As-Saffat
আস-সাফফাত: 27
37 আস-সাফফাত As-Saffat · 182 আয়াত الصافات
মূল আরবি
وَأَقْبَلَ بَعْضُهُمْ عَلَىٰ بَعْضٍ يَتَسَآءَلُونَ
English Translations
And they will approach one another asking [i.e., blaming] each other.
And they will turn to one another and question one another.
And some of them (the followers of their chiefs) will turn to others (the chiefs), asking questions from one another.
They will then turn towards each other (and start wrangling).
And some of them draw near unto others, mutually questioning.
And they will turn to one another, and question one another.
বাংলা অনুবাদ
তারা একে অপরের দিকে মুখ করে পরস্পর জিজ্ঞাসাবাদ করবে।
আর তারা একে অপরের মুখোমুখি হয়ে জিজ্ঞাসা করবে,
এবং তারা একে অপরের সামনাসামনি হয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করবে।
আর তারা একে অন্যের সামনাসামনি হয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করবে---
এবং একে অন্যের মুখোমুখি হয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করবে।
২৭. আর একজন অপরজনের প্রতি দোষারোপ ও ঝগড়া নিয়ে অগ্রসর হবে। যখন দোষারোপ আর ঝগড়া কোন উপকারে আসবে না।
তাফসীর
২৭-৩৭ নং আয়াতের তাফসীর: আল্লাহ তা'আলা বর্ণনা করছেন যে, কাফিররা জাহান্নামের মধ্যে যেভাবে জ্বলতে থাকবে ও পরস্পর দ্বন্দ্বে ও তর্ক-বিতর্কে লিপ্ত হবে ঠিক তেমনিভাবে তারা কিয়ামতের মাঠে একে অপরকে দোষারোপ করতে থাকবে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “দুর্বলরা ক্ষমতাদর্পীদেরকে বলবেঃ আমরা তোমাদের অনুসারী ছিলাম, সুতরাং আজ কি তোমরা আমাদেরকে শাস্তির কিছু অংশ থেকে রক্ষা করবে না? ক্ষমতাদপীরা উত্তরে বলবেঃ আমরা নিজেরাও তো তোমাদের সাথে জাহান্নামে রয়েছি, নিশ্চয়ই আল্লাহ্ বান্দাদের মধ্যে প্রকৃত ফায়সালা করেছেন।”(৪০:৪৭-৪৮) আল্লাহ তাআলা আরো বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হায়!
যদি তুমি দেখতে যালিমদেরকে, যখন তাদেরকে তাদের প্রতিপালকের সামনে দণ্ডায়মান করা হবে তখন তারা পরস্পর বাদ-প্রতিবাদ লুতে থাকবে, যাদেরকে দুর্বল মনে করা হতো তারা ক্ষমতাদর্পীদেরকে বলবেঃ তোমরা না থাকলে আমরা অবশ্যই মুমিন হতাম। যারা ক্ষমতাদর্পী ছিল তারা যাদেরকে দুর্বল মনে করা হতো তাদেরকে বলবেঃ তোমাদের নিকট সৎ পথের দিশা আসার পর আমরা কি তোমাদেরকে ওটা হতে নিবৃত্ত করেছিলাম? বস্তুতঃ তোমরাই তো ছিলে অপরাধী। যাদেরকে দুর্বল মনে করা হতো তারা ক্ষমতাদর্পীদেরকে বলবেঃ প্রকৃতপক্ষে তোমরাই তো দিবারাত্র চক্রান্তে লিপ্ত ছিলে, আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছিলে যে, যেন আমরা আল্লাহকে অমান্য করি এবং তার শরীক স্থাপন করি।
যখন তারা শাস্তি প্রত্যক্ষ করবে তখন অনুতাপ গোপন রাখবে এবং আমি কাফিরদের গলদেশে শৃংখল পরাবো। তাদেরকে তারা যা করতো তারই প্রতিফল দেয়া হবে।”(৩৪:৩১-৩৩) অনুরূপ বর্ণনা এখানেও রয়েছে যে, তারা তাদের নেতৃবর্গকে বলবেঃ তোমরা আমাদের ডান দিকে ছিলে। অর্থাৎ যেহেতু আমরা তোমাদের চেয়ে কম শক্তি সম্পন্ন ছিলাম এবং তোমরা আমাদের উপর আধিপত্য বিস্তার করেছিলে সেই হেতু তোমরা আমাদেরকে জোরপূর্বক ন্যায় হতে অন্যায়ের দিকে ফিরিয়ে দিতে। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, কাফিররা এ কথা শয়তানদেরকে বলবে।কাতাদা (রঃ) বলেন যে, একথা মানুষ জ্বিনদেরকে বলবে। মানুষ তাদেরকে বলবেঃ তোমরা আমাদেরকে ভাল কাজ হতে ফিরিয়ে মন্দ কাজ করতে উত্তেজিত করতে, পাপের কাজকে আমাদের চোখে সুন্দর করে দেখাতে এবং ভাল ও পুণ্যের কাজকে কঠিন ও মরূপে প্রদর্শন করতে।
হক হতে ফিরিয়ে দিতে এবং বাতিলের প্রতি আমাদেরকে প্রভাবিত করতে। কোন কোন সময় যখন আমাদের মনে পুণ্য কাজের প্রতি খেয়াল জাগতো তখন তোমরা প্রতারণা করে আমাদেরকে তা হতে সরিয়ে দিতে। ইসলাম, ঈমান এবং পুণ্য লাভ হতে তোমরা আমাদেরকে বঞ্চিত করেছে, তাওহীদ হতে আমাদেরকে বহু দূরে তোমরা নিক্ষেপ করেছো। তোমাদেরকে আমাদের মঙ্গলকামী ও শুভাকাঙ্ক্ষী মনে করে আমরা তোমাদেরকে আমাদের সব গোপন কথা বলেছিলাম ও তোমাদেরকে বিশ্বস্ত ভেবেছিলাম। তোমাদের কথা আমরা মেনে চলতাম এবং তোমাদেরকে ভাল মানুষ মনে করতাম।মহান আল্লাহ শক্তিশালী নেতৃবৃন্দের উক্তি উদ্ধৃত করেনঃ বরং তোমরা তো বিশ্বাসীই ছিলে না।
অর্থাৎ দুর্বলদের অভিযোগ শুনে জ্বিন ও মানুষের মধ্যে যারা নেতৃস্থানীয় ও সম্মানিত ব্যক্তি ছিল তারা ঐ দুর্বলদেরকে উত্তরে বলবেঃ আমাদের কোন দোষ নেই। তোমরা নিজেরাই তো অন্যায়কারী ছিলে। তোমাদের অন্তর ঈমান হতে দূরে ছিল। কুফরী ও পাপের কাজে তোমরা সদা লিপ্ত থাকতে।তোমাদের উপর আমাদের কোন কর্তৃত্ব ছিল না। বস্তুতঃ তোমরাই ছিলে সীমালংঘনকারী সম্প্রদায়। তোমাদের মনের মধ্যে অবাধ্যতা ও দুষ্টামি ছিল। তাই তোমরা আমাদের কথা মান্য করেছিলে এবং নবীদের আনয়নকৃত সত্যকে পরিত্যাগ করেছিলে। তারা যা নিয়ে এসেছিলেন তার স্বপক্ষে তারা প্রমাণও পেশ করেছিলেন।
এতদসত্ত্বেও তোমরা তাদের বিরোধিতা করেছিলে। তাই আমাদের সবারই উপর আল্লাহর আযাবের বাণী সত্যভাবে স্থির হয়েছে। আমাদেরকে অবশ্যই শাস্তির স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। আমরা তোমাদেরকে ধোঁকায় ফেলেছিলাম ও বিভ্রান্ত করেছিলাম, কারণ আমরা নিজেরাও ছিলাম বিভ্রান্ত।মহামহিমান্বিত আল্লাহ্ বলেনঃ তারা সবাই সেই দিন শাস্তিতে শরীক হবে। অর্থাৎ নিজ নিজ কাজ অনুযায়ী সবাই জাহান্নামী। আর অপরাধীদের প্রতি আমি এরূপই করে থাকি। যখন তাদেরকে বলা হতো যে, আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই তখন তারা গর্বভরে বলতোঃ আমরা কি এক পাগল কবির কথায় আমাদের মা’বৃদদেরকে বর্জন করবো?
অর্থাৎ তারা অহংকার ভরে তাওহীদের বাণী উচ্চারণ করতো না, যে বাণী মুমিনরা উচ্চারণ করতো। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আমি মানব জাতির সাথে যুদ্ধ করতে আদিষ্ট হয়েছি যে পর্যন্ত না তারা বলে যে, আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই। সুতরাং যে ব্যক্তি বলবে যে, আল্লাহ ছাড়া কোন মা'বুদ নেই সে ইসলামের হক ছাড়া তার মাল ও জান আমা হতে বাঁচিয়ে নিবে এবং তার হিসাব মহামহিমান্বিত আল্লাহর নিকট রয়েছে।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)এ বিষয়টিই আল্লাহর কিতাবেও রয়েছে এবং এক অহংকারী সম্প্রদায়ের ঘটনা বর্ণিত হয়েছে যে, তারা এ কালেমা উচ্চারণ করতে গর্বভরে অস্বীকার করছিল।
আবুল আ'লা (রাঃ) বলেন যে, কিয়ামতের দিন ইয়াহূদীদেরকে আনয়ন করা হবে, অতঃপর তাদেরকে বলা হবেঃ “তোমরা দুনিয়াতে কার ইবাদত করতে?” উত্তরে তারা বলবেঃ “আমরা আল্লাহর এবং উযায়ের (আঃ)-এর ইবাদত কাম।” তখন তাদেরকে বাম পাশে রাখার নির্দেশ দেয়া হবে। তারপর খৃষ্টানদেরকে এনে জিজ্ঞেস করা হবেঃ “তোমরা কার ইবাদত করতে?” তারা উত্তর দিবেঃ “আমরা আল্লাহর ও ঈসা (আঃ)-এর ইবাদত করতাম।” এদেরকেও বাম পাশে রাখার হুকুম করা হবে। এরপর মুশরিকদেরকে আনয়ন করে বলা হবেঃ “আল্লাহ ছাড়া কোন মা'বুদ নেই।” তখন তারা অহংকার করবে। তিনবার তাদেরকে এ কথা বলা হবে এবং তিনবারই তারা অহংকার প্রকাশ করবে।
তাদেরকেও বাম দিকে রাখার নির্দেশ দেয়া হবে। আবু নাযা (রাঃ) বলেন যে, তাদেরকে পাখীর চেয়েও বেশী দ্রুতগতিতে নিয়ে যাওয়া হবে। আবুল আ'লা (রাঃ) বলেন যে, এরপর মুসলিমদের আনয়ন করা হবে এবং তাদেরকে প্রশ্ন করা হবেঃ “তোমরা কার ইবাদত করতে?” তারা জবাবে বলবেঃ “আমরা আল্লাহ তাআলার ইবাদত করতাম। তখন তাদেরকে জিজ্ঞেস করা হবেঃ “তোমরা তাঁকে দেখলে চিনতে পারবে কি?" তারা উত্তর দিবেঃ “হ্যা পারবো।” আবার তাদেরকে প্রশ্ন করা হবেঃ “তোমরা তো তাঁকে দেখোনি, সুতরাং কি করে তাঁকে চিনতে পারবে?” তারা উত্তর দিবেঃ “আমরা জানি যে, কেউই তার সমকক্ষ নয়।” তখন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা তাদেরকে স্বীয় পরিচয় প্রদান করবেন এবং তাদেরকে মুক্তি দিবেন।
কাফির ও মুশরিকরা কালেমায়ে তাওহীদ শুনে উত্তর দিতোঃ “আমরা কি একজন কবি ও পাগলের কথায় আমাদের উপাস্যদেরকে পরিত্যাগ করবো?” অর্থাৎ তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে কবি ও পাগল বলে আখ্যায়িত করতো। আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে মিথ্যাবাদী প্রমাণিত করতঃ তাদের মত খণ্ডন করে বলেনঃ “বরং এই নবী (সঃ) সত্য নিয়ে এসেছে এবং সমস্ত রাসূলকে সে সত্য বলে স্বীকার করেছে। অন্যান্য নবীরা (আঃ) ইতিপূর্বে এই নবী (সঃ) সম্বন্ধে যে গুণাবলী ও পবিত্রতার বর্ণনা দিয়েছিলেন যেসবের সঠিক প্রমাণ তিনি নিজেই। পূর্ববর্তী নবীগণ (আঃ) যেসব হুকুম বর্ণনা করেছেন, তিনিও সেসবেরই বর্ণনা দিয়ে থাকেন।
যেমন অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “(হে নবী সঃ)! তোমাকে ঐ কথাই বলা হচ্ছে যা তোমার পূর্ববর্তী রাসূলদেরকে (আঃ) বলা হয়েছিল।”(৪১:৪৩)
আর তারা একে অন্যের সামনাসামনি হয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করবে---
[সূরা আস-সাফফাত (৩৭): আয়াত ২২ থেকে ৩৫] পূর্ণ পৃষ্ঠা
[সূরা আস-সাফফাত (৩৭): আয়াত ১৮ থেকে ২১]বলুন, 'হ্যাঁ, এবং তোমরা হবে লাঞ্ছিত।' (১৮) বস্তুত তা হবে কেবল একটি প্রচণ্ড শব্দ, তখনই তারা প্রত্যক্ষ করতে থাকবে। (১৯) এবং তারা বলবে, 'হায় দুর্ভোগ আমাদের! এটাই তো প্রতিদান দিবস।' (২০) (বলা হবে,) 'এটাই ফয়সালার দিন, যাকে তোমরা অস্বীকার করতে।' (২১)মহান আল্লাহর বাণী: "বলুন, হ্যাঁ" অর্থাৎ হ্যাঁ, তোমাদের পুনরুত্থিত করা হবে। "এবং তোমরা হবে লাঞ্ছিত" অর্থাৎ ক্ষুদ্র ও অপমানিত; কারণ তারা যখন তাদের অস্বীকারকৃত বিষয়টির সংঘটন প্রত্যক্ষ করবে, তখন অনিবার্যভাবেই তারা লাঞ্ছিত হবে। কেউ কেউ বলেছেন: এর অর্থ হলো—কিয়ামত অবশ্যই সংঘটিত হবে যদিও তোমরা তা অপছন্দ করো, সুতরাং এটি তোমাদের অনিচ্ছা সত্ত্বেও ঘটিতব্য বিষয়, যদিও আজ তোমরা তোমাদের ভ্রান্ত ধারণা অনুযায়ী তা অস্বীকার করছ।
"বস্তুত তা হবে কেবল একটি প্রচণ্ড শব্দ" অর্থাৎ একটি মাত্র চিৎকার; এটি হাসান বসরী রহ. বলেছেন এবং এটি হলো দ্বিতীয় ফুৎকার। আর এই চিৎকারকে 'জাজরাহ' (ধমক বা ঝাতকার) বলা হয়েছে, কারণ এর উদ্দেশ্য হলো তাড়িয়ে আনা; অর্থাৎ এর মাধ্যমে তাদেরকে তাড়িয়ে আনা হবে যেমন চালনা করার সময় উট ও ঘোড়াকে ধমক দিয়ে তাড়িয়ে আনা হয়। "অতঃপর তারা দাঁড়িয়ে দেখতে থাকবে" অর্থাৎ তারা একে অপরের দিকে তাকাতে থাকবে। কেউ কেউ বলেছেন: এর অর্থ হলো, তাদের সাথে কী করা হবে সেটির জন্য তারা অপেক্ষা করতে থাকবে। আবার বলা হয়েছে: এটি মহান আল্লাহর এই বাণীর ন্যায়: "হঠাৎ কাফিরদের চক্ষুসমূহ স্থির হয়ে যাবে" [আল-আম্বিয়া: ৯৭]।
আরও বলা হয়েছে: অর্থাৎ তারা সেই পুনরুত্থানের দিকে তাকাবে যা তারা অস্বীকার করত। মহান আল্লাহর বাণী: "এবং তারা বলবে, হায় দুর্ভোগ আমাদের! এটাই প্রতিদান দিবস" তারা নিজেদের জন্য ধ্বংস ও দুর্ভোগের আহ্বান জানাবে, কারণ সেদিন তারা জানতে পারবে তাদের ওপর কী বিপদ আপতিত হয়েছে। বসরী ব্যাকরণবিদদের মতে এটি 'মাসদার' হিসেবে নসব হয়েছে। আর আল-ফাররা ধারণা করেছেন যে, এর মূল রূপ হলো 'ইয়া ওয়াই লানা', যেখানে 'ওয়াই' অর্থ হলো অনুশোচনা। আন-নাহহাস বলেন: যদি বিষয়টি তেমনই হতো যেমনটি তিনি বলেছেন, তবে এটি পৃথকভাবে লেখা হতো; অথচ এটি মুসহাফে যুক্ত অবস্থায় রয়েছে এবং আমাদের জানামতে কেউ একে যুক্ত অবস্থা ছাড়া অন্যভাবে লেখেন না।
আর "প্রতিদান দিবস" বলতে হিসাবের দিনকে বোঝানো হয়েছে; কেউ বলেছেন এটি কর্মফল দিবস। "এটাই ফয়সালার দিন যাকে তোমরা অস্বীকার করতে" বলা হয়েছে: এটি তাদের একে অপরের প্রতি উক্তি হবে, অর্থাৎ এটি সেই দিন যা আমরা অস্বীকার করতাম। কেউ কেউ বলেছেন: এটি তাদের প্রতি মহান আল্লাহর বাণী। আবার বলা হয়েছে: এটি ফেরেশতাদের উক্তি, অর্থাৎ এটি মানুষের মধ্যে বিচারের দিন, ফলে তখন সত্যপন্থী ও মিথ্যাবাদীর পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে যাবে। অতঃপর "একদল জান্নাতে এবং একদল প্রজ্বলিত অগ্নিতে" [আশ-শূরা: ৭] স্থান পাবে। [সূরা আস-সাফফাত (৩৭): আয়াত ২২ থেকে ৩৫]তোমরা একত্রিত করো যালিমদের, তাদের সহচরদের এবং তারা যাদের ইবাদত করত—(২২) আল্লাহর পরিবর্তে।
অতঃপর তাদেরকে পরিচালিত করো জাহান্নামের পথে। (২৩) এবং তাদেরকে থামাও, নিশ্চয় তারা জিজ্ঞাসিত হবে; (২৪) তোমাদের কী হলো যে তোমরা একে অপরকে সাহায্য করছ না?' (২৫) বরং আজ তারা সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণকারী। (২৬)এবং তারা একে অপরের মুখোমুখি হয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করবে। (২৭) তারা বলবে, 'তোমরা তো আমাদের কাছে ডান দিক থেকে (প্রভাব নিয়ে) আসতে।' (২৮) তারা বলবে, 'বরং তোমরা মুমিনই ছিলে না। (২৯) এবং তোমাদের ওপর আমাদের কোনো আধিপত্য ছিল না; বরং তোমরাই ছিলে এক সীমালঙ্ঘনকারী সম্প্রদায়। (৩০) ফলে আমাদের ওপর আমাদের রবের বাণী সত্য প্রমাণিত হয়েছে যে, আমাদের অবশ্যই শাস্তি আস্বাদন করতে হবে।
(৩১)সুতরাং আমরা তোমাদের বিভ্রান্ত করেছিলাম, কারণ আমরা নিজেরাও বিভ্রান্ত ছিলাম।' (৩২) ফলে তারা সেদিন শাস্তিতে একে অপরের অংশীদার হবে। (৩৩) এভাবেই আমি অপরাধীদের সাথে আচরণ করে থাকি। (৩৪) নিশ্চয় তাদের যখন বলা হতো, 'আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই', তখন তারা অহংকার করত। (৩৫)
পূর্ণ পৃষ্ঠা পূর্ণ পৃষ্ঠা পূর্ণ পৃষ্ঠা
মতভেদতিনি বললেন: সে বিষয়ে তোমার কাছে যা যা পরস্পরবিরোধী মনে হয়েছে, তা পেশ করো।তিনি বললেন: আমি আল্লাহকে বলতে শুনেছি, (অতঃপর তাদের পরীক্ষার পরিণাম এছাড়া আর কিছু হবে না যে, তারা বলবে: ‘আমাদের রব আল্লাহর শপথ! আমরা মুশরিক ছিলাম না’) (সূরা আল-আন’আম, আয়াত ২৩)। আবার তিনি বলেছেন, এবং তারা আল্লাহর কাছে কোনো কথা গোপন করতে পারবে না
অথচ তারা তো গোপন করল। আবার আমি তাকে বলতে শুনেছি, (সেদিন তাদের মধ্যে কোনো বংশীয় সম্পর্ক থাকবে না এবং তারা একে অপরের খোঁজ নেবে না) (সূরা আল-মুমিনুন, আয়াত ১০১)। পুনরায় তিনি বলেছেন, (এবং তারা একে অপরের মুখোমুখি হয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করবে) (সূরা আস-সাফফাত, আয়াত ২৭)।
তিনি আরও বলেছেন, (তোমরা কি সেই সত্তাকেই অস্বীকার করছ, যিনি পৃথিবীকে দুই দিনে সৃষ্টি করেছেন) (সূরা ফুসসিলাত, আয়াত ৯) ‘অনুগত হয়ে এলাম’ বাক্যটি পর্যন্ত। এই আয়াতে তিনি আসমান সৃষ্টির আগে জমিন সৃষ্টির কথা উল্লেখ করেছেন। আবার অন্য আয়াতে বলেছেন, (আকাশ, যা তিনি নির্মাণ করেছেন) (সূরা আন-নাজিআত, আয়াত ২৭)। তারপর বলেছেন, (আর এর পরে পৃথিবীকে তিনি বিস্তৃত করেছেন) (সূরা আন-নাজিআত, আয়াত ৩০)। ফলে এই আয়াতে তিনি জমিন সৃষ্টির আগে আসমান সৃষ্টির কথা উল্লেখ করেছেন। আর আমি তাকে বলতে শুনি, (আল্লাহ ছিলেন মহাপরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়), (আল্লাহ ছিলেন পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু), (আল্লাহ ছিলেন সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা); যেন এগুলো আগে ছিল কিন্তু এখন সেই অবস্থা অতিক্রান্ত হয়েছে।অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, (আল্লাহ ছিলেন)—এই বাক্যের তাৎপর্য কী?ইবনে আব্বাস (রাযি.) বললেন: তাঁর বাণী—(অতঃপর তাদের পরীক্ষার পরিণাম এছাড়া আর কিছু হবে না যে, তারা বলবে: ‘আমাদের রব আল্লাহর শপথ!
আমরা মুশরিক ছিলাম না’) (সূরা আল-আন’আম, আয়াত ২৩)—এর ব্যাখ্যা হলো, কিয়ামতের দিন যখন তারা দেখবে যে আল্লাহ ইসলাম অনুসারীদের ক্ষমা করছেন এবং পাপসমূহ মোচন করছেন কিন্তু শিরক ক্ষমা করছেন না, আর কোনো পাপ ক্ষমা করা তাঁর জন্য অসম্ভব নয়, তখন মুশরিকরা ক্ষমার আশায় তাদের শিরকের কথা অস্বীকার করবে এবং বলবে: ‘আমাদের রব আল্লাহর শপথ! আমরা মুশরিক ছিলাম না।’ তখন আল্লাহ তাদের মুখে মোহর মেরে দেবেন এবং তাদের হাত ও পা তারা যা করত সে বিষয়ে সাক্ষ্য দেবে। সেই মুহূর্তেই কাফেররা কামনা করবে যে যদি মাটি তাদের সাথে মিশে সমতল হয়ে যেত, আর তারা আল্লাহর কাছে কোনো কথা গোপন করতে পারবে না।আর তাঁর বাণী—(সেদিন তাদের মধ্যে কোনো বংশীয় সম্পর্ক থাকবে না এবং তারা একে অপরের খোঁজ নেবে না) (সূরা আল-মুমিনুন, আয়াত ১০১)—এটি প্রথম শিঙায় ফুৎকারের সময়কার অবস্থা, (আর যখন শিঙায় ফুৎকার দেওয়া হবে, তখন আসমান ও জমিনে যারা আছে সবাই সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়বে, তবে আল্লাহ যাকে ইচ্ছা করেন সে ব্যতীত) (সূরা আয-যুমার, আয়াত ৬৮)।
সেই সময় তাদের মধ্যে কোনো বংশীয় সম্পর্ক থাকবে না এবং তারা একে অপরের খোঁজ নেবে না। (অতঃপর যখন পুনরায় ফুৎকার দেওয়া হবে, তখনই তারা দাঁড়িয়ে তাকাতে থাকবে) (সূরা আয-যুমার, আয়াত ৬৮) এবং তখন (তারা একে অপরের মুখোমুখি হয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করবে) (সূরা আস-সাফফাত, আয়াত ২৭)।আর তাঁর বাণী—(পৃথিবীকে দুই দিনে সৃষ্টি করেছেন) (সূরা ফুসসিলাত, আয়াত ৯)—এর বিষয় হলো, পৃথিবী আসমানের পূর্বেই সৃষ্টি করা হয়েছে।
আল্লাহ তাআলার বাণী: “অতঃপর যখন শিঙ্গায় ফুঁ দেওয়া হবে, তখন সেদিন তাদের মধ্যে কোনো পারস্পরিক বংশীয় সম্পর্ক থাকবে না এবং তারা একে অপরের খোঁজ-খবরও নেবে না। সুতরাং যাদের পাল্লা ভারী হবে, তারাই হবে সফলকাম। আর যাদের পাল্লা হালকা হবে, তারাই নিজেদের ক্ষতি সাধন করেছে; তারা জাহান্নামে চিরস্থায়ী হবে।”ইবনে জারীর, ইবনুল মুনযির এবং ইবনে আবী হাতিম ইবনে আব্বাস (রাযি.) থেকে “সেদিন তাদের মধ্যে কোনো পারস্পরিক বংশীয় সম্পর্ক থাকবে না এবং তারা একে অপরের খোঁজ-খবরও নেবে না” এই আয়াতাংশের ব্যাখ্যায় বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেন: যখন শিঙ্গায় ফুঁ দেওয়া হবে, তখন মহান আল্লাহ ব্যতীত কোনো প্রাণীই জীবিত থাকবে না।আবদ বিন হুমাইদ এবং ইবনে জারীর সুদ্দী (রহ.) থেকে “সেদিন তাদের মধ্যে কোনো পারস্পরিক বংশীয় সম্পর্ক থাকবে না এবং তারা একে অপরের খোঁজ-খবরও নেবে না” এই আয়াতাংশ সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেন: এটি প্রথম ফুৎকারের সময়ের অবস্থা।আবদ বিন হুমাইদ ক্বাতাদাহ (রহ.) থেকে এই আয়াত প্রসঙ্গে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেন: সেদিন মানুষের মধ্যে কেউই কাউকে তার বংশ বা আত্মীয়তার খাতিরে কোনো কিছু প্রার্থনা করবে না।ইবনে জারীর ইবনে জুরাইজ (রহ.) থেকে এই আয়াত প্রসঙ্গে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেন: সেদিন কেউ বংশের পরিচয় দিয়ে কিছু প্রার্থনা করবে না এবং আত্মীয়তার দোহাই দিয়ে কারও দিকে সম্বন্ধযুক্ত হবে না।সাঈদ ইবনে মানসুর, আবদ বিন হুমাইদ, ইবনুল মুনযির এবং ইবনে আবী হাতিম ইবনে আব্বাস (রাযি.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তাঁকে আল্লাহর এই বাণী “সেদিন তাদের মধ্যে কোনো পারস্পরিক বংশীয় সম্পর্ক থাকবে না এবং তারা একে অপরের খোঁজ-খবরও নেবে না” এবং আল্লাহর বাণী “তারা একে অপরের দিকে মুখ করে জিজ্ঞাসাবাদ করবে” (সূরা আস-সাফফাত, আয়াত ২৭) সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল।
তিনি বললেন: এগুলো কিয়ামতের বিভিন্ন পর্যায়। প্রথম ফুৎকারের সময় যখন তারা অচেতন হয়ে পড়বে, তখন তাদের মাঝে কোনো বংশীয় আভিজাত্য থাকবে না এবং কেউ কাউকে জিজ্ঞাসাবাদও করবে না। অতঃপর যখন পরবর্তী ফুঁ দেওয়া হবে, তখন তারা দণ্ডায়মান হয়ে একে অপরকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে থাকবে।
ইবনে জারির দাহহাক থেকে এই আয়াত সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: ‘আল-কাসর’ হলো বিশাল বৃক্ষের কাণ্ডসমূহ, যেন সেগুলো পীতবর্ণের উটের মধ্যভাগ।ইবনে জারির বলেন: প্রতিটি জিনিসের মধ্যভাগকে ‘জাওযাহ’ বলা হয়।ইবনে জারির হারুন থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: হাসান (বাসরি) এটি ‘কাল-কাসর’ (সাদ অক্ষরে সুকুন যোগে) পাঠ করেছেন এবং বলেছেন: এটি হলো কাঠের মোটা টুকরো।ইবনে জারির হাসান থেকে ‘যেন তারা পীতবর্ণের উট’ (জামালতুন সুফর) সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: এগুলো কৃষ্ণবর্ণের উষ্ট্রীর ন্যায়।ইবনে জারির আলীর সূত্রে ইবনে আব্বাস থেকে ‘যেন তারা পীতবর্ণের উট’ সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: এগুলো তামার টুকরো।আব্দ বিন হুমাইদ এবং ইবনে জারির মুজাহিদ থেকে আল্লাহর বাণী ‘প্রাসাদ সদৃশ’ প্রসঙ্গে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: বৃক্ষের বোঝা এবং খেজুর গাছের কাণ্ড।
‘যেন তারা পীতবর্ণের উট’ সম্পর্কে তিনি বলেন: এগুলো হলো সেতুর রজ্জুসমূহ।আব্দুর রাজ্জাক, আব্দ বিন হুমাইদ, ইবনে জারির এবং ইবনুল মুনযির কাতাদাহ থেকে ‘প্রাসাদ সদৃশ’ প্রসঙ্গে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: বৃক্ষ ও খেজুর গাছের কাণ্ডসমূহ। ‘যেন তারা পীতবর্ণের উট’ সম্পর্কে তিনি বলেন: যেন সেগুলো কৃষ্ণবর্ণের উষ্ট্রী।আব্দ বিন হুমাইদ ইকরিমা থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি ‘কাল-কাসর’ পাঠ করতেন এবং বলতেন: এটি স্থূল খেজুর গাছের খণ্ডের মতো। ‘যেন তারা পীতবর্ণের উট’ প্রসঙ্গে তিনি বলেন: এগুলো হলো যুবতী উষ্ট্রী।ইবনে মারদুইয়াহ আব্দুল্লাহ ইবনে সামিত থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: আমি আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আসকে জিজ্ঞাসা করলাম—আপনি কি আল্লাহর বাণী: ‘এটি এমন এক দিন যখন তারা কথা বলতে পারবে না এবং তাদের ওজর পেশ করার অনুমতিও দেওয়া হবে না’ সম্পর্কে লক্ষ্য করেছেন?
তিনি বললেন: কিয়ামত দিবস এমন একটি দিন যার বিভিন্ন অবস্থা ও পর্যায় রয়েছে। কোনো অবস্থায় তারা কথা বলবে না, কোনো অবস্থায় কথা বলবে এবং কোনো অবস্থায় ওজর পেশ করবে। আমি তোমাদের কাছে কেবল তা-ই বর্ণনা করছি যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন: যখন কিয়ামত দিবস হবে, মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ মেঘমালার ছায়াতলে অবতীর্ণ হবেন। প্রতিটি উম্মত তিনটি পর্দার অন্তরালে হাঁটু গেড়ে বসে থাকবে, প্রতিটি পর্দার দূরত্ব পঞ্চাশ হাজার বছরের পথ। একটি আলোর পর্দা, একটি অন্ধকারের পর্দা এবং একটি পানির পর্দা যা দেখা যাবে না।
অতঃপর তিনি সেই পানিকে আদেশ করবেন এবং তা সেই অন্ধকারে বিলীন হয়ে যাবে। কোনো প্রাণী সেই বাণী শোনা মাত্রই প্রাণ হারাবে; সেই মুহূর্তেই তারা কথা বলতে পারবে না।হাকেম বর্ণনা করেছেন এবং একে সহীহ বলেছেন ইকরিমা সূত্রে, তিনি বলেন: নাফে ইবনুল আযরাক ইবনে আব্বাসকে মহান আল্লাহর বাণী—‘এটি এমন এক দিন যখন তারা কথা বলবে না’, ‘তুমি মৃদু ধ্বনি ছাড়া আর কিছুই শুনতে পাবে না’ (সূরা ত্বহা, আয়াত: ১০৮), ‘তারা একে অপরের মুখোমুখি হয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করবে’ (সূরা সাফফাত, আয়াত: ২৭) এবং ‘এসো, তোমরা আমার আমলনামা পড়ে দেখো’ (সূরা হাক্কাহ, আয়াত: ১৯) সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন যে, এগুলো কী?
তিনি (ইবনে আব্বাস) বললেন:
