Al-Baqarah

আল-বাকারা: 106

2:106
টেক্সট কপি

মূল আরবি

۞ مَا نَنسَخْ مِنْ ءَايَةٍ أَوْ نُنسِهَا نَأْتِ بِخَيْرٍ مِّنْهَآ أَوْ مِثْلِهَآ ۗ أَلَمْ تَعْلَمْ أَنَّ ٱللَّهَ عَلَىٰ كُلِّ شَىْءٍ قَدِيرٌ

English Translations

Sahih International

We do not abrogate a verse or cause it to be forgotten except that We bring forth [one] better than it or similar to it. Do you not know that Allāh is over all things competent?

Muhsin Khan

Whatever a Verse (revelation) do We abrogate or cause to be forgotten, We bring a better one or similar to it. Know you not that Allah is able to do all things?

Taqi Usmani

Whenever We abrogate a verse or cause it to be forgotten, We bring one better than it or one equal to it. Do you not know that Allah is powerful over everything?

Abul Ala Maududi

For whatever verse We might abrogate or consign to oblivion, We bring a better one or the like of it. Are you not aware that Allah is All-Powerful?

Pickthall

Nothing of our revelation (even a single verse) do we abrogate or cause be forgotten, but we bring (in place) one better or the like thereof. Knowest thou not that Allah is Able to do all things?

Yusuf Ali

None of Our revelations do We abrogate or cause to be forgotten, but We substitute something better or similar: Knowest thou not that Allah Hath power over all things?

বাংলা অনুবাদ

তাইসিরুল কুরআন

আমি কোন আয়াত রহিত করলে কিংবা ভুলিয়ে দিলে, তাত্থেকে উত্তম কিংবা তারই মত আয়াত নিয়ে আসি, তুমি কি জান না যে, আল্লাহ প্রত্যেক বস্তুর উপর ক্ষমতাবান।

রাওয়াই আল-বায়ান

আমি যে আয়াত রহিত করি কিংবা ভুলিয়ে দেই, তার চেয়ে উত্তম কিংবা তার মত আনয়ন করি। তুমি কি জান না যে, আল্লাহ সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান।

শাইখ মুজিবুর রহমান

আমি কোন আয়াতের হুকুম রহিত করলে কিংবা আয়াতটিকে বিস্মৃত করিয়ে দিলে তদপেক্ষা উত্তম অথবা তদনুরূপ আয়াত আনয়ন করি। তুমি কি জাননা যে, আল্লাহ সর্ব বিষয়ের উপরই ক্ষমতাবান?

ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

আমরা কোনো আয়াত রহিত করলে বা ভুলিয়ে দিলে তা থেকে উত্তম অথবা তার সমান কোনো আয়াত এনে দেই আপনি কি জানেন না যে, আল্লাহ্‌ সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান।

ফাতহুল মাজীদ

আমি কোন আয়াত রহিত করলে কিংবা আয়াতটিকে বিস্মৃত করে দিলে তার চেয়ে উত্তম বা তদনুরূপ আনয়ন করি; তুমি কি জান না যে, আল্লাহ সর্ব বিষয়ের ওপরই ক্ষমতাবান?

মুখতাসার

১০৬. আল্লাহ তা‘আলা বলছেন, তিনি যখনই কোন আয়াতের বিধান রহিত করেন কিংবা তার শব্দ উঠিয়ে দেন তথা মানুষকে তা ভুলিয়ে দেন তখনই তিনি উভয় জাহানের জন্য অতি লাভজনক এমন কিছু নিয়ে আসেন অথবা তার সমপর্যায়ের কোন কিছু নিয়ে আসেন। আর এটি হচ্ছে তাঁর জ্ঞান ও প্রজ্ঞার ভিত্তিতে। হে নবী! আপনি তো জানেনই, নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা সর্ব বিষয়ে শক্তিমান। তিনি যা চান তাই করেন। আর যা চান তাই আদেশ করেন।

তাফসীর

তাফসীর ইবনে কাসীর

১০৬-১০৭ নং আয়াতের তাফসীর‘নখ’ এর মূলতত্ত্বঃহযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, নস’ এর অর্থ হচ্ছে পরিবর্তন। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছে সরিয়ে দেয়া, যা লিখার সময় (কখনও) অবশিষ্ট থাকে, কিন্তু হুকুম পরিবর্তন হয়ে যায়। হযরত ইবনে মাসউদের (রাঃ) ছাত্র হযরত আবুল আলিয়া (রঃ) এবং হযরত মুহাম্মদ বিন কাব কার্যীও (রঃ) এ রকমই বর্ণনা করেছেন। যহ্হাক (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছে ভুলিয়ে দেয়া। আতা (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ ছেড়ে দেয়া। সুদী (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ উঠিয়ে নেয়া। যেমন নিম্নের আয়াতটিঃ (আরবি) ব্যভিচারী বৃদ্ধ ব্যভিচারিণী বৃদ্ধাকে প্রস্তরাঘাতে হত্যা করা।' আরও একটি আয়াতঃ (আরবি) অর্থাৎ যদি বানী আদমের জন্যে স্বর্ণের দুইটি উপত্যকা হয় তবে সে অবশ্যই তৃতীয়টি অনুসন্ধান করবে।ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, আল্লাহ তা'আলা আয়াতের হুকুম পরিবর্তন করে থাকেন।

যেমন হালালকে হারাম, হারামকে হালাল, জায়েযকে নাজায়েয এবং নাজায়েযকে জায়েয ইত্যাদি নির্দেশ ও নিষেধাজ্ঞা, বাধা ও অনুমতি এবং বৈধ ও অবৈধ কাজে নস’ হয়ে থাকে। তবে যে সংবাদ দেয়া হয়েছে বা যে ঘটনাবলী বর্ণনা করা হয়েছে তাতে রদবদল এবং নাসিখ ও মানসূখ হয় না। নস’ এর শাব্দিক অর্থ হচ্ছে নকল করা। যেমন একটি পুস্তক থেকে আর একটি পুস্তক নকল করা হয়। এরকমই এখানেও যেহেতু একটি নির্দেশের পরিবর্তে আর একটি নির্দেশ দেয়া হয় এ জন্যে একে নসখ বলে। ওটা হয় নির্দেশের পরিবর্তন হোক বা শব্দের পরিবর্তন হোক।‘নস’ এর মূলতত্ত্বের উপর মূলনীতির পণ্ডিতগণের অভিমতএ জিজ্ঞাস্য বিষয়ে ধর্মীয় মূলনীতির পণ্ডিতগণের ব্যাখ্যা বিভিন্ন রূপ হলেও অর্থ হিসেবে সবগুলো প্রায় একই।

নস’ এর অর্থ হচ্ছে-কোন শরঈ নির্দেশ পরবর্তী দলীলের ভিত্তিতে সরে যাওয়া। কখনও সহজের পরিবর্তে কঠিন এবং কখনও কঠিনের পরিবর্তে সহজ হয়, আবার কখনও বা কোন পরিবর্তনই হয় না। তাবরানীর (রঃ) হাদীস গ্রন্থে একটি হাদীস আছে যে, দুই ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট হতে একটি সূরা মুখস্থ করেছিলেন। সূরাটি তারা পড়তেই থাকেন। একদা রাত্রির নামাযে সূরাটি তারা পড়ার ইচ্ছে করেন কিন্তু কোনক্রমেই স্মরণ করতে পারেন না। হতবুদ্ধি হয়ে তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে উপস্থিত হন এবং ওটা বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন তাদেরকে বলেনঃ “এটা মানসূখ হয়ে গেছে এবং এর পরিবর্তে উত্তম দেয়া হয়েছে।

তোমাদের অন্তর হতে ওটা বের করে নেয়া হয়েছে। দুঃখ করো না, নিশ্চিন্ত থাক।'হযরত যুহরী (রঃ) (আরবি) পেশ এর সঙ্গে পড়তেন। এর, একজন বর্ণনাকারী সুলাইমান বিন রাকিম দুর্বল। আবু বকর আম্বারীও (রঃ) অন্য সনদে মারফুরূপে এটাকে বর্ণনা করেছেন, যেমন কুরতুবীর (রঃ) বর্ণনায় রয়েছে (আরবি) কে (আরবি) ও (আরবি) পড়া হয়েছে (আরবি) এর অর্থ হচ্ছে পিছনে সরিয়ে দেয়া। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এর তাফসীরে বর্ণনা করেনঃ অর্থাৎ আমি ওকে ছেড়ে দেই, মানসূখ করি না। হযরত ইবনে মাসউদের (রাঃ) ছাত্র বলেনঃ ‘অর্থাৎ আমি ওর শব্দ ঠিক রেখে হুকুম পরিবর্তন করে দেই।' আবৃদ বিন উমাইর (রঃ), মুজাহিদ (রঃ) এবং আতা (রঃ) হতে বর্ণিত আছে অর্থাৎ আমি ওকে পিছনে সরিয়ে দেই।

আতিয়া আওফী (রঃ) বলেনঃ ‘অর্থাৎ মানসূখ করি।' সুদ্দী (রঃ) এবং রাবী' বিন আনাসও (রঃ) এটাই বলেন। যহহাক (রঃ) বলেনঃ “অর্থাৎ নাসিখকে মানসূখের পিছনে রাখি। আবুল আলিয়া (রঃ) বলেনঃ ‘অর্থাৎ আমার নিকট ওটা টেনে নেই।' হযরত উমার (রাঃ) খুত্বায় পড়েছেন এবং এর অর্থ ‘পিছনে হওয়া বর্ণনা করেছেন (আরবি) পড়লে ওর ভাবার্থ হবে ‘আমি ওটা ভুলিয়ে দেই। আল্লাহ তা'আলা যে হুকুম উঠিয়ে নিতে ইচ্ছে করতেন ওটা নবী (সঃ) কে ভুলিয়ে দিতেন। এভাবেই ঐ আয়াতটি উঠে। যেতে।হযরত সা'দ বিন আবি ওয়াক্কাস (রাঃ) (আরবি) পড়তেন। এতে তাঁকে হযরত কাসিম বিন আবদুল্লাহ (রঃ) বলেন যে, হযরত সাঈদ বিন মুসাইয়্যাব (রঃ) তো একে (আরবি) পড়তেন।

তখন তিনি বলেন যে, সাঈদের (রঃ) উপর কিংবা তাঁর বংশের উপর কুরআন মাজীদ অবতীর্ণ হয়নি। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “হে নবী (সঃ)! আমি তোমাকে অতি সত্বরই পড়িয়ে দিবো, অতঃপর তুমি ভুলবে না। (৮৭:৬) আরও বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ যখন তুমি ভুলে যাবে তখন তোমার প্রভুকে স্মরণ কর।' (১৮:২৪) হযরত উমারের (রাঃ) ঘোষণা রয়েছেঃ “হযরত আলী (রাঃ) উত্তম ফায়সালাকারী এবং হযরত উবাই (রাঃ) সবচেয়ে বেশী কুরআনের পাঠক। আমরা হযরত উবাই (রাঃ)-এর কথা ছেড়ে দেই। কেননা, তিনি বলেন, 'আমি যা আল্লাহর রাসূলের (সঃ) মুখে শুনেছি তা ছাড়বো না, অথচ আল্লাহ পাক বলেনঃ “আমি যা মানসূখ করি বা ভুলিয়ে দেই, তা হতে উত্তম বা তারই মত আনয়ন করি।' (সহীহ বুখারী ও মুসনাদ-ই-আহমাদ)।‘তা হতে উত্তম হয় অর্থাৎ বান্দাদের জন্যে সহজ ও তাদের আরাম হিসেবে, কিংবা ‘তারই মত হয়।

কিন্তু আল্লাহ পাকের দূরদর্শিতা তার পরেরটাতেই রয়েছে। সৃষ্টজীবের হেরফেরকারী এবং সৃষ্টি ও হুকুমের অধিকারী একমাত্র আল্লাহ। তিনি যাকে যেভাবে চান সেভাবেই গঠন করেন। তিনি যাকে চান ভাগ্যবান করেন এবং যাকে চান হতভাগ্য করেন। যাকে চান সুস্থতা প্রদান করেন এবং যাকে চান রোগাক্রান্ত করেন। যাকে চান ক্ষমতা প্রদান করেন এবং যাকে চান দুর্ভাগা করেন। বান্দাদের মধ্যে তিনি যে হুকুম জারী করতে চান। তাই জারী করেন। যা চান হারাম করেন, যা চান হালাল করেন, যা চান অনুমতি দেন এবং যা চান নিষেধ করেন। তিনি ব্যাপক বিচারপতি। তিনি যা চান সেই আহকামই জারী করেন,তার হুকুম কেউ অগ্রাহ্য করতে পারেনা।

তিনি যা চান তাই করেন। কেউই তাকে বাধা দান করতে পারে না। তিনি বান্দাদেরকে পরীক্ষা করেন এবং দেখেন যে, তারা নবী ও রাসূলদের কিরূপ অনুসারী হয়। তিনি কোন যৌক্তিকতার কারণে নির্দেশ দেন, আর কোন যৌক্তিকতার কারণে ঐ হুকুমকেই সরিয়ে দেন। তখন পরীক্ষা হয়ে যায়। ভাল লোকেরা তখনও আনুগত্যে প্রস্তুত ছিল এবং এখনও আছে কিন্তু যাদের অন্তর খারাপ, তারা তখন সমালোচনা শুরু করে দেয় এবং নাক মুখ চড়িয়ে থাকে। অথচ সমস্ত সৃষ্টজীবের সৃষ্টিকর্তার সমস্ত কথাই মেনে নেয়া উচিত এবং সর্বাবস্থায়ই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর অনুসরণ করা উচিত। তিনি যা বলেন তাই সত্য জেনে পালন করা এবং যা নিষেধ করেন তা থেকে বিরত থাকা কর্তব্য।

এস্থলেও ইয়াহুদীদের কথাকে চরমভাবে অগ্রাহ্য করা হয়েছে এবং তাদের কুফরীর বর্ণনা রয়েছে। তারা নসখ’কে স্বীকার করতো না। কেউ কেউ বলেন যে, বিবেক অনুসারেও এতে অসুবিধে রয়েছে। আবার কেউ কেউ শরীয়তের দৃষ্টিতে একে অসুবিধাজনক মনে করে থাকেন। এ আয়াতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)কে সম্বোধন করা হলেও প্রকৃত পক্ষে এটা ইয়াহূদীদের কথার প্রতিবাদেই বলা হয়েছে। তারা ইঞ্জীল ও কুরআনকে মানতো না। কারণ এই যে, এ দুটির মধ্যে তাওরাতের কতকগুলো হুকুম পরিবর্তন করা হয়েছে। আর এই একই কারণে তারা এই নবীগণকেও স্বীকার করতো না। এটা শুধু অবাধ্যতা ও অহংকারই বটে। নচেৎ বিবেক হিসেবে তা নসখ’ অসম্ভব নয়।

কেননা, মহান আল্লাহ স্বীয় কার্যে সর্বাধিকারী। তিনি যা চান ও যখন চান সৃষ্টি করে থাকেন। যা চান, যেভাবে চান সে ভাবে রাখেন। এভাবেই যা চান এবং যখন চান হুকুম করে দেন। এটা স্পষ্ট কথা যে, তার হুকুমের উপর কারও হুকুম বের হতে পারে না। এভাবেই শরীয়তের ভিত্তিতেও এটা প্রমাণিত বিষয়। পূর্ববর্তী আসমানী কিতাবসমূহ ও শরীয়তসমূহে এটা বিদ্যমান রয়েছে। হযরত আদম (আঃ)-এর সন্তানেরা পরস্পর ভাই বোন হতো। কিন্তু তাদের মধ্যে বিয়ে বৈধ ছিল। অতঃপর পরবর্তী যুগে এটা হারাম করে দেয়া হয়েছে। হযরত নূহ (আঃ) যখন নৌকায় উঠছেন তখন সমুদয় প্রাণীর গোশত বৈধ রাখা হয়েছে।

কিন্তু পরে কতকগুলোর গোশত অবৈধ ঘোষণা করা হয়। দুই বোনকে এক সঙ্গে বিয়ে করা হযরত ইসরাঈল (আঃ) এবং তাঁর সন্তানদের জন্যে বৈধ ছিল। অতঃপর তাওরাতে এবং তার পরেও অবৈধ করে দেয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা হযরত ইবরাহীমকে তার পুত্র ইসমাঈলের (আঃ) কুরবানীর নির্দেশ দিয়েছিলেন, কিন্তু কুরবানীর পূর্বেই এই হুকুম মানসূখ করে দেয়া হয়। বানী ইসরাঈলকে হুকুম দেয়া হয়েছিল যে, যারা বাছুর পূজা করেছিল তাদেরকে যেন তারা হত্যা করে; অথচ অনেক বাকি থাকতেই এ হুকুম উঠিয়ে নেয়া হয়। এরকম আরও বহু ঘটনা বিদ্যমান রয়েছে। আর স্বয়ং ইয়াহূদীরাও ওটা স্বীকার করে। কিন্তু তথাপিও তারা কুরআন মাজীদকে ও শেষ নবীকে (সঃ) এ বলে মানছে না যে, আল্লাহর কালামের পরিবর্তন অপরিহার্য হচ্ছে এবং এটা অসম্ভব।

এ আয়াত দ্বারা আল্লাহ তাআলা নখের বৈধতা বর্ণনা করতঃ ঐ অভিশপ্ত দলের দাবী খণ্ডন করেছেন। সূরা-ই-আলে-ইমরানের মধ্যেও-যার প্রারম্ভে বানী ইসরাঈলকে সম্বোধন করা হয়েছে, নসখ’ সংঘটিত হওয়ার বর্ণনা বিদ্যমান। রয়েছে।আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ প্রত্যেক খাদ্য বানী ইসরাঈলের উপর হালাল ছিল, কিন্তু ইসরাঈল (আঃ) তার উপর যে জিনিস হারাম করে নিয়েছিল (ওটা তাদের উপর ও হারাম করা হয়েছে)। এর বিস্তারিত তাফসীর ইনশাআল্লাহ ওর স্থানে আসবে। সব মুসলমানই এতে একমত যে, আল্লাহর আহকামের মধ্যে নখ’ হওয়া বৈধ, বরং সংঘটিত হয়ে গেছে এবং ওতেই আল্লাহ তা'আলার পূর্ণ নৈপূণ্য প্রকাশ পেয়েছে।

মুফাসির আবু মুসলিম ইস্পাহানী লিখেছেন যে, কুরআনের মধ্যে নসখ’ সংঘটিত হয়নি। কিন্তু তার এই কথা দুর্বল। কুরআন মাজীদের যেখানে যেখানে নসখ’ বিদ্যমান রয়েছে ওর উত্তর দিতে গিয়ে যদিও তিনি বহু পরিশ্রম করেছেন, কিন্তু সবই বিফল হয়েছে। যে স্ত্রী লোকের স্বামী মারা যায় তার অন্যত্র বিয়ে সিদ্ধ হওয়ার জন্যে পূর্বে সময়কাল ছিল এক বছর। কিন্তু পরে এর জন্যে সময় করা হয়েছে চার মাস দশ দিন। এ দুটো আয়াতই কুরআন পাকের মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে।পূর্বে কিবলাহ ছিল বাইতুল মুকাদ্দাস। কিন্তু পরে পবিত্র কাবাকে কিবলাহ করা হয়েছে। দ্বিতীয় আয়াতটি স্পষ্ট এবং প্রথম আয়াতটিও আনুষঙ্গিকভাবে বর্ণিত হয়েছে।

পূর্বে মুসলমানদের উপর এই নির্দেশ ছিল যে,তারা এক একজন মুসলমান দশ জন কাফিরের মুকাবিলা করবে এবং পিছনে সরে আসবে না; কিন্তু পরে এ হুকুম মানসূখ হয়ে গিয়ে একজন মুসলমানকে দু’জন কাফিরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে এবং দুটি আয়াতই আল্লাহ তা'আলার কালামে বিদ্যমান রয়েছে।পূর্বে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সঙ্গে আলাপ করার আগে কিছু সাদকা করার নির্দেশ ছিল। পরে এটা মানসূখ করে দেয়া হয়। আর এ দুটি আয়াতই কুরআন কারীমের মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে। আল্লাহই সবচেয়ে বেশী জানেন।'

তাফসীর আবু বকর যাকারিয়া

আমরা কোন আয়াত রহিত করলে বা ভুলিয়ে দিলে তা থেকে উত্তম অথবা তার সমান কোন আয়াত এনে দেই [১] আপনি কি জানেন না যে, আল্লাহ্‌ সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান।

[১] এই আয়াতে কুরআনী আয়াত রহিত হওয়ার সম্ভাব্য সকল প্রকারই সন্নিবেশিত হয়েছে। অভিধানে “নস্‌খ” শব্দের অর্থ দূর করা, লেখা, স্থান পরিবর্তন করে অন্যত্র নিয়ে যাওয়া। আয়াতে ‘নস্‌খ’ শব্দ দ্বারা বিধি-বিধান দূর করা - অর্থাৎ রহিত করাকে বুঝানো হয়েছে। এ কারণেই হাদীস ও কুরআনের পরিভাষায় এক বিধানের স্থলে অন্য বিধান প্রবর্তন করাকে ‘নস্‌খ’ বলা হয়। ‘অন্য বিধান’ টি কোন বিধানের বিলুপ্তি ঘোষণাও হতে পারে, আবার এক বিধানের পরিবর্তে অপর বিধান প্রবর্তনও হতে পারে। [ইবনে কাসীর]

তাফসীর আল-কুরতুবী

[সূরা আল-বাকারা (২): আয়াত ১০৬] পূর্ণ পৃষ্ঠা

[সূরা আল-বাকারা (২): আয়াত ১০৫]আহলে কিতাবদের মধ্য থেকে যারা কুফরি করেছে তারা এবং মুশরিকরা চায় না যে, তোমাদের রবের পক্ষ থেকে তোমাদের নিকট কোনো কল্যাণ অবতীর্ণ হোক। অথচ আল্লাহ যাকে চান তাকেই নিজের রহমতের জন্য বিশেষভাবে মনোনীত করেন এবং আল্লাহ মহান অনুগ্রহের অধিকারী। (১০৫)মহান আল্লাহর বাণী: "চায় না" অর্থাৎ আকাঙ্ক্ষা করে না, আর এ সংক্রান্ত আলোচনা পূর্বে অতিক্রান্ত হয়েছে (১)। "আহলে কিতাবদের মধ্য থেকে যারা কুফরি করেছে এবং মুশরিকরা" - এখানে 'মুশরিকরা' শব্দটি 'আহলে কিতাব' শব্দের ওপর অন্বিত (আত্বফ) হয়েছে। তবে 'মুশরিকুনা' (পেশযুক্ত) পড়াও বৈধ, সেক্ষেত্রে এটি 'আল্লাজিনা' শব্দের ওপর অন্বিত হবে; এ কথা নাহহাস বলেছেন।

"তোমাদের নিকট কোনো কল্যাণ অবতীর্ণ হোক" - এখানে 'মিন' অব্যয়টি অতিরিক্ত, আর 'খাইরুন' শব্দটি কর্মবাচ্যের ক্রিয়ার কর্তা (নায়েবে ফায়িল)। আর 'আন' শব্দটি নসব বা কর্মের স্থলাভিষিক্ত, অর্থাৎ কল্যাণ অবতীর্ণ করার বিষয়টিকে। "আল্লাহ যাকে চান তাকেই নিজের রহমতের জন্য বিশেষভাবে মনোনীত করেন" - আলী ইবনে আবি তালিব (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন: "নিজের রহমতের জন্য বিশেষিত করেন" এর অর্থ হলো তাঁর নবুওয়াতের মাধ্যমে, যা তিনি মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে দিয়ে বিশেষিত করেছেন। অন্য একদল বলেছেন: রহমত অর্থ হলো কুরআন। আবার কেউ কেউ বলেছেন: এই আয়াতে রহমত শব্দটি আল্লাহর পক্ষ থেকে অতীতে ও বর্তমানে তাঁর বান্দাদের প্রতি প্রদত্ত সকল প্রকার অনুগ্রহের ক্ষেত্রে ব্যাপক অর্থবোধক।

বলা হয়ে থাকে: 'রাহিমা-ইয়ারহামু' যখন হৃদয় কোমল হয়। আর 'রুহম', 'মারহামাহ' এবং 'রাহমাহ' সমার্থক; এ কথা ইবনুল ফারিস বলেছেন। বান্দাদের প্রতি আল্লাহর রহমত হলো তাদের ওপর তাঁর নেয়ামত দান এবং তাদের প্রতি তাঁর ক্ষমা। "আর আল্লাহ মহান অনুগ্রহের অধিকারী" - এখানে 'যু' অর্থ অধিকারী বা মালিক। [সূরা আল-বাকারা (২): আয়াত ১০৬]আমি কোনো আয়াত রহিত করলে কিংবা তা বিস্মৃত করে দিলে আমি তার চেয়ে উত্তম কিংবা তার সমপর্যায়ের কোনো আয়াত নিয়ে আসি। তুমি কি জান না যে, আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান? (১০৬)এতে পনেরটি মাসআলা রয়েছে: প্রথম— মহান আল্লাহর বাণী: "আমি কোনো আয়াত রহিত করলে কিংবা তা বিস্মৃত করে দিলে"।

"তা বিস্মৃত করে দিলে" শব্দটি "রহিত করি" শব্দের ওপর অন্বিত হয়েছে এবং জজম (যতি) হওয়ার কারণে এর শেষাক্ষর 'ইয়া' বিলুপ্ত হয়েছে। আর যারা "নানসা'হা" (বিলম্বিত করি) পড়েছেন তারা জজমের কারণে হামজার পেশ বিলুপ্ত করেছেন; এর অর্থ সামনে আসবে। "আমরা নিয়ে আসি" হলো শর্তের উত্তর (জাওয়াবুস শারত)। এটি শরীয়তের বিধানাবলির ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আয়াত। এর প্রেক্ষাপট হলো— ইহুদিরা যখন মুসলমানদের কাবার দিকে মুখ ফিরিয়ে সালাত আদায়ের কারণে হিংসা পোষণ করল এবং এর মাধ্যমে ইসলামের সমালোচনা করে বলল: মুহাম্মদ তাঁর অনুসারীদের কোনো বিষয়ে আদেশ দেন আবার পরে তা থেকে নিষেধ করেন, সুতরাং এই কুরআন তাঁর নিজের পক্ষ থেকেই উদ্ভাবিত, আর একারণেই এর এক অংশ অন্য অংশের স্ববিরোধী।

তখন আল্লাহ তাআলা নাযিল করেন: "আর যখন আমি এক আয়াতের পরিবর্তে অন্য আয়াত স্থলাভিষিক্ত করি..." (২) এবং নাযিল করেন: "আমি কোনো আয়াত রহিত করলে..."।(১). এই খণ্ডের ৩৪ পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য।(২). দ্রষ্টব্য ১০ম খণ্ড, ১৭৬ পৃষ্ঠা।

তাফসীর আদ-দুররুল মানসূর

পূর্ণ পৃষ্ঠা

ইবনে জারীর, ইবনুল মুনযির এবং তাবারানী ইবনে মাসউদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলতেন: হে আল্লাহ! যদি আপনি আমাকে সৌভাগ্যবানদের তালিকায় লিখে থাকেন, তবে আমাকে সৌভাগ্যবানদের মধ্যেই বহাল রাখুন। আর যদি আপনি আমাকে দুর্ভাগাদের তালিকায় লিখে থাকেন, তবে সেখান থেকে আমার নাম মুছে দিন এবং আমাকে সৌভাগ্যবানদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করুন। কেননা আপনি যা ইচ্ছা তা মুছে দেন এবং যা ইচ্ছা বহাল রাখেন এবং আপনার নিকটেই রয়েছে মূল কিতাব।ইবনে জারীর কাব (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি ওমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-কে উদ্দেশ্য করে বলেন: হে আমিরুল মুমিনীন!

আল্লাহর কিতাবে যদি একটি আয়াত না থাকত, তবে আমি কিয়ামত পর্যন্ত যা কিছু ঘটবে তা আপনাকে জানিয়ে দিতাম।তিনি (ওমর) বললেন: সেটি কোন আয়াত? তিনি (কাব) বললেন: আল্লাহর বাণী— ‘আল্লাহ যা ইচ্ছা তা মুছে দেন এবং যা ইচ্ছা বহাল রাখেন এবং তাঁর নিকটেই রয়েছে মূল কিতাব’।ইবনে জারীর আদ-দাহহাক (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেন: আল্লাহ বলেন— আপনি যা ইচ্ছা রহিত করুন এবং আয়ুষ্কালের ব্যাপারে যা ইচ্ছা করুন; আপনি চাইলে তা বৃদ্ধি করতে পারেন আবার চাইলে হ্রাস করতে পারেন। ‘এবং তাঁর নিকটেই রয়েছে মূল কিতাব’—এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন: এটি হলো সামগ্রিক কিতাব ও তাঁর জ্ঞান, অর্থাৎ যা রহিত করা হয় এবং যা বহাল রাখা হয় তা সবই এতে বিদ্যমান।ইবনে জারীর, ইবনুল মুনযির, ইবনে আবি হাতেম এবং আল-বাইহাকী আল-মাদখাল গ্রন্থে ইবনে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে আল্লাহর বাণী— ‘আল্লাহ যা ইচ্ছা তা মুছে দেন এবং যা ইচ্ছা বহাল রাখেন’—এর ব্যাখ্যায় বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেন: আল্লাহ কুরআনের যা ইচ্ছা পরিবর্তন ও রহিত করেন এবং যা ইচ্ছা বহাল রাখেন যা আর পরিবর্তন করা হয় না।

‘এবং তাঁর নিকটেই রয়েছে মূল কিতাব’—এর ব্যাপারে তিনি বলেন: এর সামগ্রিক রূপ তাঁর নিকট মূল কিতাবে সংরক্ষিত; নাসিখ (রহিতকারী) ও মানসুখ (রহিত), যা পরিবর্তন করা হয় এবং যা বহাল রাখা হয়—সবই মহান আল্লাহর কিতাবে রয়েছে।ইবনে জারীর কাতাদাহ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে আল্লাহর বাণী— ‘আল্লাহ যা ইচ্ছা তা মুছে দেন এবং যা ইচ্ছা বহাল রাখেন’—প্রসঙ্গে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেন: এটি মহান আল্লাহর এই বাণীর অনুরূপ— ‘আমি যে আয়াতই রহিত করি কিংবা ভুলিয়ে দিই, আমি তার চেয়ে উত্তম অথবা তার সমতুল্য আয়াত নিয়ে আসি’ (সূরা আল-বাকারা, আয়াত ১০৬)। আর ‘এবং তাঁর নিকটেই রয়েছে মূল কিতাব’ অর্থাৎ সামগ্রিক কিতাব এবং তার মূল উৎস।ইবনে জারীর এবং ইবনে আবি হাতেম ইবনে যায়েদ থেকে এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বর্ণনা করেছেন যে, ‘আল্লাহ যা ইচ্ছা তা মুছে দেন’—অর্থাৎ নবীদের ওপর যা নাযিল করা হয় তার মধ্য থেকে; ‘এবং যা ইচ্ছা বহাল রাখেন’—অর্থাৎ নবীদের ওপর যা নাযিল করা হয় তার মধ্য থেকে যা তিনি ইচ্ছা করেন; ‘এবং তাঁর নিকটেই রয়েছে মূল কিতাব’—যা কখনো পরিবর্তন বা পরিমার্জন করা হয় না।ইবনে জারীর ইবনে জুরাইজ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, ‘আল্লাহ যা ইচ্ছা তা মুছে দেন’—এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন: অর্থাৎ রহিত করেন; ‘এবং তাঁর নিকটেই রয়েছে মূল কিতাব’—এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন: সেটি হলো আল-জিকর (মূল লিপি)।ইবনে আবি শায়বাহ, ইবনুল মুনযির এবং ইবনে আবি হাতেম ইকরিমা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে আল্লাহর বাণী— ‘আল্লাহ যা ইচ্ছা তা মুছে দেন এবং যা ইচ্ছা বহাল রাখেন’—এর ব্যাখ্যায় বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেন: আল্লাহ এক আয়াত দিয়ে অন্য আয়াত মুছে দেন (রহিত করেন)।

‘এবং তাঁর নিকটেই রয়েছে মূল কিতাব’—এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন: কিতাবের মূল ভিত্তি।ইবনে জারীর এবং ইবনে আবি হাতেম হাসান (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে আল্লাহর বাণী— ‘প্রত্যেক নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কিতাব (নির্ধারণ) রয়েছে’—এর ব্যাখ্যায় বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেন: বনী আদমের আয়ুষ্কাল একটি কিতাবে সংরক্ষিত। ‘আল্লাহ যা ইচ্ছা তা মুছে দেন’—অর্থাৎ যার মৃত্যুর সময় উপস্থিত হয়েছে তাকে; ‘এবং যা ইচ্ছা বহাল রাখেন’—অর্থাৎ যার মৃত্যুর সময় এখনো আসেনি, সে তার নির্ধারিত সময় পর্যন্ত জীবন অতিবাহিত করে।