Al-Baqarah
আল-বাকারা: 6
2 আল-বাকারা Al-Baqarah · 286 আয়াত البقرة
মূল আরবি
إِنَّ ٱلَّذِينَ كَفَرُوا۟ سَوَآءٌ عَلَيْهِمْ ءَأَنذَرْتَهُمْ أَمْ لَمْ تُنذِرْهُمْ لَا يُؤْمِنُونَ
English Translations
Indeed, those who disbelieve - it is all the same for them whether you warn them or do not warn them - they will not believe.
Verily, those who disbelieve, it is the same to them whether you (O Muhammad Peace be upon him) warn them or do not warn them, they will not believe.
Surely for those who have disbelieved, it is all the same whether you warn them or you warn them not: they do not believe.
As for those who have rejected (these truths), it is all the same whether or not you warn them, for they will not believe.
As for the Disbelievers, Whether thou warn them or thou warn them not it is all one for them; they believe not.
As to those who reject Faith, it is the same to them whether thou warn them or do not warn them; they will not believe.
বাংলা অনুবাদ
নিশ্চয় যারা কুফরী করেছে তাদেরকে তুমি ভয় দেখাও আর না দেখাও উভয়টাই তাদের জন্য সমান, তারা ঈমান আনবে না।
নিশ্চয় যারা কুফরী করেছে, তুমি তাদেরকে সতর্ক কর কিংবা না কর, উভয়ই তাদের জন্য বরাবর, তারা ঈমান আনবে না।
নিশ্চয়ই যারা অবিশ্বাস করছে তাদের জন্য উভয়ই সমান; তুমি তাদেরকে ভয় প্রদর্শন কর বা না কর, তারা ঈমান আনবেনা।
যারা কুফরী করেছে আপনি তাদেরকে সতর্ক করুন বা না করুন , তারা ঈমান আনবে না।
নিশ্চয় যারা কুফরী করেছে তাদেরকে তুমি সতর্ক কর বা না কর- উভয়টা তাদের জন্য সমান, তারা ঈমান আনবে না।
৬. যারা কাফির তারা সর্বদা ভ্রষ্টতা ও হঠকারিতারই উপর অবিচল। সুতরাং তাদেরকে ভীতি প্রদর্শন করা, না করা উভয়ই সমান।
তাফসীর
অর্থাৎ যারা সত্যকে গোপন করতে অভ্যস্ত এবং তাদের ভাগ্যে এই আছে, তারা কখনও সেই ওয়াহীকে বিশ্বাস করবে না, যা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর অবতীর্ণ হয়েছে। যেমন অন্য এক স্থানে বলা হয়েছেঃ যেসব লোকের উপর আল্লাহর কথা সাব্যস্ত হয়ে গেছে, তারা ঈমান আনবে না, যদিও তাদের কাছে সমস্ত নিদর্শন এসে যায়-যে পর্যন্ত না তারা বেদনাদায়ক শাস্তি অবলোকন করে। এমনিভাবে আল্লাহ তা'আলা দুষ্টমতি আহলে কিতাবদের সম্পর্কে বলেছেনঃ যদিও তুমি আহলে কিতাবের নিকট সমস্ত দলীল-প্রমাণ নিয়ে আস, তথাপি তারা তোমার কিবলার অনুসরণ করবে না। অর্থাৎ ঐ অর্বাচীন দুর্ভাগাদের সৌভাগ্য লাভ হবেই না, কাজেই পথভ্রষ্টদের সুপথ প্রাপ্তি কিরূপে হবে?
হে নবী (সঃ)! তুমি তাদের জন্যে আফসোস করো না। তোমার কাজ তো শুধু রিসালাতের হক আদায় করে দেয়া। যারা মেনে নেবে তারা ভাগ্যবান, আর যারা মানবে না, তবে ঠিক আছে, তোমার দায়িত্ব ঠিক মতোই পালন হয়ে গেছে। আমি স্বয়ং অনতি বিলম্বে তাদের হিসাব নিয়ে নেবো। তুমি তো শুধু ভয় প্রদর্শক মাত্র। আল্লাহই প্রত্যেক কাজের সমাধানকারী।'হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর এ ব্যাপারে খুবই আগ্রহ ছিল যে, সবাই যেন ঈমানদার হয়ে যায় এবং হিদায়েত কবুল করে নেয়। কিন্তু মহান প্রভু বলে দিলেন যে, এ সৌভাগ্য প্রত্যেকের জন্যে নয়।
এ দান ভাগ করে দেয়া হয়েছে। যার ভাগ্যে এর অংশ পড়েছে আপনা আপনি তোমার কথা মেনে নেবে, আর যে হতভাগা সে কখনও মানবে না। সুতরাং অর্থ এই যে, যারা কুরআন কারীমকে অস্বীকার করে তারা বলেঃ “আমরা পূর্বের কিতাবগুলোকে মেনে থাকি। তাদেরকে ভয় দেখিয়ে কোন লাভ নেই। কেননা প্রকৃতপক্ষে তারা নিজেদের কিতাবকেও মানে না। কারণ, তার মধ্যে তোমাকেও মানার অনুরূপ অঙ্গীকার রয়েছে। তাহলে তারা যখন ঐ কিতাব ও ঐ নবীর (আঃ) উপদেশ মানছে না; যাকে তারা মানতে অঙ্গীকারাবদ্ধ হয়েছে, তখন হে নবী (সঃ)! তোমার কথাকে তারা কি করে মানতে পারে?আবুল আলিয়ার (রঃ) মত এই যে, এই আয়াতটি খন্দকের যুদ্ধে ঐ নেতৃবর্গের সম্বন্ধে নাযিল হয়েছে যাদের সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলার ফরমান রয়েছেঃ (১৪:২৮) (আরবি)কিন্তু যে অর্থ আমরা প্রথমে বর্ণনা করেছি সেটাই বেশী প্রকাশমান এবং অন্যান্য আয়াতের সাথে অধিকতর সামঞ্জস্যপূর্ণ।
আল্লাহই এ ব্যাপারে সবচেয়ে ভাল জানেন। ঐ হাদীসটির উপর পুনরায় চোখ ফিরানো উচিত যা ইবনে আবি হাতিমের উদ্ধৃতি দিয়ে এখনই বর্ণিত হয়েছে (আরবি) প্রথম বাক্যটির (আরবি) হয়েছে। অর্থাৎ ভয় দেখানো না দেখানো সমান, কোন অবস্থাতেই তারা ঈমান আনবে না (আরবি) তার (আরবি) হওয়াও সম্ভব। কেননা অনুমিত বাক্য হচ্ছেঃ (আরবি) এবং (আরবি) হয়ে যাবে (আরবি) আল্লাহই প্রত্যেক বিষয়ে সবচেয়ে ভাল ও সুষ্ঠ জ্ঞানের অধিকারী।
যারা কুফরী [১] করেছে আপনি তাদেরকে সতর্ক করুন বা না করুন [২] , তারা ঈমান আনবে না [৩]।
[১] কাফের শব্দের অর্থ অস্বীকারকারী, কাফের শব্দটি মুমিন শব্দের বিপরীত। বিভিন্ন কারণে কেউ কাফের হয়, তন্মধ্যে বিশেষ করে ঈমানের ছয়টি রুকনের কোন একটির প্রতি ঈমান না থাকলে সে নিঃসন্দেহে কাফের। এ ছাড়াও ইসলামের আরকানসমূহও যদি কেউ অস্বীকার করে তাহলেও সে কাফের হবে। অনুরূপভাবে কেউ দ্বীনের এমন কোন আহকামকে অস্বীকার করলেও কাফের বলে বিবেচিত হবে যা দ্বীনের বিধিবিধান বলে সাব্যস্ত হয়েছে। কুরআন ও সুন্নাহর আয়াত ও হাদীসসমূহ বিশ্লেষণ করে আমরা কুফরীকে দু’ভাগে ভাগ করতে পারি। বড় কুফ্র, ছোট কুফ্র। প্রথমতঃ বড় কুফ্র। আর তা পাঁচ প্রকারঃ
১) মিথ্যা প্রতিপন্ন করার সাথে সম্পৃক্ত কুফ্র। আর তা হল রাসূলগণের মিথ্যাবাদী হওয়ার বিশ্বাস পোষণ করা। অতএব তারা যা কিছু নিয়ে এসেছেন, তাতে যে ব্যক্তি তাদেরকে প্রকাশ্যে কিংবা অপ্রকাশ্যে মিথ্যা সাব্যস্ত করল, সে কুফরী করল। এর দলীল হল আল্লাহ্র বাণীঃ “যে ব্যক্তি আল্লাহ্র উপর মিথ্যারোপ করে অথবা তার কাছে সত্যের আগমণ হলে তাকে সে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে, তার অপেক্ষা অধিক যালিম আর কে? জাহান্নামেই কি কাফিরদের আবাস নয়"? [সূরা আল আন্কাবুতঃ ৬৮]
২) অস্বীকার ও অহংকারের মাধ্যমে কুফরঃ এটা এভাবে হয় যে, রাসূলের সত্যতা এবং তিনি যে আল্লাহ্র পক্ষ থেকে সত্য নিয়ে এসেছেন সে সম্পর্কে জ্ঞাত থাকা, কিন্তু অহংকার ও হিংসাবশতঃ তাঁর হুকুম না মানা এবং তাঁর নির্দেশ না শোনা। এর দলীল আল্লাহ্র বাণীঃ “যখন আমরা ফেরেশ্তাদের বললাম, আদমকে সিজদা কর, তখন ইবলীস ব্যতীত সকলেই সিজদা করল। সে অমান্য করল ও অহংকার করল। সুতরাং সে কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত হল”। [সূরা আল-বাকারাহঃ ৩৪]
৩) সংশয়-সন্দেহের কুফরঃ আর তা হল রাসূলগণের সত্যতা এবং তারা যা নিয়ে এসেছেন সে সম্পর্কে ইতস্তত করা এবং দৃঢ় বিশ্বাস না রাখা। একে ধারণা সম্পর্কিত কুফ্রও বলা হয়। আর ধারণা হল একীন ও দৃঢ় বিশ্বাসের বিপরীত। এর দলীল আল্লাহ্ তা'আলার বাণীঃ “আর নিজের প্রতি যুলুম করে সে তার উদ্যানে প্রবেশ করল। সে বলল, আমি মনে করি না যে, এটি কখনো ধ্বংস হয়ে যাবে। আমি মনে করি না যে, কিয়ামত হবে। আর আমি যদি আমার রবের নিকট প্রত্যাবর্তিত হই-ই, তবে আমি তো নিশ্চয়ই এ অপেক্ষা উৎকৃষ্ট স্থান পাব। তদুত্তরে তার বন্ধু বিতর্কমূলকভাবে জিজ্ঞাসা করতঃ তাঁকে বলল, তুমি কি তাঁকে অস্বীকার করছ যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন মৃত্তিকা ও পরে শুক্র হতে এবং তার পর পূর্ণাঙ্গ করেছেন পুরুষ আকৃতিতে? কিন্তু তিনিই আল্লাহ্ আমার রব এবং আমি কাউকেও আমার রবের শরীক করি না”। [সূরা আল-কাহ্ফঃ ৩৫-৩৮]
৪) বিমুখ থাকার মাধ্যমে কুফরঃ এদ্বারা উদ্দেশ্য হল দ্বীন থেকে পরিপূর্ণভাবে বিমুখ থাকা এমনভাবে যে, স্বীয় কর্ণ, হৃদয় ও জ্ঞান দ্বারা ঐ আদর্শ থেকে দূরে থাকা যা রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিয়ে এসেছেন। এর দলীল আল্লাহ্র বাণীঃ “কিন্তু যারা কুফর করেছে তারা সে বিষয় থেকে বিমুখ যে বিষয়ে তাদেরকে সতর্ক করা হয়েছে”। [সূরা আল-আহকাফঃ ৩]
৫) নিফাকের মাধ্যমে কুফ্রঃ এদ্বারা বিশ্বাসগত নিফাক বুঝানো উদ্দেশ্য, যেমন ঈমানকে প্রকাশ করে গোপনে কুফ্র লালন করা। এর দলীল আল্লাহ্র বাণীঃ “এটা এজন্য যে, তারা ঈমান আনার পর কুফরী করেছে। ফলে তাদের হৃদয়ে মোহর মেরে দেয়া হয়েছে। অতএব তারা বুঝে না”। [সূরা আল-মুনাফিকূনঃ ৩]
দ্বিতীয়তঃ ছোট কুফ্র,
এ ধরনের কুফরে লিপ্ত ব্যক্তি মুসলিম মিল্লাত থেকে বের হয়ে যাবে না এবং চিরতরে জাহান্নামে অবস্থান করাকেও তা অপরিহার্য করে না। এ কুফরে লিপ্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে শুধু কঠিন শাস্তির ধমক এসেছে। এ প্রকার কুফ্র হল নেয়ামত অস্বীকার করা। কুরআন ও সুন্নার মধ্যে বড় কুফ্র পর্যন্ত পৌঁছে না এ রকম যত কুফরের উল্লেখ এসেছে, তার সবই এ প্রকারের অন্তর্গত। এর উদাহরণের মধ্যে রয়েছে, আল্লাহ্ তা'আলার বাণীঃ “আল্লাহ্ দৃষ্টান্ত দিচ্ছেন এমন এক জনপদের যা ছিলো নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত, যেখানে সর্বদিক হতে তার প্রচুর জীবিকা আসত। অতঃপর তারা আল্লাহ্র অনুগ্রহ অস্বীকার করল। ফলে তারা যা করত তজ্জন্য আল্লাহ্ সে জনপদকে আস্বাদন করালেন ক্ষুধা ও ভীতির আচ্ছাদন”। [সূরা আন-নাহলঃ ১১২] এখানে অনুগ্রহ অস্বীকার করাকে কুফর বলা হয়েছে, যা ছোট কুফর। [আল-ওয়াজিবাতুল মুতাহাত্তিমাতু]
[২] আয়াতে ব্যবহৃত ‘ইনযার’ শব্দের অর্থ, এমন সংবাদ দেয়া যাতে ভয়ের সঞ্চার হয়। এর বিপরীত শব্দ হলো, ‘ইবশার' আর তা এমন সংবাদকে বলা হয়, যা শুনে আনন্দ লাভ হয়। সাধারণ অর্থে ‘ইনযার’ বলতে ভয় প্রদর্শন করা। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে শুধু ভয় প্রদর্শনকে ‘ইনযার’ বলা হয় না, বরং শব্দটি দ্বারা এমন ভয় প্রদর্শন বুঝায়, যা দয়ার ভিত্তিতে হয়ে থাকে। যেভাবে মা সন্তানকে আগুন, সাপ, বিচ্ছু এবং হিংস্র জীবজন্তু হতে ভয় দেখিয়ে থাকেন। ‘নায়ীর’ বা ভয়-প্রদর্শনকারী ঐ সমস্ত ব্যক্তি যারা অনুগ্রহ করে মানবজাতিকে যথার্থ ভয়ের খবর জানিয়ে দিয়েছেন। এ জন্যই নবী-রাসূলগণকে খাসভাবে ‘নাযীর’ বলা হয়।
কেননা, তারা দয়া ও সতর্কতার ভিত্তিতে অবশ্যম্ভাবী বিপদ হতে ভয় প্রদর্শন করার জন্যই প্রেরিত হয়েছেন। নবীগণের জন্য ‘নাযীর’ শব্দ ব্যবহার করে একদিকে ইংগিত করা হয়েছে যে, যারা দাওয়াতের দায়িত্ব পালন করবেন, তাদের দায়িত্ব হচ্ছে সাধারণ মানুষের প্রতি যথার্থ মমতা ও সমবেদনা সহকারে কথা বলা। এ আয়াতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সান্তনা দেয়ার জন্য বলা হয়েছে যে, এ সমস্ত জেদী-অহংকারী লোক, যারা সত্যকে জেনে-শুনেও কুফরীর উপর দৃঢ় হয়ে আছে, অথবা অহংকারের বশবর্তী হয়ে কোন সত্য কথা শুনতে কিংবা সুস্পষ্ট দলীলপ্রমাণ দেখতেও প্রস্তুত নয়, তাদের পথে এনে ঈমানের আলোকে আলোকিত করার উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে বিরামহীন চেষ্টা করেছেন তা ফলপ্রসূ হওয়ার নয়।
এদের ব্যাপারে চেষ্টা করা না করা একই কথা।
এ আয়াত দ্বারা বুঝা গেল যে, কুফ্র ও অন্যান্য সব পাপের আসল শাস্তি তো আখেরাতে হবেই; তবে কোন কোন পাপের আংশিক শাস্তি দুনিয়াতেও হয়ে থাকে। দুনিয়ার এ শাস্তি ক্ষেত্রবিশেষে নিজের অবস্থা সংশোধন করার সামথ্যকে ছিনিয়ে নেয়া হয়। শুভবুদ্ধি লোপ পায়। মানুষ আখেরাতের হিসাব-নিকাশ সম্পর্কে গাফেল হয়ে গোমরাহীর পথে এমন দ্রুততার সাথে এগুতে থাকে; যাতে অন্যায়ের অনুভূতি পর্যন্ত তাদের অন্তর থেকে দূরে চলে যায়। এ আয়াত থেকে আরও একটি বিষয় লক্ষণীয় যে, এ আয়াতে কাফেরদের প্রতি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নসীহত করা না করা সমান বলে ঘোষণা করা হয়েছে।
তবে তাদেরকে জানানোর এবং সংশোধনের চেষ্টা করার সওয়াব অবশ্যই পাওয়া যাবে। তাই সমগ্র কুরআনে কোন আয়াতেই এসব লোককে ঈমান ও ইসলামের দিকে দাওয়াত দেয়া নিষেধ করা হয়নি। এতে বুঝা যাচ্ছে, যে ব্যক্তি ঈমান ও ইসলামের দাওয়াত দেয়ার কাজে নিয়োজিত, তা ফলপ্রসূ হোক বা না হোক, সে এ কাজের সওয়াব পাবেই।
[৩] ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ঐকান্তিক ইচ্ছা ছিল যে, সমস্ত মানুষই ঈমান আনুক এবং তার অনুসরণ করে হিদায়াত প্রাপ্ত হউক। তাই আল্লাহ্ তা'আলা এ আয়াত নাযিল করে এটা জানিয়ে দিলেন যে, ঈমান আনা ও হিদায়াতপ্রাপ্ত হওয়া আপনার ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল নয়। পূর্বে যার জন্য সৌভাগ্য লিখা হয়েছে সেই ঈমান আনবে। আর যার জন্য দূর্ভাগ্য লিখা হয়েছে সে পথভ্রষ্ট হবে। [আত-তাফসীরুস সহীহ]
[সূরা আল-বাকারাহ (২): আয়াত ৬] পূর্ণ পৃষ্ঠা
মাসআলা: যদি কেউ প্রশ্ন করে যে, হামযাহ কেন 'আলাইহুম', 'ইলাইহুম' এবং 'লাদাইহুম' পাঠ করেছেন, অথচ 'মিন রাব্বিহিম', 'ফিহিম' কিংবা 'জান্নাতাইহিম' শব্দগুলোতে এমনটি পাঠ করেননি? এর উত্তর হলো, 'আলাইহিম', 'ইলাইহিম' ও 'লাদাইহিম' শব্দগুলোতে যে 'ইয়া' রয়েছে তা মূলত 'আলিফ' থেকে পরিবর্তিত হয়েছে; এর মূল রূপ ছিল 'আলাহুম', 'লাদাহুম' ও 'ইলাহুম'। ফলে 'হা' বর্ণটিকে তার মূল যম্মাহর (পেশ) ওপর বহাল রাখা হয়েছে। কিন্তু 'ফিহিম', 'মিন রাব্বিহিম' কিংবা 'জান্নাতাইহিম' শব্দগুলোতে এই প্রেক্ষিত নেই। আর ইমাম কিসায়ী 'আলাইহিমুয যিল্লাহ' এবং 'ইলাইহিমুছনাইন' শব্দগুলোতে তাঁর সাথে একমত হয়েছেন, যা তাঁদের উভয়ের প্রচলিত কিরাআত অনুযায়ী সুপরিচিত।
[সূরা আল-বাকারাহ (২): আয়াত ৬]নিশ্চয় যারা কুফরি করেছে, আপনি তাদেরকে সতর্ক করুন বা না করুন, উভয়ই তাদের জন্য সমান; তারা ঈমান আনবে না (৬) কাফিরদের অবস্থা ও পরিণতির বর্ণনা এবং কুফরের অর্থযখন মহান আল্লাহ মুমিনদের এবং তাদের অবস্থার কথা উল্লেখ করেছেন, তখন তিনি কাফিরদের এবং তাদের পরিণতির কথা বর্ণনা করেছেন। কুফর হলো ঈমানের বিপরীত এবং এই আয়াতে এটিই উদ্দেশ্য। কখনো কখনো এটি নেয়ামত এবং উপকারের অস্বীকৃতি (অকৃতজ্ঞতা) অর্থেও ব্যবহৃত হয়। এরই প্রেক্ষিতে সূর্যগ্রহণের হাদীসে নারীদের সম্পর্কে নবী করীম (সা.)-এর উক্তি রয়েছে: (আমি জাহান্নাম দেখেছি এবং আজকের মতো ভয়াবহ দৃশ্য আর কখনও দেখিনি।
আর আমি দেখেছি যে জাহান্নামের অধিবাসীদের অধিকাংশ হলো নারী)। জিজ্ঞাসা করা হলো: হে আল্লাহর রাসূল! কেন? তিনি বললেন: (তাদের কুফরির কারণে)। পুনরায় জিজ্ঞাসা করা হলো: তারা কি আল্লাহর সাথে কুফরি করে? তিনি বললেন: (তারা স্বামীর অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে এবং উপকারের অস্বীকৃতি জানায়। যদি তুমি তাদের কারো প্রতি যুগ যুগ ধরে ইহসান বা উপকার করো, অতঃপর সে তোমার কাছ থেকে সামান্য কিছু অপ্রীতিকর দেখে, তবে সে বলে ওঠে: আমি তোমার কাছ থেকে কখনো কোনো কল্যাণ পাইনি)। এটি বুখারী ও অন্যান্যরা সংকলন করেছেন। আর আরবি ভাষায় কুফরের মূল অর্থ হলো: গোপন করা ও ঢেকে রাখা।
এখান থেকেই কবির উক্তি এসেছে:এমন এক রাতে যার মেঘমালা তারকাদের ঢেকে ফেলেছে অর্থাৎ সেগুলোকে আচ্ছাদিত করে ফেলেছে। এই অর্থেই রাতকে 'কাফির' বলা হয়, কারণ এটি তার অন্ধকার দিয়ে সবকিছুকে ঢেকে দেয়। কবি বলেছেন: «১»অতঃপর তারা সারিবদ্ধ সুরক্ষিত ডিমগুলোর কথা স্মরণ করল যখন সূর্য তার ডান হাত অন্ধকারের চাদরে সমর্পণ করলযুক্কাউ (যাল বর্ণের যম্মাহ ও মাদ্দ সহকারে): সূর্যের একটি নাম। অন্য এক কবির উক্তি:ভোর হওয়ার পূর্বেই সে অবতরণ করল, যখন সূর্যের সন্তান অন্ধকারের মধ্যে লুকিয়ে ছিলঅর্থাৎ রাতের মধ্যে। 'কাফির' বলতে সমুদ্র এবং বিশাল নদীকেও বোঝানো হয়।
এছাড়া 'কাফির' অর্থ কৃষকও হয়, যার বহুবচন হলো 'কুফফার'। মহান আল্লাহ বলেছেন: "যেমন বৃষ্টির উপমা, যার ফলে উৎপন্ন উদ্ভিদ কৃষকদের (কুফফার) চমৎকৃত করে" [আল-হাদীদ: ২০]। অর্থাৎ কৃষকদের, কারণ তারা বীজ মাটির নিচে ঢেকে দেয়। আর ছাই...(১). তিনি হলেন ছালাবাহ ইবনে সুআইর আল-মাযিনী; তিনি পুরুষ ও স্ত্রী উটপাখি এবং সূর্যাস্তের সময় তাদের ডিমের কাছে ফেরার দৃশ্য বর্ণনা করছেন। 'ছিকল' (হরকতসহ) এখানে অর্থ হলো সুরক্ষিত উটপাখির ডিম। 'রাশীদ' হলো যা একটির ওপর আরেকটি অথবা পাশাপাশি সাজানো। 'তার ডান হাত কাফিরে নিক্ষেপ করল' অর্থাৎ সূর্য অস্ত যেতে শুরু করল।
লিসানুল আরব, মূল শব্দ (কাফারা)।(২). দ্রষ্টব্য: খণ্ড ১৭, পৃষ্ঠা ২৫৫
৪ - ৫ - আল্লাহ তাআলার বাণী: “আর যারা ঈমান আনে আপনার প্রতি যা অবতীর্ণ করা হয়েছে এবং আপনার পূর্বে যা অবতীর্ণ করা হয়েছে তার প্রতি, আর তারা আখিরাতের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস রাখে। তারাই তাদের রবের পক্ষ থেকে হিদায়াতের ওপর প্রতিষ্ঠিত এবং তারাই সফলকাম।”ইবনে ইসহাক, ইবনে জারীর এবং ইবনে আবি হাতিম ইবনে আব্বাস (রাযি.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, আল্লাহর বাণী—আর যারা ঈমান আনে আপনার প্রতি যা অবতীর্ণ করা হয়েছে এবং আপনার পূর্বে যা অবতীর্ণ করা হয়েছে
এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন: অর্থাৎ আপনি আল্লাহর পক্ষ থেকে যা নিয়ে এসেছেন এবং আপনার পূর্ববর্তী রাসূলগণ যা নিয়ে এসেছেন, তারা সেসব বিষয়কে সত্য বলে বিশ্বাস করে; তারা তাঁদের মধ্যে কোনো পার্থক্য করে না এবং তাঁদের রবের পক্ষ থেকে তাঁরা যা নিয়ে এসেছেন তা অস্বীকার করে না।
আর তারা আখিরাতের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস রাখে
অর্থাৎ পুনরুত্থান, কিয়ামত, জান্নাত, জাহান্নাম, হিসাব ও মিযানের প্রতি বিশ্বাস রাখে। তারা ওইসব লোকদের মতো নয় যারা দাবি করে যে তারা আপনার পূর্বের বিষয়গুলোর ওপর ঈমান এনেছে অথচ আপনার রবের পক্ষ থেকে আপনার কাছে যা এসেছে তা অস্বীকার করে।আবদ বিন হুমাইদ কাতাদা (রহ.) থেকে বর্ণনা করেন—আর যারা ঈমান আনে আপনার প্রতি যা অবতীর্ণ করা হয়েছে
সম্পর্কে তিনি বলেন: এটি হলো ফুরকান (আল-কুরআন), যার মাধ্যমে আল্লাহ সত্য ও মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য করে দিয়েছেন। এবং আপনার পূর্বে যা অবতীর্ণ করা হয়েছে
অর্থাৎ আপনার পূর্বে অতিক্রান্ত কিতাবসমূহ।
তারাই তাদের রবের পক্ষ থেকে হিদায়াতের ওপর প্রতিষ্ঠিত এবং তারাই সফলকাম
সম্পর্কে তিনি বলেন: তারা সত্যের মাধ্যমেই হিদায়াত ও সফলতার উপযুক্ত হয়েছে, ফলে আল্লাহ তা তাদের জন্য সাব্যস্ত করেছেন।এটি ঈমানদারদের বৈশিষ্ট্য, এরপর মুশরিকদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করে তিনি বলেছেন—নিশ্চয় যারা কুফরি করেছে, তাদের জন্য সমান...
(সূরা বাকারাহ, আয়াত ৬ ও তার পরবর্তী আয়াত)।সূরা বাকারার প্রথম পাঁচ আয়াতের ফযিলত আবদুল্লাহ ইবনে আহমদ ইবনে হাম্বল ‘যাওয়ায়েদুল মুসনাদ’-এ এবং হাকেম ও বায়হাকী ‘আদ-দাওয়াতে’ উবাই ইবনে কাব (রাযি.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: আমি নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর নিকট উপস্থিত ছিলাম, এমতাবস্থায় একজন গ্রাম্য ব্যক্তি এসে বলল: ‘হে আল্লাহর নবী, আমার এক ভাই অসুস্থ।’ তিনি জিজ্ঞেস করলেন: ‘তার কী হয়েছে?’ সে বলল: ‘তার ওপর জিনের আছর বা পাগলামি হয়েছে।’ তিনি বললেন: ‘তাকে আমার কাছে নিয়ে এসো।’অতঃপর সে তাকে নবীজির সামনে বসাল।
তখন নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাকে সূরা ফাতিহা, সূরা বাকারার প্রথম চার আয়াত, সূরা বাকারার এই আয়াত—আর তোমাদের ইলাহ তো একমাত্র ইলাহ
(সূরা বাকারাহ, আয়াত ১৬৩), আয়াতুল কুরসি, সূরা বাকারার শেষ তিন আয়াত, সূরা আল-ইমরানের একটি আয়াত—(আল্লাহ সাক্ষ্য দেন যে, নিশ্চয়ই তিনি ছাড়া অন্য কোনো ইলাহ নেই) (সূরা আল-ইমরান ১৮), সূরা আরাফের একটি আয়াত—(নিশ্চয়ই তোমাদের রব আল্লাহ) (সূরা আরাফ ৫৪), সূরা মুমিনুনের শেষ অংশ—(অতঃপর আল্লাহ অতি উচ্চ, যিনি প্রকৃত মালিক) (সূরা মুমিনুন ১১৬), সূরা জিনের একটি আয়াত—(এবং নিশ্চয় আমাদের রবের মর্যাদা অতি উচ্চ) (সূরা জিন ৩), সূরা সাফফাতের প্রথম দশ আয়াত, সূরা হাশরের শেষ তিন আয়াত, ‘কুল হুওয়াল্লাহু আহাদ’ এবং ‘মুআউবিজাতাইন’ (সূরা ফালাক ও নাস) দ্বারা ঝাড়ফুঁক করলেন।
এরপর লোকটি এমনভাবে উঠে দাঁড়ালো যেন সে কখনও অসুস্থ ছিল না।
