As-Saffat
আস-সাফফাত: 88
37 আস-সাফফাত As-Saffat · 182 আয়াত الصافات
মূল আরবি
فَنَظَرَ نَظْرَةً فِى ٱلنُّجُومِ
English Translations
And he cast a look at the stars
Then he cast a glance at the stars (to deceive them),
Then, he cast a look at the stars,
Then he looked carefully at the stars
And he glanced a glance at the stars
Then did he cast a glance at the Stars.
বাংলা অনুবাদ
অতঃপর তারকারাজির দিকে সে একবার তাকাল (অর্থাৎ চিন্তে ভাবনা করল)
অতঃপর সে তারকারাজির মধ্যে একবার দৃষ্টি দিল।
অতঃপর সে একবার তারকারাজির দিকে একবার তাকালো।
অতঃপর তিনি তারকারাজির দিকে একবার তাকালেন,
অতঃপর সে (ইবরাহীম) একবার তারকাদের দিকে তাকাল।
৮৮. ইবরাহীম (আলাইহস-সালাম) তাঁর জাতির সাথে বের হওয়া থেকে বাঁচার পথ খোঁজার জন্য ফন্দি আঁটতে তারকারাজির প্রতি দৃষ্টি দিলেন।
তাফসীর
৮৮-৯৮ নং আয়াতের তাফসীর: হযরত ইবরাহীম (আঃ) স্বীয় সম্প্রদায়কে এই কথা এ জন্যেই বললেন যে, যখন তারা তাদের মেলায় বের হয়ে যাবে তখন তিনি যেন শহরে একাই থেকে যেতে পারেন এবং তাদের মূর্তিগুলোকে ভেঙ্গে চুরমার করার সুযোগ পান। এই জন্যে তিনি এমন কথা বললেন যা প্রকৃত প্রস্তাবে সত্য ছিল। তারা তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী হযরত ইবরাহীম (আঃ)-কে অসুস্থ ভেবেছিল। তাই তাকে রেখেই তারা বের হয়েছিল। আর এরই মাঝে তিনি দ্বীনী খিদমত করেছিলেন। কাতাদাও (রঃ) বলেন যে, যখন কোন ব্যক্তি কোন বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করে তখন আরবীয়রা বলেঃ “তিনি নক্ষত্রের প্রতি দৃষ্টিপাত করেছেন।” অর্থ হচ্ছে এই যে, চিন্তিতভাবে নক্ষত্রের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করা এবং অনুধাবন করা যে, কিভাবে ওর প্রভাবমুক্ত হওয়া যাবে?
হযরত ইবরাহীম (আঃ) চিন্তা-ভাবনা করে বললেন যে, তিনি পীড়িত অর্থাৎ দুর্বল। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, হযরত ইবরহীম (আঃ) তিনটি মিথ্যা কথা বলেছিলেন। এর মধ্যে দু’বার আল্লাহর দ্বীনের জন্যে মিথ্যা বলেছিলেন। যথা (আরবী) (আমি অসুস্থ)। অপর স্থানে বলেছিলেনঃ (আরবী) (২১:৬৩) (বরং তাদের এই বড় প্রতিমাটি এ কাজ করেছে অর্থাৎ মূর্তিগুলো ভেঙ্গেছে)। আর একবার তিনি স্বীয় স্ত্রী হযরত সারাকে তার বোন বলেছিলেন। একথা স্মরণযোগ্য যে, এগুলোর একটিও আসল বা প্রকৃত মিথ্যা ছিল না। এখানে রূপক অর্থে মিথ্যা বলা হয়েছে। সুতরাং তাকে তিরস্কার করা চলবে না। কথার মাঝে কোন শরয়ী উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে এরূপ বাহানা করা মিথ্যার অন্তর্ভুক্ত নয়।হযরত আবু সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর ঐ তিনটি কথার মধ্যে একটিও এমন ছিল না যার কর্ম-কৌশলের সাথে আল্লাহর দ্বীনের কল্যাণ সাধন উদ্দেশ্য ছিল না।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত সুফিয়ান (রঃ) বলেন যে, “আমি অসুস্থ” এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ “আমি প্লেগ রোগে আক্রান্ত হয়েছি।” আর ঐ লোকগুলো এরূপ রোগাক্রান্ত ব্যক্তি হতে পালিয়ে যেতো।
হযরত সাঈদ (রঃ) বলেন যে, আল্লাহর দ্বীন প্রচার এবং তাদের মিথ্যা উপাস্যদের অসারতা প্রমাণের জন্যেই হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর এটা একটি কর্মকৌশল ছিল যে, তিনি নক্ষত্র উদিত হতে দেখে বলেছিলেনঃ “আমি অসুস্থ।” এ কথাও বলা হয়েছে যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ “আমি রোগাক্রান্ত হবো” অর্থাৎ একবার মৃত্যুর রোগ আসবেই। একটা উক্তি এও রয়েছে যে, তার এ কথার দ্বারা উদ্দেশ্য ছিলঃ “আমার হৃদয় তোমাদের দেব-দেবীর উপাসনা করাতে অসুস্থ।”হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, যখন হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর সম্প্রদায় মেলাতে যাচ্ছিল তখন তাকেও তারা তাদের সাথে যেতে বাধ্য করছিল। তখন তিনি “আমি অসুস্থ” একথা বলে সরে পড়েন এবং একটি নক্ষত্রের দিকে দৃষ্টিপাত করেন।
যখন তারা সবাই মেলায় চলে যায় তখন তিনি অতি সন্তর্পণে তাদের দেবতাগুলোর নিকট গমন করেন এবং বলেনঃ “তোমরা খাদ্য গ্রহণ করছো না কেন?” হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাদের মন্দিরে গিয়ে দেখেন যে, তারা তাদের দেবতাগুলোর সামনে যে নৈবেদ্য বা প্রসাদ রেখেছিল সেগুলো সবই পড়ে রয়েছে। তারা বরকতের আশায় যেসব উৎসর্গ রেখেছিল সেগুলো হতে তাদের দেবতাগুলো কিছুই খায়নি। মন্দিরটি ছিল অত্যন্ত প্রশস্ত ও কারুকার্য খচিত। দরযার নিকটেই এক প্রকাণ্ড মূর্তি ছিল। তার পাশে ছিল অনেকগুলো ছোট ছোট মূর্তি। মন্দিরটি মূর্তিতে পরিপূর্ণ ছিল। তাদের সামনে নানা জাতের উপাদেয় খাদ্য রাখা ছিল।
তাদের এ বিশ্বাস ছিল যে, খাদ্যগুলো বরকতময় হবে এবং তারা মেলা হতে ফিরে এসে ওগুলো ভক্ষণ করবে। হযরত ইবরাহীম (আঃ) মূর্তিগুলোর মুখ হতে তার কথার কোন জবাব না পেয়ে আবার বললেনঃ “তোমাদের হয়েছে কি, কথা বলছো না কেন?” অতঃপর তিনি তাদের নিকটবর্তী হয়ে ডান হাত দ্বারা তাদেরকে আঘাত করেন। কাতাদা (রঃ) ও জওহারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) তখন মূর্তিগুলোকে ভেঙ্গে ফেলার উদ্দেশ্যে অগ্রসর হলেন এবং ডান হাত দ্বারা আঘাত করতে শুরু করলেন। কেননা ঐগুলো ছিল খুব শক্ত। তিনি সবগুলোকে ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করে ফেললেন। কিন্তু সবচেয়ে বড় মূর্তিটিকে তিনি বহাল রেখে দিলেন, ভেঙ্গে ফেললেন না।
যাতে ওর উপরই মন্দ ধারণা জন্মে, যেমন সূরায়ে আম্বিয়ায় বর্ণিত হয়েছে এবং সেখানে এর পূর্ণ তাফসীরও বর্ণনা করা হয়েছে।মূর্তিপূজকরা মেলা হতে ফিরে এসে যখন তাদের মন্দিরে প্রবেশ করলো তখন দেখলো যে, মূর্তিগুলো ভাঙ্গা অবস্থায় বিশৃংখলভাবে পড়ে রয়েছে। কারো হাত নেই, কারো পা নেই, কারো মাথা এবং কারো কারো পূর্ণ দেহটিই নেই। তারা বিস্মিত হলো যে, ব্যাপার কি!মহান আল্লাহর উক্তিঃ “তখন ঐ লোকগুলো তার দিকে ছুটে আসলো।” অর্থাৎ বহু চিন্তা-ভাবনা করে, আলাপ আলোচনা করে তারা বুঝলো যে, হয় না হয় এটা ইবরাহীমেরই (আঃ) কাজ। তাই তারা দ্রুতগতিতে তাঁর দিকে ধাবিত হয়েছিল।
এখানে ঘটনাটি সংক্ষিপ্তভাবে বর্ণিত হয়েছে। সূরায়ে আম্বিয়ায় এটা বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাদের সকলকে এক সাথে পেয়ে তাবলীগ করার বড় সুযোগ লাভ করলেন। তিনি তাদেরকে বললেনঃ “তোমরা নিজেরা যাদেরকে খোদাই করে নির্মাণ কর তাদেরই কি তোমরা পূজা করে থাকো? প্রকৃতপক্ষে আল্লাহই সৃষ্টি করেছেন তোমাদেরকে এবং তোমরা যা তৈরী কর সেগুলোকেও।” এই আয়াতে (আরবী) অক্ষরটি সম্ভবতঃ (আরবী) হিসেবে এসেছে এবং এও হতে পারে যে, এটা (আরবী)-এর অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। তবে প্রথমটিই বেশী সুস্পষ্ট। হযরত হুযাইফা (রাঃ) হতে মারফু রূপে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ প্রত্যেক শিল্পী ও তার শিল্পকে সৃষ্টি করেন।
(এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) কিতাবু আফআলিল ইবাদ’ এর মধ্যে বর্ণনা করেছেন) কেউ কেউ এ আয়াতটি (আরবী) এরূপ পড়েছেন। যেহেতু এমন সুস্পষ্ট উক্তির উত্তর তাদের নিকট ছিল না সেই হেতু তারা নবী (আঃ)-এর শত্রুতায় উঠে পড়ে লেগে গেল। তারা বললোঃ “তার জন্যে একটি ইমারত (চতুর্দিকে পাকা প্রাচীরযুক্ত ইমারত যাতে অগ্নি প্রজ্বলিত করা হয়েছিল) তৈরী কর, অতঃপর তাকে জ্বলন্ত অগ্নিতে নিক্ষেপ কর।” মহান আল্লাহ স্বীয় বন্ধুকে এই জ্বলন্ত অগ্নি হতে রক্ষা করেন। তাঁকেই তিনি বিজয় মাল্যে ভূষিত করেন ও সাহায্য দান করেন। আর তাদেরকে করেন অতিশয় হেয় ও অপমানিত।
এর পূর্ণ বর্ণনা ও পুরোপুরি তাফসীর সূরায়ে আম্বিয়ায় গত হয়েছে। এ জন্যেই মহামহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তাদেরকে অতিশয় হেয় করে দিলাম।”
অতঃপর তিনি তারকারাজির দিকে একবার তাকালেন,
[সূরা আস-সাফফাত (৩৭): আয়াত ৮৩ থেকে ৯০] পূর্ণ পৃষ্ঠা
[সূরা আস-সাফফাত (৩৭): আয়াত ৮৩ থেকে ৯০]আর নিশ্চয়ই তাঁর (নূহের) অনুসারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন ইবরাহীম (৮৩)। যখন তিনি তাঁর রবের নিকট উপস্থিত হয়েছিলেন এক সুস্থ ও প্রশান্ত হৃদয় নিয়ে (৮৪)। যখন তিনি তাঁর পিতা ও তাঁর সম্প্রদায়কে বলেছিলেন, "তোমরা কিসের ইবাদত করছ? (৮৫) তোমরা কি আল্লাহকে ছেড়ে অলীক উপাস্যদের কামনা করছ? (৮৬) তাহলে বিশ্বজগতের রব সম্পর্কে তোমাদের ধারণা কী?" (৮৭)অতঃপর তিনি তারকাদের দিকে এক নজরে তাকালেন (৮৮)। এবং বললেন, "নিশ্চয়ই আমি অসুস্থ" (৮৯)। তখন তারা তাঁর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে প্রস্থান করল (৯০)।মহান আল্লাহর বাণী: "আর নিশ্চয়ই তাঁর অনুসারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন ইবরাহীম।" ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন: অর্থাৎ তাঁর দ্বীনের অনুসারীদের অন্তর্ভুক্ত।
মুজাহিদ বলেন: অর্থাৎ তাঁর আদর্শ ও সুন্নাহর অনুসারী। আসমায়ী বলেন: 'শিআহ' অর্থ সাহায্যকারী দল; এটি 'শিয়া' শব্দ থেকে গৃহীত, যার অর্থ সেই ছোট ছোট কাঠ যা বড় কাঠের সাথে প্রজ্বলিত করা হয় যাতে আগুন ভালোভাবে জ্বলে ওঠে। কালবী ও ফাররা বলেন: এর অর্থ হলো নিশ্চয়ই মুহাম্মদ (সা.)-এর অনুসারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন ইবরাহীম। এই ব্যাখ্যা অনুযায়ী "তাঁর অনুসারী" শব্দের সর্বনামটি মুহাম্মদ (সা.)-এর দিকে নির্দেশ করে। তবে প্রথম মতানুসারে এটি নূহ (আ.)-এর দিকে নির্দেশ করে এবং এটিই অধিক স্পষ্ট, কারণ নূহ (আ.)-এর কথা আগে উল্লিখিত হয়েছে। নূহ ও ইবরাহীমের মাঝে মাত্র দুজন নবী অতিবাহিত হয়েছেন—হূদ ও সালিহ।
নূহ ও ইবরাহীমের মধ্যকার সময়কাল ছিল দুই হাজার ছয়শ চল্লিশ বছর—এটি যামাখশারী বর্ণনা করেছেন। মহান আল্লাহর বাণী: "যখন তিনি তাঁর রবের নিকট উপস্থিত হয়েছিলেন এক সুস্থ হৃদয় নিয়ে" অর্থাৎ শিরক ও সন্দেহ থেকে মুক্ত একনিষ্ঠ হৃদয়ে। আউফ আল-আরাবি বলেন: আমি মুহাম্মদ ইবনে সিরীনকে জিজ্ঞাসা করলাম, সুস্থ হৃদয় বলতে কী বোঝায়? তিনি বললেন: আল্লাহর সৃষ্টির ব্যাপারে তাঁর প্রতি একনিষ্ঠ হওয়া। তাবারী গালিব আল-কাত্তান, আউফ এবং অন্যান্যদের সূত্রে মুহাম্মদ ইবনে সিরীন থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি হাজ্জাজ সম্পর্কে বলতেন: আবু মুহাম্মদ এক হতভাগা! যদি আল্লাহ তাকে শাস্তি দেন তবে তা তার পাপের কারণে, আর যদি তাকে ক্ষমা করেন তবে তা তার জন্য পরম আনন্দের।
আর যদি তার হৃদয় সুস্থ ও বিশুদ্ধ হয়ে থাকে তবে তার চেয়েও উত্তম ব্যক্তিরা পাপে লিপ্ত হয়েছেন। আউফ বলেন: আমি মুহাম্মদ ইবনে সিরীনকে বললাম, সুস্থ হৃদয় কী? তিনি বললেন: এ কথা জানা যে, আল্লাহ সত্য, কিয়ামত সুনিশ্চিত এবং আল্লাহ কবরের বাসিন্দাদের পুনরুত্থিত করবেন। হিশাম ইবনে উরওয়াহ বলেন: আমার পিতা আমাদের বলতেন—হে বৎসগণ! তোমরা লানতকারী (অভিশাপদানকারী) হয়ো না। তোমরা কি ইবরাহীমের দিকে লক্ষ্য করোনি? তিনি কখনোই কোনো কিছুকে লানত করেননি। মহান আল্লাহ বলেন: "যখন তিনি তাঁর রবের নিকট উপস্থিত হয়েছিলেন এক সুস্থ হৃদয় নিয়ে।" তাঁর রবের নিকট উপস্থিত হওয়ার বিষয়টি দুটি অর্থ বহন করতে পারে: এক.
তাঁকে তাওহীদ ও আনুগত্যের দিকে আহ্বানের সময়। দুই. তাঁকে অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করার সময়। "যখন তিনি তাঁর পিতাকে বললেন"—তিনি হলেন আযর, যার আলোচনা ইতিপূর্বে অতিক্রান্ত হয়েছে। "এবং তাঁর সম্প্রদায়কে: তোমরা কিসের ইবাদত করছ?"—এখানে "কী" শব্দটি শুরুতে থাকায় কর্তাবাচক অবস্থায় রয়েছে এবং "তা" শব্দটি তার বিধেয় হওয়া সম্ভব...(১) দেখুন খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ২২; প্রথম অথবা দ্বিতীয় সংস্করণ। [ ..... ]
