An-Nisa

আন-নিসা: 171

4:171

আরবি

يَـٰٓأَهْلَ ٱلْكِتَـٰبِ لَا تَغْلُوا۟ فِى دِينِكُمْ وَلَا تَقُولُوا۟ عَلَى ٱللَّهِ إِلَّا ٱلْحَقَّ ۚ إِنَّمَا ٱلْمَسِيحُ عِيسَى ٱبْنُ مَرْيَمَ رَسُولُ ٱللَّهِ وَكَلِمَتُهُۥٓ أَلْقَىٰهَآ إِلَىٰ مَرْيَمَ وَرُوحٌ مِّنْهُ ۖ فَـَٔامِنُوا۟ بِٱللَّهِ وَرُسُلِهِۦ ۖ وَلَا تَقُولُوا۟ ثَلَـٰثَةٌ ۚ ٱنتَهُوا۟ خَيْرًا لَّكُمْ ۚ إِنَّمَا ٱللَّهُ إِلَـٰهٌ وَٰحِدٌ ۖ سُبْحَـٰنَهُۥٓ أَن يَكُونَ لَهُۥ وَلَدٌ ۘ لَّهُۥ مَا فِى ٱلسَّمَـٰوَٰتِ وَمَا فِى ٱلْأَرْضِ ۗ وَكَفَىٰ بِٱللَّهِ وَكِيلًا

English Translations

Sahih International

O People of the Scripture, do not commit excess in your religion or say about Allāh except the truth. The Messiah, Jesus the son of Mary, was but a messenger of Allāh and His word which He directed to Mary and a soul [created at a command] from Him. So believe in Allāh and His messengers. And do not say, "Three"; desist - it is better for you. Indeed, Allāh is but one God. Exalted is He above having a son. To Him belongs whatever is in the heavens and whatever is on the earth. And sufficient is Allāh as Disposer of affairs.

Muhsin Khan

O people of the Scripture (Jews and Christians)! Do not exceed the limits in your religion, nor say of Allah aught but the truth. The Messiah 'Iesa (Jesus), son of Maryam (Mary), was (no more than) a Messenger of Allah and His Word, ("Be!" - and he was) which He bestowed on Maryam (Mary) and a spirit (Ruh) created by Him; so believe in Allah and His Messengers. Say not: "Three (trinity)!" Cease! (it is) better for you. For Allah is (the only) One Ilah (God), Glory be to Him (Far Exalted is He) above having a son. To Him belongs all that is in the heavens and all that is in the earth. And Allah is All-Sufficient as a Disposer of affairs.

Taqi Usmani

O people of the Book, be not excessive in your Faith, and do not say about Allah anything but the truth.The MasīH ‘Īsā, the son of Maryam, is only a Messenger of Allah, and His Word that He had delivered to Maryam, and a spirit from Him. So, believe in Allah and His Messengers. Do not say “Three”. Stop it. That is good for you. Allah is the only One God. He is far too pure to have a son. To Him belongs what is in the heavens and what is in the earth. And Allah is enough to trust in.

Abul Ala Maududi

People of the Book! Do not exceed the limits in your religion, and attribute to Allah nothing except the truth. The Messiah, Jesus, son of Mary, was only a Messenger of Allah, and His command that He conveyed unto Mary, and a spirit from Him (which led to Mary's conception). So believe in Allah and in His Messengers, and do not say: (Allah is a) trinity. Give up this assertion; it would be better for you. Allah is indeed just one God. Far be it from His glory that He should have a son. To Him belongs all that is in the heavens and in the earth. Allah is sufficient for a guardian.

Pickthall

O People of the Scripture! Do not exaggerate in your religion nor utter aught concerning Allah save the truth. The Messiah, Jesus son of Mary, was only a messenger of Allah, and His word which He conveyed unto Mary, and a spirit from Him. So believe in Allah and His messengers, and say not "Three" - Cease! (it is) better for you! - Allah is only One Allah. Far is it removed from His Transcendent Majesty that He should have a son. His is all that is in the heavens and all that is in the earth. And Allah is sufficient as Defender.

Yusuf Ali

O People of the Book! Commit no excesses in your religion: Nor say of Allah aught but the truth. Christ Jesus the son of Mary was (no more than) a messenger of Allah, and His Word, which He bestowed on Mary, and a spirit proceeding from Him: so believe in Allah and His messengers. Say not "Trinity": desist: it will be better for you: for Allah is one Allah: Glory be to Him: (far exalted is He) above having a son. To Him belong all things in the heavens and on earth. And enough is Allah as a Disposer of affairs.

বাংলা অনুবাদ

তাইসিরুল কুরআন

ওহে কিতাবধারীগণ! তোমরা তোমাদের দ্বীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করো না, আর আল্লাহ সম্বন্ধে সত্য ছাড়া কিছু বলো না, ঈসা মাসীহ তো আল্লাহর রসূল আর তাঁর বানী যা তিনি মারইয়ামের নিকট প্রেরণ করেছিলেন, আর তাঁর পক্ষ হতে নির্দেশ, কাজেই তোমরা আল্লাহর প্রতি ও তাঁর রসূলগণের প্রতি ঈমান আনো, আর বলো না ‘তিন’ (জন ইলাহ আছে), নিবৃত্ত হও, তা হবে তোমাদের জন্য কল্যাণকর, আল্লাহ তো একক ইলাহ, তিনি পবিত্র এত্থেকে যে, তাঁর সন্তান হবে। আসমানসমূহে আর যমীনে যা আছে সব কিছু তাঁরই, আর কর্মবিধায়ক হিসেবে আল্লাহই যথেষ্ট।

রাওয়াই আল-বায়ান

হে কিতাবীগণ, তোমরা তোমাদের দীনের মধ্যে বাড়াবাড়ি করো না এবং আল্লাহর উপর সত্য ছাড়া অন্য কিছু বলো না। মারইয়ামের পুত্র মাসীহ ঈসা কেবলমাত্র আল্লাহর রাসূল ও তাঁর কালিমা, যা তিনি প্রেরণ করেছিলেন মারইয়ামের প্রতি এবং তাঁর পক্ষ থেকে রূহ। সুতরাং তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলগণের প্রতি ঈমান আন এবং বলো না, 'তিন'। তোমরা বিরত হও, তা তোমাদের জন্য উত্তম। আল্লাহই কেবল এক ইলাহ, তিনি পবিত্র মহান এ থেকে যে, তাঁর কোন সন্তান হবে। আসমানসূহে যা রয়েছে এবং যা রয়েছে যমীনে, তা আল্লাহরই। আর কর্মবিধায়ক হিসেবে আল্লাহই যথেষ্ট।

শাইখ মুজিবুর রহমান

হে আহলে কিতাব! তোমরা স্বীয় ধর্মে সীমা অতিক্রম করনা এবং আল্লাহর বিরুদ্ধে সত্য ব্যতীত বলনা; নিশ্চয়ই মারইয়াম নন্দন ঈসা মাসীহ্ আল্লাহর রাসূল ও তাঁর বাণী - যা তিনি মারইয়ামের প্রতি সঞ্চারিত করেছিলেন এবং তাঁর আদিষ্ট আত্মা; অতএব আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উপর বিশ্বাস স্থাপন কর। আর ‘‘আল্লাহ তিন জনের একজন’’- এ কথা বলা পরিহার কর। তোমাদের কল্যাণ হবে; নিশ্চয়ই আল্লাহই একমাত্র ইলাহ; তিনি কোন সন্তান হওয়া হতে পুতঃ, মুক্ত। নভোমন্ডল ও ভূ-মন্ডলে যা আছে তা তাঁরই এবং আল্লাহই কার্য সম্পাদনে যথেষ্ট।

ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

হে কিতাবীরা! স্বীয় দীনের মধ্যে তোমরা বাড়াবাড়ি করো না এবং আল্লাহর উপর সত্য ব্যতীত কিছু বলো না। মারইয়াম-তনয় ঈসা মসীহ কেবল আল্লাহর রাসূল এবং তাঁর বাণী, যা তিনি মারইয়ামের কাছে পাঠিয়েছিলেন ও তাঁর পক্ষ থেকে রূহ। কাজেই তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলদের উপর ঈমান আন এবং বলো না, ‘তিন !’ নিবৃত্ত হও, এটাই তোমাদের জন্য কল্যাণকর হবে। আল্লাহই তো এক ইলাহ; তাঁর সন্তান হবে... তিনি এটা থেকে পবিত্র-মহান। আসমানসমূহে যা কিছু আছে ও যমীনে যা কিছু আছে সব আল্লাহরই; আর কর্মবিধায়করূপে আল্লাহই যথেষ্ট।

ফাতহুল মাজীদ

হে আহলে কিতাবগণ! তোমরা তোমাদের দীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি কর না ও আল্লাহ সম্বন্ধে সত্য ছাড়া অন্য কিছু বলো না। মারইয়ামের ছেলে ‘ঈসা মসীহ তো আল্লাহর রাসূল এবং তাঁর বাণী, যা তিনি মারইয়ামের নিকট প্রেরণ করেছিলেন ও তাঁর আদেশ। সুতরাং তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলগণের প্রতি ঈমান আন এবং ‘তিন!’ বল না, (তিনজন ইলাহ) নিবৃত্ত হও, এটা তোমাদের জন্য কল্যাণকর হবে। আল্লাহ তো একমাত্র ইলাহ; তাঁর সন্তান হবে- তিনি এটা হতে পবিত্র। আসমানে যা কিছু আছে ও জমিনে যা কিছু আছে সব আল্লাহরই; কর্ম-বিধানে আল্লাহই যথেষ্ট।

মুখতাসার

১৭১. হে রাসূল! আপনি ইঞ্জীলে বিশ্বাসী খ্রিস্টানদেরকে বলুন: তোমরা নিজেদের ধর্মীয় ব্যাপারে সীমালঙ্ঘন করো না। আর আল্লাহর উপর ‘ঈসা (আলাইহিস-সালাম) এর ব্যাপারে সত্য ছাড়া অন্য কথা বলো না। নিশ্চয়ই মাসীহ ‘ঈসা ইবনু মারইয়াম আল্লাহর রাসূল। যাঁকে আল্লাহ তা‘আলা সত্যসহ প্রেরণ করেন। তিনি তাঁকে সেই কালিমা দিয়ে সৃষ্টি করেন যাসহ তিনি জিব্রীল (আলাইহিস-সালাম) কে মারইয়ামের নিকট পাঠান। তা হলো তাঁরই বাণী “কুন” তুমি হয়ে যাও তখন তিনি হয়ে গেলেন। সেটি ছিলো মূলতঃ আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি ফুঁ যেটি জিব্রীল (আলাইহিস-সালাম) আল্লাহর আদেশে দিয়েছেন। তাই তোমরা বিনা পার্থক্যে আল্লাহ ও তাঁর সকল রাসূলের উপর ঈমান আনো। আর তোমরা বলো না যে, ইলাহ হলো তিনজন। তোমরা এ জাতীয় মিথ্যা ও অসার কথা থেকে ফিরে আসো। তাহলে তোমাদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে মঙ্গল হবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা এক ইলাহ। তিনি শরীক ও সন্তান থেকে পবিত্র। তিনি অমুখাপেক্ষী। আসমান, জমিন ও এতদুভয়ের মাঝের সব কিছুর মালিক তিনি। আর এ সব কিছুর তত্ত্বাবধায়ক ও পরিচালক হিসেবে আল্লাহই যথেষ্ট।

তাফসীর

তাফসীর ইবনে কাসীর

আল্লাহ তা'আলা আহলে কিতাবকে বাড়াবাড়ি ও সীমা অতিক্রম করতে নিষেধ করছেন। খ্রীষ্টানেরা হযরত ঈসা (আঃ)-এর ব্যাপারে সীমা অতিক্রম করেছিল এবং তাকে নবুওয়াত হতে বাড়িয়ে দিয়ে আল্লাহ পর্যন্ত পৌছিয়ে দিয়েছিল। তারা তার আনুগত্য ছেড়ে তাঁর ইবাদতে লেগে পড়েছিল, এমনকি অন্যান্য মনীষীর ব্যাপারেও তাদের ধারণা খারাপ হয়ে গিয়েছিল। খ্রীষ্টান ধর্মের আলেমদেরকেও তারা নিস্পাপ মনে করতে থাকে এবং এ ধারণা করে নেয় যে, ধর্মের আলেমগণ যা কিছু বলেন তা মেনে নেয়াই অপরিহার্য কর্তব্য। সত্য-মিথ্যা, হক-বাতিল এবং সুপথ-ভ্রান্তির পথ পরীক্ষা করার কোন অধিকার তাদের নেই। যার বর্ণনা কুরআন কারীমের নিম্নের এ আয়াতে রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ “তারা তাদের আলেমদেরকে ও ধর্মাজকদেরকে তাদের প্রভু বানিয়ে নিয়েছিল।”(৯:৩১)।মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমরা আমাকে এমনভাবে বাড়িয়ে দিও না যেমনভাবে খ্রীষ্টানেরা হযরত ঈসা ইবনে মারইয়াম (আঃ)-কে বাড়িয়ে দিয়েছে। আমি তো একজন দাস মাত্র। সুতরাং তোমরা আমাকে আল্লাহর দাস ও আল্লাহর রাসূল বলবে। এ হাদীসটি সহীহ বুখারী প্রভৃতি হাদীস গ্রন্থেও রয়েছে।মুসনাদ-ই-আহমাদের অপর একটি হাদীসে রয়েছে যে, একটি লোক রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেঃ “হে মুহাম্মাদ (সঃ)! হে আমাদের নেতা ও নেতার। ছেলে! হে আমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তির ছেলে।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “হে লোক সকল! তোমরা নিজেদের কথার প্রতি খেয়াল রেখো। দেখ, শয়তান যেন তোমাদেরকে এদিক-ওদিক করে না দেয়। আমি মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ (সঃ)। আমি আল্লাহর দাস ও তাঁর রাসূল। আল্লাহর শপথ! আমি চাইনে যে, তোমরা আমাকে আমার মর্যাদা অপেক্ষা বেশী বাড়িয়ে দেবে।”এরপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ তোমরা আল্লাহ তা'আলার প্রতি মিথ্যা অপবাদ দিও না। তোমরা তাঁর স্ত্রী ও সন্তান সাব্যস্ত করো না। তিনি ওটা হতে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র। ওটা হতে তিনি বহু দূরে ও বহু উচ্চে রয়েছেন। তার শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদায় তার কোন অংশীদার নেই। তিনি ছাড়া কেউ মা'বুদ ও প্রভু নেই। হযরত মাসীহ ঈসা ইবনে মারইয়াম (আঃ) আল্লাহ তা'আলার রাসূল। তিনি তার দাসদের মধ্যে একজন দাস এবং তার একজন সৃষ্ট ব্যক্তি। তিনি শুধু। শব্দের মাধ্যমে সৃষ্ট হয়েছেন। যে শব্দটি নিয়ে হযরত জিবরাইল (আঃ) হযরত মারইয়াম (আঃ)-এর নিকট এসেছিনে এবং আল্লাহ তা'আলার নির্দেশক্রমে ঐ কালেমা তাঁর মধ্যে ফুঁকে দেন। এর ফলেই হযরত ঈসা (আঃ)-এর জন্ম হয়। পিতা ছাড়াই একমাত্র এ কালেমার মাধ্যমেই তিনি সৃষ্টি হন বলেই তাকে বিশেষভাবে কালেমাতুল্লাহ' উপাধিতে ভূষিত করা হয়। কুরআন মাজীদের অন্য আয়াতে রয়েছে (আরবী) অথাৎ হযরত মাসীহ ইবনে মারইয়াম শুধুমাত্র আল্লাহর রাসূল, তার পূর্বে বহু রাসূল অতীত হয়েছেন, তার মাতা সত্যবাদিনী, তারা দু'জন আহার্য ভোজন করতো।' (৫:৭৫) অন্য আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃঅর্থাৎ “ঈসার দৃষ্টান্ত আল্লাহ তা'আলার নিকট আদমের মতই, তাকে তিনি মাটি দ্বারা সৃষ্টি করেছেন অতঃপর বলেছেন- হও, আর তেমনই হয়ে গেছে।”(৩:৫৯) কুরআন কারীমের অন্য আয়াতে রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ “যে তার লজ্জাস্থান সংরক্ষণ করেছে এবং আমি স্বীয় রূহ তার মধ্যে ফুকে দিয়েছি এবং তাকে ও তার পুত্রকে বিশ্ববাসীর জন্যে নিদর্শন বানিয়েছি।” (২১৪ ৯১) আর এক আয়াতে রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ “এবং ইমরানের কন্যা মারইয়াম যে তার লজ্জাস্থান সংরক্ষণ করেছে।” (৬৬:১২) হযরত ঈসা (আঃ) সম্পর্কে এ আয়াতে বলা হয়েছে (আরবী) অর্থাৎ “সে (ঈসা আঃ) একজন দাস ছাড়া কিছুই নয়, আমি তাকে পুরস্কৃত করেছিলাম।” (৪৩:৫৯) সুতরাং ভাবার্থ এই নয় যে, স্বয়ং আল্লাহর কালেমাই ঈসা (আঃ) হয়ে গেছেন। বরং ভাবার্থ হচ্ছে এই যে, আল্লাহ তাআলার কালেমার মাধ্যমে হযরত ঈসা (আঃ)-এর জন্ম হয়েছে। সহীহ বুখারী শরীফে হযরত উবাদা ইবনে সামিত (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি সাক্ষ্য দিয়েছে যে আল্লাহ এক, তার কোন অংশীদার নেই, মুহাম্মাদ (সঃ) তাঁর বান্দাহ্ ও রাসূল, ঈসা (আঃ) আল্লাহর বান্দাহ ও তাঁর রাসূল এবং তাঁর কালেমা যা তিনি মারইয়ামের মধ্যে ফুকে দিয়েছিলেন ও তিনি তাঁর রূহ এবং আরও সাক্ষ্য দেয় যে, জান্নাত ও জাহান্নাম সত্য, তার আমল যাই হোক না কেন আল্লাহ তাআলা তাকে জান্নাতে প্রবিষ্ট করবেন।” অন্য বর্ণনায় এতটুকু বেশী রয়েছে যে, সে জান্নাতের আটটি দরজার মধ্যে যেটি দিয়ে ইচ্ছে প্রবেশ করবে। হযরত ঈসা (আঃ)-কে যেমন হাদীসে ও কুরআনে বলা (আরবী) হয়েছে ঐ রকমই কুরআন কারীমের একটি আয়াতে রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ “তিনি যা কিছু আকাশে ও যা কিছু যমীনে রয়েছে সমস্তই নিজের পক্ষ হতে তোমাদের অনুগত করে দিয়েছেন।” (৪৫:১৩) অর্থাৎ স্বীয় মাখলুক হতে ও নিজের রূহ হতে (আরবী)-এর ভাবার্থ এটাই। সুতরাং এখানে শব্দটি (আরবী) - এর জন্যে অর্থাৎ কতককে বুঝাবার জন্যে নয়, যেমন অভিশপ্ত খ্রীষ্টানদের ধারণা রয়েছে যে হযরত ঈসা (আঃ) আল্লাহর একটা অংশ ছিলেন। বরং (আরবী) এখানে (আরবী) অর্থাৎ প্রারম্ভের জন্যে এসেছে। হযরত মুজাহিদ বলেন যে, (আরবী) -এর ভাবার্থ হচ্ছে (আরবী) অর্থাৎ তার পক্ষ হতে রাসূল। আবার কেউ কেউ বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে (আরবী) কিন্তু বেশী স্পষ্ট হচ্ছে প্রথম উক্তিটি। অর্থাৎ তাকে রূহ দ্বারা সৃষ্টি করা হয়েছে যা স্বয়ং আল্লাহ তা'আলার মাখলুক। সুতরাং তাকে ‘রূহুল্লাহ’ বলা ঐরূপই যেরূপ বলা হয় নাকাতুল্লাহ' (আল্লাহর উষ্ট্রী) এবং বায়তুল্লাহ'। অর্থাৎ শুধুমাত্র সৌজন্য প্রকাশ করার উদ্দেশ্যেই নিজের দিকে সম্বন্ধ লাগিয়েছেন। হাদীস শরীফে এও রয়েছে যে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমি আমার প্রভুর নিকট তাঁর ঘরে যাবো।”তারপরে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তোমরা এ বিশ্বাস করে নাও যে, আল্লাহ এক, তিনি স্ত্রী ও সন্তানাদি হতে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র এবং এটাও বিশ্বাস করে নাও যে, ঈসা (আঃ) আল্লাহর দাস, তাঁর সৃষ্ট এবং তার সম্মানিত রাসূল। তোমরা তিন’ বলল না। অর্থাৎ ঈসা (আঃ) ও মারইয়াম (আঃ)-কে আল্লাহর সাথে অংশীদার করো না। কেউ যে তাঁর অংশীদার হবে এ হতে তিনি সম্পূর্ণরূপে পবিত্র। সূরা-ই-মায়েদায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ যারা বলে যে, আল্লাহ তিনজনের মধ্যে একজন তারা অবশ্যই কাফির হয়ে গেছে, আল্লাহ এক, তিনি ছাড়া কেউ ইবাদতের যোগ্য নেই। (৫৪৭৩) যেমন আল্লাহ তা'আলা সূরা-ই-মায়েদার শেষে বলেছেন- (আরবী) অর্থাৎ যখন আল্লাহ বললেন- হে মারইয়াম নন্দন ঈসা, তুমি কি লোকদেরকে বলেছিলে যে, আল্লাহকে পরিত্যাগ করে তোমরা আমাকে ও আমার মাতাকে দুই মাদরূপে গ্রহণ কর?' (৫:১১৬) হযরত ঈসা (আঃ) ওটা সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করবেন। খ্রীষ্টানদের নিকট এ ব্যাপারে দলীল প্রমাণ কিছুই নেই। অযথা তারা ভ্রান্তির পথে চালিত হয়ে নিজেদেরকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ তো হযরত ঈসা (আঃ)-কে আল্লাহ বলে বিশ্বাস করে নিয়েছে। আর কেউ কেউ তাঁকে আল্লাহ তা'আলার শরীক মনে করছে। আবার কেউ কেউ তাঁকে আল্লাহ তা'আলার পুত্র বলছে।সত্য কথা এই যে, যদি দশজন খ্রীষ্টান একত্রিত হয় তবে তাদের খেয়াল হবে এগার রকম। সাঈদ ইবনে বাতরীক ইসকানদারী নামক খ্রীষ্টানদের একজন বড় পণ্ডিত প্রায় চারশ হিজরীতে বর্ণনা করেছে যে, কনসটান্টিনোপলের প্রতিষ্ঠাতা কুসতুনতীনের আমলে সে যুগীয় বাদশাহর নির্দেশক্রমে খ্রীষ্টানদের এক সম্মেলন হয়। তথায় তাদের দু’হাজারেরও বেশী বড় বড় পাদরী ছিল। অতঃপর তাদের মধ্যে এত বেশী মতবিরোধ সৃষ্টি হয় যে, কোন বিষয়ের উপর সত্তর আশি জনের বেশী লোক একমত হতে পারেনি। দশজনের এক রকম বিশ্বাস, বিশজনের আর এক খেয়াল, চল্লিশজন অন্য কিছু বলে এবং ষাট জন অন্য দিকে যায়। মোটকথা, হাজার হাজার লোকের মধ্যে অতিকষ্টে মাত্র তিনশ আঠারোজন লোক এক সিদ্ধান্তে একমত হয়। বাদশাহ ঐ আকীদাকেই গ্রহণ করে এবং বাকীগুলো পরিত্যাগ করে। তাদেরই সে পৃষ্ঠপোষকতা করে এবং তাদের জন্যে গীর্জা বানিয়ে দেয়, গ্রন্থরাজি লিখিয়ে দেয় ও আইন কানুন লিপিবদ্ধ করে। ওরাই আমানত-ই-কুবরার মাসআলা বের করে যা প্রকৃতপক্ষে জঘন্যতম। খেয়ানতই ছিল। ঐ লোকগুলোকে মালেকানিয়্যাহ' বলা হয়। দ্বিতীয় বার সম্মেলনে যে দলটি গঠিত হয়, তার নাম হচ্ছে ইয়াকুবিয়্যাহ। অতঃপর তৃতীয় সম্মেলনে যে দলটি গঠিত হয় তার নাম নাসতুরিয়্যাহ।' এ তিনটি দল হযরত ঈসা (আঃ)-এর ব্যাপারে তিনটি উক্তি করে থাকে। (অর্থাৎ একদল তাঁকেই আল্লাহ বলে, একদল তাঁকে আল্লাহর অংশীদার বলে এবং একদল তাকে আল্লাহর পুত্র বলে)। তারা আবার একে অপরকে কাফির বলে থাকে। আর আমাদের নিকট তো তারা সবাই কাফির। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তোমরা এটা হতে বিরত হও এবং এ বিরত থাকাই তোমাদের জন্যে মঙ্গলজনক। আল্লাহ তো এক, সন্তান হওয়া হতে তাঁর সত্তা সম্পূর্ণ পবিত্র। সমস্তই তার সৃষ্ট এবং সমস্ত কিছুই তার অধিকারে রয়েছে। সকলেই তাঁর দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ। সবকিছুই তার উপর নির্ভরশীল। তাহলে তাঁরই মাখলুকের মধ্যে কেউ তার স্ত্রী এবং কেউ তার সন্তান কিরূপে হতে পারে? অন্য একটি আয়াতে রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ তিনি তো হচ্ছেন প্রথম আকাশ ও যমীনের সৃষ্টিকারী, সুতরাং কিরূপে তাঁর সন্তান হতে পারে? (৬:১০১) সূরা-ই-মারইয়ামের (আরবী) হতে (আরবী) (১৯:৮৮-৯৫) পর্যন্ত আয়াতেও বিস্তারিতভাবে এর অস্বীকৃতি রয়েছে।

তাফসীর আবু বকর যাকারিয়া

হে কিতাবীরা! স্বীয় দ্বীনের মধ্যে তোমরা বাড়াবাড়ি করো না [১] এবং আল্লাহর উপর সত্য ব্যতীত কিছু বলো না। মারইয়াম-তনয় ঈসা মসীহ কেবল আল্লাহর রাসূল এবং তাঁর বাণী [২], যা তিনি মারইয়ামের কাছে পাঠিয়েছিলেন ও তাঁর পক্ষ থেকে রূহ। কাজেই তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলদের উপর ঈমান আন এবং বলো না, ‘তিন [৩] !’ নিবৃত্ত হও, এটাই তোমাদের জন্য কল্যাণকর হবে। আল্লাহই তো এক ইলাহ; তাঁর সন্তান হবে - - -তিনি এটা থেকে পবিত্র-মহান। আসমানসমূহে যা কিছু আছে ও যমীনে যা কিছু আছে সব আল্লাহরই; আর কর্মবিধায়করূপে আল্লাহই যথেষ্ট [৪]।

[১] (غُلُوّ) শব্দের অর্থ সীমা ছাড়িয়ে যাওয়া। অর্থাৎ দ্বীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করার অর্থ তার ন্যায়সঙ্গত সীমারেখা অতিক্রম করা । আহলে কিতাব অর্থাৎ ইয়াহুদী-নাসারা উভয় জাতিকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে, দ্বীনের ব্যাপারে কোনরূপ বাড়াবাড়ি করো না। কারণ এ বাড়াবাড়ি রোগে উভয় জাতিই আক্রান্ত হয়েছে। নাসারারা ঈসা ‘আলাইহিস সালাম-কে ভক্তি-শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করেছে। তাকে স্বয়ং আল্লাহ, আল্লাহর পুত্র অথবা তিনের এক আল্লাহ বানিয়ে দিয়েছে। অপরদিকে ইয়াহুদীরা তাকে অমান্য ও প্রত্যাখ্যান করার দিক দিয়ে বাড়াবাড়ি পথ অবলম্বন করেছে। তারা ঈসা ‘আলাইহিস সালাম-কে আল্লাহর নবী হিসেবে স্বীকার করেনি। বরং তাঁর মাতা মারইয়াম ‘আলাইহিস সালাম-এর উপর মারাত্মক অপবাদ আরোপ করেছে এবং তার নিন্দাবাদ করেছে। দ্বীনের ব্যাপারে বাড়াবড়ি ও সীমালংঘনের কারণে ইয়াহুদী ও নাসারাদের গোমরাহী ও ধ্বংস হওয়ার শোচনীয় পরিণতি বার বার প্রত্যক্ষ হয়েছে। তাই রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর প্রিয় উম্মতকে এ ব্যাপারে সংযত থাকার জন্য সতর্ক করেছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন ‘তোমরা আমার প্রশংসা করতে গিয়ে এমন অতিরঞ্জিত করো না, যেমন নাসারারা ঈসা ইবন মারইয়াম ‘আলাইহিমুস্ সালাম-এর ব্যাপারে করেছে। স্মরণ রাখবে যে, আমি আল্লাহর বান্দা। অতএব, আমাকে আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল বলবে’। [বুখারীঃ ৩৪৪৫]

অর্থাৎ আল্লাহর বান্দা ও মানুষ হিসেবে আমিও অন্য লোকদের সমপর্যায়ের। তবে আমার সবচেয়ে বড় মর্যাদা এই যে, আমি আল্লাহর রাসূল। এর চেয়ে অগ্রসর করে আমাকে আল্লাহ্ তা’আলার কোন বিশেষণে বিশেষিত করা বাড়াবাড়ি বৈ নয়। তোমরা ইয়াহুদী-নাসারাদের মতো বাড়াবাড়ি করো না। হাদীসে এসেছে যে, হজের সময় ‘রমীয়ে জামারাহ’ অর্থাৎ কংকর নিক্ষেপের জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা-কে কংকর আনতে আদেশ করলেন। তিনি মাঝারি আকারের পাথরকুচি নিয়ে এলে রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম অত্যন্ত পছন্দ করলেন এবং বললেন, ‘এ ধরণের মাঝারী আকারের কংকর নিক্ষেপ করাই পছন্দনীয়’। বাক্যটি তিনি দু’বার বললেন। তারপর বললেন, ‘তোমরা দ্বীনের মধ্যে বাড়াবাড়ি থেকে দূরে থেকো। কেননা, তোমাদের পূর্ববতী উম্মতসমূহ তাদের দ্বীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করার কারণেই ধ্বংস হয়েছে’। [ইবন মাজাহ: ৩০২৯]

আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমন একটি কাজ করলেন যাতে ‘রুখসত’ বা ছাড় ছিল। কিন্তু কিছু লোক সেটা করতে অপছন্দ করল। সেটা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে পৌঁছলে তিনি আল্লাহর হামদ ও প্রশংসার পর বললেন, কিছু লোকের এ কি অবস্থা হয়েছে যে, তারা আমি যা করছি তা করা থেকে নিজেদেরকে বাঁচিয়ে রাখতে চায়? আল্লাহর শপথ, আল্লাহর ব্যাপারে আমি তাদের থেকে সবচেয়ে বেশী জানি এবং তাদের থেকেও বেশী আল্লাহর ভয় করি। [বুখারী: ৭৩০১]

[২] এখানে ‘কালেমাতুহু’ শব্দে বাতলে দেয়া হয়েছে যে, ঈসা ‘আলাইহিস সালাম আল্লাহর কালেমা। মুফাসসিরগণ এর বিভিন্ন অর্থ বর্ণনা করেছেন-

(এক) ‘কালেমাতুল্লাহ’ অর্থ আল্লাহর সুসংবাদ। এর দ্বারা ঈসা ‘আলাইহিস সালাম-এর ব্যক্তি-সত্তাকে বোঝানো হয়েছে। ইতোপূর্বে আল্লাহ তা’আলা ফিরিশতার মাধ্যমে মারইয়াম ‘আলাইহিস সালামকে ঈসা ‘আলাইহিস সালাম সম্পর্কে যে সুসংবাদ দান করেছিলেন সেখানে ‘কালেমা’ শব্দ প্রয়োগ করা হয়েছে। বলা হয়েছে,

(اِذْ قَالَتِ الْمَلٰۗىِٕكَةُ يٰمَرْيَمُ اِنَّ اللّٰهَ يُبَشِّرُكِ بِكَلِمَةٍ)

“যখন ফিরিশতারা বললো, হে মারইয়াম! নিশ্চয় আল্লাহ তোমাকে সুসংবাদ দিচ্ছেন এক ‘কালেমা’র”। [সূরা আলে-ইমরানঃ ৪৫] (দুই) কারো মতে এখানে ‘কালেমা’ অর্থ নিদর্শন। যেমন অন্য এক আয়াতে শব্দটি নিদর্শন অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। যথা: (وَصَدَّقَتْ بِكَلِمٰتِ رَبِّهَا) [সূরা আত-তাহরীম: ১২] তাই আল্লাহ্ তা’আলা কর্তৃক মারইয়ামের প্রতি কালেমা পাঠাবার অর্থ হচ্ছে এই যে, আল্লাহ তা’আলা মারইয়াম আলাইহাস সালামের গর্ভাধারকে কোন পুরুষের শুক্ৰকীটের সহায়তা ছাড়াই গর্ভধারণের হুকুম দিলেন। সে হিসেবে ঈসা ‘আলাইহিস সালাম শুধু আল্লাহর কালেমা বা নির্দেশে চিরাচরিত প্রথার বিপরীতে পিতার মাধ্যম ছাড়াই জন্মগ্রহণ করেছিলেন। (তিন) কাতাদা বলেন, কালেমা দ্বারা (كُنْ) বা ‘হও’ শব্দ বোঝানো হয়েছে। [তাবারী] ঈসা ‘আলাইহিস সালামকে ‘কালেমাতুল্লাহ’ বলার কারণ হচ্ছে এই যে, ঈসা ‘আলাইহিস সালামের জন্মের ব্যাপারটি জাগতিক কোন মাধ্যম বাদেই আল্লাহর কালেমা দ্বারা সংঘটিত হয়েছে। এখানে তাকে ‘আল্লাহর কালাম’ বলে বিশেষভাবে উল্লেখ করে সম্মানিত করাই উদ্দেশ্য। নতুবা সবকিছুই আল্লাহর কালেমার মাধ্যমেই হয়। তাঁর কালেমা ব্যতীত কিছুই হয় না। আল্লাহ ঈসা ‘আলাইহিস সালামকে তাঁর নিদর্শন ও আশ্চৰ্যতম সৃষ্টি হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। তিনি জিবরাইল ‘আলাইহিস সালামকে মারইয়ামের নিকট পাঠালেন। জিবরাইল ‘আলাইহিস সালাম তার জামার ফাঁকে ফু দিলেন। এ পবিত্র ফেরেশতার পবিত্র ফুঁ মারইয়ামের গর্ভে প্রবেশ করলে আল্লাহ তা’আলা সে ফুঁকটিকে পবিত্র রুহ হিসেবে পরিণত করলেন। আর এ জন্যই তাঁকে সম্মানিত করে ‘রুহুল্লাহ’ বলা হয়ে থাকে। [তাফসীরে সা’দী]

[৩] কুরআন নাযিলের সমসাময়িক কালে খৃষ্টানরা যেসব উপদলে বিভক্ত ছিল, তন্মধ্যে ত্রিত্ববাদ সম্পর্কে তাদের ধর্মবিশ্বাস তিনটি ভিন্ন ভিন্ন মূলনীতির উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। এক দল মনে করতো- মসীহই আল্লাহ। স্বয়ং আল্লাহই মসীহরূপে পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়েছেন। দ্বিতীয় দল বলতো -মসীহ পুত্র। তৃতীয় দলের বিশ্বাস ছিল -তিন সদস্যের সমন্বয়ে আল্লাহর একক পরিবার। এ দলটি আবার দু’টি উপদলে বিভক্ত ছিল। এক দলের মতে পিতা, পুত্র ও মারইয়াম এ তিনের সমন্বয়ে এক আল্লাহ। অন্য একদলের মতে মারইয়াম ‘আলাইহিস সালাম-এর পরিবর্তে ‘রূহুল কুদুস’ বা পবিত্র আত্মা জিবরাঈল ‘আলাইহিস সালাম ছিলেন তিন আল্লাহর একজন। মোটকথা, খৃষ্টানরা ঈসা ‘আলাইহিস সালাম-কে তিনের এক আল্লাহ মনে করতো। তাদের ভ্রান্তি অপনোদনের জন্য কুরআনুল কারীমে প্রত্যেকটি উপদলকে ভিন্ন ভিন্নভাবে সম্বোধন করা হয়েছে এবং সম্মিলিতভাবেও সম্বোধন করা হয়েছে। তাদের সামনে স্পষ্ট ও জোরালোভাবে তুলে ধরা হয়েছে যে, সত্য একটিই। আর তা হলো ঈসা মসীহ ‘আলাইহিস সালাম তার মাতা মারইয়াম ‘আলাইহিস সালাম -এর গর্ভে জন্মগ্রহণকারী একজন মানুষ ও আল্লাহ্ তা’আলার সত্য রাসূল। এর অতিরিক্ত তাঁর সম্পর্কে যা কিছু বলা বা ধারণা করা হয়, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও বাতিল। তাঁর প্রতি ইয়াহুদীদের মত অবজ্ঞা বা ঈর্ষা পোষণ করা অথবা খৃষ্টানদের মত অতিভক্তি প্রদর্শন করা সমভাবে নিন্দনীয় ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কুরআনুল কারীমের অসংখ্য আয়াতে একদিকে ইয়াহুদী-খৃষ্টানদের পথভ্রষ্টতা দৃঢ়ভাবে প্রকাশ করা হয়েছে, অপরদিকে আল্লাহ্ তা’আলার দরবারে ঈসা ‘আলাইহিস সালাম-এর উচ্চ মর্যাদা ও বিশেষ সম্মানের অধিকারী হওয়ার কথাও জোরালোভাবে ব্যক্ত করা হয়েছে। ফলে অবজ্ঞা ও অতিভক্তি দু’টি পরস্পর বিরোধী ভ্রান্ত মতবাদের মধ্যবর্তী সত্য ও ন্যায়ের সঠিক পথ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।

[৪] অর্থাৎ আকাশ ও যমীনের উপর হতে নীচে পর্যন্ত যাকিছু আছে সবই আল্লাহ তা'আলার সৃষ্টি ও তাঁর বান্দা। অতএব, তাঁর কোন অংশীদার বা পুত্র-পরিজন হতে পারে না। আল্লাহ তা’আলা একাই সর্বকার্য সম্পাদনকারী এবং সকলের কার্য সম্পাদনের জন্য তিনি একাই যথেষ্ট; অন্য কারো সাহায্য-সহযোগীতার প্রয়োজন নেই। তিনি একক, তাঁর কোন অংশীদার বা পুত্র-পরিজন থাকতে পারে না। সারকথা, কোন সৃষ্ট ব্যক্তিরই স্রষ্টার অংশীদার হওয়ার যোগ্যতা নেই। আল্লাহ তা’আলার পবিত্র সত্তার জন্য এর অবকাশও নেই, প্রয়োজনও নেই। অতএব, একমাত্র বিবেকবর্জিত, ঈমান হতে বঞ্চিত ব্যক্তি ছাড়া আল্লাহ্ তা’আলার সৃষ্ট কোন জীবকে তাঁর অংশীদার বা পুত্র বলা অন্য কারো পক্ষে সম্ভব নয়।