Al-Baqarah
আল-বাকারা: 243
2 আল-বাকারা Al-Baqarah · 286 আয়াত البقرة
আরবি
۞ أَلَمْ تَرَ إِلَى ٱلَّذِينَ خَرَجُوا۟ مِن دِيَـٰرِهِمْ وَهُمْ أُلُوفٌ حَذَرَ ٱلْمَوْتِ فَقَالَ لَهُمُ ٱللَّهُ مُوتُوا۟ ثُمَّ أَحْيَـٰهُمْ ۚ إِنَّ ٱللَّهَ لَذُو فَضْلٍ عَلَى ٱلنَّاسِ وَلَـٰكِنَّ أَكْثَرَ ٱلنَّاسِ لَا يَشْكُرُونَ
English Translations
Have you not considered those who left their homes in many thousands, fearing death? Allāh said to them, "Die"; then He restored them to life. And Allāh is the possessor of bounty for the people, but most of the people do not show gratitude.
Did you (O Muhammad SAW) not think of those who went forth from their homes in thousands, fearing death? Allah said to them, "Die". And then He restored them to life. Truly, Allah is full of Bounty to mankind, but most men thank not.
Have you not seen those who left their homes, while they were in thousands, to escape death? So, Allah said to them, “Be dead.” Then He raised them alive. Surely, Allah is gracious to people, but most of the people are not grateful.
(O Messenger), have you thought of those who went forth from their homes for fear of death even though they were in their thousands? Allah said to them: “Die!” Then He restored them to life. Indeed Allah is Bounteous to mankind; but most people do not give thanks in return.
Bethink thee (O Muhammad) of those of old, who went forth from their habitations in their thousands, fearing death, and Allah said unto them: Die; and then He brought them back to life. Lo! Allah is a Lord of Kindness to mankind, but most of mankind give not thanks.
Didst thou not Turn by vision to those who abandoned their homes, though they were thousands (In number), for fear of death? Allah said to them: "Die": Then He restored them to life. For Allah is full of bounty to mankind, but Most of them are ungrateful.
বাংলা অনুবাদ
তুমি কি সেই লোকদের প্রতি লক্ষ্য করনি, যারা মৃত্যুকে এড়াবার জন্য নিজেদের ঘর থেকে হাজারে হাজারে বের হয়ে গিয়েছিল, তখন আল্লাহ তাদেরকে বললেন, ‘তোমাদের মৃত্যু হোক’। তৎপর তাদেরকে জীবিত করে উঠালেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ লোকেদের প্রতি দয়াশীল কিন্তু অধিকাংশ লোক শোকর করে না।
তুমি কি তাদেরকে দেখনি, যারা তাদের গৃহসমূহ থেকে বের হয়েছে মৃত্যুর ভয়ে এবং তারা ছিল হাজার-হাজার? অতঃপর আল্লাহ তাদেরকে বললেন, ‘তোমরা মরে যাও’! তারপর তিনি তাদেরকে জীবিত করলেন। নিশ্চয় আল্লাহ তো মানুষের উপর অনুগ্রহশীল। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ শুকরিয়া আদায় করে না।
তুমি কি তাদের প্রতি লক্ষ্য করনি, মৃত্যুর বিভীষিকাকে এড়ানোর জন্য যারা নিজেদের গৃহ হতে বহির্গত হয়েছিল? অথচ তারা ছিল বহু সহস্র; তখন আল্লাহ তাদেরকে বললেনঃ তোমরা মর; পুনরায় তিনি তাদেরকে জীবন দান করলেন; নিশ্চয়ই মানবগণের প্রতি আল্লাহ অনুগ্রহশীল, কিন্তু অধিকাংশ লোক কৃতজ্ঞতা স্বীকার করেনা।
আপনি কি তাদের দেখেন নি যারা মৃত্যুভয়ে হাজারে হাজারে স্বীয় আবাসাভুমি পরিত্যাগ করেছিল? অতঃপর আল্লাহ্ তাদেরকে বলেছিলেন, ‘তোমরা মরে যাও’। তারপর আল্লাহ্ তাদেরকে জীবিত করেছিলেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ মানুষের প্রতি অনুগ্রহশিল; কিন্তু অধিকাংশ লোক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না।
আপনি কি তাদের প্রতি লক্ষ করেননি যারা মৃত্যুর ভয়ে তাদের বাড়িঘর থেকে বের হয়ে পড়েছিল? আর তারা ছিল হাজার হাজার। তখন আল্লাহ তাদেরকে বললেন: তোমরা মরে যাও। অতঃপর তিনি তাদেরকে পুনরায় জীবিত করলেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ মানুষের প্রতি খুবই অনুগ্রহশীল; কিন্তু অধিকাংশ লোকই শুকরিয়া আদায় করে না।
২৪৩. হে নবী! আপনি কি ওদের বিষয়টি চিন্তা করে দেখেছেন? যারা অনেকেই মহামারী ইত্যাদির কারণে মৃত্যুর ভয়ে নিজেদের বাড়ি-ঘর ছেড়েছে। তারা ছিলো বনী ইসরাঈলের একটি গোষ্ঠী। তখন আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে বললেন: তোমরা মরে যাও। ফলে তারা মারা গেলো। অতঃপর তিনি আবার তাদেরকে জীবিত করলেন এ কথা জানানোর জন্য যে, সকল ব্যাপার একমাত্র আল্লাহ তা‘আলারই হাতে। নিশ্চয়ই তারা নিজেদের কোন লাভ-ক্ষতির মালিক নয়। নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা মানুষের উপর অত্যন্ত দয়াবান ও দানশীল। তবুও অধিকাংশ মানুষ তাঁর নিয়ামতের কোন কৃতজ্ঞতা আদায় করে না।
তাফসীর
২৪৩-২৪৫ নং আয়াতের তাফসীরহযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এই লোকগুলো সংখ্যায় চার হাজার ছিল। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, তারা ছিল আট হাজার। কেউ বলেন ন'হাজার, কেউ বলেন চল্লিশ হাজার এবং কেউ ত্রিশ হাজারের কিছু বেশী বলে থাকেন। এরা যাওয়ারদান' নামক গ্রামের অধিবাসী ছিল যা ওয়াসিতের দিকে রয়েছে। আবার কেউ কেউ বলেন যে, তারা আযরাআত নামক গ্রামের অধিবাসী ছিল। তারা প্লেগের ভয়ে নিজেদের গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিল। তারা একটি গ্রামে এসে উপস্থিত হলে আল্লাহর নির্দেশক্রমে সবাই মরে যায়। ঘটনাক্রমে একজন নবী সেখান দিয়ে গমন করেন। তাঁর প্রার্থনার ফলে আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে পুনর্জীবিত করেন। কেউ কেউ বলেন যে, তারা একটি জনশূন্য নির্মল বায়ুযুক্ত খোলা মাঠে অবস্থান করেছিল। অতঃপর তারা দু'জন ফেরেশতার চীৎকারে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। দীর্ঘদিন অতিবাহিত হওয়ার ফলে তাদের অস্থিগুলোও চুনে পরিণত হয়। সেই জায়গায় জনবসতি বসে যায়। একদা হিযকীল নামে বানী ইসরাঈলের একজন নবী সেখান দিয়ে গমন করেন। তিনি তাদের পুনর্জীবনের জন্যে প্রার্থনা করেন এবং আল্লাহ তার প্রার্থনা কবুল করেন। আল্লাহ তা'আলা নির্দেশ দেন : “তুমি বল- “হে গলিত অস্থিগুলো! আল্লাহ তাআলার নির্দেশক্রমে তোমরা একত্রিত হয়ে যাও। অতঃপর প্রত্যেক শরীরের অস্থির কাঠামো দাঁড়িয়ে গেল। এরপর তার উপর আল্লাহর নির্দেশ হলো : তুমি বলহে অস্থিগুলো! আল্লাহ তা'আলার নির্দেশক্রমে তোমরা গোত, শিরা ইত্যাদিও তোমাদের উপর মিলিয়ে নাও।' অতঃপর ঐ নবীর (আঃ) চোখের সামনে এটাও হয়ে গেল। এরপর তিনি আল্লাহর নির্দেশক্রমে আত্মাগুলোকে সম্বোধন করে বলেনঃ “হে আত্মাসমূহ! তোমরা আল্লাহ তাআলার হুকুমে পূর্বের নিজ নিজ দেহের ভিতর প্রবেশ কর। সঙ্গে সঙ্গে যেমন তারা এক সাথে সব মরে গিয়েছিল তেমনই সবাই এক সাথে জীবিত হয়ে গেল এবং স্বতস্ফূর্তভাবে তাদের মুখে উচ্চারিত হলোঃ (আরবি) অর্থাৎ আপনি পবিত্র। আপনি ছাড়া কেউ উপাস্য নেই।' কেয়ামতের দিন ঐ দেহের সঙ্গেই দ্বিতীয়বার আত্মার উত্থিত হওয়ার এটা দলীল।অতঃপর বলা হচ্ছে, মানুষের উপর আল্লাহ তা'আলার বড় অনুগ্রহ রয়েছে। যে, তিনি মহাশক্তির বড় বড় নিদর্শনাবলী তাদেরকে প্রদর্শন করছেন। কিন্তু এটা সত্ত্বেও অধিকাংশ লোক মহান আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছে না। এর দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, আল্লাহ ছাড়া প্রাণ রক্ষা ও আশ্রয় লাভের অন্য কোন উপায় নেই। ঐ লোকগুলো প্লেগের ভয়ে পলায়ন করছিল এবং ইহলৌকিক জীবনের প্রতি লোভী ছিল, তাই তাদের প্রতি আল্লাহর শাস্তি এসে যায় এবং তার ধ্বংস হয়ে যায়। মুসনাদ-ই-আহমাদের মধ্যে হাদীস রয়েছে যে, যখন উমার (রাঃ) সিরিয়ার দিকে গমন করেন এবং সারাবা নামক স্থানে পৌছেন তখন হযরত আবু ওবাইদাহ বিন জাররাহ (রাঃ) প্রভৃতি সেনাপতিদের সাথে তার সাক্ষাৎ ঘটে। তাঁরা তাঁকে সংবাদ দেন যে, সিরিয়ায় আজকাল প্লেগ রোগ রয়েছে। এখন তারাও তথায় যাবেন কি যাবেন না এই নিয়ে তাঁদের মধ্যে মতভেদ সৃষ্টি হয়। অবশেষে হযরত আবদুর রহমান বিন আউফ (রাঃ) এসে তাদের সাথে মিলিত হন এবং বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছি : যখন এমন জায়গায় প্লেগ ছড়িয়ে পড়ে যেখানে তোমরা অবস্থান করছে তখন তোমরা তার ভয়ে পলায়ন করো না। আর যখন তোমরা কোন জায়গায় বসে থাকার সংবাদ শুনতে পাও তখন তোমরা তথায় যেও না।' হযরত উমার ফারূক (রাঃ) একথা শুনে আল্লাহর প্রশংসা করতঃ তথা হতে ফিরে যান (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম)।অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছেঃ “এটা আল্লাহর শাস্তি যা পূর্ববর্তী উম্মতদের উপর অবতীর্ণ করা হয়েছিল। অতঃপর বলা হচ্ছেঃ “ঐ লোকদের পলায়ন যেমন তাদেরকে মৃত্যু হতে রক্ষা করতে পারলো না দ্রুপ তোমাদেরও যুদ্ধ হতে মুখ ফিরিয়ে নেয়া বৃথা। মৃত্যু ও আহার্য দু'টোই ভাগ্যে নির্ধারিত হয়ে রয়েছে। নির্ধারিত আহার্য বাড়বেও না কমবেও না।, দ্রুপ মৃত্যুও নির্ধারিত সময়ের পূর্বেও আসবে না বা পিছনেও সরে যাবে না। অন্য জায়গায় রয়েছে : যারা আল্লাহর পথ হতে সরে পড়েছে এবং তাদের সঙ্গীদেরকেও বলছে এই যুদ্ধে শহীদগণও যদি আমাদের অনুসরণ করতো তবে তারাও নিহত হতো না। তাদেরকে বলে দাও- তোমরা যদি সত্যবাদী হও তবে তোমাদের নিজেদের জীবন হতে মৃত্যুকে সরিয়ে দাও তো:অন্য স্থানে রয়েছে : তারা বলে-হে আমাদের প্রভু! আমাদের উপর যুদ্ধ ফরয করেছেন কেন: কেন আমাদেরকে সামান্য কিছু দিনের জন্যে অবসর দিলেন না: তুমি বল-ইহলৌকিক জগতের পুঁজি সামান্য এবং যে আল্লাহকে ভয় করে তার জন্যে পরকালই উত্তম এবং তোমরা এতটুকুও অত্যাচারিত হবে না।' অন্যত্র রয়েছে। তোমাদেরকে মৃত্যু পেয়ে যাবেই যদিও তোমরা উচ্চতম শিখরে অবস্থান কর।' এস্থলে ইসলামী সৈনিকদের উদ্যমশীল নেতা, বীর পুরুষদের অগ্রগামী, আল্লাহর তরবারী এবং ইসলামের আশ্রয়স্থল আবূ সুলাইমান হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদের (রাঃ) ঐ উক্তি উদ্ধৃত করা সম্পূর্ণ সময়গাপযোগী হবে যা তিনি ঠিক মৃত্যুর সময় বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন ও মৃত্যুকে ভয়কারী, যুদ্ধক্ষেত্র হতে পলায়নকারী কাপুরুষের দল কোথায় রয়েছে: তারা দেখুক যে, আমার গ্রন্থীসমূহ আল্লাহর পথে আহত হয়েছে। দেহের কোন জায়গা এমন নেই যেখানে তীর, তরবারী, বর্শা ও বল্লমের আঘাত লাগেনি। কিন্তু দেখ যে, আমি যুদ্ধক্ষেত্রে না থেকে বিছানায় পড়ে মৃত্যুবরণ করছি।অতঃপর বিশ্বপ্রভু তাঁর বান্দাদেরকে তাঁর পথে খরচ করার উৎসাহ দিচ্ছেন। এরূপ উৎসাহ তিনি স্থানে স্থানে দিয়েছেন। হাদীস-ই-নযুলেও রয়েছে : ‘কে এমন আছে যে, সেই আল্লাহকে ঋণ প্রদান করবে যিনি না দরিদ্র, না অত্যাচারী: (আরবি) (২:২৪৫) এই আয়াতটি শুনে হযরত আবুদ দাহ্দাহ আনসারী (রাঃ) বলেছিলেন : হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ‘আল্লাহ্ কি আমাদের নিকট ঋণ চাচ্ছেন:' তিনি বলেন 'হাঁ'। হযরত আবুদ দাহ্দাহ্ তখন বলেনঃ আমাকে আপনার হাত খানা দিন। অতঃপর তিনি তার হাতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হাত নিয়ে বলেনঃ আমি আমার ছয়শো খেজুর বৃক্ষ বিশিষ্ট বাগানটি আমার সর্বশ্রেষ্ঠ মহান সম্মানিত প্রভুকে ঋণ প্রদান করলাম। সেখান হতে সরাসরি তিনি বাগানে আগমন করেন এবং স্ত্রীকে ডাক দেন : “হে উম্মুদ্দাহ্দাহ্!' স্ত্রী উত্তরে বলেনঃ আমি উপস্থিত রয়েছি। তখন তিনি তাকে বলেনঃ “তুমি বেরিয়ে এসো। আমি এই বাগানটি আমার মহা সম্মানিত প্রভুকে ঋণ দিয়েছি (তাফসীর-ই-ইবনে আবি হাতীম)। কর-ই-হাসানা’-এর ভাবার্থ আল্লাহ তা'আলার পথেও খরচ হবে, সন্তানদের জন্যেও খরচ হবে এবং আল্লাহ তা'আলার পবিত্রতাও বর্ণনা করা হবে।অতঃপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “আল্লাহ তা দ্বিগুণ চারগুণ করে দেবেন'। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ আল্লাহর পথে ব্যয়কারীর দৃষ্টান্ত ঐ শস্য বীজের ন্যয় যার সাতটি শীষ বের হয়ে থাকে এবং প্রত্যেক শীষে একশটি করে দানা থাকে এবং আল্লাহ্ যাকে ইচ্ছে করেন তার চেয়েও বেশী দিয়ে থাকেন। এই আয়াতের তাফসীর ইনশাআল্লাহ অতি সত্ত্বরই আসছে। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ)-কে হযরত আবু উসমান নাহদী (রঃ) জিজ্ঞেস করেনঃ ‘আমি শুনেছি যে,আপনি বলেনঃ “ এক একটি পুণ্যের বিনিময়ে এক লক্ষ পুণ্য পাওয়া যায়। (এটা কি সত্য):' তিনি বলেনঃ ‘এতে তুমি কি বিস্ময়বোধ করছো: আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ) -এর নিকট শুনেছিঃ একটি পুণ্যের বিনিময়ে দু’লক্ষ পূণ্য পাওয়া যায় (মুসনাদ-ই-আহমাদ)। কিন্তু এই হাদীসটি গরীব।তাফসীর-ই-ইবনে আবি হাতীম গ্রন্থে রয়েছে, হযরত আবু উসমান নাহদী বলেনঃ হযরত আবু হুরাইরার (রাঃ) খিদমতে আমার চেয়ে বেশী কেউ থাকতেন না। তিনি হজ্বে গমন করলে তার পিছনে আমিও গমন করি। আমি বসরায় গিয়ে শুনতে পাই যে, জনগণ হযরত আবু হুরাইরার (রাঃ) উদ্ধৃতি দিয়ে উপরোক্ত হাদীসটি বর্ণনা করছেন। তাদেরকে আমি বলিঃ ‘আল্লাহর শপথ! আমিই সবচেয়ে বেশী তাঁর সাহচর্যে থেকেছি। আমি কখনও তাঁর নিকট এই হাদীসটি শুনিনি।'অতঃপর আমার ইচ্ছে হলো যে, স্বয়ং আবু হুরাইরা (রাঃ)-কে আমি জিজ্ঞেস করবো। আমি তথা হতে এখানে চলে আসি। এসে জানতে পারি যে, তিনি হজে চলে গেছেন। আমি শুধুমাত্র একটি হাদীসের জন্যে মক্কা চলে আসি। তথায় তাঁর সাথে আমার সাক্ষাৎ ঘটে। আমি তাঁকে বলিঃ জনাব! বসরাবাসী আপনার উদ্ধৃতি দিয়ে এটা কিরূপ বর্ণনা দিচ্ছে:' তিনি বলেনঃ ‘এতে বিস্ময়ের কি আছে:' অতঃপর এই আয়াতটি পাঠ করেন এবং বলেনঃ সাথে সাথে আল্লাহ তা'আলার এই কথাটিও পড়ঃ(আরবি)অর্থাৎ ইহলৌকিক জীবনের আসবাবপত্র পরকালের তুলনায় অতি নগণ্য। (৯:৩৮) আল্লাহর শপথ! আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট শুনেছি যে, একটি পুণ্যের বিনিময়ে আল্লাহ তা'আলা দু’লক্ষ পুণ্য দান করে থাকেন।জামেউত্ তিরমিযীর মধ্যে এই বিষয়ের নিম্নের হাদীসটিও রয়েছে : যে ব্যক্তি বাজারে গিয়ে (আরবি)অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া কেউ উপাস্য নেই, তিনি এক,তাঁর কেউ অংশীদার নেই, তার জন্যে সাম্রাজ্য ও তাঁর জন্যেই প্রশংসা এবং তিনি প্রত্যেক বস্তুর উপর ক্ষমতাবান- এ দু'আটি পাঠ করে, আল্লাহ তার জন্যে এক লাখ পুণ্য লিখেন এবং এক লাখ পাপ ক্ষমা করে দেন। তাফসীর-ই-ইবনে আবি হাতীম গ্রন্থে রয়েছে(আরবি) এই আয়াতটি যখন অবতীর্ণ হয় তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) প্রার্থনা করেন: হে আল্লাহ! আমার উম্মতকে আরও বেশী দান করুন। অতঃপর (আরবি) এই আয়াতটি যখন অবতীর্ণ হয় তখনও তিনি এই প্রার্থনাই করেন। তখন (আরবি) অর্থাৎ “নিশ্চয় ধৈর্যশীলদেরকে তাদের প্রতিদান পূর্ণভাবে ও অপরিমিতভাবে দেয়া হবে’ (৩৯:১০) -এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। হযরত কা'ব বিন আহবর (রাঃ)-কে এক ব্যক্তি বলেনঃ আমি এক ব্যক্তির নিকট শুনেছি যে, যে ব্যক্তি সূরা-ই (আরবি) একবার পাঠ করে তার জন্যে বেহেশতে দশ লক্ষ অট্টালিকা তৈরি হয়, এটা কি সত্য:' তিনি বলেনঃ ‘এতে বিস্ময়বোধ করার কি আছে: বরং বিশ লক্ষ, ত্রিশ লক্ষ এবং আরও এত বেশী যে, ওগুলো একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কেউ গণনা করতে পারে না।' অতঃপর তিনি এই আয়াতটি পাঠ করে বলেনঃ ‘আল্লাহ তা'আলা যখন (আরবি) অর্থাৎ বহু গুণ’ বলেছেন তখন তা গণনা করা মানুষের ক্ষমতার মধ্যে কি করে থাকতে পারে:' অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন- “আহার্যের হ্রাস ও বৃদ্ধি আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকেই হয়ে থাকে। আল্লাহর পথে খরচ করাতে কার্পণ্য করো না। যাকে তিনি বেশী দিয়েছেন তার মধ্যেও যুক্তিসঙ্গতা রয়েছে এবং যাকে দেননি তার মধ্যেও দুরদর্শিতা রয়েছে। তোমরা সবাই কিয়ামতের দিন তার নিকট প্রত্যাবর্তীত হবে।
আপনি কি তাদের দেখেন নি যারা মৃত্যুভয়ে হাজারে হাজারে স্বীয় আবাসাভুমি পরিত্যাগ করেছিল? [১] অতঃপর আল্লাহ্ তাদেরকে বলেছিলেন, ‘তোমরা মরে যাও’। তারপর আল্লাহ্ তাদেরকে জীবিত করেছিলেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ মানুষের প্রতি অনুগ্রহশিল; কিন্তু অধিকাংশ লোক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না। [২]
[১] বিভিন্ন বর্ণনায় এসেছে, কোন এক শহরে ইসরাঈল-বংশধরের কিছু লোক বাস করত। তাদের সংখ্যা ছিল প্রায় দশ হাজার। সেখানে এক মারাত্মক সংক্রামক ব্যাধির প্রাদুর্ভাব হয়। তারা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে সে শহর ত্যাগ করে দুটি পাহাড়ের মধ্যবর্তী এক প্রশস্ত ময়দানে গিয়ে বসবাস করতে লাগল। আল্লাহ্ তা'আলা তাদের কাছে দু’জন ফেরেশ্তা পাঠালেন তাদেরকে এবং দুনিয়ার অন্যান্য জাতিকে একথা অবগত করানোর জন্য যে, মৃত্যুর ভয়ে পালিয়ে গিয়ে কেউ রক্ষা পেতে পারে না। ফেরেশ্তা দু’জন ময়দানের দু’ধারে দাঁড়িয়ে এমন এক বিকট শব্দ করলেন যে, তাদের সবাই একসাথে মরে গেল। দীর্ঘকাল পর ইসরাঈল-বংশধরদের একজন নবী সেখান দিয়ে যাওয়ার পথে সেই বন্ধ জায়গায় বিক্ষিপ্ত অবস্থায় হাড়-গোড় পড়ে থাকতে দেখে বিস্মিত হলেন। তখন ওহীর মাধ্যমে তাকে মৃত লোকদের সমস্ত ঘটনা অবগত করানো হল। তখন তিনি দোআ করলেন এবং আল্লাহ্ তাদেরকে জীবিত করে দিলেন। [ইবনে কাসীর]
এ ঘটনাটি দুনিয়ার সমস্ত চিন্তাশীল বুদ্ধিজীবীকে সৃষ্টিবলয় সম্পর্কিত চিন্তা-ভাবনার ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্তের সন্ধান দেয়। তদুপরি এটা কেয়ামত অস্বীকারকারীদের জন্য একটা অকাট্য প্রমাণ হওয়ার সাথে সাথে এ বাস্তব সত্য উপলব্ধি করার পক্ষেও বিশেষ সহায়ক যে, মৃত্যুর ভয়ে পালিয়ে থাকা তা জিহাদ হোক বা প্লেগ মহামারীই হোক, আল্লাহ্ এবং তাঁর নির্ধারিত নিয়তি বা তাকদীরের প্রতি যারা বিশ্বাসী তাদের পক্ষে সমীচীন নয়। যার এ বিশ্বাস রয়েছে যে, মৃত্যুর একটা নির্ধারিত সময় রয়েছে, নির্ধারিত সময়ের এক মুহুর্ত পূর্বেও তা হবে না এবং এক মূহুর্ত পরেও তা আসবে না, তাদের পক্ষে এরূপ পলায়ন অর্থহীন এবং আল্লাহ্র অসন্তুষ্টির কারণ।
[২] এ আয়াত কয়েকটি বিষয়ের সমাধান করে দিয়েছে। প্রথমতঃ আল্লাহ্র নির্ধারিত তাকদীরের উপর কোন তদবীর কার্যকর হতে পারে না। জিহাদ বা মহামারীর ভয়ে পালিয়ে গিয়ে প্রাণ বাঁচানো যায় না, আর মহামারীগ্রস্ত স্থানে অবস্থান করাও মৃত্যুর কারণ হতে পারে না। মৃত্যুর একটি সুনির্দিষ্ট সময় রয়েছে, যার কোন ব্যতিক্রম হওয়ার নয়। দ্বিতীয়তঃ কোনখানে কোন মহামারী কিংবা কোন মারাত্মক রোগ-ব্যাধি দেখা দিলে সেখান থেকে পালিয়ে অন্যত্র আশ্রয় নেয়া বৈধও নয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু '‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এরশাদ মোতাবেক অন্য এলাকার লোকের পক্ষেও মহামারীগ্রস্ত এলাকায় যাওয়া বৈধ নয়। হাদীসে বলা হয়েছেঃ ‘সে রোগের মাধ্যমে আল্লাহ্ তা'আলা তোমাদের পূর্ববতী বিভিন্ন উম্মতের উপর আযাব নাযিল করেছেন। সুতরাং যখন তোমরা শুনবে যে, কোন শহরে প্লেগ প্রভৃতি মহামারী দেখা দিয়েছে, তখন সেখানে যেও না। আর যদি কোন এলাকাতে এ রোগ দেখা দেয় এবং তুমি সেখানেই থাক, তবে সেখান থেকে পলায়ন করবে না’। [বুখারী: ৩৪৭৩, মুসলিম: ২২১৮]
ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস হচ্ছে এই যে, ‘কোথাও যাওয়া মৃত্যুর কারণ হতে পারে না, আবার কোনখান থেকে পালিয়ে যাওয়াও মৃত্যুর হাত থেকে রেহাই পাওয়ার উপায় নয়'। এ মৌলিক বিশ্বাসের পাশাপাশি আলোচ্য নির্দেশটি নিঃসন্দেহে বিশেষ তাৎপর্যপূণ।
প্রথমতঃ মহামারীগ্রস্ত এলাকার বাইরের লোককে আসতে নিষেধ করার একটি তাৎপর্য এই যে, এমনও হতে পারে যে, সেখানে গমন করার পর তার হায়াত শেষ হওয়ার দরুনই এ রোগে আক্রান্ত হয়ে সে মৃত্যুবরণ করলঃ এতদসত্ত্বেও আক্রান্ত ব্যক্তির মনে এমন ধারণা হতে পারে যে, সেখানে না গেলে হয়ত সে মারা যেত না। তাছাড়া অন্যান্য লোকেরও হয়ত এ ধারণাই হবে যে, এখানে না এলে মৃত্যু হত না। অথচ যা ঘটেছে তা পূর্বেই নির্ধারিত ছিল। যেখানেই থাকত, তার মৃত্যু এ সময়েই হত ! এ আদেশের মাধ্যমে মুসলিমদেরকে ঈমানের ব্যাপারে সন্দেহসংশয় থেকে রক্ষা করা হয়েছে। যাতে করে তারা কোন ভুল বোঝাবুঝির শিকার না হয়।
দ্বিতীয়তঃ এতে আল্লাহ্ তা'আলা মানুষকে উপদেশ দিয়েছেন যে, যেখানে কষ্ট হওয়ার বা মৃত্যুর আশংকা থাকে, সেখানে যাওয়া উচিত নয়; বরং সাধ্যমত ঐসব বস্তু থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করা কর্তব্য, যা তার জন্য ধ্বংস বা ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাছাড়া নিজের জানের হেফাযত করা প্রত্যেক মানুষের জন্য ওয়াজিব ঘোষণা করা হয়েছে। এ নিয়মের চাহিদাও তাই যে, আল্লাহ্র দেয়া তাকদীরে পূর্ণ বিশ্বাস রেখে যথাসাধ্য সতর্কতামূলক ব্যবস্থা অবলম্বন করতে হবে। যেসব স্থানে প্রাণ নাশের আশংকা থাকে, সেসব স্থানে না যাওয়াও এক প্রকার সতর্কতামূলক তদবীর। এমনিভাবে সংশ্লিষ্ট এলাকার লোকদেরকে সে স্থান থেকে পলায়ন করতে নিষেধ করার মাঝেও বহু তাৎপর্য নিহিতঃ একটি হচ্ছে এই যে, যদি এ পলায়নের প্রথা চলতে থাকে, তবে সাধারণভাবে ও সমষ্টিগতভাবে সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যারা সক্ষম ও সবল তারা তো সহজেই পালাতে পারে, কিন্তু যারা দুর্বল তাদের কি অবস্থা হবে? আর যারা রোগাক্রান্ত, তাদের সেবা-শুশ্রুষা কিংবা মরে গেলে দাফন-কাফনেরই বা কি ব্যবস্থা হবে? দ্বিতীয়তঃ যারা সেখানে ছিল, তাদের মধ্যে হয়ত রোগের জীবাণু প্রবেশ করে থাকবে। এমতাবস্থায় তারা যদি বাড়ী-ঘর থেকে বের হয়ে থাকে, তবে তাদের দুঃখ-দুর্দশা আরও বেড়ে যাবে। কারণ প্রবাস জীবনে রোগাক্রান্ত হলে যে কি অবস্থা তা সবারই জানা। তৃতীয়তঃ যদি তাদের মধ্যে রোগের জীবাণু ক্রিয়া করে থাকে, তবে তা বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়বে। আর যদি নিজের জায়গায় আল্লাহ্র উপর ভরসা করে পড়ে থাকে, তবে হয়ত নাজাত পেতে পারে। আর যদি এ রোগে মারা যাওয়াই তার ভাগ্যে থাকে, তবে ধৈর্য ও স্থিরতা অবলম্বনের বদলায় শহীদের মর্যাদা লাভ করবে। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্লেগ মহামারী সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বলেছেন, "এ রোগটি আসলে শাস্তিরূপে নাযিল হয়েছিল এবং যে জাতিকে শাস্তি দেয়া উদ্দেশ্য হত তাদের ভেতর পাঠানো হত। অতঃপর আল্লাহ্ তাআলা একে মুমিনদের জন্য রহমতে পরিবর্তিত করে দিয়েছেন। আল্লাহ্র যেসব বান্দা এ রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়া সত্বেও নিজ এলাকায়ই ধৈর্য সহকারে বসবাস করে এবং এ বিশ্বাস রাখে যে, তার শুধু সে বিপদই হতে পারে, যা আল্লাহ্ তা'আলা তার জন্য লিখে রেখেছেন, তবে এমন ব্যক্তি শহীদের মত সওয়াব পাবে’ [বুখারীঃ ৫৭৩৪]
রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণীঃ ‘প্লেগ শাহাদাত এবং প্লেগ আক্রান্ত ব্যক্তি শহীদ’ [বুখারীঃ ৫৭৩২] এর ব্যাখ্যাও তাই। [মাআরিফুল কুরআন থেকে সংক্ষেপিত ও পরিমার্জিত]
