Al-A'raf

আল-আরাফ: 80

7:80

আরবি

وَلُوطًا إِذْ قَالَ لِقَوْمِهِۦٓ أَتَأْتُونَ ٱلْفَـٰحِشَةَ مَا سَبَقَكُم بِهَا مِنْ أَحَدٍ مِّنَ ٱلْعَـٰلَمِينَ

English Translations

Sahih International

And [We had sent] Lot when he said to his people, "Do you commit such immorality as no one has preceded you with from among the worlds [i.e., peoples]?

Muhsin Khan

And (remember) Lout (Lot), when he said to his people: "Do you commit the worst sin such as none preceding you has committed in the 'Alamin (mankind and jinns)?

Taqi Usmani

And (We sent) LūT (Lot) when he said to his people, “Do you commit the shameful act in which nobody in the world has ever preceded you?

Abul Ala Maududi

And remember when We sent Lot [as a Messeng to his people and he said to them: 'Do you realize you practise an indecency of which no other people in the world were guilty of before you?

Pickthall

And Lot! (Remember) when he said unto his folk: Will ye commit abomination such as no creature ever did before you?

Yusuf Ali

We also (sent) Lut: He said to his people: "Do ye commit lewdness such as no people in creation (ever) committed before you?

বাংলা অনুবাদ

তাইসিরুল কুরআন

আর আমি লূতকে পাঠিয়েছিলাম। যখন সে তার জাতিকে বলেছিল, ‘তোমরা এমন নির্লজ্জতার কাজ করছ যা বিশ্বজগতে তোমাদের পূর্বে কোন একজনও করেনি।’

রাওয়াই আল-বায়ান

আর (প্রেরণ করেছি) লূতকে। যখন সে তার কওমকে বলল, ‘তোমরা কি এমন অশ্লীল কাজ করছ, যা তোমাদের পূর্বে সৃষ্টিকুলের কেউ করেনি’?

শাইখ মুজিবুর রহমান

আর আমি লূতকে পাঠিয়েছিলাম। সে তার কাওমকে বলেছিলঃ তোমরা এমন অশ্লীল ও কু-কর্ম করছো যা তোমাদের পূর্বে বিশ্বে আর কেহই করেনি।

ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

আর আমি লূতকেও পাঠিয়েছিলাম। তিনি তার সম্প্রদায়কে বলেছিলেন, ‘তোমরা কি এমন খারাপ কাজ করে যাচ্ছ যা তোমাদের আগে সৃষ্টিকুলের কেউ করেনি ?

ফাতহুল মাজীদ

আর আমি লূতকে (নবুওয়াত দান করে) পাঠিয়েছিলাম, যখন তিনি তাঁর সম্প্রদায়কে বলেছিলেন, তোমরা কি এমন অশ্লীল ও কুকর্ম করছো, যা তোমাদের পূর্বে বিশ্বে আর কেউই করেনি?

মুখতাসার

৮০. হে নবী! আপনি লূত (আলাইহিস-সালাম) কে স্মরণ করুন যখন তিনি তাঁর সম্প্রদায়ের অপকর্মে বিরক্ত হয়ে বললেন: তোমরা কি বর্ণনাতীত এক বিশ্রী অপকর্মে লিপ্ত হয়ে যাওনি? আর তা হলো পুরুষদের সাথে সমকামিতায় লিপ্ত হওয়া। এ জঘন্য অপকর্ম মূলতঃ তোমরা নতুন করেই চালু করেছো। যে অপকর্মে তোমাদের পূর্বে আর কেউ লিপ্ত হয়নি।

তাফসীর

তাফসীর ইবনে কাসীর

৮০-৮১ নং আয়াতের তাফসীর: ‘ঐ সময়টিও স্মরণযোগ্য যখন আমি (আল্লাহ) লুত (আঃ)-কে নবীরূপে প্রেরণ করেছিলাম । সে তার কওমকে আল্লাহর পথে আহ্বান করেছিল। লুত (আঃ) ছিলেন নূত ইবনে হারূন ইবনে আযর। তিনি হযরত ইবরাহীম খলীলুল্লাহ (আঃ)-এর ভ্রাতুস্পুত্র ছিলেন। হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর সাথে তিনিও ঈমান আনয়ন করেছিলেন এবং তাঁর সাথে সিরিয়ার দিকে হিজরত করেছিলেন। আল্লাহ তা'আলা তাঁকে আহলে সুদূমের নিকট পাঠিয়েছিলেন। তিনি সুদূমবাসীকে আল্লাহর দিকে ডাকতেন এবং সৎকাজের আদেশ ও মন্দ কাজ হতে নিষেধ করতেন। তারা এমন নির্লজ্জতাপূর্ণ কাজের আবিষ্কার করেছিল যা হযরত আদম (আঃ) থেকে নিয়ে আজ পর্যন্ত তাদের ছাড়া অন্য কোন জাতি সেই কাজে লিপ্ত হয়নি। তারা নারীদেরকে ছেড়ে পুরুষদের কাছে কু-কাজের জন্যে আসতো। এ কাজের কল্পনা আজ পর্যন্ত কারো মনেও জাগ্রত হয় নি এবং আজ পর্যন্ত বানী আদম এ কাজে কখনও জড়িত হয়নি। জামে’ দামেশকের প্রতিষ্ঠাতা উমাইয়া খলীফা ওয়ালীদ ইবনে আব্দুল মালিক বলেছিলেনঃ “যদি আল্লাহ তা'আলা কুরআন কারীমে লূত সম্প্রদায়ের ঘটনা বর্ণনা না করতেন তবে আমার এ বিশ্বাসই হতো না যে, কোন পুরুষ তাক অন্য কোন পুরুষ লোকের সাথে এরূপ কাজ করতে পারে!” সুতরাং হযরত লুত (আঃ) স্বীয় সম্প্রদায়কে সম্বোধন করে বললেনঃ “তোমরা এমন অশ্লীল ও কুকর্মে লিপ্ত হয়ে পড়েছে যে কাজ তোমাদের পূর্বে বিশ্বে আর কেউই করে নি। তোমরা নারীদেরকে ছেড়ে পুরুষ লোকদের কাছে আসছে এবং তাদের দ্বারা নিজেদের যৌন ক্রিয়া নিবারণ করে নিচ্ছো? বাস্তবিকই এটা তোমাদের সীমালংঘন ও বড় রকমের অজ্ঞতাই বটে! যে জিনিসের যেটা স্থান নয় তোমরা ওকে ওরই স্থান বানিয়ে নিচ্ছো।” এরপর অন্য আয়াতে আল্লাহ পাক (হযরত লুতের আঃ কথা নকল করে) বলেনঃ “এরা আমার কন্যা যার সাথে চাও সম্পর্ক স্থাপন কর।” তারা বললোঃ “(হে নূত আঃ)! তুমি তো জান যে, তোমার এই পার্থিব কন্যাদের কোনই প্রয়োজন আমাদের নেই। যাদের প্রয়োজন আমাদের রয়েছে তা তোমার জানা আছে।” মুফসিরগণ বর্ণনা করেছেন যে, পুরুষ নিজের প্রয়োজন পুরুষ দ্বারা পূর্ণ করে নিতো এবং নারীরাও তাদের প্রয়োজন নারীদের দ্বারাই পূর্ণ করে নিতো। আর ওটা ছাড়া তাদের কোন উপায়ও ছিল না।

তাফসীর আবু বকর যাকারিয়া

আর আমি লূতকেও [১] পাঠিয়েছিলাম [২]। তিনি তার সম্প্রদায়কে বলেছিলেন, ‘তোমারা কি এমন খারাপ কাজ করে যাচ্ছ যা তোমাদের আগে সৃষ্টিকুলের কেউ কারেনি ?

[১] লূত ‘আলাইহিসসালাম ছিলেন ইবরাহীম ‘আলাইহিস সালামের ভ্রাতুষ্পুত্র। উভয়ের মাতৃভূমি ছিল পশ্চিম ইরাকে বসরার নিকটবর্তী প্রসিদ্ধ বাবেল শহর। এখানে মূর্তিপূজার ব্যাপক প্রচলন ছিল। স্বয়ং ইবরাহীম আলাইহিস সালামের পরিবারও মূর্তিপূজায় লিপ্ত ছিল। তাদের হিদায়াতের জন্য আল্লাহ্ তা'আলাইবরাহীম আলাইহিস সালামকে নবী করে পাঠান। কিন্তু সবাই তার বিরুদ্ধাচরণ করে এবং ব্যাপারটি নমরূদের অগ্নি পর্যন্ত গড়ায়। স্বয়ং পিতা তাকে গৃহ থেকে বহিষ্কার করার হুমকি দেন। নিজ পরিবারের মধ্যে শুধু স্ত্রী সারা ও ভ্রাতুষ্পপুত্র লুত মুসলিম হন। অবশেষে তাদেরকে সাথে নিয়ে ইবরাহীম আলাইহিস সালাম দেশ ছেড়ে সিরিয়ায় হিজরত করেন। জর্দান নদীর তীরে পৌছার পর আল্লাহর নির্দেশে ইবরাহীম আলাইহিস্ সালাম বায়তুল মোকান্দাসের অদূরেই বসতি স্থাপন করেন।

লুত আলাইহিস সালামকেও আল্লাহ্ তা'আলা নবুওয়াত দান করে জর্দান ও বায়তুল মোকান্দাসের মধ্যবর্তী সাদূমের অধিবাসীদের পথ প্রদর্শনের জন্য প্রেরণ করেন। এ এলাকায় বেশ কয়েকটি বড় বড় শহর ছিল। কুরআনুল কারীম বিভিন্ন স্থানে এদের সমষ্টিকে ‘মু'তাফেকা' ও 'মু'তাফেকাত’ শব্দে বর্ণনা করেছে। এসব শহরের মধ্যে সাদূমকেই রাজধানী মনে করা হত। লুত ‘আলাইহিস সালাম এখানেই অবস্থান করতেন। এ এলাকার ভূমি ছিল উর্বর ও শস্যশ্যামল। এখানে সর্বপ্রকার শস্য ও ফলের প্রাচুর্য ছিল। আল্লাহ্ তা'আলা লুত আলাইহিস সালামকে তাদের হেদায়াতের জন্য নিযুক্ত করেন। তিনি স্বজাতিকে সম্বোধন করে বলেনঃ “তোমরা এমন অশ্লীল কাজ কর, যা তোমাদের পূর্বে পৃথিবীর কেউ করেনি।” অর্থাৎ লুত আলাইহিস সালামের জাতি নারীদেরকে বাদ দিয়ে পুরুষদের সাথে কাম প্রবৃত্তি চরিতার্থ করত। এটা ছিল এমন কাজ যা এর পূর্বে কোন জাতি করেনি। এজন্য আল্লাহ্ তা'আলা বলছেনঃ তোমরা মনুষ্যত্বের সীমা অতিক্রমকারী সম্পপ্রদায়। প্রত্যেক কাজে সীমা অতিক্রম করাই তোমাদের আসল রোগ। যৌন কামনার ক্ষেত্রেও তোমরা আল্লাহর নির্ধারিত সীমা ডিঙ্গিয়ে স্বভাববিরুদ্ধ কাজে লিপ্ত হয়েছ। লুত আলাইহিস সালামের উপদেশের জবাবে তার সম্প্রদায় বললঃ এরা বড় পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন বলে দাবী করে। এদের চিকিৎসা এই যে, এদেরকে বস্তি থেকে বের করে দাও। তখন গোটা জাতিই আল্লাহর আযাবে পতিত হল। শুধু লুত আলাইহিস সালাম ও তার কয়েকজন সঙ্গী আযাব থেকে বেঁচে রইলেন। আল্লাহ বলেনঃ “আমি লুত ও তার পরিবারকে আযাব থেকে বাচিয়ে রেখেছি।” কারণ, লুত আলাইহিস সালামের ঘরের লোকেরাই শুধু মুসলিম ছিল। সুতরাং তারাই আযাব থেকে মুক্তি পেল। অবশ্য তাদের মধ্যে তার স্ত্রী অন্তর্ভুক্ত ছিল না। সারকথা এই যে, গোণা-গুণতি কয়েকজন মুসলিম ছিল। তাদেরকে আযাব থেকে বাঁচানোর জন্য আল্লাহ তা'আলা লুত ‘আলাইহিস সালামকে নির্দেশ দেন যে, স্ত্রী ব্যতীত অন্যান্য পরিবার-পরিজন ও সম্পর্কশীল লোককে নিয়ে শেষ রাত্রে বস্তি থেকে বের হয়ে যান এবং পিছনে ফিরে দেখবেন না। কেননা, আপনি যখন বস্তি থেকে বের হয়ে যাবেন, তখনই কালবিলম্ব না করে আযাব এসে যাবে। লুত 'আলাইহিস সালাম এ নির্দেশ মত স্বীয় পরিবার-পরিজন ও সম্পর্কশীলদেরকে নিয়ে শেষ রাত্রে সাদূম ত্যাগ করেন। তার স্ত্রী প্রসঙ্গে দুরকম বর্ণনা রয়েছে। এক বর্ণনা অনুযায়ী সে সঙ্গে রওয়ানাই হয়নি। দ্বিতীয় বর্ণনায় আছে, কিছু দূর সঙ্গে চলার পর আল্লাহর নির্দেশের বিপরীতে পিছনে ফিরে বস্তিবাসীদের অবস্থা দেখতে চেয়েছিল। ফলে সাথে সাথে আযাব এসে তাকেও পাকড়াও করল। কুরআনুল কারীমের বিভিন্ন জায়গায় এ ঘটনাটি সংক্ষেপে ও বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে। তাদের উপর আপতিত আযাব সম্পর্কে আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ যখন আমার আযাব এসে গেল, তখন আমি বস্তিটিকে উল্টে দিলাম এবং তাদের উপর স্তরে স্তরে প্রস্তর বর্ষণ করলাম যা আপনার প্রতিপালকের নিকট চিহ্নযুক্ত ছিল। সে বস্তিটি এ কাফেরদের থেকে বেশী দূরে নয়।

এতে বুঝা যাচ্ছে যে, উপর থেকে প্রস্তর বর্ষিত হয়েছে এবং নীচে থেকে জীবরাঈল আলাইহিস সালাম গোটা ভূখণ্ডকে উপরে তুলে উল্টে দিয়েছেন। সূরা আলহিজরের আয়াতে এ আযাবের বর্ণনার পূর্বে বলা হয়েছেঃ সূর্যোদয়ের সময় বিকট শব্দ তাদেরকে পাকড়াও করল। লুত ‘আলাইহিস সালামের সম্প্রদায়ের উপর পতিত ভয়াবহ আযাবসমূহের মধ্যে ভূখণ্ড উল্টে দেয়ার আযাবটি তাদের অশ্লীল ও নির্লজ্জ কাজের সাথে বিশেষ সঙ্গতিও রাখে। কারণ, তারা সিদ্ধ পন্থার বিপরীত কাজ করেছিল। সূরাঃ হুদের বর্ণিত আয়াতসমূহের শেষে আল্লাহ্ তাআলা আরবদেরকে হুশিয়ার করে এ কথাও বলেছে যে, উল্টে দেয়া বস্তিগুলো যালেমদের কাছ থেকে বেশী দূরে নয়। সিরিয়া গমনের পথে সব সময়ই সেগুলো তাদের চোখের সামনে পড়ে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, তারা তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে না। এ দৃশ্য শুধু কুরআন নাযিলের সময়েরই নয়, আজও বিদ্যমান রয়েছে। বায়তুল মুকাদাস ও জর্দান নদীর মাঝখানে আজও এ ভূখণ্ডটি ‘লুত সাগর' অথবা ‘মৃত সাগর’ নামে পরিচিতি। এর ভূ-ভাগ সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে অনেক নীচে অবস্থিত। এর একটি বিশেষ অংশে নদীর আকারে আশ্চর্য ধরণের পানি বিদ্যমান। এ পানিতে কোন মাছ, ব্যাঙ ইত্যাদি জীবিত থাকতে পারে না। এ কারণেই একে মৃত সাগর বলা হয়। কথিত আছে, এটাই সাদূমের অবস্থান স্থল। [ড.শাওকী আবু খালীল, আতলাসুল কুরআন, পৃ. ৫৭-৬১]

[২] বর্তমানে যে এলাকাটিকে ট্রান্স জর্দান বলা হয় সেখানেই ছিল এ জাতিটির বাস। ইরাক ও ফিলিস্তিনের মধ্যবর্তী স্থানে এ এলাকাটি অবস্থিত। এ এলাকা এমনই শ্যামল সবুজে পরিপূর্ণ ছিল যে, মাইলের পর মাইল জুড়ে এ বিস্তৃত এলাকা যেন একটি বাগান মনে হতো। এ এলাকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মানুষকে মুগ্ধ ও বিমোহিত করত। কিন্তু আজ এ জাতির নাম-নিশানা দুনিয়ার বুক থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। এমনকি তাদের জনপদগুলো কোথায় কোথায় অবস্থিত ছিল তাও আজ সঠিকভাবে জানা যায় না। মৃত সাগরই তাদের একমাত্র স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে টিকে আছে।