An-Nisa
আন-নিসা: 101
4 আন-নিসা An-Nisa · 176 আয়াত النساء
আরবি
وَإِذَا ضَرَبْتُمْ فِى ٱلْأَرْضِ فَلَيْسَ عَلَيْكُمْ جُنَاحٌ أَن تَقْصُرُوا۟ مِنَ ٱلصَّلَوٰةِ إِنْ خِفْتُمْ أَن يَفْتِنَكُمُ ٱلَّذِينَ كَفَرُوٓا۟ ۚ إِنَّ ٱلْكَـٰفِرِينَ كَانُوا۟ لَكُمْ عَدُوًّا مُّبِينًا
English Translations
And when you travel throughout the land, there is no blame upon you for shortening the prayer, [especially] if you fear that those who disbelieve may disrupt [or attack] you. Indeed, the disbelievers are ever to you a clear enemy.
And when you (Muslims) travel in the land, there is no sin on you if you shorten your Salat (prayer) if you fear that the disbelievers may attack you, verily, the disbelievers are ever unto you open enemies.
When you travel on the earth, there is no sin on you in shortening your Salāh, if you fear that the disbelievers would put you in trouble. Surely, the disbelievers are an open enemy for you.
When you go forth journeying in the land, there is no blame on you if you shorten the Prayer, (especially) if you fear that the unbelievers might cause you harm. Surely the unbelievers are your open enemies.
And when ye go forth in the land, it is no sin for you to curtail (your) worship if ye fear that those who disbelieve may attack you. In truth the disbelievers are an open enemy to you.
When ye travel through the earth, there is no blame on you if ye shorten your prayers, for fear the Unbelievers May attack you: For the Unbelievers are unto you open enemies.
বাংলা অনুবাদ
যখন তোমরা দেশে-বিদেশে সফর কর, তখন নামায কসর করাতে তোমাদের কিছুমাত্র দোষ নেই, যদি তোমরা ভয় কর যে, কাফিরগণ তোমাদেরকে বিপদগ্রস্ত করবে। নিঃসন্দেহে কাফিরগণ তো তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।
আর যখন তোমরা যমীনে সফর করবে, তখন তোমাদের সালাত কসর করাতে কোন দোষ নেই। যদি আশঙ্কা কর যে, কাফিররা তোমাদেরকে ফিতনায় ফেলবে*। নিশ্চয় কাফিররা তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু। * শত্রুদের আক্রমণের আশঙ্কা না থাকলেও সফরে সালাত ‘কসর’ করা যাবে। কেননা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকল সফরেই সালাত ‘কসর’ করেছেন।
আর যখন তোমরা ভূপৃষ্ঠে ভ্রমণ কর তখন সালাত সংক্ষেপ করলে তোমাদের কোন অপরাধ নেই, যদি তোমরা আশংকা কর যে, যারা অবিশ্বাসী তারা তোমাদেরকে বিব্রত করবে; নিশ্চয়ই কাফিরেরা তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।
তোমরা যখন দেশ-বিদেশে সফর করবে তখন যদি তোমাদের আশংকা হয় যে, কাফেররা তোমাদের জন্য ফিত্না সৃষ্টি করবে, তবে সালাত ‘কসর’ করলে তোমাদের কোনো দোষ নেই। নিশ্চয়ই কাফেররা তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।
তোমরা যখন দেশ-বিদেশে সফর করবে তখন যদি তোমাদের আশঙ্কা হয়, কাফিররা তোমাদের জন্য ফেতনা সৃষ্টি করবে, তবে সালাত সংক্ষিপ্ত করলে তোমাদের কোন দোষ নেই। নিশ্চয়ই কাফিররা তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।
১০১. তোমরা জমিনে সফর করলে চার রাকাত বিশিষ্ট সালাতকে কমিয়ে দু’ রাকাত পড়াতে কোন পাপ নেই। যদি তোমরা কাফিরদের পক্ষ থেকে অপছন্দনীয় কোন কিছু তোমাদের ব্যাপারে ঘটে যাওয়ার ভয় পাও। বস্তুতঃ তোমাদের সাথে কাফিরদের শত্রুতা প্রকাশ্য ও সুস্পষ্ট।
তাফসীর
ইরশাদ হচ্ছে-'যখন তোমরা ভূ-পৃষ্ঠে পর্যটন কর’ অর্থাৎ শহরসমূহের সফরে বের হও। যেমন অন্য জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘জেনে রেখো যে, সত্বরই তোমাদের মধ্যে রুগীও হবে এবং অন্যান্য এমন লোকও হবে যারা আল্লাহর অনুগ্রহ অনুসন্ধানে ভূ-পৃষ্ঠে ভ্রমণ করবে। (৭৩:২০) তবে সে সময় নামায সংক্ষেপ করায় তোমাদের কোন অপরাধ নেই। অর্থাৎ চার রাকআতের স্থলে দু'রাকআত, যেমন জমহুর এ আয়াত দ্বারা এটাই বুঝেছেন, যদিও তাদের মধ্যে কতক মাসআলায় মতভেদ রয়েছে। কেহ কেহ বলেন যে, সালাত সংক্ষেপ করার জন্য আনুগত্যের সফর হওয়া শর্ত। যেমন জিহাদের জন্য, হাজ্জ বা উমরার জন্য, বিদ্যা অনুসন্ধানের জন্য এবং যিয়ারত ইত্যাদির জন্য সফর করা। ইবন উমার (রাঃ), আতা' (রঃ) এবং ইয়াহইয়ারও (রঃ) উক্তি এটাই। একটি বর্ণনা হিসাবে ইমাম মালিকেরও (রঃ) এটাই উক্তি। কেননা এরপরে ঘোষণা রয়েছে ? যদি তোমরা আশংকা কর যে, অবিশ্বাসীরা তোমাদেরকে বিব্রত করবে। কারও কারও মতে এ শর্ত আরোপের কোনই প্রয়োজন নেই যে, এ সফর আল্লাহ তাআলার নৈকট্য লাভের উদ্দেশে হতে হবে, বরং প্রত্যেক বৈধ সফরেই সালাত সংক্ষেপ করা যায়। যেমন মৃত জন্তুর মাংস ভক্ষণের অনুমতি দেয়ার ব্যাপারে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বলেন: (আরবী) অর্থাৎ যে পাপাসক্তি ব্যতীত ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়বে (তার জন্যে মৃত জন্তুর গোশত ভক্ষণ বৈধ)।' (৫:৩) হ্যা তবে শর্ত এই যে, সেটা যেন পাপ কার্যের উদ্দেশ্যে সফর না হয়। ইমাম শাফিঈ (রঃ), ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রঃ) প্রমুখ ইমামগণের এটাই উক্তি।হাদীসে রয়েছে যে, একটি লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করতঃ বলে, “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি একজন ব্যবসায়ী লোক। ব্যবসা উপলক্ষে আমি সমুদ্র ভ্রমণ করে থাকি। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে দু' রাকআত নামায পড়ার নির্দেশ দেন। এ হাদীসটি মুরসাল। কোন কোন লোকের মাযহাব এই যে, প্রত্যেক সফরেই নামায কসর করতে হবে। সফর হয় বৈধই হোক বা অবৈধই হোক। এমনকি, যদি কেউ ডাকাতি বা লুঠতরাজি করার উদ্দেশ্যেও সফর করে সেখানেও নামাযকে কসর করার অনুমতি রয়েছে। ইমাম আবু হানীফা (রঃ), সাওরী (রঃ) এবং দাউদেরও (রঃ) এটাই উক্তি যে, আয়াতটি সাধারণ। কিন্তু এ উক্তি জমহুরের উক্তির বিপরীত। কাফিরদের হতে ভয় করার যে শর্ত লাগানো হয়েছে তা অধিক প্রচলনের কারণেই লাগানো হয়েছে। এ আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার সময় যেহেতু অবস্থা প্রায় এরূপই ছিল সেহেতু আয়াতের মধ্যেও ওটা বর্ণনা করা হয়েছে। হিজরতের পর মুসলমানদেরকে যেসব সফরে যেতে হয়েছিল তার সবগুলোই ছিল সন্ত্রাসের সফর। প্রতি পদে পদে শত্রুর ভয় ছিল। এমনকি মুসলমানগণ জিহাদ ছাড়া এবং বিশেষ কোন সেনাবাহিনীর সঙ্গ ছাড়া সফরের জন্যে বের হতেই পারতেন না। আর নিয়ম আছে যে, অধিক হিসেবে যে কথা বলা হয় তার বোধগম্য ধর্তব্য হয় না। যেমন এক জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “তোমরা তোমাদের দাসীদেরকে নির্লজ্জতার কার্যে বাধ্য করো না যদি তারা পবিত্র থাকতে ইচ্ছে করে।' অন্য জায়গায় রয়েছেঃ “তোমাদের যে স্ত্রীদের সাথে তোমরা সহবাস করছে তাদের ঐ মেয়েগুলোও তোমাদের জন্য হারাম যারা তোমাদের নিকট প্রতিপালিত হচ্ছে। অতএব এ আয়াত দু’টিতে যেমন শর্তের বর্ণনা রয়েছে, কিন্তু ওর হওয়ার উপরই হুকুম নির্ভর করে না, বরং এ শর্ত ছাড়াও ওটাই হুকুম। অর্থাৎ নির্লজ্জতার কার্যে দাসীদেরকে বাধ্য করা হারাম, তারা পবিত্র থাকার ইচ্ছে করুক আর নাই করুক। অনুরূপভাবে ঐ স্ত্রীর কন্যা তার স্বামীর পক্ষে হারাম যে স্ত্রীর সাথে স্বামী সহবাস করেছে, তার কন্যা তার স্বামীর নিকট প্রতিপালিতা হোক আর নাই হোক। অথচ কুরআন কারীমের মধ্যে দু’জায়গায় এ শর্ত রয়েছে। তাহলে এ দু জায়গায় যেমন এসব শর্ত ছাড়াও এ হুকুম, দ্রুপ এখানেও যদিও ভয় না থাকে তবুও শুধু সফরের কারণেই নামাযকে কসর করা বৈধ। মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, হযরত ইয়ালা ইবনে উমাইয়া (রাঃ) হযরত উমার (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেন, নামায হালকা করার নির্দেশ তো ভয়ের অবস্থায় আর এখন তো নিরাপত্তা রয়েছে (সুতরাং এখন নির্দেশ কি)?' তখন হযরত উমার (রাঃ) উত্তরে বলেনঃ এ প্রশ্নই আমিও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে করেছিলাম। তিনি বলেছিলেনঃ ‘এটা আল্লাহ তা'আলার একটা সাদকা যা তিনি তোমাদেরকে প্রদান করেছেন, সুতরাং তোমরা তা গ্রহণ কর।' সহীহ মুসলিম, সুনান ইত্যাদির মধ্যেও এ হাদীসটি রয়েছে। বর্ণনাটি সম্পূর্ণই সঠিক।হযরত আবু হানযালা খুদামা (রাঃ) হযরত উমার (রাঃ)-কে সফরের নামাযের কথা জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন দু'রাকআত। তিনি তখন বলেন, কুরআন পাকে তো ভয়ের অবস্থায় দু'রাকআতের কথা রয়েছে। আর এখন তো পূর্ণ নিরাপত্তা বিরাজ করছে?' হযরত উমার (রাঃ) তখন বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এটাই সুন্নাত। (ইবনে আবি শাইবা) অন্য এক ব্যক্তির প্রশ্নের উত্তরে হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “আকাশ থেকে তো এ অবকাশ অবতীর্ণ হয়েছে। এখন তোমার ইচ্ছে হলে তা ফিরিয়ে দাও।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, 'মক্কা ও মদীনার মধ্যে নিরাপত্তা থাকা সত্ত্বেও আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সঙ্গে দু'রাকআত নামায পড়েছি। (সুনান-ই-নাসাঈ) অন্য একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) মদীনা হতে মক্কার পথে রওয়ানা হয়েছেন, তখন সেখানে আল্লাহর ভয় ছাড়া অন্য কোন ভয় ছিল না। তখনও তিনি দু'রাকআত নামায আদায় করতেন।সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে যে, মক্কা হতে মদীনা প্রত্যাবর্তনের পথেও তিনি দু'রাকআতই নামায আদায় করেছেন এবং সে সফরে তিনি মক্কায় দশ দিন অবস্থান করেছিলেন।মুসনাদ-ই-আহমাদে হযরত হারেসা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, ‘মিনার মাঠে আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সঙ্গে যোহর ও আসরের নামায দু’ রাকআত পড়েছি, অথচ আমরা সংখ্যায় অনেক ছিলাম এবং সম্পূর্ণ নিরাপদ অবস্থায় ছিলাম। সহীহ বুখারী শরীফে রয়েছে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সঙ্গে, হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর সঙ্গে, হযরত উমার (রাঃ)-এর সঙ্গে এবং হযরত উসমান (রাঃ)-এর সঙ্গে (সফরে) দু' রাকআত নামায পড়েছি। কিন্তু এখন হযরত উসমান (রাঃ) স্বীয় খিলাফতের শেষ যুগে পূর্ণ পড়তে আরম্ভ করেছেন।'সহীহ বুখারী শরীফের অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর নিকট যখন হযরত উসমান (রাঃ)-এর চার রাকআত নামায পড়ার কথা বর্ণিত হয় তখন তিনি ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ পাঠ করেন এবং বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সঙ্গে মিনায় দু'রাকআত নামায পড়েছি এবং হযরত আবু বকর (রাঃ) ও হযরত উমার (রাঃ)-এর সঙ্গেও পড়েছি। সুতরাং যদি আমার ভাগ্যে এ চার রাকআতের পরিবর্তে গৃহীত দু'রাকআতই পড়তো!' অতএব উল্লিখিত হাদীসগুলো এ কথার উপর স্পষ্টভাবে দলীল যে, সফরে নামায কসর করার জন্যে ভয়ের অবস্থা হওয়া শর্ত নয়, বরং সম্পূর্ণ নিরাপদ সফরেও দু'রাকআত আদায় করা যায়। এ জন্যেই উলামা-ই-কিরাম বলেন যে, এখানে ভাবার্থ হচ্ছে কাইফিয়াত’ অর্থাৎ কিরআত, দাড়ান, রুকু, সিজদাহ ইত্যাদির মধ্যে কসর বা সংক্ষেপ করা, কামইয়াত' অর্থাৎ রাকআতের সংখ্যায় সংক্ষেপ করা নয়। যহ্হাক (রঃ), মুজাহিদ (রঃ) এবং সুদ্দী (রঃ)-এর এটাই উক্তি। যেমন পরে আসছে। এর একটি দলীল হচ্ছে ইমাম মালিক (রঃ)-এর বর্ণনাকৃত নিমের হাদীসটিঃ হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন, নামায দু' দু' রাকআত করেই বাড়ীতে ও সফরে ফরয করা হয়েছিল। অতঃপর সফরে তো দু' রাকআতই থেকে যায়। কিন্তু বাড়ীতে অবস্থানের সময় আরও দু' রাকআত বাড়িয়ে দেয়া হয়। সুতরাং আলেমদের এ দলটি বলেন যে, প্রকৃত নামায ছিল দু' রাকআত, তাহলে এ আয়াতে কসরের অর্থ কামইয়াত’ অর্থাৎ রাকাতের সংখ্যায় কম হওয়া কিরূপে হতে পারে? এই উক্তির স্বপক্ষে খুব বড় শক্তি নিম্নের হাদীস দ্বারা পাওয়া যাচ্ছেঃমুসনাদ-ই-আহমাদে হযরত উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, ‘সফরে নামায হচ্ছে দু'রাকআত, ঈদুল আযহার নামায দু'রাকআত, ঈদুল ফিরের নামায দু'রাকআত এবং জুমার নামায দু'রাকআত, মুহাম্মাদ (সঃ)-এর ভাষায় এ হচ্ছে পূর্ণ নামায, কসর নয়।' এ হাদীসটি সুনান-ই-নাসাঈ, সুনান-ই-ইবনে মাজাহ্ এবং সহীহ ইবনে হিব্বানেও রয়েছে। এর সনদ। মুসলিমের শর্তের উপরে রয়েছে। এর একজন বর্ণনাকারী ইবনে আবি লাইলা (রঃ)-এর হযরত উমার (রাঃ) হতে শ্রবণ করা সাব্যস্ত আছে। যেমন ইমাম মুসলিম (রঃ) স্বীয় হাদীস গ্রন্থ সহীহ’-এর ভূমিকার মধ্যে লিখেছেন। স্বয়ং এ বর্ণনায় এবং এ ছাড়া অন্যান্য বর্ণনার মধ্যেও স্পষ্টভাবে এটা বিদ্যমান রয়েছে। আর এটা ইনশাআল্লাহ সঠিকও বটে, যদিও ইয়াহইয়া ইবনে মুঈন (রঃ), ইবনে আবি হাতিম (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈ (রঃ) বলেন যে, ইবনে আবি লাইলা (রঃ) এটা হযরত উমার (রাঃ) হতে শুনেননি। কিন্তু এটা মেনে নিলেও এ সনদে কোন ত্রুটি থাকে না। কেননা, অন্য কোন পন্থায় হযরত ইবনে আবি লাইলার উপরে সিকাহ্ নামক একজন বর্ণনাকারী রয়েছেন এবং তাঁর হযরত উমার (রাঃ) হতে শ্রবণ বর্ণিত আছে। আর সুনান-ই-ইবনে মাজায় ইবনে আবি লাইলা (রঃ)-এর হযরত কাব ইবনে আজরা হতে এবং তার হযরত উমার (রাঃ) হতে রেওয়ায়াতও বর্ণিত আছে। আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন।হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, ‘আল্লাহ তা'আলা তোমাদের নবী (সঃ)-এর ভাষায় তোমাদের উপর নামায ফরয করেছেন বাড়ীতে অবস্থানের সময় চার রাকআত, সফরে দু' রাকআত এবং ভয়ের অবস্থায় এক রাকআত। অতএব বাড়ীতে অবস্থানের সময় এর পূর্বে ও পরে যেমনিভাবে নামায পড়া হতো তেমনিভাবে সফরেও পড়া হবে। এ বর্ণনায় এবং উপরে হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর বর্ণনায় যে রয়েছে, আল্লাহ তা'আলা বাড়ীতে অবস্থানের সময়ও দু'রাকআতই ফরয করেছিলেন’ এ দুটো বর্ণনার মধ্যে বৈপরীত্ব কিছুই নেই। কেননা, মূল তো দু'রাকআতই ছিল পরে আরও দু'রাকআত বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। তবে এখন বলা যেতে পারে যে, বাড়ীতে অবস্থানের অবস্থায় ফরয চার রাকআতই বটে, যেমন হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর বর্ণনায় রয়েছে। আল্লাহ তাআলাই ভাল জানেন। মোটকথা এ দু'টি বর্ণনা দ্বারা জানা গেল যে, সফরে নামায দু'রাকআতই বটে এবং এটাই পূর্ণ নামায, অসম্পূর্ণ নামায় নয়, আর হযরত উমার (রাঃ)-এর বর্ণনা দ্বারা এটাই সাব্যস্ত হয়েছে। তাহলে কসর' বা নামায় সংক্ষেপ করণের ভাবার্থ হচ্ছে কসর-ই-কাইফিয়াত' অর্থাৎ অবস্থার দিক দিয়ে সংক্ষেপণ, যেমন- ‘সলাতুল খাওফ' বা ভয়ের সময়ের নামাযে সংক্ষেপ করা হয়। এজন্যেই আল্লাহ তা'আলা বলেন-“যদি তোমরা আশংকা কর যে, কাফিররা তোমাদেরকে বিব্রত করবে। আর এ কারণেই আল্লাহ তা'আলা এর পরবর্তী আয়াতে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “(হে নবী সঃ) তুমি যখন তাদের মধ্যে থাক তখন তাদের জন্যে নামায প্রতিষ্ঠিত কর। অতঃপর নামায সংক্ষেপ করার উদ্দেশ্যে এর নিয়মাবলীও বর্ণনা করেছেন। ইমামুল মুহাদ্দেসিন হযরত ইমাম বুখারী (রঃ) (আরবী) পর্যন্ত লিখার পর আরম্ভ করেছেন। হযরত যহ্হাক (রঃ) (আরবী)-এর তাফসীরে বলেন যে, এটা হচ্ছে যুদ্ধের সময়, সে সময় মানুষ সোয়ারীর উপর দু’ তাকবীরে নামায পড়ে নেবে, তার মুখ যে দিকেই হোক না কেন। হযরত সুদ্দী (রঃ) বলেন, যখন তুমি সফরে দু' রাকআত নামায পড়ে নেবে তখন তোমার এ কসর' পুরো নামাযই হয়ে গেল। হ্যা, তবে যদি ভয় থাকে যে, কাফিররা বিব্রত করবে তবে ‘কসর' এক রাকআতই পড়তে হবে। ভয়ের সময় ছাড়া এক রাকআত কসর' হালাল নয়।হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এ আয়াত দ্বারা ঐ দিনকে বুঝান হয়েছে যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় সাহাবীগণসহ ‘আসফান’ নামক স্থানে অবস্থান করছিলেন এবং মুশরিকরা ছিল ‘যজনান’ নামক স্থানে। একদল অপর দলের উপর আক্রমণের জন্যে সম্পূর্ণ প্রস্তুত ছিল। এদিকে যোহরের নামাযের সময় হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীগণসহ পূর্ব নিয়ম অনুযায়ী পূর্ণ চার রাকআতই আদায় করেন। এদিকে মুশরিকরা মুসলমানদের আসবাবপত্র লুটে নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। ইবনে জারীর (রঃ) এটাকে মুজাহিদ (রঃ), সুদ্দী (রঃ), জাবির (রঃ) এবং হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন এবং তিনি এটাই অবলম্বন করেছেন এবং এটাকেই সঠিকও বলেছেন। হযরত খালিদ ইবনে উসায়েদ (রঃ) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ)-কে বলেন, “আমরা ভয়ের নামাযের কসরের হুকুম তো আল্লাহ তা'আলার কিতাবের মধ্যে পাচ্ছি, কিন্তু মুসাফিরের নামাযের কসরের হুকুম তো আল্লাহ পাকের কিতাবে পাওয়া যায় না? 'হযরত ইবনে উমার (রাঃ) উত্তরে বলেনঃ “আমরা আমাদের নবী (সঃ) -কে সফরের নামায কসর করতে দেখেছি এবং আমরাও ওটার উপর আমল করেছি।লক্ষ্য করলে বুঝা যাবে যে, হযরত খালিদ ইবনে উসায়েদ (রঃ) কসরের প্রয়োগ ভয়ের নামাযের উপর করলেন এবং আয়াতের ভাবার্থ ভয়ের নামাযই নিলেন, আর মুসাফিরের নামাযকে ওর অন্তর্ভুক্ত করলেন না। আবার হযরত ইবনে উমার (রাঃ) ওটা সমর্থনও করলেন। এ আয়াত দ্বারা তিনি মুসাফিরের নামাযের কসরের বর্ণনা না দিয়ে বরং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কাজকে তার জন্যে সনদ করলেন। এর চেয়েও স্পষ্ট হচ্ছে ইবনে জারীর (রঃ)-এর বর্ণনাটি। ওতে রয়েছে যে, হযরত সাম্মাক (রঃ) তাঁকে সফরের নামাযের মাসআলা জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেনঃ ‘সফরের নামায দু'রাকআত এবং এ দু'রাকআতই হচ্ছে সফরের পূর্ণ নামায, কসর নয়। কসর তো রয়েছে ভয়ের নামাযে। ইমাম একটি দলকে এক রাকআত নামায পড়াবেন, অন্য দলটি শত্রুদের সম্মুখে থাকবে। অতঃপর এ দলটি শত্রুদের সামনে চলে যাবে এবং ঐ দলটি চলে আসবে। এ দলটিকে ইমাম সাহেব এক রাকআত নামায পড়াবেন। তাহলে ইমামের দু'রাকআত হবে এবং দল দু’টির এক রাকআত করে হবে।
তোমরা যখন দেশ-বিদেশে সফর করবে তখন যদি তোমাদের আশংকা হয় যে, কাফেররা তোমাদের জন্য ফিত্না সৃষ্টি করবে, তবে সালাত ‘কসর [১]’ করলে তোমাদের কোন দোষ নেই। নিশ্চয়ই কাফেররা তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।
পনরতম রুকু‘
[১] কসর শুধু চার রাকাআতের ফরয সালাতের বেলায় হবে। মাগরিব ও ফযরের সালাতে কোন কসর নেই। পূর্ণ সালাতের স্থলে অর্ধেক সালাত আদায় করার ক্ষেত্রে কারো মনে এরূপ ধারণা আনাগোনা করে যে, বোধহয় এতে সালাত পূর্ণ হলো না, এটা ঠিক নয়। কারণ, কসরও শরীআতেরই নির্দেশ। এ নির্দেশ পালনে গোনাহ হয় না; বরং সওয়াব পাওয়া যায়। ইয়া’লা ইবন উমাইয়্যা বলেন, আমি উমর ইবনুল খাত্তাবকে এ আয়াতে বর্ণিত ‘যদি তোমাদের আশংকা হয় যে, কাফেররা তোমাদের জন্য ফিতনা সৃষ্টি করবে’ এটা উল্লেখ করে জিজ্ঞেস করলাম যে, এখন তো মানুষ নিরাপদ হয়েছে তারপরও সালাতের কসর পড়ার কারণ কি? তখন উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, তুমি যেটাতে আশ্চর্য হয়েছ, আমিও সেটাতে আশ্চর্যবোধ করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সেটা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, “এটা একটি সদকা যেটি আল্লাহ তোমাদের উপর সদকা করেছেন, সুতরাং তোমরা আল্লাহর সদকা গ্রহণ কর”। [মুসলিম: ৬৮৬]
