি পাঠ করেছেন:সুতরাং তুমি আমাকে তিরস্কার করো না বরং জাবিরকে তিরস্কার করো … কারণ জাবিরই আমাকে তপ্ত দুপুরে কঠোর পরিশ্রমে বাধ্য করেছে।তারা একে ‘আমির’ (আবাদকারী) নামেও ডাকত।
তিনি পাঠ করেছেন:আবু মালিক মধ্যদুপুরে আমার কাছে ফিরে আসে … সে আসে এবং আমিরের (রুটির) নিকট তার বোঝা নামিয়ে রাখে।আবু মালিক হলো ক্ষুধার উপনাম। [সূরা আল ইমরান (৩): আয়াত ১০২]হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে যথাযথভাবে ভয় করো এবং তোমরা মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না (১০২)।এতে একটি মাসয়ালা রয়েছে: ইমাম বুখারি «৩» মুররাহ হতে, তিনি আবদুল্লাহ হতে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: “(আল্লাহর) যথাযথ তাকওয়া হলো এই যে, তাঁর আনুগত্য করা হবে এবং অবাধ্যতা করা হবে না, তাঁকে স্মরণ রাখা হবে এবং বিস্মৃত হওয়া হবে না, আর তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হবে এবং অকৃতজ্ঞতা করা হবে না।” ইবনে আব্বাস বলেছেন: এর অর্থ হলো চোখের পলকের জন্যও যেন তাঁর অবাধ্যতা না করা হয়।
মুফাসসিরগণ উল্লেখ করেছেন যে, যখন এই আয়াতটি নাযিল হলো তখন তারা বললেন: হে আল্লাহর রাসূল, কার পক্ষে এটি পালন করার সামর্থ্য আছে? এটি তাদের জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ল। তখন আল্লাহ তাআলা নাযিল করলেন: “তোমরা আল্লাহকে ভয় করো তোমাদের সাধ্যানুযায়ী” [আত-তাগাবুন: ১৬] «৪»। ফলে এটি এই আয়াতটিকে রহিত করে দিল; এটি কাতাদাহ, রাবী এবং ইবনে যায়েদ থেকে বর্ণিত। মুকাতিল বলেছেন: সূরা আল ইমরানে এই আয়াতটি ছাড়া রহিতকৃত আর কোনো আয়াত নেই। আবার কেউ কেউ বলেছেন: আল্লাহর বাণী “তোমরা আল্লাহকে ভয় করো তোমাদের সাধ্যানুযায়ী” মূলত এই আয়াতটিরই ব্যাখ্যা। এর অর্থ হলো: তোমরা আল্লাহর যথাযথ তাকওয়া অবলম্বন করো তোমাদের সাধ্য অনুযায়ী।
আর এটিই অধিকতর সঠিক অভিমত «৫», কেননা রহিতকরণ কেবল তখনই ঘটে যখন সামঞ্জস্য বিধান করা অসম্ভব হয়; আর এখানে সামঞ্জস্য বিধান সম্ভব, তাই এটিই শ্রেয়। আলী ইবনে আবু তালহা ইবনে আব্বাস হতে বর্ণনা করেছেন যে, আল্লাহর বাণী “হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে যথাযথভাবে ভয় করো” আয়াতটি রহিত হয়নি, বরং ‘যথাযথ তাকওয়া’ হলো আল্লাহর পথে যথাযথভাবে জিহাদ করা...আল্লাহর পথে যথাযথভাবে(১). তিনি হলেন আওস ইবনে হাজার। আর দিওয়ানে আছে: তিনি এতে তাঁর মাথা সঁপে দিলেন … এবং দুঃখ-কষ্ট ছুড়ে ফেললেন …(২). ‘দাল’ পাণ্ডুলিপি থেকে। আর ‘জীম’ পাণ্ডুলিপিতে আছে: তাকে রক্ষা করল।(৩).
‘যা’ এবং ‘হা’ পাণ্ডুলিপিতে রয়েছে: আন-নাহহাস, তিনি মুররাহ হতে, তিনি ইয়াহইয়া হতে, তিনি আবদুল্লাহ হতে বর্ণনা করেছেন।(৪). ১৮শ খণ্ড, ১৪৪ পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য। [ ..... ](৫). ‘যা’ পাণ্ডুলিপিতে আছে: এটি অধিকতর সঠিক প্রকার।(৬). ‘দাল’ পাণ্ডুলিপিতে রয়েছে।
ইবনে মারদাওয়াইহ বুরায়দাহ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) খুতবা দিচ্ছিলেন, এমতাবস্থায় হাসান ও হুসাইন (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) লাল জামা পরিহিত অবস্থায় আসলেন; তাঁরা হাঁটছিলেন এবং হোঁচট খাচ্ছিলেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মিম্বর থেকে নেমে আসলেন এবং তাঁদের একজনকে এক পাশে ও অন্যজনকে অন্য পাশে করে কোলে তুলে নিলেন। এরপর তিনি মিম্বরে আরোহণ করে বললেন: আল্লাহ সত্যই বলেছেন: "নিশ্চয়ই তোমাদের সম্পদ ও সন্তানসন্ততি এক পরীক্ষা।" আমি যখন এই দুই শিশুকে হাঁটতে ও হোঁচট খেতে দেখলাম, তখন আমি ধৈর্য ধরতে পারলাম না, এমনকি আমি আমার বক্তব্য বন্ধ করে তাঁদের কাছে নেমে আসলাম।ইবনে মারদাওয়াইহ আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যখন মিম্বরে দাঁড়িয়ে লোকদের উদ্দেশ্যে খুতবা দিচ্ছিলেন, তখন হুসাইন ইবনে আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বের হলেন।
তিনি তাঁর পরিহিত লম্বা কাপড়ে পা লেগে পড়ে গেলেন এবং কেঁদে উঠলেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মিম্বর থেকে নেমে আসলেন। লোকেরা যখন তা দেখল, তারা দ্রুত হুসাইন (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর দিকে এগিয়ে গেল এবং একে অপরের হাত বদল করে তাঁকে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর হাতে পৌঁছে দিল। তখন তিনি বললেন: আল্লাহ শয়তানকে লাঞ্ছিত করুন, নিশ্চয়ই সন্তান এক মহা পরীক্ষা। সেই সত্তার কসম যাঁর হাতে আমার প্রাণ, আমি বুঝতেই পারিনি যে কখন আমি মিম্বর থেকে নেমে এসেছি।ইবনুল মুনযির ইয়াহইয়া ইবনে আবি কাসীর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) হাসান অথবা হুসাইনের কান্নার শব্দ শুনতে পেলেন।
তখন নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন: সন্তান এক পরীক্ষা; আমি তাঁর দিকে ধাবিত হলাম অথচ আমার কোনো হুঁশ ছিল না। আর আল্লাহ তাআলাই সর্বজ্ঞ।মহান আল্লাহর বাণী: "অতএব তোমরা আল্লাহকে যথাসাধ্য ভয় করো।"ইবনে আবি হাতিম সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: যখন "তোমরা আল্লাহকে যথাযথভাবে ভয় করো" (সূরা আল-ইমরান, আয়াত ১০২) অবতীর্ণ হলো, তখন লোকদের জন্য আমল করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ল। তাঁরা ইবাদতে এতোটাই মগ্ন হলেন যে তাঁদের গোড়ালি ফুলে গেল এবং কপালে ক্ষত সৃষ্টি হলো। তখন আল্লাহ তাআলা মুসলমানদের জন্য সহজীকরণ হিসেবে অবতীর্ণ করলেন: "অতএব তোমরা আল্লাহকে যথাসাধ্য ভয় করো।" আর এটি পূর্ববর্তী আয়াতকে রহিত করে দিল।আবদ ইবনে হুমাইদ এবং ইবনুল মুনযির রাবী ইবনে আনাস থেকে "অতএব তোমরা আল্লাহকে যথাসাধ্য ভয় করো" আয়াতের ব্যাখ্যায় বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: অর্থাৎ তোমাদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা ব্যয় করো।আবদ ইবনে হুমাইদ এবং ইবনুল মুনযির কাতাদাহ থেকে "অতএব তোমরা আল্লাহকে যথাসাধ্য ভয় করো" আয়াত সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি বিশেষ অনুমতি বা সহজীকরণ।
আল্লাহ তাআলা ইতিপূর্বে সূরা আল-ইমরানে অবতীর্ণ করেছিলেন: "তোমরা আল্লাহকে যথাযথভাবে ভয় করো" (সূরা আল-ইমরান, আয়াত ১০২)। আর যথাযথ ভয়ের অর্থ হলো আল্লাহর আনুগত্য করা এবং তাঁর অবাধ্য না হওয়া। অতঃপর তিনি তাঁর বান্দাদের ওপর বিধান শিথিল করে দিলেন এবং এই সহজীকরণের আয়াত নাযিল করলেন: "অতএব তোমরা আল্লাহকে যথাসাধ্য ভয় করো এবং শোনো ও আনুগত্য করো।"
