An-Nisa
আন-নিসা: 105
4 আন-নিসা An-Nisa · 176 আয়াত النساء
আরবি
إِنَّآ أَنزَلْنَآ إِلَيْكَ ٱلْكِتَـٰبَ بِٱلْحَقِّ لِتَحْكُمَ بَيْنَ ٱلنَّاسِ بِمَآ أَرَىٰكَ ٱللَّهُ ۚ وَلَا تَكُن لِّلْخَآئِنِينَ خَصِيمًا
English Translations
Indeed, We have revealed to you, [O Muḥammad], the Book in truth so you may judge between the people by that which Allāh has shown you. And do not be for the deceitful an advocate.
Surely, We have sent down to you (O Muhammad SAW) the Book (this Quran) in truth that you might judge between men by that which Allah has shown you (i.e. has taught you through Divine Inspiration), so be not a pleader for the treacherous.
Surely, We have revealed to you the Book with the truth, so that you may judge between people according to what Allah has shown you. Do not be an advocate for those who breach trust.
(O Messenger!) We have revealed to you this Book with the Truth so that you may judge between people in accordance with what Allah has shown you. So do not dispute on behalf of the dishonest,
Lo! We reveal unto thee the Scripture with the truth, that thou mayst judge between mankind by that which Allah showeth thee. And be not thou a pleader for the treacherous;
We have sent down to thee the Book in truth, that thou mightest judge between men, as guided by Allah: so be not (used) as an advocate by those who betray their trust;
বাংলা অনুবাদ
অবশ্যই আমি সত্য সহকারে তোমার প্রতি কিতাব নাযিল করেছি, যেন তুমি যা আল্লাহ তোমাকে জানিয়েছেন, সে অনুসারে মানুষের মধ্যে বিচার ফায়সালা কর এবং খিয়ানতকারীদের পক্ষে তর্ক করো না।
নিশ্চয় আমি তোমার প্রতি যথাযথভাবে কিতাব নাযিল করেছি, যাতে তুমি মানুষের মধ্যে ফয়সালা কর সে অনুযায়ী যা আল্লাহ তোমাকে দেখিয়েছেন। আর তুমি খিয়ানতকারীদের পক্ষে বিতর্ককারী হয়ো না।
নিশ্চয়ই আমি তোমার প্রতি সত্যসহ গ্রন্থ অবতীর্ণ করেছি - যেন তুমি তদনুযায়ী মানবদেরকে আদেশ প্রদান কর, যা আল্লাহ তোমাকে শিক্ষা দান করেছেন এবং তুমি বিশ্বাসঘাতকদের পক্ষে বিতর্ককারী হয়োনা।
আমরা তো আপনার প্রতি সত্যসহ কিতাব নাযিল করেছি যাতে আপনি আল্লাহ আপনাকে যা জানিয়েছেন সে অনুযায়ী মানুষের মধ্যে বিচার মীমাংসা করতে পারেন। আর আপনি বিশ্বাসভঙ্গকারীদের সমর্থনে তর্ক করবেন না
আমি তো তোমার প্রতি সত্যসহ কিতাব নাযিল করেছি যাতে আল্লাহ তোমাকে যা জানিয়েছেন সে অনুসারে মানুষের মধ্যে বিচার-মীমাংসা কর এবং তুমি খিয়ানতকারীদের সমর্থনে তর্ক কর না।
১০৫. হে রাসূল! আমি আপনার উপর সত্য সহ কুর‘আন নাযিল করেছি। যেন আপনি আল্লাহর দেয়া জ্ঞান ও ইলহাম অনুযায়ী মানুষকে সকল বিষয় বিস্তারিত বুঝিয়ে দিতে পারেন। তবে সেখানে ব্যক্তি ইচ্ছার প্রতিফলন যেন না ঘটে। আর আপনি নিজের ও আমানত খিয়ানতকারীদের পক্ষে তাদের কাছ থেকে অধিকার তলবকারীকে প্রতিহত করবেন না।
তাফসীর
১০৫-১০৯ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তাআলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে সম্বোধন করে বলেন-হে নবী (সঃ)! আমি তোমার উপর যে কুরআন কারীম অবতীর্ণ করেছি তার আদি হতে অন্ত পর্যন্ত সবই সত্য। ওর খবর সত্য এবং ওর নির্দেশ সত্য। তারপরে বলা হচ্ছে-‘যেন তুমি জনগণের মধ্যে ঐ ন্যায় বিচার করতে পার যা আল্লাহ তোমাকে শিখিয়েছেন।কোন কোন নীতিশাস্ত্রবিদ এর দ্বারা দলীল নিয়েছেন যে, নবী (সঃ)-কে ইজতিহাদ দ্বারা ফায়সালা করার অধিকার দেয়া হয়েছিল। এর দলীল ঐ হাদীসটিও বটে যা সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর দরজার উপর বিবাদে লিপ্ত দু’ব্যক্তির কণ্ঠস্বর শুনে বলেনঃ “জেনে রেখো যে, আমি একজন মানুষ। যা শুনি সে অনুযায়ী ফায়সালা করে থাকি। খুব সম্ভব যে, এক ব্যক্তি খুব যুক্তিবাদী এবং বাকপটু, আমি তার কথা সঠিক মনে করে হয়তো তার অনুকূলেই মীমাংসা করে দেবো, কিন্তু যার অনুকূলে মীমাংসা করবো সে হয়তো প্রকৃত হকদার নয়। সে যেন এটা বুঝে নেয় যে, ওটা তার জন্যে জাহান্নামের আগুনের একটি খণ্ড। এখন তার অধিকার রয়েছে যে, হয় সে তা গ্রহণ করবে, না হয় ছেড়ে দেবে।'মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, দু’জন আনসারী একটা উত্তরাধিকারের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট মামলা নিয়ে উপস্থিত হন। তাদের কারো কোন প্রমাণ ছিল না। সে সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের নিকট উপরোক্ত হাদীসটিই বর্ণনা করেন এবং বলেনঃ “কেউ যেন আমার ফায়সালার উপর ভিত্তি করে তার ভাই-এর সামান্য হকও গ্রহণ না করে। যদি এরূপ করে তবে কিয়ামতের দিন সে স্বীয় স্কন্ধে জাহান্নামের আগুন বুঝিয়ে নিয়ে আসবে।” তখন ঐ দু’জন মনীষী ক্রন্দনে ফেটে পড়েন এবং প্রত্যেকেই বলেনঃ “আমার নিজের হকও আমি আমার ভাইকে দিয়ে দিচ্ছি।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন তাদেরকে বলেনঃ “তোমরা যখন একথাই বলছো তখন যাও এবং তোমাদের বিবেচনায় যতদূর সম্ভব হয় ঠিকভাবে অংশ ফেলে দাও। তারপর নির্বাচনের গুটিকা নিক্ষেপ করতঃ নিজ নিজ অংশ নিয়ে নাও। অতঃপর প্রত্যেকেই স্বীয় ভ্রাতার অনিচ্ছাকৃতভাবে গৃহীত হক ক্ষমা করে দাও।”সূনান-ই-আবি দাউদের মধ্যেও এ হাদীসটি রয়েছে। তাতে এ শব্দগুলোও রয়েছেঃ “আমি তোমাদের মধ্যে স্বীয় বিবেকবুদ্ধি অনুযায়ী ঐ সব বিষয়ে ফায়সালা করে থাকি যেসব বিষয়ে কোন অহী অবতীর্ণ হয় না।” তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এর মধ্যে রয়েছে যে, আনসারদের একটি দল এক যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সঙ্গে ছিলেন। তথায় এক ব্যক্তির একটি বর্ম চুরি হয়ে যায়। লোকটি ধারণা করেন যে, তামা ইবনে উবাইরিক বর্মটি চুরি করেছে। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে ঘটনাটি পেশ করা হয়। চোরটি ঐ বর্ম এক ব্যক্তির ঘরে তার অজান্তে ফেলে দেয় এবং স্বীয় গোত্রীয় লোকদেরকে বলেঃ “আমি বর্মটি অমুকের ঘরে ফেলে দিয়েছি। তোমরা তার নিকটে পাবে।” তার গোত্রীয় লোকগুলো তখন নবী (সঃ)-এর নিকট গমন করে বলে, “হে আল্লাহর নবী (সঃ)! আমাদের সঙ্গী তো চোর নয় বরং চোর হচ্ছে অমুক ব্যক্তি। আমরা অনুসন্ধান নিয়ে জেনেছি যে, বর্মটি তার ঘরেই বিদ্যমান রয়েছে। সুতরাং আপনি জন সম্মুখে আমাদের সঙ্গীটির নির্দোষিতা ঘোষণা করতঃ তাকে রক্ষা করুন। নচেৎ ভয় আছে যে, সে ধ্বংস হয়ে যায় না কি!” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন দাড়িয়ে জনগণের সামনে তাকে দোষমুক্ত বলে ঘোষণা করেন। তখন উপরোক্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। আর যে লোকগুলো মিথ্যা গোপন রেখে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসেছিল তাদের ব্যাপারে (আরবী) হতে দুটি আয়াত অবতীর্ণ হয়। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-(আরবী) অর্থাৎ যে কেউ অপরাধ অথবা পাপ অর্জন করে, তৎপর ওর অপবাদ কোন নিরপরাধ ব্যক্তির প্রতি আরোপ করে, তবে সে নিজেই সেই অপবাদ ও প্রকাশ্য পাপ বহন করবে। এর দ্বারাও এ লোকগুলোকেই বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ চোর এবং চোরের পক্ষ হতে বিতর্ককারীদের ব্যাপারেই এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। কিন্তু এ বর্ণনাটি গারীব ও দুর্বল।কোন কোন মনীষী হতে বর্ণিত আছে যে, এ আয়াতটি বানূ উবাইরিকের চোরের সম্বন্ধে অবতীর্ণ হয়। এ ঘটনাটি জামিউত তিরমিযীর কিতাবুত তাফসীরের মধ্যে হযরত কাতাদাহ্ ইবনে নোমান (রাঃ)-এর ভাষায় সুদীর্ঘভাবে বর্ণিত আছে। হযরত কাতাদাহ ইবনে নোমান (রাঃ) বলেনঃ “আমার গোত্রের মধ্যে বাশার, বাশীর ও মুবাশশার নামক তিনজন লোক ছিল যাদেরকে বান্ উবাইরিক বলা হতো। বাশীর ছিল একজন মুনাফিক। সে কবিতা রচনা করে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবীগণের দুর্নাম করতো। অতঃপর সে কোন একজন আরবীর দিকে ঐ কবিতার সম্বন্ধ লাগিয়ে দিয়ে বেশ আগ্রহ সহকারে পাঠ করতো। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবীগণ জানতেন যে, এ খাবীসই হচ্ছে এ কবিতাগুলোর রচয়িতা। এ লোকগুলো অজ্ঞতার যুগ হতেই ছিল দরিদ্র ও অভাবী। মদীনার লোকদের সাধারণ খাবার ছিল যব ও খেজুর। তবে ধনী লোকেরা সিরিয়া হতে আগত যাত্রীদের নিকট হতে ময়দা ক্রয় করতে যা তারা নিজেদের জন্যে নির্দিষ্ট করে নিতো। বাড়ীর অন্যান্য লোকেরা সাধারণতঃ যব ও খেজুরই ভক্ষণ করতো। আমার চাচা রিফাআ ইবনে যায়েদও (রাঃ) সিরিয়া হতে আগত যাত্রীদলের নিকট হতে এক বোঝা ময়দা ক্রয় করেন এবং তা তাঁর এক কক্ষে রেখে দেন যেখানে অস্ত্র শস্ত্র, লৌহবর্ম এবং তরবারী ইত্যাদিও রক্ষিত ছিল। রাত্রে চোরেরা নীচ দিয়ে সিদ কেটে ময়দাও বের করে নেয় এবং অস্ত্র-শস্ত্রগুলোও উঠিয়ে নেয়। সকালে আমার চাচা আমার নিকট এসে সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করে। তখন আমরা অনুসন্ধান চালিয়ে জানতে পারি যে, আজ রাত্রে বানূ উবাইরিকের ঘরে আগুন জ্বলছিল এবং তারা কিছু খাদ্য রান্না করছিল। আমাদেরকে বলা হয়ঃ ‘সম্ভবতঃ আপনাদের বাড়ী হতেই তারা খাদ্য চুরি করে এনেছিল। এর পূর্বে আমরা যখন আমাদের পরিবারের লোকদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করছিলাম তখন ঐ গোত্রের লোকেরা আমাদেরকে বলেছিল, ‘তোমাদের চোর হচ্ছে লাবীদ ইবনে সহল। আমরা জানতাম যে, একাজ লাবীদের নয়, সে ছিল একজন বিশ্বস্ত খাটি মুসলমান। হযরত লাবীদ (রাঃ) এ সংবাদ পেয়ে বাইরে বেরিয়ে আসেন। তরবারী নিয়ে বানূ উবাইরিকের নিকট এসে বলেনঃ “তোমরা আমার চুরি সাব্যস্ত কর, নতুবা তোমাদেরকে হত্যা করে দেবো।' তখন তারা তাঁর নির্দোষিতা স্বীকার করে এবং তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে। আমরা পূর্ণ তদন্তের পর বুঝতে পারি যে, বানূ উবাইরিকই চুরি করেছে। আমার চাচা আমাকে বলেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট গিয়ে তুমি তাকে সংবাদটা দিয়ে এসো। আমি গিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করি এবং একথাও বলি যে, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি আমাদেরকে অস্ত্র-শস্ত্রগুলো আদায় করে দিন। খাদ্য ফিরিয়ে দেয়ার প্রয়োজন নেই। রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেনঃ “আচ্ছা, আমি তদন্ত করে দেখছি।' বানূ উবাইরিকের নিকট এ সংবাদ পৌছলে তারা হযরত উসায়েদ ইবনে উরওয়া (রাঃ) নামক এক ব্যক্তিকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট প্রেরণ করে। তিনি এসে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এতো জুলুম হচ্ছে, বানূ উবাইরিক তো সৎ ও ইসলামপন্থী লোক। তাদের উপর কাতাদাহ্ ইবনে নোমান (রাঃ) ও তাঁর চাচা চুরির অপবাদ দিচ্ছেন! অতঃপর আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে উপস্থিত হলে তিনি আমাকে বলেনঃ “তুমি তো এটা ভাল কাজ করছে না যে, দ্বীনদার ও ভাল লোকদের উপর চুরির অপবাদ দিচ্ছ, অথচ তোমার নিকট কোন প্রমাণও নেই। আমি নিরুত্তর হয়ে চলে আসি এবং মনে মনে খুব লজ্জিত ও হতবুদ্ধি হয়ে পড়ি। আমার ধারণা হয় যে, ঐ মাল সম্বন্ধে যদি নীরব থাকতাম এবং নবী (সঃ)-এর সঙ্গে কোন আলোচনাই না করতাম তাহলেই ভাল হতো। এমন সময় আমার চাচা এসে আমাকে জিজ্ঞেস করেন, তুমি কি করে আসলে?' আমি তার নিকট সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করি। শুনে তিনি বলেন, আমরা আল্লাহ তাআলার নিকটই সাহায্য প্রার্থনা করছি।' তিনি চলে যাওয়ার পর পরই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। সুতরাং (আরবী) দ্বারা বানূ উবারিককেই বুঝানো হয়েছে। হযরত কাতাদাহ (রাঃ)-কে তিনি যে কথা বলেছিলেন তার জন্যে তাকে আল্লাহ তাআলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করতে বলা হয় এবং এ কথাও বলা হয় যে, এলোকগুলো যদি ক্ষমা প্রার্থনা করে তবে আল্লাহ পাক তাদেরকে ক্ষমা করবেন। তারপর আল্লাহ তা'আলা (আরবী) পর্যন্ত এবং (আরবী) হতে (আরবী) পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন। এগুলো হযরত লাবীদ (রাঃ)-এর ব্যাপারেই অবতীর্ণ হয়। কেননা, বানূ উবাইরিক তাঁর উপর চুরির অপবাদ দিয়েছিল, অথচ তিনি ওটা হতে সম্পূর্ণ মুক্ত ছিলেন। এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (সঃ) বানূ উবাইরিকের নিকট হতে আমাদের অস্ত্র-শস্ত্রগুলো আদায় করে দেন। আমি ঐগুলো নিয়ে আমার চাচার নিকট গমন করি। তিনি এত বৃদ্ধ ছিলেন যে, চোখেও কম দেখতেন। তিনি আমাকে বলেন, হে আমার ভ্রাতুস্পুত্র! এ অস্ত্রগুলো তুমি আল্লাহ তা'আলার নামে দান করে দাও।' এতদিন পর্যন্ত আমার চাচার প্রতি আমার কিছুটা বদ ধারণা ছিল যে, তিনি অন্তরের সঙ্গে সম্পূর্ণরূপে ইসলামের মধ্যে প্রবেশ করেননি। কিন্তু এ ঘটনাটি আমার অন্তর হতে এ কু-ধারণা দূর করে দেয়। তখন আমি তাঁকে খাটি মুসলমানরূপে স্বীকার করে নেই। বাশীর এ আয়াতগুলো শুনে মুশরিকদের সাথে মিলিত হয়ে যায় এবং সালাফা বিনতে সাদ ইবনে সুমিয়্যার নিকটে অবস্থান করে। তারই ব্যাপারে (আরবী) হতে (আরবী) পর্যন্ত পরবর্তী আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়।হযরত হাসসান (রাঃ) স্বীয় কবিতার মাধ্যমে বাশীরের এ জঘন্য কার্যের নিন্দে করেন। এ কবিতাগুলো শুনে সালাফা নামী স্ত্রীলোকটি খুবই লজ্জিতা হয় এবং বাশীরের সমস্ত আসবাবপত্র মস্তকে বহন করে নিয়ে গিয়ে আবতাহ' নামক মাঠে নিক্ষেপ করে এবং তাকে বলে, তুমি কোন মঙ্গল নিয়ে আমার নিকট আসনি, বরং হযরত হাসসান (রাঃ)-এর কবিতাগুলো নিয়ে এসেছে। আমি তোমাকে আমার নিকট স্থান দেবো না। এ বর্ণনা বহু কিতাবে বহু সনদে দীর্ঘাকারে ও সংক্ষিপ্তাকারে বর্ণিত আছে।অতঃপর আল্লাহ তাআলা এ মুনাফিকদের জ্ঞানের স্বল্পতার বর্ণনা দিচ্ছেন যে, তারা তাদের মন্দ কার্যাবলী জনগণের নিকট গোপন করছে বটে কিন্তু এতে লাভ কি? তারা সেটা আল্লাহ তাআলা হতে গোপন করতে পারবে না। অতঃপর তাদেরকে সম্বোধন করে বলেন-“মানলাম যে, এভাবে তোমাদের কার্যকলাপ গোপন করতঃ তোমরা পৃথিবীর বিচারকদের নিকট হতে বেঁচে গেলে, কেননা তারা বাহ্যিকের উপর ফায়সালা দিয়ে থাকে। কিন্তু কিয়ামতের দিন তোমরা সেই আল্লাহ তা'আলার সামনে কি উত্তর দেবে যিনি প্রকাশ্য ও গোপনীয় সবই জানেন? তথায় তোমরা তোমাদের মিথ্যা দাবীকে সত্যরূপে প্রমাণ করার জন্যে কাকে উকিল করে পাঠাবে? মোটকথা সে দিন তোমাদের কোন কৌশলই ফলদায়ক হবে না।
আমরা [১] তো আপনার প্রতি সত্যসহ কিতাব নাযিল করেছি যাতে আপনি আল্লাহ আপনাকে যা জানিয়েছেন সে অনুযায়ী মানুষের মধ্যে বিচার মীমাংসা করতে পারেন। আর আপনি বিশ্বাসভঙ্গকারীদের সমর্থনে তর্ক করবেন না [২]
ষোলতম রুকূ‘
[১] সূরা আন-নিসার ১০৫ থেকে ১১৩ নং আয়াত এক বিশেষ ঘটনার সাথে সম্পর্কযুক্ত। ঘটনাটি হচ্ছে, হিজরতের প্রাথমিক যুগে সাধারণ মুসলিমদের আর্থিক অবস্থা খুব খারাপ ছিল। তাদের সাধারণ খাদ্য ছিল যবের আটা কিংবা খেজুর কিংবা গমের আটা। এগুলো প্রায়ই মদীনায় পাওয়া যেতো না। সিরিয়া থেকে কোন চালান এলে কেউ কেউ তা সংগ্রহ করে রাখত। রিফা’আ ইবন যায়েদ রাদিয়াল্লাহু আনহু এ ধরনের কিছু গমের আটা সংগ্রহ করে একটি বস্তায় রেখে দিয়েছিলেন। এ বস্তার মধ্যে কিছু অস্ত্র-শস্ত্রও রেখে একটি ছোট কক্ষে সংরক্ষিত রেখেছিলেন। মদীনাতে তখন বনু উবাইরাক গোত্রের বিশর, বশীর ও মুবাশশির নামীয় তিন লোক বিশেষ কারণে খ্যাতি লাভ করেছিল। তন্মধ্যে বশীর ছিল প্রকৃতই মুনাফিক। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের নামে বদনামী করে কবিতা রচনা করে অন্যের নামে চালিয়ে দিত। সেই বশীর সিধ কেটে রিফা'আ ইবন যায়েদের সে বস্তা বের করে নেয়। সকালে রিফা'আ রাদিয়াল্লাহু আনহু ব্যাপারটি তার ভ্রাতুষ্পপুত্র কাতাদার কাছে বিবৃত করলেন। বনু উবায়রাক বললো, সম্ভবত এটা লবীদ ইবন সাহলের কীর্তি। লবীদ ইবন সাহল তা শুনে অত্যন্ত ক্রোধাম্বিত হলেন এবং তরবারী কোষমুক্ত করে বললেন, আমার উপর অপবাদ চাপানো হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন পন্থায় কাতাদা ও রিফা’আ রাদিয়াল্লাহু আনহুমার প্রবল ধারণা জন্মেছিল যে, এটি বনী উবাইরাকের কীর্তি। তখন কাতাদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে চুরির ঘটনা এবং তদন্তক্রমে বনু উবাইরাকের প্রতি প্রবল ধারণার কথা আলোচনা করলেন। বনু উবায়রাক সংবাদ পেয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে রিফা'আ ও কাতাদার বিরুদ্ধে অভিযোগ করল যে, শরীআতসম্মত প্রমাণ ছাড়াই তারা আমাদের নামে চুরির অপবাদ আরোপ করছে। আপনি তাদেরকে বারণ করুন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাই করলেন। কিন্তু বেশীদিন অতিবাহিত না হতেই এ ব্যাপারে বেশ কয়েকটি আয়াত নাযিল হয়। যার মাধ্যমে সমস্ত ঘটনা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে তুলে ধরা হয়। প্রথমে আয়াতে বলা হয়েছে, “আমরা তো আপনার প্রতি সত্যসহ কিতাব নাযিল করেছি যাতে আপনি আল্লাহ আপনাকে যা জানিয়েছেন সে অনুযায়ী মানুষের মধ্যে বিচার মীমাংসা করতে পারেন এবং বিশ্বাসঘাতকদের অর্থাৎ বনী উবাইরাক এর সমর্থনে তর্ক করবেন না। আর আপনি ধারণার বশবর্তী হয়ে সাহাবী কাতাদা ইবন নুমানকে যা বলা হয়েছে সে জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থী হোন। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। আর যারা নিজেদেরকে প্রতারিত করে তাদের পক্ষে বাদ-বিসম্বাদ করবেন না, নিশ্চয় আল্লাহ বিশ্বাস ভংগকারী পাপীকে পছন্দ করেন না। তারা মানুষ থেকে গোপন করতে চায় কিন্তু আল্লাহর থেকে গোপন করে না, অথচ তিনি তাদের সংগেই আছেন রাতে যখন তারা, তিনি যা পছন্দ করেন না- এমন বিষয়ে পরামর্শ করে এবং তারা যা করে তা সর্বতোভাবে আল্লাহর জানা রয়েছে। দেখ, তোমরাই ইহ জীবনে তাদের পক্ষে বিতর্ক করছ; কিন্তু কিয়ামতের দিন আল্লাহর সম্মুখে কে তাদের পক্ষে বিতর্ক করবে অথবা কে তাদের উকিল হবে? কেউ কোন মন্দ কাজ করে অথবা নিজের প্রতি যুলুম করে পরে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করলে আল্লাহকে সে ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু পাবে। অর্থাৎ যদি তারা ক্ষমা প্রার্থী হতো তবে আল্লাহ অবশ্যই তাদের ক্ষমা করে দিতেন। আর কেউ পাপ কাজ করলে সে ওটা তার নিজের ক্ষতির জন্যই করে। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়। কেউ কোন দোষ বা পাপ করে পরে ওটা কোন নির্দোষ ব্যক্তি অর্থাৎ লবীদ ইবন সাহলের প্রতি আরোপ করলে সে তো মিথ্যা অপবাদ ও স্পষ্ট পাপের বোঝা বহন করে। তারপর আল্লাহ্ তা’আলা রাসূলকে উদ্দেশ্য করে নাযিল করলেন, আপনার প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়া না থাকলে তাদের একদল আপনাকে পথভ্রষ্ট করতে বদ্ধপরিকর ছিল। কিন্তু তারা নিজেদের ছাড়া আর কাউকেও পথভ্রষ্ট করে না এবং আপনার কোনই ক্ষতি করতে পারে না। আল্লাহ আপনার প্রতি কিতাব ও হিকমত নাযিল করেছেন এবং আপনি যা জানতেন না তা আপনাকে শিক্ষা দিয়েছেন, আপনার প্রতি আল্লাহর মহা অনুগ্রহ রয়েছে। এ আয়াতসমূহ নাযিল হলে মূল ঘটনা স্পষ্ট হয়ে গেল। বনু উবাইরাকের কাছ থেকে অস্ত্র-শস্ত্র নিয়ে এসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম রিফা’আর কাছে তা ফেরৎ দিলেন। তিনি সে সমুদয় আল্লাহর রাস্তায় দান করে দিলেন। এদিক বিশর মুনাফেকী অবস্থা ধরা পড়ে যাওয়ার কারণে মক্কায় সুলাফা বিনতে সাদ ইবন সুমাইয়া নামীয় এক মহিলার কাছে গিয়ে সরাসরি মুর্তাদ হয়ে গেল। তখন ১১৫ নং আয়াত নাযিল হলো, যাতে হক প্রকাশিত হওয়ার পরে রাসূলের বিরুদ্ধাচারণের কারণে কঠিন শাস্তির ঘোষণা দেয়া হয়েছে। [তিরমিযী: ৩০৩৬; মুস্তাদরাকে হাকিম ৪/৩৮৫] ঘটনা যাই হোক, কুরআনের সাধারণ পদ্ধতি অনুযায়ী এ ব্যাপারে প্রদত্ত নির্দেশাবলী এ ঘটনার সাথে বিশেষভাবে সম্পর্কযুক্ত নয়; বরং বর্তমান ও ভবিষ্যতে আগমনকারী মুসলিমদের জন্য ব্যাপক। এছাড়া এসব নির্দেশের মধ্যে অনেক মৌলিক ও শাখাগত মাস’আলাও রয়েছে।
[২] আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি যে, আল্লাহর কসম অবশ্যই আমি দিনে সত্তর বারেরও অধিক আল্লাহর নিকট এস্তেগফার এবং তাওবা করে থাকি। [বুখারীঃ ৬৩০৭]
