An-Nisa

আন-নিসা: 123

4:123

আরবি

لَّيْسَ بِأَمَانِيِّكُمْ وَلَآ أَمَانِىِّ أَهْلِ ٱلْكِتَـٰبِ ۗ مَن يَعْمَلْ سُوٓءًا يُجْزَ بِهِۦ وَلَا يَجِدْ لَهُۥ مِن دُونِ ٱللَّهِ وَلِيًّا وَلَا نَصِيرًا

English Translations

Sahih International

It [i.e., Paradise] is not [obtained] by your wishful thinking nor by that of the People of the Scripture. Whoever does a wrong will be recompensed for it, and he will not find besides Allāh a protector or a helper.

Muhsin Khan

It will not be in accordance with your desires (Muslims), nor those of the people of the Scripture (Jews and Christians), whosoever works evil, will have the recompense thereof, and he will not find any protector or helper besides Allah.

Taqi Usmani

This is not (a matter of) your fancies or the fancies of the People of the Book. Whoever does evil shall be requited for it, and he shall find neither a friend for himself, besides Allah, nor a helper.

Abul Ala Maududi

It is neither your fancies nor the fancies of the People of the Book which matter. Whoever does evil shall reap its consequence and will find none to be his protector and helper against Allah.

Pickthall

It will not be in accordance with your desires, nor the desires of the People of the Scripture. He who doeth wrong will have the recompense thereof, and will not find against Allah any protecting friend or helper.

Yusuf Ali

Not your desires, nor those of the People of the Book (can prevail): whoever works evil, will be requited accordingly. Nor will he find, besides Allah, any protector or helper.

বাংলা অনুবাদ

তাইসিরুল কুরআন

তোমাদের বাসনা আর আহলে কিতাবদের বাসনা কোন কাজে আসবে না। যে ব্যক্তি কোন কুকর্ম করবে, সে তার বিনিময় প্রাপ্ত হবে, সে আল্লাহ ছাড়া তার জন্য কোন অভিভাবক পাবে না, কোন সাহায্যকারীও না।

রাওয়াই আল-বায়ান

না তোমাদের আশায় এবং না কিতাবীদের আশায় (কাজ হবে)। যে মন্দকাজ করবে তাকে তার প্রতিফল দেয়া হবে। আর সে তার জন্য আল্লাহ ছাড়া কোন অভিভাবক ও সাহায্যকারী পাবে না।

শাইখ মুজিবুর রহমান

না তোমাদের বৃথা আশায় কাজ হবে, আর না আহলে কিতাবের বৃথা আশায়; যে অসৎ কাজ করবে সে তার প্রতিফল পাবে এবং সে আল্লাহর পরিবর্তে কেহকে বন্ধু অথবা সাহায্যকারী প্রাপ্ত হবেনা।

ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

তোমাদের খেয়াল-খুশী ও কিতাবীদের খেয়াল-খুশী অনুসারে কাজ হবে না; কেউ মন্দ কাজ করলে তার প্রতিফল সে পাবে এবং আল্লাহ ছাড়া তার জন্য সে কোনো অভিভাবক ও সহায় পাবে না।

ফাতহুল মাজীদ

তোমাদের বাসনা ও আহলে কিতাবীদের বাসনা অনুসারে কাজ হবে না; কেউ মন্দ কাজ করলে তার প্রতিফল সে পাবেই এবং আল্লাহ ব্যতীত তার জন্য সে কোন অভিভাবক ও সাহায্যকারী পাবে না।

মুখতাসার

১২৩. হে মুসলিমরা! মূলতঃ নাজাত ও সফলতার ব্যাপারটি না তোমাদের আশার অধীন, না আহলে কিতাবের। বরং তা আমলেরই অধীন। তোমাদের কেউ বদ আমল করলে আল্লাহ তা‘আলা কিয়ামতের দিন তার প্রতিদান দিবেন। সে তখন আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া এমন কোন অভিভাবক পাবে না যে তার কল্যাণ করতে পারে অথবা এমন কোন সাহায্যকারী পাবে না যে তার ক্ষতি প্রতিরোধ করবে।

তাফসীর

তাফসীর ইবনে কাসীর

১২৩-১২৬ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত কাতাদাহ (রঃ) বলেন, 'আমাদের নিকট বর্ণনা করা হয় যে, আহলে কিতাব ও মুসলমানদের মধ্যে তর্ক হয়- আহলে কিতাব এই বলে মুসলমানদের উপর নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ করছিল যে, তাদের নবী (আঃ) মুসলমানদের নবী (সঃ)-এর পূর্বে দুনিয়ার বুকে আগমন করেছিলেন এবং তাদের কিতাবও মুসলমানদের কিতাবের পূর্বে অবতীর্ণ হয়েছিল। অপরপক্ষে মুসলমানেরা বলছিল যে, তাদের নবী (সঃ) সর্বশেষ নবী এবং তাদের কিতাবও পূর্ববর্তী সমস্ত কিতাবের ফায়সালাকারী। সে সময় এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। এতে অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের উপর মুসলমানদের শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করা হয়।হযরত মুহাজিদ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, আরবের লোকেরা বলেছিল, ‘আমাদেরকে মৃত্যুর পর পুনর্জীবিত করা হবে না এবং আমাদের শাস্তিও হবে। ইয়াহূদীরা বলেছিল, ‘জান্নাতে শুধুমাত্র আমরাই যাবো।' খ্রীষ্টানেরাও অনুরূপ কথা বলেছিল। আর তারা এ কথাও বলেছিল যে, তাদেরকে শুধু কিছুদিন জাহান্নামের শাস্তি ভোগ করতে হবে। আয়াতের বিষয়বস্তু এই যে, শুধু মুখের কথা ও দাবীর দ্বারা সত্য প্রকাশিত হয় না। বরং ঈমানদার হচ্ছে ঐ ব্যক্তি যার অন্তর পরিষ্কার হয়, আমল তার সাক্ষী স্বরূপ হয় এবং আল্লাহ প্রদত্ত দলীল তার হাতে থাকে। হে মুশরিকের দল! তোমাদের মনের বাসনা ও অসার দাবীর কোন মূল্য নেই এবং আহলে কিতাবের উচ্চাকাঙ্খা এবং বড় বড় বুলিও মুক্তির মাপকাঠি নয়। বরং মুক্তির মাপকাঠি হচ্ছে মহান আল্লাহর নির্দেশাবলী পালন ও রাসূলগণের আনুগত্য স্বীকার। মন্দ কার্যকারীদের সঙ্গে কি এমন সম্বন্ধ রয়েছে যে, যার কারণে তাদেরকে তাদের মন্দ কার্যের প্রতিদান দেয়া হবে না? বরং কিয়ামতের দিন ভাল-মন্দ যে যা করেছে তিল পরিমাণ হলেও তার চোখের সামনে তা প্রকাশিত হয়ে পড়বে। এ আয়াতটি সাহাবীগণের সামনে খুবই কঠিন ঠেকেছিল। হযরত আবু বকর (রাঃ) বলেছিলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! অণুপরিমাণ কার্যেরও যখন প্রতিদান দেয়া হবে তখন মুক্তি কিরূপে পাওয়া যাবে? তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ প্রত্যেক মন্দ কার্যকারী দুনিয়াতেই প্রতিদান পাবে।'তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এ রয়েছে, হযরত আবদুল্লাহ ইবৃনে উমার (রাঃ) স্বীয় গোলামকে বলেনঃ “সাবধান! যেখানে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের (রাঃ)-কে শূলী দেয়া হয়েছে সেখান দিয়ে গমন করো না। কিন্তু গোলাম তাঁর এ কথা ভুলে যায় এবং হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ)-এর দৃষ্টি হযরত ইবনে যুবায়েরের উপর নিপতিত হলে তিনি বলেন, আল্লাহর শপথ! যতটুকু আমার জানা আছে, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, তুমি রোযাদার, নামাযী ও আত্মীয়তার সম্পর্ক যুক্তকারী ছিলে। আমি আশা রাখি যে, যেটুকু মন্দকাজ তোমার দ্বারা সাধিত হয়েছে তার প্রতিশোধ দুনিয়াতেই হয়ে গেল। এরপর আল্লাহ তা'আলা তোমাকে আর শাস্তি দেবেন না। অতঃপর তিনি হযরত মুজাহিদ (রঃ)-কে লক্ষ্য করে বলেন, হযরত আবূ বকর (রাঃ) হতে আমি শুনেছি, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “যে ব্যক্তি মন্দকার্য করে তার প্রতিদান সে দুনিয়াতেই পেয়ে যায়। অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হযরত ইবনে যুবাইর (রাঃ)-কে শূলে দেখে বলেন, হে আবূ হাবীব! আল্লাহ তোমার প্রতি সদয় হোন। আমি তোমার পিতার মুখেই এ হাদীসটি শুনেছি। তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এ রয়েছে যে, হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর বিদ্যামানতায় এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) আয়াতটি তাঁকে পাঠ করে শুনিয়ে দেন তখন তিনি খুব চিন্তিত হয়ে পড়েন। তিনি মনে করেন যে, প্রত্যেক আমলের যখন প্রতিদান দেয়া হবে তখন মুক্তিপ্রাপ্তি খুব কঠিন হয়ে যাবে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেনঃ “হে আবু বকর (রাঃ)! জেনে রেখ যে, তোমার সঙ্গীদেরকে অর্থাৎ মুমিনদেরকে তো দুনিয়াতেই তাদের কার্যের প্রতিদান দেয়া হবে এবং ঐ বিপদসমূহের কারণেই তোমাদের পাপ ক্ষমা করে দেয়া হবে। কিয়ামতের দিন তোমরা পবিত্র হয়ে উঠবে। হ্যা, তবে অন্য লোক যারা রয়েছে তাদের পাপ পুঞ্জীভূত হয়ে যাবে এবং কিয়ামতের দিন তাদেরকে শাস্তি দেয়া হবে।' এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযীও (রঃ) বর্ণনা করেছেন এবং বলেছেন যে, এর বর্ণনাকারী মূসা ইবনে উবাইদাহ দুর্বল এবং অপর বর্ণনাকারী মাওলা ইবনে সিবা অজ্ঞাত। বহু পন্থায় এর মর্মকথা বর্ণিত হয়েছে। অন্য একটি হাদীসে রয়েছে যে, হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এ আয়াতটি আমাদের উপর খুব ভারী বোধ হচ্ছে। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ মুমিনের এ প্রতিদান ওটাই যা দুনিয়াতেই তার উপর বিপদ-আপদের আকারে আপতিত হয়। আর একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (স) বলেনঃ ‘এমন কি একজন মুমিন হয় তো তার জামার পকেটে কিছু টাকা রাখলো, তারপর প্রয়োজনের সময় ক্ষণিকের জন্যে সে সেই টাকা পেলো না, এরপর আবার পকেটে হাত দিতেই টাকা বেরিয়ে আসে। এই যে কিছুক্ষণ সে টাকাটা পেলো না যার দরুন মনে কিছুটা কষ্ট পেলো, এর ফলেও তার পাপ মার্জনা করা হয় এবং এটাও তার মন্দ কার্যের প্রতিদান হয়ে যায়। দুনিয়ার এসব বিপদ তাকে এমন খাটি ও পবিত্র করে দেয় যে, কিয়ামতের কোন বোঝা তার উপরে থাকে না। যেমন সোনা আগুনে দিলে খাটি হয়ে বেরিয়ে আসে, দ্রুপ সেও দুনিয়ায় পাক সাফ হয়ে আল্লাহ তাআলার নিকট গমন করে।' তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এ রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ আয়াত সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত হয়ে বলেনঃ মুমিনকে প্রত্যেক জিনিসেই পুণ্য দেয়া হয়, এমনকি মৃত্যুর যন্ত্রণায়ও পুণ্য দেয়া হয়।’মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন বান্দার পাপ খুব বেশী হয়ে যায় এবং সে পাপসমূহ দূর করার মত অধিক সৎ আমল থাকে না তখন আল্লাহ তা'আলা তার উপর কোন দুঃখ নাযিল করেন যার ফলে তার গুনাহ মাফ হয়ে যায়।'হযরত সাঈদ ইবনে মানসূর (রঃ) বলেন যে, যখন উপরোক্ত আয়াতটি সাহাবীগণের উপর ভারী বোধ হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাদেরকে বলেনঃ ‘তোমরা ঠিকভাবে এবং মিলেমিশে থাক, মুসলমানের প্রত্যেক বিপদই হচ্ছে তার পাপের প্রায়শ্চিত্ত। এমনকি কাঁটা লাগলেও (ঐ কারণে গুনাহ মাফ হয়ে থাকে)।' অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, সাহাবীগণ রোদন করছিলেন এবং তাঁরা খুবই চিন্তান্বিত ছিলেন। সে সময় রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁদেরকে এ কথা বলেছিলেন। এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে জিজ্ঞেস করেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমরা আমাদের এ রোগে কি পাবো?' তিনি বলেনঃ ‘এর ফলে তোমাদের পাপের প্রায়শ্চিত্ত হয়ে যাবে।' একথা শুনে হযরত কা'ব ইবনে আজরা (রাঃ) প্রার্থনা করেন, হে আল্লাহ! মৃত্যু পর্যন্ত যেন জ্বর আমা হতে পৃথক না হয়। কিন্তু যেন আমি হজ্ব, উমরা, জিহাদ এবং জামাআতে নামায পড়া হতে বঞ্চিত না হই। তাঁর এ প্রার্থনা গৃহীত হয়, তার শরীরে হাত লাগালে জ্বর অনুভূত হতো। (মুসনাদ-ই-আহমাদ)রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে একবার জিজ্ঞেস করা হয়ঃ ‘প্রত্যেকে মন্দ কার্যেরই কি প্রতিদান দেয়া হবে? তিনি উত্তরে বলেনঃ হ্যা, ঐ রকমই এবং অতটুকুই কিন্তু প্রত্যেক সৎ কার্যের প্রতিদান দশগুণ করে দেয়া হয়। সুতরাং সে ধ্বংস হয়ে গেল যার এক দশ হতে বেড়ে গেল (অর্থাৎ পাপের প্রতিদান সমান সমান এবং পুণ্যের প্রতিদান দশগুণ হওয়া সত্ত্বেও পাপ বেশী থেকে গেল)'। (তাফসীর-ইইবনে মিরদুওয়াই) হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, (আরবী)-এর দ্বারা কাফিরকে বুঝান হয়েছে। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘আমি একমাত্র কাফিরদের উপর প্রতিশোধ গ্রহণ করে থাকি। (৩৪:১৭)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও হযরত সাঈদ ইবনে যুবাইর (রাঃ) বলেন যে, এখানে মন্দ কার্যের ভাবার্থ হচ্ছে শিক” এরপর বলা হচ্ছে- এ ব্যক্তি আল্লাহর পরিবর্তে কোন বন্ধু ও সাহায্যকারী পাবে না। হাঁ, যদি সে তাওবা করে তাহলে সেটা অন্য কথা।ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেনঃ সঠিক কথা এই যে, প্রত্যেক মন্দ কাজই এ আয়াতের অন্তর্ভুক্ত। যেমন উপরে বর্ণিত হাদীসগুলো দ্বারা জানা যাচ্ছে। এ বিষয়ে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।মন্দকার্যের শাস্তির বর্ণনা দেয়ার পর এখন সৎ কার্যের প্রতিদানের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে। মন্দকাজের শাস্তি হয়তো দুনিয়াতেই দেয়া হয় এবং এটাই বান্দার জন্যে উত্তম, অথবা পরকালে দেয়া হয়। আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে এটা হতে র করুন। আমরা তাঁর নিকট প্রার্থনা জানাচ্ছি যে, তিনি যেন আমাদেরকে উভয় জগতে নিরাপত্তা দান করেন এবং আমাদেরকে যেন তিনি দয়া ও ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখেন। আমাদেরকে যেন তিনি ধরপাকড় ও অসন্তুষ্টি হতে রক্ষা করেন।সত্যার্যাবলী আল্লাহ তা'আলা পছন্দ করে থাকেন এবং স্বীয় অনুগ্রহ ও করুণা দ্বারা তা গ্রহণ করে থাকেন। কোন নর বা নারীর সৎকার্য তিনি নষ্ট করেন না। তবে শর্ত এই যে, হতে হবে মুসমলান। এ সৎলোকদেরকে তিনি স্বীয় জান্নাতে প্রবিষ্ট করেন। তাদের পুণ্য তিনি মোটেই কম হতে দেবেন না। বলা হয় খেজুরের আঁটির উপরিভাগের পাতলা আঁশকে। (আরবী) বলা হয় খেজুরের আঁটির মধ্যস্থলের হালকা ছালকে। এ দু'টো থাকে খেজুরের আঁটির মধ্যে। আর বলা হয় ঐ আঁটির উপরের আবরণকে। কুরআন কারীমের মধ্যে এরূপ স্থলে এ তিনটি শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে।এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-ওর চেয়ে উত্তম ধর্মের লোক আর কে হতে পারে যে স্বীয় আনন আল্লাহর উদ্দেশ্যে সমর্পণ করেছে? ঈমানদারী ও সৎ। নিয়তে তাঁর ঘোষণা অনুযায়ী তাঁর নির্দেশাবলী পালন করে এবং সে সৎকর্মশীলও হয়। অর্থাৎ সে শরীয়তের অনুসারী, সত্যধর্ম ও সুপথের পথিক এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হাদীসের উপর আমলকারী। প্রত্যেক ভাল কাজ গ্রহণীয় হওয়ার জন্যে এ দু'টি শর্ত রয়েছে। অর্থাৎ আন্তরিকতা ও অহী অনুযায়ী হওয়া। (আরবী) বা আন্তরিকতার ভাবার্থ এই যে, উদ্দেশ্য হবে শুধু আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি অর্জন। আর সঠিক হওয়ার অর্থ এই যে, সেটা হবে শরীয়ত অনুযায়ী। সুতরাং বাহির তো কুরআন ও হাদীস অনুযায়ী হওয়ার মাধ্যমে ঠিক হয়ে যায়। আর ভেতর সুসজ্জিত হয় সৎ নিয়তের দ্বারা। যদি এ দুটির মধ্যে মাত্র একটি না থাকে তবে আমল নষ্ট হয়ে যাবে। আন্তরিকতা না থাকলে কপটতা চলে আসে। তখন মানুষের সন্তুষ্টি ও তাদেরকে দেখানো উদ্দেশ্য হয়ে থাকে। কাজেই সেই অবস্থায় আমল গ্রহণযোগ্য হয় না। সুন্নাহ অনুযায়ী কাজ না হলে পথভ্রষ্টতা এবং অজ্ঞতা একত্রিত হয়ে যায়, ফলে তখনও আমল গ্রহণযোগ্যরূপে বিবেচিত হয় না। যেহেতু মুমিনের আমল লোক দেখানো হতে এবং শরীয়তের বিপরীত হওয়া থেকে মুক্ত হয় সেহেতু তার কাজ সর্বাপেক্ষা উত্তম কাজ হয়ে থাকে। ঐ কাজই আল্লাহ পাক ভালবাসেন এবং সে জন্যেই তা মোচনের কারণ হয়ে থাকে। এ কারণেই আল্লাহ তা'আলা এর পরেই বলেন-“তারা ইবরাহীম (আঃ)-এর সুদৃঢ় ধর্মের অনুকরণ করে থাকে। অর্থাৎ তারা হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর এবং কিয়ামত পর্যন্ত যত লোক তাঁর পদাংক অনুসরণ করবেন তাদের সকলের ধর্মের অনুসরণ করে থাকে। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ ‘ইবরাহীমের বেশী নিকটতম তারাই যারা তার অনুসারী এবং এ নবী (সঃ)।' (৩:৬৮) আর এক আয়াতে রয়েছে (আরবী) অর্থাৎ হে নবী (সঃ)! আমি তোমার নিকট অহী করেছি যে, তুমি ইবরাহীমের সুদৃঢ় ধর্মের অনুসরণ কর এবং সে মুশরিকদের অন্তর্গত ছিল না। (১৬:১২৩)(আরবী) বলা হয় স্বেচ্ছায় শির্ক হতে অসন্তোষ প্রকাশকারীকে ও পূর্ণভাবে সত্যের দিকে মন সংযোগকারীকে, যাকে কোন বাধাদানকারী বাধা দিতে পারে এবং দূরকারী দূর করতে পারে না।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর আনুগত্য স্বীকারের প্রতি গুরুত্ব আরোপের জন্যে এবং প্রতি উদ্বুদ্ধ করার উদ্দেশ্যে তার গুণাবলীর বর্ণনা দিচ্ছেন যে, তিনি আল্লাহর বন্ধু। অর্থাৎ বান্দা উন্নতি করতে করতে যে উচ্চতম পদ সোপান পর্যন্ত পৌঁছতে পারে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) সে সোপান পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিলেন। বন্ধুত্বের দরজা অপেক্ষা বড় দরজা আর নেই। এটা হচ্ছে প্রেমের উচ্চতম স্থান। হযরত ইবরাহীম (আঃ) ঐ স্থান পর্যন্ত পৌছেছিলেন। এর কারণ ছিল তাঁর পূর্ণ আনুগত্য। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ ‘সেই ইবরাহীম যে পুরোপুরি আল্লাহর আনুগত্য স্বীকার করেছিল। (৫৩:৩৭) অর্থাৎ হযরত ইবরাহীম (আঃ) আল্লাহ তাআলার নির্দেশাবলী সন্তুষ্টচিত্তে পালন করেছিলেন। কখনও তিনি তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোন কাজ করেননি। তাঁর ইবাদতে তিনি কখনও বিরক্তি প্রকাশ করেননি। কোন কিছু তাঁকে তাঁর ইবাদত হতে বিরত রাখতে পারেনি। আর একটি আয়াতে আছে (আরবী) অর্থাৎ যখন আল্লাহ তা'আলা ইবরাহীমকে কতগুলো কথা দ্বারা পরীক্ষা করেন, তখন সে ঐগুলো পূর্ণ করে।' (২৪ ১২৪) আল্লাহ তা'আলা আর এক জায়গায় বলেন- (আরবী) অর্থাৎ ইবরাহীম (আঃ) ছিল একাগ্রচিত্তে আল্লাহর নির্দেশাবলী পালনকারী এবং সে মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিল না।' (১৬:১২০)সহীহ বুখারী শরীফে হযরত আমর ইবনে মাইমুন (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত মুআয (রাঃ) ইয়ামনে ফজরের নামাযে যখন -এ আয়াতটি পাঠ করেন তখন একটি লোক বলেন- (আরবী) অর্থাৎ হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর মায়ের চক্ষু ঠাণ্ডা হলো।'তাফসীর-ই-ইবনে জারীরে রয়েছে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) খালীলুল্লাহ উপাধি হওয়ার কারণ এই যে, একবার দুর্ভিক্ষের সময় তিনি মিসরে বা মুসিলে তার এক বন্ধুর নিকট হতে কিছু খাদ্য-শস্য আনার উদ্দেশ্যে গমন করেন। কিন্তু তথায় কিছু না পেয়ে শূন্য হস্তে ফিরে আসছিলেন। স্বীয় গ্রামের নিকটবর্তী হলে তার খেয়াল হয় যে, এ বালুর ঢিবি হতে কিছু বালু বস্তায় ভর্তি করা হোক এবং এটা বাড়ী নিয়ে গিয়ে পরিবারকে কিছুটা সান্ত্বনা দেয়া যাবে। এভাবে তিনি বস্তায় বালু ভরে নেন এবং সোয়ারীর উপর উঠিয়ে নিয়ে বাড়ী মুখে রওয়ানা হন। মহান আল্লাহর কুদরতে সে বালু প্রকৃত আটা হয়ে যায়। তিনি বাড়ীতে পৌঁছে বস্তা রেখে ঘুমিয়ে পড়েন। তার পরিবারের লোকেরা বস্তা খুলে দেখে যে, সেটা উত্তম আটায় পূর্ণ রয়েছে। আটা খামীর করে রুটি পাকান হয়। তিনি জাগ্রত হয়ে পরিবারের লোককে আনন্দিত দেখতে পান এবং রুটিও প্রস্তুত দেখেন। তখন তিনি বিস্মিতভাবে তাদেরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “যে আটা দিয়ে তোমরা রুটি তৈরী করলে তা পেলে কোথায়? তারা উত্তরে বলেঃ আপনি তো আপনার বন্ধুর নিকট হতে নিয়ে এসেছেন। এখন তিনি ব্যাপারটা বুঝে ফেলেন এবং তাদেরকে বলেনঃ হ্যাঁ, এটা আমি আমার বন্ধু মহান সম্মানিত আল্লাহর নিকট হতে এনেছি।' সুতরাং আল্লাহ তা'আলাও তাকে স্বীয় বন্ধুরূপে গ্রহণ করেন। আর তাঁকে খালীলুল্লাহ উপাধিতে ভূষিত করেন? কিন্তু এ ঘটনার সত্যতার ব্যাপারে সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। খুব বেশী বললে এটাই বলা যাবে যে, এটা বানী ইসরাঈলের বর্ণনা, যাকে আমরা সত্যও বলতে পারি না এবং মিথ্যাও বলতে পারি না। তাকে আল্লাহর বন্ধু বলার প্রকৃত কারণ এই যে, তার অন্তরে আল্লাহ তাআলার প্রতি সীমাহীন ভালবাসা ছিল। আর ছিল তার প্রতি তার পূর্ণ আনুগত্য। তিনি স্বীয় ইবাদত দ্বারা আল্লাহ তা'আলাকে সন্তুষ্ট করেছিলেন। নবীও (সঃ) তাঁর বিদায় ভাষণে বলেছিলেনঃ “হে জনমণ্ডলী! দুনিয়াবাসীদের মধ্যে যদি আমি কাউকে বন্ধুরূপে গ্রহণকারী হতাম তবে আবু বকর ইবনে আবূ কুহাফা (রাঃ)-কে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করতাম। কিন্তু তোমাদের সঙ্গী (আমি) হচ্ছেন আল্লাহ তা'আলার বন্ধু।' (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম)আর একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তাআলা যেমন হযরত ইবরাহীমকে স্বীয় বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন দ্রুপ তিনি আমাকেও তার বন্ধুরূপে গ্রহণ করেছেন।'হযরত আবু বকর ইবনে মিরদুওয়াই (রঃ) স্বীয় তাফসীরে বর্ণনা করেছেন যে, হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবীগণ তার অপেক্ষায় বসেছিলেন। তাঁদের মধ্যে আলাপ আলোচনা চলছিল। কেউ বলছিলেনঃ ‘চমকপ্রদ কথা এই যে, আল্লাহ তাআলা স্বীয় মাখলুকের মধ্যে হযরত ইবরাহীম (আঃ)-কে বন্ধুরূপে গ্রহণ করেছেন। অন্য একজন বলেনঃ ‘এর চেয়েও বড় মেহেরবানী এই যে, হযরত মূসা (আঃ)-এর সঙ্গে তিনি স্বয়ং কথা বলেছেন এবং তার কালিমুল্লাহ বানিয়েছেন। অপর একজন বলেনঃ হযরত ঈসা (আঃ) তো হচ্ছেন আল্লাহর রূহ এবং তাঁর কালেমা। আর একজন বলেনঃ হযরত আদম (আঃ) হচ্ছেন সাফীউল্লাহ এবং আল্লাহর পছন্দনীয় বান্দা। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বাইরে এসে বলেনঃ “আমি তোমাদের কথা শুনেছি। নিশ্চয়ই তোমাদের কথা সত্য। হযরত ইবরাহীম (আঃ) হচ্ছেন খালীলুল্লাহ, হযরত মূসা (আঃ) হচ্ছেন কালীমুল্লাহ, হযরত ঈসা (আঃ) হচ্ছেন রূহুল্লাহ ও কালেমাতুল্লাহ এবং হযরত আদম (আঃ) হচ্ছেন সাফীউল্লাহ। এ রকমই হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) বটে। জেনে রেখো আমি একটি ঘটনা বর্ণনা করছি, এটা কিন্তু অহংকার হিসেবে নয়। আমি বলছি যে, আমি হাবীবুল্লাহ। আমি হচ্ছি সর্বপ্রথম সুপারিশকারী এবং আমার সুপারিশই সর্বপ্রথম গৃহীত হবে। আমিই প্রথম জান্নাতের দরজায় করাঘাতকারী। আল্লাহ তাআলা আমার জন্যে জান্নাতের দরজা খুলে দেবেন এবং আমাকেও ওর ভেতরে প্রবিষ্ট করবেন। আর আমার সঙ্গে থাকবে দরিদ্র মুমিন লোকেরা। কিয়ামতের দিন পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত লোক অপেক্ষা বেশী সম্মানিত হবো আমিই। এটা গৌরবের বশবর্তী হয়ে বলছি, বরং ঘটনা অবহিত করার জন্য তোমাদেরকে বলছি।' এ সনদে এ হাদীসটি গারীব বটে, কিন্তু এর সত্যতার কতক প্রমাণও বিদ্যমান রয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বলেনঃ “তোমরা কি এতে বিস্ময় বোধ করছো যে, বন্ধুত্ব ছিল হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর জন্যে, কালাম ছিল হযরত মূসা (আঃ)-এর জন্যে এবং দর্শন ছিল হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা (সঃ)-এর জন্যে। (মুসতাদরিক-ই-হাকীম) এ রকমই বর্ণনা হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে এবং আরও বহু সাহাবী ও তাবেঈ হতেও বর্ণিত আছে। তাছাড়া পূর্ববর্তী ও পরবর্তী বহু গুরুজন হতেও বর্ণিত আছে।মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমে রয়েছে, হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর অভ্যাস ছিল এই যে, তিনি অতিথিদেরকে সঙ্গে নিয়ে খেতেন। একদিন তিনি অতিথির খোজে বের হন। কিন্তু কোন অতিথি না পেয়ে ফিরে আসেন। বাড়িতে প্রবেশ করে দেখেন যে, একটি লোক দাঁড়িয়ে রয়েছেন। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ হে আল্লাহর বান্দা! আপনাকে আমার বাড়ীতে প্রবেশের অনুমতি দিল কে?' লোকটি উত্তরে বলেনঃ ‘এ বাড়ীর প্রকৃত মালিক আমাকে অনুমতি দিয়েছেন। তিনি জিজ্ঞেস করেনঃ ‘আপনি কে?' তিনি বলেনঃ আমি মৃত্যুর ফেরেশতা, আমাকে আল্লাহ তা'আলা তাঁর এক বান্দার নিকট এজন্যে পাঠিয়েছেন যে, তিনি তাঁকে স্বীয় বন্ধুরূপে গ্রহণ করেছেন, আমি যেন তাকে এ সুসংবাদ শুনিয়ে দেই।' এ কথা শুনে হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাকে বলেনঃ ‘তাহলে আমাকে বলুন তো, সে মহা পুরুষ কে? আল্লাহর শপথ! তিনি এ দুনিয়ার কোন দূর প্রান্তে থাকলেও আমি গিয়ে তার সাথে সাক্ষাৎ করবো এবং আমার অবশিষ্ট জীবন তার পদচুম্বনে কাটিয়ে দেবো।' এটা শুনে মৃত্যুর ফেরেশতা বলেনঃ “ঐ ব্যক্তি আপনিই।' তিনি আবার জিজ্ঞেস করেনঃ ‘সত্যিই কি আমি? ফেরেশতা বলেনঃ হ্যাঁ, আপনিই’। হযরত ইবরাহীম (আঃ) পুনরায় ফেরেশতাকে জিজ্ঞেস করেন তাহলে আপনি এ কথাও বলুন তো, কিসের উপর ভিত্তি করে এবং কোন কার্যের বিনিময়ে তিনি আমাকে বন্ধু হিসেবে মনোনীত করেছেন?' ফেরেশতা উত্তরে বলেনঃ কারণ এই যে, আপনি সকলকে দিতে থাকেন, কিন্তু আপনি কারও নিকট কিছু যাজ্ঞা করেন না।অন্য এক বর্ণনায় রয়েছে যে, যখন হতে আল্লাহ তা'আলা হযরত ইবরাহীম (আঃ)-কে ‘খালীলুল্লাহ' এ বিশিষ্ট উপাধিতে ভূষিত করেন তখন হতে তাঁর অন্তরে আল্লাহর ভয় এতো বেশী জমে উঠেছিল যে, তার অন্তরের কম্পনের শব্দ দূর হতে এমনিভাবেই শুনা যেতো যেমনিভাবে মহাশূন্যে পাখীর উড়ে যাওয়ার শব্দ শুনা যায়। সহীহ হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সম্বন্ধেও এসেছে যে, যে সময় আল্লাহ তাআলার ভয় তার উপর প্রভাব বিস্তার করতো তখন তার কান্নার শব্দ, যা তিনি দমন করে রাখতেন, দূরবর্তী ও পার্শ্ববর্তী লোকেরা এমনিভাবেই শুনতে পেতো যেমনিভাবে কোন হাঁড়ির মধ্যে পানি টগবগ করে ফুটলে তা শুনা যায়। এরপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-আকাশ ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে সবই তার অধিকারে রয়েছে এবং সবাই তার দাসত্বের শৃংখলে আবদ্ধ আছে। সবই তাঁর সৃষ্ট। তথায় তিনি যখন যা করার ইচ্ছে করেন, বিনা বাধা-বিপত্তিতে তাই করে থাকেন। কারও সাথে পরামর্শ করার তার প্রয়োজন হয় না। এমন কেউ নেই যে তাঁকে তাঁর ইচ্ছে হতে ফিরিয়ে দিতে পারে। কেউ তাঁর আদেশের সামনে প্রতিবন্ধক রূপে দাঁড়াতে পারে না। তিনি শ্রেষ্ঠত্ব ও ব্যাপক ক্ষমতার অধিকারী। তিনি ন্যায় বিচারক, মহা বিজ্ঞানময়, সূক্ষ্মদর্শী ও পরম দয়ালু। তিনি এক। কারও মুখাপেক্ষী তিনি নন। কোন লুক্কায়িত জিনিস, ক্ষুদ্র হতে ক্ষুদ্রতম জিনিস এবং বহু দূরের জিনিস তাঁর নিকট গুপ্ত নেই। যা কিছু আমাদের দৃষ্টির অন্তরালে রয়েছে তার সবই তাঁর নিকট প্রকাশমান।

তাফসীর আবু বকর যাকারিয়া

তোমাদের খেয়াল-খুশী ও কিতাবীদের খেয়াল-খুশী অনুসারে কাজ হবে না [১]; কেউ মন্দ কাজ করলে তার প্রতিফল সে পাবে [২] এবং আল্লাহ ছাড়া তার জন্য সে কোন অভিভাবক ও সহায় পাবে না।

[১] আয়াতে মুসলিম ও আহলে-কিতাবদের মধ্যে অনুষ্ঠিত একটি কথোপকথন উল্লেখিত হয়েছে। এরপর কথোপকথন বিচার করে উভয় পক্ষকে বিশুদ্ধ হেদায়াত দেয়া হয়েছে। অবশেষে আল্লাহর কাছে গ্রহণীয় ও শ্রেষ্ঠ হওয়ার একটি মানদণ্ড ব্যক্ত করা হয়েছে, যা সামনে রাখলে মানুষ কখনো ভ্রান্তি ও পথভ্রষ্টতার শিকার হবে না। এতে বলা হয়েছে যে, এ গর্ব ও অহংকার কারো জন্য শোভা পায় না। শুধু কল্পনা, বাসনা ও দাবী দ্বারা কেউ কারো চাইতে শ্রেষ্ঠ হয় না; বরং প্রত্যেকের কাজকর্মই শ্রেষ্ঠত্বের ভিত্তি। কারো নবী ও গ্রন্থ যতই শ্রেষ্ঠ হোক না কেন, যদি সে ভ্রান্ত কাজ করে, তবে সেই কাজের শাস্তি পাবে। এ শাস্তির কবল থেকে রেহাই দিতে পারে- এরূপ কাউকে সে খুঁজে পাবে না।

[২] এ আয়াত নাযিল হলে সাহাবায়ে কেরাম অত্যন্ত চিন্তিত হয়ে পড়েন। আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেনঃ “যে কেউ কোন অসৎকাজ করবে, সে জন্য তাকে শাস্তি দেয়া হবে”। আয়াতটি যখন নাযিল হল, তখন আমরা খুব দুঃখিত ও চিন্তাযুক্ত হয়ে পড়লাম এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে গিয়ে বললামঃ এ আয়াতটি তো কোন কিছুই ছাড়েনি। সামান্য মন্দ কাজ হলেও তার সাজা দেয়া হবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ চিন্তা করো না, সাধ্যমত কাজ করে যাও। কেননা, (উল্লেখিত শাস্তি যে জাহান্নামই হবে, তা জরুরী নয়) তোমরা দুনিয়াতে যে কোন কষ্ট বা বিপদাপদে পড়, তাতে তোমাদের গোনাহর কাফফারা এবং মন্দ কাজের শাস্তি হয়ে থাকে। এমনকি যদি কারো পায়ে কাঁটা ফুটে, তাও গোনাহর কাফফারা বৈ নয়।’ [মুসলিমঃ ২৫৭৪]

অন্য এক বর্ণনায় আছে, ‘মুসলিম দুনিয়াতে যে কোন দুঃখ-কষ্ট, অসুখ-বিসুখ অথবা ভাবনা-চিন্তার সম্মুখীন হয়, তা তার গোনাহর কাফফারা হয়ে যায়।’ [বুখারীঃ ৫৬৪১, মুসলিমঃ ২৫৭৩]

অন্য হাদীসে এসেছে, “আল্লাহ যার কল্যাণ চান, তাকে কিছু বিপদাপদ দিয়ে থাকেন”। [বুখারী ৫৬৪৫]

মোটকথা, আলোচ্য আয়াতে মুসলিমদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে, শুধু দাবী ও বাসনায় লিপ্ত হয়ো না; বরং কাজের চিন্তা কর। কেননা, তোমরা অমুক নবী কিংবা গ্রন্থের অনুসারী শুধু এ বিষয় দ্বারাই তোমরা সাফল্য অর্জন করতে পারবে না। বরং এ গ্রন্থের প্রতি বিশুদ্ধ ঈমান এবং তদনুযায়ী সৎকার্য সম্পাদনের মধ্যেই প্রকৃত সাফল্য নিহিত রয়েছে।