Al-Baqarah
আল-বাকারা: 144
2 আল-বাকারা Al-Baqarah · 286 আয়াত البقرة
মূল আরবি
قَدْ نَرَىٰ تَقَلُّبَ وَجْهِكَ فِى ٱلسَّمَآءِ ۖ فَلَنُوَلِّيَنَّكَ قِبْلَةً تَرْضَىٰهَا ۚ فَوَلِّ وَجْهَكَ شَطْرَ ٱلْمَسْجِدِ ٱلْحَرَامِ ۚ وَحَيْثُ مَا كُنتُمْ فَوَلُّوا۟ وُجُوهَكُمْ شَطْرَهُۥ ۗ وَإِنَّ ٱلَّذِينَ أُوتُوا۟ ٱلْكِتَـٰبَ لَيَعْلَمُونَ أَنَّهُ ٱلْحَقُّ مِن رَّبِّهِمْ ۗ وَمَا ٱللَّهُ بِغَـٰفِلٍ عَمَّا يَعْمَلُونَ
English Translations
We have certainly seen the turning of your face, [O Muḥammad], toward the heaven, and We will surely turn you to a qiblah with which you will be pleased. So turn your face [i.e., yourself] toward al-Masjid al-Ḥarām. And wherever you [believers] are, turn your faces [i.e., yourselves] toward it [in prayer]. Indeed, those who have been given the Scripture [i.e., the Jews and the Christians] well know that it is the truth from their Lord. And Allāh is not unaware of what they do.
Verily! We have seen the turning of your (Muhammad's SAW) face towards the heaven. Surely, We shall turn you to a Qiblah (prayer direction) that shall please you, so turn your face in the direction of Al-Masjid- al-Haram (at Makkah). And wheresoever you people are, turn your faces (in prayer) in that direction. Certainly, the people who were given the Scriptures (i.e. Jews and the Christians) know well that, that (your turning towards the direction of the Ka'bah at Makkah in prayers) is the truth from their Lord. And Allah is not unaware of what they do.
We have been seeing you turning your face to the heavens. So, We will certainly assign to you a Qiblah that you would like. Now, turn your face in the direction of the Sacred Mosque (Al-Masjid-ul-Harām), and (O Muslims), wherever you are, turn your faces in its direction. Even those who have been given the Book know well that it is the truth from their Lord, and Allah is not unaware of what they do.
We see you oft turning your face towards the sky; now We are turning you to the direction that will satisfy you. Turn your face towards the Holy Mosque, and wherever you are, turn your faces towards it in Prayer.Those who have been granted the Scripture certainly know that this (injunction to change the direction of Prayer) is right and is from their Lord. Allah is not heedless of what they do.
We have seen the turning of thy face to heaven (for guidance, O Muhammad). And now verily We shall make thee turn (in prayer) toward a qiblah which is dear to thee. So turn thy face toward the Inviolable Place of Worship, and ye (O Muslims), wheresoever ye may be, turn your faces (when ye pray) toward it. Lo! Those who have received the Scripture know that (this revelation) is the Truth from their Lord. And Allah is not unaware of what they do.
We see the turning of thy face (for guidance to the heavens: now Shall We turn thee to a Qibla that shall please thee. Turn then Thy face in the direction of the sacred Mosque: Wherever ye are, turn your faces in that direction. The people of the Book know well that that is the truth from their Lord. Nor is Allah unmindful of what they do.
বাংলা অনুবাদ
নিশ্চয়ই আমি তোমার আকাশের দিকে মুখ ফিরিয়ে দেখাকে লক্ষ্য করেছি, যে ক্বিবলা তুমি পছন্দ কর, আমি তোমাকে সেদিকে ফিরে যেতে আদেশ করছি। তুমি মাসজিদুল হারামের দিকে মুখ ফিরাও এবং তোমরা যেখানেই থাক, ওরই দিকে মুখ ফিরাও; বস্তুতঃ যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদের জানা আছে যে, ক্বিবলার পরিবর্তন তাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে প্রকৃতই সত্য এবং তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে মোটেই গাফিল নন।
আকাশের দিকে বার বার তোমার মুখ ফিরানো আমি অবশ্যই দেখছি। অতএব আমি অবশ্যই তোমাকে এমন কিবলার দিকে ফিরাব, যা তুমি পছন্দ কর। সুতরাং তোমার চেহারা মাসজিদুল হারামের দিকে ফিরাও এবং তোমরা যেখানেই থাক, তার দিকেই তোমাদের চেহারা ফিরাও। আর নিশ্চয় যারা কিতাবপ্রাপ্ত হয়েছে, তারা অবশ্যই জানে যে, তা তাদের রবের পক্ষ থেকে সত্য এবং তারা যা করে, সে ব্যাপারে আল্লাহ গাফিল নন।
নিশ্চয়ই আমি আকাশের দিকে তোমার মুখমন্ডল উত্তোলন অবলোকন করেছি। তাই আমি তোমাকে ঐ কিবলাহমুখীই করাচ্ছি যা তুমি কামনা করছো। অতএব তুমি মাসজিদুল হারামের দিকে তোমার মুখমন্ডল ফিরিয়ে দাও এবং তোমরা যেখানেই থাক তোমাদের আনন সে দিকেই প্রত্যাবর্তিত কর; এবং নিশ্চয়ই যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তারা অবশ্যই অবগত আছে যে, নিশ্চয়ই এটি তাদের রবের নিকট হতে প্রেরিত সত্য; এবং তারা যা করছে তদ্বিষয়ে আল্লাহ অমনোযোগী নন।
অবশ্যই আমরা আকাশের দিকে আপনার বারবার তাকানো লক্ষ্য করি। সুতরাং অবশ্যই আমরা আপনাকে এমন কিবলার দিকে ফিরিয়ে দিব যা আপনি পছন্দ করেন। অতএব আপনি মসজিদুল হারামের দিকে চেহারা ফিরান। আর তোমরা যেখানেই থাক না কেন তোমাদের চেহারাসমূহকে এর দিকে ফিরাও এবং নিশ্চয় যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তারা অবশ্যই জানে যে, এটা তাদের রবের পক্ষ হতে হক। আর তারা যা করে সে সম্পর্কে আল্লাহ্ গাফেল নন।
নিশ্চয়ই আমি আকাশের দিকে তোমার চেহারা উঠানো দেখতে পাচ্ছি। তাই আমি তোমাকে ঐ কেবলামুখীই করব যা তুমি কামনা করছ; অতএব, তুমি মাসজিদে হারামের দিকে (কা‘বার দিকে) তোমার মুখমণ্ডল ফিরিয়ে নাও এবং তোমরা যেখানে আছ তোমাদের মুখ সে দিকেই ঘুরাও; আর নিশ্চয়ই যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তারা অবশ্যই অবগত আছে যে, নিশ্চয়ই এটা তাদের প্রতিপালকের নিকট হতে সত্য এবং তারা যা করছে সে বিষয়ে আল্লাহ গাফেল নন।
১৪৪. হে নবী! আমি আপনাকে ক্বিবলার ব্যাপারে নতুন ওহি তথা আপনার পছন্দসই ক্বিবলার দিকে মুখ ফিরানোর আদেশের অপেক্ষায় আপনার চেহারা ও দৃষ্টিকে বার বার আকাশের দিকে উঠাতে দেখেছি। তাই আমি বলছি, আমি অবশ্যই আপনাকে বাইতুল-মাক্বদিসের পরিবর্তে আপনার পছন্দসই তথা বাইতুল্লাহিল-হারামের দিকে মুখ ফিরানোর আদেশ করবো। সুতরাং আমি আপনাকে আদেশ করছি, আপনি এখন থেকে নিজ চেহারাকে মক্কার বাইতুল্লাহিল-হারামের দিকে ফিরান। হে মু’মিনরা! তোমরা যেখানেই থাকো না কেন তোমরা অবশ্যই নামায আদায়ের সময় সেদিকেই মুখ ফিরাবে। কিতাবধারী ইহুদি ও খ্রিষ্টানরা নিশ্চয়ই জানে যে, ক্বিবলা পরিবর্তনের বিধানটি সত্য একটি বিষয় যা তাদের স্রষ্টা ও নিয়ন্ত্রক আল্লাহ তা‘আলার কাছ থেকেই নাযিল করা হয়েছে। যা তাদের কিতাবগুলোতেও বিবৃত হয়েছে। নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা সত্যবিমুখী লোকদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে গাফিল নন। বরং আল্লাহ তা‘আলা সবই জানেন এবং তিনি অচিরেই এর প্রতিদান দিবেন।
তাফসীর
হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, কুরআন মাজীদের মধ্যে প্রথম ‘নসখ’ হচ্ছে কিবলাহর হুকুম। রাসূলুল্লাহ (সঃ) মদীনায় হিজরত করেন। এখানকার অধিকাংশ অধিবাসী ছিল ইয়াহূদী। আল্লাহ তাঁকে বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে নামায পড়ার নির্দেশ দেন। ইয়াহুদীরা এতে খুবই খুশী হয়। তিনি কয়েক মাস পর্যন্ত ঐ দিকেই নামায পড়েন। কিন্তু স্বয়ং তাঁর মনের বাসনা ছিল হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর কিবলাহ্। তিনি আল্লাহ তাআলার নিকট প্রার্থনা জানাতেন। প্রায়ই তিনি আকাশের দিকে চক্ষু উত্তোলন করতেন। অবশেষে এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। এতে ইয়াহূদীরা বলতে থাকেঃ তিনি এই কিবলাহ্ হতে সরে গেলেন কেন?
এর উত্তরে বলা হয় যে, পূর্ব ও পশ্চিমের মালিক একমাত্র আল্লাহ। আল্লাহ তা'আলা আরও বলেনঃ “যে দিকেই তোমাদের মুখ হয়-আল্লাহ সেই দিকেই রয়েছেন। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, পূর্ব কিবলাহ ছিল পরীক্ষামূলক। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) নামাযের পরে স্বীয় মস্তক আকাশের দিকে উত্তোলন করতেন। তখন এই আয়াত অবতীর্ণ হয় এবং মসজিদে হারামের দিকে মুখ করার নির্দেশ দেয়া হয়। হযরত জিবরাঈল (আঃ) ইমামতি করেন।হযরত আবদুল্লাহ বিন উমার (রাঃ) মসজিদে হারামে' মীযাবের সামনে বসে এই পবিত্র আয়াতটি পাঠ করেন এবং বলেনঃ মীযাব কা'বার দিকে রয়েছে।
ইমাম শাফেঈ (রঃ)-এরও একটি উক্তি এই রয়েছে যে, ঠিক কাবার দিকে মুখ করাই হচ্ছে আসল উদ্দেশ্য। তাঁর দ্বিতীয় উক্তি এই যে, মুখ কাবার দিকে হওয়াই যথেষ্ট। আবুল আলিয়া (রঃ) মুজাহিদ (রঃ), ইকরামা (রঃ), সাঈদ বিন যুবাইর (রঃ), রাবী বিন আনাস (রঃ), প্রভৃতি মণীষীরও উক্তি এটাই। একটি হাদীসের মধ্যেও রয়েছে যে, পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যবর্তী স্থানে কিবলাহ্ রয়েছে। ইবনে জুরাইজ-এর গ্রন্থে হাদীস রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ মসজিদে হারামের অধিবাসীদের কিবলাহ্ হচ্ছে বায়তুল্লাহ। হারাম’ বাসীদের কিবলাহ হলো মসজিদ'। আর হারাম কিবলাহ্ হচ্ছে সমগ্র পৃথিবী বাসীর।
পূর্বেই থাক বা পশ্চিমেই থাক, আমার সমস্ত উম্মতের কিবলাহ্ এটাই। ‘আবু নাঈম’ নামক পুস্তকে হযরত বারা' (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) মোল বা সতেরো মাস পর্যন্ত বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ করে নামায পড়লেও বায়তুল্লাহ শরীফের দিকে নামায পড়াই তিনি পছন্দ করতেন। সুতরাং মহান আল্লাহর নির্দেশক্রমে তিনি বায়তুল্লাহ শরীফের দিকে মুখ করে আসরেরনামায আদায় করেন। অতঃপর তাঁর সাথে নামায আদায়কারীগণের মধ্যে এক ব্যক্তি অন্য একটি মসজিদের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। ঐ মসজিদে নামাযীরা সেই সময় রুকুতে ছিলেন। ঐ লোকটি তাঁদেরকে লক্ষ্য করে বলেনঃ আল্লাহর শপথ!
আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সঙ্গে মক্কা শরীফের দিকে মুখ করে নামায আদায় করেছি।' একথা শুনা মাত্রই তাঁরা যে অবস্থায় ছিলেন সেই অবস্থাতেই বায়তুল্লাহ শরীফের দিকে ফিরে যান। আবদুর রাজ্জাকও কিছু হ্রাস-বৃদ্ধির সাথে এটা বর্ণনা করেছেন। সুনানে নাসায়ীর মধ্যে হযরত আবু সাঈদ বিন মুআল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ “আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর যুগে ফজরের সময় মসজিদে নব্বীতে (সঃ) যেতাম এবং তথায় কিছু নফল নামায আদায় করতাম। একদিন আমরা গিয়ে দেখি যে, নবী (সঃ) মিম্বারের উপর বসে আছেন। আমি বলি যে আজ নিশ্চয় কোন নতুন কথা হয়েছে। আমিও বসে পড়ি।
রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন (আরবি) এই আয়াতটি পাঠ করেন। আমি আমার সঙ্গীদেরকে বলি আসুন, আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বক্তৃতা শেষ করার পূর্বেই এই নতুন নির্দেশকে কার্যে পরিণত করি এবং প্রথমেই আমরা আদেশ মান্যকারী হয়ে যাই। এই বলে আমরা একদিকে চলে যাই এবং সর্বপ্রথম বায়তুল্লাহ শরীফের দিকে মুখ করে নামায আদায় করি। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) মিম্বার হতে নেমে আসেন এবং কিবলাহর দিকে মুখ করে সর্বপ্রথম যুহরের নামায আদায় করেন। তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই' গ্রন্থে হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) কাবার দিকে মুখ করে সর্বপ্রথম যে নামায আদায় করেন তা যুহরের নামায ছিল।
আর এই নামাযই হচ্ছে সালাত-ই-ওসতা। কিন্তু কা'বার দিকে মুখ করে রাসূলুল্লাহ (সঃ) সর্বপ্রথম যে আসরের নামায আদায় করেন এটাই বেশী প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। এজন্যেই কুবাবাসী পরের দিন ফজরের নামাযে এই সংবাদ পেয়েছিল। তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই' গ্রন্থে হযরত নুওয়াইলা’ বিনতে মুসলিম (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ “আমরা বানু হারিসার মসজিদে বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে যুহর বা আসরের নামায পড়ছিলাম। আমাদের দু'রাকআত নামায পড়া হয়ে গেছে, এমন সময় কে একজন এসে কিবলাহ পরিবর্তনের সংবাদ দেয়। ফলে, আমরা নামাযের মধ্যেই বায়তুল্লাহর দিকে ঘুরে যাই এবং অবশিষ্ট দু'রাকাত ঐ দিকেই মুখ করে আদায় করি।
নামাযের মধ্যে এইভাবে ফিরে যাওয়ার ফলে পুরুষ লোকেরা স্ত্রী লোকদের স্থানে এবং স্ত্রী লোকেরা পুরুষ লোকদের স্থানে এসে পড়ে। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এই সংবাদ পৌছলে তিনি খুশি হয়ে বলেনঃ এরাই হচ্ছে অদৃশ্যের উপর ঈমান আনয়নকারী।‘তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই’ গ্রন্থে হযরত উম্মারাহ্ বিন আউস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ “রুকুর অবস্থায় আমরা কিবলাহ্ পরিবর্তনের সংবাদ পাই এবং আমরা পুরুষ, স্ত্রী ও শিশু সবাই ঐ কিবলাহর দিকেই ফিরে। যাই।' অতঃপর ইরশাদ হচ্ছে, তোমরা পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর ও দক্ষিণ যেখানেই থাকনা কেন, নামাযের সময় তোমরা কাবার দিকে মুখ কর।' তবে সফরে সোয়ারীর উপর যে ব্যক্তি নফল নামায পড়ে সে সোয়ারী যে দিকেই যাবে সে দিকেই মুখ করে নফল নামায আদায় করবে।
তার মনের গতি কাবার দিকে থাকলেই যথেষ্ট হবে। এই রকমই যে ব্যক্তি যুদ্ধের মাঠে নামায পড়ে সে যেভাবে পারে এবং যেই দিকে পড়া তার জন্যে সুবিধাজনক হয় সেই দিকেই পড়বে। অনুরূপভাবে যে ব্যক্তি কিবলাহর দিক ঠিক করতে পারছে না সে অনুমান করে যে দিকেই কিবলাহ হওয়ার ধারণা তার বেশী হবে সে দিকেই সে নামায আদায় করবে। অতঃপর যদি প্রকৃত পক্ষেই তার নামায কিবলার দিকে হয়ে থাকে তবুও সে আল্লাহ তা'আলার নিকট ক্ষমা পেয়ে যাবে।জিজ্ঞাস্য বিষয়ঃমালেকীগণ এই আয়াত দ্বারা দলীল গ্রহণ করেছেন যে, নামাযীকে নামাযের অবস্থায় তার দৃষ্টি সামনের দিকে রাখতে হবে, সিজদার জায়গায় নয়।
যেমন ইমাম শাফেঈ (রঃ), ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রঃ) এবং ইমাম আবু হানীফারও (রঃ) এটাই মযহাব। কেননা আয়াতে রয়েছে, মসজিদে হারামের দিকে মুখ কর’, কাজেই যদি সিজদার জায়গায় মুখ করা যায় তবে কিছু নত হতে হবে এবং এই কৃত্রিমতাপূর্ণ বিনয় ও নম্রতার উল্টো। কোন কোন মালেকিয়্যার এটাও উক্তি রয়েছে যে, দাঁড়ান অবস্থায় স্বীয় বক্ষের প্রতি দৃষ্টি রাখতে হবে। কাযী শুরাইহ (রঃ) বলেন যে, দাঁড়ান অবস্থায় দৃষ্টি সিজদার স্থানে রাখতে হবে। জমহুর উলামার এটাই উক্তি। কেননা এটাই হচ্ছে পূর্ণ বিনয় ও নম্রতা। অন্য একটি হাদীসেও এ বিষয়টি এসেছে। রুকুর অবস্থায় দৃষ্টি স্বীয় পায়ের স্থানে, সিজদার অবস্থায় নাকের স্থানে এবং (আরবি)-এর সময় ক্রোড়ের প্রতি রাখতে হবে।
অতঃপর ইরশাদ হচ্ছে যে, ইয়াহুদীরা কথা যতই বানিয়ে বলুক না কেন, তাদের মন বলে যে, কিবলাহ্র পরিবর্তন আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকেই হয়েছে এবং এটা সত্য। কেননা, এটা স্বয়ং তাদের কিতাবেও রয়েছে। কিন্তু এরা একমাত্র কুফর, অবাধ্যতা, অহংকার এবং হিংসার বশবর্তী হয়েই এটা গোপন করছে। কিন্তু মহান আল্লাহ তাদের কৃতকর্ম হতে উদাসীন নন।
অবশ্যই আমরা আকাশের দিকে আপনার বারবার তাকানো লক্ষ্য করি [১]। সুতরাং অবশ্যই আমরা আপনাকে এমন কিবলার দিকে ফিরিয়ে দিব যা আপনি পছন্দ করেন [২]। অতএব আপনি মসজিদুল হারামের দিকে [৩] চেহারা ফিরান [৪]। আর তোমরা যেখানেই থাক না কেন তোমাদের চেহারাসমূহকে এর দিকে ফিরাও এবং নিশ্চয় যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তারা অবশ্যই জানে যে, এটা তাদের রব-এর পক্ষ হতে হক। আর তারা যা করে সে সম্পর্কে আল্লাহ্ গাফেল নন।
[১] কেবলা পরিবর্তনের আদেশ আসার আগে থেকেই নবী রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতীক্ষায় ছিলেন। তিনি নিজেই অনুভব করছিলেন ইসরাঈলবংশীয়দের নেতৃত্বের যুগ শেষ হয়ে গেছে এবং তার সাথে সাথে বায়তুল-মুকাদাসের কেন্দ্রীয় মর্যাদা লাভেরও অবসান ঘটেছে। এখন আসল ইবরাহিমী কেবলার দিকে মুখ ফিরানোর সময় হয়ে গেছে। কা'বা মুসলিমদের কেবলা সাব্যস্ত হোক - এটাই ছিল রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আন্তরিক বাসনা। তিনি এর জন্য দোআও করছিলেন। এ কারণেই তিনি বার বার আকাশের দিকে চেয়ে দেখতেন যে, ফেরেশতা নির্দেশ নিয়ে আসছেন কি না।
[২] এ আয়াতাংশটি হচ্ছে কেবল পরিবর্তন সম্পর্কিত মূল নির্দেশ। এ নির্দেশটি তৃতীয় হিজরীর রজব বা শাবান মাসে নাযিল হয়। ইবনে সা’আদ বর্ণনা করেছেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি দাওয়াত উপলক্ষে উম্মে বিশ্র ইবনে বারা’ ইবনে মা’রুর-এর ঘরে গিয়েছিলেন। সেখানে যোহরের সময় গিয়েছিল। তিনি সেখানে সালাতে লোকদের ইমামতি করতে দাড়িয়েছিলেন। দু রাকা’আত সালাত আদায় হয়ে গিয়েছিল। এমনি সময় তৃতীয় রাকাআতে ওহীর মাধ্যমে এ আয়াতটি নাযিল হল। সঙ্গে সঙ্গেই তিনি ও তার সঙ্গে জামা'আতে শামিল সমস্ত লোক বায়তুল মোকাদ্দাসের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে কাবার দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিলেন। [তাবাকাতে ইবনে সাদ: ১/২৪২]
এরপর মদীনা ও মদীনার আশেপাশে এ নির্দেশটি সাধারণভাবে ঘোষণা করে দেয়া হল। বারা ইবনে আযেব বলেন, এক জায়গায় ঘোষকের কথা এমন অবস্থায় পৌছল, যখন তারা রুকূ করছিল। নির্দেশ শোনার সাথে সাথেই সবাই সে অবস্থাতেই কা'বার দিকে মুখ ফিরালো। আনাস ইবনে মালেক বলেন, এ খবরটি কুবায় পৌছল পরের দিন ফজরের সালাতের সময়। লোকেরা এক রাকাআত সালাত শেষ করেছিল, এমন সময় তাদের কানে আওয়াজ পৌছলঃ ‘সাবধান! কেবলা বদলে গেছে। এখন কা'বার দিকে কেবলা নির্দিষ্ট হয়েছে। এ কথা শোনার সাথে সাথেই সমগ্র জামা’আত কাবার দিকে মুখ ফিরালো। [অনুরূপ বর্ণনা, বুখারী ৪৪৮৬]
[৩] ‘মসজিদুল হারাম’ অর্থ সম্মান ও মর্যাদাসম্পন্ন মসজিদ। এর অর্থ হচ্ছে এমন ইবাদত গৃহ, যার মধ্যস্থলে কা'বাগৃহ অবস্থিত।
[৪] হিজরতের পূর্বে মক্কা-মুকার্রামায় যখন সালাত ফরয হয়, তখন কা'বাগৃহই সালাতের জন্য কেবলা ছিল, না বায়তুল-মুকাদাস ছিল - এ প্রশ্নে সাহাবী ও তাবেয়ীগণের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুম বলেনঃ ইসলামের শুরু থেকেই কিবলা ছিল বায়তুল-মুকাদাস। হিজরতের পরও ষোল/সতের মাস পর্যন্ত বায়তুল-মুকাদ্দাসই কেবলা ছিল। এরপর কাবাকে কেবলা করার নির্দেশ আসে। তবে রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কায় অবস্থানকালে হাজরেআসওয়াদ ও রোকনে-ইয়ামানীর মাঝখানে দাড়িয়ে সালাত আদায় করতেন যাতে কা'বা ও বায়তুল-মুকাদাস উভয়টিই সামনে থাকে।
মদীনায় পৌছার পর এরূপ করা সম্ভব ছিল না। তাই তার মনে কেবলা পরিবর্তনের বাসনা দানা বাধতে থাকে। অন্যান্য সাহাবী ও তাবেয়ীগণ বলেনঃ মক্কায় সালাত ফরয হওয়ার সময় কা'বা গৃহই ছিল মুসলিমদের প্রাথমিক কেবলা। কেননা ইবরাহীম ও ইসমাঈল ‘আলাইহিমুস সালাম-এরও কেবলা তাই ছিল। মহানবী রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কায় অবস্থানকালে কাবাগৃহের দিকে মুখ করেই সালাত আদায় করতেন। মদীনায় হিজরতের পর তার কেবলা বায়তুল-মুকাদ্দাস সাব্যস্ত হয়। তিনি মদীনায় ষোল/ সতের মাস পর্যন্ত বায়তুল-মোকান্দাসের দিকে মুখ করে সালাত আদায় করেন। এরপর প্রথম কেবল অর্থাৎ কাবাগৃহের দিকে মুখ করার নির্দেশ নাযিল হয়।
[সূরা আল-বাকারাহ (২): আয়াত ১৪৪] পূর্ণ পৃষ্ঠা
কিবলার দিকে মুখ করা এবং তোমাদের নবীকে সত্য বলে বিশ্বাস করার মাধ্যমে; আর অধিকাংশ মুসলিম এবং মূলনীতিবিদগণ এই মতের ওপরই রয়েছেন। ইবনে ওয়াহাব, ইবনুল কাসিম, ইবনে আব্দুল হাকাম এবং আশহাব ইমাম মালিক থেকে বর্ণনা করেছেন যে, "আর আল্লাহ এমন নন যে তোমাদের ঈমান বিনষ্ট করবেন" আয়াতাংশ সম্পর্কে তিনি বলেছেন: (এর অর্থ) তোমাদের সালাত। মহান আল্লাহর বাণী: "নিশ্চয়ই আল্লাহ মানুষের প্রতি অত্যন্ত মমতাময়, পরম দয়ালু।" 'রাফাহ' (মমতা) হলো 'রাহমাহ' (দয়া) অপেক্ষা অধিক প্রবল। আবু আমর ইবনুল আলা বলেন: 'রাফাহ' হলো 'রাহমাহ' এর চেয়েও বেশি; তবে অর্থ উভয়টির কাছাকাছি।
আমরা এ শব্দের ভাষাতাত্ত্বিক প্রয়োগ, কাব্যিক উদাহরণ এবং অর্থসমূহ "আল-আসনা ফি শারহি আসমাইল্লাহিল হুসনা" নামক গ্রন্থে বিস্তারিত আলোচনা করেছি; তাই সেখানে দেখে নেওয়া যেতে পারে। কুফাবাসী ক্বারীগণ এবং আবু আমর "লা-রাউফুন" শব্দটি 'ফাউল' ওজনে পাঠ করেছেন, আর এটি বনু আসাদ গোত্রের ভাষা। ওয়ালিদ ইবনে উকবার উক্তিটিও এ থেকে গৃহীত:আর তুমি যেন নিকৃষ্টতম অন্বেষণকারী না হও … সে তার চাচার সাথে যুদ্ধ করে, যিনি অত্যন্ত মমতাময়, পরম দয়ালু।আল-কিসায়ী বর্ণনা করেছেন যে বনু আসাদ গোত্রের ভাষা হলো "লা-রাফুন", যা 'ফাল' ওজনে। আর আবু জাফর ইবনুল ক্বাক্বা "লা-রাউফুন" পড়েছেন হামযাহ ছাড়া দ্বিত্ব সহকারে; একইভাবে তিনি মহান আল্লাহর কিতাবের প্রতিটি হামযাহকে সহজ করে পড়েছেন, তা সাকিন হোক বা হরকতযুক্ত।
[সূরা আল-বাকারাহ (২): আয়াত ১৪৪]আকাশের দিকে তোমার বারবার তাকানো আমি অবশ্যই দেখছি। অতএব আমি তোমাকে অবশ্যই এমন কিবলার দিকে ফিরিয়ে দেব যা তুমি পছন্দ কর। সুতরাং তুমি তোমার চেহারা মাসজিদুল হারামের দিকে ফিরাও। আর তোমরা যেখানেই থাক না কেন, তোমাদের চেহারা তার দিকেই ফিরাও। আর নিশ্চয়ই যাদেরকে কিতাব দেওয়া হয়েছে, তারা অবশ্যই জানে যে এটি তাদের রবের পক্ষ থেকে সত্য। আর তারা যা করে সে সম্পর্কে আল্লাহ গাফেল নন। (১৪৪)উলামায়ে কেরাম বলেছেন: এই আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার দিক থেকে মহান আল্লাহর বাণী "অচিরেই মানুষের মধ্যে যারা নির্বোধ তারা বলবে" এর আগে নাজিল হয়েছে।
"তোমার চেহারা বারবার ফিরানো" এর অর্থ হলো আকাশের দিকে তোমার চেহারা বারবার ঘোরানো, তাবারী এটি বলেছেন। যাজ্জাজ বলেছেন: আকাশের দিকে তাকানোর জন্য তোমার চোখের বারবার দৃষ্টিপাত; তবে উভয়ের অর্থ কাছাকাছি। আকাশের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে কারণ তার সাথে যা কিছু সম্পৃক্ত বা সেখান থেকে যা কিছু আসে (যেমন বৃষ্টি, রহমত ও ওহী), তার বিশেষ সম্মান ও মর্যাদা রয়েছে। "যা তুমি পছন্দ কর" এর অর্থ হলো যা তুমি ভালোবাসো। সুদ্দী বলেছেন: তিনি যখন বাইতুল মাকদিসের দিকে মুখ করে সালাত আদায় করতেন, তখন তিনি আকাশের দিকে মাথা তুলতেন এবং দেখতেন কী নির্দেশ দেওয়া হয়।
তিনি কাবার দিকে মুখ করে সালাত আদায় করা পছন্দ করতেন; ফলে আল্লাহ তাআলা অবতীর্ণ করলেন: "আকাশের দিকে তোমার বারবার তাকানো আমি অবশ্যই দেখছি।" আবু ইসহাক বারাহ (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) ষোল বা সতেরো মাস বাইতুল মাকদিসের দিকে মুখ করে সালাত আদায় করেছেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) কাবার দিকে মুখ ফিরিয়ে দেওয়াটা পছন্দ করতেন, তখন আল্লাহ তাআলা অবতীর্ণ করলেন: "আকাশের দিকে তোমার বারবার তাকানো আমি অবশ্যই দেখছি।" এই ভাবার্থ ও এর ব্যাখ্যা ইতিপূর্বেই আলোচিত হয়েছে; আর সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য।
পূর্ণ পৃষ্ঠা পূর্ণ পৃষ্ঠা পূর্ণ পৃষ্ঠা
মহান আল্লাহর বাণী: মানুষের মধ্যে যারা নির্বোধ তারা শীঘ্রই বলবে, 'কিসে তাদের সে কিবলা থেকে ফিরিয়ে দিল যার ওপর তারা ছিল?' আপনি বলুন, 'পূর্ব ও পশ্চিম আল্লাহরই। তিনি যাকে ইচ্ছা করেন সরল পথের দিকে পরিচালিত করেন।'ইবনে সাদ, ইবনে আবি শাইবা, আবদ ইবনে হুমাইদ, বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ (তাঁর নাসিখ গ্রন্থে), তিরমিজি, নাসায়ি, ইবনে জারির, ইবনে হিব্বান এবং বায়হাকি তাঁর সুনান গ্রন্থে বারা বিন আজিব রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেছেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনায় আগমনের পর সর্বপ্রথম তাঁর আনসার মাতুলদের (মামার বংশের লোক) কাছে অবতরণ করেন।
তিনি ষোলো বা সতেরো মাস বাইতুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ করে সালাত আদায় করেছিলেন। তবে কিবলা কাবার দিকে হওয়াটাই তাঁর নিকট পছন্দনীয় ছিল। প্রথম যে সালাতটি তিনি (কাবার দিকে) আদায় করেছিলেন তা ছিল আসরের সালাত। তাঁর সাথে একদল লোকও সালাত আদায় করেছিলেন। এরপর তাঁর সাথে সালাত আদায়কারী ব্যক্তিদের মধ্য থেকে এক ব্যক্তি বের হয়ে একটি মসজিদের লোকদের নিকট দিয়ে যাচ্ছিলেন, যখন তারা রুকু অবস্থায় ছিলেন। তখন তিনি বললেন: 'আমি আল্লাহর নামে সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে কাবার দিকে মুখ করে সালাত আদায় করেছি।' কথাটি শুনে তারা যে অবস্থায় ছিলেন সে অবস্থাতেই কাবার দিকে ঘুরে গেলেন।
কিবলা কাবার দিকে পরিবর্তিত হওয়ার আগে কিছু লোক পূর্ববর্তী কিবলার ওপর থাকাবস্থায় ইন্তেকাল করেছিলেন এবং কেউ কেউ নিহত হয়েছিলেন। আমরা তাদের ব্যাপারে কী বলব তা বুঝতে পারছিলাম না। তখন আল্লাহ তাআলা অবতীর্ণ করলেন: 'আল্লাহ তোমাদের ঈমান (সালাত) বিনষ্ট করবেন না। নিশ্চয়ই আল্লাহ মানুষের প্রতি অত্যন্ত মমতাময়, পরম দয়ালু।' (সূরা আল-বাকারা, আয়াত ১৪৩)ইবনে ইসহাক, আবদ ইবনে হুমাইদ এবং ইবনে আবি হাতিম বারা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাইতুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ করে সালাত আদায় করতেন এবং আল্লাহর নির্দেশের অপেক্ষায় বারবার আকাশের দিকে তাকাতেন।
তখন আল্লাহ তাআলা অবতীর্ণ করলেন: 'নিশ্চয়ই আমি আপনার বারবার আকাশের দিকে তাকানো লক্ষ্য করি। সুতরাং আমি অবশ্যই আপনাকে এমন কিবলার দিকে ফিরিয়ে দেব যা আপনি পছন্দ করেন। অতএব আপনি আপনার মুখ মসজিদে হারামের দিকে ফিরান।' (সূরা আল-বাকারা, আয়াত ১৪৪)। তখন মুসলিমদের মধ্য থেকে কিছু লোক বললেন: 'আমরা যদি জানতে পারতাম আমাদের মধ্যে যারা কিবলা পরিবর্তনের আগে মারা গিয়েছেন তাদের কী অবস্থা এবং বাইতুল মুকাদ্দাসের দিকে আমাদের সালাতের হুকুমই বা কী হবে?' তখন আল্লাহ অবতীর্ণ করলেন: 'আল্লাহ তোমাদের ঈমান বিনষ্ট করবেন না।' (সূরা আল-বাকারা, আয়াত ১৪৩)।
আর মানুষের মধ্যে যারা নির্বোধ—অর্থাৎ আহলে কিতাবগণ—তারা বলল: 'কিসে তাদের সে কিবলা থেকে ফিরিয়ে দিল যার ওপর তারা ছিল?' তখন আল্লাহ তাআলা অবতীর্ণ করলেন: 'মানুষের মধ্যে যারা নির্বোধ তারা শীঘ্রই বলবে...' আয়াতের শেষ পর্যন্ত।তিরমিজি, নাসায়ি, ইবনে মুনজির, ইবনে আবি হাতিম, দারা কুতনি এবং বায়হাকি বারা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ষোলো বা সতেরো মাস বাইতুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ করে সালাত আদায় করেছিলেন।
"...তোমার মুখমণ্ডল মাসজিদুল হারামের দিকে ফেরাও এবং তোমরা যেখানেই থাকো, তোমাদের মুখমণ্ডল তার দিকেই ফেরাও।" (সূরা বাকারাহ, আয়াত: ১৪৪)এবং "আর যাদেরকে কিতাব প্রদান করা হয়েছে তারা অবশ্যই জানে যে, এটি তাদের রবের পক্ষ থেকে আসা সত্য; আর তারা যা করে সে বিষয়ে আল্লাহ গাফেল নন।" (সূরা বাকারাহ, আয়াত: ১৪৪)। বর্ণনাকারী বলেন: তখন মুনাফিকরা বলল, "মুহাম্মাদ তার জন্মভূমি ও স্বজাতির প্রতি অনুরাগী হয়েছে।" আর মুশরিকরা বলল, "মুহাম্মাদ আমাদের (কাবা)-কে তার কিবলা এবং তার মাধ্যম বানাতে চেয়েছে; সে বুঝতে পেরেছে যে আমাদের দ্বীন তার দ্বীনের চেয়ে অধিক সঠিক পথপ্রদর্শক।"ইয়াহূদীরা মুমিনদের উদ্দেশ্যে বলল, "কিসে তোমাদের মক্কার দিকে ফিরিয়ে দিল এবং মূসা, ইয়াকূব ও নবীদের কিবলা থেকে বিমুখ করল?
আল্লাহর কসম, তোমরা তো কেবল বিভ্রান্তিতেই লিপ্ত রয়েছ।"আর মুমিনগণ বললেন, "আমাদের মধ্য থেকে একদল লোক বিদায় নিয়েছেন (মৃত্যুবরণ করেছেন), আমরা জানি না আমরা এবং তারা সঠিক কিবলার ওপর ছিলাম কি না।" বর্ণনাকারী বলেন: তখন আল্লাহ তা'আলা এ প্রসঙ্গে অবতীর্ণ করলেন— "মানুষের মধ্যে যারা নির্বোধ তারা বলবে, তারা যে কিবলার ওপর ছিল তা থেকে কিসে তাদেরকে ফিরিয়ে দিল?"— থেকে আল্লাহর বাণী "নিশ্চয়ই আল্লাহ মানুষের প্রতি পরম স্নেহশীল ও দয়ালু" পর্যন্ত।আবদ ইবনে হুমায়দ ও ইবনুল মুনযির কাতাদাহ (রহ.) থেকে আল্লাহর এই বাণীর ব্যাখ্যায় বর্ণনা করেন যে, কিবলা পরিবর্তনের বিষয়টি ছিল একটি পরীক্ষা ও পরিশুদ্ধি।
আনসারগণ নবীজির হিজরতের পূর্বে প্রায় দুই বছর (বাইতুল মুকাদ্দাসের দিকে) সালাত আদায় করেছেন। আর আল্লাহর নবী মদীনায় আসার পর ষোল মাস বাইতুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ করে সালাত আদায় করেন। এরপর আল্লাহ তা'আলা তাঁকে কাবা তথা বাইতুল হারামের দিকে ফিরিয়ে দেন। তখন মানুষের মধ্য থেকে কিছু লোক বলতে লাগল, "তারা যে কিবলার ওপর ছিল তা থেকে কিসে তাদেরকে ফিরিয়ে দিল? এই ব্যক্তি হয়তো তার জন্মভূমির প্রতি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছেন।" আল্লাহ তা'আলা তখন অবতীর্ণ করলেন— "বলুন, পূর্ব ও পশ্চিম আল্লাহরই; তিনি যাকে ইচ্ছা সরল পথে পরিচালিত করেন।" আর কিছু লোক বলল: "কিবলা এখন বাইতুল হারামের দিকে ফিরে গিয়েছে, তবে আমরা প্রথম কিবলার দিকে মুখ করে যে আমলগুলো করেছিলাম সেগুলোর কী হবে?" তখন আল্লাহ অবতীর্ণ করলেন— "আল্লাহ তোমাদের ঈমান (সালাত) নষ্ট করবেন না" (সূরা বাকারাহ, আয়াত: ১৪৩)।
আল্লাহ তাঁর বান্দাদের তাঁর ইচ্ছানুযায়ী একের পর এক বিধানের মাধ্যমে পরীক্ষা করেন, যাতে তিনি প্রকাশ করে দেন কে তাঁর আনুগত্য করে আর কে অবাধ্য হয়। আর এ সবকিছুই আল্লাহর প্রতি ঈমান, ইখলাস এবং আল্লাহর ফয়সালার প্রতি আত্মসমর্পণের বিভিন্ন স্তরে কবুলযোগ্য।ইবনে সা'দ ও ইবনে আবী শায়বাহ উমারা ইবনে আওস আল-আনসারী (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: আমরা অপরাহ্নের সালাতগুলোর একটি আদায় করছিলাম। এমতাবস্থায় এক ব্যক্তি মসজিদের দরজায় দাঁড়িয়ে ঘোষণা করলেন যে, কাবার দিকে ফিরে সালাত আদায় করা আবশ্যক হয়েছে। তখন আমাদের ইমাম কাবার দিকে ঘুরে গেলেন এবং নারী ও শিশুরাও তাঁর সাথে ঘুরে গেল।ইবনে আবী শায়বাহ ও আল-বাযযার আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: আমাদের কাছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ থেকে একজন ঘোষণাকারী এসে বললেন, কিবলা বাইতুল্লাহিল হারামের দিকে পরিবর্তিত হয়েছে।
তখন ইমাম দুই রাকাত সালাত আদায় করে ফেলেছিলেন। তাঁরা সেই অবস্থাতেই ঘুরে গেলেন এবং অবশিষ্ট দুই রাকাত কাবার দিকে মুখ করে আদায় করলেন।
তিনি বলেছেন: ইসলামের ভিত্তি পাঁচটি স্তম্ভের ওপর প্রতিষ্ঠিতএই সাক্ষ্য দেওয়া যে আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই এবং মুহাম্মদ আল্লাহর রাসুল, সালাত কায়েম করা, জাকাত প্রদান করা, রমজানের সিয়াম পালন করা এবং হজ সম্পাদন করা।আহমদ, আবু দাউদ, ইবনে জারির, ইবনুল মুনজির, ইবনে আবি হাতিম, হাকেম (যিনি একে সহিহ বলেছেন) এবং বায়হাকি তাঁর সুনানে মুআজ ইবনে জাবাল থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: সালাত তিনটি ধাপে পরিবর্তিত হয়েছে এবং সিয়াম তিনটি ধাপে পরিবর্তিত হয়েছে।সালাতের ধাপগুলোর ক্ষেত্রে বর্ণনা হলো: নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যখন মদিনায় আসলেন, তখন তিনি সতের মাস পর্যন্ত বায়তুল মাকদিসের দিকে মুখ করে সালাত আদায় করেন।
এরপর আল্লাহ তাঁর ওপর অবতীর্ণ করেন: (নিশ্চয়ই আমি আপনার মুখমণ্ডলকে বারবার আকাশের দিকে তাকাতে দেখছি। সুতরাং আমি অবশ্যই আপনাকে এমন কিবলার দিকে ফিরিয়ে দেব যা আপনি পছন্দ করেন)। (সূরা আল-বাকারা, আয়াত ১৪৪) এই আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ তাঁকে মক্কার দিকে মুখ ফেরানোর নির্দেশ দেন; এটি ছিল একটি পরিবর্তন। তিনি বলেন: সাহাবীগণ সালাতের জন্য একত্রিত হতেন এবং একে অপরকে (সালাতের সময়ের ব্যাপারে) অবহিত করতেন, এমনকি একপর্যায়ে তারা এর বিকল্প কোনো পদ্ধতির প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে অনুভব করলেন। এরপর আনসারদের জনৈক ব্যক্তি, যাকে আবদুল্লাহ ইবনে ইয়াজিদ বলা হয়, রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর নিকট এসে বললেন: হে আল্লাহর রাসুল!
আমি স্বপ্নে এক দৃশ্য দেখলাম—আর আমি যদি বলি যে আমি জাগ্রত ছিলাম তবে আমি সত্যই বলব—আমি নিদ্রা ও জাগরণের মাঝামাঝি অবস্থায় ছিলাম, এমতাবস্থায় আমি সবুজ পোশাক পরিহিত এক ব্যক্তিকে দেখলাম। তিনি কিবলার দিকে মুখ করে দাঁড়ালেন এবং বললেন: 'আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'—এভাবে প্রতিটি বাক্য দুইবার করে আযান শেষ করলেন। এরপর তিনি কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলেন এবং পুনরায় আগের মতোই বললেন, তবে তাতে অতিরিক্ত এই বাক্যটি যোগ করলেন: 'ক্বাদ ক্বামাতিস সালাহ' (সালাত শুরু হয়ে গেছে)।রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন: এটি বিলালকে শিখিয়ে দাও এবং সে যেন এর মাধ্যমে আযান দেয়।ফলে বিলালই ছিলেন প্রথম ব্যক্তি যিনি এই আযান দিয়েছিলেন।
তিনি বলেন: এরপর উমর ইবনুল খাত্তাব আসলেন এবং বললেন: হে আল্লাহর রাসুল! তাঁর কাছে যা আগন্তুক হিসেবে এসেছিল, আমার কাছেও অনুরূপ স্বপ্ন এসেছিল, তবে তিনি আমার আগে পৌঁছে গেছেন। এই হলো সালাতের দ্বিতীয় পরিবর্তন।তিনি বলেন: সাহাবীগণ যখন সালাতে আসতেন, তখন দেখা যেত নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সালাতের কিছু অংশ শেষ করে ফেলেছেন। এমতাবস্থায় একজন লোক অন্য একজনকে চুপিচুপি জিজ্ঞাসা করতেন যে, কত রাকাত পড়া হয়েছে? সে বলত এক রাকাত বা দুই রাকাত। তখন নবাগত ব্যক্তি তা নিজে পড়ে নিতেন এবং এরপর জামাতের সাথে সালাতে শরিক হতেন। এরপর মুআজ আসলেন এবং বললেন: আমি তাঁকে (নবীকে) যে অবস্থায় পাব, সে অবস্থাতেই তাঁর সাথে শরিক হব, এরপর যা ছুটে গেছে তা পূর্ণ করব।
তিনি যখন আসলেন, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তখন সালাতের কিছু অংশ শেষ করেছিলেন, তাই তিনি সরাসরি তাঁর সাথে সালাতে স্থির থাকলেন। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যখন সালাত শেষ করলেন, তখন তিনি দাঁড়িয়ে ছুটে যাওয়া অংশ পূর্ণ করলেন। তখন রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন: মুআজ তোমাদের জন্য একটি পদ্ধতি প্রবর্তন করেছে, তোমরাও এভাবেই করো।এই হলো সালাতের তিনটি পরিবর্তন বা ধাপ।আর সিয়ামের ধাপগুলো হলো: রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যখন মদিনায় আসলেন, তখন তিনি প্রতি মাসে তিন দিন করে সিয়াম পালন করতেন এবং আশুরার সিয়াম পালন করতেন।
এরপর আল্লাহ তাঁর ওপর সিয়াম ফরজ করলেন এবং অবতীর্ণ করলেন: হে মুমিনগণ, তোমাদের ওপর সিয়াম ফরজ করা হয়েছে যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর করা হয়েছিল...
তাঁর বাণী এবং যারা সিয়াম পালনে সক্ষম (কিন্তু কষ্ট অনুভব করে), তাদের বিনিময় হলো একজন মিসকিনকে অন্নদান করা
পর্যন্ত। তখন যার ইচ্ছা সিয়াম পালন করত আর যার ইচ্ছা একজন মিসকিনকে খাবার খাইয়ে দিত এবং এটাই তার জন্য যথেষ্ট হতো। এরপর আল্লাহ অন্য আয়াতটি অবতীর্ণ করলেন: (রমজান মাস, যাতে কুরআন নাজিল করা হয়েছে মানুষের জন্য হিদায়াত স্বরূপ...
