Al-A'raf
আল-আরাফ: 8
7 আল-আরাফ Al-A'raf · 206 আয়াত الأعراف
মূল আরবি
وَٱلْوَزْنُ يَوْمَئِذٍ ٱلْحَقُّ ۚ فَمَن ثَقُلَتْ مَوَٰزِينُهُۥ فَأُو۟لَـٰٓئِكَ هُمُ ٱلْمُفْلِحُونَ
English Translations
And the weighing [of deeds] that Day will be the truth. So those whose scales are heavy - it is they who will be the successful.
And the weighing on that day (Day of Resurrection) will be the true (weighing). So as for those whose scale (of good deeds) will be heavy, they will be the successful (by entering Paradise).
The Weighing (of deeds) on that day is definite. As for those whose scales are heavy, they will be the successful ones.
The weighing on that Day will be the true weighing: those whose scales are heavy will prosper.
The weighing on that day is the true (weighing). As for those whose scale is heavy, they are the successful.
The balance that day will be true (to nicety): those whose scale (of good) will be heavy, will prosper:
বাংলা অনুবাদ
সেদিনের ওজন হবে ঠিক ঠিক। ফলে যাদের পাল্লা ভারী হবে তারা সফলকাম হবে।
আর সেদিন পরিমাপ হবে যথাযথ। সুতরাং যাদের পাল্লা ভারি হবে তারাই হবে সফলকাম।
আর সেদিন (কিয়ামাতের দিন) ন্যায় ও সঠিকভাবে (প্রত্যেকের ‘আমল) ওযন করা হবে, সুতরাং যাদের (পুণ্যের) পাল্লা ভারী হবে তারাই হবে কৃতকার্য ও সফলকাম।
আর সেদিন ওজন যথাযথ হবে সুতরাং যাদের পাল্লা ভারী হবে তারাই সফলকাম হবে।
সেদিন সঠিক ওজন করা হবে। যাদের পাল্লা ভারী হবে তারাই সফলকাম হবে।
৮. কিয়ামতের দিন আমলসমূহের ওজন এমন ইনসাফ ভিত্তিক হবে যাতে কোন ধরনের যুলুম ও অত্যাচার থাকবে না। সুতরাং ওজনের সময় যার নেকীর পাল্লা তার পাপের পাল্লার চেয়ে ভারী হবে সেই হবে সফলকাম ও ভয়মুক্ত।
তাফসীর
৮-৯ নং আয়াতের তাফসীর: ইরশাদ হচ্ছে যে, কিয়ামতের দিন আমলসমূহ ওজন করা হবে এটা সত্য কথা, যেন কারো উপর যুলুম না হতে পারে। যেমন এক জায়গায় বলেনঃ “কিয়ামতের দিন আমি সত্য ও ন্যায়ের দাঁড়িপাল্লা স্থাপন করবো যাতে কারো উপর বিন্দুমাত্রও যুলুম না হতে পারে। সরিষার দানা পরিমাণও যদি কোন আমল থেকে থাকে সেটাও ছুটে যাবে না। গণনার জন্যে আমিই যথেষ্ট।” অন্য জায়গায় আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “আল্লাহ অণু পরিমাণও কারো উপর অত্যাচার করবেন না। যদি একটি পুণ্য হয় তবে ওকে দ্বিগুন ত্রিগুণ করে দেয়া হবে। তাঁর এই বিরাট প্রতিদান তাঁর পক্ষ থেকে পুরস্কার স্বরূপ।” আর এক জায়গায় তিনি বলেনঃ “যার (পুণ্যের) পাল্লা ভারী হবে সে তো তার বাসনানুরূপ সুখে অবস্থান করবে।
আর যার (পুণ্যের) পাল্লা হাল্কা হবে, তার বাসস্থান হবে হাবিয়া। তোমার কি জানা আছে, ওটা কি? ওটা হচ্ছে জ্বলন্ত অগ্নি।” আর এক স্থানে তিনি বলেনঃ “যখন শিঙ্গায় ফু দেয়া হবে তখন আত্মীয়তার সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যাবে। কেউ কাউকেও কিছুই জিজ্ঞেস করবে না। যার (পুণ্যের) ওজন ভারী, হবে সে তো হবে কৃতকার্য ও সফলকাম, আর যর (পুণ্যের) ওজন হালকা হবে সে বড়ই ক্ষতিগ্রস্ত ও বিফল মনোরথ হবে। আর তার বাসস্থান হবে জাহান্নাম।” দাড়িপাল্লায় যা ওজন করা হবে তা হচ্ছে কারো কারো মতে স্বয়ং আমল। যদিও ওর কোন আকার নেই অর্থাৎ যদিও ওটা কোন দৃশ্যমান অস্তিত্ব বিশিষ্ট পদার্থ নয়, তবুও সেই দিন আল্লাহ তা'আলা ওকে পদার্থের আকার দান করবেন।
এই বিষয়েরই হাদীস হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, সূরায়ে বাকারা’ এবং সূরায়ে আলে-ইমরান’ কিয়ামতের দিন দু’টি মেঘখণ্ডের আকারে সামনে আসবে। অথবা দু’টি সামিয়ানার আকারে কিংবা আকাশে ছড়িয়ে পড়া পাখীদের আঁকের আকারে আসবে। সহীহ হাদীসে রয়েছে যে, কুরআন পাঠকের কাছে কুরআন মাজীদ একজন নবযুবকের আকারে হজির হবে। কুরআনের পাঠক তাকে জিজ্ঞেস করবেঃ ‘তুমি কে? সে উত্তরে বলবেঃ “আমি কুরআন। আমি তোমাকে রাত্রিকালে জাগিয়ে রাখতাম এবং সারাদিন রোযার হুকুম পালনার্থে পিপাসার্ত রাখতাম।” কবরের প্রশ্নের ঘটনায় রয়েছে যে, কবরে মুমিনের কাছে একজন সুগন্ধময় সুন্দর যুবক আগমন করবে।
কবরবাসী তাকে জিজ্ঞেস করবেঃ ‘তুমি কে? সে বলবেঃ “আমি তোমার সৎ আমল।”হাদীসে বেতাকার মধ্যে রয়েছে যে, একজন লোককে একটি কাগজের টুকরা দেয়া হবে এবং ওটা তারাযুর এক পাল্লায় রাখা হবে। আর অপর পাল্লায় রাখা হবে কাগজের নিরানব্বইটি দফতর। এক একটি দফতর এতো বড় হবে যে, যতদূর দৃষ্টি যায় ততদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকবে। ঐ কাগজের টুকরায় (আরবী) ‘লা-ইলাহা-ইল্লাল্লাহু’ লিখা থাকবে। লোকটি বলবেঃ “কোথায় এই কাগজের টুকরাটি এবং কোথায় ঐ বড় বড় দফতরগুলো।” তখন আল্লাহ পাক তাকে বলবেনঃ “আজ কিন্তু তোমার উপর অত্যাচার করা হবে না।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন যে, তার পাপরাশির বড় বড় দফতরের পাল্লা হালকা হয়ে যাবে এবং ঐ কাগজখণ্ডের পাল্লা ভারী হয়ে যাবে।আবার এ কথাও বলা হয়েছে যে, আমল বা আমলনামা ওজন করা হবে না, বরং আমলকারীকে ওজন করা হবে।
যেমন হাদীসে রয়েছে যে, কিয়ামতের দিন একজন মোটা লোকটে আনয়ন করা হবে, কিন্তু সে আল্লাহর কাছে পাখীর পালকের সমানও ওজনের হবে না। অতঃপর তিনি (আরবী) -এই আয়াতটি পাঠ করেন।হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর প্রশংসা করতে গিয়ে বলেনঃ “তোমরা আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর সরু সরু পা দেখে কেন বিস্ময় বোধ করছো? আল্লাহর শপথ! এটা দাঁড়িপাল্লায় ওজন করলে এর ওজন উহুদ পাহাড়ের চেয়েও বেশী হবে।” এই তিনটি বর্ণনাকে এভাবে জমা করা যেতে পারে যে, কখনো ওজন করা হবে আমল, কখনো আমলনামা এবং কখনো আমলকারীকে।
আর সেদিন ওজন [১] যথাযথ হবে [২] সুতরাং যাদের পাল্লা ভারী হবে তারাই সফলকাম হবে [৩]।
[১] সেদিনের সে দাঁড়িপাল্লায় কোন অপরাধীর অপরাধ বাড়িয়ে দেয়া হবে না। আর কোন নেককারের নেক কমিয়ে দেয়া হবে না। [আদওয়াউল বায়ান] অন্য আয়াতেও আল্লাহ সেটা বলেছেন, “আর কেয়ামতের দিনে আমরা ন্যায়বিচারের মানদণ্ড স্থাপন করব, সুতরাং কারো প্রতি কোন যুলুম করা হবে না এবং কাজ যদি শস্য দানা পরিমাণ ওজনেরও হয় তবুও তা আমরা উপস্থিত করব;" |সূরা আল-আম্বিয়া: ৪৭] তবে আল্লাহ্ তা'আলা কোন কোন নেক বান্দার আমলকে বহুগুণ বর্ধিত করবেন। আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয় আল্লাহ অণু পরিমাণও যুলুম করেন না। আর কোন পুণ্য কাজ হলে আল্লাহ সেটাকে বহুগুণ বর্ধিত করেন এবং আল্লাহ তার কাছ থেকে মহাপুরস্কার প্রদান করেন।” [সূরা আন-নিসা:৪০] অনুরূপভাবে ‘হাদীসে বিতাকাহ’ নামে বিখ্যাত হাদীসেও দেখুন, [ইবন মাজাহঃ ৪৩০০; তিরমিযী ২১২৭] সেটা বর্ণিত হয়েছে।
[২] এ আয়াতে বলা হয়েছেঃ “সেদিন যে ভাল-মন্দ কাজকর্মের ওজন হবে তা সত্যসঠিকভাবেই হবে।” এতে কোনরূপ সন্দেহের অবকাশ নেই। এখানে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, এতে মানুষ ধোঁকায় পড়তে পারে যে, যেসব বস্তু ভারী, সেগুলোর ওজন ও পরিমান হতে পারে। মানুষের ভাল-মন্দ কাজকর্ম কোন জড় পদার্থ নয় যে, এগুলোকে ওজন করা যেতে পারে। এমতাবস্থায় কাজকর্মের ওজন কিরূপে করা হবে? উত্তর এই যে, প্রথমতঃ আল্লাহ্ তা'আলা সর্বশক্তিমান। তিনি সব কিছুই করতে পারেন। অতএব, আমরা যা ওজন করতে পারি না আল্লাহ তা'আলাও তা ওজন করতে পারবেন, এটা বিচিত্র কিছু নয়। দ্বিতীয়তঃ আজকাল জগতে ওজন করার নতুন নতুন যন্ত্র আবিস্কার হয়েছে যাতে দাঁড়িপাল্লা, স্কেলকাঁটা ইত্যাদির কোন প্রায়োজন নেই।
এসব নবাবিস্কৃত যন্ত্রের সাহায্যে আজকাল এমন বস্তুও ওজন করা যায়, যা ইতোপূর্বে ওজন করার কল্পনাও করা যেত না। আজকাল বাতাসের চাপ এবং বৈদ্যুতিক প্রবাহও ওজন করা যায়। এমনকি শীত-গ্রীষ্ম পর্যন্ত ওজন করা হয়। এগুলোর মিটারই এদের দাঁড়িপাল্লা। যদি আল্লাহ তা'আলা স্বীয় অসীম শক্তি-বলে মানুষের কাজকর্ম ওজন করে নেন, তবে এতে বিস্ময়ের কিছুই নেই। হাদীসে রয়েছে যে, যদি কোন বান্দার ফরয কাজসমূহে কোন ক্রটি পাওয়া যায়, তবে রাববুল আলামীন বলবেনঃ দেখ, তার নফল কাজও আছে কি না। নফল কাজ থাকলে ফরযের ক্রটি নফল দ্বারা পূরণ করা হবে। [মুসনাদে আহমাদঃ ৪/৬৫]
আমলের ওজন পদ্ধতিঃ
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ পাখার সমানও হবে না। এ কথার সমর্থনে কুরআনুল কারীমের এ আয়াত পাঠ করলেন। "
(فَلَا نُقِيْمُ لَهُمْ يَوْمَ الْقِيٰمَةِ وَزْنًا)
অর্থাৎ কেয়ামতের দিন আমি তাদের কোন ওজন স্থির করবো না ’ [বুখারীঃ ৪৪৫২, মুসলিমঃ ২৭৮৫] আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহুর প্রশংসায় বর্ণিত এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তার পা দুটি বাহ্যতঃ যতই সরু হোক, যাঁর হাতে আমার প্রাণ, সেই সত্তার কসম, কেয়ামতের দাড়িপাল্লায় তার ওজন ওহুদ পর্বতের চাইতেও বেশী হবে। [মুসনাদে আহমাদ: ১/৪২০] রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন, ‘দুটি বাক্য উচ্চারণের দিক দিয়ে খুবই হাল্কা; কিন্তু দাঁড়িপাল্লায় অত্যন্ত ভারী এবং আল্লাহর কাছে অতি প্রিয়।
বাক্য দুটি হচ্ছে, ‘সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহী’, ‘সুবহানাল্লাহিল আযীম'। [বুখারীঃ ৭৫৬৩] রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেনঃ ‘সুবহানাল্লাহ’ বললে আমলের দাড়িপাল্লার অর্ধেক ভরে যায় আর ‘আলহামদুলিল্লাহ' বললে বাকী অর্ধেক পূর্ণ হয়ে যায়। [ মুসনাদে আহমাদঃ ৪/২৬০, ৫/৩৬৫; সুনান দারমীঃ ৬৫৩] অনুরূপভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ‘আমলের ওজনের বেলায় কোন আমলই সচ্চরিত্রতার সমান ভারী হবে না। [আবু দাউদঃ ৪৭৯৯; তিরমিয়ীঃ ২০০৩] অন্যত্র রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “যে ব্যক্তি জানাযার সাথে কবরস্থান পর্যন্ত যায়, তার আমলের ওজনে দু'টি কিরাত রেখে দেয়া হবে” [বুখারীঃ ১২৬১]।
অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, এই কিরাতের ওজন হবে ওহুদ পাহাড়ের সমান। [মুসলিমঃ ৬৫৪] কেয়ামতে আমলের ওজন সম্পর্কে এ ধরণের বহু হাদীস রয়েছে।
[৩] মানুষের জীবনের সমগ্র কার্যাবলী দু’টি অংশে বিভক্ত হবে। একটি ইতিবাচক বা সৎকাজ এবং অন্যটি নেতিবাচক বা অসৎকাজ। ইতিবাচক অংশের অন্তর্ভুক্ত হবে সত্যকে জানা ও মেনে নেয়া এবং সত্যের অনুসরণ করে সত্যের খাতিরে কাজ করা। আখেরাতে এটিই হবে ওজনদার, ভারী ও মূল্যবান। আর সে মূল্যবান কাজের ফলাফলও মূল্যবান হবে। এ আয়াতে তা উল্লেখ না হলেও অন্য আয়াতে সেটা বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ বলেন, “অতঃপর যার পাল্লাসমূহ ভারী হবে, সে তো থাকবে সন্তোষজনক জীবনে " [সূরা আল-কারি'আহ:৬-৭] অর্থাৎ জান্নাতে। অন্যদিকে সত্য থেকে গাফিল হয়ে অথবা সত্য থেকে বিচ্যুত হয়ে মানুষ নিজের নফস-প্রবৃত্তি বা অন্য মানুষের ও শয়তানের অনুসরণ করে অসত্য পথে যা কিছুই করে, তা সবই নেতিবাচক অংশে স্থান লাভ করবে।
আর এ নেতিবাচক অংশটি কেবল যে মূল্যহীন হবে তাই নয়, বরং এটি মানুষের ইতিবাচক অংশের মর্যাদাও কমিয়ে দেবে। কাজেই মানুষের জীবনের সমুদয় কার্যাবলীর ভাল অংশ যদি তার মন্দ অংশের ওপর বিজয় লাভ করে এবং ক্ষতিপূরণ হিসেবে অনেক কিছু দেবার পরও তার হিসেবে কিছু না কিছু অবশিষ্ট থাকে, তবেই আখেরাতে তার সাফল্য লাভ করা সম্ভব।
[সূরা আল-আরাফ (৭): আয়াত ৮ থেকে ৯] পূর্ণ পৃষ্ঠা
'দাওয়াহ' শব্দটি পেশ (রাফ') এবং 'আন কালু' অংশটি জবর (নাসব) হওয়া বৈধ, যেমনটি মহান আল্লাহর বাণী: "পুণ্য এটি নয় যে তোমরা মুখ ফিরাবে" আয়াতে 'আল-বিররা' শব্দটিকে পেশ পড়ার ক্ষেত্রে, এবং তাঁর বাণী: "অতঃপর যারা মন্দ কাজ করেছিল তাদের পরিণাম হয়েছিল মন্দ, যেহেতু তারা মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছিল" আয়াতে 'আকিবাতা' শব্দটিকে পেশ পড়ার ক্ষেত্রে। [সূরা আল-আরাফ (৭): আয়াত ৬ থেকে ৭]অতএব আমি অবশ্যই তাদেরকে জিজ্ঞেস করব যাদের কাছে রাসুল পাঠানো হয়েছিল এবং আমি অবশ্যই রাসুলগণকেও জিজ্ঞেস করব। (৬) অতঃপর আমি অবশ্যই তাদের কাছে পূর্ণ জ্ঞানের সাথে তাদের বৃত্তান্ত বর্ণনা করব এবং আমি তো অনুপস্থিত ছিলাম না।
(৭)মহান আল্লাহর বাণী: (অতএব আমি অবশ্যই তাদেরকে জিজ্ঞেস করব যাদের কাছে রাসুল পাঠানো হয়েছিল) এটি প্রমাণ করে যে কাফিরদের হিসাব নেওয়া হবে। আল-কুরআনের অন্য আয়াতে এসেছে "অতঃপর নিশ্চয়ই তাদের হিসাব গ্রহণ আমারই কাজ।" এবং সূরা আল-কাসাসে রয়েছে "এবং অপরাধীদেরকে তাদের পাপ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে না," অর্থাৎ যখন তারা শাস্তির মধ্যে স্থায়ীভাবে নিপতিত হবে। আর পরকালের বিভিন্ন পর্যায় রয়েছে: একটি পর্যায়ে তাদেরকে হিসাবের জন্য জিজ্ঞেস করা হবে, আর অন্য একটি পর্যায়ে তাদেরকে জিজ্ঞেস করা হবে না। আর তাদের (কাফিরদের) প্রতি প্রশ্ন হবে স্বীকৃতি আদায়, তিরস্কার এবং লজ্জিত করার জন্য।
আর রাসুলদের প্রতি প্রশ্ন হবে সাক্ষ্য গ্রহণ এবং বিষয়টির ব্যাখ্যা করার জন্য, অর্থাৎ তাদের কওম তাদেরকে কী উত্তর দিয়েছিল সে সম্পর্কে। আর এটাই তাঁর বাণীর অর্থ: "যাতে তিনি সত্যবাদীদেরকে তাদের সত্যবাদিতা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন," যার বর্ণনা সামনে আসবে। কেউ কেউ বলেছেন: এর অর্থ হলো, "অতএব আমি অবশ্যই তাদেরকে জিজ্ঞেস করব যাদের কাছে রাসুল পাঠানো হয়েছিল" অর্থাৎ নবীগণ, "এবং আমি অবশ্যই রাসুলগণকেও জিজ্ঞেস করব" অর্থাৎ ঐসব ফেরেশতাগণ যারা তাঁদের নিকট প্রেরিত হয়েছিলেন। "ফালানাসআলান্না" শব্দে 'লাম' হলো শপথের 'লাম' এবং এর প্রকৃত অর্থ হলো তাকিদ বা দৃঢ়তা প্রদান করা।
অনুরূপভাবে (অতঃপর আমি অবশ্যই তাদের কাছে পূর্ণ জ্ঞানের সাথে তাদের বৃত্তান্ত বর্ণনা করব) ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন: তাদের আমলনামা তাদের ব্যাপারে কথা বলবে। (এবং আমি তো অনুপস্থিত ছিলাম না) অর্থাৎ আমি তাদের আমলসমূহের সাক্ষী ছিলাম। আর এই আয়াতটি প্রমাণ করে যে আল্লাহ তাআলা স্বীয় জ্ঞানের মাধ্যমেই সর্বজ্ঞ। [সূরা আল-আরাফ (৭): আয়াত ৮ থেকে ৯]আর সেদিন পরিমাপ হবে যথাযথ। সুতরাং যাদের পাল্লা ভারী হবে, তারাই সফলকাম। (৮) আর যাদের পাল্লা হালকা হবে, তারাই তারা যারা নিজেদের ক্ষতি করেছে, যেহেতু তারা আমার আয়াতসমূহের প্রতি জুলুম করত। (৯)মহান আল্লাহর বাণী: (আর সেদিন পরিমাপ হবে যথাযথ) এটি একটি মুক্তাদা (উদ্দেশ্য) ও খবর (বিধেয়)।
আবার 'আল-হাক্কু' শব্দটি বিশেষণ (সিফাত) হওয়া এবং 'ইয়াওমাইযিন' অংশটি খবর হওয়াও সম্ভব। আবার 'আল-হাক্কু' শব্দটিকে মাসদার হিসেবে জবর (নাসব) দিয়ে পড়াও বৈধ। আর এখানে ওজন বা পরিমাপ বলতে বান্দাদের আমল পরিমাপ করাকে বোঝানো হয়েছে।(১). ২য় খণ্ড ২৩৭ পৃষ্ঠা দেখুন।(২). ১৪তম খণ্ড ৯ ও ১২৯ পৃষ্ঠা দেখুন।(৩). ২০তম খণ্ড ৩৭ পৃষ্ঠা দেখুন।(৪). ১৩তম খণ্ড ৩১৫ পৃষ্ঠা দেখুন।(৫). ১৪তম খণ্ড ৯ ও ১২৯ পৃষ্ঠা দেখুন।(৬). তাবারির ভাষ্য অনুযায়ী: "তাদের আমলনামা তাদের কৃতকর্মের ব্যাপারে তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে।"
ইবনুল মুনজির, ইবনে আবি হাতিম এবং আবুশ শাইখ সাঈদ ইবনে জুবায়ের থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: ‘আরাফ’ হলো জান্নাত ও জাহান্নামের মধ্যবর্তী পাহাড়সমূহ; তারা এর চূড়ায় অবস্থান করবে। ‘আরাফ’ বলতে তিনি এর শিখর বা উচ্চদেশ বুঝিয়েছেন।ইবনে আবি হাতিম কাব থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: আল্লাহর কিতাবে ‘আরাফ’ হলো গভীর ও ঢালু স্থান।ইবনে লাহিয়া বলেছেন: এটি একটি সুউচ্চ পাহাড়ের পেছনে অবস্থিত গভীর উপত্যকা।ইবনে আবি হাতিম ইবনে জুরাইজ থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: তারা মনে করতেন যে এটি হলো ‘সিরাত’।ইবনে জারির ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: নিশ্চয়ই আরাফ হলো জান্নাত ও জাহান্নামের মধ্যবর্তী একটি উঁচু টিলা, যেখানে জান্নাত ও জাহান্নামের মাঝখানে একদল পাপিষ্ঠ মানুষ বসে থাকবে।ইবনে জারির ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: আরাফ হলো জান্নাত ও জাহান্নামের মধ্যবর্তী একটি প্রাচীর।ইবনে জারির ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: আরাফ বলতে সেই প্রাচীরকে বোঝানো হয়েছে যা আল্লাহ কুরআনে উল্লেখ করেছেন এবং এটি জান্নাত ও জাহান্নামের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত।ইবনে জারির ইবনে মাসউদ থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: কিয়ামতের দিন মানুষের হিসাব গ্রহণ করা হবে।
যার নেকি বদির চেয়ে একটিও বেশি হবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর যার বদি নেকির চেয়ে একটিও বেশি হবে, সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে। অতঃপর তিনি পাঠ করলেন: অতঃপর যাদের পাল্লা ভারী হবে তারাই হবে সফলকাম এবং যাদের পাল্লা হালকা হবে তারাই নিজেদের ক্ষতি করেছে
(সূরা আরাফ: আয়াত ৮-৯)। অতঃপর তিনি বলেন: মিজানের পাল্লা একটি শস্যদানার সমপরিমাণ ওজনে হালকা বা ভারী হয়।তিনি বলেন: আর যার নেকি ও বদি সমান হবে, সে হবে আরাফবাসীদের অন্তর্ভুক্ত। তারা সিরাতের ওপর অবস্থান করবে। অতঃপর যখন জান্নাতবাসী ও জাহান্নামবাসীদের পেশ করা হবে এবং তারা যখন জান্নাতবাসীদের দিকে তাকাবে, তখন ডেকে বলবে: ‘তোমাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক’।
আর যখন তাদের দৃষ্টি বাম দিকে ফিরিয়ে নেয়া হবে এবং তারা জাহান্নামবাসীদের দেখবে, তখন বলবে: হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদের জালেম সম্প্রদায়ের সঙ্গী করবেন না
। তারা তাদের আবাসস্থল থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করবে। আর নেককারদের এমন একটি নূর বা জ্যোতি দেয়া হবে যা তাদের সামনে ও ডান পাশে চলতে থাকবে। প্রত্যেক মুমিন বান্দা ও প্রত্যেক উম্মতকে নূর প্রদান করা হবে। যখন তারা সিরাতের ওপর আসবে, আল্লাহ প্রত্যেক মুনাফিক নর-নারীর নূর কেড়ে নেবেন। জান্নাতবাসীরা যখন মুনাফিকদের এই দশা দেখবে, তখন তারা বলবে: ‘হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদের জন্য আমাদের নূর পূর্ণ করে দিন’।আর আরাফবাসীদের হাতে নূর থাকবে এবং তা তাদের হাত থেকে কেড়ে নেয়া হবে না।
সেই সম্পর্কেই আল্লাহ বলেন: তারা তখনও জান্নাতে প্রবেশ করেনি, কিন্তু তারা আশা পোষণ করে
। এই আশাই ছিল তাদের জান্নাতে প্রবেশের সোপান।ইবনে মাসউদ বলেন: বান্দা যখন একটি নেকি করে, তখন তার জন্য দশটি নেকি লেখা হয়। আর যখন একটি পাপ করে, তখন মাত্র একটিই লেখা হয়। অতঃপর তিনি বলতেন: সেই ব্যক্তি ধ্বংস হলো, যার একক সংখ্যাগুলো (বদি) তার দশক সংখ্যাগুলোকে (নেকি) ছাড়িয়ে গেল।ইবনে জারির হুযাইফা থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: আরাফবাসী হলো এমন এক কওম যাদের আমলনামায় এমন কিছু ভালো কাজ ছিল যার ফলে আল্লাহ তাদের জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেবেন। তারাই হবে জান্নাতে প্রবেশকারী সর্বশেষ দল।
তারা জান্নাতবাসী ও জাহান্নামবাসী উভয়কেই চিনতে পারবে।
আল-ফজলতখন লোকটি কাঁদতে শুরু করল এবং উচ্চস্বরে বিলাপ করতে লাগল। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন: "তুমি কি আল্লাহর কিতাবের এই আয়াতটি পড়নি— এবং আমি কিয়ামতের দিন ন্যায়বিচারের মানদণ্ড স্থাপন করব, সুতরাং কারও প্রতি সামান্যতম জুলুম করা হবে না। আর যদি তা সরিষার দানা পরিমাণও হয়, আমি তা উপস্থিত করব; আর হিসাব গ্রহণের জন্য আমিই যথেষ্ট
।" তখন লোকটি বলল: "হে আল্লাহর রাসূল! আমি আমার ও তাদের (দাসদের) জন্য তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার চেয়ে উত্তম কিছু দেখছি না। আমি আপনাকে সাক্ষী রাখছি যে, তারা সবাই এখন থেকে মুক্ত।"আল-হাকিম আত-তিরমিজি 'নাওয়াদিরুল উসুল' গ্রন্থে এবং ইবনে আবি হাতিম রিফাআ ইবনে রাফে আদ-জুরাকি থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল, "হে আল্লাহর রাসূল!
আমাদের অধীনস্থ দাসদের ব্যাপারে আপনার অভিমত কী, যাদের আমরা প্রহার করি?" তিনি বললেন: "তাদের অপরাধ এবং তোমাদের দেওয়া শাস্তি ওজন করা হবে। যদি তোমাদের দেওয়া শাস্তি তাদের অপরাধের চেয়ে বেশি হয়, তবে তারা তোমাদের থেকে তার বদলা গ্রহণ করবে।"সে বলল: "তাদের গালমন্দ করার ব্যাপারে আপনার অভিমত কী?" তিনি বললেন: "তাদের অপরাধ এবং তোমাদের দেওয়া কষ্ট ওজন করা হবে। যদি তোমাদের দেওয়া কষ্ট তাদের অপরাধের চেয়ে বেশি হয়, তবে তোমাদের নেকি থেকে তাদের তা প্রদান করা হবে।"সে বলল: "হে আল্লাহর রাসূল! আমার সন্তানদের প্রহারের ব্যাপারে কী বলেন?" তিনি বললেন: "তোমার সন্তানদের শাসন করার ক্ষেত্রে তোমার নিয়তকে অভিযুক্ত করা হবে না।
কারণ তুমি নিজে তৃপ্ত থেকে তারা ক্ষুধার্ত থাকলে অথবা তুমি পোশাক পরিহিত থেকে তারা বস্ত্রহীন থাকলে তোমার মন তা মেনে নেয় না।"আল-হাকিম জায়েদ ইবনে আসলাম থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: এক ব্যক্তি বলল, "হে আল্লাহর রাসূল! দাসদের প্রহার করার ব্যাপারে আপনি কী বলেন?" তিনি বললেন: "যদি তা যথার্থ কারণে হয় তবে ঠিক আছে, অন্যথায় কিয়ামতের দিন তোমার থেকে এর প্রতিশোধ নেওয়া হবে।"জিজ্ঞেস করা হলো: "হে আল্লাহর রাসূল! তাদের গালমন্দ করার ব্যাপারে কী বলেন?" তিনি বললেন: "অনুরূপ কথা।"সে বলল: "হে আল্লাহর রাসূল! আমরা তো আমাদের সন্তানদেরও শাস্তি দেই এবং গালমন্দ করি।" তিনি বললেন: "তারা তোমাদের দাসদের মতো নয়; কেননা তোমাদের সন্তানদের প্রতি তোমাদের মমত্ববোধের কারণে তোমাদের অভিযুক্ত করা হয় না।"আল-হাকিম জিয়াদ ইবনে আবি জিয়াদ থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: এক ব্যক্তি বলল, "হে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)!
আমার সম্পদ ও সেবক রয়েছে। আমি রাগান্বিত হলে কঠোর হই, গালি দেই এবং প্রহার করি।"তখন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন: "তাদের অপরাধসমূহ তোমার শাস্তির বিপরীতে ওজন করা হবে। যদি তা সমান হয়, তবে তোমার পক্ষেও কিছু থাকবে না, বিপক্ষেও নয়। আর যদি শাস্তি বেশি হয়, তবে কিয়ামতের দিন তোমার নেক আমল থেকে তা কেটে নেওয়া হবে।"তখন লোকটি বলল: "হায় আফসোস! হায় আফসোস! আমার নেক আমল থেকে কেটে নেওয়া হবে? হে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)! আমি আপনাকে সাক্ষী রাখছি যে, আমার সকল দাস আজ থেকে মুক্ত। আমি এমন কাউকে আমার অধীন রাখতে চাই না, যার কারণে আমার নেক আমল নিয়ে নেওয়া হবে।"তিনি বললেন: "তুমি কী হিসাব করলে?
তুমি কি মহান আল্লাহর বাণী শোননি: এবং আমি ন্যায়বিচারের মানদণ্ড স্থাপন করব...
পুরো আয়াত।"ইবনে আবি শায়বাহ, আহমাদ 'আজ-জুহদ' গ্রন্থে এবং বায়হাকি 'আল-বাস' গ্রন্থে ইবনে মাসউদ থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: কিয়ামতের দিন মানুষকে মিজানের (পাল্লার) কাছে আনা হবে এবং সেখানে তারা চরম বাদানুবাদে লিপ্ত হবে।ইবনে জারির ইবনে আব্বাস থেকে আল্লাহর বাণী: এবং আমি কিয়ামতের দিন ন্যায়বিচারের মানদণ্ড স্থাপন করব...
এর ব্যাখ্যায় বর্ণনা করেছেন যে,তিনি বলেন: "এটি মহান আল্লাহর এই বাণীর মতো: আর সেদিন ওজন হবে সত্য
(সূরা আল-আরাফ, আয়াত: ৮)।"
