An-Nisa

আন-নিসা: 77

4:77

আরবি

أَلَمْ تَرَ إِلَى ٱلَّذِينَ قِيلَ لَهُمْ كُفُّوٓا۟ أَيْدِيَكُمْ وَأَقِيمُوا۟ ٱلصَّلَوٰةَ وَءَاتُوا۟ ٱلزَّكَوٰةَ فَلَمَّا كُتِبَ عَلَيْهِمُ ٱلْقِتَالُ إِذَا فَرِيقٌ مِّنْهُمْ يَخْشَوْنَ ٱلنَّاسَ كَخَشْيَةِ ٱللَّهِ أَوْ أَشَدَّ خَشْيَةً ۚ وَقَالُوا۟ رَبَّنَا لِمَ كَتَبْتَ عَلَيْنَا ٱلْقِتَالَ لَوْلَآ أَخَّرْتَنَآ إِلَىٰٓ أَجَلٍ قَرِيبٍ ۗ قُلْ مَتَـٰعُ ٱلدُّنْيَا قَلِيلٌ وَٱلْـَٔاخِرَةُ خَيْرٌ لِّمَنِ ٱتَّقَىٰ وَلَا تُظْلَمُونَ فَتِيلًا

English Translations

Sahih International

Have you not seen those who were told, "Restrain your hands [from fighting] and establish prayer and give zakāh"? But then when battle was ordained for them, at once a party of them feared men as they fear Allāh or with [even] greater fear. They said, "Our Lord, why have You decreed upon us fighting? If only You had postponed [it for] us for a short time." Say, "The enjoyment of this world is little, and the Hereafter is better for he who fears Allāh. And injustice will not be done to you, [even] as much as a thread [inside a date seed]."

Muhsin Khan

Have you not seen those who were told to hold back their hands (from fighting) and perform As-Salat (Iqamat-as-Salat), and give Zakat, but when the fighting was ordained for them, behold! a section of them fear men as they fear Allah or even more. They say: "Our Lord! Why have you ordained for us fighting? Would that you had granted us respite for a short period?" Say: "Short is the enjoyment of this world. The Hereafter is (far) better for him who fears Allah, and you shall not be dealt with unjustly even equal to the Fatila (a scalish thread in the long slit of a date-stone).

Taqi Usmani

Have you not seen those to whom it was said, “Hold your hands (from fighting) and be steadfast in Salāh and pay Zakāh.” However, when fighting is enjoined upon them, then surprisingly, a group from them starts fearing people, as one would fear Allah, or fearing even more.They say, “Our Lord, why have you enjoined fighting upon us? Would you have not spared us for a little more time?” Say, “The enjoyment of the world is but a little, and the Hereafter is far better for the one who fears Allah, and you shall not be wronged, even to the measure of a fiber.

Abul Ala Maududi

Have you not seen those who were told: 'Restrain you hands, and establish the Prayer, and pay the Zakah'? But when fighting was enjoined upon them some of them feared men as one should fear Allah, or even more, and said: 'Our Lord, why have You ordained fighting for us? Why did You not grant us a little more respite?' Say to them: 'There is little enjoyment in this world. The World to Come is much better for the God-fearing. And you shall not be wronged even to the extent of the husk of a date-stone.

Pickthall

Hast thou not seen those unto whom it was said: Withhold your hands, establish worship and pay the poordue, but when fighting was prescribed for them behold! a party of them fear mankind even as their fear of Allah or with greater fear, and say: Our Lord! Why hast Thou ordained fighting for us? If only Thou wouldst give us respite yet a while! Say (unto them, O Muhammad): The comfort of this world is scant; the Hereafter will be better for him who wardeth off (evil); and ye will not be wronged the down upon a date-stone.

Yusuf Ali

Hast thou not turned Thy vision to those who were told to hold back their hands (from fight) but establish regular prayers and spend in regular charity? When (at length) the order for fighting was issued to them, behold! a section of them feared men as - or even more than - they should have feared Allah: They said: "Our Lord! Why hast Thou ordered us to fight? Wouldst Thou not Grant us respite to our (natural) term, near (enough)?" Say: "Short is the enjoyment of this world: the Hereafter is the best for those who do right: Never will ye be dealt with unjustly in the very least!

বাংলা অনুবাদ

তাইসিরুল কুরআন

তুমি কি তাদেরকে দেখনি, যাদেরকে বলা হয়েছিল, তোমরা তোমাদের হাত সংযত রাখ, নামায কায়িম কর এবং যাকাত দাও? অতঃপর যখন তাদের প্রতি জিহাদ ফরয করা হল, তখন তাদের একদল মানুষকে এমন ভয় করতে লাগল যেমন আল্লাহকে ভয় করা উচিত, বরং তার চেয়েও বেশী এবং বলতে লাগল, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! কেন আমাদের প্রতি জিহাদ ফরয করলে, আমাদেরকে আরও কিছু অবসর দিলে না কেন?’ বল, ‘পার্থিব ভোগ সামান্য, যে তাকওয়া অবলম্বন করে তার জন্য আখিরাতই উত্তম, তোমাদের প্রতি বিন্দুমাত্র অন্যায় করা হবে না।’

রাওয়াই আল-বায়ান

তুমি কি তাদেরকে দেখনি যাদেরকে বলা হয়েছিল, তোমরা তোমাদের হাত গুটিয়ে নাও এবং সালাত কায়েম কর ও যাকাত প্রদান কর? অতঃপর তাদের উপর যখন লড়াই ফরয করা হল, তখন তাদের একদল মানুষকে ভয় করতে লাগল আল্লাহকে ভয় করার অনুরূপ অথবা তার চেয়ে কঠিন ভয়। আর বলল, ‘হে আমাদের রব, আপনি আমাদের উপর লড়াই ফরয করলেন কেন? আমাদেরকে কেন আরো কিছুকালের অবকাশ দিলেন না’? বল, ‘দুনিয়ার সুখ সামান্য। আর যে তাকওয়া অবলম্বন করে তার জন্য আখিরাত উত্তম। আর তোমাদের প্রতি সূতা পরিমাণ যুলমও করা হবে না’।

শাইখ মুজিবুর রহমান

তুমি কি তাদের প্রতি লক্ষ্য করনি যাদেরকে বলা হয়েছিল যে, তোমাদের হস্তসমূহ সংযত রাখ এবং সালাত প্রতিষ্ঠিত কর ও যাকাত প্রদান কর। অনন্তর যখন তাদের প্রতি জিহাদ ফরয করে দেয়া হল তখন তাদের একদল আল্লাহকে যেরূপ ভয় করবে তদ্রুপ মানুষকে ভয় করতে লাগল, বরং তদপেক্ষাও অধিক; এবং তারা বললঃ হে আমাদের রাব্ব! আপনি কেন আমাদের উপর যুদ্ধ ফরয করলেন? কেন আমাদেরকে আর কিছুকালের জন্য অবসর দিলেননা? তুমি বলঃ পার্থিব আনন্দ খুবই সীমিত এবং ধর্মভীরুগণের জন্য পরকালই কল্যাণকর; এবং তোমরা খেজুর বীজ পরিমাণও অত্যাচারিত হবেনা।

ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

আপনি তাদেরকে দেখেননি যাদেরকে বলা হয়েছিল, ‘তোমরা তোমাদের হস্ত সংবরণ কর, সালাত কায়েম কর এবং যাকাত দাও ?’ অতঃপর যখন তাদেরকে যুদ্ধের বিধান দেয়া হল তখন তাদের একদল মানুষকে ভয় করছিল আল্লাহকে ভয় করার মত অথবা তার চেয়েও বেশী এবং বলল, ‘হে আমাদের রব! আমাদের জন্য যুদ্ধের বিধান কেন দিলেন? আমাদেরকে কিছু দিনের অবকাশ কেন দিলেন না[ ৩]?’ বলুন, ‘পার্থিব ভোগ সামান্য এবং যে তাকওয়া অবলম্বন করে তার জন্য আখেরাতই উত্তম। আর তোমাদের প্রতি সামান্য পরিমাণও যুলুম করা হবে না।’

ফাতহুল মাজীদ

তুমি কি তাদেরকে দেখনি যাদেরকে বলা হয়েছিল, ‘তোমরা তোমাদের হস্ত সংবরণ কর, সালাত কায়েম কর এবং যাকাত দাও?’ অতঃপর যখন তাদেরকে যুদ্ধের বিধান দেয়া হল তখন তাদের একদল মানুষকে ভয় করছিল আল্লাহকে ভয় করার মত অথবা তদপেক্ষা অধিক, এবং বলতে লাগল, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের জন্য যুদ্ধের বিধান কেন দিলেন? আমাদেরকে কিছু দিনের অবকাশ দিন না! বল:‎ ‘পার্থিব ভোগ সামান্য এবং যে ব্যক্তি মুত্তাকী তার জন্য পরকালই উত্তম। তোমাদের প্রতি সামান্য পরিমাণও জুলুম করা হবে না।’

মুখতাসার

৭৭. হে রাসূল! আপনি কি আপনার কিছু সাহাবীর ব্যাপার জানেন যারা নিজেদের উপর জিহাদ ফরয হওয়া কামনা করেছে। তখন তাদেরকে বলা হয়েছে, তোমরা নিজেদের হাতগুলো যুদ্ধ হতে বিরত রাখো আর সালাত কায়েম ও যাকাত আদায় করো। এ বিধানটি ছিলো যুদ্ধ ফরয হওয়ার আগে। তারা মদীনায় হিজরত করার পর ইসলামের রক্ষণ শক্তি বৃদ্ধি পেলে সময় মতো যুদ্ধ ফরয করা হলে ব্যাপারটি কারো কারো উপর কঠিন হয়ে পড়ে। তারা মানুষকে আল্লাহর মতো অথবা তার চেয়েও বেশি ভয় করতে শুরু করে। তারা বলে: হে আমাদের রব! কেন আমাদের উপর যুদ্ধ ফরয করা হলো? আপনি কেন তা ফরয করতে আরেকটু সময় দেরী করলেন না। তাহলে আমরা আরো কিছু সময় দুনিয়া ভোগ-আস্বাদন করতে পারতাম। হে রাসূল! আপনি তাদেরকে বলে দিন, দুনিয়ার ভোগ-বিলাস তা যতোই করা হোক না কেন তা খুবই সামান্য ও নশ্বর। আখিরাতই মুত্তাকীদের জন্য সর্বোত্তম। কারণ, সেখানকার নিয়ামত চিরস্থায়ী। তোমাদের নেক আমলগুলোর কোন কমতি করা হবে না। যদিও তা খেজুর দানার মাঝের সুতার সমপরিমাণ হোক না কেন।

তাফসীর

তাফসীর ইবনে কাসীর

৭৭-৭৯ নং আয়াতের তাফসীর: ঘটনা বর্ণিত হচ্ছে যে, ইসলামের প্রাথমিক যুগে যখন মুসলমানরা মক্কায় অবস্থান করছিল তখন তারা ছিল দুর্বল। তারা মর্যাদাসম্পন্ন শহরে বাস করছিল। তথায় কাফিরদেরই প্রাধান্য বজায় ছিল। মুসলমানরা তাদেরই শহরে ছিল।কাফিরেরা সংখ্যায় খুব বেশী ছিল এবং যুদ্ধের অস্ত্র-শস্ত্রও ছিল তাদের অধিক। এ কারণেই আল্লাহ তাআলা মুসলমানদেরকে জিহাদের নির্দেশ দেননি। বরং তাদেরকে কাফিরদের অত্যাচার সহ্য করারই নির্দেশ দিয়েছিলেন। তিনি তাদেরকে আরও আদেশ করেছিলেন যে, তিনি যেসব হুকুম আহকাম অবতীর্ণ করেছেন ঐগুলোর উপর যেন তারা আমল করে। যেমন তারা যেন নামায প্রতিষ্ঠা করে এবং যাকাত আদায় করে। সাধারণতঃ যদিও তখন তাদের মালের আধিক্য ছিল না তথাপি দরিদ্র ও অভাবগ্রস্তদেরকে সাহায্য করা ও তাদের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন করার নির্দেশ দেন। আল্লাহ তাআলা মুমিনদের জন্যে এটাই যুক্তিযুক্ত মনে করেন যে, তারা যেন এখানে কাফিরদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ না করে বরং সবর ও ধৈর্যের দ্বারাই যেন কাজ নেয়। আর ওদিকে কাফিররা ভীষণ বীরত্বের সাথে মুসলমানদের উপর অত্যাচার ও উৎপীড়নের পাহাড় চাপিয়ে দেয়। তারা ছোট-বড় প্রত্যেককেই কঠিন হতে কঠিনতম শাস্তি দিতে থাকে। কাজেই মুসলমানগণ অত্যন্ত সংকীর্ণতার মধ্য দিয়ে কালাতিপাত করছিল। মাঝে মাঝে তাদের মধ্যে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়ে যেতো এবং তারা কামনা করতো যে, যদি আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে যুদ্ধের নির্দেশ দিতেন। অবশেষে যখন তাদেরকে মদীনায় হিজরত করার অনুমিত দেয়া হয় তখন মুসলমানরা স্বীয় মাতৃভূমি, আত্মীয়-স্বজন সবকে আল্লাহর নামে উৎসর্গ করে মদীনায় হিজরত করে। তথায় আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে সর্বপ্রকারের সুবিধা ও নিরাপত্তা দান করেন। সাহায্যকারী হিসেবে তারা মদীনার আনসারদেরকে পেয়ে যায় এবং তাদের সংখ্যাও বহুগুণে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়। তাছাড়া তারা যথেষ্ট শক্তিও অর্জন করে।তখন আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয় যে, তারা যেন তাদের প্রতিদ্বন্দ্বীদের সাথে যুদ্ধ করে। জিহাদের হুকুম অবতীর্ণ হওয়া মাত্রই কতক লোক ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। জিহাদের কথা চিন্তা করে যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত এবং স্ত্রীদের বিধবা হওয়া ও শিশুদের পিতৃহীন হওয়ার দৃশ্য তাদের চোখের সামনে ভেসে উঠে। ভয় পেয়ে তারা বলে উঠে- “হে আমাদের প্রভু! এখনই কেন আমাদের উপর যুদ্ধ বিধিবদ্ধ করলেন? আমাদেরকে আরও কিছুদিন অবসর দিতেন!' এ বিষয়কেই অন্য আয়াতে নিম্নরূপে বর্ণনা করা হয়েছেঃ (আরবী) (৪৭:২০) এর সংক্ষিপ্ত ভাবৰ্থ এই যে, মুমিনগণ বলে-(যুদ্ধের) কোন সূরা অবতীর্ণ হয় না কেন? অতঃপর যখন কোন সূরা অবতীর্ণ করা হয় এবং তাতে জিহাদের বর্ণনা দেয়া হয় তখন রুগ্ন অন্তরবিশিষ্ট লোকেরা চীৎকার করে উঠে এবং ভ্রুকুঞ্চিত করে তোমার দিকে তাকায় এবং ঐ ব্যক্তির মত চক্ষু বন্ধ করে নেয় যে মৃত্যুর পূর্বক্ষণে অচৈতন্য হয়ে থাকে। তাদের জন্যে আফসোস!মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, মক্কায় হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ) এবং আরও কয়েকজন সাহাবী রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট উপস্থিত হয়ে বলেন, “হে আল্লাহর নবী (সঃ)! কুফরীর অবস্থায় আমরা সম্মানিত ছিলাম, আর আজ ইসলামের অবস্থায় আমাদের লাঞ্ছিত মনে করা হচ্ছে।' তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ আমার উপর আল্লাহ পাকের এ নির্দেশই রয়েছে যে, আমি যেন ক্ষমা করে দেই। সাবধান কাফিরদের সাথে যুদ্ধ করো না।'অতঃপর মদীনায় হিজরতের পর এখানে যখন জিহাদের আয়াত অবতীর্ণ হয় তখন লোকেরা বিরত থাকে। তখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। ইমাম নাসাঈ (রঃ), ইমাম হাকিম (রঃ) এবং ইমাম ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ)ও এটা বর্ণনা করেছেন। হযরত সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, তাদের উপর নামায ও যাকাত ফরয ছিল। তখন তারা আকাঙক্ষা করে যে, জিহাদও যদি ফরয করা হতো!অতঃপর যখন জিহাদের হুকুম অবতীর্ণ হয় তখন দুর্বল ঈমানের লোকেরা মানুষকে ঐরূপ ভয় করতে লাগে যেমন আল্লাহ তাআলাকে ভয় করা উচিত; বরং তার চেয়েও বেশী ভয় করতে থাকে এবং বলে-“হে আমাদের প্রভু! আপনি আমাদের উপর জিহাদ কেন ফরয করলেন? স্বাভাবিক মৃত্যু পর্যন্ত আমাদেরকে দুনিয়ায় সুখ ভোগ করতে দিলেন না কেন?' তখন তাদেরকে উত্তর দেয়া হয় যে, দুনিয়ার সুখ ভোগ খুবই অস্থায়ী এবং জান্নাতের তুলনায় খুবই নগণ্যও বটে। আর আখিরাত আল্লাহ ভীরুদের জন্য দুনিয়া হতে বহুগুণ উত্তম ও পবিত্র।হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি ইয়াহুদীদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। তাদেরকে উত্তরে বলা হয়-“আল্লাহভীরুদের পরিণাম সূচনা হতে বহুগুণে উত্তম। তোমাদেরকে তোমাদের কার্যের পূর্ণ প্রতিদান দেয়া হবে। তোমাদের একটি সৎ আমলও বিনষ্ট হবে না। আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে কারও উপর এক চুল পরিমাণ ও অত্যাচার হওয়া অসম্ভব। এ বাক্যে দুনিয়ার প্রতি অনাগ্রহ উৎপাদন করে পরকালের প্রতি তাদের মনোযোগ আকর্ষণ করা হচ্ছে এবং তাদের মধ্যে জিহাদের উত্তেজনা সৃষ্টি করা হচ্ছে।মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমে রয়েছে যে, হযরত হাসান বসরী (রঃ)। (আরবী) -এ আয়াতটি পাঠ করে বলেনঃ “আল্লাহ তা'আলা ঐ ব্যক্তির উপর সদয় হোন যে দুনিয়ায় এভাবেই থাকে। দুনিয়ার প্রথম হতে শেষ পর্যন্ত এ রকমই অবস্থা যেমন একজন নিদ্রিত ব্যক্তি স্বপ্নে নিজের কোন পছন্দনীয় জিনিস দেখতে পায় কিন্তু চক্ষু খোলা মাত্রই জানতে পারে যে, মূলে কিছুই ছিল না। হযরত আবু মুসহির (রঃ)-এর নিম্নের কবিতাংশটি কতই না সুন্দরঃ (আরবী) অর্থাৎ দুনিয়ায় ঐ ব্যক্তির জন্য কোনই মঙ্গল নেই, যার জন্যে আখিরাতে আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে কোনই অংশ নেই, যদিও দুনিয়া কতক লোককে বিস্ময় বিমুগ্ধ করে, কিন্তু এটা খুব অল্পই সুখ এবং এর ধ্বংস খুব নিকটবর্তী।এরপর বলা হচ্ছে-‘তোমরা যেখানেই থাকনা কেন মৃত্যু তোমাদেরকে ধরবেই যদিও তোমরা সুদৃঢ় দুর্গে অবস্থান কর।' কোন মধ্যস্থতা কাউকেও এটা হতে বাঁচাতে পারবে না। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘এর উপর যত কিছু রয়েছে সবই ধ্বংসশীল।'(৫৫:২৬) আর এক আয়াতে আছেঃ (আরবী) আর্থাৎ প্রত্যেক প্রাণীই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণকারী'। (৩:১৮৫) অন্য জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ তোমার পূর্বেও আমি কোন মানুষের জন্য চিরস্থায়ী জীবন নির্ধারণ করিনি।'(২১:৩৪) এগুলো বলার উদ্দেশ্য এই যে, মানুষ জিহাদ করুক আর নাই করুক একমাত্র আল্লাহ পাকের সত্তা ছাড়া সকলকেই একদিন না একদিন মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতেই হবে। প্রত্যেকের জন্য একটা সময় নির্ধারিত রয়েছে এবং প্রত্যেকের মুত্যুর স্থানও নির্দিষ্ট রয়েছে।হযরত খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রাঃ) স্বীয় মরণ শয্যায় শায়িত অবস্থায় বলেনঃ ‘আল্লাহর শপথ! আমি বহু বহু যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতঃ বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করেছি। তোমরা এসে দেখ যে, আমার শরীরের এমন কোন অঙ্গ নেই যেখানে বলুম, বর্শা, তীর, তরবারী বা অন্য কোন অস্ত্রের চিহ্ন দেখা যায় না। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে আমার ভাগ্যে মৃত্যু লিখা ছিল না বলে আজ তোমরা দেখ যে আমি গৃহ শয্যায় মৃত্যুবরণ করছি। সুতরাং কাপুরুষের দল আমার জীবন হতে যেন শিক্ষা গ্রহণ করে।আল্লাহ তা'আলা বলেন- মৃত্যুর থাবা হতে উচ্চতম, সুদৃঢ় এবং সংরক্ষিত দুর্গ ও অট্টালিকাও রক্ষা করতে পারবে না। কেউ কেউ বলেন যে শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে আকাশের বুরুজ। কিন্তু এটা দুর্বল উক্তি। সঠিক কথা এই যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে সুরক্ষিত প্রাসাদাসমূহ। অর্থাৎ মৃত্যু হতে রক্ষা পাওয়ার জন্যে যে কোন সুব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক না কেন ওটা নির্ধারিত সময়েই আসবে, একটুও আগে পিছে হবে না। যুহাইর ইবনে আবি সালমা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ যে ব্যক্তি মৃত্যুর কারণে পলায়ন করে তাকে মুত্যু পেয়ে বসবেই, যদিও সে সোপানের সাহায্যে আকাশ মার্গেও আরোহণ করে।(আরবী) শব্দটিকে কেউ কেউ তাশদীদ সহ বলেছেন এবং কেউ কেউ ‘তাশদীদ’ ছাড়াই বলেছেন। দুটোরই একই অর্থ। কিন্তু কারও কারও মতে আবার এ দুটোর মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। মুশাইয়্যাদাহ্ পড়লে অর্থ হবে সুদীর্ঘ এবং মুশায়াদাহ পড়লে অর্থ হবে চুন দ্বারা সুশোভিত। এ পরিপ্রেক্ষিতে তাফসীর -ই-ইবনে জারীর এবং মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমে একটি সুদীর্ঘ গল্প হযরত মুজাহিদ (রঃ)-এর ভাষায় বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন যে, পূর্ব যুগে একটি স্ত্রীলোক গর্ভবতী ছিল। তার প্রসব বেদনা উঠে এবং সে একটি কন্যা সন্তান প্রসব করে। সে তখন তার পরিচারককে বলে, “যাও কোন জায়গা হতে আগুন নিয়ে এসো। পরিচারক বাইরে গিয়ে দেখে যে, দরজার উপর একটি লোক দাড়িয়ে রয়েছে। লোকটি পরিচারককে জিজ্ঞেস করে, “স্ত্রী লোকটি কি সন্তান প্রসব করেছেন? সে বলে, ‘কন্যা সন্তান।লোকটি তখন বলে, ‘জেনে রেখ যে, এ মেয়েটি একশ জন পুরুষের সঙ্গে ব্যভিচার করবে এবং এখন স্ত্রীলোকটির যে পরিচারক রয়েছে শেষে তার সাথে এ মেয়েটির বিয়ে হবে। আর একটি মাকড়সা তার মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াবে।এ কথা শুনে চাকরটি সেখান হতে ফিরে যায় এবং ঐ মেয়েটির পেট ফেড়ে দেয়। অতঃপর তাকে মৃতা মনে করে তথা হতে পলায়ন করে। এ অবস্থা দেখে তার মা তার পেট সেলাই করে দেয় এবং চিকিৎসা করতে আরম্ভ করে। অবশেষে মেয়েটির ক্ষতস্থান ভাল হয়ে যায়। ইতিমধ্যে এক যুগ অতিবাহিত হয়। মেয়েটি যৌবনে পদার্পণ করে। সে খুব সুন্দরী ছিল। তখন সে ব্যভিচারের কাজ শুরু করে দেয়। আর ওদিকে ঐ চাকরটি সমুদ্র পথে পালিয়ে গিয়ে কাজ-কাম আরম্ভ করে দেয় এবং বহু অর্থ উপার্জন করে। দীর্ঘদিন পর প্রচুর ধন-সম্পদসহ সে তার সেই গ্রামে ফিরে আসে। তারপর সে একটি বৃদ্ধা স্ত্রীলোককে ডেকে পাঠিয়ে বলেঃ আমি বিয়ে করতে চাই। এ গ্রামের যে খুব সুশ্রী মেয়ে তার সঙ্গে আমার বিয়ে দাও।' বৃদ্ধা তথা হতে বিদায় নেয়। ঐ গ্রামের ঐ মেয়েটি অপেক্ষা সুশ্রী মেয়ে আর একটিও ছিল না বলে সে তাকেই বিয়ের প্রস্তাব দেয়। মেয়েটি প্রস্তাব সমর্থন করে এবং বিয়ে হয়ে যায়। সে সব কিছু ত্যাগ করে লোকটির নিকট চলেও আসে। তার ঐ স্বামীকে জিজ্ঞেস করেঃ আচ্ছা বলুনতো, আপনি কে? কোথা হতে এসেছেন এবং কিভাবেই বা এখানে এসেছেন?' লোকটি তখন সমস্ত ঘটনা বিবৃত করে বলেঃ এখানে আমি একটি স্ত্রীলোকের পরিচারক ছিলাম। তার মেয়ের সঙ্গে এরূপ কাজ করে এখান হতে পালিয়ে গিয়েছিলাম। বহু বছর পরে এসেছি।' তখন মেয়েটি বলে, যে মেয়েটির পেট ফেড়ে আপনি পালিয়ে গিয়েছিলেন। আমি সেই মেয়ে।' এ বলে সে তাকে তার ক্ষত স্থানের দাগও দেখিয়ে দেয়। তখন লোকটির বিশ্বাস হয়ে যায় এবং মেয়েটিকে বলে, তুমি যখন ঐ মেয়ে তখন তোমার সম্বন্ধে আমার আর একটি কথা জানা আছে। তা এই যে, তুমি আমার পূর্বে একশ জন লোকের সঙ্গে মিলিত হয়েছে। মেয়েটি তখন বলে, কথা তো ঠিকই, কিন্তু আমার গণনা মনে নেই। লোকটি বলে তোমার সম্বন্ধে আমার আরও একটি কথা জানা আছে। তা এই যে, একটি মাকড়সা তোমার মুত্যুর কারণ হবে। যা হোক, তোমার প্রতি আমার খুবই ভালবাসা রয়েছে। কাজেই আমি তোমাকে একটি সুউচ্চ ও সুদৃঢ় প্রাসাদ নির্মাণ করে দিচ্ছি। তুমি সেখানে অবস্থান করবে। তাহলে সেখানে কোন পোকা-মাকড়ও প্রবেশ করতে পারবে না। সে তাই করে। মেয়েটির জন্যে এরূপই একটি প্রাসাদ নির্মিত হয় এবং সে সেখানেই বাস করতে থাকে, কিছুদিন পর একদা তারা স্বামী-স্ত্রী ঐ প্রাসাদের মধ্যে বসে রয়েছে, এমন সময় হঠাৎ ছাদের উপর একটি মাকড়সা দেখা যায়। ঐ লোক তখন তার স্ত্রীকে বলে, “দেখ, আজ এখানে মাকড়সা দেখা গেছে। ওটা দেখা মাত্রই মেয়েটি বলে, আচ্ছা, এটা আমার প্রাণ নেয় নেবেই কিন্তু আমিই এর প্রাণ নেব।' অতঃপর সে চাকরকে বলেঃ মাকড়সাটিকে আমার নিকট জ্যান্ত ধরে আন। চারকটি ধরে আনে। সে তখন মাকড়সাটিকে স্বীয় পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে দলিত করে। ফলে মাকড়সাটির প্রাণ বায়ু নির্গত হয়। ওর দেহের যে রস বের হয় ওরই এক আধ ফোটা তার বৃদ্ধাঙ্গুলির নখ ও মাংসের মধ্যস্থলে প্রবেশ করে। ফলে বিষক্রিয়া আরম্ভ হয় এবং পা কৃষ্ণবর্ণ ধারণ করে। তাতেই তার জীবনলীলা শেষ হয়ে যায়।হযরত উসমান (রাঃ)-এর উপর বিদ্রোহীগণ যখন আক্রমণ চালায় তখন তিনি বলেনঃ “হে আল্লাহ! আপনি মুহাম্মাদ (সঃ)-এর উম্মতকে ঐক্যবদ্ধ করুন। অতঃপর তিনি নিম্নের ছন্দ দু’টি পাঠ করেনঃ (আরবী) হাযরের বাদশাহ সাতেরূনকে পারস্য সমাট সাবুর যুল আলতাফ যে হত্যা করেছিল সে ঘটনাটিও আমরা এখানে বর্ণনা করছি। ইবনে হিশাম বলেছেন যে, সাকূর যখন ইরাকে অবস্থান করছিল সে সময় তার এলাকার উপর সাতেরূন আক্রমণ চালিয়েছিল। এর প্রতিশোধ স্বরূপ সাকূর যখন তার উপর আক্রমণ চালায় তখন সে দুর্গের দরজা বন্ধ করে তাতে আশ্রয় গ্রহণ করে। দু’বছর পর্যন্ত দুর্গ অবরোধ করে রাখা হয় কিন্তু কোনক্রমেই দুর্গ বিজিত হয় না।একদা সাতেরূনের নাযীরা নাম্নী এক কন্যা তার পিতার দুর্গে টহল দিচ্ছিল। এমন সময় সায়ূরের উপর তার দৃষ্টি যায়। সে সময় সাকূর শাহী রেশমী পোশাক পরিহিত ছিল এবং তার মস্তকে ছিল রাজমুকুট। নাযীরা মনে মনে বলে-তোর সাথে আমার বিয়ে হলে কতইনা উত্তম হতো! সুতরাং গোপনে তার নিকট বিয়ের প্রস্তাব পাঠাতে আরম্ভ করে এবং সাকূর ওয়াদা করে যে, যদি এ মেয়েটি তাকে দুর্গ দখল করিয়ে দিতে পারে তবে সে তাকে বিয়ে করবে।সাতেরূন ছিল বড়ই মদ্যপায়ী। সারারাত তার মদ্যের নেশাতেই কেটে যেতো। মেয়েটি এ সুযোগেরই সদ্ব্যবহার করে। রাতে স্বীয় পিতাকে মদমত্ত অবস্থায় দেখে চুপে চুপে তার শিয়র হতে দুর্গের দরজার চাবিটি বের করে নেয় এবং তার নির্ভরযোগ্য ক্রীতদাসের মাধ্যমে সানূরের নিকট পৌছিয়ে দেয়। সাবুর তখন ঐ চাবি দিয়ে দুর্গের দরজা খুলে দেয় এবং ভেতরে প্রবেশ করে সাধারণভাবে হত্যাকার্য চালিয়ে যায়।অবশেষে দুর্গ তার দখলে এসে যায়। এও বলা হয়েছে যে, ঐ দুর্গে একটি যাদুযুক্ত জিনিস ছিল। ওটা ভাঙ্গতে না পারলে এ দুর্গ জয় করা সম্ভব ছিল না। ঐ মেয়েটিই ওটা ভাঙ্গবার পদ্ধতি বলে দেয় যে, একটি সাদাকালো মিশ্রিত রঙের কবুতর এনে তার পা কোন কুমারী মেয়ের প্রথম ঋতুর রক্ত দ্বারা রঞ্জিত করতে হবে, তারপর কবুতরটিকে ছেড়ে দিলেই ওটা উড়ে গিয়ে ঐ দুর্গের দেয়ালে বসবে। আর তেমনি যাদুযুক্ত জিনিসটি পড়ে যাবে এবং দুর্গের সিংহদ্বার খুলে যাবে।অতএব সাকূর তাই করে এবং দুর্গ জয় করতঃ সাতেরূনকে হত্যা করে। অতঃপর সমস্ত লোককে তরবারীর নীচে নিক্ষেপ করে এবং সারা শহর ধ্বংস। করে দেয়। তারপর সাতেরূনের কন্যাকে সঙ্গে নিয়ে স্বীয় রাজ্যে ফিরে আসে এবং তাকে বিয়ে করে নেয়। একদা রাত্রে মেয়েটি স্বীয় শয্যায় শুয়ে আছে কিন্তু তার ঘুম আসছে না। সে অস্থিরতা প্রকাশ করছে। তার এ অবস্থা দেখে সাবুর তাকে জিজ্ঞেস করেঃ ব্যাপার কি?' সে বলে, সম্ভবতঃ বিছানায় কিছু রয়েছে যে কারণে আমার ঘুমে ধরছে না। প্রদীপ জ্বালিয়ে বিছানায় অনুসন্ধান চালানো হলো। অবশেষে তৃণ জাতীয় গাছের ছোট একটি পাতা পাওয়া গেল।তার এ চরম বিলাসিতা দেখে সানূর উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লো যে, ছোট একটি পাতা বিছানায় থাকার কারণে তার ঘুম আসছে না! তাই তাকে জিজ্ঞেস করলো, তোমার পিতার নিকট তোমার জন্যে কি কি থাকতো'? সে বললোঃ ‘আমার জন্যে থাকতো নরম রেশমের বিছানা এবং পাতলা নরম রেশমের পোশাক। আর আমি আহার করতাম পায়ের অস্থির মজ্জা এবং পান করতাম। খাটি সুরা। এ ব্যবস্থাই আমার আব্বা আমার জন্যে রেখেছিলেন। মেয়েটি এরূপ ছিল যে, বাহির হতে তার পায়ের গোছর গোড়ালির) মজ্জা পর্যন্তও দেখা যেতো। একথাগুলো সায়ূরের মনে অন্য এক উত্তেজনার সৃষ্টি করে এবং মেয়েটিকে বলেঃ ‘যে পিতা তোমাকে এভাবে লালন পালন করেছে, তুমি তোমার সে পিতার সাথে এ ব্যবহার করেছে যে, আমার দ্বারা তাকে হত্যা করিয়েছে এবং তার রাজ্যকে ছারখার করিয়েছে। কাজেই আমার সঙ্গেও যে তুমি এরূপ ব্যবহার করবে না তা আমি কিরূপে বিশ্বাস করতে পারি’? তৎক্ষণাৎ সে নির্দেশ দেয় যে, তার চুলকে ঘোড়ার লেজের সঙ্গে বেঁধে দিয়ে ঘোড়াকে লাগামহীন ছেড়ে দেয়া হোক। তাই করা হয়। ঘোড়া নাচতে লাফাতে আরম্ভ করে এবং এভাবে তাকে এ নশ্বর জগৎ হতে চির বিদায় গ্রহণ করতে হয়। আল্লাহপাক বলেন-যদি তাদের উপর কোন কল্যাণ অবতীর্ণ হয় অর্থাৎ যদি তারা খাদ্যশস্য, ফল, সন্তানাদি ইত্যাদি লাভ করে তবে তারা বলে- এটা আল্লাহ তা'আলার নিকট হতে এসেছে। আর যদি তাদের উপর কোন অমঙ্গল নিপতিত হয় অর্থাৎ দুর্ভিক্ষ, মৃত্যু, মাল ও সন্তানের স্বল্পতা এবং ক্ষেত্র ও বাগানের ক্ষতি ইত্যাদি পৌছে যায় তখন তারা বলে-“হে নবী (সঃ)! এটা আপনার কারণেই হয়েছে। অর্থাৎ এটা নবী (সঃ)-এর অনুসরণ এবং মুসলমান হওয়ার কারণেই হয়েছে। ফিরাউনের অনুসারীরাও অমঙ্গলের বেলায় হযরত মূসা (আঃ) এবং তাঁর অনুসারীদেরকে কু-লক্ষণ বলে অভিহিত করতো। যেমন। কুরআন কারীমের এক জায়গায় বলা হয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ যখন তাদের নিকট কোন মঙ্গল পৌছে তখন তারা বলে- এটা আমাদের জন্যই হয়েছে এবং যখন তাদের নিকট কোন অমঙ্গল পৌছে তখন তারা মূসা (আঃ) ও তাঁর অনুসারীদেরকে কুলক্ষণে বলে থাকে।’(৭:১৩১)আর এক জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ কতক লোক এমন রয়েছে যারা এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে আল্লাহর ইবাদত করে থাকে।'(২২:১১) অতএব এখানেও এ মুনাফিকরা যারা বাহ্যিক মুসলমান কিন্তু অন্তরে ইসলামকে ঘৃণা করে তাদের নিকট যখন কোন অমঙ্গল পৌছে তখন তারা ঝট করে বলে ফেলে যে, এ ক্ষতি ইসলাম গ্রহণের কারণেই হয়েছে। সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, এখানে (আরবী) শব্দের ভাবার্থ বৃষ্টিপাত হওয়া, গৃহপালিত পশুর আধিক্য হওয়া, ছেলেমেয়ে বেশী হওয়া এবং স্বচ্ছলতা আসা। এসব হলে তারা বলতো-“এটা আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতেই হয়েছে। আর যদি এর বিপরীত হতো তবে তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কেই এ জন্যে দায়ী করতো এবং তাঁকে বলতো-এটা আপনার কারণেই হয়েছে। অর্থাৎ আমরা আমাদের বড়দের আনুগত্য ছেড়ে এ নবী (সঃ)-এর আনুগত্য স্বীকার করেছি বলেই আমরা এ বিপদে পড়েছি। তাই আল্লাহ পাক তাদের এ অপবিত্র কথা ও জঘন্য বিশ্বাসের খণ্ডন করতে গিয়ে বলেন- সবই আল্লাহর পক্ষ হতে এসেছে। তার ফায়সালা ও ভাগ্যলিখন প্রত্যেক ভাল-মন্দ, ফাসিক, ফাজির, মুমিন এবং কাফির সবারই উপরেই জারী রয়েছে। ভাল ও মন্দ সবই তার পক্ষ থেকেই হয়ে থাকে।অতঃপর তিনি তাদের সে উক্তি খণ্ডন করছেন যা তারা শুধুমাত্র সন্দেহ, অজ্ঞতা, নির্বুদ্ধিতা এবং অত্যাচারের বশবর্তী হয়েই বলে থাকে। তিনি বলেনতাদের কি হয়েছে যে, কোন কথা বুঝবার যোগ্যতা তাদের মধ্য হতে লোপ পাচ্ছে? (আরবী) সম্পর্কে যে একটি গারীব হাদীস রয়েছে তারও এখানে বর্ণনা দেয়া হচ্ছে। মুসনাদ-ই-বাযে ' হযরত আমর ইবনে শুয়াইব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি তাঁর পিতা হতে এবং তিনি তাঁর দাদা হতে বর্ণনা করেন- তাঁর দাদা বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট বসেছিলাম, এমন সময় কতগুলো লোককে সঙ্গে নিয়ে হযরত আবু বকর (রাঃ) এবং হযরত উমার (রাঃ) আগমন করেন। তাঁরা উচ্চেঃস্বরে কথা বলছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে তাঁরা দুজন বসে পড়েন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) জিজ্ঞেস করেনঃ “উচ্চৈঃস্বরে কিসের আলোচনা চলছিল?' এক ব্যক্তি বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! হযরত আবু বকর (রাঃ) বলছিলেন যে, পুণ্য এবং মঙ্গল আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে হয়ে থাকে এবং মন্দ ও অমঙ্গল আমাদের পক্ষ থেকে হয়ে থাকে।রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত উমার (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেনঃ “তুমি কি বলছিলে’? হযরত উমার (রাঃ) বলেন, আমি বলছিলাম যে, দু'টোই আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকেই হয়ে থাকে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ ‘এ তর্ক প্রথম প্রথম হযরত জিবরাঈল (আঃ) ও হযরত মিকাইল (আঃ)-এর মধ্যেও হয়েছিল। হযরত মিকাঈল (আঃ) ঐ কথাই বলেছিলেন যা হযরত আবু বকর (রাঃ) বলছিল এবং হযরত জিবরাঈল (আঃ) ঐ কথাই বলেছিলেন যা তুমি (হযরত উমার রাঃ) বলছিলে। তাহলে আকাশবাসীদের মধ্যে যখন মতভেদ সৃষ্টি হয়েছে তখন পৃথিবীবাসীদের মধ্যে এটা হওয়া তো স্বাভাবিক'।অতঃপর ইসরাফীল (আঃ)-এর উপর এর মীমাংসার ভার পড়ে যায়। তিনি মীমাংসা করেন যে, ভাল ও মন্দ দু'টোই আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতেই হয়ে থাকে। অতঃপর তিনি তাঁদের দুজনকে সম্বোধন করে বলেনঃ “তোমরা আমার সিদ্ধান্ত শুনে নাও এবং স্মরণ রেখো আল্লাহ তাআলা যদি স্বীয় অবাধ্যাচরণ না চাইতেন তবে তিনি ইবলিশকে সৃষ্টি করতেন না।কিন্তু শায়খুল ইসলাম ইমাম তাকিয়ুদ্দীন আবূ আব্বাস হযরত ইবনে তাইমিয়্যাহ (রঃ) বলেন যে, এ হাদীসটি মাও’ এবং যেসব মুহাদ্দিস হাদীস পরীক্ষা করে থাকেন তাঁরা সবাই একমত যে, এ হাদীসটি তৈরী করে নেয়া হয়েছে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-কে সম্বোধন করে বলছেনঃ অতঃপর এ সম্বোধন সাধারণ হয়ে গেছে, অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা সকলকেই সম্বোধন করে বলছেন- “তোমাদের নিকট যে কল্যাণ উপস্থিত হয় তা আল্লাহ তাআলারই অনুগ্রহ, দয়া ও করুণা। আর তোমাদের উপর যে অমঙ্গল নিপতিত হয় তা তোমাদের স্বীয় কর্মেরই প্রতিফল।' যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ তোমাদের উপর যে বিপদ পৌছে তা তোমাদের হাত যা অর্জন করেছে তারই কিছুটা প্রতিফল এবং তিনি তোমাদের অধিকাংশ পাপই ক্ষমা করে দেন। (৪২:৩০) এর ভাবার্থ হচ্ছে- “তোমার পাপের কারণে। অর্থাৎ কার্যেরই প্রতিফল।রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তির শরীরের সামান্য ছাল উঠে যায় বা তার পদস্খলন ঘটে কিংবা তাকে কিছু কাজ করতে হয়, ফলে শরীর দিয়ে ঘাম বের হয়, ওটাও কোন না কোন পাপের কারণেই হয়ে থাকে। আর আল্লাহ তা'আলা যে পাপগুলো দেখেও দেখেন না এবং ক্ষমা করে থাকেন সেগুলো তো অনেক রয়েছে।” এ মুরসাল হাদীসটির বিষয়বস্তু একটি মুত্তাসিল সহীহ হাদীসেও রয়েছে।রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! মুমিনকে যে দুঃখকষ্ট পৌছে, এমনকি তার পায়ে যে কাঁটা ফুটে সে কারণেও আল্লাহ তা'আলা তার পাপ মার্জনা করে থাকেন। হযরত আবু সালিহ (রঃ) বলেন (আরবী)-এর ভাবার্থ এই যে, যে অমঙ্গল তোমার উপর নিপতিত হয় তার কারণ হচ্ছে তোমার পাপ। হ্যা, তবে ওটাও ভাগ্যে আল্লাহ তা'আলাই লিখেছেন।হযরত মুতরাফ ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেন, তোমরা তকদীর সম্বন্ধে কি জিজ্ঞেস করছো? তোমাদের জন্যে কি সূরা-ই-নিসার (আরবী)-এ আয়াতটি যথেষ্ট নয়? আল্লাহর শপথ! মানুষকে আল্লাহ তাআলার নিকট সমর্পণ করা হয়নি বরং তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে এবং তাঁরই নিকট তারা ফিরে যাবে। এ উক্তিটি খুবই দৃঢ় ও মজবুত এবং এটা কাদরিয়্যাহ্ এবং জাবরিয়্যাহ সম্প্রদায়ের উক্তিকে চরমভাবে খণ্ডন করেছে। এ তর্ক-বিতর্কের জায়গা তাফসীর নয়।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন- “হে নবী (সঃ)! তোমার কাজ হচ্ছে শুধু শরীয়তকে প্রচার করা, আল্লাহর সন্তুষ্টি ও অসন্তুষ্টির কাজকে, তার আদেশ ও নিষেধকে মানুষের নিকট পৌছিয়ে দেয়া। আল্লাহ তা'আলার সাক্ষ্যই যথেষ্ট। তিনি তোমাকে রাসূল করে পাঠিয়েছেন। অনুরূপভাবে তাঁরই সাক্ষ্য এ ব্যাপারেও যথেষ্ট যে, তুমি প্রচারকার্য চালিয়েছো। তোমার ও তাদের মধ্যে যা কিছু হচ্ছে তিনি সব কিছুই দেখছেন। তারা তোমার সাথে যে অবাধ্যাচরণ ও অহংকার করছে তাও তিনি দেখতে রয়েছেন।

তাফসীর আবু বকর যাকারিয়া

আপনি তাদেরকে দেখেননি যাদেরকে বলা হয়েছিল, ‘তোমরা তোমাদের হস্ত সংবরণ কর, সালাত কায়েম কর [১] এবং যাকাত দাও [২] ?’ অতঃপর যখন তাদেরকে যুদ্ধের বিধান দেয়া হল তখন তাদের একদল মানুষকে ভয় করছিল আল্লাহকে ভয় করার মত অথবা তারচেয়েও বেশী এবং বলল, ‘হে আমাদের রব! আমাদের জন্য যুদ্ধের বিধান কেন দিলেন? আমাদেরকে কিছু দিনের অবকাশ কেন দিলেন না?’ [৩] বলুন, ‘পার্থিব ভোগ সামান্য [৪] এবং যে তাকওয়া অবলম্বন করে তার জন্য আখেরাতই উত্তম [৫]। আর তোমাদের প্রতি সামান্য পরিমাণও যুলুম করা হবে না’।

এগারতম রুকূ‘

[১] ইমাম যুহরী বলেন, সালাত কায়েম করার অর্থ, পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের প্রত্যেকটিকে তার নির্ধারিত সময়ে আদায় করা। [আত-তাফসীরুস সহীহ]

[২] আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, আব্দুর রহমান ইবন আউফ রাদিয়াল্লাহু আনহু এবং তার কয়েকজন সাথী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, আমরা যখন মুশরিক ছিলাম তখন আমরা সম্মানিত ছিলাম। কিন্তু যখন ঈমান আনলাম তখন আমাদেরকে অসম্মানিত হতে হচ্ছে। একথা শুনে রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ ‘আমি ক্ষমা করতে নির্দেশিত হয়েছি, সুতরাং তোমরা যুদ্ধ করো না। তারপর যখন আল্লাহ তাকে মদীনায় হিজরত করালেন এবং যুদ্ধের নির্দেশ দেয়া হল তখন তাদের কেউ কেউ যুদ্ধ করা থেকে বিরত থাকল। তখন আল্লাহ তা’আলা এ আয়াত নাযিল করেন। [নাসায়ী: ৩০৮৬; মুস্তাদরাকে হাকিমঃ ২/৬৭, ৩০৬]

[৩] সুদ্দী বলেন, তারা ‘কিছুদিনের অবকাশ’ বলে মৃত্যু পর্যন্ত সময় চাচ্ছিল। অর্থাৎ তারা যেন বলছে যে, তাদের মৃত্যু হয়ে গেলে তারপর এ আয়াত নাযিল হওয়ার দরকার ছিল। [আত-তাফসীরুস সহীহ]

[৪] হাসান বসরী এ আয়াত পাঠ করে বলেন, ঐ বান্দাকে আল্লাহ রহমত করুন, যে দুনিয়াকে এ আয়াত অনুযায়ী সঙ্গী বানিয়েছে। দুনিয়ার প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত উদাহরণ হচ্ছে, সে ব্যক্তির ন্যায়, যে একটি ঘুম দিল, ঘুমের মধ্যে সে কিছু ভাল স্বপ্ন দেখল, তারপর তার ঘুম ভেঙ্গে গেল। আত-তাফসীরুস সহীহ]

[৫] আয়াতে দুনিয়ার নেয়ামতের তুলনায় আখেরাতের নেয়ামতসমূহকে উত্তম বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তার কয়েকটি কারণ রয়েছে:

দুনিয়ার নেয়ামত অল্প এবং আখেরাতের নেয়ামত অধিক।

দুনিয়ার নেয়ামত ক্ষণস্থায়ী এবং আখেরাতের নেয়ামত অনন্ত-অফুরন্ত।

দুনিয়ার নেয়ামতসমূহের সাথে নানা রকম অস্থিরতাও রয়েছে, কিন্তু আখেরাতের নেয়ামত এ সমস্ত জঞ্জালমুক্ত।

দুনিয়ার নেয়ামত লাভ অনিশ্চিত, কিন্তু আখেলাতের নেয়ামত প্রত্যেক মুত্তাকী ব্যক্তির জন্য একান্ত নিশ্চিত। [তাফসীরে কাবীর]