Al-Baqarah

আল-বাকারা: 204

2:204
টেক্সট কপি

মূল আরবি

وَمِنَ ٱلنَّاسِ مَن يُعْجِبُكَ قَوْلُهُۥ فِى ٱلْحَيَوٰةِ ٱلدُّنْيَا وَيُشْهِدُ ٱللَّهَ عَلَىٰ مَا فِى قَلْبِهِۦ وَهُوَ أَلَدُّ ٱلْخِصَامِ

English Translations

Sahih International

And of the people is he whose speech pleases you in worldly life, and he calls Allāh to witness as to what is in his heart, yet he is the fiercest of opponents.

Muhsin Khan

And of mankind there is he whose speech may please you (O Muhammad SAW), in this worldly life, and he calls Allah to witness as to that which is in his heart, yet he is the most quarrelsome of the opponents.

Taqi Usmani

Among men there is one whose speech, in this life, attracts you; he even makes Allah his witness on what is in his heart, while he is extremely quarrelsome.

Abul Ala Maududi

Among people there is a kind whose sayings on the affairs of the world fascinate you: he calls Allah again and again to bear testimony to his sincerity; yet he is most fierce in enmity.

Pickthall

And of mankind there is he whoso conversation on the life of this world pleaseth thee (Muhammad), and he calleth Allah to witness as to that which is in his heart; yet he is the most rigid of opponents.

Yusuf Ali

There is the type of man whose speech about this world's life May dazzle thee, and he calls Allah to witness about what is in his heart; yet is he the most contentious of enemies.

বাংলা অনুবাদ

তাইসিরুল কুরআন

মানুষের মধ্যে এমন আছে, পার্থিব জীবন সম্পর্কিত যার কথাবার্তা তোমাকে চমৎকৃত করে, আর সে ব্যক্তি তার অন্তরে যা আছে সে সম্পর্কে আল্লাহকে সাক্ষী রাখে অথচ সে ব্যক্তি খুবই ঝগড়াটে।

রাওয়াই আল-বায়ান

আর মানুষের মধ্যে এমনও আছে, যার কথা দুনিয়ার জীবনে তোমাকে অবাক করে এবং সে তার অন্তরে যা রয়েছে, তার উপর আল্লাহকে সাক্ষী রাখে। আর সে কঠিন ঝগড়াকারী।

শাইখ মুজিবুর রহমান

এবং মানুষের মধ্যে এমনও আছে যার পার্থিব জীবন সংক্রান্ত কথা তোমাকে চমৎকৃত করে, আর সে নিজের (অন্তরস্থ সততা) সম্বন্ধে আল্লাহকে সাক্ষী করে থাকে, কিন্তু বস্তুতঃ সে হচ্ছে কঠোর কলহপরায়ণ ব্যক্তি।

ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

আর মানুষের মধ্যে এমন ব্যক্তি আছে, পার্থিব জীবনে যার কথাবার্তা আপনাকে চমৎকৃত করে এবং তার অন্তরে যা আছে সে সম্বন্ধে আল্লাহ্‌কে সাক্ষী রাখে। প্রকৃতপক্ষে সে ভীষণ কলহপ্রিয়।

ফাতহুল মাজীদ

আর মানুষের মধ্যে এমন লোকও আছে যার পার্থিব জীবন সংক্রান্ত কথা তোমাকে অবাক করে তোলে। আর সে তার মনের বিষয়ের ওপর আল্লাহকে সাক্ষী বানায়। মূলত সে হচ্ছে ভীষণ ঝগড়াটে ব্যক্তি।

মুখতাসার

২০৪. হে নবী! মানুষের মাঝে কিছু আছে মুনাফিক। যার কথাবার্তা এ দুনিয়াতে আপনার খুব ভালোই লাগবে। দেখবেন, সে খুব সুন্দর কথাই বলছে। এমনকি আপনি তাকে সত্যবাদী এবং কল্যাণকামীই মনে করবেন। অথচ তার মূল উদ্দেশ্য হলো শুধুমাত্র তার জীবন ও সম্পদ রক্ষা করা। উপরন্তু সে মিথ্যাবশতঃ আল্লাহকে তার অন্তরের ঈমান ও কল্যাণের সাক্ষী বানাচ্ছে। আর সে মুসলমানদের কঠিন শত্রু এবং মারাত্মক ঝগড়াটে।

তাফসীর

তাফসীর ইবনে কাসীর

২০৪-২০৭ নং আয়াতের তাফসীরসুদ্দী (রঃ) বলেন যে, এই আয়াতগুলো আখনাস বিন শারীক সাকাফীর সম্বন্ধে অবতীর্ণ হয়। এই লোকটি মুনাফিক ছিল। প্রকাশ্যে সে মুসলমান ছিল বটে কিন্তু ভিতরে সে মুসলমানদের বিরোধী ছিল। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, আয়াতগুলো ঐ মুনাফিকদের সম্বন্ধে অবতীর্ণ হয় যারা হযরত যুবাইর (রাঃ) ও তাঁর সঙ্গীদের দুর্নাম করেছিল, যাদেরকে ‘রাজী’ নামক স্থানে শহীদ করা হয়েছিল। এই শহীদগণের প্রশংসায় শেষের আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। এবং পূর্বের আয়াতগুলো মুনাফিকদের নিন্দে করে অবতীর্ণ হয়। কেউ কেউ বলেন যে, আয়াতগুলো সাধারণ। প্রথম তিনটি আয়াত সমস্ত মুনাফিকের সম্বন্ধে অবতীর্ণ হয় এবং চুতর্থ আয়াতটি সমুদয় মুসলমানের প্রশংসায় অবতীর্ণ হয়।

কাতাদাহ (রঃ) প্রভৃতি মনীষীর উক্তি এটাই এবং এটাই সঠিক। হযরত নাওফ বাককালী (রঃ) যিনি তাওরাত ও ইঞ্জীলেরও পণ্ডিত ছিলেন, বলেনঃ “আমি এই উম্মতের কতকগুলো লোকের মন্দ-গুণ আল্লাহ তা'আলার অবতারিত গ্রন্থের মধ্যেই পাচ্ছি। বর্ণিত আছে যে, কতকগুলো লোক প্রতারণা করে দুনিয়া কামাচ্ছে। তাদের কথা তো মধুর চাইতেও মিষ্ট কিন্তু তাদের অন্তর নিম অপেক্ষাও তিক্ত। মানুষকে দেখানোর জন্যে তারা ছাগলের চামড়া পরিধান করে, কিন্তু তাদের অন্তর নেকড়ে বাঘের ন্যায়। আল্লাহ তাআলা বলেন, 'আমার উপর সে বীরতু প্রকাশ করে এবং আমার সাথে প্রতারণা করে থাকে। আমার সত্তার শপথ!

আমি তার প্রতি এমন পরীক্ষা পাঠাবো যে, সহিষ্ণু লোকেরাও হতভম্ব হয়ে পড়বে।”কুরতুবী (রঃ) বলেন, 'আমি খুব চিন্তা ও গবেষণা করে বুঝতে পারলাম যে, এগুলো মুনাফিকদের বিশেষণ। কুরআন পাকের মধ্যেও এটা বিদ্যমান রয়েছে।' অতঃপর তিনি (আরবি) (২:২০৪) এই আয়াতগুলো পাঠ করেন। হযরত সাঈদ (রঃ) যখন অন্যান্য গ্রন্থের উদ্ধৃতি দিয়ে এ কথাটি বর্ণনা করেন তখন হযরত মুহাম্মদ বিন কা'ব (রাঃ) বলেছিলেন, 'এটা কুরআন মাজীদের মধ্যেও রয়েছে। এবং তিনিও এই আয়াতগুলো পাঠ করেন। সাঈদ (রঃ) বলেন, এই আয়াতগুলো কাদের সম্বন্ধে অবতীর্ণ হয়েছিল তা আমি জানি। শান-ই-নযুল হিসেবে আয়াতগুলো যে সম্বন্ধেই অবতীর্ণ হয়ে থাকনা কেন, হুকুম হিসেবে সাধারণ।ইবনে মাহীসানের (রাঃ) কিরাতে ইয়াশহাদু আল্লাহু’ রয়েছে।

তখন অর্থ। হবে-তারা মুখে যা কিছুই বলুক না কেন, তাদের অন্তরের কথা আল্লাহ খুবই ভাল জানেন।' যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে (আরবি)অর্থাৎ “(হে মুহাম্মদ (সঃ)!) যখন মুনাফিকরা তোমার নিকট আসে তখন তারা বলে-আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, নিশ্চয়ই আপনি আল্লাহর রাসূল এবং আল্লাহ জানেন যে, আপনি অবশ্যই তাঁর রাসূল এবং আল্লাহ সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, নিশ্চয়ই মুনাফিকরা মিথ্যাবাদী।' (৬৩:১) কিন্তু জমহুরের পঠনে ‘ইয়ুশহিদুল্লাহ রয়েছে। তখন অর্থ হবে তারা জনসাধারণের সামনে নিজেদের মনের দুষ্টামি গোপন করলেও আল্লাহর সামনে তাদের অন্তরের কুফরী প্রকাশমান। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ তারা মানুষ হতে গোপন করছে বটে কিন্তু আল্লাহ হতে গোপন করতে পারবে না।

(৪:১০৮)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এই অর্থ বর্ণনা করেন, মানুষের সামনে তারা ইসলাম প্রকাশ করে এবং আল্লাহর শপথ করে বলে যে, তারা মুখে যা বলছে তাই তাদের অন্তরেও রয়েছে।' আয়াতের সঠিক অর্থ এটাই বটে। আবদুর রহমান বিন যায়েদ (রঃ) এবং মুজাহিদ (রঃ) হতেও এই অর্থই বর্ণিত আছে। ইমাম ইবনে জারীরও (রঃ) এই অর্থই পছন্দ করেছেন। শব্দটির আভিধানিক অর্থ হচ্ছে ‘খুবই বাঁকা। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে। (আরবি) অর্থাৎ এর দ্বারা তুমি যেন বাঁকা সম্প্রদায়কে ভয় প্রদর্শন কর।' (২০:৯৭) মুনাফিকদের অবস্থাও তদ্রুপ। তারা প্রমাণ স্থাপনে মিথ্যা বলে থাকে, সত্য হতে সরে যায়, সরল ও সঠিক কথা ছেড়ে দিয়ে মিথ্যার আশ্রয় নেয় এবং গালি দিয়ে থাকে।

বিশুদ্ধ হাদীসে রয়েছে যে, মুনাফিকদের অবস্থা তিনটি। (১) কথা বললে মিথ্যা বলে। (২) অঙ্গীকার করলে তা ভঙ্গ করে। (৩) ঝগড়া করলে গালি দেয়।অন্য একটি হাদীসে রয়েছে যে, আল্লাহ তাআলার নিকট অতি মন্দ ঐ ব্যক্তি যে অত্যন্ত ঝগড়াটে। এর কয়েকটি সনদ রয়েছে। অতঃপর ইরশাদ হচ্ছে-এরা যেমন কটু ও কর্কশ ভাষী তেমনই এদের কার্যাবলীও অতি জঘন্য। তাদের কাজ তাদের কথার সম্পূর্ণ বিপরীত। তাদের আকীদা বা বিশ্বাস একেবারেই অসৎ। এখানে (আরবি) শব্দটির অর্থ হচ্ছে ‘ইচ্ছে করা। যেমন আল্লাহ পাকের নির্দেশ রয়েছে। (আরবি) অর্থাৎ ‘তোমরা জুম'আর নামাযের ইচ্ছে কর।' (৬২:৯) এখানে শব্দটির অর্থ দৌড়ান নয়।

কেননা নামাযের জন্যে দৌড়িয়ে যাওয়া নিষিদ্ধ। হাদীস শরীফে রয়েছে, যখন তোমরা নামাযের জন্যে আগমন কর তখন আরাম ও স্বস্তির সাথে এসো। কাজেই অর্থ এই যে, মুনাফিকদের উদ্দেশ্য হচ্ছে পৃথিবীর বুকে অশান্তি উৎপাদন করা এবং শস্যক্ষেত্র ও জীব-জন্তু বিনষ্ট করা। হযরত মুজাহিদ (রঃ) হতে এই অর্থও বর্ণিত আছে যে, ঐ মুনাফিকদের শঠতা ও অন্যায় কার্যকলাপের ফলে আল্লাহ তা'আলা বৃষ্টি বন্ধ করে দেন, ফলে শস্যক্ষেত্র ও জীব-জন্তুর ক্ষতি সাধন হয়ে থাকে। আল্লাহ তা'আলা এই ধরনের বিবাদ ও অশান্তি উৎপাদনকারীদেরকে মোটেই ভালবাসেন না। এই দুষ্ট ও অসদাচরণকারীদেরকে যখন উপদেশের মাধ্যমে বুঝানো হয়, তখন তারা আরো উত্তেজিত হয়ে উঠে এবং বিরোধিতার উত্তেজনায় পাপ কার্যে আরও বেশী লিপ্ত হয়ে পড়ে।

যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে, এবং যখন তাদের সামনে আমার প্রকাশ্য নিদর্শনসমূহ পাঠ করা হয় তখন তুমি কাফিরদের মুখমণ্ডলে ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির চিহ্ন লক্ষ্য করে থাকো। এবং পাঠকদের উপর তারা লাফিয়ে পড়ে; জেনে রেখো যে, কাফিরদের জন্যে আমার নির্দেশ হচ্ছে দেখাগ্নি এবং সেটা অত্যন্ত জঘন্য স্থান। এখানেও বলা হচ্ছে যে, তাদের জন্যে দোযখই যথেষ্ট এবং নিশ্চয় ওটা নিকৃষ্ট আশ্রয় স্থল। মুনাফিকদের জঘন্য চরিত্রের বর্ণনা দেয়ার পর এখন মুমিনদের প্রশংসা করা হচ্ছে। এই আয়াতটি হযরত সুহাইব বিন সিনানের (রাঃ) ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। তিনি মক্কায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন।

তিনি মদীনায় হিজরত করতে চাইলে মক্কার কাফিরেরা তাকে বলে, আমরা তোমাকে মাল নিয়ে মদীনা যেতে দেবো। তুমি মাল-ধন ছেড়ে গেলে যেতে পারো। তিনি সমস্ত মাল পৃথক করে নেন এবং কাফিরেরা তাঁর ঐ মাল অধিকার করে নেয়। সুতরাং তিনি ঐসব সম্পদ ছেড়ে দিয়েই মদীনায় হিজরত করেন। এই কারণেই এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। হযরত উমার (রাঃ) ও সাহাবা-ই-কিরামের একটি বিরাট দল তাঁর অভ্যর্থনার জন্যে ‘হুররা' নামক স্থান পর্যন্ত এগিয়ে আসেন এবং তাঁকে মুবারকবাদ জানিয়ে বলেনঃ “আপনি বড়ই উত্তম ও লাভজনক ব্যবসা করেছেন।' একথা শুনে তিনি বলেনঃ “আপনাদের ব্যবসায়েও যেন আল্লাহ তা'আলা আপনাদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত না করেন।

আচ্ছা বলুন তো, এই মুবারকবাদের কারণ কি: ঐ মহান ব্যক্তিগণ বলেনঃ আপনার সম্বন্ধে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়েছে। যখন তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট পৌছেন তখন তিনিও তাকে সুসংবাদ প্রদান করেন।মক্কার কুরাইশরা তাকে বলেছিলেঃ তুমি যখন মক্কায় আগমন কর তখন তোমার নিকট কিছুই ছিল না। তোমার নিকট যে মাল-ধন রয়েছে তা সবই তুমি এখানেই উপার্জন করেছ। সুতরাং এই মাল আমরা তোমাকে মদীনায় নিয়ে যেতে দেবো না। অতএব তিনি মাল ছেড়ে দিয়ে একমাত্র আল্লাহর দ্বীন নিয়েই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে উপস্থিত হন। একটি বর্ণনায় এও রয়েছে যে, যখন তিনি হিজরতের উদ্দেশ্যে বের হন এবং কাফিরেরা তা জানতে পারে তখন তারা সবাই এসে তাকে ঘিরে নেয়।

তিনি তৃণ হতে তীর বের করে নিয়ে বলেনঃ “হে মক্কাবাসী! আমি যে কেমন তীরন্দাজ তা তোমরা ভাল করেই জান। আমার একটি তীরও লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় না। তীর শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমি তোমাদেরকে বিদীর্ণ করতে থাকবো। এর পরে চলবে তরবারির যুদ্ধ। এই যুদ্ধেও আমি তোমাদের কারও চেয়ে কম নই। যখন তরবারীও ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাবে তখন তোমরা কাছে এসে যা ইচ্ছে তাই করতে পারো। তোমরা যদি এটা স্বীকার করে নাও তবে ভাল কথা। নচেৎ আমি তোমাদেরকে আমার সমুদয় সম্পদ দিয়ে দিচ্ছি। তোমরা সবই নিয়ে নাও এবং আমাকে মদীনা যেতে দাও।' তারা মাল নিতে সম্মত হয়ে যায়, এভাবেই তিনি হিজরত করেন।

তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট পৌছার পূর্বেই ওয়াহীর মাধ্যমে এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়েছিল। দেখা মাত্রই রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁকে মুবারকবাদ দেন। অধিকাংশ মুফাসসিরের এও উক্তি রয়েছে যে, এই আয়াতটি সাধারণ প্রত্যেক মুজাহিদের ব্যাপারেই প্রযোজ্য। যেমন অন্যস্থানে রয়েছে। ‘আল্লাহ তা'আলা বেহেশতের বিনিময়ে মুমিনদের জীবন ও সম্পদ ক্রয় করে নিয়েছেন। তারা আল্লাহর পথে জিহাদ করে, তারা হত্যা করে এবং নিহতও হয়। আল্লাহর এই সত্য অঙ্গীকার তাওরাত, ইঞ্জীল ও কুরআনের মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে। আল্লাহ তা'আলা অপেক্ষা বেশী সত্য অঙ্গীকারকারী আর কে হতে পারে: হে ইমানদারগণ!

তোমরা এই ক্রয়-বিক্রয়ে ও আদান-প্রদানে সন্তুষ্ট হয়ে যাও, এটাই বড় কৃতকার্যতা'। হযরত হিশাম বিন আমের (রাঃ) যখন কাফিরদের দু'টি ব্যুহ ভেদ করে তাদের মধ্যে ঢুকে পড়েন এবং একাকীই তাদের উপর আক্রমণ চালান তখন কতকগুলো মুসলমান তাঁর এই আক্রমণকে শরীয়ত: বিরোধী মনে করেন। কিন্তু হযরত উমার (রাঃ) এবং হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) প্রভৃতি সাহাবীগণ এর প্রতিবাদ করেন এবং (আরবি) (২:২০৭) এই আয়াতটি পাঠ করে শুনান।

তাফসীর আবু বকর যাকারিয়া

আর মানুষের মধ্যে এমন ব্যক্তি আছে, পার্থিব জীবনে [১] যার কথাবার্তা আপনাকে চমৎকৃত করে এবং তার অন্তরে যা আছে সে সম্বন্ধে আল্লাহ্‌কে সাক্ষী রাখে। প্রকৃতপক্ষে সে ভীষণ কলহপ্রিয়।

[১] আয়াতের এ অংশের তিনটি অর্থ হতে পারেঃ

(১) পার্থিব জীবন সম্পর্কে যার কথাবার্তা

আপনাকে চমৎকৃত করে।

(২) পার্থিব জীবনে যাদের কথাবার্তা আপনাকে চমৎকৃত করে। এবং

(৩) পার্থিব জীবনে আপনি চমৎকৃত হন তাদের কথাবার্তায়।

তাফসীর আল-কুরতুবী

[সূরা আল-বাকারা (২): আয়াত ২০৪] পূর্ণ পৃষ্ঠা

একুশতম মাসআলা- আল্লাহ তাআলার বাণী "অতঃপর যে ব্যক্তি তাড়াহুড়ো করল" এর মধ্যে "মান" (যে ব্যক্তি) শব্দটি مبتدأ (উদ্দেশ্য) হিসেবে পেশযুক্ত হয়েছে এবং "তার ওপর কোনো গুনাহ নেই" অংশটি তার خبر (বিধেয়)। কুরআনের বাইরে অন্য ক্ষেত্রে "তাদের ওপর কোনো গুনাহ নেই" বলাও ব্যাকরণগতভাবে বৈধ, কারণ এখানে "মান" শব্দটি দ্বারা একটি সমষ্টিকে বোঝানো হয়েছে; যেমনটি মহান আল্লাহ বলেছেন: "এবং তাদের মধ্যে এমন কিছু লোক রয়েছে যারা আপনার দিকে কান পাতে।" অনুরূপভাবে "এবং যে বিলম্ব করল তার ওপরও কোনো গুনাহ নেই" বাক্যের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য। আর আল্লাহ তাআলার বাণী "তার জন্য যে তাকওয়া অবলম্বন করে"-এর মধ্যে 'লাম' হরফটি ক্ষমার সাথে সংশ্লিষ্ট। এর অর্থ দাঁড়ায়: ক্ষমা কেবল তার জন্য যে তাকওয়া অবলম্বন করেছে। এটি ইবনে মাসউদ এবং আলী (রাযি.)-এর তাফসীর অনুযায়ী। কাতাদাহ (র.) বলেন: আমাদের কাছে বর্ণিত হয়েছে যে, ইবনে মাসউদ (রাযি.) বলেছেন: হজ থেকে প্রত্যাবর্তনের পর সকল প্রকার পাপাচার থেকে বেঁচে থেকে যে তাকওয়া অবলম্বন করে, মাগফিরাত বা ক্ষমা কেবল তার জন্যই নির্ধারিত। আখফাশ বলেন: এর উহ্য অর্থ হলো "এটি তার জন্য যে তাকওয়া অবলম্বন করে।" কেউ কেউ বলেছেন: "তার জন্য যে তাকওয়া অবলম্বন করে" অর্থ হচ্ছে যে ব্যক্তি ইহরাম অবস্থায় এবং হারাম শরীফে শিকার করা থেকে বিরত থাকে। আবার ইবনে উমর (রাযি.) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, এর অর্থ হলো (তাড়াহুড়ো করা বা বিলম্ব করার) অনুমতি কেবল তার জন্য যে তাকওয়া অবলম্বন করে। অন্য মতে এর অর্থ: নিরাপত্তা কেবল মুত্তাকীদের জন্য। আবার বলা হয়েছে যে, এটি আল্লাহ তাআলার বাণী "তোমরা স্মরণ করো" এর যিকিরের সাথে সংশ্লিষ্ট, অর্থাৎ এই যিকির কেবল তাদের জন্য যারা তাকওয়া অবলম্বন করে। সালিম ইবনে আবদুল্লাহ সহজ করার উদ্দেশ্যে আলিফকে উহ্য রেখে (সন্ধি করে) "ফলা-ছমা আলাইহি" পড়েছেন; আরবরা কখনো কখনো এরূপ ব্যবহার করে থাকে। কবি বলেছেন:
যদি আমি যুদ্ধ না করি তবে আমাকে বোরকা (নারীদের পোশাক) পরিয়ে দাও। অতঃপর আল্লাহ তাআলা তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছেন এবং হাশরের ময়দানে একত্রিত হওয়া ও দণ্ডায়মান হওয়ার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। ‌‌[সূরা আল-বাকারা (২): আয়াত ২০৪]মানুষের মধ্যে এমন লোকও আছে যার পার্থিব জীবন সম্বন্ধীয় কথাবার্তা তোমাকে মুগ্ধ করে এবং সে তার অন্তরের কথার ওপর আল্লাহকে সাক্ষী রাখে, অথচ সে চরম কলহপ্রিয়। (২০৪)এর মধ্যে তিনটি মাসআলা রয়েছে: প্রথমটি- আল্লাহ তাআলার বাণী: "মানুষের মধ্যে এমন লোকও আছে যার কথাবার্তা তোমাকে মুগ্ধ করে।" যখন আল্লাহ তাআলা তাদের কথা উল্লেখ করলেন যাদের লক্ষ্য কেবল দুনিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ—যেমনটি তাঁর এই বাণীতে রয়েছে: "মানুষের মধ্যে এমন লোক আছে যে বলে, হে আমাদের রব! আমাদের দুনিয়াতেই দান করুন"—এবং সেই মুমিনদের কথা যারা উভয় জাহানের কল্যাণ প্রার্থনা করে, তখন তিনি মুনাফিকদের কথাও উল্লেখ করলেন। কারণ তারা প্রকাশ্যে ঈমান আনে এবং অন্তরে কুফর গোপন রাখে। সুদ্দী এবং অন্যান্য মুফাসসিরগণ বলেন: এই আয়াতটি আল-আখনাস ইবনে শুরাইক সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে, যার আসল নাম ছিল উবাই। 'আখনাস' তার উপাধি, কারণ সে বদরের যুদ্ধের দিন তার মিত্র বনু যুহরা গোত্রের তিনশ লোককে নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সাথে যুদ্ধ করা থেকে সটকে পড়েছিল, যার বিস্তারিত বর্ণনা 'আলে ইমরান' সূরায় আসবে। সে ছিল মিষ্টভাষী এবং সুশ্রী চেহারার অধিকারী। এরপর সে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর নিকট এসে ইসলাম প্রকাশ করল এবং বলল: "আল্লাহ জানেন আমি সত্যবাদী।" কিন্তু এরপর সে পালিয়ে গেল এবং একদল মুসলমানের শস্যক্ষেত ও গাধার পালের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় শস্য পুড়িয়ে দিল এবং গাধাগুলোকে হত্যা করল। মাহদাবী বলেন: তার ব্যাপারেই এই আয়াত নাযিল হয়েছে।১. সূরা ইউনুস, আয়াত ৪২।

তাফসীর আদ-দুররুল মানসূর

পূর্ণ পৃষ্ঠা

আল-আযরাকী ইবনে আবি নাজিহ থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: তাওয়াফকালে ওমর এবং আবদুর রহমান ইবনে আউফের অধিকাংশ কথা ছিল: "হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের দুনিয়াতে কল্যাণ দান করুন এবং আখেরাতেও কল্যাণ দান করুন এবং আমাদের আগুনের আজাব থেকে রক্ষা করুন।"ইবনে আবি শায়বা এবং আবদুল্লাহ ইবনে আহমাদ 'যাওয়ায়েদুয যুহদ'-এ হাবীব ইবনে সাহবান আল-কাহিলী থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: আমি বাইতুল্লাহর তাওয়াফ করছিলাম এবং ওমর ইবনুল খাত্তাবও তাওয়াফ করছিলেন; তখন এই দোয়া ছাড়া তাঁর মুখে আর কিছুই ছিল না: "হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের দুনিয়াতে কল্যাণ দান করুন এবং আখেরাতেও কল্যাণ দান করুন এবং আমাদের আগুনের আজাব থেকে রক্ষা করুন।" এছাড়া তাঁর আর কোনো সার্বক্ষণিক পাঠ ছিল না।আবদ ইবনে হুমাইদ ইকরিমা থেকে বর্ণনা করেছেন যে,আইয়ামে তাশরীকের দিনগুলোতে এই দোয়াটি পাঠ করা মুস্তাহাব বা পছন্দনীয় মনে করা হতো: "হে আমাদের প্রতিপালক!

আমাদের দুনিয়াতে কল্যাণ দান করুন এবং আখেরাতেও কল্যাণ দান করুন এবং আমাদের আগুনের আজাব থেকে রক্ষা করুন।"আবদ ইবনে হুমাইদ আতা থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: যে ব্যক্তি হজ সম্পাদন শেষে নিজের পরিবারের উদ্দেশ্যে রওনা হবে, তার জন্য উচিত হবে তখন বলা: "হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের দুনিয়াতে কল্যাণ দান করুন এবং আখেরাতেও কল্যাণ দান করুন এবং আমাদের আগুনের আজাব থেকে রক্ষা করুন।"ইবনে জারীর ইবনে যায়দ থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: সে সময় ওই স্থানগুলোতে মানুষ তিন শ্রেণিতে বিভক্ত ছিল: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ও মুমিনগণ, কুফর অবলম্বনকারীগণ এবং নেফাক অবলম্বনকারীগণ।

(প্রথম শ্রেণি সম্পর্কে বলা হয়েছে:) মানুষের মধ্যে এমনও আছে যারা বলে, হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের দুনিয়াতে দান করুন; অথচ আখেরাতে তাদের কোনো অংশ নেই। তারা কেবল দুনিয়ার স্বার্থে এবং পার্থিব যাচনা করার জন্যই হজ করত, তারা আখেরাত কামনা করত না এবং তাতে বিশ্বাসও করত না। (দ্বিতীয় শ্রেণি সম্পর্কে বলা হয়েছে:) এবং তাদের মধ্যে এমনও আছে যারা বলে, হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের দুনিয়াতে কল্যাণ দান করুন এবং আখেরাতেও কল্যাণ দান করুন এবং আমাদের আগুনের আজাব থেকে রক্ষা করুন। আর তৃতীয় শ্রেণি সম্পর্কে বলা হয়েছে: (এবং মানুষের মধ্যে এমন কেউ আছে যার পার্থিব জীবনের কথা আপনাকে মুগ্ধ করে) (সূরা বাকারাহ, আয়াত ২০৪)।ইমাম আহমাদ এবং তিরমিযী—যিনি একে হাসান বলেছেন—আনাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর নিকট এসে জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল!

কোন দোয়াটি সর্বোত্তম? তিনি বললেন: "তুমি তোমার প্রতিপালকের নিকট দুনিয়া ও আখেরাতের ক্ষমা ও নিরাপত্তা প্রার্থনা করো।" অতঃপর তিনি পরের দিন এসে আবার জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! কোন দোয়াটি সর্বোত্তম? তিনি বললেন: "তুমি তোমার প্রতিপালকের নিকট দ্বীন, দুনিয়া ও আখেরাতের ক্ষমা ও নিরাপত্তা প্রার্থনা করো।" তারপর তিনি আবারও পরের দিন এসে জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! কোন দোয়াটি সর্বোত্তম? তিনি বললেন: "তুমি তোমার প্রতিপালকের নিকট দুনিয়া ও আখেরাতের ক্ষমা ও নিরাপত্তা প্রার্থনা করো।" এরপর তিনি চতুর্থ দিন এসে আবার জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল!

কোন দোয়াটি সর্বোত্তম? তিনি বললেন: "তুমি তোমার প্রতিপালকের নিকট দুনিয়া ও আখেরাতের ক্ষমা ও নিরাপত্তা প্রার্থনা করো। কেননা, যদি তোমাকে দুনিয়াতে এই দুটি বিষয় প্রদান করা হয় এবং আখেরাতেও তা দেওয়া হয়, তবে তুমি সফলকাম হলে।"আবদুর রাজ্জাক কাতাদাহ থেকে বর্ণনা করেছেন, মহান আল্লাহর বাণী হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের দুনিয়াতে কল্যাণ দান করুন সম্পর্কে তিনি বলেন: এর অর্থ হলো নিরাপত্তা। এবং আখেরাতেও কল্যাণ দান করুন সম্পর্কে তিনি বলেন: এর অর্থও হলো নিরাপত্তা।ইবনে আবি শায়বা, আবদ ইবনে হুমাইদ, ইবনে জারীর, আয-যাহাবী তাঁর 'ফাদলুল ইলম' গ্রন্থে এবং বায়হাকী 'শুআবুল ঈমান' গ্রন্থে হাসান (বসরি) থেকে বর্ণনা করেছেন; আল্লাহর বাণী {হে আমাদের প্রতিপালক!

আমাদের দুনিয়াতে কল্যাণ দান করুন এবং আখেরাতেও কল্যাণ দান করুন} সম্পর্কে তিনি বলেন: দুনিয়ার কল্যাণ হলো ইলম ও ইবাদত, আর আখেরাতের কল্যাণ হলো জান্নাত।