Al-Baqarah

আল-বাকারা: 34

2:34

আরবি

وَإِذْ قُلْنَا لِلْمَلَـٰٓئِكَةِ ٱسْجُدُوا۟ لِـَٔادَمَ فَسَجَدُوٓا۟ إِلَّآ إِبْلِيسَ أَبَىٰ وَٱسْتَكْبَرَ وَكَانَ مِنَ ٱلْكَـٰفِرِينَ

English Translations

Sahih International

And [mention] when We said to the angels, "Prostrate before Adam"; so they prostrated, except for Iblees. He refused and was arrogant and became of the disbelievers.

Muhsin Khan

And (remember) when We said to the angels: "Prostrate yourselves before Adam.". And they prostrated except Iblis (Satan), he refused and was proud and was one of the disbelievers (disobedient to Allah).

Taqi Usmani

And when We said to the angels: “Prostrate yourselves before ’Ādam!” So, they prostrated themselves, all but Iblīs (Satan). He refused, and became one of the infidels.

Abul Ala Maududi

And when We ordered the angels: “Prostrate yourselves before Adam,” all of them fell prostrate, except Iblis. He refused, and gloried in his arrogance and became one of the defiers.

Pickthall

And when We said unto the angels: Prostrate yourselves before Adam, they fell prostrate, all save Iblis. He demurred through pride, and so became a disbeliever.

Yusuf Ali

And behold, We said to the angels: "Bow down to Adam" and they bowed down. Not so Iblis: he refused and was haughty: He was of those who reject Faith.

বাংলা অনুবাদ

তাইসিরুল কুরআন

যখন আমি ফেরেশতাদেরকে বললাম, আদামকে সাজদাহ কর, তখন ইবলীস ছাড়া সকলেই সাজদাহ করল, সে অমান্য করল ও অহঙ্কার করল, কাজেই সে কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল।

রাওয়াই আল-বায়ান

আর যখন আমি ফেরেশতাদেরকে বললাম, ‘তোমরা আদমকে সিজদা কর’। তখন তারা সিজদা করল, ইবলীস ছাড়া। সে অস্বীকার করল এবং অহঙ্কার করল। আর সে হল কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত।

শাইখ মুজিবুর রহমান

এবং যখন আমি মালাইকা/ফেরেশতাদেরকে বলেছিলাম যে, তোমরা আদমকে সাজদাহ কর, তখন ইবলীস ব্যতীত সকলে সাজদাহ করেছিল; সে অগ্রাহ্য করল ও অহংকার করল এবং কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল।

ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

আর স্মরণ করুন, যখন আমরা ফেরেশতাদের বললাম, আমাকে সিজদা কর, তখন ইবলিশ ছাড়া সকলেই সিজদা করল; সে অস্বীকার করল ও অহংকার করল। আর সে কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত হল।

ফাতহুল মাজীদ

আর (স্মরণ কর) আমি যখন ফেরেশতাগণকে বললাম, তোমরা আদমকে সিজদা কর, তখন ইবলিস ব্যতীত সকলে সিজদা করেছিল। সে অস্বীকার করল ও অহংকার করল এবং কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল।

মুখতাসার

৩৪. আল্লাহ তা‘আলা বর্ণনা করেন যে, তিনি একদা ফিরিশতাদেরকে আদেশ করেছেন আদম (আলাইহিস-সালাম) কে সম্মানের সাজদা দিতে। ফলে তাঁরা আল্লাহর আদেশ পালনার্থে দ্রুত সাজদা করলেন। তবে জিন জাতীয় ইবলিস কিন্তু তা করেনি। সে আল্লাহর সাজদাহর আদেশের উপর আপত্তি জানিয়ে এবং আদম (আলাইহিস-সালাম) এর উপর অহংকার করে তাঁকে সাজদাহ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। ফলে সে কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেলো।

তাফসীর

তাফসীর ইবনে কাসীর

ফেরেশতাদের সিজদা এবং আদম (আঃ)-এর মর্যাদাআল্লাহ তা'আলা হযরত আদম (আঃ)-এর এই বড় মর্যাদার কথা বর্ণনা করে মানুষের উপর তার বড় অনুগ্রহের কথা প্রকাশ করেছেন এবং তাদেরকে হযরত আদম (আঃ)-এর সামনে ফেরেশতাদেরকে সিজদা করার নির্দেশ দেয়ার সংবাদ দিয়েছেন। এর প্রমাণ রূপে বহু হাদীস রয়েছে। একটি তো শাফায়াতের হাদীস যা একটু আগেই বর্ণিত হলো। দ্বিতীয় হাদীসে আছে যে, হযরত মূসা (আঃ) আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা জানিয়ে বলেনঃ “আমাকে হযরত আদম (আঃ)-এর সহিত সাক্ষাৎ করিয়ে দিন যিনি নিজেও বেহেশত হতে বের হয়েছিলেন এবং আমাদেরকেও বের করেছিলেন। দুই নবী (আঃ) একত্রিত হলে হযরত মূসা (আঃ) তাকে বলেনঃ আপনি কি সেই আদম (আঃ) যাকে আল্লাহ স্বহস্তে সৃষ্টি করেছেন, স্বীয় রূহ তাঁর মধ্যে ফুকেছেন এবং তাঁর সামনে ফেরেশতাদেরকে সিজদা করিয়েছেন।' পূর্ণ হাদীস ইনশাআল্লাহ অতি সত্বরই বর্ণিত হবে।শয়তান কিহযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ইবলীস ফেরেশতাদের একটি গোত্রের অন্তর্ভুক্ত ছিল যাদেরকে জ্বীন বলা হয়। তারা অগ্নিশিখা দ্বারা সৃষ্ট ছিল। তার নাম ছিল হারিস এবং সে বেহেশতের খাজাঞ্চি ছিল। এই গোত্রটি ছাড়া অন্যান্য সব ফেরেশতা আলো দ্বারা সৃষ্ট ছিল। কুরআন মাজীদের মধ্যেও এই জ্বীনদের সৃষ্টি কথা বর্ণনা করা হয়েছে, (আরবি) অগ্নিশিখার যে প্রখরতা উপর দিকে উঠে তাকে (আরবি)বলা হয়। এর দ্বারাই জ্বীনদের সৃষ্টি করা হয়েছিল। আর মানুষকে মাটি দ্বারা সৃষ্টি করা হয়েছিল। প্রথমে জ্বীনেরা পৃথিবীতে বাস করতো। তারা বিবাদ বিসম্বাদ ও কাটাকাটি, মারামারি করতে থাকলে আল্লাহ তা'আলা ইবলীসকে ফেরেশতাদের সেনাবাহিনী দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে পাঠিয়ে দেন। ওদেরকেই জ্বীন বলা হতো।ইবলীস ও তার সঙ্গীরা তাদেরকে মেরে কেটে সমুদ্র দ্বীপে এবং পর্বত প্রান্তে তাড়িয়ে দেয়। ইবলীসের অন্তরে এই অহংকাক্সের সৃষ্টি হয়ে গেল যে, সে ছাড়া আর কারও দ্বারা এ কাৰ্ষ সাধন সম্ভব হয়নি। তার অন্তুরের এ পাপ ও আমিত্বের কথা একমাত্র আল্লাহই জানতেন। যখন বিশ্বপ্রভু বললেনঃ “আমি যমীনে খলীফা বানাতে চাই” তখন ফেরেশতারা আরজ করেছিলেনঃ “আপনি এদেরকে কেন সৃষ্টি করবেন যারা পূর্বসম্প্রদায়ের মত ঝগড়া ফাসাদও রক্তারক্তি করবে?” তখন আল্লাহ উত্তরে বললেনঃ “আমি জানি যা তোমরা জাননা, অর্থাৎ ইবলীসের অন্তরে যে ফর ও অহংকার আছে তার জ্ঞান আমারই আছে, তোমাদের নেই।”অতঃপর হযরত আদম (আঃ)-এর মাটি উঠিয়ে আনা হলো। তা ছিল খুবই মসৃণ ও উত্তম। তা খামীর করা হলে আল্লাহ তা'আলা তার দ্বারা হযরত আদম (আঃ) কে হন্তে সৃষ্টি করলেন। চল্লিশ দিন পর্যন্ত তা এ রকমই পুতুলের আকারে ছিল। ইবলীস আসতো ও তার উপর লাথি মেরে দেখতো যে, ওটা কেনফাপা জিনিসের মত শব্দকারী মাটি। অতঃপর সে মুখের ছিদ্র দিয়ে প্রবেশ করে পিছনের ছিদ্র দিয়ে বেরিয়ে আসতো এবং আবার পিছন দিয়ে ঢুকে মুখ দিয়ে বেরিয়ে যেতো। অতঃপর সে বলতোঃ প্রকৃতপক্ষে এটা কোন জিনিসই নয়। আমি যদি এর উপর বিজয়ী হই তবে একে আমি ধ্বংস করে ছাড়বো এবং যদি এর শাসনভার আমার উপর অর্পিত হয় তবে আমি কখনও এটা স্বীকার করবো না।” অতঃপর আল্লাহ অ'আলা এর মধ্যে কুঁদিয়ে রূহ ভৱে দিলেন। ওটা যেখান পর্যন্ত পৌছলো, রক্ত-গোশত হতে থাকলো। যখন রূহ নাভি পর্যন্ত পৌছলো তখন তিনি স্বীয় শরীরকে দেখে খুশী হয়ে গেলেন। এবং তৎক্ষণাৎ উঠার ইচ্ছে করলেন। কিন্তু রূহ তখনও নীচের অংশে পৌছেনি বলে উঠতে পারলেন না। এই তাড়াহুড়ার বর্ণনাই নিম্নের আয়াতে রয়েছেঃ “মানুষকে অধৈর্য ও ত্রস্তরূপে সৃষ্টি করা হয়েছে।” খুণী বা দুবে কোন অবস্থাতেই তার ধৈর্য নেই। যখন রূহ শরীরে পৌছে গেল এবং হাঁচি এলো তখন তিনি বলেনঃ (আরবি) তখন আল্লাহ পাক উত্তরে বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “আল্লাহ তোমার প্রতি সদয় হোক।তারপর শুধুমাত্র ইবলীসের সঙ্গী ফেরেশতাদেরকে আল্লাহ তা'আলা বললেনঃ “আদম (আঃ) কে সিজদা কর।” সবাই সিজদা করলেন, কিন্তু ইবলীসের অহংকার প্রকাশ পেয়ে গেল, সে অমান্য করলো এবং বললোঃ “আমি তার চেয়ে উত্তম, তার চেয়ে আমি বয়সে বড়, তার চেয়ে আমি বেশী শক্তিশালী, সে সৃষ্ট হয়েছে মাটি দ্বারা, আমি সৃষ্ট হয়েছি আগুন দ্বারা এবং আগুন মাটি অপেক্ষা শক্তিশালী।" তার এ অবাধ্যতার কারণে আল্লাহ তা'আলা তাকে স্বীয় রহমত হতে বঞ্চিত করে দেন এবং এ জন্যেই তাকে ইবলীস বলা হয়।তার অবাধ্যতার শাস্তি স্বরূপ আল্লাহ তা'আলা তাকে বিতাড়িত শয়তান করে দিলেন। অতঃপর তিনি হযরত আদম (আঃ) কে মানুষ, জীবজন্তু, জমীন, সমুদ্র পাহাড়-পর্বত ইত্যাদির নাম বলে দিয়ে তাঁকে ঐ সব ফেরেশতার সামনে হাজির করলেন যারা ইবলীসের সঙ্গী ছিল ও আগুন দ্বারা সৃষ্ট ছিল। মহান আল্লাহ তাদেরকে বললেনঃ “তোমরা যদি এ কথায় সত্যবাদী হও যে, আমি জমীনে খলীফা পাঠাবো না, তবে তোমরা আমাকে এ জিনিসগুলোর নাম বলে দাও?” যখন ফেরেশতারা দেখলো যে, আল্লাহ তাদের পূর্ব কথায় অসন্তুষ্ট হয়েছেন, কাজেই তারা বললোঃ হে আল্লাহ! আপনি পবিত্র। আমরা আমাদের পূর্ব কথা হতে প্রত্যাবর্তন করছি এবং স্বীকার করছি যে, আমরা ভবিষ্যতের কথা জানি। আমরা তো শুধু ঐটুকুই জানতে পারি যেটুকু আপনি আমাদেরকে জানিয়ে দেবেন। আমরা তো শুধু ঐটুকুই জানতে পারি যেটুকু আপনি আমাদেরকে শিখিয়ে দিয়েছেন। এখন আল্লাহ পাক হযরত আদম (আঃ)কে ওগুলোর নাম তাদেরকে বলে দিতে আদেশ করলেন। হযরত আদম (আঃ) তাদেরকে ওগুলোর নাম বলে দিলেন। আল্লাহ তা'আলা তখন তাদেরকে সম্বোধন কব্রে বললেনঃ “হে ফেরেশতার দল! আমি কি তোমাদেরকে বলিনি যে, আকাশ জমীনের অদৃশ্য বস্তুর জ্ঞান একমাত্র আমারই আছে আর কারও নেই? আমি প্রত্যেক গোপনীয় বিষয় ঠিক ঐরূপই জানি যেমন জানি প্রকাশ্য বিষয়সমূহ। অর্থাৎ ইবলীসের গোপনীয় অহংকারের কথাও আমি জানতাম। আর তোমরা তার মোটেই খবর রাখতে না।" কিন্তু এ মতটি গরীব এবং এর মধ্যে এমন কতকগুলো কথা আছে সেগুলো সমালোচনার যোগ্য। আমরা যদি ওগুলো পৃথক পৃথকভাবে বর্ণনা করি তবে বিষয়টি খুব দীর্ঘ হয়ে যাবে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) পর্যন্ত এ হাদীসটির সনদও ওটাই যা হতে তার প্রসিদ্ধ তাফসীর বর্ণিত আছে। এ রুকমই আরও একটি হাদীস বর্ণিত আছে, তাতে কিছুহ্রাস বৃদ্ধিও রয়েছে। তার মধ্যে এটাও আছে যে, ভূপৃষ্ঠের মাটি নেয়ার জন্যে হযরত জিবরাঈল (আঃ) জমীনে গেলে জমীন বললোঃ “আপনি আমা হতে কিছু কমিয়ে দেবেন এ জন্যে আমি আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাচ্ছি।” তিনি ফিব্রে অসলেন। অতঃ আল্লাহ তা'আলা মরণের ফেরেশতা (আযরাইল আঃ) কে পাঠালেন। জমীন তাকেও ঐ কথাই বললো। কিন্তু তিনি উত্তরে বললেনঃ “আমি যে মহান আল্লাহর আদেশ পুৱা না করেই ফিরে যাবো এ থেকে আমিও তাঁর নিকট আশ্রয় চাচ্ছি।” সুতরাং তিনি সমস্ত ভূ-পৃষ্ঠ হতে একমুষ্টি মাটি গ্রহণ করলেন। মাটির রং কোন স্থানে লাল, কোন জায়গায় সাদা এবং কোথাও বা কালো ছিল বলে মানুষের রং বিভিন্ন প্রকারের হয়েছে। কিন্তু এ হাদীসটিও বনী ইসরাঈলের কথায় পরিপূর্ণ। এর মধ্যে বেশীর ভাগই পূর্ববর্তী লোকদের কথা মিলিয়ে দেয়া হয়েছে। ওগুলো সাহাবীদের (রাঃ) কথা হলেও তাঁরা হয়তো পূর্ববর্তী কিতাবসমূহ হতে তা গ্রহণ করে থাকবেন। আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন। হাকিম তার মুসতাদরিক’ গ্রন্থে এরূপ বহু বর্ণনা এনেছেন এবং ওগুলোর সনদকে বুখারীর (রঃ) শর্তের উপর বলেছেন। ভাবার্থ এই যে, যখন আল্লাহ তা'আলা ফেরেশতাদেরকে বললেনঃ “তোমরা হযরত আদম (আঃ) কে সিজদা কর”-ইবলীসও এই সম্বোধনের অন্তর্ভুক্ত ছিল। কেননা, যদিও সে তাদের অন্তর্ভুক্ত ছিল না, কিন্তু সে তাদের মতই ছিল এবং তাদের মতই কাজ করতো। সুতরাং সম্বোধনের অন্তর্ভুক্ত সেও ছিল। আর এজন্যেই অমান্য করার শাস্তি তাকে ভোগ করতে হয়েছে। এর ব্যাখ্যা ইনশাআল্লাহ। (আরবি)-এর তাফসীরে আসবে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন সে, অবাধ্যতার পূর্বে যে ফেরেশতাদের মধ্যে ছিল, তার নাম আযীল। ভূ-পৃষ্ঠে ছিল তার বাসস্থান। বিদ্যা ও জ্ঞানে সে খুব বড় ছিল। এ জন্যেই তার মস্তিষ্ক অহংকারের ভরপুর ছিল। তার ও তার দলের সম্পর্ক ছিল জ্বীনদের সঙ্গে। তার চারটি ডানা ছিল। সে ছিল বেহেশতের খাজাঞ্চী। জমীন ও দুনিয়ার আকাশের সে ছিল সম্রাট। হযরত হাসান (রঃ) বলেন যে, ইবলীস কখনও ফেরেশতা ছিল না। তার মূল বা গোড়া হলো জ্বীন হতে। যেমন হযরত আদম (আঃ)-এর মূল মানুষ হতে। এর ইসনাদ সঠিক।আবদুর রহমান বিন যায়েদ বিন আসলাম (রঃ) ও শহর বিন হাওশাব (রঃ) -এর এটাই মত। হযরত সা’দ বিন মাসউদ (রঃ) বলেন যে, ফেরেশতাগণ। জীনদের কতককে মেরে ফেলেছিলেন এবং কতকগুলোকে বন্দী করে আকাশের উপর নিয়ে গিয়েছিলেন। তথায় তারা ইবাদতের জন্যে রয়ে গিয়েছিল। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে এও বর্ণিত আছে যে, প্রথমে আল্লাহ একটি মাখলুক সৃষ্টি করেন। হযরত আদম (আঃ)-কে সিজদা করার জন্যে তাদেরকে নির্দেশ দেন। তা তারা অমান্য করে এবং এর ফলে তাদেরকে পুড়িয়ে ফেলা হয়। অতঃপর তিনি দ্বিতীয় মাখলুক সৃষ্টি করেন তাদেরও এ অবস্থাই ঘটে। তার পরে তিনি তৃতীয় মাখলুক সৃষ্টি করেন এবং তারা আদেশ পালন করে। কিন্তু এ হাদীসটিও গরীব এবং এর ইসনাদ সঠিক নয়। এর একজন বর্ণনাকারীর উপর সন্দেহ পোষণ করা হয়। সুতরাং এটা প্রমাণ যোগ্য নয়। ইবলীসের গোড়াই ছিল কুফর ও ভ্রান্তির উপর। কিছু দিন সঠিকভাবে চলেছিল। কিন্তু পুনরায় স্বীয় মূলের উপর এসে পড়েছিল। সিজদা করার নির্দেশ পালন ছিল আল্লাহর আনুগত্য স্বীকার ও হযরত আদম (আঃ)-এর প্রতি সম্মান প্রদর্শন।কেউ কেউ বলেন যে, এই সিজদাহ্ ছিল সালাম প্রদান ও সম্মান প্রদর্শনের সিজদা। হযরত ইউসুফ (আঃ). এর ব্যাপারে রয়েছে যে, তিনি তার পিতাকে সিংহাসনে বসিয়ে দেন এবং সবাই সিজদায় পড়ে যায়। তখন হযরত ইউসুফ (আঃ) বলেনঃ “হে পিতা! এটাই আমার স্বপ্নের ব্যাখ্যা যা আমার প্রভু সত্যরূপে দেখিয়েছেন। পূর্ববর্তী উম্মতদের জন্য এটা বৈধ ছিল, কিন্তু আমাদের ধর্মে এটা রহিত হয়ে গেছে।হযরত মুআয (রাঃ) বলেনঃ “আমি সিরিয়াবাসীকে তাদের নেতৃবর্গ এবং আলেমদের সামনে সিজদা করতে দেখেছিলাম। কাজেই আল্লাহর রাসূল (সঃ) কে বলি-হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি সিজদা পাওয়ার বেশী হকদার।" তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আমি যদি কোন মানুষকে কোন মানুষের সামনে সিজদা করার অনুমতি দিতে পারতাম তবে নারীদেরকে নির্দেশ দিতাম যে, তারা যেন তাদের স্বামীকে সিজদা করে। কেননা তাদের ওদের উপর বড় হক রয়েছে।" ইমাম রাযী (রঃ) এটাকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। কেউ কেউ বলেন যে, সিজদা ছিল আল্লাহ তা'আলার জন্যে। হযরত আদম (আঃ) কিবলাহ হিসেবে ছিলেন। কিন্তু এটা বিবেচ্য বিষয়। প্রথম মতটিই বেশী স্পষ্ট এবং উত্তম বলে মনে হচ্ছে। এই সিজদা ছিল হযরত আদম (আঃ)-এর প্রতি সম্মান প্রদর্শন ও সালাম প্রদান হিসেবে। আর এটা মহান আল্লাহর আনুগত্যের উপরেই ছিল। কেননা ওটা ছিল তাঁর নির্দেশ, কাজেই ওটা অবশ্যই পালনীয় ছিল। ইমাম রাযীও (রঃ) এই মতকেই জোরালো বলেছেন এবং অন্য দুটি মতকে দুর্বল বলেছেন। মত দু’টির একটি হচ্ছে হযরত আদম (আঃ)-এর কিবলাহ হিসেবে হওয়া, এতে বড় একটা মর্যাদা প্রকাশ পায় না। আর অপরটি হচ্ছে সিজদার ভাবার্থ লওয়া অপারগতা ও হীনতা স্বীকার, মাটিতে কপাল রেখে প্রকৃত সিজদাহ্ করা নয়। কিন্তু এ দুটো ব্যাখ্যাই দুর্বল। হযরত কাতাদ (রঃ) বলেন যে, এই অহংকারের পাপই ছিল সর্বপ্রথম পাপ যা ইবলীস হতে প্রকাশ পেয়েছে। বিশুদ্ধ হাদীসে আছে যে, যার অন্তরে সরিষার দানা পরিমাণ অহংকার থাকবে সে বেহেশতে প্রবেশ লাভ করবে না। এই অহংকার, কুফর এবং অবাধ্যতার কারণেই ইবলীসের গলদেশে অবিসম্পাতের গলাবন্ধ লেগে গেছে এবং মহান আল্লাহর রহমত হতে নিরাশ হয়ে তার দরবার হতে বিতাড়িত হয়েছে। (আরবি)-এখানে শব্দটি (আরবি)-এর অর্থে ব্যবহৃত হওয়ার কথাও বলা হয়েছে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “যাদেরকে ডুবানো হলো সে তাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল। অন্যত্র বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তুমি অত্যাচারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে।” কবিদের কবিতাতেও শব্দটি এ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। তা হলে অর্থ হচ্ছেঃ “সে কাফির হয়ে গেল।” ইবনে ফোরাক বলেন যে, সে আল্লাহর ইলমে কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত ছিল। কুরতুবী (রঃ) একেই প্রাধান্য দিয়েছেন এবং একটি মাসয়ালা বর্ণনা করেছেন যে, কোন লোকের হাতে অলৌকিক কিছু প্রকাশ পাওয়া তার আল্লাহর ওয়ালী হওয়ার প্রমাণ নয়-যদিও কতকগুলো সূফী ও ব্রাফেযী এর বিপরীত বলে থাকে। কেননা, আমরা কারও জন্যে এ কথার ফায়সালা দিতে পারি না যে, সে ঈমানের অবস্থাতেই আল্লাহর সঙ্গে মিলিত হবে। এ শয়তানের প্রতি লক্ষ্য করলেই বুঝা যাবে যে, ওয়ালী তো দুরের কথা, সে ফেরেশতা হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু শেষে কাফিরদের নেতা হয়ে গেল। তাছাড়া কতকগুলো অলৌকিক কাজ যা বাহ্যত কারামাত রূপে পরিলক্ষিত হয়, তা আল্লাহর ওয়ালীগণ ছাড়া অন্যান্য লোকের হাতেও প্রকাশ পেয়ে থাকে। এমনকি ফাসিক, ফাজির, মুশরিক এবং কাফিরের হাতেও প্রকাশ পেয়ে থাকে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) কুরআন মাজীদের (আরবি) (৪৪:১০) এই আয়াতটি অদ্ভরে গোপন রেখে যখন ইবনে সাইয়াদ নামক একজন কাফিরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “বলতো, আমি অন্তুরে কি গোপন রেখেছি?" সে বলঃ (আরবি)। কোন বর্ণনায় আছে যে, রাগের সময় সে এত ফুলে উঠতো যে, তার দেহ দ্বারা সে সমস্ত পথ বন্ধ করে দিতে। হযরত আবদুল্লাহ বিন আমর (রাঃ) তাকে হত্যা করেন।দাজ্জালের এরূপ বহু কথা তো হাদীসসমূহে এসেছে। যেমন তার আকাশ হতে বৃষ্টি বর্ষণ করা, ভূ-পৃষ্ঠ হতে শস্য উৎপাদন করা, পৃথিবীর ধনভাণ্ডার তার পিছনে লেগে যাওয়া, এক যুবককে হত্যা করে পুনরায় জীবিত করা ইত্যাদি। হযরত লায়েস বিন সা'দ (রাঃ) এবং হযরত ইমাম শাফিঈ (রঃ) বলেনঃ “যদি তোমরা কোন মানুষকে পানির উপর চলতে দেখ, তবে তাকে আল্লাহর ওয়ালী মনে করো না, যে পর্যন্ত না তার সমস্ত কাজ কর্ম কুরআন ও হাদীস অনুযায়ী হয়।” আকাশ ও পৃথিবীর সমস্ত ফেরেশতার উপর এই সিজদার নির্দেশ ছিল, যদিও একটি দলের এই মতও রয়েছে যে, এই নির্দেশ শুধু জমীনের ফেরেশতাদের উপর ছিল। কিন্তু এটা ঠিক নয়। কুরআন মাজীদের মধ্যে রয়েছেঃ “ইবলীস ছাড়া সমস্ত ফেরেশতাই সিজদা করেছিল।” এখানে শুধু ইবলীসকেই পৃথক করা হয়েছে। কাজেই বুঝা যাচ্ছে যে, সিজদার এ আদেশ ছিল সাধারণ। জমীন ও আসমান উভয় স্থানের ফেরেশতাদের উপরই সিজদার নির্দেশ ছিল। আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন।

তাফসীর আবু বকর যাকারিয়া

আর স্মরণ করুন, যখন আমরা ফেরেশতাদের বললাম, আমাকে সিজদা করো [১], তখন ইবলিশ [২] ছাড়া সকলেই সিজদা করলো ; সে অস্বীকার করলো ও অহংকার করলো [৩]। আর সে কাফেরদের অন্তর্ভুক্ত হলো [৪]।

[১] এ আয়াতে বাহ্যতঃ যে কথা বর্ণনা করা হয়েছে তা এই যে, আদম '‘আলাইহিস সালামকে সিজদা করার হুকুম ফেরেশতাদেরকে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু পরে যখন এ কথা বলা হলো যে, ইবলীস ব্যতীত সব ফেরেশতাই সিজদা করলেন, তখন তাতে প্রমাণিত হলো যে, সিজদার নির্দেশ ইবলিসের প্রতিও ছিল। কিন্তু নির্দেশ প্রদান করতে গিয়ে শুধু ফেরেশতাগণের উল্লেখ এ জন্য করা হলো যে, তারাই ছিল সর্বোত্তম ও সর্বশ্রেষ্ঠ। যখন তাদেরকে আদম '‘আলাইহিস সালাম-এর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের নির্দেশ দেয়া হলো, তাতে ইবলিস অতি উত্তম রূপে এ নির্দেশের অন্তর্ভুক্ত বলে জানা গেল। অথবা সে যেহেতু ফেরেশতাদের দলের মধ্যেই অবস্থান করছিল তখন তাকে অবশ্যই নির্দেশ পালন করতে হত। সে নিজেকে নির্দেশের বাইরে মনে করার কোন যৌক্তিক কারণ নেই। শুধুমাত্র তার গর্ব ও অহঙ্কারই তাকে তা করতে বাধা দিচ্ছিল। [ইবনে কাসীর]

এ আয়াতে আদম ‘‘আলাইহিস সালামকে সেজদা করতে ফেরেশতাদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সূরা ইউসুফ-এ ইউসুফ ‘আলাইহিস সালাম-এর পিতা-মাতা ও ভাইগণ মিশর পৌছার পর ইউসুফকে সিজদা করেছিলেন বলে উল্লেখ রয়েছে। এটা সুস্পষ্ট যে, এ সিজদা ‘ইবাদাতের উদ্দেশ্যে হতে পারে না। কেননা, আল্লাহ্‌ ব্যতীত অপরের ইবাদাত শির্ক ও কুফরী। কোন কালে কোন শরীআতে এরূপ কাজের বৈধতার কোন সম্ভাবনাই থাকতে পারে না। সুতরাং এর অর্থ এছাড়া অন্য কোন কিছুই হতে পারে না যে, প্রাচীনকালের সিজদা আমাদের কালের সালাম, মুসাফাহা, মু'আনাকা, হাতে চুমো খাওয়া এবং সম্মান প্রদর্শনার্থে দাঁড়িয়ে যাওয়ার সমার্থক ও সমতুল্য ছিল। ইমাম জাসসাস আহকামুল কুরআন গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন যে, পূর্ববতী নবীগণের শরীআতে বড়দের প্রতি সম্মানসূচক সিজদা করা বৈধ ছিল। শরীআতে মুহাম্মদীতে তা রহিত হয়ে গেছে। বড়দের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের পদ্ধতি হিসেবে এখন শুধু সালাম ও মুসাফাহার অনুমতি রয়েছে। রুকূ’-সিজদা এবং সালাতের মত করে হাত বেঁধে কারো সম্মানার্থে দাড়ানোকে অবৈধ বলে ঘোষণা করা হয়েছে। [আহকামুল কুরআন লিল জাসসাস]

এখানে প্রশ্ন থেকে যায়, সিজদায়ে তা’জিমী বা সম্মানসূচক সিজদার বৈধতার প্রমাণ তো কুরআনুল কারীমের উল্লেখিত আয়াতসমূহে পাওয়া যায়, কিন্তু তা রহিত হওয়ার দলীল কি? উত্তর এই যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামএর অনেক হাদীস দ্বারা সিজদায়ে তা’জিমী হারাম বলে প্রমাণিত হয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু '‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, যদি আমি আল্লাহ্‌ তা'আলা ব্যতীত অন্য কারো প্রতি সিজদা করা জায়েয মনে করতাম, তবে স্বামীকে তাঁর বৃহৎ অধিকারের কারণে সিজদা করার জন্য স্ত্রীকে নির্দেশ দিতাম, কিন্তু এই শরীআতে সিজদায়ে- তা’জিমী সম্পূর্ণ হারাম বলে কাউকে সিজদা করা কারো পক্ষে জায়েয নয়’। [মুসনাদে আহমাদঃ ৩/১৫৮]

[২] ‘ইবলিস’ শব্দের অর্থ হচ্ছে ‘চরম হতাশ’। আর পারিভাষিক অর্থে এমন একটি জিনকে ইবলিস বলা হয় যে আল্লাহ্‌র হুকুমের নাফরমানী করে আদম ও আদম-সন্তানদের অনুগত ও তাদের জন্য বিজিত হতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। মানব জাতিকে পথভ্রষ্ট করার ও কেয়ামত পর্যন্ত তাদেরকে ভুল পথে চলার প্রেরণা দান করার জন্য সে আল্লাহ্‌র কাছে সময় ও সুযোগ প্রার্থনা করেছিল। আসলে শয়তান ও ইবলিস মানুষের মত একটি কায়াসম্পন্ন প্রাণীসত্তা। তাছাড়া সে ফেরেশতাদের অন্তর্ভুক্ত ছিল, এ ভুল ধারণাও কারো না থাকা উচিত। কারণ পরবর্তী আলোচনাগুলোতে কুরআন নিজেই তার জীনদের অন্তর্ভুক্ত থাকার এবং ফেরেশতাদের থেকে আলাদা একটি স্বতন্ত্র শ্রেণীর সৃষ্টি হওয়ার ব্যাপারে সুস্পষ্ট বক্তব্য পরিবেশন করেছে।

[৩] হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “যার অন্তরে সরিষার দানা পরিমাণ অহঙ্কারও অবশিষ্ট থাকবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না। ” [আবুদাউদ: ৪০৯১] আর ইবলীসের মন ছিল গর্ব ও অহঙ্কারে পরিপূর্ণ। সুতরাং আল্লাহ্‌র সমীপ থেকে দূরিভূত হওয়াই ছিল তার জন্য যুক্তিযুক্ত শাস্তি।

[৪] সুদ্দী বলেন, সে ঐ সমস্ত কাফেরদের অন্তর্ভুক্ত হল যাদেরকে আল্লাহ্‌ তখনও সৃষ্টি করেননি। যারা তার পরে কাফের হবে সে তাদের অন্তর্ভুক্ত হল। মুহাম্মাদ ইবনে কাব আল-কুরায়ী বলেন, আল্লাহ্‌ ইবলীসকে কুফর ও পথভ্রষ্টতার উপরই সৃষ্টি করেছেন, তারপর সে ফেরেশতাদের আমল করলেও পরবর্তীতে যে কুফরির উপর তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে সে তার দিকেই ফিরে গেল। [ইবনে কাসীর]