Al-Baqarah

আল-বাকারা: 197

2:197

আরবি

ٱلْحَجُّ أَشْهُرٌ مَّعْلُومَـٰتٌ ۚ فَمَن فَرَضَ فِيهِنَّ ٱلْحَجَّ فَلَا رَفَثَ وَلَا فُسُوقَ وَلَا جِدَالَ فِى ٱلْحَجِّ ۗ وَمَا تَفْعَلُوا۟ مِنْ خَيْرٍ يَعْلَمْهُ ٱللَّهُ ۗ وَتَزَوَّدُوا۟ فَإِنَّ خَيْرَ ٱلزَّادِ ٱلتَّقْوَىٰ ۚ وَٱتَّقُونِ يَـٰٓأُو۟لِى ٱلْأَلْبَـٰبِ

English Translations

Sahih International

Ḥajj is [during] well-known months, so whoever has made ḥajj obligatory upon himself therein [by entering the state of iḥrām], there is [to be for him] no sexual relations and no disobedience and no disputing during ḥajj. And whatever good you do - Allāh knows it. And take provisions, but indeed, the best provision is fear of Allāh. And fear Me, O you of understanding.

Muhsin Khan

The Hajj (pilgrimage) is (in) the well-known (lunar year) months (i.e. the 10th month, the 11th month and the first ten days of the 12th month of the Islamic calendar, i.e. two months and ten days). So whosoever intends to perform Hajj therein by assuming Ihram), then he should not have sexual relations (with his wife), nor commit sin, nor dispute unjustly during the Hajj. And whatever good you do, (be sure) Allah knows it. And take a provision (with you) for the journey, but the best provision is At-Taqwa (piety, righteousness, etc.). So fear Me, O men of understanding!

Taqi Usmani

The Hajj is (to be performed in) the months that are well-known. So whoever undertakes Hajj in them, there should be no obscenity, no sin, no quarrel in the Hajj. Whatever good you do, Allah will know it. Take provisions along, for the merit of (having) provision is to abstain (from begging), and fear Me, O men of understanding!

Abul Ala Maududi

The months of Hajj are well known. Whoever intends to perform Pilgrimage in these months shall abstain from sensual indulgence, wicked conduct and quarrelling; and whatever good you do, Allah knows it. Take your provisions for the Pilgrimage; but, in truth, the best provision is piety. Men of understanding, beware of disobeying Me.

Pickthall

The pilgrimage is (in) the well-known months, and whoever is minded to perform the pilgrimage therein (let him remember that) there is (to be) no lewdness nor abuse nor angry conversation on the pilgrimage. And whatsoever good ye do Allah knoweth it. So make provision for yourselves (Hereafter); for the best provision is to ward off evil. Therefore keep your duty unto Me, O men of understanding.

Yusuf Ali

For Hajj are the months well known. If any one undertakes that duty therein, Let there be no obscenity, nor wickedness, nor wrangling in the Hajj. And whatever good ye do, (be sure) Allah knoweth it. And take a provision (With you) for the journey, but the best of provisions is right conduct. So fear Me, o ye that are wise.

বাংলা অনুবাদ

তাইসিরুল কুরআন

হাজ্জ হয় কয়েকটি নির্দিষ্ট মাসে, অতঃপর এ মাসগুলোতে যে কেউ হাজ্জ করার মনস্থ করবে, তার জন্য হাজ্জের মধ্যে স্ত্রী সম্ভোগ, অন্যায় আচরণ ও ঝগড়া-বিবাদ বৈধ নয় এবং তোমরা যে কোন সৎ কাজই কর, আল্লাহ তা জানেন এবং তোমরা পাথেয়ের ব্যবস্থা করবে আর তাক্বওয়াই শ্রেষ্ঠ পাথেয়। হে জ্ঞানী সমাজ! আমাকেই ভয় করতে থাক।

রাওয়াই আল-বায়ান

হজের সময় নির্দিষ্ট মাসসমূহ। অতএব এই মাসসমূহে যে নিজের উপর হজ আরোপ করে নিল, তার জন্য হজে অশ্লীল ও পাপ কাজ এবং ঝগড়া-বিবাদ বৈধ নয়। আর তোমরা ভাল কাজের যা কর, আল্লাহ তা জানেন এবং পাথেয় গ্রহণ কর। নিশ্চয় উত্তম পাথেয় তাকওয়া। আর হে বিবেক সম্পন্নগণ, তোমরা আমাকে ভয় কর।

শাইখ মুজিবুর রহমান

হাজ্জের মাসগুলি সুবিদিত। কেহ যদি ঐ মাসগুলির মধ্যে হাজ্জের সংকল্প করে তাহলে সে হাজ্জের সময়ে সহবাস, দুস্কার্য ও কলহ করতে পারবেনা এবং তোমরা যে কোন সৎ কাজ করনা কেন আল্লাহ তা জ্ঞাত আছেন। আর তোমরা তোমাদের সাথে পাথেয় নিয়ে নাও। বস্ত্ততঃ উৎকৃষ্ট পাথেয় হচ্ছে তাকওয়া বা আত্মসংযম। সুতরাং হে জ্ঞানবানগণ! আমাকে ভয় কর।

ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

হজ হয় সুবিদিত মাসগুলোতে। তারপর যে কেউ এ মাসগুলোতে হজ করা স্থির করে সে হজের সময় স্ত্রী-সম্ভোগ, অন্যায় আচরণ, ও কলহ-বিবাদ করবে না। আর তোমরা উত্তম কাজ থেকে যা-ই কর আল্লাহ্‌ তা জানেন আর তোমরা পাথেয় সংগ্রহ কর। নিশ্চয় সবচেয়ে উত্তম পাথেয় হচ্ছে তাকওয়া। হে বোধসম্পন্ন ব্যক্তিগণ ! তোমরা আমারই তাকওয়া অবলম্বন কর ।

ফাতহুল মাজীদ

হজ্জের মাসগুলো নির্ধারিত; অতএব কেউ যদি ঐ মাসগুলোর সময় হজ্জের সংকল্প করে, তবে সে হজ্জের মধ্যে সহবাস, দুষ্কার্য ও ঝগড়া করতে পারবে না এবং তোমরা যে কোন সৎ কর্ম কর না কেন আল্লাহ তা জানেন। আর তোমরা (নিজেদের) পাথেয় সঞ্চয় করে নাও; বস্তুতঃ নিশ্চিত উৎকৃষ্টতম পাথেয় হচ্ছে আল্লাহভীতি। আর হে জ্ঞানীগণ! তোমরা আমাকে ভয় কর।

মুখতাসার

১৯৭. হজ্জের সময় হলো মূলতঃ গুটি কয়েক মাস। যা শাওয়াল মাসে শুরু হয়ে যিল-হজ্জের দশ তারিখে শেষ হয়। সুতরাং কেউ যদি এ মাসগুলোতে নিজের উপর হজ্জকে বাধ্যতামূলক করে নিয়ে ইহরাম বেঁধে ফেলে তাহলে তার জন্য স্ত্রী সহবাস ও তার আনুষঙ্গিক বিষয়গুলো নিষিদ্ধ। তেমনিভাবে তার জন্য সময় ও স্থানের গুরুত্বের দরুন আল্লাহর আনুগত্য থেকে বের হয়ে এসে যে কোন পাপে লিপ্ত হওয়া সমধিকভাবে নিষিদ্ধ। অনুরূপভাবে তার জন্য এমন তর্কও হারাম যা রাগ ও ঝগড়া পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দেয়। তোমরা যে কল্যাণের কাজগুলো করো তা সবই আল্লাহ জানেন এবং তিনি তার প্রতিদান দিবেন। আর তোমরা হজ্জকর্ম আদায়ের জন্য নিজ ঘর থেকে প্রয়োজনীয় খাদ্য-পানীয় নিয়ে বের হবে। জেনে রাখো, তোমাদের যে কোন কাজের সর্বোত্তম প্রেরণা হলো একমাত্র আল্লাহভীরুতা। তাই হে সুস্থ বিবেকবানরা! তোমরা আমার আদেশ-নিষেধ মানার মাধ্যমে আমাকেই ভয় করো।

তাফসীর

তাফসীর ইবনে কাসীর

আরবী ভাষাবিদগণ বলেন যে, প্রথম বাক্যটির ভাবার্থ হচ্ছে-হজ্ব হলো ঐ মাসগুলোর হজ্ব যা সুবিদিত ও নির্দিষ্ট। সুতরাং হজ্বের মাসগুলোতে ইহরাম বাঁধা অন্যান্য মাসে ইহরাম বাঁধা হতে বেশী পূর্ণতা প্রদানকারী। তবে অন্যান্য মাসের ইহরামও সঠিক। ইমাম মালিক (রঃ), ইমাম আবু হানীফা (রাঃ), ইমাম আহমাদ (রঃ), ইমাম ইবরাহীম নাখঈ (রাঃ), ইমাম সাওরী (রঃ) ও ইমাম লায়েস (রঃ) বলেন যে, বছরের যে কোন মাসে ইহরাম বাঁধা যেতে পারে। তাদের দলীল (আরবি) এই আয়াতটি। অর্থাৎ '(হে নবী সঃ!) তারা তোমাকে নব চন্দ্ৰসমূহ সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করছে; তুমি বল-এগুলো হচ্ছে জনসমাজের উপকারের জন্যে ও হজ্বের জন্যে সময় নিরূপক। (২:১৮৯) (আরবি) তাঁদের দ্বিতীয় দলীল হচ্ছে এই যে, হজ্ব ও উমরাহ এ দু’টোকেই বলা হয়েছে, আর উমরাহর ইহরাম প্রত্যেক মাসেই বাঁধা যায়; সুতরাং হজ্বের ইহরামও প্রত্যেক মাসেই বাঁধা যাবে। তবে হযরত ইমাম শাফিঈ (রঃ) বলেন যে, হজ্বের ইহরাম শুধুমাত্র হজ্বের মাসগুলোতেই বাঁধতে হবে এবং অন্যান্য মাসে ইহরাম বাধলৈ তা সঠিক হবে না। কিন্তু ওর দ্বারা উমরাহও হতে পারে কিনা এ সম্বন্ধে তার দুটি উক্তি রয়েছে।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত জাবির (রাঃ), হযরত আতা’ (রঃ) এবং হযরত মুজাহিদেরও (রঃ) এটাই মাযহাব যে, হজ্বের ইহরাম হজের মাস ছাড়া অন্যান্য মাসে বাধা সঠিক নয়। তাদের দলীল হচ্ছে (আরবি) এই আয়াতটি। আরবী ভাষাবিদগণের আর একটি দলের মতে আয়াতটির এই শব্দগুলোর ভাবার্থ এই যে, হজ্বের সময় হচ্ছে নির্দিষ্ট কয়েকটি মাস। সুতরাং সাব্যস্ত হচ্ছে যে, এই মাসগুলোর পূর্বে ইহরাম বাঁধা ঠিক হবে না। যেমন নামাযের সময়ের পূর্বে কেউ নামায পড়ে নিলে নামায ঠিক হয় না। ইমাম শাফিঈ (রঃ) বলেন, আমাকে মুসলিম বিন খালিদ সংবাদ দিয়েছেন, তিনি ইবনে জুরাইজের নিকট হতে শুনেছেন, তাঁকে উমার বিন আতা’ বলেছেন, তাঁর কাছে ইকরামা বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন যে, হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ) বলেছেন কোন ব্যক্তির জন্যে এটা উচিত নয় যে, সে হজ্বের মাসগুলো ছাড়া অন্য মাসে হজ্বের ইহরাম বাঁধে। কেননা, আল্লাহ তা'আলা বলেছেন(আরবি) অর্থাৎ হজ্বের মাসগুলো সুবিদিত।' এই বর্ণনাটির আরও বহু সনদ রয়েছে। একটি সনদে আছে যে, এটাই সুন্নাত।সহীহ ইবনে খুজাইমার মধ্যেও এই বর্ণনাটি নকল করা হয়েছে। উসূলের গ্রন্থসমূহেও এই জিজ্ঞাস্য বিষয়টির এভাবে নিস্পত্তি করা হয়েছে যে, এটা সাহাবীর (রাঃ) উক্তি এবং তিনি সেই সাহাবী যিনি কুরআন কারীমের ব্যাখ্যাতা। সুতরাং এ উক্তি যেন রাসূলুল্লাহরই (সঃ) উক্তি। তাছাড়া তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই এর একটি মারফু হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন- হজ্বের মাস ছাড়া অন্য মাসে ইহরাম বাঁধা কারও জন্যে উচিত নয়।' এর ইসনাদও উত্তম। কিন্তু ইমাম শাফিঈ (রঃ) ও ইমাম বায়হাকী (রঃ) বর্ণনা করেন যে, এই হাদীসের একজন বর্ণনাকারী হচ্ছেন হযরত জাবির বিন আবদুল্লাহ (রাঃ), তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয় যে, হজ্বের মাসগুলোর পূর্বে হজ্বের ইহরাম বাঁধা যেতে পারে কি: তিনি উত্তরে বলেন, 'না।' হাদীসটি মাওকুফ হওয়াই সঠিক কথা। হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাসের (রাঃ) সুন্নাত এটাই’-এই উক্তি দ্বারা সাহাবীর (রাঃ) এই ফতওয়ার গুরুত্ব বেড়ে যাচ্ছে।(আরবি)-এর ভাবার্থ হযরত আবদুল্লাহ বিন উমার বর্ণনা করেন, শাওয়াল, যুলকা'দা এবং যিলহজ্ব মাসের দশদিন (সহীহ বুখারী)।' এই বর্ণনাটি তাফসীর-ই-ইবনে জারীর এবং তাফসীর-ই-মুস্তাদরিক-ই-হাকিম এর মধ্যেও রয়েছে। হযরত ইবনে উমার (রাঃ), হযরত আলী (রাঃ), হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ), হযরত আবদুল্লাহ্ বিন যুবাইর (রাঃ) এবং হযরত আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ) হতেও এটা বর্ণিত আছে। হযরত আতা' (রঃ) হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত ইবরাহিম নাখঈ (রঃ), হযরত শা'বী (রঃ), হযরত হাসান বসরী (রঃ), হযরত ইবনে সীরীন (রঃ), হযরত মাকহুল (রঃ), হযরত কাতাদাহ (রঃ), হযরত যহাক বিন মাযাহিম (রঃ), হযরত রাবী' বিন আনাস (রঃ) এবং হযরত কাতাদাহ (রঃ), হযরত যহ্হাক বিন মাযাহিম (রঃ) এবং হযরত মুকাতিল বিন হিব্বানও (রঃ) এ কথাই বলেন। হযরত ইমাম শাফিঈ (রঃ), ইমাম আবু হানীফা (রঃ), ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রঃ), ইমাম আবু ইউসুফ (রঃ) এবং আবু সাউরেরও (রঃ) মাযহাব এটাই। ইমাম ইবনে জারীরও (রঃ) এটাই পছন্দ করেন। (আরবি) শব্দটি বহুবচন। এর ব্যবহার পূর্ণ দু'মাস এবং তৃতীয় মাসের কিছু অংশের উপরেও হতে পারে। যেমন বলা হয়-“আমি এই বছর বা আজকে তাকে দেখেছি। সুতরাং প্রকৃতপক্ষে সারা বছর ধরে বা সারা দিন ধরে তো তাকে দেখেনি। বরং দেখার সময় অল্পই হয়ে থাকে। কিন্তু প্রায়ই এ কথাই বলা হয়ে থাকে। এই নিয়মে এখানেও তৃতীয় মাসের উল্লেখ করা হয়েছে। কুরআন মাজীদের মধ্যেও (আরবি) (২:২০৩) রয়েছে। অর্থাৎ যে দু’দিনে তাড়াতাড়ি করে। অথচ ঐ তাড়াতাড়ি দেড় দিনের হয়ে থাকে। কিন্তু গণনায় দু’দিন বলা হয়েছে।' ইমাম মালিক (রঃ) এবং ইমাম শাফিঈর (রঃ) প্রথম উক্তি এটাও রয়েছে যে, শাওয়াল, যুলকা'দা এবং যুলহাজির পুরো মাসই। হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতেও এটাই বর্ণিত আছে। ইবনে শিহাব (রঃ) আতা (রঃ), জাবির বিন আবদুল্লাহ (রঃ), তাউস (রাঃ), মুজাহিদ (রঃ), উরওয়াহ (রঃ), রাবী (রঃ )এবং কাতাদা (রঃ) হতে এটাই বর্ণিত রয়েছে। একটি মারফু হাদীসেও এটা এসেছে। কিন্তু ওটা মাওযূ। কেননা, এর বর্ণনাকারী হচ্ছে হুসাইন বিন মুখারিক, যার উপরে এই দুর্নাম রয়েছে যে, সে হাদীস বানিয়ে থাকে। সুতরাং হাদীসটির মারফু হওয়া সাব্যস্ত হয় না। ইমাম মালিকের (রঃ) এই উক্তিকে মেনে নেয়ার পর এটা প্রমাণিত হচ্ছে যে, যুল-হাজ্ব মাসে উমরা করা ঠিক হবে না। এটা ভাবার্থ নয় যে, দশই যুলহাজ্বের পরেও হজ্ব হতে পারে।হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হজ্বের মাসগুলোতে উমরা করা ঠিক নয়। ইবনে জারীরও (রঃ) এ উক্তিগুলির এই ভাবার্থই বর্ণনা করেছেন যে, হজের সময় তো মিনার দিন (দশই যিল হজ্ব) অতিক্রান্ত হওয়া মাত্রই শেষ হয়ে যায়। মুহাম্মদ ইবনে সীরীন বর্ণনা করেন-‘আমার জানা মতে এমন কোন আলেম নেই যিনি হজ্বের মাসগুলো ছাড়া অন্যান্য মাসে উমরাহ করাকে এই মাসগুলোর মধ্যে উমরাহ করা অপেক্ষা উত্তম মনে করতে সন্দেহ করে থাকেনঃ কাসিম বিন মুহাম্মদ (রঃ) কে ইবনে আউন হজ্বের মাসগুলিতে উমরাহ করা সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করলে তিনি উত্তরে বলেন-মনীষীগণ একে পূর্ণ উমরাহ মনে করতেন না।' হযরত উমার (রাঃ) এবং উসমান (রাঃ) হজ্বের মাসগুলো ছাড়া অন্যান্য মাসে উমরাহ করাকে পছন্দ করতেন। এমনকি তারা হজ্বের মাসগুলোতে উমরাহ করতে নিষেধ করতেন। (পূর্ব আয়াতটির তাফসীরে এটা বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যুলকা'দা মাসে চারটি উমরাহ আদায় করেছেন। অথচ যুলকা'দা মাসও হচ্ছে হজ্বের মাস। সুতরাং হজ্বের মাসগুলোতে উমরাহ করা জায়েয প্রমাণিত হলো, এ সম্পর্কে আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন-অনুবাদক)অতঃপর ইরশাদ হচ্ছেঃ “যে ব্যক্তি এই মাসগুলোতে হজ্বের সংকল্প করে অর্থাৎ হজ্বের ইহরাম বাঁধে। এর দ্বারা প্রমাণিত হচ্ছে যে, হজ্বের ইহরাম বাঁধা ও তা পুরো করা অবশ্য কর্তব্য। ফরয’ শব্দের এখানে অর্থ হচ্ছে সংকল্প করা। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এর দ্বারা ওদেরকে বুঝান হয়েছে যারা হজ্ব ও উমরাহর ইহরাম বেঁধেছে। আতা’ (রঃ) বলেন যে, এখানে ফরয’ এর ভাবার্থ হচ্ছে ইহরাম। ইবরাহীম (রঃ) ও যহ্হাক (রঃ)-এরও উক্তি এটাই। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ইহরাম বেঁধে ‘লাব্বায়েক' পাঠের পর কোন স্থানে থেমে যাওয়া উচিত নয়। অন্যান্য মনীষীদেরও এটাই উক্তি। কোন কোন মনীষী বলেন যে, ফর' শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে ‘লাব্বায়েক' পাঠ। শব্দের অর্থ হচ্ছে সহবাস। যেমন কুরআন কারীমের মধ্যে অন্য জায়গায় রয়েছেঃ(আরবি) অর্থাৎ রোযার রাত্রে স্ত্রী সহবাস তোমাদের জন্য হালাল করা হলো।' (২১৮৭) ইহরামের অবস্থায় সহবাস এবং ওর পূর্ববর্তী সমস্ত কার্যই হারাম। যেমন প্রেমালাপ করা, চুম্বন দেয়া এবং স্ত্রীদের বিদ্যমানতায় এসব কথা আলোচনা করা। কেউ কেউ পুরুষদের মজলিসেও এসব কথা আলোচনা করাকে(আরবি) এর অন্তর্ভুক্ত করেছেন। কিন্তু হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এর বিপরীত বর্ণিত হয়েছে। একদা তিনি ইহরামের অবস্থায় এই ধরনেরই একটি কবিতা পাঠ করেন। এ সম্বন্ধে তাকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, স্ত্রী লোকদের সামনে এই প্রকারের কথা বললে (আরবি) হয়ে থাকে। (আরবি) এর নিম্নতম পর্যায় এই যে, সহবাস প্রভৃতির আলোচনা করা, কটু কথা বলা, ইশারা ইঙ্গিতে সহবাস করা, নিজ স্ত্রীকে বলা যে ইহরাম ভেঙ্গে গেলেই সহবাস করা হবে, আলিঙ্গন করা, চুম্বন দেয়া ইত্যাদি সব কিছুই (আরবি)-এর অন্তর্গত। ইহরামের অবস্থায় এসব করা হারাম। বিভিন্ন ব্যাখ্যাতার বিভিন্ন উক্তির সমষ্টি এই।(আরবি) শব্দের অর্থ হচ্ছে অবাধ্য হওয়া, শিকার করা, গালি দেয়া ইত্যাদি। যেমন হাদীস শরীফে রয়েছে যে, মুসলমানকে গালি দেয়া হলো ফিস্ক এবং তাকে হত্যা করা হলো কুফর। আল্লাহ ছাড়া অন্যদের নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে জন্তু, যবাহ করাও হচ্ছে ফিস্ক। যেমন কুরআন মাজীদের মধ্যে রয়েছেঃ(আরবি) অর্থাৎ ‘অথবা ফিস্ক যা আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে যবাহ করা হয়েছে।' (৬:১৪৫) খারাপ উপাধি দ্বারা ডাক দেয়াও ফিস্ক। যেমন কুরআন পাকে ঘোষিত হয়েছে।(আরবি) অর্থাৎ “তোমরা অন্যকে কলংক যুক্ত উপাধিতে সম্বোধন করো না।' (৪৯:১১) সংক্ষিপ্ত কথা এই যে, আল্লাহ তা'আলার প্রত্যেক অবাধ্যতাই ফিকের অন্তর্গত। এটা সর্বদাই অবৈধ বটে; কিন্তু সম্মানিত মাসগুলিতে এর অবৈধতা আরও বৃদ্ধি পায়। আল্লাহ তা'য়ালা বলেনঃ(আরবি) অর্থাৎ ‘তোমরা এই সম্মানিত মাসগুলোতে তোমাদের আত্মার উপর অত্যাচার করো না।' (৯:৩৬) অনুরূপভাবে হারাম শরীফের মধ্যে এর অবৈধতা বৃদ্ধি পায়। যেমন ইরশাদ হচ্ছে, (আরবি) অর্থাৎ ‘হারামের মধ্যে যে ব্যক্তি ধর্মদ্রোহীতার ইচ্ছে করবে, তাকে আমি বেদনাদায়ক শাস্তি দেবো।' (২২:২৫) ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, এখানে ‘ফিক’ এর ভাবার্থ হচ্ছে ঐ কাজ যা ইহরামের অবস্থায় নিষিদ্ধ। যেমন শিকার করা, মস্তক মুণ্ডন করা বা ঘেঁটে দেয়া এবং নখ কাটা ইত্যাদি। হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতেও এটাই বর্ণিত আছে। কিন্তু সর্বোত্তম ব্যাখ্যা হচ্ছে ওটাই যা আমরা বর্ণনা করেছি। অর্থাৎ প্রত্যেক পাপের কাজ হতে বিরত রাখা হয়েছে। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে-যে ব্যক্তি এই বায়তুল্লাহর হজ্ব করে সে যেন ‘রাফাস’ এবং ‘ ফিক’ না করে, তবে সে পাপ হতে এমনই মুক্ত হয়ে যাবে যেমন তার জন্মের দিন ছিল।এর পরে ইরশাদ হচ্ছে-হজ্বে কলহ নেই।' অর্থাৎ হজ্বের সময় এবং হজ্বের আরকান ইত্যাদির মধ্যে তোমরা কলহ করো না। এর পূর্ণ বর্ণনা আল্লাহ তা'আলা দিয়েছেন যে, হজ্বের মাসগুলো নির্ধারিত রয়েছে। সুতরাং তাতে কম-বেশী করা চলবে না এবং পূর্বেও পরেও করা চলবে না। মুশরিকরা এরূপ করে থাকতো। কুরআন মাজীদের মধ্যে অন্য জায়গায় এর নিন্দে করা হয়েছে। অনুরূপভাবে কুরাইশরা মাশআর-ই-হারামের পাশে মুযদালিফায় অবস্থান করতো এবং আরবের বাকি লোক আরাফায় অবস্থান করতো। অতঃপর তারা পরস্পর ঝগড়া বিবাদে লিপ্ত হয়ে পড়তো এবং একে অপরকে বলতো, আমরা সঠিক পথের উপর এবং ইবরাহীম (আঃ)-এর পথের উপর রয়েছি। এখানে এটা হতে নিষেধ করা হচ্ছে যে, আল্লাহ তা'আলা তাঁর নবীর (সঃ) মাধ্যমে হজ্বের সময়, আরকান ও আহকাম এবং অবস্থানের স্থান ইত্যাদি সব কিছু বর্ণনা করেছেন। সুতরাং এখন আর কেউ অপরের উপর কোন গৌরব প্রকাশ করতে পারবে না বা হজ্বের দিন পরিবর্তন করতে পারবে না। কাজেই সকলকেই এখন কলহ-বিবাদ হতে বিরত থাকতে হবে। ভাবার্থ এটাও বর্ণনা করা হয়েছে যে, তোমরা হজ্বের সফরে পরস্পর ঝগড়া বিবাদ করো না, একে অপরকে রাগান্বিত করো না এবং কেউ কাউকেও গালি দিয়ো না। বহু মুফাসসিরের এই উক্তিও রয়েছে, আবার অনেকের পূর্বের উক্তিও রয়েছে। হযরত ইকরামা (রাঃ) বলেন, কারও নিজের দাসকে শাসন গর্জন করা এর অন্তর্ভুক্ত নয়। তবে মারতে পারে না। কিন্তু আমি বলি যে, যদি নিজের ক্রীতদাসকে মেরেও দেয় তবুও কোন দোষ নেই। এর প্রমাণ মুসনাদ-ই -আহমাদের নিম্নের এই হাদীসটি-হযরত আবু বকরের (রাঃ) কন্যা হযরত আসমা (রাঃ) বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে হজ্বের সফরে ছিলাম। আমরা ‘আরায’ নামক স্থানে বিশ্রাম গ্রহণ করছিলাম। হযরত আয়েশা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পাশে বসেছিলেন এবং আমি আমার জনক হযরত আবু বকরের (রাঃ) নিকটে বসেছিলাম। হযরত আবু বকর (রাঃ) ও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উটের আসবাবপত্র হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর পরিচারকের নিকট ছিল। হযরত আবু বকর (রাঃ) তার অপেক্ষা করছিলেন। কিছুক্ষণ পর সে এসে পড়ে। হযরত আবু বকর (রাঃ) তাকে জিজ্ঞেস করেন, উট কোথায়: সে বলে, ‘গত রাত্রে উটটি হারিয়ে গেছে। হযরত আবু বকর (রাঃ) এতে অসন্তুষ্ট হন এবং বলেন একটি মাত্র উট তুমি দেখতে পারলে না, হারিয়ে দিলে:' একথা বলে তিনি তাকে প্রহার করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন মুচকি হেসে বলেন, ‘তোমরা দেখ, তিনি ইহরামের অবস্থায় কি কাজ করছেন: এই হাদীসটি সুনান-ই-আবু দাউদ ও ইবনে মাজাহ্নর মধ্যেও রয়েছে। পূর্ববর্তী কোন একজন মনীষী হতে এটাও বর্ণিত আছে যে, এই প্রহার ছিল হজ্ব শেষ হওয়ার পর। কিন্তু এটাও স্মরণীয় বিষয় যে, হযরত আবু বকর (রাঃ) কে রাসূলুল্লাহর (সঃ) “দেখ, তিনি ইহরামের অবস্থায় কি করছেন!’-একথা বলার মধ্যে খুবই সূক্ষ্ম অস্বীকৃতি। রয়েছে এবং এর মধ্যে এইভাব নিহিত রয়েছে যে, তাকে ছেড়ে দেয়াই উত্তম ছিল।তাফসীর-ই-মুসনাদ-ই-আবদ বিন হামীদের মধ্যে একটি হাদীস রয়েছে, হযরত জাবির বিন আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, যে ব্যক্তি এরূপ অবস্থায় হজ্ব পূর্ণ করলো যে, কোন মুসলমান তার হাতের দ্বারা এবং মুখের দ্বারা কষ্ট পেলো না, তার পূর্বের সমস্ত পাপ মোচন হয়ে গেলো। অতঃপর আল্লাহ তাআলা বলেন-“তোমরা যে কোন সকার্য কর না কেন আল্লাহ তা অবগত আছেন। উপরে যেহেতু অন্যায় ও অশ্লীল কাজ হতে বাধা দেয়া হয়েছে, কাজেই এখানে পুণ্যের কাজের প্রতি উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে এবং বলা হয়েছে যে, তাদেরকে কিয়ামতের দিন প্রতিটি সত্ত্বার্যের পূর্ণ প্রতিদান দেয়া হবে ।আল্লাহ তা'আলা বলেন-“তোমরা হজ্বের সফরে নিজেদের সাথে পাথেয় নিয়ে যাও। ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, জনগণ পাথেয় ছাড়াই হজ্বের সফরে বেরিয়ে পড়তো। পরে তারা মানুষের কাছে চেয়ে বেড়াতো। এজন্যেই এই নিদের্শ দেয়া হয়েছে যে, তারা যেন পাথেয় সাথে নিয়ে যায়। হযরত ইকরামা (রাঃ) এবং হযরত উয়াইনাও (রঃ) একথাই বলেন। সহীহ্ বুখারী, সুনান -ই-নাসাঈ প্রভৃতির মধ্যেও এই বর্ণনাগুলো রয়েছে। একটি বর্ণনায় এও রয়েছে যে, ইয়ামনবাসীরা এরূপ করতো এবং বলতো-‘আমরা আল্লাহ তা'আলার উপর নির্ভরশীল।' হযরত আবদুল্লাহ বিন উমার (রাঃ) হতে এও বর্ণিত আছে যে, যখন তারা ইহরাম বাঁধতো তখন তাদের কাছে যে পাথেয় থাকতো তা তারা ফেলে দিতে এবং পুনরায় নতুনভাবে পাথেয় গ্রহণ করতো। এজন্যেই তাদের উপর এই নির্দেশ হয় যে, তারা যেন এরূপ না করে এবং আটা, ছাতু ইত্যাদি। খাদ্য যেন পাথেয় হিসেবে গ্রহণ করে। অন্যান্য আরও বহু বিশ্বস্ত মুফাসপ্রিও এরকমই বলেছেন। এমনকি হযরত ইবনে উমার (রাঃ) তো একথাও বলেছেন যে, সফরে উত্তম পাথেয় রাখার মধ্যেই মানুষের মর্যাদা নিহিত রয়েছে। সাথীদের প্রতি মন খুলে খরচ করারও তিনি শর্ত আরোপ করতেন। ইহলৌকিক পাথেয়ের বর্ণনার সাথে আল্লাহ তা'আলা পারলৌকিক পাথেয়ের প্রস্তুতি গ্রহণের প্রতিও গুরুত্ব আরোপ করেছেন। অর্থাৎ বান্দী যেন তার কবর রূপ সফরে আল্লাহ তা'আলার ভয়কে পাথেয় হিসেবে সাথে নিয়ে যায়। যেমন অন্য স্থানে পোষাকের বর্ণনা দিয়ে বলেন (আরবি) অর্থাৎ এবং খোদা -ভীরুতার পোষাকই হচ্ছে উত্তম।' (৭:২৬) অর্থাৎ বান্দা যেন বিনয়, নম্রতা, আনুগত্য এবং খোদা-ভীরুতার গোপনীয় পোষাক হতে শূন্য না থাকে। এমনকি এই গোপনীয় পোষাক বাহ্যিক পোষাক হতে বহু গুণে শ্রেয়।একটি হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, যে ব্যক্তি দুনিয়ায় পাথেয় গ্রহণ করে তা আখেরাতে তার উপকারে আসবে (তাবরানীর হাদীস)। এ নির্দেশ শুনে একজন দরিদ্র সাহাবী (রাঃ) বলেন, 'হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার নিকট তো কিছুই নেই। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, এতটুকু তো রয়েছে যে, তোমাকে কারও কাছে ভিক্ষে করতে হয় না এবং উত্তম পাথেয় হচ্ছে আল্লাহর ভয়।' (তাফসীর ই- ইবনে-আবি হাতিম)।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন, 'হে জ্ঞানবানগণ! তোমরা আমাকে ভয় কর।' অর্থাৎ আমার শাস্তি ও পাকড়াওকে ভয় করতঃ তোমরা আমার নির্দেশকে অমান্য করো না তা হলেই মুক্তি পেয়ে যাবে এবং এটাই হবে জ্ঞানের পরিচায়ক।

তাফসীর আবু বকর যাকারিয়া

হজ্ব হয় সুবিদিত মাসগুলোতে [১]। তারপর যে কেউ এ মাসগুলোতে হজ্ব করা স্থির করে সে হজ্বের সময় স্ত্রী-সম্ভোগ [২], অন্যায় আচরণ [৩], ও কলহ-বিবাদ [৪] করবে না। আর তোমরা উত্তম কাজ থেকে যা-ই কর আল্লাহ্‌ তা জানেন [৫] আর তোমরা পাথেয় সংগ্রহ কর [৬]। নিশ্চয় সবচেয়ে উত্তম পাথেয় হচ্ছে তাকওয়া। হে বোধসম্পন্ন ব্যক্তিগণ ! তোমরা আমারই তাকওয়া অবলম্বন কর [৭] ।

[১] যারা হজ্ব অথবা উমরা করার নিয়্যতে এহ্‌রাম বাঁধে, তাদের উপর এর সকল অনুষ্ঠানক্রিয়াদি সম্পন্ন করা ওয়াজিব হয়ে পড়ে। এ দু'টির মধ্যে উমরার জন্য কোন সময় নির্ধারিত নেই। বছরের যে কোন সময় তা আদায় করা যায়। কিন্তু হজ্বের মাস এবং এর অনুষ্ঠানাদি আদায়ের জন্য সুনির্দিষ্ট তারিখ নির্ধারিত রয়েছে। কাজেই এ আয়াতের শুরুতেই বলে দেয়া হয়েছে যে, হজ্বের ব্যাপারটি উমরার মত নয়। এর জন্য কয়েকটি মাস রয়েছে, সেগুলো প্রসিদ্ধ ও সুবিদিত। আর তা হচ্ছে শাওয়াল, যিল্‌ক্বদ ও জিলহজ্ব। হজ্বের মাস শাওয়াল হতে আরম্ভ হওয়ার অর্থ হচ্ছে, এর পূর্বে হজ্বের এহ্‌রাম বাঁধা জায়েয নয়।

[২] (رفث) , ‘রাফাস’ একটি ব্যাপক শব্দ, যাতে স্ত্রী সহবাস ও তার আনুষাঙ্গিক কর্ম, স্ত্রীর সাথে ঘনিষ্ঠভাবে মেলামেশা, এমনকি খোলাখুলিভাবে সহবাস সংক্রান্ত আলাপ আলোচনাও এর অন্তর্ভুক্ত। এহ্‌রাম অবস্থায় এ সবই হারাম। হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “যে কেউ এমনভাবে হজ্জ করবে যে, তাতে ‘রাফাস’, ‘ফুসূক’ ও ‘জিদাল’ তথা অশ্লীলতা, পাপ ও ঝগড়া ছিল না, সে তার হজ্জ থেকে সে দিনের ন্যায় ফিরে আসল যে দিন তাকে তার মা জন্ম দিয়েছিল। " [বুখারী: ১৫২১, মুসলিম: ১৩৫০]

[৩] (فسوق) ‘ফুসুক’ এর শাব্দিক অর্থ বের হওয়া। কুরআনের ভাষায় নির্দেশ লংঘন বা নাফরমানী করাকে ‘ফুসুক’ বলা হয়। সাধারণ অর্থে যাবতীয় পাপকেই ফুসুক বলে। তাই অনেকে এস্থলে সাধারণ অর্থই নিয়েছেন। কিন্তু আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু ‘ফুসুক’ শব্দের অর্থ করেছেন - সে সকল কাজ-কর্ম যা এহরাম অবস্থায় নিষিদ্ধ। স্থান অনুসারে এ ব্যাখ্যাই যুক্তিযুক্ত। কারণ সাধারণ পাপ এহ্‌রামের অবস্থাতেই শুধু নয়; বরং সবসময়ই নিষিদ্ধ। যে সমস্ত বিষয় প্রকৃতপক্ষে নাজায়েয ও নিষিদ্ধ নয়, কিন্তু এহরামের জন্য নিষেধ ও নাজায়েয, তা হচ্ছে ছয়টিঃ (১) স্ত্রী সহবাস ও এর আনুষাঙ্গিক যাবতীয় আচরণ; এমনকি খোলাখুলিভাবে সহবাস সংক্রান্ত আলাপ-আলোচনা। (২) স্থলভাগের জীব-জন্তু শিকার করা বা শিকারীকে বলে দেয়া। (৩) নখ বা চুল কাটা। (৪) সুগন্ধি দ্রব্যের ব্যবহার। এ চারটি বিষয় নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলের জন্যই এহ্‌রাম অবস্থায় হারাম বা নিষিদ্ধ। অবশিষ্ট দুটি বিষয় পুরুষের সাথে সম্পৃক্ত। (৫) সেলাই করা কাপড় পোষাকের মত করে পরিধান করা। (৬) মাথা ও মুখমণ্ডল আবৃত করা। আলোচ্য ছয়টি বিষয়ের মধ্যে স্ত্রী সহবাস যদিও ‘ফুসুক’ শব্দের অন্তর্ভুক্ত, তথাপি একে 'রাফাস' শব্দের দ্বারা স্বতন্ত্রভাবে এজন্যে ব্যক্ত করা হয়েছে যে, এহ্‌রাম অবস্থায় এ কাজ থেকে বিরত থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, এর কোন ক্ষতিপূরণ বা বদলা দেয়ার ব্যবস্থা নেই। কোন কোন অবস্থায় এটা এত মারাত্মক যে, এতে হজই বাতিল হয়ে যায়। অবশ্য অন্যান্য কাজগুলোর কাফ্‌ফারা বা ক্ষতিপূরণ দেয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। আরাফাতে অবস্থান শেষ হওয়ার পূর্বে স্ত্রী সহবাস করলে হজ্ব ফাসেদ হয়ে যাবে। গাভী বা উট দ্বারা এর কাফ্‌ফারা দিয়েও পরের বছর পুনরায় হজ্ব করতেই হবে। এজন্যেই (فَلَا رَفَثَ) শব্দ ব্যবহার করে একে স্বতন্ত্রভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।

[৪] (جدال) শব্দের অর্থ একে অপরকে পরাস্ত করার চেষ্টা করা। এ জন্যেই বড় রকমের বিবাদকে (جدال) বলা হয়। এ শব্দটিও অতি ব্যাপক। কেউ কেউ এস্থলে ‘ফুসুক’ ও ‘জিদাল’ শব্দদ্বয়কে সাধারণ অর্থে ব্যবহার করে এ অর্থ নিয়েছেন যে, ‘ফুসুক’ ও ‘জিদাল’ সর্বক্ষেত্রেই পাপ ও নিষিদ্ধ, কিন্তু এহরামের অবস্থায় এর পাপ গুরুতর। পবিত্র দিনসমূহে এবং পবিত্র স্থানে, যেখানে শুধুমাত্র আল্লাহ্‌র ‘ইবাদাতের জন্য আগমন করা হয়েছে এবং ‘লাব্বাইকা লাব্বাইকা' বলা হচ্ছে, এহরামের পোষাক তাদেরকে সবসময় এ কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে যে, তোমরা এখন ‘ইবাদাতে ব্যস্ত, এমতাবস্থায় ঝগড়া-বিবাদ ইত্যাদি অত্যন্ত অন্যায় ও চরমতম নাফরমানীর কাজ। [মাআরিফুল কুরআন, সংক্ষেপিত]

[৫] ইহরামকালে নিষিদ্ধ বিষয়াদি বর্ণনা করার পর উল্লেখিত বাক্যে হিদায়াত করা হচ্ছে যে, হজের পবিত্র সময় ও স্থানগুলোতে শুধু নিষিদ্ধ কাজ থেকেই বিরত থাকা যথেষ্ট নয়, বরং সুবর্ণ সুযোগ মনে করে আল্লাহ্‌র যিক্‌র ও ইবাদাত এবং সৎকাজে সদা আত্মনিয়োগ কর। তুমি যে কাজই কর না কেন, আল্লাহ্ তা'আলা জানেন। আর এতে তোমাদেরকে অতি উত্তম প্রতিদানও দেয়া হবে।

[৬] এ আয়াতে ঐ সমস্ত ব্যক্তির সংশোধনী পেশ করা হয়েছে যারা হজ ও উমরাহ করার জন্য নিঃস্ব অবস্থায় বেরিয়ে পড়ে। অথচ দাবী করে যে, আমরা আল্লাহ্‌র উপর ভরসা করছি। পক্ষান্তরে পথে ভিক্ষাবৃত্তিতে লিপ্ত হয়। নিজেও কষ্ট করে এবং অন্যকেও পেরেশান করে। তাদেরই উদ্দেশ্যে নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে, হজের উদ্দেশ্যে সফর করার আগে প্রয়োজনীয় পাথেয় সাথে নেয়া বাঞ্ছনীয়, এটা তাওয়াকুলের অন্তরায় নয়। বরং আল্লাহ্‌র উপর ভরসা করার প্রকৃত অর্থই হচ্ছে আল্লাহ্‌ প্রদত্ত আসবাব পত্র নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী সংগ্রহ ও জমা করে নিয়ে আল্লাহ্‌র উপর ভরসা করা। রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে তাওয়াকুলের এই ব্যাখ্যাই বর্ণিত হয়েছে।

(৭) অর্থাৎ আমার শাস্তি, আমার পাকড়াও, আমার লাঞ্ছনা থেকে নিজেদেরকে বাঁচিয়ে রাখ। কেননা, যারা আমার নির্দেশ অনুসারে চলে না, আমার নিষেধ থেকে দূরে থাকে না তাদের উপর আমার আযাব অবধারিত।