Al-Baqarah

আল-বাকারা: 97

2:97

আরবি

قُلْ مَن كَانَ عَدُوًّا لِّجِبْرِيلَ فَإِنَّهُۥ نَزَّلَهُۥ عَلَىٰ قَلْبِكَ بِإِذْنِ ٱللَّهِ مُصَدِّقًا لِّمَا بَيْنَ يَدَيْهِ وَهُدًى وَبُشْرَىٰ لِلْمُؤْمِنِينَ

English Translations

Sahih International

Say, "Whoever is an enemy to Gabriel - it is [none but] he who has brought it [i.e., the Qur’ān] down upon your heart, [O Muḥammad], by permission of Allāh, confirming that which was before it and as guidance and good tidings for the believers."

Muhsin Khan

Say (O Muhammad Peace be upon him): "Whoever is an enemy to Jibrael (Gabriel) (let him die in his fury), for indeed he has brought it (this Quran) down to your heart by Allah's Permission, confirming what came before it [i.e. the Taurat (Torah) and the Injeel (Gospel)] and guidance and glad tidings for the believers.

Taqi Usmani

Say, if someone is an enemy to Jibra’īl (Gabriel) (it can by no means degrade him for) it is he who has brought it (the Qur’ān) down upon your heart by the permission of Allah, confirming what has been before it, and a guidance and good tidings to the believers.

Abul Ala Maududi

Say: “Whoever is an enemy to Gabriel (should know that) he revealed this (Qur’an) to your heart by Allah’s leave: it confirms the Scriptures revealed before it, and is a guidance and good tiding to the people of faith.

Pickthall

Say (O Muhammad, to mankind): Who is an enemy to Gabriel! For he it is who hath revealed (this Scripture) to thy heart by Allah's leave, confirming that which was (revealed) before it, and a guidance and glad tidings to believers;

Yusuf Ali

Say: Whoever is an enemy to Gabriel-for he brings down the (revelation) to thy heart by Allah's will, a confirmation of what went before, and guidance and glad tidings for those who believe,-

বাংলা অনুবাদ

তাইসিরুল কুরআন

বল, ‘যে ব্যক্তি জিবরাঈলের শত্রু হয়েছে, (সে রাগে মরে যাক) কেননা সে তো আল্লাহর হুকুমে তোমার অন্তরে কুরআন পৌঁছিয়ে দিয়েছে, যা এর পূর্ববর্তী কিতাবের সমর্থক এবং যাতে ঈমানদারদের জন্য পথনির্দেশ ও সুসংবাদ রয়েছে’।

রাওয়াই আল-বায়ান

বল, ‘যে জিবরীলের শত্রু হবে (সে অনুশোচনায় মরুক) কেননা নিশ্চয় জিবরীল তা আল্লাহর অনুমতিতে তোমার অন্তরে নাযিল করেছে, তার সামনে থাকা কিতাবের সমর্থক, হিদায়াত ও মুমিনদের জন্য সুসংবাদরূপে’।

শাইখ মুজিবুর রহমান

তুমি বলঃ যে ব্যক্তি জিবরাঈলের সাথে শত্রুতা রাখে এ জন্য যে, সে আল্লাহর হুকুমে এই কুরআনকে তোমার অন্তঃকরণ পর্যন্ত পৌঁছিয়েছে, যা পূর্ববতী কিতাবসমূহের সত্যতা প্রমাণ করছে এবং মু’মিনদের সুসংবাদ দিচ্ছে ।

ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

বলুন, ‘যে কেউ জিবরীলের শত্রু হবে, এজন্যে যে, তিনি আল্লাহ্‌র অনুমতিক্রমে আপনার হৃদয়ে কুরআন নাযিল করেছেন, যা পূর্ববর্তী কিতাবেরও সত্যায়ণকারী এবং যা মুমিনদের জন্য পথপ্রদর্শক ও শুভ সংবাদ’

ফাতহুল মাজীদ

তুমি বল- যে ব্যক্তি জিবরাঈলের সাথে শত্র“তা রাখে (সে হিংসায় মরে যাক) সে তো আল্লাহর হুকুমে এ কুরআনকে তোমার অন্তঃকরণ পর্যন্ত পৌঁছিয়েছে, যে অবস্থায় তা পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের সত্যতা প্রমাণ করছে, পথ দেখাচ্ছে, মু’মিনদেরও সুসংবাদ দিচ্ছে।

মুখতাসার

৯৭. হে নবী! আপনি সেই ইহুদিকে জানিয়ে দিন যে বলে: নিশ্চয়ই ফিরিশতাদের মধ্যকার জিব্রীলই আমাদের বড় শত্রু। আপনি বলুন: যে ব্যক্তি জিব্রীলের সাথে শত্রুতা পোষণ করে তার অবশ্যই জানা উচিত যে, ইনিই তো সে জিব্রীল যিনি আল্লাহর আদেশে আপনার অন্তরে কুর‘আন নাযিল করেছেন। যা পূর্ববর্তী সকল ঐশী কিতাবের সপক্ষে। যেমন: তাওরাত ও ইঞ্জীল। যা কল্যাণের পথ প্রদর্শনকারী। যা মু’মিনদেরকে আল্লাহর পক্ষ থেকে নিয়ামতের সুসংবাদ দেয়। সুতরাং যে ব্যক্তি এমন ফিরিশতার সাথে শত্রুতা পোষণ করে সে অবশ্যই পথভ্রষ্ট।

তাফসীর

তাফসীর ইবনে কাসীর

৯৭-৯৮ নং আয়াতের তাফসীরইমাম আবু যাফর তাবারী (রঃ) বলেনঃ মুফাসসিরগণ এতে একমত যে, যখন ইয়াহুদীরা হযরত জিবরাঈল (আঃ) কে তাদের শত্রু এবং হযরত মীকাঈল (আঃ) কে তাদের বন্ধু বলেছিল তখন তাদের একথার উত্তরে এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। কিন্তু কেউ কেউ বলেন যে, নবুওয়াতের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর সঙ্গে তাদের যে কথোপকথন হয়েছিল তার মধ্যে তারা একথা বলেছিল। আবার কেউ কেউ বলেন যে, হযরত উমর ফারুক (রাঃ) এর সঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নবুওয়াত সম্বন্ধে তাদের যে বিতর্ক হয়েছিল তাতে তারা এ কথা বলেছিল।রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নবুওয়াতের উপর কতকগুলো প্রমাণহয়রত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ইয়াহুদীদের একটি দল রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট এসে বলেঃ আমরা আপনাকে কয়েকটি প্রশ্ন করছি যার সঠিক উত্তর নবী ছাড়া অন্য কেউই দিতে পারে না। আপনি সত্য নবী হলে এর উত্তর দিন।' রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আচ্ছা ঠিক আছে, যা ইচ্ছা তাই প্রশ্ন কর। কিন্তু অঙ্গীকার কর, যদি আমি ঠিক ঠিক উত্তর দেই তবে তোমরা আমার নবুওয়াতকে স্বীকার করতঃ আমার অনুসারী হবে তো?' তারা অঙ্গীকার করে। রাসুলুল্লাহ (সঃ) তখন হযরত ইয়াকুব (আঃ)-এর মত আল্লাহকে সাক্ষী রেখে তাদের নিকট হতে পাকা ওয়াদা গ্রহণ করতঃ তাদেরকে প্রশ্ন করার অনুমতি প্রদান করেন। তারা বলেঃ ‘প্রথমে এটা বলুন তো, হযরত ইয়াকুব (আঃ) নিজের উপরে কোন্ জিনিসটি হারাম করেছিলেন?' রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বলেনঃ “শুন! যখন হযরত ইয়াকুব আরকুন সিনা’ রোগে ভীষণভাবে আক্রান্ত হন তখন তিনি প্রতিজ্ঞা করেন যে, আল্লাহ তা'আলা যদি তাকে এ রোগ হতে আরোগ্যদান করেন তবে তিনি উটের গোশত খাওয়া ও উস্ত্রীর দুধ পান করা পরিত্যাগ করবেন। আর এ দুটি ছিল তার খুবই লোভনীয় ও প্রিয় বস্তু।অতঃপর তিনি সুস্থ হয়ে গেলে এ দুটো জিনিস নিজের উপর হারাম করে দেন। তোমাদের উপর সেই আল্লাহর শপথ, যিনি হযরত মূসা (আঃ)-এর উপর তাওরাত অবতীর্ণ করেছিলেন, সত্য করে বলতো এটা সঠিক নয় কি? তারা শপথ করে বলেঃ “নিশ্চয়ই সত্য। রাসূলুল্লাহ (সঃ) আরও বলেনঃ “হে আল্লাহ! আপনি সাক্ষী থাকুন। অতঃপর তারা বলেঃ “আচ্ছা বলুন তো, তাওরাতের মধ্যে যে নিরক্ষর নবীর সংবাদ রয়েছে তাঁর বিশেষ নিদর্শন কি? আর তাঁর কাছে কোন্ ফেরেশতা ওয়াহী নিয়ে আসেন?' তিনি বলেনঃ তাঁর বিশেষ নির্দশন এই যে, যখন তার চক্ষু ঘুমিয়ে থাকে তখন তার অন্তর জাগ্রত থাকে। তোমাদেরকে সেই প্রভুর কসম, যিনি হযরত মূসা (আঃ) এর উপর তাওরাত অবতীর্ণ করেছিলেন, বলতো এটা সঠিক উত্তর নয় কি? তারা সবাই কসম করে বলে :আপনি সম্পূর্ণ সঠিক উত্তর দিয়েছেন। তিনি বলেনঃ হে আল্লাহ! আপনি সাক্ষী থাকুন। তারা বলেঃ ‘এবার আমাদেরকে দ্বিতীয় অংশের উত্তর দিন। এটাই আলোচনার সমাপ্তি। তিনি বলেনঃ ‘আমার বন্ধু জিবরাঈলই (আঃ) আমার নিকট ওয়াহী নিয়ে আসেন এবং তিনিই সমস্ত নবীর নিকট ওয়াহী নিয়ে আসতেন। সত্য করে বল এবং কসম করে বল, আমার এ উত্তরটিও সঠিক নয় কি? তারা শপথ করে বলেঃ হা, উত্তর সঠিকই বটে; কিন্তু তিনি আমাদের শত্রু। কেননা, তিনি কঠোরতা ও হত্যাকাস্ত্রে কারণসমূহ ইত্যাদি নিয়ে আসেন। এজন্যে আমরা তাঁকে মানি এবং আপনাকেও মানবো না। তবে হাঁ, যদি আপনার নিকট আমাদের বন্ধু হযরত মীকাঈল (আঃ) ওয়াহী নিয়ে আসতেন তবে আমরা আপনার সত্যতা স্বীকার করতঃ আপনার অনুসারী হতাম। তাদের একথার উত্তরে এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। কোন কোন বর্ণনায় এও আছে যে, তারা এটাও প্রশ্ন করেছিল ও বন্ধু কি জিনিস?' রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বলেনঃ “তিনি একজন ফেরেশতা। তিনি মেঘের উপর নিযুক্ত রয়েছেন এবং আল্লাহর নির্দেশক্রমে তাকে এদিক ওদিক নিয়ে যান। তারা বলে এ গর্জনের শব্দ কি?' তিনি বলেনঃ ‘এটা ঐ। ফেরেশতারই শব্দ'। (মুসনাদ-ই-আহমাদ ইত্যাদি)সহীহ বুখারী শরীফের একটি বর্ণনায় আছে যে, যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) মদীনায় আগমন করেন সেই সময় হযরত আবদুল্লাহ বিন সালাম (রাঃ) স্বীয় বাগানে অবস্থান করছিলেন এবং তিনি ইয়াহুদী ধর্মের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আগমন সংবাদ শুনেই তিনি তাঁর নিকট উপস্থিত হন এবং বলেনঃ জনাব, আমি আপনাকে তিনটি প্রশ্ন করছি যার উত্তর নৰী ছাড়া কেউই জানে না। বলুন, কিয়ামতের প্রথম লক্ষণ কি? জান্নাতবাসীদের প্রথম খাবার কি এবং কোন্ জিনিস সন্তানকে কখনও মায়ের দিকে আকৃষ্ট করে এবং কখনও বাপের দিকে রাসূলুহ (সঃ) বলেনঃ ‘এ তিনটি প্রশ্নের উত্তর এখনই জিরাঈল (আঃ) আমাকে বলে গেলেন।' আবদুল্লাহ বিন সালাম বলেনঃ জিবরাঈল তো আমাদের শত্রু।' তখন রাসূলুহ (সঃ) এ আয়াতটি পাঠ করেন। অতঃপর তিনি বলেনঃ কিয়ামতের প্রথম লক্ষণ এই যে, এক আগুন হবে যা জনগণকে পূর্ব দিক হতে পশ্চিম দিকে নিয়ে জমা করবে। জান্নাতবাসীদের প্রথম খাবার হবে মাছের কলিজা। যখন পুরুষের বীর্য স্ত্রীর বীর্যের উপর প্রাধান্য লাভ করে তখন পুত্র সন্তান জন্ম গ্রহণ করে আর যখন স্ত্রীর বীর্য পুরুষের বীর্যের উপর প্রাধান্য লাভ করে তখন কন্যা সন্তানের জন্ম হয়। এ উত্তর শুনেই হযরত আবদুল্লাহ বিন সালাম মুসলমান হয়ে যান এবং পাঠ করেনঃ আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কেউ উপাস্য নেই এবং আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি আল্লাহর রাসূল।অতঃপর তিনি বলেনঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ) ইয়াহূদীরা খুবই নির্বোধ ও অ িপ্রকৃতির লোক। আপনি তাদেরকে আমার সম্বন্ধে জিজ্ঞাসাবাদ করার পূর্বেই যদি তারা আমার ইসলাম গ্রহণের সংবাদ জেনে নেয় তবে তারা আমার সম্বন্ধে খারাপ মন্তব্য করবে (সুতরাং আপনি তাদেরকে প্রথমে জিজ্ঞাসাবাদ করুন)। অতঃপর ইয়াহূদীরা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করলে তিনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমাদের মধ্যে আবদুল্লাহ বিন সালাম কেমন লোক?' তারা বলেঃ তিনি আমাদের মধ্যে উত্তম লোক ও উত্তম লোকের ছেলে, তিনি আমাদের মধ্যে নেতা ও নেতার ছেলে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “তিনি যদি ইসলাম গ্রহণ করেন তবে তোমাদের মত কি?' তারা বলেঃ “আল্লাহ তাঁকে ওটা হতে রক্ষা করুন!' অতঃপর আবদুল্লাহ বিন সালাম (রাঃ) বের হয়ে পড়েন। (তিনি এতক্ষণ আড়ালে ছিলেন) এবং পাঠ করেনঃ আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কেউ উপাস্য নেই এবং আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ (সঃ) তাঁর রাসূল। তখনই তারা বলে উঠেঃ সে আমাদের মধ্যে খারাপ লোক এবং খারাপ লোকের ছেলে, সে অত্যন্ত নিম্ন স্তরের লোকে।' হযরত আবদুল্লাহ বিন সালাম (রাঃ) তখন বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ) আমি এই ভয়ই করেছিলাম।সহীহ বুখারী শরীফে আছে, হযরত ইকরামা (রাঃ) বলেনঃ (আরবি)-এর অর্থ হচ্ছে ‘দাস' এবং (আরবি)-এর অর্থ হচ্ছে ‘আল্লাহ। সুতরাং (আরবি) ইত্যাদির অর্থ দাঁড়ালো আল্লাহর দাস'। কেউ কেউ এর বিপরীত অর্থও করেছেন। তারা বলেন যে, (আরবি) শব্দের অর্থ 'দাস' এবং এর পূর্বের শব্দগুলো হচ্ছে আল্লাহর নাম। যেমন আরবী ভাষায় (আরবি) ইত্যাদি (আরবি) শব্দটি সব জায়গায় একই থাকছে এবং আল্লাহর নাম পরিবর্তিত হচ্ছে। এরকমই (আরবি) প্রত্যেক স্থলে ঠিক আছে, আর আল্লাহর উত্তম নামগুলো পরিবর্তিত হচ্ছে। আরবী ভাষা ছাড়া। অন্যান্য ভাষায় (আরবি) পূর্বে এবং (আরবি) পরে এসে থাকে। এ নিয়ম এখানেও রয়েছে। যেমনঃ (আরবি) ইত্যাদি। এখন মুফাসৃসিরগণের দ্বিতীয় দলের দলীল দেয়া হচ্ছে-যারা বলেন যে, এ আলোচনা হযরত উমারের (রাঃ) সঙ্গে হয়েছিল। শাবি (রঃ) বলেনঃ হযরত উমার (রাঃ) রাওহা নামক স্থানে এসে দেখেন যে, জনগণ দৌড়াদৌড়ি করে একটি পাথরের ঢিবির পার্শ্বে গিয়ে নামায আদায় করছে। তিনি জিজ্ঞেস করেনঃ ব্যাপার কি? উত্তর আসে যে, এখানে রাসূলুল্লাহ (সঃ) নামায আদায় করেছিলেন। এতে তিনি অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হন যে, যেখানেই সময় হতো সেখানেই রাসূলুল্লাহ (সঃ) নামায পড়ে নিতেন, তারপরে সেখান হতে চলে যেতেন। এখন ঐ স্থানগুলোকে বরকতময় মনে করে অযথা সেখানে গিয়ে নামায পড়তে কে বলেছে? অতঃপর তিনি অন্য প্রসঙ্গ উত্থাপন করেন। তিনি বলেনঃ “আমি মাঝে মাঝে ইয়াহুদীদের সভায় যোগদান করতাম এবং দেখতাম যে, কিভাবে কুরআন তাওরাতের ও তাওরাত কুরআনের সত্যতা স্বীকার করে থাকে। ইয়াহুদীরাও আমার প্রতি ভালবাসা প্রকাশ করতে থাকে এবং প্রায়ই তাদের সাথে আমার আলোচনা হতো। একদিন আমি তাদের সাথে কথা বলছি এমন সময় দেখি যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঐ পথ দিয়ে চলে যাচ্ছেন। তারা আমাকে বলেঃ “ঐ যে তোমাদের নবী (সঃ) চলে যাচ্ছেন। আমি বলিঃ আচ্ছা আমি যাই। কিন্তু তোমাদের এক আল্লাহর কসম! আল্লাহর সত্যকে স্মরণ করে, আল্লাহর নিয়ামতসমূহের প্রতি লক্ষ্য রেখে এবং তোমাদের নিকট যে আল্লাহর কিতাব বিদ্যমান রয়েছে ওর প্রতি খেয়াল করে সেই প্রভুর নামে শপথ করে। বলতো, তোমরা কি মুহাম্মদ (সঃ) কে আল্লাহর রাসূল বলে স্বীকার কর না? তারা সবাই নীরব হয়ে যায়। তাদের বড় আলেম, যে তাদের মধ্যে পূর্ণ জ্ঞানের অধিকারী ছিলো এবং তাদের নেতাও ছিল, তাদেরকে সে বলেঃ তোমাদের এরূপ কঠিন কসম দেয়ার পরও তোমরা স্পষ্ট ও সত্য উত্তর দিচ্ছ না কেন? তারা বলেঃ জনাব! আপনি আমাদের প্রধান, সুতরাং আপনিই উত্তর দিন।' পাদরী তখন বলেঃ তাহলে শুনুন জনাব! আপনি খুব বড় কসম দিয়েছেন। এটা তো সত্যিই যে, মুহাম্মদ (সঃ) যে আল্লাহর রাসূল তা আমরা অন্তর থেকেই জানি। আমি বলি, ‘আফসোস! জান তবে মাননা কেন?' সে বলেঃ তার একমাত্র কারণ এই যে, তার নিকট যে বার্তাবাহক আসেন তিনি হচ্ছেন জিবরাঈল (আঃ), তিনি অত্যন্ত কঠোর, সংকীর্ণমনা, কঠিন শাস্তি ও কষ্ঠের ফেরেশতা। তিনি আমাদের শত্রু এবং আমরা তার শক্র। মুহাম্মদ (সঃ)-এর নিকট যদি হযরত মীকাঈল (আঃ) আসতেন যিনি দয়া, নম্রতা ও শান্তির ফেরেশতা তবে আমরা তাঁকে স্বীকার করতে কোন দ্বিধাবোধ করতাম না। তখন আমি বলি- আচ্ছা বলতো, আল্লাহর নিকট এই দুজনের কোন সম্মান ও মর্যাদা আছে কি?' সে বলেঃ একজন মহান আল্লাহর ডান দিকে আছেন এবং অন্য জন তার বাম দিকে আছেন। আমি বলি- সেই আল্লাহর কসম যিনি ছাড়া কেউ মাবুদ নেই। যে তাঁদের কোন একজনের শত্রু সে আল্লাহ পাকের শ এবং অপর ফেরেশতারও শক্র। জিবরাঈল (আঃ)-এর শত্রু মীকাঈল (আঃ)-এর বন্ধুত্ব হতে পারে না এবং মীকাঈল (আঃ)-এর শত্রু জিবরাঈল (আঃ) এর বন্ধুত্ব হতে পারে না অথবা তাদের কারও শক্র আল্লাহ তা'আলার বন্ধু হতে পারে না। তাঁদের দুজনের কেউই আল্লাহ পাকের অনুমতি ছাড়া পৃথিবীতে আসতে পারেন না বা কোন কাজও করতে পারেন না। আল্লাহর শপথ! তোমাদের প্রতি আমার লোভ নেই বা ভয়ও নেই। জেনে রেখো যে, যে আল্লাহর শত্রু এবং তাঁর রাসূলগনের, ফেরেশতাগণের, জিবরাঈল (আঃ) ও মীকাঈল (আঃ)-এর শত্রু, এরূপ কাফিরদের স্বয়ং আল্লাহ শক্ত। এ বলেই আমি চলে আসি।আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট পৌছলে তিনি আমাকে দেখেই বলেনঃ ‘খাত্তাব তনয়! আমার উপর নতুন ওয়াহী অবতীর্ণ হয়েছে। আমি বলি- 'হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! শুনিয়ে দিন। তিনি তখন উপরোক্ত আয়াতটি পাঠ করে শুনিয়ে দেন। আমি তখন বলি- হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার বাপ মা আপনার প্রতি কুরবান হোক! এখনই ইয়াহূদীদের সাথে আমার এ কথাগুলো নিয়েই আলোচনা চলছিল। আপনাকে এ সংবাদ দেয়ার জন্যেই আমি হাজির হয়েছি। কিন্তু আমার আগমনের পূর্বেই সেই সূক্ষ্মদর্শী ও সর্ববিদিত আল্লাহ্ আপনার নিকট সংবাদ পৌছিয়ে দিয়েছেন।' (মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিম ইত্যাদি)। কিন্তু এ বর্ণনাটি মুনকাতা এবং মুত্তাসিল নয়। শাবী (রঃ) হযরত উমারের (রাঃ) যুগ পান নি।আয়াতটির ভাবার্থ এই যে, হযরত জিবরাঈল (আঃ) আল্লাহ তা'আলার একজন বিশ্বস্ত ফেরেশতা। আল্লাহর নির্দেশক্রমে তিনি তার বাণী নবীদের (আঃ) নিকট পৌছানোর কার্যে নিযুক্ত রয়েছেন। ফেরেশতাগণের মধ্যে তিনি আল্লাহর রাসূল। কোন একজন রাসূলের প্রতি শত্রুতা পোষণকারী সমস্ত রাসূলের প্রতি শত্রুতা পোষণকারী। যেমন একজন রাসূলের উপর ঈমান আনলেই সব রাসূলের উপর ঈমান আনা হয়, অনুরূপভাবে একজন রাসূলকে অস্বীকার করা মানেই সব রাসূলকেই অস্বীকার করা। যারা কোন কোন রাসূলকে অস্বীকার করে থাকে, স্বয়ং আল্লাহই তাদেরকে কাফির বলেছেন। যেমন তিনি বলেছেনঃ “নিশ্চয় যারা আল্লাহর সঙ্গে ও তাঁর রাসূলগণের সঙ্গে কূফরী করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা আনয়ন করতে চায় আর বলে- আমরা কাউকে মানি ও কাউকে মানি না------।এ সব আয়াতে ঐ ব্যক্তিকে স্পষ্টভাবে কাফির বলা হয়েছে। যে কোন একজন নবীকে অমান্য করে থাকে। এরকমই জিব্রাঈল (আঃ)-এর শত্রুও আল্লাহর শত্রু। কেননা তিনি স্বেচ্ছায় আসেন না। কুরআন পাকে ঘোষিত হচ্ছেঃ ‘আমরা আল্লাহর নির্দেশ ছাড়া অবতীর্ণ হই না।' অন্যত্র আছেঃ এটা বিশ্ব প্রভ কর্তক অবতারিত যা নিয়ে রূহুল আমীন এসে থাকে, এবং তোমার অন্তরে ঢুকিয়ে দিয়ে থাকে, যেন তুমি ভয় প্রদর্শনকারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাও।' সহীহ বুখারী শরীফের মধ্যে হাদীসে কুদসীতে আছেঃ ‘আমার বন্ধুদের প্রতি শত্রুতা পোষনকারী আমার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণাকারী।' কুরআন কারীমের এটাও একটা বিশেষত্ব যে, এটা পূর্ববর্তী সমস্ত আসমানী কিতাবের সত্যতা স্বীকার করে এবং ঈমানদারগণের জন্যে এটা হিদায়াত স্বরূপ, আর তাদের জন্যে বেহেশতের সুসংবাদ দিয়ে থাকে। রাসূলগণের মধ্যে মানুষ রাসূল ও ফেরেশতা রাসূল সবাই জড়িত রয়েছেন। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ “নিশ্চয় আল্লাহ পাক ফেরেশতাগণের মধ্য হতে এবং মানুষের মধ্য হতে স্বীয় রাসূল বেছে নেন।' জিবরাঈল (আঃ) ও মীকাঈল (আঃ) ফেরেশতাদেরই অন্তর্ভুক্ত। তথাপি বিশেষভাবে তাদের নাম নেয়ার কারণ হচ্ছে যেন এটা পরিষ্কার হয়ে যায় যে, হযরত জিবরাঈলের (আঃ)শক্র হযরত মীকাঈল (আঃ)-এরও শত্রু, এমনকি আল্লাহরও শত্রু।মাঝে মাঝে হযরত মীকাঈলও (আঃ) নবীগণের (আঃ) কাছে এসেছেন। যেমন রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সঙ্গে প্রথম প্রথম এসে ছিলেন। কিন্তু ঐ কাজে নিযুক্ত রয়েছেন হযরত জিবরাঈল (আঃ)। যেমন হযরত মীকাঈল (আঃ) নিযুক্ত রয়েছেন গাছপালা উৎপাদন ও বৃষ্টি বর্ষণ ইত্যাদি কাজে। আর হযরত ইসরাফীল (আঃ) নিযুক্ত রয়েছেন শিঙ্গা ফুঙ্কার কাজে।একটি বিশুদ্ধ হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ঘুম থেকে জেগে নিম্নের দোআটি পাঠ করতেনঃ হে আল্লাহ, হে জিবরাঈল, মীকাঈল ও ইসরাফীলের প্রভু! হে আকাশ ও ভূমণ্ডলের সৃষ্টিকর্তা এবং প্রকাশ্য ও গোপনীয় বিষয়সমূহের জ্ঞাতা! আপনার বান্দাদের মতভেদের ফয়সালা আপনিই করে থাকেন। হে আল্লাহ! মতভেদপূর্ণ বিষয়ে আপনার হুকুমে আমাকে সঠিক পথে পরিচালিত করুন। আপনি যাকে চান তাকে সরল-সঠিক পথ দেখিয়ে থাকেন। (আরবি) ইত্যাদি শব্দের বিশ্লেষণ এবং অর্থ ইতিপূর্বেই বর্ণিত হয়েছে। হযরত আবদুল আযীয ইবনে উমার (রাঃ) বলেন যে, ফেরেশতাদের মধ্যে হযরত জিবরাঈলের (আঃ) নাম খাদেমুল্লাহ। আয়াতের শেষে এটা বলেননি যে, অল্লাহ্ও ঐ লোকদের শত্রু বরং বলেছেন আল্লাহ কাফিরদের শত্রু। এর দ্বারা এরকম লোকদেরও হুকুম জানা গেল। একে আরবী ভাষায় (আরবি) এর স্থানে (আরবি) বলা হয়। আরবের কথায় এর দৃষ্টান্ত কবিতার মধ্যেও প্রায়ই পাওয়া যায়। যেন এরূপ বলা হচ্ছেঃ যে আল্লাহর বন্ধুর সঙ্গে শত্রুতা করলো সে আল্লাহর সঙ্গে শত্রুতা করলো এবং যে আল্লাহর শত্রু, আল্লাহও তার শত্রু। আর স্বয়ং আল্লাহ যার শত্রু তার কুফরী ও ধ্বংসের মধ্যে কোন সন্দেহ থাকতে পারে কি? সহীহ বুখারীর হাদীস ইতিপূর্বেই বর্ণিত হয়েছে, যেখানে আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ “আমার বন্ধুর সাথে শত্রুতাকারীর বিরুদ্ধে আমি যুদ্ধ ঘোষণা করছি।' অন্য হাদীসে আছেঃ “আমি আমার বন্ধুদের প্রতিশোধ গ্রহণ করে থাকি। আর একটি হাদীসে আছেঃ যার শত্রু স্বয়ং আমি হই তার ধ্বংস অনিবার্য।

তাফসীর আবু বকর যাকারিয়া

বলুন, ‘যে কেউ জিবরীলের [১] শত্রু হবে, এজন্যে যে, তিনি আল্লাহ্‌র অনুমতিক্রমে আপনার হৃদয়ে কুরআন নাযিল করেছেন, যা পূর্ববর্তী কিতাবেরও সত্যায়ণকারী এবং যা মুমিনদের জন্য পথপ্রদর্শক ও শুভ সংবাদ’ [২]

[১] ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, জিবরীল’ শব্দটি আব্দুল্লাহ ও আব্দুর রহমান এর মতই। [আত-তাফসীরুস সহীহ]

[২] এ আয়াত নাযিল হওয়ার একটি কারণ এই বলা হয় যে, ইয়াহুদীরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট এসে বলল, হে আবুল কাশেম। আমরা আপনাকে কয়েকটি প্রশ্ন করছি, যদি সেগুলোর জবাব আপনি দিতে পারেন তবে আমরা আপনার অনুসরণ করব, আপনার সত্যতার সাক্ষ্য দিব এবং আপনার উপর ঈমান আনব। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের কাছ থেকে অঙ্গীকার নিলেন যেমন ইয়াকুব ‘আলাইহিস সালাম তার সন্তানদের কাছ থেকে নিয়েছিলেন, তিনি বলেন, “আমরা যা বলছি তাতে আল্লাহ্‌ই কৰ্মবিধায়ক" [সূরা ইউসুফ:৬৬]

তখন তারা বলল, আমাদেরকে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আলামত কি বলুন। রাসূল বললেন, “তার চক্ষু ঘুমায় কিন্তু তার অন্তর ঘুমায় না”। তারা বলল, কিভাবে একজন নারী মেয়ে সন্তানের জন্ম দেয় আর কিভাবে পুরুষ সন্তানের জন্ম দেয়? রাসূল বললেন, দুই বীর্য মিলিত হওয়ার পরে যদি মহিলার বীর্য পুরুষের বীর্যের চেয়ে বেশী প্রাধান্য বিস্তারকারী হয় তবে মেয়ে সন্তান হয়। আর যদি পুরুষের বীর্য মহিলার বীর্যের উপর প্রাধান্য বিস্তার করে তবে পুত্র সন্তান হয়। তারা বলল, আপনি সত্য বলেছেন। ---- তারা বলল, ইসরাঈল (ইয়াকুব) কোন বস্তুকে তার নিজের উপর হারাম করেছেন সেটা আমাদের জানান। তিনি বললেন, ইয়াকুব ‘আলাইহিস সালাম বেদুইন এলাকায় বাস করতেন। তখন তার ইরকুন নিসা’ নামক রোগ হয়। ফলে তিনি দেখলেন যে, উটের গোস্ত ও দুধ তার জন্য এ রোগের কারণ হয়েছে, তখন তিনি সেটা নিজের উপর নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। তারা বলল, আপনি সত্য বলেছেন। তারা বলল, আপনার কাছে কোন ফেরেশতা ওহী নিয়ে আসে তার সম্পর্কে আমাদের জানান। কেননা, প্রত্যেক নবীর কাছেই কোন না কোন ফেরেশতা তার রবের কাছ থেকে ওহী ও রিসালত নিয়ে আগমন করে থাকে। এ ব্যাপারে আপনার সঙ্গীটি কে? এটি বাকী রয়েছে। যদি এটা বলেন তো আমরা আপনার অনুসরণ করব। রাসূল বললেন, তিনি তো জিবরীল। তারা বলল, এই তো সে যে যুদ্ধ বিগ্রহ নিয়ে আসে। সে ফেরেশতাদের মধ্যে আমাদের শক্র। আপনি যদি বলতেন যে, তিনি মীকাইল, তবে আমরা আপনার অনুসরণ করতাম। কারণ তিনি বৃষ্টি ও রহমত নিয়ে আসে। তখন আল্লাহ্ তা'আলা উপরোক্ত আয়াত নাযিল করেন। [মুসনাদে আহমাদ: ১/২৭৪, তিরমিয়ী: ৩১১৭]

আয়াতে বলা হয়েছে যে, যে কেউ জিবরালের শক্র হবে; সে শুধু এজন্যই শক্র হবে যে, তিনি আল্লাহ্‌র নির্দেশে যার উপর ইচ্ছা ওহী নিয়ে অবতরণ করে থাকেন। যারা আল্লাহ্‌র ফেরেশতা ও তার বিধানের বিরোধিতার জন্য জিবরীলের সাথে শক্রতা করবে তার ব্যাপারে শরীআতের হুকুম কি তা পরবর্তী আয়াতে বর্ণিত হবে।