Al-A'raf

আল-আরাফ: 157

7:157

আরবি

ٱلَّذِينَ يَتَّبِعُونَ ٱلرَّسُولَ ٱلنَّبِىَّ ٱلْأُمِّىَّ ٱلَّذِى يَجِدُونَهُۥ مَكْتُوبًا عِندَهُمْ فِى ٱلتَّوْرَىٰةِ وَٱلْإِنجِيلِ يَأْمُرُهُم بِٱلْمَعْرُوفِ وَيَنْهَىٰهُمْ عَنِ ٱلْمُنكَرِ وَيُحِلُّ لَهُمُ ٱلطَّيِّبَـٰتِ وَيُحَرِّمُ عَلَيْهِمُ ٱلْخَبَـٰٓئِثَ وَيَضَعُ عَنْهُمْ إِصْرَهُمْ وَٱلْأَغْلَـٰلَ ٱلَّتِى كَانَتْ عَلَيْهِمْ ۚ فَٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ بِهِۦ وَعَزَّرُوهُ وَنَصَرُوهُ وَٱتَّبَعُوا۟ ٱلنُّورَ ٱلَّذِىٓ أُنزِلَ مَعَهُۥٓ ۙ أُو۟لَـٰٓئِكَ هُمُ ٱلْمُفْلِحُونَ

English Translations

Sahih International

Those who follow the Messenger, the unlettered prophet, whom they find written [i.e., described] in what they have of the Torah and the Gospel, who enjoins upon them what is right and prohibits them from what is wrong and makes lawful for them what is good and forbids them from what is evil and relieves them of their burden and the shackles which were upon them. So they who have believed in him, honored him, supported him and followed the light which was sent down with him - it is those who will be the successful.

Muhsin Khan

Those who follow the Messenger, the Prophet who can neither read nor write (i.e. Muhammad SAW) whom they find written with them in the Taurat (Torah) (Deut, xviii, 15) and the Injeel (Gospel) (John xiv, 16), - he commands them for Al-Ma'ruf (i.e. Islamic Monotheism and all that Islam has ordained); and forbids them from Al-Munkar (i.e. disbelief, polytheism of all kinds, and all that Islam has forbidden); he allows them as lawful At-Taiyibat [(i.e. all good and lawful) as regards things, deeds, beliefs, persons, foods, etc.], and prohibits them as unlawful Al-Khaba'ith (i.e. all evil and unlawful as regards things, deeds, beliefs, persons, foods, etc.), he releases them from their heavy burdens (of Allah's Covenant), and from the fetters (bindings) that were upon them. So those who believe in him (Muhammad SAW), honour him, help him, and follow the light (the Quran) which has been sent down with him, it is they who will be successful.

Taqi Usmani

those who follow the Messenger, the Ummiyy (unlettered) prophet whom they find written with them in the Torah and the Injīl , and who bids them what is fair and forbids what is unfair, and makes lawful for them good things, and makes unlawful for them impure things, and relieves them of their burden, and of the shackles that were upon them. So, those who believe in him and support him, and help him and follow the light sent down with him, - those are the ones who are successful.”

Abul Ala Maududi

[To-day this mercy is for] those who follow the ummi Prophet, whom they find mentioned in the Torah and the Gospel with them. He enjoins upon them what is good and forbids them what is evil. He makes the clean things lawful to them and prohibits all corrupt things, and removes from them their burdens and the shackles that were upon them. So those who believe in him and assist him, and succour him and follow the Light which has been sent down with him, it is they who shall prosper.

Pickthall

Those who follow the messenger, the Prophet who can neither read nor write, whom they will find described in the Torah and the Gospel (which are) with them. He will enjoin on them that which is right and forbid them that which is wrong. He will make lawful for them all good things and prohibit for them only the foul; and he will relieve them of their burden and the fetters that they used to wear. Then those who believe in him, and honour him, and help him, and follow the light which is sent down with him: they are the successful.

Yusuf Ali

"Those who follow the messenger, the unlettered Prophet, whom they find mentioned in their own (scriptures),- in the law and the Gospel;- for he commands them what is just and forbids them what is evil; he allows them as lawful what is good (and pure) and prohibits them from what is bad (and impure); He releases them from their heavy burdens and from the yokes that are upon them. So it is those who believe in him, honour him, help him, and follow the light which is sent down with him,- it is they who will prosper."

বাংলা অনুবাদ

তাইসিরুল কুরআন

যারা প্রেরিত উম্মী নাবীকে অনুসরণ করবে যা তাদের কাছে রক্ষিত তাওরাত ও ইনজীলে তারা লিখিত পাবে। সে তাদেরকে সৎকাজের নির্দেশ দেয়, অসৎ কাজ করতে নিষেধ করে, পবিত্র বস্তুসমূহ তাদের জন্য হালাল করে, অপবিত্র বস্তুগুলো তাদের জন্য নিষিদ্ধ করে, তাদের থেকে গুরুভার সরিয়ে দেয় আর সেই শৃঙ্খল (হালাল-হারামের বানোয়াট বিধি-নিষেধ) যাতে ছিল তারা বন্দী। কাজেই যারা তার প্রতি ঈমান আনে, তাকে সম্মান প্রদর্শন করে, তাকে সাহায্য-সহযোগিতা করে আর তার উপর অবতীর্ণ আলোর অনুসরণ করে, তারাই হচ্ছে সফলকাম।

রাওয়াই আল-বায়ান

যারা অনুসরণ করে রাসূলের, যে উম্মী নবী; যার গুণাবলী তারা নিজদের কাছে তাওরাত ও ইঞ্জিলে লিখিত পায়, যে তাদেরকে সৎ কাজের আদেশ দেয় ও বারণ করে অসৎ কাজ থেকে এবং তাদের জন্য পবিত্র বস্তু হালাল করে আর অপবিত্র বস্তু হারাম করে। আর তাদের থেকে বোঝা ও শৃংখল- যা তাদের উপরে ছিল- অপসারণ করে। সুতরাং যারা তার প্রতি ঈমান আনে, তাকে সম্মান করে, তাকে সাহায্য করে এবং তার সাথে যে নূর নাযিল করা হয়েছে তা অনুসরণ করে তারাই সফলকাম।

শাইখ মুজিবুর রহমান

যারা সেই নিরক্ষর রাসূলের অনুসরণ করে চলে যার কথা তারা তাদের নিকট রক্ষিত তাওরাত ও ইঞ্জীল কিতাবে লিখিত পায়, যে মানুষকে সৎ কাজের নির্দেশ দেয় ও অন্যায় কাজ করতে নিষেধ করে, আর সে তাদের জন্য পবিত্র বস্তুসমূহ বৈধ করে এবং অপবিত্র ও খারাপ বস্তুকে তাদের প্রতি অবৈধ করে, আর তাদের উপর চাপানো বোঝা ও বন্ধন হতে তাদেরকে মুক্ত করে। সুতরাং তার প্রতি যারা ঈমান রাখে, তাকে সম্মান করে এবং সাহায্য করে ও সহানুভূতি প্রকাশ করে, আর সেই আলোকের অনুসরণ করে চলে যা তার সাথে অবতীর্ণ করা হয়েছে, তারাই (ইহকালে ও পরকালে) সাফল্য লাভ করবে।

ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

‘যারা অনুসরণ করে রাসূলের, উম্মী নবীর, যার উল্লেখ তারা তাদের কাছে তাওরাত ও ইঞ্জীলে লিপিবদ্ধ পায়, যিনি তাদের সৎকাজের আদেশ দেন, অসৎকাজ থেকে নিষেধ করেন, তাদের জন্য পবিত্র বস্তু হালাল করেন এবং অপবিত্র বস্তু হারাম করেন। আর তাদেরকে তাদের গুরুভার ও শৃংখল হতে মুক্ত করেন যা তাদের উপর ছিল। কাজেই যারা তার প্রতি ঈমান আনে, তাকে সম্মান করে, তাকে সাহায্য করে এবং যে নূর তার সাথে নাযিল হয়েছে সেটার অনুসরণ করে, তারাই সফলকাম।

ফাতহুল মাজীদ

যারা অনুসরণ করে বার্তাবাহক উম্মী নাবীর, যাকে তারা তাদের নিকট রক্ষিত তাওরাত ও ইঞ্জীলে লিখিত অবস্থায় পেয়েছে, যে তাদেরকে সৎ কার্যের নির্দেশ দেয় ও অসৎ কার্যে বাধা দেয়, যে তাদের জন্য পবিত্র বস্তু হালাল করে ও অপবিত্র বস্তু হারাম করে এবং যে মুক্ত করে তাদেরকে তাদের গুরুভার হতে ও শৃংখল হতে যা তাদের ওপর ছিল। সুতরাং যারা তার প্রতি ঈমান আনে, তাকে সম্মান করে, তাকে সাহায্য করে এবং যে নূর তার সাথে অবতীর্ণ হয়েছে তার অনুসরণ করে তারাই সফলকাম।

মুখতাসার

১৫৭. যারা মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর অনুসরণ করে। তিনি এমন এক আনপড় নবী যিনি না পড়তে পারেন না লিখতে পারেন। বরং তাঁর নিকট কেবল তাঁর প্রতিপালকই ওহী পাঠায়। যাঁর নাম ও বৈশিষ্ট্যাবলী এবং তাঁর উপর যা নাযিল করা হয়েছে তা তারা মূসা (আলিাইহিস-সালাম) এর উপর নাযিলকৃত তাওরাতে এবং ঈসা (আলিাইহিস-সালাম) এর উপর নাযিলকৃত ইঞ্জীলে লিখিত পাবে। তিনি তাদেরকে সুন্দর ও সঠিকেরই আদেশ করেন এবং মানুষের সঠিক বিবেক ও বিশুদ্ধ স্বভাবে যা অসুন্দর ও অসঠিক তা থেকেই নিষেধ করেন। উপরন্তু তিনি তাদের জন্য এমন সব মজাদার খাদ্য, পানীয় ও বিবাহের বিষয়াদি হালাল করেন যাতে কোন ধরনের ক্ষতি নেই। আর সকল ধরনের বিশ্রী ও অরুচিকর জিনিস তাদের উপর হারাম করেন। তেমনিভাবে তাদের উপর থেকে এমন কঠিন বিধানাদি দূর করেন যা মেনে চলতে তাদেরকে বাধ্য করা হয়েছে। যেমন: হত্যাকারীকে হত্যা করার বাধ্যবাধকতা; চাই হত্যাকাণ্ডটি ইচ্ছাকৃত হোক কিংবা অনিচ্ছাকৃত। অতএব, বনী ইসরাঈল ও অন্যান্যদের মধ্যকার যারা তাঁর উপর ঈমান আনবে এবং তাঁকে সম্মান ও মর্যাদা দিবে উপরন্তু তাঁর শত্রু কাফিরদের বিরুদ্ধে তাঁকে সহযোগিতা করবে এবং তাঁর উপর নাযিলকৃত পথপ্রদর্শক আলোকময় কুর‘আনের অনুসরণ করবে তারাই সত্যিকারার্থে সফলকাম। যারা তাদের উদ্দেশ্য হাসিল করতে সক্ষম হবে এবং তাদেরকে তাদের ভয়ের বস্তুসমূহ থেকে দূরে রাখা হবে।

তাফসীর

তাফসীর ইবনে কাসীর

যারা নিরক্ষর নবী (সঃ)-এর অনুসরণ করে এবং মুসলমান হয়, তারা সেই ভবিষ্যদ্বাণী সম্পর্কে সম্যক অবগত যে ভবিষ্যদ্বাণী তাদের কিতাব তাওরাত ও ইঞ্জীলে নবী উম্মী (সঃ) সম্পর্কে করা হয়েছে। নবীদের গ্রন্থসমূহে নবী (সঃ)-এর গুণাবলী উল্লিখিত আছে। ঐসব গ্রন্থে নবীগণ নিজ নিজ উম্মতকে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নবুওয়াতের সুসংবাদ প্রদান করেছেন এবং তার মাযহাব গ্রহণ করার হিদায়াত করে গেছেন। তাঁদের আলেমগণ ও ধর্মযাজকগণ তা অবগত আছেন।মুসনাদে আহমাদে রয়েছে যে, একজন বেদুইন বর্ণনা করেছে, নবী (সঃ)-এর যুগে একবার আমি দুধ বিক্রি করার উদ্দেশ্যে মদীনায় গমন করি । বিক্রি শেষে আমি মনে মনে বলি, মুহাম্মাদ (সঃ)-এর সাথে সাক্ষাৎ করেই নেই এবং তার মুখের কিছু বাণী শুনাই যাক। আমি দেখি যে, হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) হযরত আবু বকর ও হযরত উমার (রাঃ)-এর সাথে কোথায় যেন যাচ্ছেন। আমিও তাঁদের পিছু পিছু চললাম। তারা তিনজন এমন এক ইয়াহূদীর বাড়ীতে পৌছলেন যে তাওরাতের জ্ঞান রাখতো। তার ছেলে মৃত্যুশয্যায় শায়িত ছিল। ছেলেটি ছিল নব যুবক এবং সৌন্দর্যের অধিকারী। ইয়াহূদীটি তার ছেলের পার্শ্বে বসে তাওরাত পাঠ করছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঐ ইয়াহূদীর সাথে বাক্যালাপ করতে শুরু করলেন। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “তাওরাত অবতীর্ণকারীর শপথ! সত্য করে বল তো, এতে আমার নবুওয়াতের কোন সংবাদ আছে কি নেই?” সে মাথা নেড়ে উত্তর দিলোঃ “না।” তখন তার মরণাপন্ন ছেলেটি বলে উঠলোঃ “তাওরাত অবতীর্ণকারীর শপথ! আমাদের কিতাবে আপনার গুণাবলী ও নবুওয়াতের সংবাদ বিদ্যমান রয়েছে এবং আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি আল্লাহর রাসূল।” অতঃপর ছেলেটি মারা গেল। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “এ মুসলমান। সুতরাং ইয়াহূদীদেরকে এখান থেকে সরিয়ে দাও।” তারপর তিনি তার কাফন ও জানাযার নামাযের ব্যবস্থা করলেন। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) জারীরী হতে এবং তিনি আবু সখর আকীলী হতে তাখরীজ করেছেন। ইবনে কাসীর (রঃ) বলেন যে, এ হাদীসটি অতি উত্তম ও মজবুত। এটা সহীহ বুখারীতে হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে)হিশাম ইবনুল আস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াসের নিকট ইসলাম প্রচারের জন্যে আমি ও অন্য একটি লোক প্রেরিত হই। আমরা উভয়ে গমন করি এবং দামেস্কের উপকণ্ঠ পর্যন্ত পৌঁছি। জিবিল্লাহ ইবনে আইহাম গাস্সানীর প্রাসাদে আমরা উপস্থিত হই। তিনি সিংহাসনের অধিকারী ছিলেন। আমরা কি বলতে চাই তা জানবার জন্যে তিনি আমাদের কাছে একজন দূত পাঠালেন। আমরা দূতকে বললামঃ “আমরা তোমার সাথে কথা বলবো না। বাদশাহর সাথে কথা বলার জন্যে আমরা প্রেরিত হয়েছি। তিনি যদি আমাদেরকে তার কাছে ডেকে নেন তবে আমরা তার সাথে কথা বলবো। তোমার কাছে আমাদের বলার কিছুই নেই। সে তখন বাদশাহকে (প্রাদেশিক শাসনকর্তাকে) খবর দিলো। বাদশাহ আমাদেরকে ডেকে নিলেন এবং বললেনঃ “কি বলতে চাও বল।" হিশাম ইবনুল আস তাঁর সাথে আলাপ শুরু করলেন এবং তাঁকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন। তিনি কালো রঙ্গের কাপড় পরিহিত ছিলেন। হিশাম তাঁকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “আপনার পরনে কালো কাপড় কেন?" জিবিল্লাহ উত্তরে বললেনঃ “আমি শপথ করেছি যে, যে পর্যন্ত তোমাদেরকে সিরিয়া থেকে বহিষ্কার না করবো সে পর্যন্ত এই কালো পোশাক ছাড়বো না। আমরা বললাম, আল্লাহর কসম! আমরা আপনার সিংহাসন দখল করে নেবো। শুধু তাই নয়, ইনশাআল্লাহ আপনাদের কেন্দ্রীয় সম্রাটের (হিরাক্লিাসের) রাজ্যও আমাদের অধিকারে এসে যাবে। আমাদের নবী (সঃ) এই ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন। তিনি বললেনঃ “তোমরা সেই লোক নও। ওরা হচ্ছে এমন লোক যে দিনে রোযা রাখে ও রাত্রে নামায পড়ে। বল তো, তোমাদের রোযা কিরূপ?” আমরা পূর্ণভাবে এর বর্ণনা দিলাম। তখন লক্ষ্য করলাম যে, তাঁর চেহারা মলিন হয়ে গেছে। তিনি বললেনঃ “আচ্ছা যাও, সম্রাটের (হিরাক্লিয়াসের) সাথে সাক্ষাৎ কর।” এই বলে তিনি আমাদের সাথে একজন পথ প্রদর্শক পাঠালেন। আমরা তার পথ প্রদর্শনায় চলতে লাগলাম। যখন আমরা শহরের নিকটবর্তী হলাম তখন ঐ পথ প্রদর্শক আমাদেরকে বললোঃ “তোমরা এই সওয়ারী ও উষ্ট্রীগুলো নিয়ে শহরে প্রবেশ করতে পারবে না। তোমরা ইচ্ছা করলে আমি তোমাদের জন্যে ঘোড়া ও খচ্চরের ব্যবস্থা করে দিতে পারি। আমরা বললাম, আল্লাহর শপথ! আমরা আমাদের এই উষ্ট্ৰীগুলোর উপরই সওয়ার হয়ে থাকবো। সে তখন বাদশাহকে লিখে পাঠালো যে, তারা নিজেদের ছাড়া অন্য কোন সওয়ারীতে সওয়ার হতে সম্মত নয়। সম্রাট তখন আমাদের উন্ত্রীতেই আরোহণ করে আমাদেরকে শহরে প্রবেশের অনুমতি দিলেন। আমরা তরবারী লটকিয়ে সম্রাটের প্রাসাদ পর্যন্ত পৌঁছে নিজেদের সওয়ারীগুলো সেখানে বসিয়ে দিলাম। সম্রাট স্বীয় প্রাসাদের কক্ষ থেকে আমাদেরকে দেখতে ছিলেন। আমরা নেমেই (আরবী) বললাম। আল্লাহ জানেন, আমাদের তাকবীরের শব্দে সারা প্রাসাদ কেঁপে উঠলো। মনে হলো যেন প্রবল ঝটিকা ওকে হেলিয়ে দিলো। বাদশাহ আমাদেরকে বলে পাঠালেনঃ “তোমাদের দ্বীনকে এভাবে প্রকাশ করা উচিত ছিল না। তারপর তিনি আমাদেরকে ডেকে পাঠালেন। আমরা যখন দরবারে প্রবেশ করি তখন তিনি সিংহাসনে উপবিষ্ট ছিলেন। আর তাঁর চারদিকে পোপ, ধর্মযাজক ও উচ্চপদস্থ কর্মচারীরা বসেছিল। তার মজলিসের সমস্ত জিনিসই ছিল লাল বর্ণের। সারা পরিবেশ ছিল লাল এবং তাঁর পোশাকও ছিল লাল। আমরা তাঁর নিকটবর্তী হলে তিনি হেসে ওঠেন এবং বলেনঃ “তোমরা পরস্পর যেমন সালামের আদান প্রদান কর তেমন আমাকে সালাম করলে না কেন?” তার কাছে একজন আরবী ভাষায় পারদর্শী দো-ভাষী বিদ্যমান ছিলেন। আমরা তাঁর মাধ্যমে বললাম, আমরা পরস্পর যে সালাম আদান প্রদান করি তা আপনার জন্যে শোভনীয় নয় এবং আপনাদের পারস্পরিক আদব ও সালামের রীতিও আমাদের জন্যে উপযুক্ত নয় যে, সেই রীতিতে আমরা আপনাকে সম্মান প্রদর্শন করবো। তিনি বললেনঃ “তোমাদের পারস্পরিক সালাম কিরূপ?" আমরা উত্তরে বললামঃ (আরবী) অর্থাৎ আপনার উপর শান্তি বর্ষিত হাক। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “তোমরা তোমাদের বাদশাহকে কিভাবে সালাম জানিয়ে থাক?" আমরা জবাবে বললাম, এভাবেই। তিনি আবার প্রশ্ন করলেনঃ “তিনি কিভাবে উত্তর দেন?” আমরা বললাম, তিনি এই শব্দগুলো দ্বারাই উত্তর দিয়ে থাকেন। তিনি পুনরায় জিজ্ঞেস করলেনঃ “তোমাদের সম্মানিত না’রা কি?” আমরা উত্তর দিলামঃ (আরবী) হচ্ছে আমাদের সম্মানিত ও প্রসিদ্ধ না’রা। যখন আমরা এটা উচ্চৈঃস্বরে বললাম তখন সারা প্রাসাদ কেঁপে উঠলো। শেষ পর্যন্ত তিনি মাথা উঠিয়ে দেখতে লাগলেন যে, না জানি ঘরের ছাদ ভেঙ্গেই পড়ে না কি! তিনি বললেনঃ “তোমরা যে এই কথাটি বললে যার ফলে ঘর নড়ে উঠলো, তাহলে যখন তোমরা নিজেদের বাড়ীতে এটা পড় তখন তোমাদের ঘরও কেপে উঠে না কি?” আমরা উত্তরে বললাম, না তো। আমরা আপনার প্রাসাদ ছাড়া এমনটি হতে তো আর কখনো দেখিনি। তিনি বললেনঃ “হায়! যদি তোমাদের সব জিনিসও কেঁপে উঠতো এবং এই না’রার জোরে আমার অর্ধেক রাজ্য হাত ছাড়া হয়ে যেতো এবং বাকী অর্ধেক টিকে থাকতো তবে কতইনা ভাল হতো।” আমরা জিজ্ঞেস করলাম, তা কেন? তিনি জবাবে বললেনঃ “নবুওয়াতের বিষয়টি মজবুত ও প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাওয়া অপেক্ষা এটাই আমার কাছে সহজতর।” তারপর তিনি আমাদের আগমনের উদ্দেশ্য জিজ্ঞেস করলেন। আমরা তাবলীগের উদ্দেশ্যের কথা বলেদিলাম। তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ “তোমাদের নামায রোযা কেমন?” আমরা সবকিছুই জানিয়ে দিলাম। অতঃপর তিনি আমাদেরকে বিদায় দিলেন এবং অতিথিশালায় অবস্থান করতে বললেন। তিনি উত্তমরূপে আমাদের মেহমানদারী করলেন। তথায় আমরা তিন দিন অবস্থান করলাম। পুনরায় তিনি এক রাত্রে আমাদেরকে ডেকে পাঠালেন এবং আমাদের আগমনের কারণ জিজ্ঞেস করলেন। আমরা আমাদের আগমনের উদ্দেশ্যের কথা পুনরাবৃত্তি করলাম। অতঃপর তিনি স্বর্ণ-রৌপ্য জড়ানো একটা খুব বড় জিনিস চেয়ে পাঠালেন। তাতে ছোট ছোট প্রকোষ্ঠ নির্মিত ছিল এবং সবগুলো তালাবদ্ধ ছিল। তিনি একটি কক্ষের তালা খুললেন এবং ওর মধ্য থেকে একটি কালো রেশমী কাপড় বের করলেন। তাতে একটি লাল ছবি নির্মিত ছিল এবং সেটা ছিল একটি মানুষের ছবি। মানুষটির চোখগুলো ছিল বড় বড়, উরু ছিল মোটা, দাড়ি ছিল লম্বা ও ঘন। চুলগুলো ছিল দু'ভাগে বিভক্ত, অত্যন্ত সুন্দর ও দীর্ঘ। সম্রাট আমাদেরকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “ইনি কে তা জান কি?” আমরা উত্তর দিলাম, না। তিনি বললেনঃ “ইনি হলেন হযরত আদম (আঃ)। তাঁর দেহে অনেকগুলো চুল ছিল। এরপর তিনি আর একটি বাক্সের তালা খুললেন। ওর মধ্য থেকে একটি কালো রেশমী কাপড় বের করলেন। তাতে একটি গৌর বর্ণের মানুষের ছবি বানানো ছিল। মানুষটির ছিল কুঞ্চিত কেশ, লাল চক্ষু, বড় মাথা এবং সুন্দর দাড়ি। বাদশাহ বললেনঃ “ইনি হচ্ছেন হযরত নূহ (আঃ)।" তারপর আর একটি বাক্স থেকে তিনি আর একটি ফটো বের করলেন। ওটার রং ছিল গৌর, চোখগুলো সুন্দর ছিল, কপাল ছিল চওড়া, চেহারা ছিল খাড়া, দাড়িগুলো ছিল সাদা এবং মুখটি ছিল হাস্যময়। সম্রাট জিজ্ঞেস করলেনঃ “জান ইনি কে? ইনি হলেন হযরত ইবরাহীম (আঃ)।” তিনি আর একটি বাক্স খুললেন। তাতে ছিল একটি উজ্জ্বল গৌর বর্ণের ছবি। ওটা ছিল হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর ফটো। বাদশাহ জিজ্ঞেস করলেনঃ “এই লোকটিকে চেনো কি?” আমরা বললামঃ হ্যা, ইনি হচ্ছেন হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)। তাঁর ছবিটি দেখে আমরা আবেগে অভিভূত হয়ে পড়লাম। বাদশাহ বললেনঃ “আল্লাহ জানেন যে, ইনিই হচ্ছেন হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)!” তারপর তিনি দাড়িয়ে গেলেন এবং বলে উঠলেনঃ “আল্লাহর শপথ! ইনিই কি তিনি?” আমরা উত্তরে বললামঃ “হ্যা, ইনিই তিনি। এই ছবিটি দেখে আপনি মনে করে নেন যে তাঁকেই দেখেছেন। তারপর তিনি কিছুক্ষণ ধরে অত্যন্ত মনোযোগর সাথে ছবিটির দিকে তাকিয়ে থাকলেন। তারপর বললেনঃ “এটা ছিল শেষ বাক্স। কিন্তু এটাকে সর্বশেষ দেখাবার পরিবর্তে মধ্যভাগে দেখালাম তোমাদের সত্যতা পরীক্ষা করার জন্যে।” এরপর তিনি আর একটি ছবি বের করলেন। ওটা ছিল গোধূম বর্ণের এবং নরম ও পাতলা আকৃতি বিশিষ্ট। কেশগুলো ছিল কুঞ্চিত, চোখগুলো ছিল বসা বসা, দৃষ্টি ছিল তীক্ষ এবং ওষ্ঠ ছিল মোটা। তিনি বললেনঃ “ইনি হলেন হযরত মূসা (আঃ)!” ওরই সাথে মিলিত আর একটি ছবি ছিল। এটা ছিল আকারে ওরই সাথে সাদৃশ্যযুক্ত। কিন্তু এটার চুলগুলো ছিল তৈলাক্ত ও চিরুনীকৃত । কপাল ছিল চওড়া এবং চোখগুলো বড় বড়। তিনি বললেনঃ “ইনি হলেন হযরত হারূন ইবনে ইমরান (আঃ)।” তারপর আর একটি বাক্স থেকে তিনি আর একটি ফটো বের করলেন। ওটার ছিল গোধূম বর্ণ, দেহের উচ্চতা মধ্যম, সোজা কেশ এবং চেহারায় দুঃখ ও ক্রোধের চিহ্ন প্রকাশমান। তিনি বললেনঃ “ইনি হলেন হযরত লূত (আঃ)।” তারপর তিনি একটা সাদা বর্ণের রেশমী কাপড় বের করলেন। তাতে যে মানুষের ফটো ছিল তা ছিল সেনালী বর্ণের। দেহ লম্বা ছিল না। গাল ছিল হালকা পাতলা এবং চেহারা ছিল সুন্দর। তিনি বললেনঃ “ইনি ইসহাক (আঃ)।” এরপর তিনি আর একটি দরজা খুললেন এবং এর মধ্য থেকে একটি সাদা রেশমী কাপড় বের করে আমাদেরকে দেখালেন। এর আকৃতি হযরত ইসহাক (আঃ)-এর আকৃতির সাথে খুবই সাদৃশ্যযুক্ত ছিল। তিনি বললেনঃ “ইনি হযরত ইয়াকূব (আঃ)।” তারপর তিনি কালো রেশমী কাপড়ের আর একটি ফটো দেখালেন। ওটার ছিল গৌর বর্ণ, সুন্দর চেহারা, মুখমণ্ডলে ঔজ্জ্বল্য, আন্তরিকতা ও বিনয়ের লক্ষণ পরিস্ফুট এবং বর্ণ কতকটা লাল। বললেনঃ “ইনি হলেন হযরত ইসমাঈল (আঃ)।” এরপর আর একটি বাক্স হতে আর একটি সাদা রেশমী কাপড় বের করলেন যার মধ্যকার ছবিটি হযরত আদম (আঃ)-এর ছবির সাথে সাদৃশ্যযুক্ত ছিল। চেহারায় যেন সূর্য চমকাচ্ছে। বললেনঃ “ইনি হযরত ইউসুফ (আঃ)।” তারপর আর একটি ছবি বের করলেন। ওটার ছিল লাল রং, পুরু পায়ের গোছা, বড় বড় চোখ, বড় পেট ও বেঁটে দেহ। বললেনঃ “ইনি হযরত দাউদ (আঃ)।” এরপর আরও একটি ছবি বের করলেন। ওটার ছিল মোটা উরু, লম্বা পা এবং তিনি ঘোড়ার উপর সওয়ার ছিলেন। বললেনঃ “ইনি হযরত সুলাইমান (আঃ)।” অতঃপর তিনি আরও একটি ছবি বের করলেন। ওটা ছিল বয়সে যুবক, দাড়ি ছিল কালো, চুলগুলো ছিল ঘন, চক্ষুগুলো সুন্দর এবং চেহারাতেও সৌন্দর্য বিরাজ করছিল। সম্রাট বললেনঃ “ইনি হলেন হযরত ঈসা ইবনে মারইয়াম (আঃ)।” আমরা তাকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি এই ছবিগুলো পেলেন কোথায়? আমাদের বিশ্বাস যে, এগুলো অবশ্যই নবীদেরই ছবি। কেননা, আমরা আমাদের নবী (সঃ)-এর ছবি সঠিকভাবেই পেয়েছি। উত্তরে তিনি বললেনঃ “হযরত আদম (আঃ) আল্লাহ তা'আলার নিকট আবেদন করেছিলেন- হে আল্লাহ! আমার নবী সন্তানদেরকে আমাকে দেখিয়ে দিন। আল্লাহ তা'আলা তখন ঐ নবীদের ফটোগুলো হযরত আদম (আঃ)-কে প্রদান করেছিলেন। ঐগুলোকে হযরত আদম (আঃ) পাশ্চাত্য দেশে রক্ষিত রেখেছিলেন। যুলকারনাইন ওগুলোকে বের করেন এবং হযরত দানইয়াল (আঃ)-এর হাতে সমর্পণ করেন। অতঃপর সম্রাট বললেনঃ “আমি তো চাচ্ছিলাম যে, নিজের রাজ্য ছেড়ে দিয়ে তোমাদের কোন এক নগণ্য লোকের গোলাম হয়ে থাকি যে পর্যন্ত না আমার মৃত্যু হয়।”এরপর তিনি আমাদেরকে বিদায় দিলেন। বিদায়ের প্রাক্কালে তিনি আমাদেরকে বহু পুরস্কার ও উপঢৌকন প্রদান করলেন এবং গমনের সুব্যবস্থা করে দিলেন। যখন আমরা আবু বকর (রাঃ)-এর কাছে আসলাম এবং ঘটনাটি বর্ণনা করলাম তখন তিনি আবেগে অভিভূত হয়ে পড়লেন এবং বললেনঃ “আল্লাহ তাকে তাওফীক দিলে এই রূপই করতো!” অতঃপর তিনি বললেনঃ “রাসূলুল্লাহ (সঃ) আমাদেরকে সংবাদ দিয়েছেন যে, ইয়াহূদীরা তাদের কিতাবে নবী (সঃ)-এর গুণাবলী পেয়ে থাকে।”হযরত আতা ইবনে ইয়াসার (রাঃ) বলেনঃ “আমি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ)-এর সাথে সাক্ষাৎ করি এবং তাওরাতে রাসূলুল্লাহ (সঃ) সম্পর্কে যে ভবিষ্যদ্বাণী রয়েছে তা জিজ্ঞেস করি। তিনি উত্তরে বললেনঃ “হ্যা, আল্লাহর শপথ! তাওরাতে তাঁর গুণাবলীর এরূপই বর্ণনা রয়েছে যেরূপ কুরআনে রয়েছে।” আল্লাহ পাক বলছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ নিশ্চয়ই আমি তোমাকে সাক্ষী, শুভ সংবাদদাতা ও ভয় প্রদর্শনকারী রূপে পাঠিয়েছি।” (৪৮:৮) দ্রুপ তাওরাতেও রয়েছে- “তুমি আমার বান্দা ও রাসূল। তোমার নাম মুতাওয়াক্কিল, তুমি কঠোরও নও এবং সংকীর্ণমনাও নও। আল্লাহ তা'আলা তোমাকে ঐ পর্যন্ত নিজের কাছে আহ্বান করবেন না যে পর্যন্ত না তুমি ভুল পথে পরিচালিত কওমকে সোজা পথে পরিচালিত করতে পার। আর যে পর্যন্ত না তারা ঈমান আনে এবং তাদের অন্তর থেকে পর্দা উঠে যায়, কান শ্রবণকারী ও চক্ষু দর্শনকারী হয়। অতঃপর হযরত কা'ব (রঃ)-এর সাথে হযরত আতা’ (রাঃ)-এর সাক্ষাৎ হলে তাকেও তিনি এই প্রশ্ন করেন। তিনি যা বর্ণনা করেন তাতে একটি অক্ষরেরও গরমিল হয়নি। গরমিল শুধু একুটু হয় যে, তিনি নিজের ভাষায় - (আরবী) কে (আরবী) -কে (আরবী) এবং (আরবী)- কে (আরবী) বলতেন। কিন্তু তিনি নিম্নের বাক্যটুকু বাড়িয়ে দিয়েছেনঃ “তিনি বাজারে শোরগোল করেন না, মন্দের বদলা মন্দ দ্বারা দেন না, বরং ক্ষমা করে দেন।” এরপর তিনি আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ)-এর হাদীসটি বর্ণনা করলেন। তারপর বললেনঃ পূর্ববর্তী গুরুজনদের ভাষায়- তাওরাত' শব্দের প্রয়োগে সাধারণতঃ আহলে কিতাবের কিতাবগুলোর উপর হয়ে থাকে এবং হাদীসের কিতাবগুলোতেও এরূপই কিছু এসেছে। আল্লাহ তাআলাই সর্বাপেক্ষা অধিক জ্ঞানের অধিকারী।হযরত জুবাইর ইবনে মুতইম (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি একবার ব্যবসা উপলক্ষে সিরিয়া অভিমুখে যাত্রা শুরু করি। যখন আমি সিরিয়ার নিকটবর্তী হই তখন একটি লোকের সাথে আমার সাক্ষাৎ হয়। সে আমাকে জিজ্ঞেস করে- “তোমাদের দেশে কোন একজন লোক নবী হয়ে এসেছেন কি?” আমি উত্তরে বলি, হ্যা। সে জিজ্ঞেস করে-“তুমি তার ছবি চিনতে পারবে কি?” আমি উত্তর দেই, হ্যা। তখন সে আমাকে এমন একটি ঘরে নিয়ে গেল যেখানে অনেকগুলো ছবি ছিল। কিন্তু আমি সেখানে আমাদের নবী (সঃ)-এর ছবি দেখতে পেলাম না। আমরা ঐ সম্পর্কেই আলাপ আলোচনা করছিলাম এমন সময় একটি লোক এসে বললোঃ “ব্যাপার কি?” আমরা ঐ সংবাদ দিলে সে আমাদেরকে তার বাড়ীতে নিয়ে গেল। তার ঘরে প্রবেশ করেই আমি নবী (সঃ)-এর ছবি দেখতে পেলাম। ছবিতে এও দেখলাম যে, নবী (সঃ)-এর পেছনে একটি লোক দাড়িয়ে রয়েছে। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তার পেছনে তাকে ধরে যে লোকটি দাঁড়িয়ে আছে সে কে? সে উত্তরে বললোঃ “ঐ লোকটি নবী নয়। কিন্তু যদি তার পরে অন্য কেউ নবী হতো তবে এই লোকটিই হতো। তার পরে অন্য কোন নবী আসবেন না। কিন্তু এই লোকটি তার স্থলাভিষিক্ত হবে।”হযরত উমার (রাঃ)-এর মুআযযিন হযরত আকরা (রাঃ) বলেন, একদা হযরত উমার (রাঃ) আমাকে একজন খ্রীষ্টান পাদ্রীকে ডেকে আনার জন্যে প্রেরণ করেন। আমি তাকে ডেকে আনলে তিনি তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমরা তোমাদের কিতাবে আমার বর্ণনাও পাও কি?" সে উত্তরে বলেঃ “হাঁ। কিতাবে আপনাকে কারণ বলা হয়েছে।” হযরত উমার (রাঃ) তখন স্বীয় ছড়িটি উঠিয়ে নিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “কারণ এর অর্থ কি?” সে উত্তর দেয়, “এর অর্থ হচ্ছে লৌহ মানব।” হ্যরত উমার (রাঃ) পুনরায় তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “আমার পরে কে হবে?” সে জবাবে বলেঃ “হ্যা, আপনার পরে আপনার স্থলাভিষিক্ত হবেন। একজন সৎ লোক। কিন্তু তিনি স্বীয় আত্মীয়-স্বজনকে প্রাধান্য দিবেন।” একথা । শুনে উমার (রাঃ) বলে উঠলেন, “আল্লাহ হযরত উসমান (রাঃ)-এর উপর দয়া করুন।” একথা তিনি তিনবার বললেন। তারপর তিনি ঐ পাদ্রীকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “এরপর কে হবে?” সে উত্তর দিলোঃ “লৌহ খণ্ডের মতো এক ব্যক্তি।” হযরত উমার (রাঃ) বুঝে ফেললেন যে, এর দ্বারা হযরত আলীকে বুঝানো হয়েছে। তিনি স্বীয় মাথা ধরে আফসোস করতে লাগলেন। পাদ্রী বললোঃ “হে আমীরুল মুমিনীন! তিনি সৎ খলীফা হবেন। কিন্তু তিনি এমন এক সময় খলীফা হবেন যখন তরবারী কোষ থেকে বের করে নেয়া হবে এবং রক্ত প্রবাহিত হবে।”আল্লাহ পাকের উক্তিঃ “নবী (সঃ) মানুষকে সৎ কাজের নির্দেশ দেন এবং অন্যায় কাজ করতে নিষেধ করেন।” এটা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বিশেষণ যা পূর্ববর্তী কিতাবগুলোতে উল্লিখিত রয়েছে। বাস্তব ক্ষেত্রেও অবস্থা এই ছিল যে, তিনি কল্যাণকর কথা ছাড়া কিছুই বলতেন না এবং যা অকল্যাণকর ও ক্ষতিকর হতো তা থেকে তিনি মানুষকে বিরত রাখতেন। যেমন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ “যখন তোমরা আল্লাহ তা'আলাকে বলতে শুনঃ (আরবী) তখন কান খাড়া করে দাও। হয়তো কোন কল্যাণকর জিনিসের হুকুম করা হচ্ছে অথবা কোন মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করা হচ্ছে। আর আল্লাহ সবচেয়ে বড় ও গুরুতপূর্ণ বিষয়ের যে নির্দেশ দিয়েছেন তা হচ্ছে এই যে, তোমরা অন্যকে অংশীদার করা ছাড়াই তার ইবাদত করবে। কাউকেই তাঁর অংশীদার স্থাপন করবে না। সমস্ত নবী এই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই প্রেরিত হয়েছিলেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “আমি প্রত্যেক কওমের মধ্যে স্বীয় রাসূল পাঠিয়েছি (যে, সে তাদেরকে বলবেঃ), তোমরা শুধুমাত্র আল্লাহরই ইবাদত করবে এবং প্রতিমা পূজা থেকে বিরত থাকবে।”আবু হুমাইদ (রাঃ) ও আবু উসাদই (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যখন তোমরা আমা হতে বর্ণিত কোন হাদীস শুন, যেটাকে তোমাদের অন্তর মেনে নেয় এবং যার দ্বারা তোমাদের বুদ্ধি বিবেক নরম হয়ে যায় এবং তোমরা অনুভব কর যে, এটা তোমাদের মন-মগজের নিকটতর। তখন তোমরা নিশ্চিতরূপে জেনে নেবে যে, আমার মন-মস্তিষ্ক তোমাদের অপেক্ষা ওর বেশী নিকটতম হবে অর্থাৎ ওটা আমার হাদীস হবে। আর যদি স্বয়ং তোমাদের অন্তর ঐ হাদীসকে অস্বীকার করে এবং ওটা তোমাদের মন-মগজ ও বুদ্ধি বিবেক থেকে দূরে হয় তবে জেনে রাখবে যে, তোমাদের চেয়ে আমার মন-মস্তিষ্ক ওর থেকে বেশী দূরে হবে অর্থাৎ ওটা আমার হাদীস হবে না।” (ইবনে কাসীর (রঃ) বলেন যে, ইমাম আহমাদ (রঃ) এটা উত্তম ইসনাদের সাথে বর্ণনা করেছেন। সুনান কিতাব লেখকদের কেউই এটা তাখরীজ করেননি) হযরত আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “যখন তোমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কোন হাদীস শুনতে পাবে তখন ওটার ব্যাপারে ঐ ধারণাই পোষণ করবে যা সঠিকতম ধারণা হয়, যা বেশী কল্যাণময় এবং পবিত্রময়।” (এটা ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন) ইরশাদ হচ্ছে- “সে তাদের জন্যে পবিত্র বস্তুসমূহ বৈধ করে দেয় এবং অপবিত্র ও খারাপ বস্তুকে তাদের প্রতি অবৈধ করে।” অর্থাৎ তিনি তাদের এমন বস্তুসমূহ হালাল করেন যা তারা নিজেরাই নিজেদের উপর হারাম করে নিয়েছিল। যেমন ‘বাহীমা’, ‘সায়েবা’, ‘ওয়াসীলা' এবং 'হাম'। এসব জন্তু হালাল কিন্তু তারা জোরপূর্বক এগুলোকে হারাম করে নিয়েছিল। এর দ্বারা তারা নিজেদের উপর সংকীর্ণতা আনয়ন করেছে। আর যে অপবিত্র ও খারাপ বস্তুগুলো আল্লাহ তা'আলা হারাম করেছেন যেমন শূকরের মাংস, সুদ এবং খাদ্য জাতীয় জিনিস যা আল্লাহ হারাম করেছেন, সেগুলোকে তারা হালাল করে নিয়েছে। আল্লাহ তা'আলা যেসব জিনিস হালাল করেছেন ওগুলো খেলে শরীরের উপকার হয় এবং দ্বীনের সহায়ক হয়। পক্ষান্তরে যেগুলো তিনি হারাম করেছেন ওগুলো দেহ ও দ্বীন উভয়ের পক্ষে ক্ষতিকর হয়ে থাকে। বিবেক বুদ্ধির মাধ্যমে যারা ভাল ও মন্দ যাচাই করে থাকেন তাঁরা এই আয়াতকেই দলীল হিসেবে গ্রহণ করে থাকেন। এই ধারণা ও অনুমানেরও উত্তর দেয়া হয়েছে কিন্তু এখানে এসবের ব্যাখ্যা দেয়ার তেমন সুযোগ নেই। এই আয়াতকে হুজ্জত রূপে কায়েম করেছেন ঐ আলেমগণও যারা বলে থাকেন যে, কোন জিনিসের বৈধতা ও অবৈধতা সম্পর্কে কোন হাদীস না থাকলে ওটা হালাল কি হারাম তা যাচাই করার মাপকাঠি হলো এই যে, আরববাসী উপকারের দিক দিয়ে কোন জিনিসকে উপকারী ও পবিত্র মনে করে এবং কোন জিনিসকে অপবিত্র ও ক্ষতিকর মনে করে (এটা দেখতে হবে)। এই অনুমান ও ধারণার ব্যাপারেও অনেক কিছু সমালোচনা হয়েছে। ঘোষিত হচ্ছে-“মানুষের অন্তরে যে বোঝা ছিল, রাসূল (সঃ) তা হাল্কা করে এবং প্রথার যে শিকলে তারা আবদ্ধ ছিল নবী (সঃ) তা দূর করে থাকে। তিনি সহজ পন্থা, দান ও ক্ষমা নিয়ে এসেছেন। যেমন হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমি সহজ এবং ভেজালবিহীন দ্বীন নিয়ে প্রেরিত হয়েছি।”নবী (সঃ) যখন হযরত মুআয (রাঃ) ও হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ)-কে আমির করে ইয়ামনে পাঠিয়েছিলেন তখন তিনি তাদেরকে উপদেশ দিয়েছিলেনঃ “তোমরা সদা প্রফুল্ল ও হাসিমাখা মুখে থাকবে। জনগণ যেন তোমাদেরকে দেখে ভয়ে পালিয়ে না যায়। তাদেরকে সহজ পন্থা বাতলিয়ে দিবে। সংকীর্ণতা আনয়ন করবে না। লোকদের যেন মেনে নেয়ার অভ্যাস হয়। তাদের মধ্যে যেন মতানৈক্য সৃষ্টির খেয়াল না জাগে।”রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাহাবী হযরত আবু বারযা আসলামী (রাঃ) বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে অবস্থান করেছি এবং তার সহজ পন্থা বাতলানোর চিত্র সুন্দরভাবে অবলোকন করেছি।" পূর্ববর্তী উম্মতদের মধ্যে বড়ই কাঠিন্য ছিল। এই উম্মতের উপর সবকিছু হালকা করে দেয়া হয়েছে। এ জন্যেই রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ আমার উম্মতকে তাদের অন্তরের খেয়াল ও বাসনার জন্যে পাকড়াও করেন না যে পর্যন্ত না তারা মুখে তা প্রকাশ করে অথবা কার্যে পরিণত করে। তিনি বলেনঃ “আল্লাহ তাআলা আমার উম্মতের ভুলত্রুটি ও বিস্মরণকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। তারা যদি ভুল বশতঃ কিছু করে বসে অথবা জোরপূর্বক তাদেরকে কোন অন্যায় কাজ করিয়ে নেয়া হয় তবে ক্ষমার্হ বলে গণ্য করা হবে। এজন্যেই আল্লাহ তা'আলা এই উম্মতকে নিম্নরূপ কথা প্রার্থনা করতে বলেছেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে পাকড়াও করবেন না, যদি আমরা বিস্মরণ হই কিংবা ভুল করে বসি, হে আমাদের প্রভু! আমাদের প্রতি কোন কঠোর ব্যবস্থা পাঠাবেন না, যেমন আমাদের পূর্ববর্তীদের উপর পাঠিয়েছিলেন, হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের উপর এমন কোন গুরুভার চাপাবেন না যা বহন করার শক্তি আমাদের নেই, আর ক্ষমা করে দিন আমাদেরকে এবং মার্জনা করে দিন, আর আমাদের প্রতি কৃপা করুন! আপনি আমাদের কর্মসম্পাদক, সুতরাং আমাদেরকে কাফির সম্প্রদায়ের উপর প্রাবল্য দান করুন।” (২:২৮৬)। সহীহ মুসলিম দ্বারা এটা প্রমাণিত যে, এ দুআ’র মাধ্যমে আল্লাহর কাছে চাওয়া হলে তিনি প্রত্যেক যাজ্ঞার সময় বলেনঃ “আচ্ছা, আমি দিলাম, আমি কবুল করলাম।”আল্লাহ পাক বলেনঃ “যারা তাঁর প্রতি (রাসূল সঃ-এর প্রতি) ঈমান রাখে, তাকে সম্মান করে ও সাহায্য সহানুভূতি করে, আর সেই নূরকে অনুসরণ করে যা তার সাথে অবতীর্ণ করা হয়েছে, তারাই ইহকালে ও পরকালে সাফল্য লাভ করবে।”

তাফসীর আবু বকর যাকারিয়া

‘যারা অনুসরণ করে রাসূলের , উম্মী [১] নবীর , যার উল্লেখ তারা তাদের কাছে তাওরাত ও ইঞ্জীলে লিপিবদ্ধ পায় [২], যিনি তাদের সৎকাজের আদেশ দেন, অসৎকাজ থেকে নিষেধ করেন, তাদের জন্য পবিত্র বস্তু হারাম করেন [৩]। আর তাদেরকে তাদের গুরুভার ও শৃংখল হতে মুক্ত করেন যা তাদের উপর ছিল [৪]।কাজেই যারা তার প্রতি ঈমান আনে , তাকে সম্মান করে, তাকে সাহায্য করে এবং যে নূর তার সাথে নাযিল হয়েছে সেটার অনুসরণ করে , তারাই সফলকাম [৫]।

[১] আলোচ্য আয়াতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দু'টি পদবী ‘রাসূল’ ও ‘নবী’ এবং এর সাথে সাথে তৃতীয় একটি বৈশিষ্ট্য ‘উম্মী'-এরও উল্লেখ করা হয়েছে। ইবন আব্বাস বলেন, (اُمِّيْ) উম্মী' শব্দের অর্থ হল নিরক্ষর। যে লেখা-পড়া কোনটাই জানে না। [বাগভী] রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেও বলেছেন, “আমরা নিরক্ষর জাতি। লিখা জানি না, হিসাব জানি না”। [বুখারী: ১০৮০] সাধারণ আরবদেরকে এ কারণেই কুরআন (اُمِّيِّيْنَ) বা নিরক্ষর জাতি বলে অভিহিত করেছে যে, তাদের মধ্যে লেখা-পড়ার প্রচলন খুবই কম ছিল। কারও কারও মতে উম্মী শব্দটি ‘উম্ম’ শব্দের দিকে সম্পর্কযুক্ত করে বলা হয়েছে। আর উম্ম অর্থ, মা ! অর্থাৎ সে তার মা তাকে যেভাবে প্রসব করেছে সেভাবে রয়ে গেছে। কারও কারও মতে শব্দটি উম্মত শব্দের দিকে সম্পর্কযুক্ত করে বলা হয়েছে। পরে সম্পর্ক করার নিয়মানুসারে তা বর্ণটি পড়ে গেছে। তখন অর্থ হবে, উম্মতওয়ালা নবী। কারও কারও মতে, শব্দটি উম্মুল কুরা’ যা মক্কার এক নাম, সেদিকে সম্বন্ধযুক্ত করে বলা হয়েছে। অর্থাৎ মক্কাবাসী। [বাগভী]

তবে বিখ্যাত মত হচ্ছে যে, উম্মী অর্থ নিরক্ষর। যদিও নিরক্ষর হওয়াটা কোন মানুষের জন্য প্রশংসনীয় গুণ নয়; বরং ক্রটি হিসাবেই গণ্য। কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জ্ঞান-গরিমা, তত্ত্ব ও তথ্য অবগতি এবং অন্যান্য গুণবৈশিষ্ট্য ও পরাকাষ্ঠা সত্ত্বেও উম্মী হওয়া তার পক্ষে বিরাট গুণ ও পরিপূর্ণতায় পরিণত হয়েছে। কারণ, শিক্ষাগত, কার্যগত ও নৈতিক পরাকাষ্ঠী যদি কোন লেখাপড়া জানা মানুষের দ্বারা প্রকাশ পায়, তাহলে তা হয়ে থাকে তার সে লেখাপড়ারই ফলশ্রুতি, কিন্তু কোন একান্ত নিরক্ষর ব্যক্তির দ্বারা এমন অসাধারণ, অভূতপূর্ব ও অনন্য তত্ত্ব-তথ্য ও সূক্ষ্ম বিষয় প্রকাশ পেলে, তা তার প্রকৃষ্ট মু'জিযা ছাড়া আর কি হতে পারে?

[২] মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যেসব গুণবৈশিষ্ট্য তাওরাত ও ইঞ্জীলে লিপিবদ্ধ ছিল সেগুলোর কিছু আলোচনা তাওরাত ও ইঞ্জীলের উদ্ধৃতি সাপেক্ষে কুরআনুল কারমেও করা হয়েছে। আর কিছু সে সমস্ত মনীষীবৃন্দের উদ্ধৃতিতে হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে, যারা তাওরাত ও ইঞ্জীলের আসল সংকলন স্বচক্ষে দেখেছেন এবং তাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আলোচনা নিজে পড়েই মুসলিম হয়েছেন। যেমন, কোন এক ইয়াহুদী বালক নবী কারম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমত করত। হঠাৎ সে একবার অসুস্থ হয়ে পড়লে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার অবস্থা জানার জন্য সেখানে গেলেন। তিনি দেখলেন, তার পিতা তার মাথার কাছে দাড়িয়ে তাওরাত তিলাওয়াত করছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ হে ইয়াহুদী, আমি তোমাকে কসম দিচ্ছি সে মহান সত্তার যিনি মূসা আলাইহিস সালামের প্রতি তাওরাত নাযিল করেছেন, তুমি কি তাওরাতে আমার অবস্থা ও গুণবৈশিষ্ট্য এবং আবির্ভাব সম্পর্কে কোন বর্ণনা পেয়েছ? সে অস্বীকার করল। তখন তার ছেলে বললঃ হে আল্লাহর রাসূল! তিনি (অর্থাৎ এই ছেলের পিতা) ভুল বলছেন। তাওরাতে আমরা আপনার আলোচনা এবং আপনার গুণবৈশিষ্ট্য দেখতে পাই। আর আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন হক মা'বূদ নাই এবং আপনি তার প্রেরিত রাসূল। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরামকে নির্দেশ দিলেন যে, এখন এ বালক মুসলিম। তার মৃত্যুর পর তার কাফন-দাফন মুসলিমরা করবে। তার পিতার হাতে দেয়া হবে না। [মুসনাদে আহমাদঃ ৫/৪১১] অন্য বর্ণনায় এসেছে যে, এক ইয়াহুদী ইসলাম গ্রহণ করার পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সে সবগুণ বর্ণনা করেছে যা সে তাওরাতে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে দেখেছে। তিনি বলেন, আমি আপনার সম্পর্কে তাওরাতে এ কথাগুলো পড়েছি- “মুহাম্মাদ ইবন আব্দুল্লাহ্‌, তার জন্ম হবে মক্কায়, তিনি হিজরত করবেন ‘তাইবার দিকে; আর তার দেশ হবে সিরিয়া। তিনি কঠোর মেজাজের হবেন না, কঠোর ভাষায় তিনি কথাও বলবেন না, হাটে-বাজারে তিনি হট্টগোলও করবেন না। “অশ্লীলতা ও নির্লজ্জতা থেকে তিনি দূরে থাকবেন " [মুস্তাদরাকঃ ২/৬৭৮ হাদীসঃ ৪২৪২]

কা’আবে আহবার বলেছেনঃ তাওরাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে লেখা রয়েছেঃ “মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল ও নির্বাচিত বান্দা। তিনি না কঠোর মেজাজের লোক, না বাজে বক্তা। না-ইবা তিনি হাটে-বাজারে হট্টগোল করার লোক। তিনি মন্দের প্রতিশোধ মন্দ দ্বারা গ্রহণ করেন না; বরং ক্ষমা করে দেন এবং ছেড়ে দেন। তার জন্ম হবে মক্কায়, আর হিজরত হবে তাইবায়। তার দেশ হবে শাম (সিরিয়া)। আর তার উম্মাত হবে ‘হাম্মদীন’। অর্থাৎ আনন্দবেদনা উভয় অবস্থাতেই আল্লাহ্ তা'আলার প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারী। তারা যে কোন উর্ধ্বারোহণকালে তাকবীর বলবে। তারা সূর্যের ছায়ার প্রতি লক্ষ্য রাখবে, যাতে সময় নির্ণয় করে যথাসময়ে সালাত আদায় করতে পারে। তিনি তার শরীরের নিমাংশে লুঙ্গি পরবেন এবং হস্ত-পদাদি ওযুর মাধ্যমে পবিত্র-পরিচ্ছন্ন রাখবেন। তাদের আযানদাতা আকাশে সুউচ্চ স্বরে আহবান করবেন। জিহাদের ময়দানে তাদের সারিগুলো এমন হবে যেমন সালাতে হয়ে থাকে। রাতের বেলায় তাদের তিলাওয়াত ও যিকরের শব্দ এমনভাবে উঠতে থাকবে, যেন মধুমক্ষিকার শব্দ। [সুনান দারামীঃ ৫, ৮, ৯]

ইবন সা’আদ রাহিমাহুল্লাহ সাহাল মওলা খাইসামা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে সনদ সহকারে উদ্ধৃত করেছেন যে, সাহাল বলেনঃ আমি নিজে ইঞ্জলে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের গুণ-বৈশিষ্ট্যসমূহ পড়েছি যে- তিনি খুব বেঁটেও হবেন না আবার খুব লম্বাও হবেন না। উজ্জ্বল বর্ণ ও দু'টি কেশ-গুচ্ছধারী হবেন। তার দু’কাঁধের মধ্যস্থলে নবুওয়াতের মোহর থাকবে। তিনি সদকা গ্রহণ করবেন না। গাধা ও উটের উপর সওয়ারী করবেন। ছাগলের দুধ নিজে দুইয়ে নেবেন। তিনি ইসমাঈল আলাইহিস সালামের বংশধর হবেন। তার নাম হবে আহমাদ। [তাবাকাত ইবন সা’আদঃ১/৩৬৩]

আতা ইবন ইয়াসার বলেনঃ আমি আব্দুল্লাহ ইবন আমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা কে বললাম, আমাকে তাওরাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের গুণাগুণ কেমন এসেছে তা বর্ণনা করুন, তিনি বললেনঃ "তাওরাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে উল্লেখ রয়েছেঃ “হে নবী, আমি আপনাকে সমস্ত উম্মতের জন্য সাক্ষী, সৎকর্মশীলদের জন্য সুসংবাদদাতা, অসৎকর্মীদের জন্য ভীতি প্রদর্শনকারী এবং উম্মিয়ীন অর্থাৎ আরবদের জন্য রক্ষণা-বেক্ষণকারী বানিয়ে পাঠিয়েছি। আপনি আমার বান্দা ও রাসূল। আমি আপনার নাম মুতাওয়াক্কিল’ রেখেছি। আপনি কঠোর মেজাজও নন, দাঙ্গাবাজও নন। হাটে-বাজারে হট্টগোলকারীও নন। মন্দের প্রতিশোধ মন্দের দ্বারা গ্রহণ করেন না; বরং ক্ষমা করে দেন। আল্লাহ তা'আলা ততক্ষণ পর্যন্ত তাকে মৃত্যু দেবেন না; যতক্ষণ না তার মাধ্যমে বাঁকা জাতিকে সোজা করে নেবেন। এমনকি যতক্ষণ না তারা। (لَااِلٰهَ اِلَّااللّٰهُ) অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া সত্য কোন মা'বূদ নেই" -এ কালেমার স্বীকৃতিদানকারী হয়ে যাবে, যতক্ষণ না অন্ধ চোখ খুলে দেবেন, বধির কান যতক্ষণ না শোনার যোগ্য বানাবেন এবং বদ্ধ হৃদয় যতক্ষণ না খুলে দেবেন। [বুখারী : ২১২৫; ৪৮৩৮] তাওরাত ও ইঞ্জীল বর্ণিত শেষনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার উম্মাতের গুণ-বৈশিষ্ট্য এবং নিদর্শনসমূহের বিশ্লেষণ ও ব্যাখ্যা সম্পর্কে বহু স্বতন্ত্র গ্রন্থ প্রণয়ন করা হয়েছে। রহমতুল্লাহ কীরানভী মুহাজেরে মক্কী রাহিমাহুল্লাহ তার গ্রন্থ ‘ইযহারুল-হক’-এ বিষয়টিকে অত্যন্ত বিস্তারিত ব্যাখ্যা ও গবেষণাসহ লিখেছেন। তাতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বর্তমান যুগের তাওরাত ও ইঞ্জীলযাতে সীমাহীন বিকৃতি সাধিত হয়েছে-তাতেও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বহু গুণাগুণ ও বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ রয়েছে। দৃষ্টান্ত স্বরূপ তাওরাত ও ইনজীলের নিম্নোক্ত স্থানগুলো দেখুন- এসব স্থানে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ব্যাপারে ইঙ্গিত করা হয়েছে। যেমন, দ্বিতীয় বিবরণ-১৮: ১৫-১৯, মথি-২১: ৩৩-৪৬, যোহন-১: ১৯-২১, ১৪: ১৫-১৭, ২৫-৩০, ১৫: ২৫-২৬, ১৬: ৭-১৫।

[৩] দ্বিতীয় গুণটি এই বলা হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানবজাতির জন্য পবিত্র ও পছন্দনীয় বস্তু-সামগ্ৰী হালাল করবেন; আর পঙ্কিল বস্তুসামগ্রীকে হারাম করবেন। অর্থাৎ অনেক সাধারণ পছন্দনীয় বস্তুসামগ্রী যা শাস্তি স্বরূপ বনী-ইসরাঈলের জন্য হারাম করে দেয়া হয়েছিল, রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেগুলোর উপর থেকে বিধি-নিষেধ প্রত্যাহার করে নেবেন। উদাহরণতঃ পশুর চর্বি বা মেদ প্রভৃতি যা বনী-ইসরাঈলের অসদাচরণের শাস্তি হিসাবে হারাম করে দেয়া হয়েছিল, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেগুলোকে হালাল সাব্যস্ত করেছেন। আর নোংরা ও পঙ্কিল বস্তু-সামগ্রীর মধ্যে শুকরের মাংস, সুদ এবং যে সমস্ত খাবার আল্লাহ হারাম করেছেন অথচ তারা সেগুলোকে হালাল বলে চালিয়েছিল। [তাবারী] অনুরূপভাবে, রক্ত, মৃত পশু, মদ ও অন্যান্য হারাম জন্তু এর অন্তর্ভুক্ত এবং আল্লাহ হারাম উপায়ে আয় যথা- সুদ, ঘুষ, জুয়া প্রভৃতিও এর অন্তর্ভুক্ত।

[৪] রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের তৃতীয় গুণ বর্ণনা প্রসঙ্গে বলা হয়েছেঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষের উপর চেপে থাকা বোঝা ও প্রতিবন্ধকতাও সরিয়ে দেবেন। (اصر) ইসর’ শব্দের অর্থ এমন ভারী বোঝা যা নিয়ে মানুষ চলাফেরা করতে অক্ষম। আর (اغلال) ‘আগলাল’ (غل) এর বহুবচন ৷ ‘গালুন’ সে হাতকড়াকে বলা হয় যা দ্বারা অপরাধীর হাত তার ঘাড়ের সাথে বেঁধে দেয়া হয় এবং সে একেবারেই নিরুপায় হয়ে পড়ে। (اصر) ‘ইসর’ ও (اغلال) ‘আগলাল’ অর্থাৎ অসহনীয় চাপ ও আবদ্ধতা বলতে এ আয়াতে সে সমস্ত কঠিন ও সাধ্যাতীত কর্তব্যের বিধি-বিধানকে বুঝানো হয়েছে যা প্রকৃতপক্ষে ধর্মের উদ্দেশ্য ছিল না, কিন্তু বনীইসরাঈল সম্প্রদায়ের উপর একান্ত শাস্তি হিসাবে আরোপ করা হয়েছিল। যেমন, বিধর্মী কাফেরদের সাথে জিহাদ করে গনীমতের যে মাল পাওয়া যেত, তা বনীইসরাঈলদের জন্য হালাল ছিল না; বরং আকাশ থেকে একটি আগুন নেমে এসে সেগুলোকে জ্বলিয়ে দিত। শনিবার দিন শিকার করাও তাদের জন্য বৈধ ছিল না। এ সমস্ত কঠিন ও জটিল বিধানসমূহ যা বনী-ইসরাঈলদের উপর আরোপিত ছিল, কুরআনে সেগুলোকে ‘ইসর’ ও ‘আগলাল’ বলা হয়েছে এবং সুসংবাদ দেয়া হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এসব কঠিন বিধি-বিধানের পরিবর্তন অর্থাৎ এগুলোকে রহিত করে তদস্থলে সহজ বিধি-বিধান প্রবর্তন করবেন। এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ দ্বীন সহজ। [বুখারীঃ ৩৯] কুরাআনুল কারীমে বলা হয়েছে

(وَمَا جَعَلَ عَلَيْكُمْ فِي الدِّيْنِ مِنْ حَرَجٍ)

আল্লাহ্‌ দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের উপর কোন কঠোরতা আরোপ করেননি’ [সূরা আল-হাজ্জঃ ৭৮]

[৫] নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিশেষ ও পরিপূর্ণ গুণ-বৈশিষ্ট্যের আলোচনার পর বলা হয়েছেঃ তাওরাত ও ইঞ্জীলে আখেরী নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রকৃষ্ট গুণ-বৈশিষ্ট্য ও লক্ষণাদি বাতলে দেয়ার পরিণতি এই যে, যারা আপনার প্রতি ঈমান আনবে এবং আপনার সহায়তা করবে আর সেই নূরের অনুসরণ করবে, যা আপনার প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে -অর্থাৎ যারা কুরআনের অনুসরণ করবে, তারাই হল কল্যাণপ্রাপ্ত। এখানে কল্যাণ লাভের জন্য চারটি শর্ত আরোপ করা হয়েছে। প্রথমতঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি ঈমান আনা, দ্বিতীয়তঃ তার প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান করা, তৃতীয়তঃ তার সাহায্য ও সহায়তা করা এবং চতুর্থতঃ কুরআন অনুযায়ী চলা। শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শন বুঝাবার জন্য (وَعَزَّرُوْهُ) ‘আযযারূহু' শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে যা (تعزير) থেকে উদ্ভুত। ‘তাষীর’ অর্থ সস্নেহে বারণ করা ও রক্ষা করা। আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু (وَعَزَّرُوْهُ) ‘আযযারূহু" -এর অর্থ করেছেন শ্রদ্ধা ও সম্মান করা। অর্থাৎ রাসূল হিসাবে তার প্রতি ঈমান আনতে হবে, নির্দেশদাতা হিসাবে তার প্রতিটি নির্দেশের অনুসরণ করতে হবে, প্রিয়জন হিসাবে তার সাথে গভীরতম ভালবাসা রাখতে হবে এবং নবুওয়াতের ক্ষেত্রে যেহেতু তিনি পরিপূর্ণ, তাই তার প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শন করতে হবে। অপর এক আয়াতেও বলা হয়েছে

(وَتُعَزِّرُوْهُ وَتُوَقِّرُوْهُ)

অর্থাৎ “তার প্রতি সম্মান প্রদর্শন কর এবং তাকে পরিপূর্ণ মর্যাদা দান কর”। [সূরা আল-ফাতহঃ ৯] এছাড়া আরো কয়েকটি আয়াতে এই হেদায়াত দেয়া হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহর উপস্থিতিতে এত উচ্চস্বরে কথা বলো না, যা তার স্বর থেকে বেড়ে যেতে পারে। [দেখুন, সূরা হুজুরাতঃ ২] অন্য এক জায়গায় বলা হয়েছেঃ

(يٰٓاَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا لَا تُـقَدِّمُوْا بَيْنَ يَدَيِ اللّٰهِ وَرَسُوْلِهٖ)

অর্থাৎ “হে ইমানদারগণ, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল থেকে এগিয়ে যেয়ো না”। অর্থাৎ যদি মজলিসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপস্থিত থাকেন এবং তাতে কোন বিষয় উপস্থাপিত হয়, তাহলে তোমরা তার আগে কোন কথা বলো না। এ আয়াতের অর্থ করতে গিয়ে কোন কোন সাহাবী বলেছেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পূর্বে কেউ কথা বলবে না এবং তিনি যখন কোন কথা বলেন, তখন সবাই তা নিশুপ বসে শুনবে। অনুরূপভাবে কুরআনের এক আয়াতে বলা হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ডাকার সময় আদবের প্রতি লক্ষ্য রাখবে; এমনভাবে ডাকবে না; নিজেদের মধ্যে একে অপরকে যেভাবে ডেকে থাক। [দেখুন, সূরা হুজুরাতঃ ২] এ আয়াতে শেষে সতর্ক করে দেয়া হয়েছে যে, এ নির্দেশের খেলাফ কোন অসম্মানজনক কাজ করা হলে সমস্ত সৎকর্ম ধ্বংস ও বরবাদ হয়ে যাবে। এ কারণেই সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুম যদিও সর্বক্ষণ-সর্বাবস্থায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কর্মসঙ্গী ছিলেন এবং এমতাবস্থায় সম্মান ও আদবের প্রতি পরিপূর্ণ লক্ষ্য রাখা বড়ই কঠিন হয়ে থাকে; তবুও তাদের অবস্থা এই ছিল যে, এ আয়াতটি নাযিল হওয়ার পর আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেনঃ হে আল্লাহর রাসূল, যিনি আপনার উপর কিতাব নাযিল করেছেন তার শপথ করে বলছি, মৃত্যু পর্যন্ত আপনার সাথে এমনভাবে কথা বলব যেন কোন ভাইয়ের কাছে কেউ গোপন বিষয়ে বলে। [মুস্তাদরাকে হাকেমঃ ২/৪৬২] এমনি অবস্থা ছিল উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুরও দেখুন- বুখারীঃ ৪৮৪৫] আমর ইবনুল আস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অপেক্ষা আমার কোন প্রিয় ব্যক্তি সারা বিশ্বে ছিল না। আর আমার এ অবস্থা ছিল যে, আমি তার প্রতি পূর্ণ দৃষ্টিতে দেখতেও পারতাম না। আমার কাছে যদি রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আকার-অবয়ব সম্পর্কে কেউ জানতে চায়, তাহলে তা বলতে আমি এজন্য অপারগ যে, আমি কখনো তার প্রতি পূর্ণ দৃষ্টিতে চেয়েও দেখিনি। [ মুসলিমঃ ১২১] উরওয়া ইবন মাসউদকে মক্কাবাসীরা গুপ্তচর বানিয়ে মুসলিমদের অবস্থা জানার জন্য মদীনায় পাঠাল। সে সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুমকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি এমন নিবেদিত প্রাণ দেখতে পেল যে, ফিরে গিয়ে রিপোর্ট দিল যে, আমি কিস্‌রা ও কায়সারের দরবারও দেখেছি এবং সম্রাট নাজ্জাশীর সাথেও সাক্ষাত করেছি, এমনটি আর কোথাও দেখিনি। আমার ধারণা, তোমরা কষ্মিনকালেও তাদের মোকাবেলায় জয়ী হতে পারবে না। [ সহীহ ইবনে হিব্বানঃ ১১/২১৬]