Al-Baqarah

আল-বাকারা: 4

2:4

আরবি

وَٱلَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِمَآ أُنزِلَ إِلَيْكَ وَمَآ أُنزِلَ مِن قَبْلِكَ وَبِٱلْـَٔاخِرَةِ هُمْ يُوقِنُونَ

English Translations

Sahih International

And who believe in what has been revealed to you, [O Muḥammad], and what was revealed before you, and of the Hereafter they are certain [in faith].

Muhsin Khan

And who believe in (the Quran and the Sunnah) which has been sent down (revealed) to you (Muhammad Peace be upon him) and in [the Taurat (Torah) and the Injeel (Gospel), etc.] which were sent down before you and they believe with certainty in the Hereafter. (Resurrection, recompense of their good and bad deeds, Paradise and Hell, etc.).

Taqi Usmani

and who believe in what has been revealed to you and what has been revealed before you; and they have faith in the Hereafter.

Abul Ala Maududi

who believe in what has been revealed to you and what was revealed before you, and have firm faith in the Hereafter.

Pickthall

And who believe in that which is revealed unto thee (Muhammad) and that which was revealed before thee, and are certain of the Hereafter.

Yusuf Ali

And who believe in the Revelation sent to thee, and sent before thy time, and (in their hearts) have the assurance of the Hereafter.

বাংলা অনুবাদ

তাইসিরুল কুরআন

আর তোমার প্রতি যা নাযিল হয়েছে ও তোমার পূর্বে যা নাযিল হয়েছে তাতে তারা বিশ্বাস স্থাপন করে এবং পরকালের প্রতিও তারা নিশ্চিত বিশ্বাসী।

রাওয়াই আল-বায়ান

আর যারা ঈমান আনে তাতে, যা তোমার প্রতি নাযিল করা হয়েছে এবং যা তোমার পূর্বে নাযিল করা হয়েছে। আর আখিরাতের প্রতি তারা ইয়াকীন রাখে।

শাইখ মুজিবুর রহমান

এবং তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে ও তোমার পূর্বে যা অবতীর্ণ হয়েছিল, যারা তদ্বিষয়ে বিশ্বাস স্থাপন করে এবং আখিরাতের প্রতি যারা দৃঢ় বিশ্বাস রাখে।

ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

আর যারা ঈমান আনে তাতে যা আপনার উপর নাযিল করা হয়েছে এবং যা আপনার পূর্বে নাযিল করা হয়েছে, আর যারা আখেরাতে নিশ্চিত বিশ্বাসী।

ফাতহুল মাজীদ

আর যারা তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ করা হয়েছে ও তোমার পূর্বে যা অবতীর্ণ করা হয়েছিল তাতে ঈমান আনে এবং তারা পরকালের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস রাখে।

মুখতাসার

৪. যারা কোন ধরনের তারতম্য না করে হে নবী! আপনার উপর আল্লাহর অবতীর্ণ ওহীতে ঈমান আনে। অনুরূপভাবে আপনার পূর্বের সকল নবীর উপর অবতীর্ণ কিতাব এবং সহীফাতেও। যারা আখিরাতের উপর দৃঢ় ঈমান রাখে এবং তাতে যে সাওয়াব ও আযাব হবে তার উপরও ঈমান রাখে।

তাফসীর

তাফসীর ইবনে কাসীর

হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ তুমি তোমার প্রভু আল্লাহ তা'আলার নিকট হতে যা কিছু এনেছে এবং তোমার পূর্ববর্তী নবীগণ (আঃ) যা কিছু এনেছিলো তারা ঐ সমুদয়ের সত্যতা স্বীকার করে। এ নয় যে, কোনটা মানে ও কোনটা মানে না, বরং প্রভুর সমস্ত কথাই বিশ্বাস করে এবং পরকালের উপরও দৃঢ় বিশ্বাস রাখে।' অর্থাৎ পুনরুত্থান, কিয়ামত, জান্নাত, জাহান্নাম, হিসাব, মীযান ইত্যাদি সমস্তই পূর্ণভাবে বিশ্বাস করে। কিয়ামত দুনিয়া ধ্বংসের পরে আসবে বলে তাকে আখেরাত বলা হয়েছে। কোন কোন মুফাসির বলেছেন যে,পূর্বে যাদের অদৃশ্যের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন ইত্যাদি বিশেষণ বর্ণনা করা হয়েছে, তাদেরই দ্বিতীয় বার এই বিশেষণ বর্ণনা করা হয়েছে।অর্থাৎ ঈমানদার আরবেরই মুমিন হোক বা আহলে কিতাব হোক বা অন্য যে কোন হোক। মুজাহিদ (রঃ), আবুল আলিয়া (রঃ), রাবী' বিন আনাস (রঃ) এবং কাতাদার (রঃ) এটাই মত। কেউ কেউ বলেছেন যে, এ দুটো একই কিন্তু এ থেকে উদ্দেশ্য হচ্ছে আহলে কিতাব। এই দুই অবস্থায় (আরবি) টি হ এবং (আরবি) এর (আরবি) হবে -এর উপর। যেমন- (৮৭:১-৪) (আরবি)এখানে (আরবি)-এর (আরবি) হয়েছে (আরবি)-এর উপর। এই প্রকারের (আরবি) সংযোগ কবিদের কবিতাতেও এসেছে। তৃতীয় মত এই যে, প্রথম (আরবি) তো হচ্ছে আরব মুমিনদের এবং (আরবি)-হতে আহলে কিতাবের মুমিনদের (আরবি) ধরা হবে। কুরআন বিশারদ মনীষী হযরত সুদী (রঃ) এটা হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) এবং অন্যান্য কয়েকজন সাহাবী (রাঃ) হতে নকল করেছেন এবং আল্লামা ইবনে জারীরও (রাঃ) এটাকেই পছন্দ করেছেন। এর প্রমাণ স্বরূপ তিনি এই আয়াতটি এনেছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ বস্তুতঃ আহলে কিতাবের মধ্যে এমন লোকও আছে যে আল্লাহ তাআলার উপর এবং যা তোমাদের উপর অবতীর্ণ হয়েছে তার উপর ও যা তাদের উপর অবতীর্ণ হয়েছে তার উপরও বিশ্বাস স্থাপন করে এবং আল্লাহকে ভয় করে। (৩:১৯৮) অনুরূপ ভাবে আরও এক জায়গায় ইরশাদ হয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ যাদেরকে আমি এর পূর্বে কিতাব দিয়েছিলাম তার উপর তারা ঈমান এনে থাকে এবং যখন তাদের নিকট কুরআন পাঠ করা হয় তখন তারা বলেআমরা এর উপর ঈমান আনলাম এবং আমাদের প্রভুর তরফ হতে সত্যরূপে বিশ্বাস করলাম, আমরা এর পূর্বেই তো মুসলমান ছিলাম। তাদেরকে তাদের ধৈর্যের বিনিময়ে ও মন্দের পরিবর্তে ভাল করার এবং আল্লাহর পথে ব্যয় করার বিনিময়ে দ্বিগুণ প্রতিদান দেয়া হবে।' (২৮:৫২-৫৪) এ ছাড়া সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, তিন ব্যক্তিকে তাঁদের কাজের বিনিময়ে দ্বিগুণ পুণ্য দেয়া হবেঃ (১) ঐ আহলে কিতাব-যে তার নবীর (আঃ) উপর ঈমান এনেছে এবং সেই সঙ্গে আমার উপরও ঈমান রেখেছে। (২) সেই কৃতদাস-যে আল্লাহর হক আদায় করে এবং স্বীয় মনিবেরও হক আদায় করে। (৩) ঐ ব্যক্তি-যে তার দাসীকে ভালভাবে শিক্ষা দিয়ে তাকে আযাদ করে দেয়, অতঃপর তাকে বিয়ে করে। ইমাম ইবনে জারীরের (রঃ) এই পার্থক্যের সম্বন্ধ এর দ্বারাও জানা যায় যে, এ সূরার প্রথমে মুমিন ও কাফিরের বর্ণনা দেয়া হয়েছে। যেমন কাফিরের দুটি অংশ আছে, কাফির ও মুনাফিক, দ্রুপ মুমিনদেরও দুটি ভাগ রয়েছে, আরবী মুমিন ও কিতাবী মুমিন। আমি বলি-বাহ্যিক দৃষ্টিতে বুঝা যায় যে, মুজাহিদের একথাটিই সঠিকঃ সূরা-ই- বাকারার প্রথম চারটি আয়াতে মুমিনদের আলোচনা আছে, এবং তার পরবর্তী তেরোটি আয়াতে মুনাফিকদের সম্বন্ধে আলোচনা করা হয়েছে। সুতরাং এ চারটি আয়াত প্রত্যেক মুমিনের জন্যে সাধারণ বা সমভাবে প্রযোজ্য। সে আরবী হোক আযমী হোক, কিতাবী হোক, মানবের মধ্যে হোক বা দানবের মধ্যেই হোক না কেন। কারণ, এর মধ্যে প্রত্যেকটি গুণ অন্যের ক্ষেত্রেই একেবারে জরুরী শর্ত। একটাকে বাদ দিয়ে অন্যটা হতেই পারে না। অদৃশ্যের উপর ঈমান আনা, নামায প্রতিষ্ঠা করা এবং যাকাত দেয়া শুদ্ধ নয়, যে পর্যন্ত না রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর এবং পূর্ববর্তী নবীগণের উপর যে কিতাব অবতীর্ণ হয়েছিল তার উপর ঈমান আনবে এবং সঙ্গে সঙ্গে পরকালের উপর দৃঢ় বিশ্বাস রাখবে। যেমন প্রথম তিনটি পরবর্তী তিনটি ছাড়া বিশ্বাসযোগ্য নয়। দ্রুপ, পরবর্তী তিনটিও পূর্ববর্তী তিনটি ছাড়া পরিশুদ্ধ হয় না। এই জন্যে ঈমানদারদের প্রতি আল্লাহ পাকের নির্দেশ হচ্ছেঃ “হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর উপর, তাঁর রাসূলের উপর, তাঁর রাসূলের উপর যে কিতাব অবতীর্ণ হয়েছে তার উপর এবং পূর্বে যে কিতাব অবতীর্ণ হয়েছিল তার উপর বিশ্বাস স্থাপন কর।' অন্য জায়গায় আল্লাহ তা'আলা বলেন, অত্যাচারী ছাড়া সমস্ত আহলে কিতাবের সঙ্গে ঝগড়ার ব্যাপারে তোমরা উত্তম পন্থা অবলম্বন কর এবং বল-আমাদের উপর যা অবতীর্ণ করা হয়েছে তার উপর এবং তোমাদের উপর যা অবতীর্ণ করা হয়েছে তার উপরও আমরা সমভাবে বিশ্বাস স্থাপন করছি; আমাদেরও তোমাদের ইবাদতের প্রভু একই।পবিত্র কুরআনের আর এক স্থানে ঘোষিত হয়েছেঃ “হে আহলে কিতাব! তোমাদের উপর আমি যা অবতীর্ণ করেছি তার উপর তোমরা বিশ্বাস স্থাপন কর, এটা তোমাদের নিকট যা আছে তার সত্যতা স্বীকারকারী।' অন্য জায়গায় আছে, “হে আহলে কিতাব! তোমরা কোন জিনিসের উপরই নও যে পর্যন্ত না তোমরা তাওরাত, ইঞ্জীল এবং যা তোমাদের প্রভুর নিকট হতে তোমাদের উপর অবতীর্ণ করা হয়েছে তা প্রতিষ্ঠিত রাখো।' অন্য জায়গায় সমস্ত ঈমানদারকে সংবাদ প্রদান রূপে কুরআন মাজীদে আল্লাহ পাক বলেছেনঃ “আল্লাহর রাসূল (সঃ) বিশ্বাস রাখে সেই বিষয়ের প্রতি যা তার প্রতি তার প্রভুর পক্ষ হতে নাযিল করা হয়েছে এবং মুমিনগণও সকলেই বিশ্বাস রাখে আল্লাহর প্রতি, তাঁর ফেরেশতাগণের প্রতি, তাঁর কিতাবসমূহের প্রতি এবং তার বার্তাবাহকগণের প্রতি এই মর্মে যে, আমরা তাঁর রাসূলগণের মধ্যে কাউকেও কোন পার্থক্য করি। আল্লাহ রাব্বল আলামীন আরও বলেছেনঃ যারা আল্লাহর উপর ও তার রাসূলগণের উপর বিশ্বাস স্থাপন করে এবং রাসূলদের (আঃ) মধ্যে কাউকেও কোন পার্থক্য করে না। এ বিষয়ে আরও বহু আয়াত রয়েছে যার মধ্যে প্রত্যেক মুসলমানের আল্লাহর উপর, তাঁর সমস্ত রাসূলের উপর এবং সমস্ত কিতাবের উপর ঈমান আনার কথা স্পষ্টাক্ষরে উল্লেখ করা হয়েছে। আহলে কিতাবের ঈমানদারগণের যে একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে তা অবশ্য একটা অন্য কথা। কেননা তাদের কিতাবের উপর তাদের ঈমান হয় পূর্ণ পরিণত। অতঃপর যখন তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হাতে ইসলাম গ্রহণ করে তখন কুরআন কারীমের উপরও তাদের ঈমান পূর্ণ পরিণত হয়ে থাকে। এ জন্যই তারা দ্বিগুণ পুণ্যের অধিকারী হয়। এই উম্মতের লোকেরও পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের উপর ঈমান আনে বটে, কিন্তু তাদের ঈমান হয় সংক্ষিপ্ত আকারে। যেমন সহীহ হাদীসের মধ্যে আছে, আল্লাহর রাসূল (সঃ) বলেছেনঃ ‘আহলে কিতাব তোমার নিকট কোন সংবাদ প্রচার করলে তোমরা তাকে সত্যও বল না আর মিথ্যাও বল না বরং বলে দাও-যা কিছু আমাদের উপর অবতীর্ণ করা হয়েছে তার উপরও বিশ্বাস করি এবং যা কিছু তোমাদের উপর অবতীর্ণ করা হয়েছে তার উপরও আমরা বিশ্বাস রাখি।' কোন কোন স্থলে এমনও হয়ে থাকে যে, যারা রাসূলুল্লাহ (সঃ) -এর উপর ঈমান আনে, তুলনামূলকভাবে আহলে কিতাব অপেক্ষা তাদের ঈমানই বেশী পূর্ণ ও দৃঢ় হয়। এই হিসেবে তারা হয় তো আহলে কিতাব অপেক্ষা বেশী পুণ্য লাভ করবে; যদিও তারা তাদের নবীর (আঃ) উপর এবং শেষ নবীর (সঃ) উপর ঈমান আনার কারণে দ্বিগুণ পুণ্যের অধিকারী। কিন্তু এরা ঈমানের পরিপক্কতার কারণে পুণ্যে তাদেরকেও ছাড়িয়ে যাবে। আল্লাহ তাআলাই এ সম্পর্কে সবচেয়ে বেশী জানেন।

তাফসীর আবু বকর যাকারিয়া

আর যারা ঈমান আনে তাতে, যা আপনার উপর নাযিল করা হয়েছে এবং যা আপনার পূর্বে নাযিল করা হয়েছে, [১] আর যারা আখেরাতে নিশ্চিত বিশ্বাসী। [২]

[১] এখানে মুত্তাকীদের এমন আরও কতিপয় গুণাবলীর বর্ণনা রয়েছে, যাতে ঈমান বিল গায়েব এবং আখেরাতের প্রতি বিশ্বাসের প্রসঙ্গটা আরও একটু বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে মুমিন ও মুত্তাকী দুই শ্রেণীর লোক বিদ্যমান ছিলেন, এক শ্রেণী তারা যারা প্রথমে মুশরিক ছিলেন এবং পরে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। অন্য শ্রেণী হলেন যারা প্রথমে আহ্‌লে-কিতাব ইয়াহুদী-নাসারা ছিলেন এবং পরে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। পূর্ববতী আয়াতে প্রথম শ্রেণীর বর্ণনা ছিল। এ আয়াতে দ্বিতীয় শ্রেণীর বর্ণনা দেয়া হয়েছে। তাই এ আয়াতে কুরআনের প্রতি ঈমান আনার সাথে সাথে পূর্ববতী আসমানী কিতাবসমূহে বিশ্বাস করার কথাও বলা হয়েছে। হাদীসের বর্ণনা অনুযায়ী এ দ্বিতীয় শ্রেণীর লোকেরা যারা ইসলাম গ্রহণের পূর্বে কোন না কোন আসমানী কিতাবের অনুসারী ছিলেন, তারা দ্বিগুণ পুণ্যের অধিকারী হবেন। [দেখুন, বুখারী: ৩০১১, মুসলিম: ১৫৪]

প্রথমতঃ কুরআনের প্রতি ঈমান এবং আমলের জন্য, দ্বিতীয়তঃ পূর্ববর্তী কিতাবসমূহে ঈমান আনার জন্য। তবে পার্থক্য এই যে, সেগুলো সম্পর্কে বিশ্বাসের বিষয় হবে, কুরআনের পূর্বে আল্লাহ্ তা'আলা যেসব কিতাব নাযিল করেছেন, সেগুলো সত্য ও হক এবং সে যুগে এর উপর আমল করা ওয়াজিব ছিল। আর এ যুগে কুরআন নাযিল হবার পর যেহেতু অন্যান্য আসমানী কিতাবের হুকুম-আহ্‌কাম এবং পূর্ববতী শরীআতসমূহ মনসুখ হয়ে গেছে, তাই এখন আমল একমাত্র কুরআনের আদেশানুযায়ীই করতে হবে। [ইবনে কাসীর থেকে সংক্ষেপিত]

[২] এ আয়াতে মুত্তাকীগণের আরেকটি গুণ বর্ণনা করা হচ্ছে যে, তারা আখেরাতে নিশ্চিত বিশ্বাস বা দৃঢ় প্রত্যয় রাখে। যেসব বিষয়ের প্রতি ঈমান আনা অপরিহার্য সেগুলোর মধ্যে এ বিষয়টি সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। তাছাড়া ঈমান অনুযায়ী আমল করার প্রকৃত প্রেরণা এখান থেকেই সৃষ্টি হয়। ইসলামী বিশ্বাসগুলোর মধ্যে আখেরাতের প্রতি ঈমান আনা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিশ্বাস, যা দুনিয়ার রূপই পাল্টে দিয়েছে। এ বিশ্বাসে উদ্বুদ্ধ হয়েই ওহীর অনুসারীগণ প্রথমে নৈতিকতা ও কর্মে এবং পরবর্তীতে ব্যক্তিগত, সামাজিক এমনকি রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে পর্যন্ত দুনিয়ার অন্যান্য সকল জাতির মোকাবেলায় একটি অনন্য বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আসনে উত্তীর্ণ হতে সমর্থ হয়েছে। পরন্তু তাওহীদ ও রিসালাতের ন্যায় এ আকীদাও সমস্ত নবী-রাসূলের শিক্ষা ও সর্বপ্রকার ধর্ম-বিশ্বাসের মধ্যেই সর্বসম্মত বিশ্বাসরূপে চলে আসছে। যেসব লোক জীবন ও এর ভোগ-বিলাসকেই জীবনের চরম লক্ষ্য বলে গণ্য করে, জীবনযাত্রার ক্ষেত্রে যে তিক্ত পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়, সে তিক্ততাকেই সর্বাপেক্ষা কষ্ট বলে মনে করে, আখেরাতের জীবন, সেখানকার হিসাব-নিকাশ, শাস্তি ও পুরস্কার প্রভৃতি সম্পর্কে যাদের এতটুকুও আস্থা নেই, তারা যখন সত্য-মিথ্যা কিংবা হালাল-হারামের মধ্যে পার্থক্য করাকে তাদের জীবনের সহজ-স্বাচ্ছন্দ্যের পথে বাধারূপে দেখতে পায়, তখন সামান্য একটু সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের বিনিময়ে সকল মূল্যবোধকে বিসর্জন দিতে এতটুকুও কুণ্ঠাবোধ করে না, এমতাবস্থায় এ সমস্ত লোককে যে কোন দুস্কর্ম থেকে বিরত রাখার মত আর কোন কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। যা কিছু অন্যায়, অসুন্দর বা অসামাজিক জীবনের শান্তি-শৃংখলার পক্ষে ক্ষতিকর, সেসব অনাচার কার্যকরভাবে উৎখাত করার কোন শক্তি কোন আইনেরও নেই, এ কথা পরীক্ষিত সত্য। আইন প্রয়োগের মাধ্যমে কোন দুরাচারের চরিত্রশুদ্ধি ঘটানোও সম্ভব হয় না। অপরাধ যাদের অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায়, আইনের শাস্তি সাধারণত তাদের দাঁত-সওয়া হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত আর তাদের মধ্যে শাস্তিকে যারা ভয় করে, তাদের সে ভয়ের আওতাও শুধুমাত্র ততটুকুতেই সীমাবদ্ধ থাকে, যকটুকুতে ধরা পড়ার ভয় বিদ্যমান। কিন্তু গোপনে লোকচক্ষুর অন্তরালে যেখানে ধরা পড়ার সম্ভাবনা থাকে না, সেরূপ পরিবেশে এ সমস্ত লোকের পক্ষেও যে কোন গৰ্হিত কাজে লিপ্ত হওয়ার পথে কোন বাধাই থাকে না। প্রকারান্তরে আখেরাতের প্রতি ঈমানই এমন এক কার্যকর নিয়ন্ত্রণবিধি, যা মানুষকে প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সর্বত্রই যে কোন গৰ্হিত আচরণ থেকে অত্যন্ত কার্যকারভাবে বিরত রাখে। তার অন্তরে এমন এক প্রত্যয়ের অম্লান শিখা অবিরাম সমুজ্জ্বল করে দেয় যে, আমি প্রকাশ্যেই থাকি আর গভীর নির্জনেই থাকি, রাজপথে থাকি কিংবা কোন বদ্ধঘরে লুকিয়েই থাকি, মুখে বা ভাব-ভঙ্গিতে প্রকাশ করি আর নাই করি, আমার সকল আচরণ, আমার সকল অভিব্যক্তি, এমনকি অন্তরে লুক্বায়িত প্রতিটি আকাংখা পর্যন্ত এক মহাসত্তার সামনে রয়েছে। তাঁর সদাজাগ্রত দৃষ্টির সামনে কোন কিছুই আড়াল করার সাধ্য আমার নেই। আমার সংগে রয়েছে এমনসব প্রহরী, যারা আমার প্রতিটি আচরণ এবং অভিব্যক্তি প্রতিমুহুর্তেই লিপিবদ্ধ করছেন।

উপরোক্ত বিশ্বাসের মাধ্যমেই প্রাথমিক যুগে এমন মহোত্তম চরিত্রের অগণিত লোক সৃষ্টি হয়েছিলেন, যাদের চাল-চলন এবং আচার-আচরণ দেখেই মানুষ ইসলামের প্রতি শ্রদ্ধায় অবনত হয়ে পড়ত। এখন লক্ষণীয় আর একটি বিষয় হচ্ছে, আয়াতের শেষে (يُؤمِنُوْنَ) শব্দ ব্যবহার না করে (يُوْقِنُوْنَ) ব্যবহার করা হয়েছে। ইয়াক্বীন অর্থ দৃঢ় প্রত্যয়। যার দ্বারা ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, আখেরাতের প্রতি এমন দৃঢ় প্রত্যয় রাখতে হবে, যে প্রত্যয় স্বচক্ষে দেখা কোন বস্তু সম্পর্কেই হতে পারে। এ দৃঢ় প্রত্যয়ের গুরুত্ব নির্ধারণে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, সবর হচ্ছে ঈমানের অর্ধেক, আর ইয়াকীন হচ্ছে পূর্ণ ঈমান” [মুস্তাদরাকে হাকিম: ২/৪৪৬]

মুত্তাকীদের এই গুণ আখেরাতে আল্লাহ্‌ তা'আলার সম্মুখে উপস্থিতি এবং হিসাবনিকাশ, প্রতিদান এবং সবকিছুরই একটি পরিপূর্ণ নকশা তার সামনে দৃশ্যমান করে রাখবে। যে ব্যক্তি অন্যের হক নষ্ট করার জন্য মিথ্যা মামলা করে বা মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়, আল্লাহ্‌র আদেশের বিপরীত পথে হারাম ধন-দৌলত উপার্জন করে এবং দুনিয়ার হীন উদ্দেশ্য সফল করার জন্য শরীআত বিরোধী কাজ করে, সে ব্যক্তি আখেরাতে বিশ্বাসী হয়ে, প্রকাশ্যে ঈমানের কথা যদি স্বীকার করে এবং শরী’আতের বিচারে তাকে মুমিনও বলা হয়, কিন্তু কুরআন যে ইয়াকীনের কথা ঘোষণা করেছে, এমন লোকের মধ্যে সে ইয়াকীন থাকতে পারে না। আর সে কুরআনী ইয়াকীনই মানবজীবনে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনে দিতে পারে। আর এর পরিণামেই মুত্তাকীগণকে হেদায়াত এবং সফলতার সে পুরস্কার দেয়া হয়েছে, যাতে বলা হয়েছে যে, তারাই সরল-সঠিক পথের পথিক, যা তাদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে দান করা হয়েছে আর তারাই সম্পূর্ণ সফলকাম হয়েছে।